#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯৭
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
সেন্ট্রাল সিটি হসপিটালের দোতলা। এতো লোকসমাগম দেখে আগন্তুকেরা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে,আসতে যেতে। এখানে কি হচ্ছে? এতো হাহাকার কেন? মেয়েলি স্বর বিলাপ করছে একটানা।
একপাশে মেঝেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বসে হাপাচ্ছে প্রিতম। দূরে একপাশে ইরফান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে,তার মুখভঙ্গি শান্ত। শুধু কিছুক্ষণ পরপর কপাল কুঁচকে প্রেরণাকে দেখছে, যাকে মির্জা বাড়ির মানুষগুলো সান্ত্বনা দিচ্ছে। প্রেরণা কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে না, বুক চাপড়াচ্ছে, অস্পষ্ট উচ্চারণে বারবার বলছে,“সব আমার জন্য,আমি এই দায় কি করে এড়াবো? আমার জন্য হয়েছে সবকিছু। ঐ জানোয়ারটাকে বহু আগেই আমার শাস্তি দেয়া উচিত ছিলো,আমি দায়ী,আমার উদাসীনতার জন্য এসব,আমি দায়ী....”
ইনু প্রেরণাকে ধরে রেখেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,“চুপ করো আপু।”
দুজন নার্স এসে প্রিতম আর ইরফানের হাত ফার্স্ট এইড করে দিচ্ছে।আগুনের ছ্যাঁকা লেগেছে দু'জনের হাতেই, প্রিতম নির্জীব,তার কোনো হুঁশ নেই, তবে ইরফান নার্সের সাথে খিটখিট করছে,“লাগবে না বা*ল। সরুন।”
অল্পবয়সী নার্স ধ'ম'ক খেয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। সামিন ইয়াসার মির্জা, ইলহাম মির্জা শান্ত চোখে ছেলেকে দেখছে।
শুদ্ধ রিতুর কোলের মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে আছে,রিতু ওর গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে।
প্রেরণা হু হু করে কাঁদছে, আবারও বলছে,“আমিই দায়ী।”
মিস জেনি কেঁদে ওঠে,“তুমি দায়ী হলে আমিও তো দায়ী প্রেরণা, আজ যদি আমি ডক্টরের কাছে না যেতাম,তবে এসব হতো?”
ইনু প্রেরণাকে আগলায়, দু চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে,“মিস জেনি ঠিক বলছে আপু। তুমি দায়ী হলে আমিও তো দায়ী। আজ যদি আমি অসুস্থ না হতাম তবে প্রিতম তো যেতো না আমার কাছে প্রণমিকে একা ফেলে,আর না এসব ঘটতো! আমরা সবাই দায়ী। তুমি কেঁদো না।”
প্রেরণা কোনো বুঝ নিচ্ছে না, দু'পাশে চুপচাপ মাথা ঝাঁকিয়ে কাদছে।
এতো লোক বিধায় গমগম করছিলো যায়গাটা, ডক্টরদের বিরক্তি লাগলেও ক্ষমতাসীন মির্জা ফ্যামিলি বিধায় টু শব্দটি করছে না, শুধু একজন এসে বলেছে,“দয়া করে একটু আস্তে কথা বলুন।”
পরী প্রণমির কেবিনে, দু'জন নার্সের একজন প্রণমির ডানহাতের চারটি আঙ্গুল ড্রেসিং করিয়ে দিচ্ছে। একজন নার্স একটা হসপিটালের ফতুয়ায় আবৃত করছে ওর শরীরটা। কাজটি করতে করতে সে বেশ লজ্জা পাচ্ছে , বারংবার না চাইতেও চোখ যাচ্ছে প্রণমির শরীরে, এতো সুন্দর একটা মেয়ে ! একেবারে নিখুঁত। প্রণমির সৌন্দর্য চোখে বিঁধছে নার্সের,সে দ্রুত ওকে পোশাকে আবৃত করে হাত সরিয়ে নেয়, এই এতো সুন্দর বলেই মেয়েটির ওপর এমন জঘন্য হামলা হলো? সৌন্দর্য কি এই মেয়েটির জীবনে অভিশাপ? নাকি মেয়েটির কপাল!
পরী ঘনঘন শ্বাস ফেলছে প্রণমিকে একটা ইনজেকশন দিয়ে। অচেতন প্রণমি। একজন নার্স বলে ওঠে,“রুকাইয়া ম্যাম দেখেছেন জানোয়ারটা কি করছে? নখের দাগ সারা শরীরে।”
পরী কোনো কথা বলে না, আরেকজন নার্স বলে ওঠে,“এসব বাদ দে, কপাল ভালো ঠিক সময়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল,নয়তো আগুনে....”
_এসব প্লিজ বলো না,আর শোনো ওর জ্ঞান ফিরলে ওর কানের কাছে এসব নিয়ে কথা বলবে না, মেয়েটা এমনিতেই নাজুক। একটা পারিবারিক আবহ বজায় রাখবে ঠিক আছে?
পরী নিস্তেজ হয়ে বলে ওদের কথাগুলো, নার্স বলে,“জি ম্যাম।”
ঠিক তখনই আরেকজন নার্স কেবিনে ঢুকে বলে,“ম্যাম বাইরে পুলিশ এসেছে। আপনি আসুন।”
পুলিশ এসেছে ইরফান মির্জাকে অ্যারেস্ট করতে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অ্যাটেম্প টু মার্ডার কেসের। রাদিফকে নেয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে, পুলিশের হেফাজতে।
ইন্সপেক্টর এলেন দুজন কনস্টেবল নিয়ে, ইহান তাজওয়ার মির্জার মুখোমুখি। ইন্সপেক্টর ঘুরে প্রত্যেককে একবার করে দেখে ইরফানকে বললো,“আপনি সম্ভবত ইরফান মির্জা?”
_জি।
ঠান্ডা স্বর জবাব দিলো।
_আমাদের সাথে চলুন। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ....
_যাবো,একটু অপেক্ষা করতে হবে আপনাদের।
উপস্থিত প্রত্যেকে ভীষণ শান্ত, পুলিশ ইন্সপেক্টর সামিন ইয়াসারের দিকে তাকায়। রিতু আর ধৈর্য রাখতে পারলো না, ছুটে এসে নিজের ছেলেকে জাপ্টে ধরে ইনস্পেক্টরকে বললো,“এটা কেনো? ও তো এবার কোনো ভুল করেনি। মেয়েটাকে বাঁচিয়েছে, এটা কি অপরাধ?”
বাকি সবাই চুপচাপ,রিতু কাঁদছে। ইন্সপেক্টর বললেন,“এটা আইন হাতে তুলে নেওয়া। আমরা আইনের লোক। আপনার মতো সাধারণ নাগরিক হলে আমিও চাইতাম উনি অ্যারেস্ট না হোক।”
রিতু ছেলেকে ছাড়ে না,প্রেরণা কান্না থামিয়ে রিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ইরফান শান্ত স্বরে রিতুকে বললো,“মাম্মা ছাড়ো।”
রিতু ছাড়ে না,তার ছেলে দোষ না করে জেলের ভাত খাবে এটা সে মানবে না। ইরফান পুলিশ ইন্সপেক্টরকে বললো,“আমাকে কিছুক্ষণ সময় দিন, আমার ওয়াইফের জ্ঞান ফিরলে তার সাথে একটু কথা বলে তারপর যাবো,এই বড় বাবা তুমি কিছু বলছো না কেন ওনাদের!”
ইন্সপেক্টর বললেন,“এটা আমরা পারছি না, আপনাকে নিতে হবে এক্ষুনি। চলুন।”
ইরফানের রাগ চাপলো, রেগেমেগে ইহানের দিকে তাকায়, তাকায় পাপা আর বড় বাবার দিকে।
চেঁচিয়ে ওঠে,“কিসের ক্ষমতা তোমাদের? একটু সময় চাইছি। আমার মেজাজ কিন্তু খারাপ হচ্ছে।”
_আপনি সিনক্রিয়েট করবেন না, চলুন।
ইরফান যাবে না এখন মানে যাবেই না, পুলিশের সাথে চেঁচামেচি করছে, চেঁচাচ্ছে বাড়ির লোকদের ওপর। এক পর্যায়ে একজন কনস্টেবল হ্যান্ডকাফ নিয়ে এগোলেই রেগেমেগে এক ঘুষি বসিয়ে দেয় কনস্টেবলের নাকে। সামিন ইয়াসার অগ্রসর হচ্ছিল ইন্সপেক্টরকে সামলে নিতে, ছেলের এমন হঠকারী কাণ্ডে তাজ্জব বনে গিয়েছে সে, ইলহাম মির্জা ছেলের দুশ্চিন্তায় এক হাত কপালে চেপে বসে ছিলো, এ পর্যায়ে দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে দিলো, হাহাকার করে উঠলো তার ভেতরটা। এই ছেলের কি হবে?
ইহান টেনে আনলো ইরফানকে। ইন্সপেক্টর বললেন,“এতো উগ্রতা মেনে নেওয়া যায়না। স্যরি।”
এরপর সে নিজেই হ্যান্ডকাফ লাগায়, ইরফান তবুও মোচড়ামুচড়ি করছিল, সামিনের দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো বলে,“পালাবো না আমি! কিছু তো করো! প্লিজ!”
ভেতরটা পুড়ছে সামিনের,বাইরে সে যথেষ্ঠ শান্ত, ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো,“স্যরি বাবা। তুমি যাও। আমরা আছি।”
ইরফান চোখ বন্ধ করে ঘনঘন শ্বাস নেয়। প্রেরণা আর প্রিতম ওকে চুপচাপ দেখছে। ইহান এসে ভাইয়ের একটা হাত ধরে বললো,“জ্ঞান হারিয়েছে শুধু,এতো অস্থির হোস না।”
_একটু কথা বলবো!
_আমরা সামলে নেবো!
ইরফান মানতে চাইছে না,হাত খোলা থাকলে কি করতো কে জানে! প্রেরণা তখন নিজেকে সামলে নিয়ে ইন্সপেক্টরকে বলে,“ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে কে?”
_ভিক্টিমের মা বাবা।
_ও তো আত্মরক্ষার জন্য এটা করেছে। রেপিস্টকে বাঁধা দেওয়ায় রেপিস্ট ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পরেছে ওকে আহত করতে, নিজেকে বাঁচাতে ও.....আপনারা একটু বেশিই....আমার বোন সুস্থ হলে সাক্ষী দেবে।
_স্যরি, তবে এটি আপনাদের প্রমাণ করতে হবে, প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী আমরা এগোচ্ছি, আর, আত্মরক্ষা? আত্মরক্ষার জন্য এভাবে কোপায় কেউ কাউকে? ম্যাডাম যা-ই হোক না কেন এটা ক্রাইম। তবে হ্যা, ব্যক্তিগত ভাবে আমি ভীষণ খুশি ওনার উপর। একটা কথাই বলবো, আইনের অনেক ফাঁকফোকর আছে, আপনারা ঠিক একটা রাস্তা পেয়ে যাবেন,আশা করি!
ইরফান মানছে না,ইহান ভাইয়ের কাঁধে হাত চেপে বলছে,“একটু শান্ত হ! আমরা আছি না? কি করবি অপেক্ষা করে? তুই যা! আমরা সবাই ওর কাছে আছি।”
প্রেরণা ঘুরেফিরে নিজের পার্স খুজতে লাগলো, সোফার ওপর থেকে পার্স তুলে ইনস্পেক্টরকে বললো,“নিউটাউন মডেল থানা থেকেই তো?”
_আমরাও আমাদের কেস ফাইল ঐ থানায় করবো, ঐ পশুটা যাতে সুস্থ হলে এক সেকেন্ডও স্বস্তির শ্বাস ফেলতে না পারে। আইন হাতে তুলে নেয়ার জন্য আপনাদের এতো তৎপরতা,আশা করছি ধর্ষণের চেষ্টা করা একটা নরপশুকে একটুও রহম করবেন না আপনারা, আমি চাচ্ছি ও বেঁচে থাকুক, মৃত্যু খুবই সহজ শাস্তি হয়ে যাবে।
প্রিতমের দিকে তাকিয়ে প্রেরণা বলে,“চল আমার সাথে।”
_আপু প্রণো?
_ওর জ্ঞান ফিরতে ঢের দেরী, আগের কাজ আগে।
একপলক ইরফানের দিকে তাকায় প্রেরণা, তবে মুখে কিছুই বললো না।
রিতু ইরফানকে নিয়ে যাওয়ার পরেও ঘন্টাখানেক আহাজারি করেছে স্বামীর বুকে মাথা ঠেকিয়ে, ভাসুরের কাছে গিয়ে তড়পেছে,“আপনাদের কত টাকা? কয়েকজন পুলিশ কিনতে পারছেন না? এ কেমন নির্লিপ্ততা আপনাদের? এতো স্বচ্ছতা দিয়ে কি হবে? আমার ছেলেকে ছাড়িয়ে আনেন নয়তো আপনাদের ঐ বেহুদা টাকায় কেনা পানিও আমি স্পর্শ করবো না।”
সামিন বোঝাতে পারলো না ভাই আর ভাইয়ের বৌকে। পরিস্থিতি এতোটাই হাতের বাইরে যে সবটা চাইলেও হুট করে ঠিক হবে না। একটা আলোচিত ইস্যু হয়ে গিয়েছে এটা ইতোমধ্যে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তোবা ছড়িয়ে যাবে সর্বোত্র। পরিস্থিতি কতটুকু থাকবে ইরফানের পক্ষে? আজ কি ইরফানের আদৌও কোন দোষ ছিলো? ঐ পরিস্থিতিতে প্রিতম কি এটা করতো না? ইহান কি করতো না? সামিন কি এটাই করতো না? যেকোনো পুরুষ কি এটাই করতো না? করতো তো!
থানায় একটা সেলেই ইরফানকে একা রাখা হয়েছে, এটা অবশ্য ইহানের অনুরোধে। বাইরের ক্রিমিনালদের সাথে রাখলে আবার কখন না কখন, কোনো বিষয় নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হয় তার মাথা খারাপ ছোটো ভাই! তাই এটা করেছে ইহান। ইরফানের সাথে এসেছে ইহান আর ইশমাম মির্জা। পুলিশ কাস্টডিতে যাওয়ার পর থেকে ইরফান চুপ হয়ে আছে। মুখটা শুকনো, চূড়ান্ত পর্যায়ের অসহায় এক নাদান শিশু লাগছে, ইহানের বড্ড মায়া হচ্ছে ভাইকে দেখে এখন, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“খাবি কিছু?”
ইরফান নিশ্চুপ। ভাইয়ের হাতের ওপর হাত রাখলো ওকে বোঝাতে ইহান,“চিন্তা করিস না! প্রণো ঠিক থাকবে!”
_আমি ওকে তালাক দেবো না দাদান।
এবার একটু বেশিই মায়া লাগলো ইহানের, গম্ভীর হয়ে বললো,“কেন গিয়েছিলি আজ ওখানে?”
_প্রেরণা আপুর কাছে।
_কেন?
_ঐ তোমার বড়বাবা বললো না? ভদ্রতা বজায় রেখে পরিস্থিতি সামলাতে। কেন, অপরাধ করেছি গিয়ে?
_না বেশ করেছিস।
সেলের লোহার শিকের মধ্যে থেকে হাত বাড়িয়ে ভাইয়ের পিঠ চাপড়ায় ইহান।
ইশমাম দুই ভাইয়ের কথাবার্তা শোনে,এমন একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতেও এরা এখন কি শান্ত। সে বললো,“তুই খাবি কিছু ইরফান? একটা ডাব এনে দেবো?”
বিরক্ত হয় ইরফান,“এই ছোটো বাবা,এখন এতো আদর দেখিও নাতো! তখন তো তিন ভাই কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে ছিলে মুখে,আমাকে হিরহির করে টানতে টানতে আনলো।”
_আনবে না? একজনকে বাইশ কোপ দিয়েছো তুমি!
_তাও তো মরলো না শা'লা!
চোয়াল শক্ত হয় ইরফানের, ইহান নির্নিমেষ দেখছে ভাইকে, খানিকবাদে ইরফান মাথা তুলে দাদানকে বললো,“ওর খবরটা একটু জেনে আসো?”
_জেনেছি। জ্ঞান ফেরেনি।
লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান বলে,“কমপক্ষে পাঁচ-সাত বছরের সাজা তো?”
_পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়তে কমতে পারে, উকিল ধরবো।
শান্ত স্বরে আওড়ায় ইহান। ইরফান বলে,“হলেও অসুবিধা নেই। এটা কোনো ব্যাপার না,দেখতে দেখতে কেটে যাবে।”
ম্লান হাসে ইহান,“তারপর কি করবি?”
_বেড়িয়েই আমার প্রথম কাজ হবে ওকে তুলে আনা।
_______
রাদিফের নামে ধর্ষণের চেষ্টা এবং হত্যা চেষ্টার মামলা হয়েছে, থানা প্রাঙ্গণে রাজ্যের ভিড়, সাংবাদিকদের। ভিড় ছিল হসপিটালের সামনেও। ওখানকার সাংবাদিকদের ইয়াসার মির্জা সামলেছে। বর্তমান এসপি নিতান্তই ভদ্রলোক,তিনি প্রেস ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের পাঠিয়েছেন ওসির কাছে।
ওসি রণ হিমশিম খাচ্ছে, থানার সামনে বিশাল জটলা, ছাত্র শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা উত্তেজিত, জানা গেলো এরা কেউ কেউ ছায়ানটের সদস্য, কেউ মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী। আন্দোলন করছে ইরফান মির্জার অপরাধ মওকুফের জন্য। নিতান্তই বাচ্চা বাচ্চা দেখতে ছেলেমেয়েগুলো। ওসি ওদেরকে সামলাতে চাইলো কোমল পন্থায়। চড়াও হলোনা ওদের ওপর, বুঝিয়ে বললো থানা প্রাঙ্গণ ছাড়তে।
কয়েক ঘণ্টার মাথায় ওরা থানা প্রাঙ্গণ ছেড়ে জমায়েত হলো লোকমঞ্চের কাছে, কাঠফাঁটা রোদ্দুরে এক একটি বিভিন্ন বয়সী মেয়ে শিশু ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়াল, ছায়ানটের বিভিন্ন সদস্য যে যার যার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রী নিয়ে জমায়েত হলো লোকমঞ্চের কাছে, সাংবাদিক ছুটে গেলো ওদের কাছে। এটা একটি মানবিক ইস্যু। ছুটে এলো চৌত্রিশটি চ্যানেলের চিফ রিপোর্টার, উদ্দেশ্য এই ইরফান মির্জা ইস্যুকে কেন্দ্র করে যার যার চ্যানেলের টিআরপি বাড়িয়ে নেওয়া।
সবথেকে ভালোলাগার দৃশ্য ছিলো যখন প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার একশো বাষট্টিজন প্রতিবন্ধী মেয়ে শিশু এসে খোলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিরব আন্দোলনে সাথ দিলো, তাদের হাতে ফেস্টুন, ব্যানার, তাতে লিস্ট দেয়া আছে এবছর যে কয়জন প্রতিবন্ধী মেয়ে শিশু নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলো তাদের নাম, এটা ছিলো মির্জাদের পক্ষের উকিলের একটা মনস্তাত্ত্বিক চাল, উদ্দেশ্য এই ইস্যুটাকে একটি জাতীয় রূপ দিয়ে জনগণের নিরব সমর্থন আদায় করা। হলোও তাই, বেশ কিছু সময়ের মধ্যেই ফলাও হয়ে গিয়েছে বিষয়টা।
ভিড় ঠেলে ভাইয়ের হাত ধরে প্রেরণা থানার পুরনো দালানের সামনে এসেই থামলো। প্রণমি তখনও অচেতন ছিলো,বেশ কিছুক্ষণ আগে জেনেছে প্রেরণা। ওখানে মির্জা পরিবারের সবাই আছে।
প্রিতম উশখুশ করছে, বোনের দিকে তাকাচ্ছে আড়চোখে, প্রেরণার মুখভঙ্গি গম্ভীর। প্রিতম আস্তেধীরে বললো,“যাবে সেলে?”
প্রেরণা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বলে,“চল।”
এক দুপুর ইহান উকিলের সাথে থেকে এসে ভাইয়ের কাছে ঝিমুচ্ছে, এতোক্ষণ ধরে থাকার জন্য খসাতে হয়েছে টাকা। ইয়াসার মির্জা আর ইশমাম মির্জা এখন উকিলের সাথে। উকিল পরামর্শ দিয়েছিলো বাদী বিবাদী বসে শুরুতেই বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতা করে নেয়া, মির্জাদের পক্ষের কেউ মানেনি, মধ্যস্থতা হয়না, ধর্ষকের সাথে কোনো মধ্যস্থতা নয়, এতে যদি তাদের ছেলেকে ছাড়ানো না যায়,তবে তাই হোক।
তবে দু পক্ষের উকিল নেমেছে কোমর বেঁধে।
প্রেরণা আর প্রিতমকে দেখে ইহান উঠে দাঁড়ায়, প্রেরণা লোকটাকে দেখলো, পরিচয়ের প্রথম দিন থেকে এভাবেই ভাইবোনের সাথেই দেখছে লোকটাকে, একটু সামান্য মায়া হয় প্রেরণার। ইহান ওকে আর প্রিতমকে দেখেই অস্থির হয়ে বললো,“প্রণোর কি অবস্থা? তিনটার পর আর খোজ নিতে পারিনি!”
_ওকে সেডিটিভ দিয়ে রাখা হয়েছে।
শান্ত স্বরে আওড়ায় প্রেরণা। ইরফান শান্ত চোখে প্রেরণা প্রিতমকে দেখলো, প্রিতম ওর দিকে এক পলক চোরা চোখে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে ইহানকে বললো,“উকিল কি বলছে?”
_যথেষ্ট তৎপর,কাল কেসের প্রথম শুনানি।
_ফরেন্সিক রিপোর্ট?
_ল্যাবে আছে।
ইহান ঘুরে ভাইকে একপলক দেখে প্রিতম প্রেরণাকে বললো,“কথা বলবেন ওর সাথে? একজন একজন করে কথা বলুন। আমি বাইরে যাচ্ছি।”
প্রিতম দাঁড়িয়ে থাকে, প্রেরণা ইহানের সাথে বেড়োয় সেল থেকে। বাইরে এসে দাঁড়ায় যেখানে দুজন সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে আছে।
প্রিতম এগিয়ে যায়, ইরফান নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে, হঠাৎ করে ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে, সে চেষ্টা সফল হয়না।
প্রিতমের চুল উসকোখুসকো, হাত দিয়ে সেগুলো আরো এলোমেলো করে দিয়ে নিরেট ঠান্ডা স্বরে বলে,“ভালো আর হলি না!”
_তাহলে তোর পপুলারিটি কমে যাবে।
প্রিতম কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো ওকে,পর পর বললো,“আমার হাত থেকে ছুড়িটা নেওয়ার জন্য অমন করছিলি কেন?”
_সবার হাত নোংরা করে লাভ কি!
_তাতে তোর কি?
_আমার বোন কাদতো। তার পি ফর প্রিতমের জেল হলে!
এবার সামান্য হাসে প্রিতম, মাথার চুলগুলোকে খামচে ধরে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“বুঝতে পারছি না তোকে শা'লা!”
_বুঝতে পারলে কি করবি? তোর বোন দিবি?
প্রিতম চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, ইরফান হেসে ফেলে, বলে,“যা যা! আর সামাজিকতা দেখাতে এখানে থাকতে হবে না, ইনু আর প্রণোর খেয়াল রাখ!”
খানিক বাদে প্রিতম বেড়িয়ে এলে প্রেরণা ঢুকলো ভেতরে। ইরফান ওকেও দেখতে লাগলো, প্রেরণার মুখভঙ্গি শান্ত। এগিয়ে গিয়ে কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল ইরফানকে, ইরফানকে লাগছে উদ্ভ্রান্তের ন্যায়, শ্যামলা হলেও ছেলেটার চেহারা ভীষণ সুন্দর প্রেরণা এই মাত্র খেয়াল করলো, আগে কখনো সেভাবে ওর দিকে তাকায়নি মনোযোগ দিয়ে, একটা ইনোসেন্ট ইনোসেন্ট ব্যাপার আছে ইরফানের চেহারায়।
ইরফান প্রেরণাকে একটা স্নিগ্ধ হাসি উপহার দেয়, প্রেরণা বলে ওঠে,“এই চৌদ্দ শিকের লকাপ সম্ভবত তোমার পছন্দের যায়গা।”
ইরফান ও কথার জবাব না দিয়ে বলে,“আমার বৌ কেমন আছে!”
প্রেরণা কয়েকপল চুপ থেকে বলে,“তোমার বৌয়ের কথা জানি না, প্রণমি ঠিক আছে,খবর নিয়েছি। যাবো এখন ওর কাছেই।”
ফিচেল হাসে ইরফান। প্রেরণা বলে,“কেন গিয়েছিলে আজ?”
_হাত চাইতে প্রণোর....
সহজ সরল স্বীকারোক্তি। প্রেরণা প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“তোমাদের পক্ষের উকিল শুনেছি দূর্দান্ত। আশা করছি ভালো কিছু হবে!”
_ভালো কিছু হলে আপনার কি?
_কিছুইনা, মির্জা ফ্যামিলি আমার কাছে বড্ড মায়াময়, ভালো লাগবে তারা দুশ্চিন্তামুক্ত হলে।
ইরফান চুপ হয়ে যায়, প্রেরণা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ইরফানকে দেখে বলে,“খেয়েছো কিছু?”
মাথা নাড়ায় ইরফান।
_খাবে কিছু? প্যাকেটজাত খাবার দিতে পারবো সম্ভবত। বলো কি খাবে!
_এক প্যাকেট সিগারেট হলে ভালো হতো।
প্রেরণা তাকিয়ে রয়, ইরফানও কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলে,বলে,“বেয়াদবি নিবেন না,যারা এটা খায়না তারা বুঝবে না এটা ঠিক কি! দাদানকে বলতে লজ্জা লাগে, তাই আপনাকে বললাম, আর আপনিই তো জানতে চাইলেন কি খাবো,তো সত্যিটা বললাম...”
প্রেরণা বুঝে যায় এই ছেলে এমনই, এতো এতো অস্থিরতার মধ্যে তার হঠাৎ খানিকটা হাসি পায়,তবে সে হাসে না, বরং চোখ মুখ কঠিন করে কপাল কুঁ'চ'কে বলে,“ভালো হও।”
_ভালো হলে বোন দেবেন?
তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করে বসে ইরফান।
প্রেরণা বলে,“কখনোই না। আমার বোনকে আমি খুব ভালো বিয়ে দেবো।”
ইরফান চুপ হয়ে যায়। প্রেরণা আর কথা না বাড়িয়ে বলে,“আসছি। কাল আসবো কোর্টে।”
_কেন আসবেন?
_আত্মীয়, সামাজিকতা রক্ষায়।
_বাহ বাহ। কোর্টে শুনানিতে যাবেন, আপনি বড্ড সামাজিক লোক!
প্রেরণা জবাব না দিয়ে বেড়োয়, এবং সত্যি সত্যি প্রেরণা এক প্যাকেট সিগারেট কিনে এক কনস্টেবলের পকেটে হাজার টাকার চকচকে নোট রেখে বলে দেয়,“ইরফান মির্জাকে দিবেন।”
এই অদ্ভুত কাজটা প্রেরণা কেন করলো সে জানে না। কোন খেয়ালে করলো বুঝতে পারলো না, কাজটা করে বোকা বোকা মুখ করে থানা প্রাঙ্গণে নামলো। প্রিতম ইহান ছিল ওসির রুমে। বেড়িয়ে এসে প্রেরণার সাথে দেখা হয়। খবর এসেছে প্রণমির জ্ঞান ফিরেছে। তারা সেখানে যাবে।
চলমান.....
#নোট_বার্তা
[ এবার অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে অনেকেই ইনবক্সে আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন আমি ইরফান প্রণো জুটিটাকে শেষ করে একটা ব্রেক নিয়ে যাতে ইহান প্রেরণার জুটিটা ধরি। নিজের পরিস্থিতি বিবেচনায় আমিও এটাই ভেবে রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম একশো দশ পর্বের মতো সম্পূর্ণ করে একটু ব্রেক নিবো। তা আর হলো না, ৯৭ পর্বেই আমাকে হার মেনে নিতে হয়েছে। শারীরিক এবং মানসিক ভাবে খুবই খুবই অসহায় বোধ করছি। যারা ইরফান প্রণমি জুটির মিলনের জন্য অধীর আগ্রহে ছিলেন তাদের কাছে কড়জোরে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই আমার, আপনাদের অপেক্ষা বাড়িয়ে দিলাম। আমার শরীরের ওপর আমার হাত নেই! ক্ষমা করবেন আপনাদের এই প্রিয় জুটির এমন টান টান সময়টিতে আমার কলম থামাতে হচ্ছে! দয়া করে ক্ষমা করবেন! আমি নিরুপায়। অসুস্থতা নিয়ে লেখা, বাক্যগুলো গোছানো হয়নি অতটা,মার্জনা করবেন পর্বটি পড়ে, দোয়ায় রাখবেন, ভীষণ কাহিল লাগছে।]