#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯৩
#ইসরাত_ইতি
কাজ বাদ দিয়ে কম্পিউটারের সামনে অযথা বসে আছে প্রিতম। আসলে কাজ সে কিছুই করছিলো না, গতকাল ইনুকে নিয়ে ইশমাম বাড়িতে চলে যাওয়ার পরে হসপিটালের বিল পে করে বাড়িতে ফিরে সেই যে ঘরকুনো হয়েছে,এখন অবধি ঘর থেকে বেড়োয়নি। তাকে লাগছে উদ্ভ্রান্তের মতন।
প্রেরণা অনেক অপেক্ষা করে শেষে গিয়ে ভাইয়ের কাঁধে একটা হাত রাখে। বসে পাশে, প্রিতম হাসার চেষ্টা করে আপুকে দেখে, চেষ্টা সফল হয়না।
প্রেরণা দরাজ গলায় বলে,“ওকে নিয়ে আয়! অনেকটা সময় পেড়িয়ে গিয়েছে। তুই গেলে ইশমাম আঙ্কেল আপত্তি করবে না এখন। তার রাগ পরেছে হয়তো। আর শোন,উনি এমন না আমরা জানি,মেয়ের এতো বড় অ্যাক্সিডেন্টের ধাক্কা সামলাতে পারেনি এই যা।”
প্রিতম নিশ্চুপ,প্রেরণা ভাইকে বোঝানোর মতো করে বলে,“দ্যাখ,মানছি তোদের মধ্যে ঝামেলাও হচ্ছে,কিন্তু সেসব স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য,সেসবকে তুই সম্পর্ক খারাপ করার কারণ বানাতে পারিস না,তাও ইনুর এই সময়ে। আমরা এতো ইগো নিয়ে বড় হইনি মেইবি! ও আসুক, তুই আমি দু'জনে মিলে ওকে বোঝাবো সুন্দর করে। বুঝবে ঠিক। তোর দুলাভাইয়ের কথা মনে আছে? আমি সপ্তাহে কয়বার ঝামেলা করতাম? যদিও ইনুর মতো অত জেদী ছিলাম না,তবুও।”
_বিষয়টা তা না আপু,আমার সেল্ফ ইসটিম লো লাগে ওদের ফ্যামিলির সামনে গেলে, আমার মনে হয় সবাই, সবকিছু আমাকে দেখে উপহাসের হাসি হাসে। আর এমনিতেও স্পেস দিচ্ছি ওদের সবাইকে, আমি আমার তরফ থেকে সর্বোচ্চ এটাই করতে পারি! আ'ম টায়ার্ড আপু!
_যা-ই লাগুক, এবার তোদের বোঝাপড়া করিয়ে দেবো আমি। আজ তো রেজাল্ট দেবে। যা গিয়ে নিয়ে আয়। তোদের তো সমস্যা না, সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে একজন থার্ড পারসন দ্বারা। ওসব সমূলে উৎপাটন করবো আমি এইবার!
প্রিতম চশমা ঠিক করে বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,“মানে?”
_মানে ইরফান মির্জাকে নিয়ে আমাদের দু বাড়িতে আর ঝামেলা হবে না,সবটা ঠিক হয়ে যাবে আমি সে ব্যবস্থা করবো।
বুঝতে পারছে না প্রিতম কিছু,ভাইকে চিন্তার মধ্যে রেখে প্রেরণা ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়,তার একটু কেটরিং সার্ভিসের অফিসে যেতে হবে, দুজন ক্লায়েন্ট এসেছে।
আজ দু'টো লিফ্ট বন্ধ একঘন্টার জন্য হঠাৎ, সবাইকে সিঁড়ি ব্যবহার করতে হচ্ছে। প্রেরণা চিন্তিত হয়ে পা ফেলছে , লিফট যদি একঘন্টার আগে চালু না হয় তবে প্রণমির বিপদ, প্রণমি গিয়েছে ছায়ানটে।
ঠিক সে সময় কেউ যেন শিষ বাজাতে বাজাতে প্রেরণার পিছনে আসছিলো,প্রেরণা ঘুরে দেখলো রাদিফ,ওর মুখের চামড়া শক্ত হয়ে গেল হঠাৎ, রাদিফ এসে আন্তরিক হয়ে, জড়ানো গলায় বলে,“কেমন আছো প্রেরণা...”
ওকে দেখেই মনে হচ্ছে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই,কিছু একটা খেয়েছে। প্রেরণা দূরে সরে দাঁড়িয়ে কঠিন হয়ে বললো,“একশো হাত দূরে থাকবে আমার থেকে! যাস্ট গেট লস্ট! নয়তো থাপ্পড় মেরে গাল লাল করে দেবো!”
রাদিফ কিছুক্ষণ শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে লম্বা কদম ফেলে নিচে নামলো। প্রেরণার পেছনে এসে দাঁড়ায় ছয় তলার শিলা ভাবী, ফিসফিসিয়ে বললো প্রেরণাকে,“রাদিফ কি বললো তোমায়?”
প্রেরণা জবাব না দিয়ে চুপচাপ হাঁটছে, শিলা বলতে থাকে,“বজ্জাত ছেলে একটা,জানো দুদিন আগে রিতা ভাবীর কোমরে হাত ছুঁয়েছিল। ওকে একদিন গনধোলাই দেওয়া উচিত আসলে,সেটা তো পারবো না সবাই মিলে ওর মা বাবার কাছে নালিশ নিয়ে যাবো। এই জানো প্রেরণা একটা সিক্রেট খবর আছে,ওর বাপ মাও নাকি ওকে রিহ্যাব দেওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।”
প্রেরণার কদম থামলো,বললো,“কেন? ড্রাগ নেয় বলে?”
_হু। তুমি কিভাবে জানলে ও ড্রাগ নেয়?
আর কথা বাড়ায় না প্রেরণা, চুপচাপ হাঁটছে। এসব রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার আসলে কোনও পরিবর্তন আনতে পারে না যদি না রোগী মন থেকে চায়।
_______
ছায়ানটের সামনে বাইক থামিয়ে ইরফান ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে ভেতরে ঢুকলো। গত ক'দিন ধরে আসেনি এখানে,আর আসবে কি আসবে না সেটা নিয়ে ছিল ভীষণ দ্বিধাগ্রস্ত, মাঝখানে রিকুর কল পেয়ে আসতে হলো, রিকু হলো ছায়ানটের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য, আজ তার জন্মদিন, সে চেয়েছে লম্বা ভাইয়াও থাকুক বাকি সবার মতো। ছোটো বাচ্চাটাকে ইরফান বারণ করতে পারেনি। গিফট নিয়ে গিয়েছে।
ইরফান এসে দেখলো প্রণমিও এসেছে, ওকে আচমকা দেখে ধাক্কার মতো খেলো ইরফান। প্রণমির মুখটা ছিল মলিন। রিকুর বার্থডে সেলিব্রেশনের পুরোটা সময় দু'জন দু'জনের উপস্থিতি টের পেলেও কেউ কারো সাথে কথা বলেনি।
যখন ছায়ানটের সর্বপ্রবীণ সদস্য দিশা আন্টি ইরফানকে ধরলেন গান গাওয়ার জন্য, ইরফান বারণ করেছে, তার মুড নেই বলে। প্রণমিও তাই। বলেছে তার মুড নেই।
সবাই অবাক হয়ে বললেন,“তোমাদের দু'জনেরই মুড নেই?”
পুরোটা সময় চুপচাপ থেকে গেটের কাছে এসে প্রণমি ইরফানের বাইক স্টার্ট হবার শব্দ পেয়েই বলে ওঠে,“ইরফান মির্জা শুনছেন!”
ইরফান থামলো,মিস জেনির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রণমি। বাইক থামিয়ে ইরফান নিরেট ভারী স্বরে জানতে চাইলো,“কিছু বলবে?”
_ভাবী কেমন আছে? ভাবীকে কি আসতে দেবেন না আপনারা?
একটু কঠিন শোনায় প্রণমির কথা। ইরফান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“অবশ্যই দেবো।”
_তো আসছে না কেন?
_তোমার ভাই গিয়ে নিয়ে আসলেই হয়। নাকি তার মুরোদ ঐ চুরি করে বিয়ে করা পর্যন্তই।
ভাইকে টিটকারী মেরে বলা কথাটা প্রণমির পছন্দ হলো না মোটেই,সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
_যেমনই হোক আমার ভাই আপনার মতো তো নয়!
কথাবার্তা যেদিক থেকেই শুরু হোক, ঘুরেফিরে ইরফানকে খুঁচিয়ে শেষ করে এই মেয়ে, নতুন নয়। ইরফান আরো একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“কেমন আছে তোমার ভাই?”
_আপনি ভাইয়ার কথা জানতে চাইছেন?
অবাক হয় প্রণমি।
_না আমার বোনের হাসবেন্ডের কথা জানতে চাইছি।
শীতল জবাব ইরফানের।
প্রণমি জবাব দিলো,“যেমন থাকার কথা তেমন আছে।”
_ওকে বলো গিয়ে ওর বৌ নিয়ে আসতে। গুড বয় তো,কারো কিছু বলার সাহস নেই ওকে। বলবেও না। বড় বাবা আসছে,পাপা বড় বাবা তোমার ইশমাম আঙ্কেলকে সামলে নেবে।
_জানি, আমার ভাইয়া শুধু ভাবীকে স্পেস দিচ্ছে, আর মুরব্বিদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে চুপ করে আছে। নয়তো পদে পদে ভাইয়া আপনাদের থেকে যেভাবে অপমানিত হচ্ছে অন্য কোনো পুরুষ হলে এতো টুকু ধৈর্য্য রাখতো না।
কন্ঠে দৃঢ়তা প্রণমির। ইরফান সামান্য হেসে বললো,“তোমাদের তিন ভাইবোনের একটা ব্যাপার আমার দারুণ লাগে, তোমরা তিন ভাইবোন সবসময় তিনজনকে নিয়ে গর্ববোধ করতেই থাকো। গুড।”
_তা বৈকি! আপনারাও যে করেন!
ইরফান আর কথা বাড়ায় না, কিছু মুহূর্ত প্রণমিকে চুপচাপ দেখে বাইক স্টার্ট করে চলে যায়। গিয়ে সরাসরি নিউটাউন রোডের সুপার মার্কেটে ঢোকে,এখান থেকে ইনুর জন্য কিছু খাবার নেবে,যা ও খেতে পছন্দ করে।
সেখানে দেখা হয় নিউমার্কেটের কাজী আফতাব উদ্দিনের সাথে। দু'জনেই ফ্রুট জোনে ঢুকে মুখোমুখি হয়, ইরফানকে দেখা মাত্রই বৃদ্ধ কাজী থতমত খেয়ে যায়, অস্বস্তি কাটাতে ইরফান একটা লম্বা সালাম দিয়ে বলে,“আসসালামু আলাইকুম নানাভাই। ভালো আছেন?”
ভীত ভঙ্গিতে ঘন ঘন উপর নিচে মাথা নাড়ায় কাজী, বললেন,“ওয়ালাইকুমুস সালাম। তোমার খবর ভালো?”
ইরফান সামান্য হাসে,বলে,“আরে এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই নানাভাই। এখন আর আপনাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে নেই, কারণ মির্জা বাড়িতে আর কখনও কোনো মেয়ে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে হবে না! রিল্যাক্স নানা।”
কাজী ড্যাবড্যাব করে তাকায়, ঘন ঘন শ্বাস ফেলে, এই ছেলেকে দেখে সে তার বুকে চাপ অনুভব করছে, ভদ্র বাড়ির এমন পাগলা ছেলে কখনও দেখেনি সে। ক্যাশ কাউন্টারে ফলের বিলটা জমা দিয়ে ইরফান কাজীর হাতে বিশাল বড় একটা ফলের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে চোখ টিপে বলে,“তবে বাকি বিয়ে গুলোও আপনিই পড়াবেন। এখন নিন ধরুন,ফল টল খেয়ে সুস্থ থাকুন। আবার দেখা হবে নানাভাই।”
কাজী পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, ইরফান দুষ্টুমি করে হাসতে হাসতে বেড়োয় সুপার মার্কেট থেকে। ঠিক তখনই তার ফোনে ফোন আসে,ইনুর রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছে। হাইয়েস্ট সিজিপিএ পেয়ে ডিপার্টমেন্ট টপার হয়েছে সে।
ইরফান ওখান থেকে সোজা চলে গেলো মিষ্টি নিতে। শুধু ইরফান নয়, ইহান সব কাজ ফেলে রেখে বাড়িতে ফিরলো মিষ্টি হাতে।
নিচতলায় লিভিং রুমে নির্জীব হয় বসেছিল ইনু,চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল অবিরত। লম্বা কদমে ইশমাম নিচে নেমে মেয়েকে আদেশ দিলো,“কি ব্যাপার রেডি হতে বলেছি তো?”
ইহান ইরফান তখন এলো, দু'জনেই অবাক, ইনুর শরীরটা ফিট নেই তেমন,জানতে চাইলো ছোটো বাবা এই অবস্থায় ইনুকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে। ইশমাম জবাব দিলো না, কারো কোনো কথাই শুনলো না। মেয়েকে নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে চলে গেলো প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্টে।
প্রিতম শুনেছে ইনুর রেজাল্ট, সে মনস্থির করেছে সে যাবে শ্বশুরবাড়িতে, কিন্তু তা আর হয়না। ইশমাম তার আগেই পৌঁছে যায় মেয়েকে নিয়ে।
বাপ বেটির মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলো প্রিতম। প্রেরণা এসে উচ্ছসিত হয়ে আপ্যায়ন করলো ইশমামকে, ইনুকে আগলালো, সান্ত্বনা দিলো,হাতে তুলে খাইয়ে দিল,প্রিতমকে আদেশ করলো ইনুকে নিয়ে ঘরে যেতে। ইনু নড়তে পারছিলো না,তার শুধু কান্না পাচ্ছিল এই মানুষগুলোর সাথে নিজের অনুভূতি শেয়ার করে হালকা হবে বলে।
শশুরের মুখোমুখি বসে আছে প্রিতম, ইশমাম নির্মল স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বলে,“ছোটোরা ভুল করলে সেটা ধরে আজীবন বসে থাকতে হয় না, এটা যেমন সত্যি। বড়রা রাগের মাথায় দু'টো কথা শুনিয়ে দিলে সেটাও ধরে বসে থাকা উচিত বলে মনে করিনা আমি।”
প্রিতম শুধু তাকিয়ে আছে, ইশমাম বলতে লাগলো, “একটা মেয়ে আমার। ওর জন্মের সময় কিছু কম্প্লিকেসি ছিল বিধায় সবাই পরামর্শ দিয়েছিলো বাচ্চাটা না রাখতে, তোমার শাশুড়ি সাহস করে রেখেছে, এবং পরবর্তী জীবনে আমাদের আর কোনো সন্তান হয়নি। বোঝোই তো ও আমাদের কাছে কি! উচিৎ অনুচিতের ব্যাখ্যায় না গিয়ে শুধু বলবো আমাদের বেঁচে থাকা ওকে ঘিরেই। তাই এতো কিছু করেছি! বলেছি! মনে কিছু নিও না।”
একটু থেমে ইশমাম বলতে থাকে,“ভেবো না, আমার মেয়ে এতো ভালো রেজাল্ট করেছে তোমার সান্নিধ্যে থেকে, আমার স্বার্থরক্ষা হয়েছে বলে খুশিতে গদগদ হয়ে মেয়ে নিয়ে তোমার কাছে এলাম, আসলে আমি মাফ চাইতে এলাম , দু'জন বাবা মা,যারা সদ্য সন্তান হারিয়েছে তাদেরকে আমি নজর আন্দাজ করেছি বলে। আমি দুঃখিত।”
প্রিতম কিছুই বলে না জবাবে,শুধু বলে,“আপনি রাতে খেয়ে যাবেন বাবা।”
_না না, আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না, তোমরা কথা বলো। আর শোনো।
প্রিতম তাকিয়ে আছে, ইশমাম বলে,“লাভ ম্যারেজ হলেও সংসার জীবনের শুরুতে বহু ঝুটঝামেলায় বোঝাপড়ায় সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজেরা হিমশিম খেলে বড়দের সাথে আলোচনা করতে পারো,আমি বা তোমার শাশুড়ি জীবিত আছি।”
প্রিতম আর ইনু শুধু ইশমামকে দেখছে। প্রেরণার মুখ হাসি হাসি ইশমামের এতো অমায়িক আচরণে, সে জানে এই বাড়ির পুরুষেরা যথেষ্ট অমায়িক, কখনোই এতোটা রুক্ষ হতে পারে না। শুধু ব্যতিক্রম ইরফান মির্জা।
মেয়ে জামাইকে বিদায় জানিয়ে ইশমাম চলে যায়, প্রিতম তখনও বিস্মিত হয়ে বসে থাকে। ছোটো থেকে তারা তিন ভাইবোন নানা যন্ত্রণা,ঝড় ঝাপটা, মানুষের মুখ ঝামটা খেয়েই বড় হয়েছে, অবশ্য প্রণমিকে ওরা বড় দুই ভাইবোন এসবের আঁচ পেতে দেয়নি, মানুষের দেয়া আঘাত সয়ে যায় দ্রুত, মিলিয়ে যায় যখন তাদের এভাবে আদর করে কাছে ডাকে মানুষ।
ইশমাম চলে গেলে প্রেরণা ভাইয়ের বৌয়ের জন্য পাতলা একটা হেলদি ডেজার্ট তৈরি করে নিয়ে আসে,চামচ মুখের সামনে ধরে আদুরে গলায় ডাকতেই ইনু ঝরঝর করে কেঁদে দেয়।
খাবারের বাটি পাশে সরিয়ে রেখে প্রেরণা ওকে আগলে নিয়ে বলে,“কি হলো?”
_আপু! আপু! আমি তোমাদের থেকে আলাদা হতে চাইনা, আমি আর কখনও তোমার ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করবো না।
_এখন এসব বলার সময়? এতো বড় একটা দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে এসেছো। প্রিতম ওকে নিয়ে ঘরে যা, আহাম্মক নাকিরে তুই!
প্রিতম দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ,ইনু ঘাড় ঘুরিয়ে ভেজা চোখে ওকে বললো,“মেজো দাদানকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করে দেবো! দাদানের সত্যিই কোনো ব্যাড ইনটেনশন নেই,দাদান বুঝে যাবে!”
প্রিতম শুধু দেখতে থাকে ইনুকে চুপচাপ, প্রণমি নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে শুনছে ভাবীর কথা। প্রেরণা এবার ম্লান হাসে, ভাইয়ের বৌকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলে,“বোকা মেয়ে! পাগল তুমি? ভাইকে বলে দেবে বোনের বাড়িতে যাতে না আসে,কি অদ্ভুত কথা বার্তা!”
ইনু অবাক চোখে প্রেরণার দিকে তাকায়,তাকায় প্রিতমও। প্রেরণার কন্ঠস্বরে ছিলো লাই। ইনু চোখ মুছে বলে,“কিন্তু আপু আপনার ভাই চাচ্ছে না,ইনফ্যক্ট আপনারা,আর আসলেই তো... সবকিছু এতো সহজে ভোলা যায়না।”
আবারও হাসে প্রেরণা, ইনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“হু তা ঠিক,তবে এটাও তো হয়না তাইনা, আমরা আত্মীয় ইনু। এমন করে চলতে পারে না, একটা বিহিত দরকার। আর ভাবছি প্রথম পদক্ষেপ টা আমিই নেবো,সবটা স্বাভাবিক করতে।”
_পদক্ষেপ?
ইনু প্রিতম দু'জনেই প্রশ্নটি করে। প্রণমিও অবাক হয়ে আপুর কথাগুলো শুনছিলো।
প্রেরণা স্বাভাবিক হেসে বলে,“হ্যা, পদক্ষেপ। ইনু এতো বড় একটা বিপদ থেকে উঠলো, প্রিতমের চাকরিটা হয়ে যাবে সম্ভবত, ইনুর রেজাল্ট, সবকিছু মিলিয়ে আমি একটু স্বস্তি পাচ্ছি বুঝলি তোরা। ভাবছি ও বাড়ির লোকদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবো, বিয়ের পর থেকে এতটুকু সামাজিকতা করা হয়নি,অথচ আমরা কতদিন গিয়ে খেয়ে এলাম ও বাড়িতে। এবং আমার পরিকল্পনা হচ্ছে ঐদিনই ইরফানের সাথে সবকিছু স্বাভাবিক করে নেবো আমি, আমরা। আইডিয়া টা দারুণ না ইনু বলো?”
ইনু অবিশ্বাস্য নজরে প্রেরণাকে দেখে,প্রিতমের মুখটাও থমথমে। প্রেরণা ইনুর গাল টিপে বলে,“আরে বাবা সত্যি, ইশি তো মোটামোটি সুস্থ, আলো আন্টিকে রেখে সামিন আঙ্কেল আগামীকাল ফিরছেন শুনলাম। নিমন্ত্রণ টা তাকে দিয়েই শুরু করবো, আর ইরফানকে আমি নিজে দাওয়াত দেবো।”
দরজার পর্দা খামচে ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রণমি,আপু সত্যিই এমনটা করবে? তার বিশ্বাস হয়না! ইনু বরাবরের মতো গলে গিয়ে প্রেরণাকে জরিয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,“আপু সত্যি বলছো? তবে আপু আমাকে খুশি করার জন্য করতে হবে না, তোমার যদি মন সায় না দেয়, প্রণমিকে জিজ্ঞেস করো না আগে....”
হাসে প্রেরণা সামান্য, ইনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“ঘরে গিয়ে পোশাক বদলে এসো, দুটো ডিম খাবে এখন। যা করার ভেবে চিন্তেই করবো আমি!”
ইনায়া এসব আশা করেনি,সে খুশি হবে নাকি বিস্মিত হবে বুঝে উঠতে পারে না । তবে আহসান পরিবারের সরল চিত্তের ভাইবোন গুলোর জন্য আরও একবার তার মনে মায়া ছেয়ে যায়, অথচ কথায় কথায় ইনু এদের অনেক আঘাত করে! একরাশ অপরাধবোধ নিয়ে ইনু ঘরে যেতেই প্রিতম বোনকে বলে,“আপু? কি ?”
প্রেরণা ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বলে,“লিস্ট দেবো,কাল বাজার করে আনবি। আমি সারাদিন ব্যস্ত থাকবো। সব টাটকা দেখে আনবি। দু'হাতে খরচ করবি! কোনো কিছুর কমতি যাতে না থাকে।”
পরেরদিন সকাল থেকে প্রেরণার দাওয়াত করা শুরু,প্রথমেই সামিন ইয়াসার মির্জা। তিনি ইশির কাছে আলোকে রেখে শান্তিনীড়ে কেবল ফিরেছেন, প্রেরণার কথা শুনে রীতিমতো অবাক হয়ে বলে,“ইরফান? মা ভেবে বলছো? দেখো প্রণমির অসুবিধা হোক এমন কিছু আমরা,এ বাড়ির মানুষগুলো ঘুণাক্ষরেও চাইনা। তোমার সামাজিকতার দরকার নেই। ইরফান যাবে না, আমরা আসবো।”
_না আঙ্কেল,মন থেকেই বলছি। বাধা দেবেন না প্লিজ! অনুরোধ আপনার কাছে!
সামিন প্রেরণার অনুরোধ ফেলতে পারে না শত অস্বস্তি থাকলেও,তিনি সায় দিয়ে বলে,“তুমি বুঝদার মানুষ, তোমার যা ইচ্ছা করো।”
প্রেরণা একে একে ইলহাম মির্জা, ইশমাম মির্জাকে দাওয়াত করে সম্মতি নিয়ে কল দেয় ইহানকে, ভদ্রভাবে দাওয়াত দিয়ে প্রেরণা ইরফানের কথাটা তুললেই ইহান বিস্মিত হয়ে বলে,“হোয়্যাট! আপনি ভেবে চিন্তে বলছেন প্রেরণা,প্রণমি কি বলেছে? আপনি ভেবেছেন ঠিক করে?”
_জি। আর এখন আমি খোদ ইরফানকে কল দিচ্ছি। আপনি আসবেন কেমন? রাখছি....
ফট করে প্রেরণা কলটা কেটে দিলো ইহানকে কিছুই বলতে না দিয়ে। তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেললো, ইনুর ঘরে একবাটি ডালিমের দানা দিয়ে ওকে খেতে বলে ওখানে দাঁড়িয়েই ইরফানকে কল করলো প্রেরণা।
ইরফান তখন অফিসে ছিলো, অচেনা নাম্বার দেখে ধরলো, সালাম দিলো, ওপাশ থেকে প্রেরণা মিষ্টি করে বললো,“ওয়ালাইকুমুস সালাম।”
ইরফান থতমত খেয়ে বললো,“হ্যালো কে?”
প্রেরণা কন্ঠস্বর আরও মিষ্টি করে বললো,“হ্যা ইরফান...আমি তোমার প্রেরণা আপু বলছি।”
চলমান.....
[ চেষ্টা করবো একদিন পরপর দেওয়ার,যদি না পারি তবে দুঃখিত!]