ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 94

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯৪
#ইসরাত_ইতি

“আমি তোমার প্রেরণা আপু বলছি।”

ইরফান মনে হলো বড়সড় একটা ধাক্কার মতো খেয়েছে, এমন ভাবে চমকেছে যে হাত থেকে ফোনটা পরে যেতেই নিচ্ছিল, ইরফান ত্বরিত ফোনটা সামলে নিলো,সামলে নিলো নিজেকে। কিছু মুহূর্ত চুপ থাকলো পরিস্থিতি বুঝতে। ওপাশ থেকে প্রেরণা স্বাভাবিক স্বরে বলল,“ইরফান?”

ইরফান ভাবছে,কেসটা ঠিক কি! কিন্তু ভেবে কোনো কূল কিনারা পেলো না, গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,“জি-জি আপু আমি ইরফান।”

হাসলো প্রেরণা সামান্য, বললো,“হ্যা আমি জানি তুমি ইরফান। কেমন আছো তুমি?”

শ্যামলা মুখের, তীক্ষ্ম চোখ জোড়া বিস্ফোরিত হয়,মনে মনে বলে,“শা'লা আজ সূর্য কোন দিক থেকে উঠেছে!”

মুখে বললো,“এইতো ভালো আপু। আপনি?”

আমতা আমতা করছে ইরফান মির্জা,বিষয়টা সে ঠিক তখনও হজম করে উঠতে পারেনি। প্রেরণা বললো,“আমিও ভালো আছি ভাই। তুমি কি এখন অফিসে?”

_জি,জি আপু।

_ওহহ,তাহলে তো বিরক্ত করে ফেললাম!

বিষয়টা হজম না হলেও ইরফান মির্জা মুখে বললো,“এই না না আপু, আপনি বলুন।”

_আচ্ছা শোনো, আগামীকাল বাড়িতে তোমাদের ফ্যামিলির দাওয়াত। আলো আন্টি,মুঈন ভাইয়া আর ইশি বাদে সবাইকে আসতেই হবে, কোনো বাহানা শুনতে চাচ্ছি না ঠিকাছে?

ইরফানের মনে হলো সে এই শতাব্দীর সবথেকে বড় জোক্স শুনলো। প্রেরণাকে লাইনে রেখেই সে চেক করলো আজ এপ্রিলের এক তারিখ কি না। তাকে এপ্রিল ফুল বানানো হচ্ছে কি না! কিন্তু তখন তো জুলাই মাস। প্রেরণা বললো,“কি হলো ইরফান? কথা বলছো না যে?”

সবকিছু এলোমেলো লাগছে ইরফানের, যে সবসময় অন্যকে চমক দিয়ে বেড়ায় সে আজকের এই সামান্য বিষয়টা হজম করতে পারছিল না। আচ্ছা এটা কি কোনো প্রাঙ্ক কল?

প্রেরণা বললো,“কি ভাবছো ভাই? এটা প্রাঙ্ক কল না। আমি তোমার প্রেরণা আপুই।”

কাশি উঠে যায় ইরফানের,হাতের কাছে গ্লাস ছিলো,তুলে পানি খেয়ে নেয়। এই মহিলা ইরফানের মনের কথা শুনে ফেলে নাকি!

সে নিজেকে খুব ভালো করে সামলায়,বলে,“আপু আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমি ইরফান!”

এবারও হাসে সামান্য প্রেরণা,“আরে ভাই জানি তুমি ইরফান, ইনুর মেজো দাদান। কাল আসবে লাঞ্চে আমাদের বাড়িতে। দাওয়াত দিয়েছি তোমার। এই কথার অন্যথা যেন না হয় ঠিক আছে?”

ইরফানকে চূড়ান্ত বিস্মিত রেখে প্রেরণা আরো টুকটাক প্রশ্ন করলো, অফিস কেমন যায় ইরফানের, মাস্টার্সের পরিক্ষা কবে। ইরফান উত্তর দিলো ঘোরের মধ্যে।

ফোন কাটার পরেও ইরফান বিশ্বাস করতে পারছিলো না কিছু, ট্রু কলারে দেখলো নাম্বারটা আসলেই প্রেরণার ছিলো কিনা। দেখলো নাম্বারটা আসলেই প্রেরণার। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো ফোনের স্ক্রিনে।

বাড়িতে সামিন ইয়াসার মির্জা, ইলহাম মির্জা ছিলো তখন, সন্ধ্যা নাগাদ ইরফান বাড়িতে ফিরে শুরুতেই এই দু'জনের মুখোমুখি হলো, আমতা আমতা করে বললো,“জ্ঞানী...স্যরি প্রেরণা আপা দাওয়াত করেছে আমায়!”

_দাওয়াত আমরাও পেয়েছি।

_আমি কি যাবো?
বিভ্রান্তের ন্যায় ইরফান জানতে চাইলো।

_তোমার বিবেচনা।

সামিন শান্ত স্বরে জবাব টা দিয়ে চলে যায়, ইলহাম দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ছেলেকে দেখে, অতঃপর সেও চলে যায়।

ইরফান বিভ্রান্ত পুরোপুরি। এতদিন অগোচরে,নানা বাহানায়, সবাইকে লুকিয়ে ও বাড়িতে গেলেও এই প্রথম ইরফান মির্জার নার্ভাস লাগছে। কেন লাগছে,ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে!

রাতের খাবার খেয়ে সবাই যখন নিচতলায় বসে রাতের খবর দেখছিলো। সামিন একপাশে গিয়ে আলোর সাথে ফোনে কথা বলছিলো, ইরফান একদৃষ্টে বড় বাবাকে দেখছে, বিবাহিত জীবনের এত বছর পরেও ফোনে এমন ভাবে কথা বলছে,একটানা মনে হচ্ছে এরা নবদম্পতি। যদিও কথা হচ্ছে ইশিকে নিয়েই। ফোন রাখতেই ইরফান হঠাৎ খুব সাহস করে বড় বাবাকে বলে,“বড় বাবা!”

_হু।
মৃদু আওয়াজে বলল সামিন। ইরফান বললো,“তুমি বড় মা'কে পটিয়ে ছিলে কিভাবে?

সামিন শীতল চোখে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফান ঘাবড়ে যাওয়ার মতো করে বলে,“স্যরি! স্লিপ অব টাঙ!”

চুপচাপ কেটে পরে ইরফান,পরী হাসতে হাসতে ইরফানের পিছু পিছু দোতলায় উঠছিল, বললো,“আয় আমি বলছি ভাইয়া কিভাবে ভাবীকে পটিয়েছিলো!”

দোতলার লিভিং রুমে ছোটো মায়ের সাথে বসলো ইরফান,তার এখন অলস সময়। পরীর কাছে পুরো কাহিনীটা শুনে বললো,“মোদ্যাকথা যা বুঝলাম,বড় মা নিজেই পটতে চেয়েছিলো বলে বড় বাবাকে সুযোগ দিয়েছিল পটানোর!”

_কি জানি!
হাসছে পরী!

ইরফান বিড়বিড় করে বললো,“আর এদিকে আমারটা তো রাজি নয়,উল্টো আমার চৌদ্দ গুষ্টিই আমার বিপরীতে, সামিন ইয়াসার মির্জার স্ট্রাগল এই ইরফান মির্জার স্ট্রাগলের কাছে নস্যি!”

_কিছু বললি?
পরী জানতে চায়।

ইরফান হাই তুলতে তুলতে উঠে বলে,“নাহ! ঘুমোবো আমি!”

পরেরদিন সকাল থেকে রান্নাঘরে তোড়জোড় শুরু হয়েছে প্রেরণার। আজ সে সবকিছু থেকে থেকে ছুটি নিয়েছে, রান্নাবান্না নিজের হাতে করবে বলে। শুদ্ধ আজ স্কুলে যায়নি, বল নিয়ে খেলছে ঘরময়। ইনুকে আজ খুশি লাগছে ভীষণ। ড্রয়িং রুমের এককোণে বসে প্রেরণার রান্না করা এক একটা আইটেম প্রেরণার নির্দেশে টেস্ট করতে করতে ইশি আর শেহার সাথে ভিডিও কলে কথা বলছে, অনেকটা দিন পরে তার খুশি যেন বাঁধভাঙা।

প্রণমি নিজের ঘরে বসে আছে চুপচাপ, বহুবার আপুর সাথে কথা বলতে গিয়েও বলতে পারেনি। ভাইয়া বাজার নিয়ে ব্যস্ত,আপু রান্না নিয়ে। মিস জেনি ঘরদোর সাজাতে ব্যস্ত,সে বিছানার কোনায় বসে আছে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে।

এক ফাঁকে প্রেরণা এসে আলমারি খুলে প্রণমির পোশাক বের করতে করতে বললো,“চল ওঠ। গোসল করবি। আমি রান্না চাপিয়ে এসেছি।”

প্রণমি উঠলো,সুযোগ পেয়ে আপুকে বললো,“আপু? কি হয়েছে? তুমি কি করতে চাইছো?”

প্রেরণা স্মিত হেসে বললো,“কিছুই না, তুই গোসল সেরে নে! আর শোন, আজ তোর ওদিকটায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। লাঞ্চ ঘরে বসে করবি, ঠিক আছে?”

হালকা মাথা নাড়ায় প্রণমি। ওকে গোসল করতে রেখে ঘরে গিয়ে নিজের ফোনটা নিয়ে নিলো প্রেরণা। একটা মেসেজ দেখে মেজাজ খারাপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে সে চলে যায় রান্নাঘরে।

অতিথিরা এলো ঠিক দুপুর দেড়টা নাগাদ। ইনু নিজের শশুর বাড়িতে একসাথে বাবা,চাচা ভাইকে দেখে আপ্লুত হয়। প্রেরণা মাথায় ঘোমটা টেনে আপ্যায়ন করে সকলকে। পরী আর রিতু আসেনি। এসেছে সামিন,ইহান, ইলহাম, ইশমাম। ইরফানকে না দেখতে পেয়ে প্রেরণা চোখ কপালে তুলে বললো,“সে কি ! ইরফান কোথায়?”

বাকিরা প্রেরণার এতো অমায়িক আচরণ দেখে কিঞ্চিত অবাক গতকাল থেকে, ইহান থমথমে মুখে বললো,“অফিসে।”

_ও আসবে না? কি আশ্চর্য?

ইহান চমকায়,পর পর বলে,“ওর লাঞ্চ টাইমে আসবে মেবি।”

ইরফান আদৌও নিশ্চিত ছিলো না,সে গতকাল থেকে দোটানায় ছিল। এক অদ্ভূত উৎকণ্ঠা মনের ভেতরে, ইরফানের অবচেতন মন টের পায়। ঠিক দুপুর একটা বিশে ইরফান আবারও প্রেরণার থেকে কল পেলো, রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে প্রেরণা বললো,“কি ব্যাপার ইরফান তুমি এখনও আসছো না কেন?”

কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে ইরফান জবাব দিলো,“আসছি। বিশ মিনিটে পৌঁছে যাচ্ছি।”

_হ্যা প্লিজ সবাই অপেক্ষা করছে।

মার্জিত উত্তরটা দিয়ে প্রেরণা কল কাটে, সামিন,ইহান, ইলহাম, ইশমাম শরবত খাওয়া রেখে প্রেরণার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। প্রেরণা হেসে বলে,“আরে আপনারা শরবত খান!”

টেবিলে খাবার সাজিয়ে প্রেরণা গোসল করতে চলে গেল। প্রিতম তার শশুর,চাচা শ্বশুরদের সাথে গল্প করছে। শুদ্ধ ইহান আঙ্কেলকে দেখতে পেয়ে তার সাথে গল্প জুড়ে দিলো রাজ্যের,তার কোন বন্ধুর কাছে কি কি খেলনা আছে,সেসবও।

ইনু বিশ্রাম নিচ্ছে,তাকে ঘরে বিশ্রাম নিতেই বলা হয়েছে। গল্পের এক ফাঁকে শুদ্ধ ইহানকে ধরে টানতে লাগলো,“আঙ্কেল আমি একটা ট্রাভিসের পেইন্টিং করেছি দেখবে এসো!”

_কোথায় নিয়ে যাচ্ছো তুমি?

_আমাদের বেডরুমে।

ইহান থমকায়, দাঁড়িয়ে পরে। শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলে,“না বাবু! এমন করে না। আমি যাবো না!”

_কেন?

_তুমি পেইন্টিং টা এখানে নিয়ে এসো।

শুধু মাথা নেড়ে দৌড়ে রুমে ঢুকতেই প্রেরণা মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে ইহানকে ঘরের বাইরে দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পরে, ইহান থতমত খায়। প্রেরণা অবাক হয়ে বলে,“আপনি!”

_শুদ্ধ টেনে আনলো!
নিচু, গম্ভীর আওয়াজ জবাব দিলো। প্রেরণা কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, ইহান তেরছা নজরে একপলক দেখে প্রেরণার মুখটা। একটা নীল জামদানি পরেছে আজ,চোখ দু'টো এতোটা টানলো কেন হঠাৎ করে? কাজল দিয়েছে নাকি! পা থামিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেনা ইহান,না পারে প্রেরণাকে দেখতে, চুপচাপ গিয়ে বাবা চাচার পাশে বসে থাকে গম্ভীর হয়ে। অদৃশ্য কেউ একজন বারবার বলছে,“খুব সুন্দর লাগছে তোমার সমুদ্রনীলাকে, তাকাও... আরেকবার তাকাও। আরে তাকাও না,কেউ বুঝতে পারবে না।”

ইহান শাসায় তাকে মনে মনে,“এখন না। তীব্র অধিকার নিয়ে তাকাবো। যদি কখনও এমন হয়, সব সংযমের ব্যারিকেড ভাঙবো। চুপ করো,আমি তাকাবো না!”

ইরফান এসেছে খানিক বাদেই। দরজা খুললো প্রেরণা, মুখ হাসি হাসি। ইরফান এবার চূড়ান্ত ভড়কে যায়। অহেতুক নিজের গলার কাছে টাইয়ের নট ধরে নাড়াচাড়া করতে করতে সালাম দিলো। প্রেরণা সালামের জবাব দিয়ে দরজার পাশে সরে দাঁড়িয়ে বললো,“এসো! আরে তোমার হাতে এসব কি! মিষ্টি! এসবের কি প্রয়োজন ছিলো!”

ইরফান কিছু মিষ্টি নিয়ে এসেছে তাড়াহুড়ো করে,প্রেরণা সেগুলো সামলে নিয়ে ইরফানকে গেস্ট রুম দেখিয়ে বলে,“ও ঘরের ওয়াশ রুম থেকে মুখ হাত ধুয়ে এসো। খেতে বসবে!”

ইনু নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মুখ হাসি হাসি করে সবকিছু দেখছিলো। তার চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে,ইশি আপুর বাড়ির মতো তার বাড়িতেও তার সব কাছের মানুষরা খেতে এসেছে। আর কোনো তিক্ততা নেই! শুধুই প্রশান্তি।
সে গিয়ে বড় বাবার পাশে চুপ করে বসে থাকে, টের পেলো শরীরে যথেষ্ট বল চলে এসেছে,আর কোনো দুর্বলতা নেই।

খাবারের আয়োজন ব্যাপক। ইশমাম মির্জা হা করে বলে,“করেছো কি মা!”

প্রেরণা হাসে,“আপনাদের তুলনায় খুব কম করতে পারছি আঙ্কেল।”

আট চেয়ারের ডাইনিং টেবিল। দখল করে চুপচাপ খেতে বসেছে সামিন, ইলহাম, ইশমাম,ইহান, ইরফান আর ইনু। মিস জেনি গিয়েছে প্রণমি আর শুদ্ধর কাছে।

প্রিতম আর প্রেরণা সবাইকে পরিবেশন করে দিচ্ছিল,ভাইকেও জোর করে প্রেরণা বসিয়ে দিলো।

স্বাভাবিক আলাপ করতে করতে প্রেরণা প্রত্যেকের প্লেটে রোস্ট তুলে দিচ্ছে,“পরী আন্টি না হয় ব্যস্ত,রিতু আন্টি কেন এলেন না?”

_শরীরটা ঠিক নেই বললো।
ইলহাম জবাব দিলো।

প্রেরণা বলে,“সেই-ই , আন্টির এখন বয়স হয়েছে। আচ্ছা আমি উনাদের জন্য দিয়ে দেবো, কাইন্ডলি নিয়ে যাবেন আঙ্কেল?”

সরল আবেদন। ইলহাম হেসে মাথা নাড়ায়। সামিন আদেশের সুরে বলে,“মেয়ে তুমিও বসো, আমাদের এতো বেড়ে খাওয়াতে হবে না। যার যা লাগে নিতে পারবো!”

প্রেরণা সামিনকে স্নিগ্ধ একটা হাসি উপহার দিয়ে একে একে সবার প্লেট দেখে, ইরফান কিছু খাচ্ছিল না, শুধু খুটছিল, সে তখনও বিভ্রান্ত! এটা কি হচ্ছে আসলে!”

প্রেরণা বলে,“সেকি ইরফান! ভাই,এভাবে খুঁটলে হয়? রান্না ভালো হয়নি?”

ইরফান চুপচাপ মাথা নাড়ে,বলে,“ভালো হয়েছে আপু।”

তৃতীয় দফায় সবাইকে বিফ পরিবেশন করে প্রেরণা চেয়ার টেনে বসে। সামিন প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,“তোমার জয়েনিং কবে থেকে বাবা?”

_নেক্সট মান্থের এক তারিখ।

বুকটাতে সুখ সুখ অনুভূত হয় ইশমামের, তার জামাই একজন প্রোগ্রামার! মান্থলি একলাখ তের হাজার টাকা বেতন! টাকা পয়সা নিয়ে এতো মাথা ঘামানো ঠিক নয় তবুও জামাই তাকে দেখিয়ে দিতে এমন একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলেছে, শুধুমাত্র নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে, ইশমাম খুশি।

এক কথায়,দুই কথায় হঠাৎ সামিন বলে,“প্রণমি খেয়েছে?”

_হু খাচ্ছে, ও ঘরে।

_তুমিও খেতে বসো, আমাদের খারাপ লাগছে মা।

_জি! আঙ্কেল, আচ্ছা আঙ্কেল,এর পর বান্দরবান কবে যাচ্ছেন?

_তোমার আন্টি ফিরলে আমি ঘুরে আসবো, এভাবে পালাবদল করে থাকবো ভাবছি!

_ঠিক আছে তবে আমি ইশি আর মুঈন ভাইয়ার জন্য কিছু প্রসেস করা খাবার পাঠাবো, আসলে ওদের আলাদা কখনো খাওয়ানো হয়নি তো,মুঈন ভাইয়া যা ব্যস্ত লোক!

সামিন হাসে,মেয়েটিকে তার বরাবরের পছন্দ, এতো আপনের মতো আচরণ করে,মায়া হয় খুব।

সবকিছু যখন স্বাভাবিক চলছিলো ঠিক তখনই প্রেরণা বলে ওঠে,“আসলে আজ একটা আলোচনা করতে এতো কষ্ট দিয়ে আপনাদের ধরে বেঁধে এনেছি আঙ্কেল!”

প্রত্যেকে প্রেরণার মুখের দিকেই তাকায়। প্রেরণার শান্ত দৃষ্টি তখন ইরফানের শ্যামলা মুখবিবরে।

ইলহাম বলে,“কি মা?”

_আসলে বিষয়টা ইরফান আর প্রণমির ব্যাপারে।

এই পর্যায়ে সবাই খাওয়া থামিয়ে দেয়, নির্নিমেষ দেখতে থাকে প্রেরণাকে। প্রেরণার মুখ হাসিহাসি। ইরফানের দৃষ্টি শান্ত।

প্রেরণা বলতে শুরু করে,“আসলে যা হয়েছে সেটা তো ঘটেই গিয়েছে। অতীতে আমরা খুব তেতো কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। যা আমাদের আশাতীত ছিলো। রাগের মাথায় ইরফান একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, এবং আমরা দু পরিবার ভুগেছি যথেষ্ট। এখন সময়ের সাথে সাথে সেসব অতীত আর স্মৃতি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা আমরা দু পক্ষই করছি, তাই না ইরফান?”

শান্ত হয়ে প্রশ্নটি করে প্রেরণা, ইরফান দৃষ্টি ফেরায় না প্রেরণার মুখ থেকে, প্রেরণা বলতে থাকে,“ইরফান আর প্রণমি দু'জনেই এখন একটি স্বাভাবিক লাইফ ডিজার্ভ করে,আর আমরা দুই পরিবারও একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক ডিজার্ভ করি যেখানে কোনো সংকোচ কিংবা মনোমালিন্য থাকবে না, যেহেতু আমরা পরম আত্মীয়, ইরফানের নিজের বোনের বাড়িতে আসতে দ্বিধা হবে না আর, তাই আমি ভাবছিলাম আমাদের সবার মনের মধ্যে যেটুকু খচখচানি আছে সেটুকু একেবারে দূর করতে।”

সামিন বলে ওঠে,“যেমন?”

_দেখুন আঙ্কেল,তখন জেদ করে,রাগের মাথায় শত চিল্লাচিল্লি করেছি এই বিয়ে ভ্যালিড নয়,ভ্যালিড নয়, যদিও আদতে এই বিয়ে বিয়ে নয় তবুও মনের মধ্যে একটা খচখচানি তো আমাদের সবার রয়ে গিয়েছে তাইনা? তাই আমি চাচ্ছিলাম ওদের ডিভোর্স টা যাতে হয়.....

ইরফান ভাতের প্লেট টা থেকে হাতটাই সরিয়ে নেয়। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। প্রেরণা তা দেখে, দৃষ্টি সরিয়ে আবারও সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,“আমার যে আমার বোনকে বিয়ে দিতে হবে আঙ্কেল!”

আবারও প্রেরণা ইরফানের মুখের দিকে তাকায়, ইরফান শান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে প্রেরণার মুখের দিকে, এবার স্বাভাবিক গলায় বলে,“না তুমি প্রণমিকে ভালোবাসো,না প্রণমি তোমাকে, না এমন কিছু কখনো হবে, একটা অহেতুক সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ রেখে কি লাভ ভাই তাইনা বলো? আমি উকিলের সাথে কথা বলেছি, কাজী গ্রামের বাড়িতে, উনি ফিরলে মঙ্গলবার আমরা দু পরিবার বসে এই ঝামেলা মিটিয়ে নেবো। তোমার মতামত কি ভাই?”

ইরফান শুধু দেখছিলো প্রেরণাকে, এরপর সে আশেপাশে বাবা চাচা ভাইদের দিকেও তাকালো । প্রেরণা হেসে ইরফানকে বললো,“ওনাদের দিকে তাকাচ্ছ কেন? আমি ওনাদের না, তোমার মতামত জানতে চেয়েছি ইরফান। দেখো যা বুঝলাম তোমার কোনো ব্যাড ইনটেনশন নেই,কিংবা প্রিতমকে নিয়ে আর কোনো ঝামেলা নেই তোমার মনের মধ্যে, তুমি নিজেও চাচ্ছো সবটা ঠিক করতে, তো চলো, এই ঝামেলাটা শেষ করে যে যার মতো থাকি। আমার বোনকে বিয়ে দিতে হবে...”

ইরফান শুধু দেখছে সবাইকে, সবাই দেখছে তাকে। প্রেরণা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখছে ইরফানের কপালে ঘাম। সাথে সাথে বললো,“আরে এতো হেজিটেট করার কিছু নেই, যা হবে স্বাভাবিক ভাবে হবে, আমার মনের মধ্যে অতীত নিয়ে কোনো তেতো ভাব নেই, যেটুকু আছে তাও তো দূর করবো তাই তুমি নির্দ্বিধায়......”

_ওর কোনো অসুবিধা নেই।
এই পর্যায়ে সামিন বলে ওঠে কথাটা। ইরফান চোখ তুলে বড় বাবাকে দেখে, সামিন প্রেরণাকে বলতে থাকে ,“ও ডিভোর্স দেবে, আর আমরা সকলেই চাচ্ছি প্রণমির খুব ভালো একটা বিয়ে হোক, আমরাও আমাদের ছেলেকে বিয়ে করাবো। এসব নিয়ে আর কোনো কথা না উঠুক। ইলহাম আমাকে বলেছিল এটা বহু আগে, বলেছিলো যাতে তোমার সাথে আলাপ করি, কিন্তু যেহেতু বিয়েটা মানছিলে না তাই আর প্রসঙ্গটা তুলিনি, তোমরা অবশ্যই মনের খচখচানি দূর করবে....

ইলহাম বলে,“কথা ছিলো ওকে চিটাগাং পাঠিয়ে দেবো, ওখানের বিজনেস টা তুলে নিতে হয়েছে তাই সেটা হয়ে ওঠেনি। এরপর ভাইয়া আর আমি মিলে ভেবেছি ওকে ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড ফুয়াদ ভাইয়ার কাছে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেবো,যাস্ট কাজটা শিখে নিক। ও তোমাদের সন্দেহ দূর করবে তুমি কিছু ভেবো না মা, তুমি আমাদের কল করে নিও মঙ্গলবার, আমরা আমাদের ছেলে নিয়ে আসবো। এবং প্রণমি মামনির জন্য অনেক অনেক দোয়া। তার জন্য উপযুক্ত পাত্র অবশ্যই খুঁজে পাবে তোমরা।”

ইনু সেই তখন থেকে তার মেজো দাদানকে দেখে যাচ্ছে, তার দাদানকে ঠিক লাগছে না এটা ইনু বুঝতে পারছে। দাদান কি অপমানিত বোধ করছে? কিন্তু আপু তো অপমান করে কিছু বলেনি, সে ঠিক করলো দাদানের সাথে এ নিয়ে আলাদা কথা বলবে।

প্রেরণা উঠে দাঁড়ায়,“আরে আপনারা খাওয়া থামিয়ে বসে আছেন, ধূর আমিও না,এসব কথা পরে তুলতে পারতাম। ইরফান, তুমি খাচ্ছো না কেন? আরেক পিস রোস্ট দেবো?”

ইরফান চুপচাপ মাথা নাড়ে, বাকিটা খাবার ইরফান কি খেয়েছে সে জানে না, বহু কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে বাবা চাচাদের পাশে চুপচাপ বসে ছিলো। যখন তারা বেড়োবে তখন প্রণমিকে ডেকে এনে প্রেরণা সবার সাথে কথা বলিয়ে দিলো, এমনকি ইরফান মির্জার সাথে, ইরফান বোকার মতো দুই বোনের দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার হাশফাশ লাগছিল,হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরুতেই সে বেড়িয়ে যায়।

________

শান্তিনীড়ের লিভিং রুমের পরিস্থিতি থমথমে। রিতু সিঁড়ির কাছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির পুরুষ গুলো চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে, ইরফানের ভাবভঙ্গি খুবই শান্ত। ইলহাম চেঁচিয়ে ওঠে,“তুই ডিভোর্স দিবি না?”

_না।
বড্ড শান্ত জবাব ইরফানের।

সামিন চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে পরলো, ইশমামও। ইলহাম চেঁচাতে লাগলো,“কেন দিবি না?”

ইহান পাশ থেকে বলে ওঠে,“তুই কি চাস না আমরা তোর প্রতি নরম থাকি? কেন আমাদের ধৈর্য্য নিয়ে খেলছিস?”

ইরফান ওদের কথার জবাব না দিয়ে সামিনের কাছে যায়, হাটু ভেঙে বসে নম্রস্বরে বড় বাবাকে বলে,“বড় বাবা! রাগ একপাশে সরিয়ে রেখে আমার কথাটা শান্ত হয়ে শোনো, জানি এটা অন্যায় আবদার তবুও করছি, কারন তোমাদের সবাইকে মোকাবেলা করার মতো ক্ষমতা আমার নেই, তাই আই রিকোয়েস্ট ইউ, আমাকে একটু সময় দাও?”

_সময় দিয়ে কি হবে? ঐ মেয়ের সাথে তোমার কি?

_আমি ওকে পছন্দ করি বড় বাবা, আমি চাচ্ছি সম্পর্কটা রাখতে, আমাকে সময় দিলে আমি তোমাদের সবার কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে পারতাম....
ধীরে ধীরে নিচুগলায় তবে স্পষ্ট করে বলে ইরফান কথাগুলো। তার কন্ঠে কোনো জড়তা নেই।

সামিন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে, ইরফান বলে,“বড় বাবা আমি মিথ্যা বলছি না , প্রিতমের বোনকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি।”

রিতু চুপচাপ ছেলের কথা শুনছে, বাকিরা সবাই হতবাক। সামিন দাঁতে দাঁত চেপে বলে , “তুমি কি আমাদের মানুষ মনে করো না!”

দুহাত ধরলো ইরফান সামিনের,“বড় বাবা রেগো না, আমার চোখে দেখো, আমি মিথ্যা বলছি? বলো আমি মিথ্যা বলছি?”

ইলহাম নিজেকে আর শান্ত রাখতে পারলো না, গর্জে উঠলো,“তোর বড় বাবার হয়ে আমি তাহলে একটা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিই? এসব পাগলামি বন্ধ করে চুপচাপ মঙ্গলবার গিয়ে ডিভোর্স দিয়ে দিবি নয়তো প্রেরণাকে গিয়ে বলবো,প্রণমিকে দিয়ে যেন একটা নারীনির্যাতন মামলা দিয়ে দেয় তোর নামে, সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকাতে হয়।”

ইরফান বাবার দিকে তাকায়। আবার তাকায় বড় বাবার দিকে, ইলহাম বলে,“কি? বড় বাবার দিকে কি তাকাচ্ছিস? আমি জানি ভাইয়া এই সিদ্ধান্তটাই নিতো! তার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই, তুই ভালোয় ভালোয় ভাব ডিভোর্স দিবি নাকি মামলা খাবি। এবং এইবার তোর বাপ,চাচা, ভাই কেউ যাবে না তোকে বাঁচাতে। মাইন্ড ইট!”

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 94 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন