#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯৬
#ইসরাত_ইতি
[ সহিংসতা এলার্ট 🚫]
“গুলশানে এক ফ্ল্যাট থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার। ধর্ষ*ণের পরে হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়েছে, সন্দেহের তালিকায় প্রতিবেশী।”
হেডলাইন টা দেখেই প্রেরণা আঁতকে উঠলো আবারও, গতকাল রাতের খবর,সে সোস্যাল মিডিয়ায় দেখেছে । মিস জেনিকে নিয়ে ক্লিনিকের ওয়েটিং রুমে বসে আছে সে, ওয়েটিং রুমের টিভি স্ক্রিনে খবরটা দেখে মিস জেনিকে করুণ কন্ঠে বললো,“মেয়েটা ক্লাস এইটে পড়তো,তার ওপর বাক প্রতিবন্ধী ছিলো,কি পশু!”
মিস জেনি মুখটা শুকনো করে বলে,“আজকাল যে কি হচ্ছে দুনিয়ায়, জানো মামনি, প্রণমিকে নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারি না। তোমার জীবন শুদ্ধকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, প্রিতম চাকুরী পেয়েছে,ওর সংসার আছে, আমি তো অকেজোই হয়ে গিয়েছি। ওর কেউ নেই, মেয়েটার একটা গতি হলেই বাঁচি।”
_সেজন্যই তো বিয়ে দেবো ওর, একটা অর্গানাইজেশন আছে, জাতিসংঘের নতুন টাস্ক, ওই অর্গানাইজেশনের একজন মেম্বার খুজবো প্রণমির জন্য, যারা মানবিক, স্বেচ্ছায় প্রতিবন্ধী বিয়ে করে আজীবন সুখে রাখে। চিন্তাভাবনা কিছুটা এরকম আমার। আর প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে গেলে প্রণমির মতো সুন্দরী আর গুণী মেয়ের বিয়ে কখনোই তার প্রতিবন্ধকতার জন্য আটকে থাকবে না।
কথা থামিয়ে দেয় প্রেরণা, হঠাৎ খুব ছটফট করছে মন,কেমন অস্থির অস্থির লাগছে, সচরাচর এমন লাগে না, মনে হচ্ছে কি যেন নেই তার। প্রণোর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে, গতকাল সন্ধ্যায় বড্ড বেশি রাগারাগী করে ফেলেছে প্রেরণা মেয়েটার সাথে। এক্ষুনি কল করে কথা বলতে মন চাইলো। ফোনটা পার্স থেকে বের করে প্রেরণা কল লাগাবে এমন সময় রিসিপশনিস্ট এসে ওদের ডাকলো।
“মিস জেনেলিয়াকে স্যার ডাকছেন।”
আর কল করা হলো না প্রেরণার, ফোনটা পার্সে ঢুকিয়ে মিস জেনিকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
________
গায়ের ফ্রকটা টেনে টেনে খোলা হচ্ছিল, আর পাজামাও, প্রণমি পা দাপাচ্ছে, নেশা করে আছে বিধায় রাদিফের পদক্ষেপ টলমলে,এক পর্যায়ে প্রণমি ওকে ধাক্কা দিতে সক্ষম সয়, সে বসে আছে গদির ওপর,এটা তার রুমের দরজার সামনে, ডান দিকে ঘুরে তিন কদমে তার রুম, তারপর বামে পাচ কদমে তার ড্রেসিং টেবিল,সেখানে তার ওয়াচ, ছুটছে প্রণমি ছুটছে। ওয়াচ টা হাতে নিয়ে সচল করে কেবল ডায়ালে কল লাগাতেই পেরেছিলো,ডায়ালে কে ছিলো জানা নেই প্রণমির। কিন্তু কথা বলতে পারলো না, রাদিফ এসে ওকে এবার বিছানায় ফেললো,প্রণমির হাত থেকে পরে যায় ওয়াচ। প্রণমি আর্তনাদ করে,“ইরফান মির্জা প্লিজ! দয়া করুন।”
ওপাশ থেকে প্রিতমের আর্তনাদ,“প্রণো সোনা কি হয়েছে? ইরফান মির্জা কি? প্রণো কথা বল? কি করছে ইরফান মির্জা?”
পরীর ক্লিনিকে ছিলো প্রিতম ইনু, প্রিতমের ছটফটানি দেখে পরী আর ইনু বোকার মতো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিতম চেঁচায়,“প্রণো ইরফান কি করছে?”
প্রণমি জবাব দেয়না। সে বলে,“ইরফান মির্জা আল্লাহকে ভয় করু....”
তখনই প্রণমির মুখ চেপে ধরে রাদিফ। প্রিতম ছটফটায়, কল কেটে চেঁচিয়ে ওঠে ইনুর ওপর,“খোদার কসম ইনু আজ আমি তোমার মেজো দাদানকে যাস্ট খু*ন করে ফেলবো।”
ইনু অসুস্থ শরীর নিয়েও উৎকণ্ঠা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়,প্রিতম ছুটতে থাকে, লোকজনের সাথে ধাক্কা লেগে ওর ফোন,ওয়ালেট সবকিছু পরে যাচ্ছে,ওর কোনো হুঁশ নেই, ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে বাইক স্টার্ট করলো প্রিতম, বুকটা পুড়ছে, কান্না পাচ্ছে তার, চূড়ান্ত অসহায় লাগছে নিজেকে।
প্রণমির মনে হলো দম বন্ধ হয়ে ম*রে যাবে ও। আবারও একটু ছাড়া পেলে পা দিয়ে রাদিফের দুপায়ের মাঝে দুর্বল যায়গায় আঘাত করলো কৌশলে,হার মানার পাত্রী প্রণমি নয়। সামান্য ব্যাথা পেয়েছে রাদিফ, মৃদু আওয়াজে কোকিয়ে ওঠে সে।
প্রণমি চমকায়। এটা কার গলা? এটা ইরফান মির্জা নয়? এই গলা কার? চেনা চেনা তবে এ মুহূর্তে প্রণমি মনে করতে পারছে না কিছু, সে বলে,“কে আপনি? আপনি কে?”
খাটের পাশে রাখা ওড়নাটা তুলে রাদিফ প্রণমির মুখ বাধে প্রথমে, ধস্তাধস্তিতে অর্ধনগ্ন প্রণমি, ওর শরীর দেখে নরপিশাচটা চূড়ান্ত ঝাঁপিয়ে পরার নিমিত্তে ওর হাত পাও বাঁধে। ড্রাগের প্রভাবে দিক-দক্ষিণ হারিয়েছে জানোয়ারটা। কিছুর ভয় নেই ওর। প্রণমির চোখ বেয়ে জল গড়ায়,মনে মনে বলে,“আল্লাহ আমাকে তুমি এইবার মেরে দিও। আর, আমি ব্যাথা কম পেতে চাচ্ছি।”
শেষ বারের মতো আপুর কথা,ভাইয়ার কথা,শুদ্ধর কথা, ভাবী,মিস জেনি সবার কথা ভাবছে প্রণমি। ও মরে গেলে ওরা কেমন করে কাঁদবে? আপু নিজেকে কিভাবে সামলাবে?
বুঝতে পারে ওর শরীরে কেউ আচর বসাচ্ছে,ওর ছটফটানি, পা দাপাদাপির তোড়ে ওকে নিয়ন্ত্রণে আনা দায়,তাই বেগ পোহাতে হচ্ছে নরপিশাচটার। প্রণমি চেঁচাতে চায়,“আমি ব্যাথা কম পেতে চাচ্ছি। আমাকে একটা আরামদায়ক মৃত্যু দিও।”
________
রোজ গার্ডেন অ্যাপার্টমেন্টে থেকে মির্জা এন্টারপ্রাইজের হেড অফিসের দূরত্ব আধাঘণ্টার। ইরফান পাঁচ মিনিটের পথ অতিক্রম করে হুট করে ব্রেক কষে। তার বাইকের সাথে ঝুলিয়ে রাখা বইয়ের ব্যাগটা। নিক স্মিথের “দ্য সেঞ্চুরি” বইয়ের থার্ড সিরিজ টা সেখানে। যেটা প্রণমিকে দিতে চেয়েছিলো আজ। শান্তিনীড় থেকে বেড়োনোর সময় বিশেষ কিছু নিয়ে বেড়োয়নি সে,এটা ব্যতীত। গতকাল রাতে ঘুমানোর আগে চোখে পরাতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বইটা উপযুক্ত হাতে তুলে দিয়ে আসবে,আজ জ্ঞানী আপার আদরের বোনের মুখে কুত্তা উপাধি শুনে মেজাজ টা খিচে গিয়েছিল যে এটা হাতেই রয়ে গিয়েছিল। মাঝপথে বাইক থামিয়ে ইরফান বইটা কিছু পল দেখলো। এটা এভাবে ফিরিয়ে নেওয়া ঠিক না, কুত্তা বললেই তো ইরফান কুত্তা হয়ে যায়নি? আর কুত্তারা নিশ্চয়ই বই উপহার দেয়না?
এটাকে ঐ বিরক্তিবতীর হাতে তুলে দিয়েই ইরফান মামলা খাবে,ইরফান জেলে যাবে! একটা জেদ চাপলো মাথায়। ইউটার্ন করে ইরফান ছুটলো রোজ গার্ডেন অ্যাপার্টমেন্টে।
মুখে তার অস্পষ্ট হাসি, এবার গেলে কি করবে? ভাবছে সে। কিন্তু ইরফানকে ধৈর্য্য রাখতে হবে, বড় বাবার মতো ধৈর্য্য।
গোটা দালান শুনশান নিরিবিলি,লিফটেও নেই কাকপক্ষী। ইরফান অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে কলিং বেলের সুইচে হাত রাখার আগেই দেখলো দরজাটা ভেজিয়ে রাখা। আশ্চর্য ইরফান, খানিকটা বিরক্তও, এটা এভাবে হাট করে খুলে রেখেছে! কি অদ্ভুত। ইরফান তবুও বেল টিপতে চাইলো,পর পর চাপা গোঙানির আওয়াজ কানে যেতেই ইরফান হুট করে দরজা ঠেললো। ড্রয়িংরুমের সবকিছু এলোমেলো, ইরফান হতভম্ব হলো, দশ সেকেন্ড নিলো ভাবতে। তারপর হাতের ব্যাগটা ফেলে ছুটলো পশ্চিম পাশের ঘরটাতে।
তিন সেকেন্ডের মতো ইরফান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, তারপর কোনো কথা না বলে গাঁয়ের সমস্ত শক্তি খরচ করে রাদিফের ঘাড় চেপে ধরে তুলে একপ্রকার ছুঁড়ে মারলো ইরফান, নেশার ঘোর কাটেনি রাদিফের, পরলো গিয়ে একটা সূচালো সেল্ফের ওপর, কপাল ফাটলো।
ইরফান ওকে পাত্তা দিলো না আর,তার শরীরটা অবশ হচ্ছিল,গা ঝাড়া দিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে চুপচাপ গিয়ে বিছানার চাদর টেনে মুড়িয়ে দেয় প্রণমির শরীর। মেয়েটা শ্বাস নিতে পারছিলো না ঠিকঠাক ভাবে,শুধু মনে হচ্ছে দমটা বেড়িয়ে যেতে চাইছে।
ইরফান তখনও কোনো কথা বলেনি, সে ব্যস্ত প্রণমির হাতের বাঁধন খুলতে, খুললো মুখের বাঁধন। ছাড়া পেয়ে প্রণমি গলাকাটা মুরগির মতো তড়পাচ্ছে। গলা থেকে আওয়াজ বেড়োচ্ছে না,শুধু চোখ থেকে পানি ঝরছে।
ইরফান বিছানার চাদর সমেত ওকে আগলায়, একহাতে প্রণমির গাল মুছিয়ে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলে,“প্রণো! প্রণো কিচ্ছু হয়নি। এই শোনো কিচ্ছু হয়নি! রিল্যাক্স! কিচ্ছু হয়নি।”
প্রণমি আর্তনাদ করে ওঠে, ইরফান ওকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে দু'চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“কিচ্ছু হয়নি! সত্যি বলছি! খোদার কসম কিচ্ছু হয়নি! প্রণো তুমি ঠিক আছো, বুঝতে পারছো?”
দু'হাতে ঝাকুনি দেয় ইরফান প্রণমিকে। প্রণমি থামে না,তার দম বেরিয়ে যাচ্ছে, তবুও তাকে কাঁদতে হবে। ইরফান পাগলের মতো চুমু খেতে থাকে ওর দুগালে, উন্মাদের মতো বিড়বিড় করে,“থামবে তুমি? নাকি আমি একটা খু'ন করবো?”
প্রণমি থামছে না,পা দাপাচ্ছে,চুল ছিঁড়ছে নিজের। আর মুখ দিয়ে কেমন অদ্ভুত শব্দ করছে। ইরফান বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেও ওকে শান্ত করতে পারলো না। ওকে বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে নিজেকে শান্ত রাখতেও, শরীরে রক্ত টগবগ করে ফুটছে। শেষটায় হার মানে ইরফান, তাকে বিধাতা অত সংযম দেয়নি যে। প্রণমিকে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো আশেপাশে তাকায়।
রাদিফকে ইরফান মেরেছে খুবই নির্দয়ভাবে, চেঁচাতে চাইলেও চেঁচাতে দেয়নি,পা দিয়ে মুখ চেপে ধরে রেখে ছুড়ি দিয়ে কুপিয়েছে, ছুড়িটা প্রণমির বেডসাইড টেবিলে রাখা ফলের ঝুড়িতে ছিলো,ছুড়িতে ধার ছিল কম, থেতলে কেটেছে রাদিফের চামড়া,তবে কেটেছে।
আশেপাশে, দুনিয়ায় কি হচ্ছে প্রণমি শুনছে না,সে ব্যস্ত নিজেকে ঢাকতে, নিজেকে আরো ঢাকতে চায় সে, আরো, ইরফান নিজের উন্মাদনা থামিয়ে ওকে দেখে, ছুটে যায় ওর কাছে, রক্তাক্ত দুহাতে দুগাল চেপে ধরে বলে,“বোকা মেয়ে কিচ্ছু হয়নি।”
_হয়েছে,অনেক কিছু হয়েছে। আমি জানি অনেক কিছু হয়েছে। ও দেখলো আমায়, ছুঁলো আমায়।
পাগলের প্রলাপ বকছে যেন প্রণমি! ইরফান আরো শক্ত করে চেপে ধরে প্রণমির গাল, চেঁচিয়ে বলে,“ও মরে গিয়েছে।”
_আপনিও দেখলেন...
_আমি তোমার স্বামী!
প্রণমি এসব কিছু শুনতে চায়না,সে অযথা মোচরামুচরি করতে থাকে,কি চাচ্ছে সে নিজেও জানে না।
ওপাশে দাপাদাপি করছে রাদিফ, প্রাণটা পুরোপুরি যায়নি জানোয়ারটার। ইরফান চুপচাপ প্রণমিকে নিজের সাথে মিশিয়ে রাখে, বিড়বিড় করে,“একটু শান্ত হও। এতে কিছু হয়না, তোমার কিচ্ছু হয়নি, তুমি সেফ, এখানে মিশে থাকো আমার, কসম, তুমি পৃথিবীর সবচাইতে সেফ যায়গায় আছো।”
প্রিতম ঢুকলো অ্যাপার্টমেন্টে, ছুটতে ছুটতে, প্রণমিকে ডাকতে ডাকতে, রাদিফের নিথর দেহ নজরে পরেনি,পরেছে প্রণমিকে জরিয়ে ধরে রাখা ইরফানকে, তীব্র ক্রোধে ইরফানের উপর আছড়ে পরলো প্রিতম, আঘাত করতে থাকলো নির্দয়ের মতো, ইরফান চুপচাপ ঘুষি গুলো হজম করে নেয়,প্রিতমকে বোঝাতে চাইল না কিছু,সে ব্যস্ত প্রণমিকে আগলাতে,“প্রণমি? প্রণমি কিচ্ছু হয়নি!”
ওকে ধাক্কা মারলো প্রিতম, অসহায়ের মতো তাকায় চাদরে মোড়ানো বোনের দিকে, ভেবে নিলো সব শেষ, কান্না পাচ্ছে, বোনকে ইরফানের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দু গালে চুমু খায়,“আমি ভাইয়া প্রণো,সব ঠিক আছে। সবকিছু!”
প্রেরণা আসে মিস জেনিকে নিয়ে,মায়ের হাত ধরে আছে শুদ্ধ। প্রেরণা বোকার মতো তাকিয়ে থাকে আছে প্রিতম,প্রণমি আর ইরফানের দিকে। মিস জেনি অকস্মাৎ নিজের মুখ চেপে ধরে, অন্যহাতে চেপে ধরে শুদ্ধর চোখ। মিনিট খানেক পর প্রেরণা নিস্তেজ কন্ঠে মিস জেনিকে বলে,“শুদ্ধকে এখান থেকে নিয়ে বেড়িয়ে যান মিস জেনি।”
মিস জেনি থরথর করে কাঁপছে, শুদ্ধকে টানতে টানতে বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে। প্রেরণা ছুটে গিয়ে ইরফানের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বোনকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলে,“সোনা! কিছুই হয়নি ঠিকাছে? আমরা সবাই এখানে আছি!”
প্রণমি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি তখনও, বিড়বিড় করছে,“হয়েছে আপু, ওরা দেখে নিয়েছে আমাকে।”
ইরফান চেঁচায়,“এই মেয়ে আমি বলেছি.....”
প্রেরণা বোনকে ধরে রেখে ইরফানের ওপর চেঁচায়,“তুমি চুপ করো....”
হঠাৎ থেমে যায় প্রেরণা, ততক্ষণে ওপাশে মেঝেতে পরে থাকা রাদিফের রক্তাক্ত বডিটা দেখে আঁতকে ওঠে প্রেরণা। তাকায় ইরফানের দিকে, ইরফান প্রেরণার দিকে তাকিয়ে নিরুদ্বেগ, ঠান্ডা স্বরে বললো,“শেষ!”
_রাদিফ?
কাঁপা গলায় বিকট আওয়াজে চেঁচায় প্রেরণা। বোনকে জরিয়ে ধরে, ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,“কখন এসেছো তুমি?”
ততক্ষণে প্রিতম দূরে পরে থাকা ছুড়িটা তুলে নিতেই ইরফান ওকে ধরলো,“তুই হাত লাগাস না, ও শেষ। আর হাত লাগাস না।”
কেঁদে ফেললো প্রিতম,“ছাড় আমাকে। ওকে টুকরো করবো আমি।”
উঠলো প্রেরণা, প্রিতমকে পেছন থেকে জাপ্টে ধরলো, ইরফানের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে,“করলে টা কি তুমি! মেরে দিলে? কি হবে এখন?”
ইরফান কিছু না বলে প্রিতমকে ফেরাচ্ছে,প্রিতমের হাত থেকে ছুড়ি নেওয়ার চেষ্টায় আছে। ঠান্ডা গলায় বলছে,“প্রণো ঠিক আছে, তুই ওটা ফেল!”
প্রণমি ঠিক নেই। প্রণমি এই দুনিয়ায় নেই। ওপাশে ধস্তাধস্তি হচ্ছে সেসব প্রণমির কানে যায়না। সে অন্য ভুবনে এখন, পার্থিব কিছুই তাকে ছুঁতে পারছে না! সে কেনো? সবসময় তার সাথেই কেন? ওরা দেখে নিলো সবকিছু, প্রণমি অসহায় ছিলো, আজ চূড়ান্ত অসহায়, প্রণমির কিচ্ছু গোপন রইলো না পুরুষের সামনে, কিচ্ছু না।
মাথা ঘুরছে প্রণমির, এমন সবসময় হবে, তার সাথেই হবে। সে না থাকলে আর হবে না। আপু কাঁদছে, সে না থাকলে এভাবে আপু বারবার কাঁদবে না,ভাইয়াও কাঁদবে না।
উঠে দাঁড়ায় প্রণমি,চিন্তারা এলোমেলো মস্তিষ্কে। চাদরে নিজেকে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে। সে বসে আছে তার রুমের বিছানায়,এখান থেকে ডানে পাঁচ কদম দিলেই দরজা, দরজা থেকে আট কদম দিয়ে ডানে ঘুরলেই কিচেন, প্রণোকে সেখানে যেতে হবে, যেতেই হবে।
প্রণমি এলোমেলো পায়ে ডুলতে ডুলতে চললো, জানোয়ারের নখের আঁচড়ে জ্বলছে গা। প্রণমি ছুটলো কিচেনে। ওকে কেউ দেখলো না।
প্রেরণা ভাই আর ইরফানকে রেখে মাথা ঘুরিয়ে দেখতেই দেখলো প্রণমি কিচেনের দিকে গেলো চাদর পেঁচিয়ে, প্রেরণাও দৌড়ালো পিছু পিছু। ততক্ষণে কিচেনের দরজা লাগিয়ে দিয়েছে প্রণমি। প্রেরণা ঘুরে উত্তর পাশের রেলিং দেয়া জানালার কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে ধাক্কা দিয়ে কিচেন র্যাক ফেলে দেখলো প্রণমি কিচেনময় কিছু হাতরে বেড়াচ্ছে, পাগলের মতো,কিছু খুঁজছে। প্রেরণা চেঁচায়,“কি করছিস প্রণো? দরজা খোল,আমার কাছে আয়।”
প্রণমি খুজছে গ্যাস স্টোভ, এটা তো ডান পাশের লোয়ার কেবিনেটের ওপর ছিলো, প্রণমি এখন খুজে পাচ্ছে না কেন? হাতরাতে হাতরাতে প্রণমি দুবার হোঁচট খেয়েও পরলো, আবারও উঠে দাঁড়াল। প্রেরণা অসহায়ের মতো বোনকে দু পলক দেখে ছুটলো রুমের ভেতর, ইরফান আর প্রিতমের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো,“থামবি তোরা? কিচেনের দরজা ভাঙ! প্রণোকে বের কর!”
প্রিতম হাত থেকে ছুড়ি ফেলে দৌড়ায়, ইরফানও। গিয়ে ধাক্কা লাগায় কিচেনের দরজায়।
ততক্ষণে গ্যাস স্টোভ খুজে পেয়েছে প্রণমি, কাঁপা কাঁপা হাতে হাতরে চুলা অন করে গাঁয়ের চাদরের একাংশ আগুনে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রেরণা ঘুরে জানালার কাছে গিয়ে এই দৃশ্য দেখতে পেয়েই আকাশ পাতাল এক করে চেঁচিয়ে উঠল,“না প্রণো এমন কিচ্ছু করবি না তুই। চাদর ফেল,ফেল বলছি। ওরে প্রিতম দরজা ভাঙছিস না কেনো!”
গায়ের সমস্ত শক্তি খরচা করে লাত্থি বসায় ওরা দুজন। ততক্ষণে আগুন প্রণমির শরীর স্পর্শ করতে শুরু করেছে,সে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ, নিরুদ্বেগ, পার্থিব কোনো ব্যাথা তাকে ছুঁতে পারছে না।
প্রেরণা ডুকরে উঠে লোহার রেলিং মাথা ঠেকিয়ে বলে,“সোনা আমি মরে যাবো,তোর পায়ে পরছি সরে আয়।”
হাহাকার করে কাঁদতে থাকলো প্রেরণা,
“সোনা আমি মরে যাবো! আমি মরে যাবো!”
দরজায় লাথির পর লাথি বসাতে থাকলো ইরফান,প্রিতম। আর চুপচাপ জ্বলতে শুরু করলো প্রণমি, ভুবনমোহিনী সৌন্দর্য, গালে একটা লাল তিল, যে খুব ভালো গান করে, ভাইয়া আপুর বড্ড আদরের আর কারো বিরক্তিবতী।
চলমান.....
[ শরীর ঠিক নেই, বহু কষ্টে এটুকু লিখলাম। #জায়া_ও_পতি পাবেন না আজ। ]