ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 98

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯৮
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

“এটাও একটা ট্রিক। ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিতে এই ট্রিকটা খুব চলে। লোকে বলে মানুষ আইনের উর্ধ্বে নয়,তবে এই আইন লোহার মতো, আগুন দিয়ে ঠিকই মনমতো বাঁকানো যায়। একটু আগুন দরকার। মিডিয়া হবে সেই আগুন।”

কথাগুলো বলে ফিচেল হাসলো যুবক লোকটা। ঠিক যুবক নয়,বয়স ত্রিশ-একত্রিশ, সুদর্শন, শরীরটাকে বাধিয়ে রেখেছে তাই যুবক লাগছে।

সামিন ইয়াসার মির্জা আর ইলহাম মির্জা মনোযোগী দৃষ্টিতে ছেলেটাকে দেখছে। তাদের সামনে সফেদ শার্ট পরে যে বসে আছে সে ব্যারিস্টার উজ্জ্বল মাহমুদ, ডিফেন্স প্রসিকিউটর। নামের মতোই জ্বলজ্বলে যার ক্যারিয়ার।

গলার কাছে টাইয়ের নট টা খানিক ঢিলা করে নড়েচড়ে বসলো,অতি বিনয়ী হাসি হেসে সামিন আর ইলহামের দিকে কফির মগ দু'টো এগিয়ে দিয়ে বললো,“কানাডায় ২০৪৪ এ ইউএসবি গ্রুপের একটি ট্রাকের ধাক্কায় দূর্ঘটনার স্বীকার হয়ে পা হারায় এলিন নামের বারো বছরের একটি এতিম শিশু, হাইকিং করতে গিয়ে বরফের পাহাড় থেকে পিছলে পরে ট্রাকের সামনে পরেছে। ইন্ডাস্ট্রির মালিক মামলায় জিতে যায় ক্ষমতার জোরে, অবশ্য এতে ড্রাইভারের কোনো দোষ ছিলোও না। কোনো ধরণের জরিমানা দিতে হয়নি তাদের, পরে ২০৪৮ এ কেসটা রিওপেন হয় আমার এক বন্ধুর প্রচেষ্টায়, হাতে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই, কিচ্ছুটি নেই, তবুও আমার বন্ধু অ্যান্থনি কেসটা জিতেছিল কিভাবে জানেন?”

_কিভাবে?

_একটা ভিডিওগ্রাফি, পঙ্গু এলিন ফার্নান্দেজের সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি নিত্যদিনকার কর্মসূচি ভিডিও ধারণ করে আদালতে পেশ করা হয়েছিল শুধুমাত্র, ব্যাস। কান্ট্রির পিপল একজোট হয়ে এক চুটকিতে এলিনের ন্যায়বিচার পাইয়ে দিলো। আদালত চাপে পরলো,আইন চাপে পরলো, নিয়ম চাপে পরলো। তাই লজিকের পাশাপাশি “সিম্প্যাথি” এই টার্মটা আমি আইনপেশায় আমার সিক্রেট ট্রিক হিসেবে ফলো করেছি। আশাকরি বুঝতে পারছেন? অলরেডি শহরে মিছিল নেমেছে আপনাদের ছেলের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে।”

_কিন্তু এটা তো পসিবল না!

_জি,পসিবল না, তবে আপনাদের অনেকটা সাহায্য করবে।

_কিভাবে?

_দেখে নিবেন, আর আমি তো আছিই।

উজ্জ্বল ছেলেটা খুবই শান্ত স্বভাবের বুদ্ধিমান, সামিন শুনেছে, ছেলেটার সাথে কথা বলে উদ্বিগ্নতা কমেছে কিছুটা। ইলহাম ব্যস্ত হলো,“ভাইয়া চলো উঠি, থানায় একটা ঘুরি দিয়ে হসপিটালে যাবো।”

সামিন উজ্জ্বলকে বললো,“আগে কখনো দেখিনি তোমাকে, তবে তোমার দাদু নিজাম মাহমুদ আমার কেসের প্রসিকিউটর ছিলেন, তিনিই ছাড়িয়েছেন আমাকে।”

_জি দাদুর মুখে আপনাদের কথা প্রায়ই শুনতাম, ইনফ্যক্ট এখনও শুনি।

_মাঝখানে লন্ডনে ছিলে শুনেছি।

উজ্জ্বল হাসল,“সাইকোলজি নিয়ে পরেছি ওখানে।”

_সাইকোলজি?

_ জি আমার ডিগ্রী আছে। আমি একজন কনসালটেন্ট।

অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ছেলেটার দিকে। ভীষণ মেধাবী ছেলেটা, কথাবার্তার ভঙ্গি যথেষ্ট স্মার্ট। ছেলেটার সাথে কথা বলে সামিন স্বস্তি পায়, নিশ্চয়ই কিছু একটা করতে পারে এ। এই পরিস্থিতিতে কৌতুহল জাগলেও উঠে দাঁড়ায় সে। তাদের এখন থানায় যেতে হবে।

_______

তীব্র মেডিসিনের ঘ্রাণ নাকে যেতেই নিজের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যায় মেয়েটা, আশ্চর্য হলেও টের পায় শরীরে যন্ত্রণার ছিটেফোঁটাও নেই, কেমন অস্বাভাবিক শীতলতা পা থেকে মাথায়, তবে স্নায়ুতে চলছিল তান্ডব লীলা, ডক্টররা দিতে পারেনি সেখানে মেডিসিন।
ছোটো বেলায়,একটা ঘরে সে খেলছিল,এক লোক এসে দুহাতের দশ আঙুল দিয়ে ছোটো নরম শরীরে আঘাত দিয়ে বলেছিলো,“আরে আরে,আদর করছি তো!”
গতকালের ঘটনা ভুলে গিয়ে প্রণমি ছবছর বয়সের সেই দুঃসহ দিনটাকেই যেনো দেখছিলো চোখের সামনে। জ্ঞান ফেরার পর থেকেই নির্বিকার সে, চুপচাপ শুয়েছিলো, নার্স এসে টেনে উঠিয়ে বসিয়ে বললো,“খেতে হবে ডিয়ার, আচ্ছা শুনলাম তুমি খুদে গানরাজের অডিশনে টিকেছো? আমরা তবে একজন ভবিষ্যৎ সিঙ্গারের সেবা করছি?”

এক ঘোরের রাজ্য থেকে নামলো প্রণো, হঠাৎ করেই ডানহাতের আঙ্গুল দুটোয় জ্বলুনি অনুভূত হয়,যে আঙ্গুল দুটো সম্ভবত পুড়েছে। কক্ষজুড়ে এক নিদারুণ নিস্তব্ধতা, তবুও প্রণমি টের পায় তাকে ঘিরে অসংখ্য মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কক্ষের বিভিন্ন স্থানে,প্রণমি বুঝতে পারে।
তার নড়নচড়ন নেই। ইনু ,শেহা, ইনশিরাহ এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। ইনশিরাহ আর শেহা বিকেলেই এসেছে। আলো আর পরী গিয়েছে থানায়। পালা করে প্রত্যেকেই ছোটাছুটি করছে থানাতে, তাদের ছেলেদের দেখার জন্য।
শুধু যায়নি রিতু, সে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে সোফাতে, তাঁরই পাশে মিস জেনি। ইশমাম ও শুদ্ধও সেখানে।

ইনু দরজা দেখছে বারবার,কখন প্রেরণা আপু আসবে, এর মাঝে এই মেয়ে উত্তেজিত হয়ে পরলে সে কিভাবে সামলাবে?

প্রণমি উত্তেজিত হয়না। তার মুখে কোনো ভাব নেই।

প্রেরণা প্রিতম আসে ইহান তাজওয়ার মির্জার সাথে। ত্রস্ত পায়ে প্রেরণা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে গেলো বোনের কাছে। দু'হাতে বোনের গাল দুটো ধরে নিজেকে শত চেষ্টা করেও সামলাতে ব্যর্থ প্রেরণা। ডাক্তারের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও কেঁদে ওঠে ওর সামনে।

প্রিতম গিয়ে আপুর মুখ চেপে ধরে সরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় প্রণোকে বলে,“খাবি কিছু প্রণো?”

প্রণমির কান্না নয়,হাসি পাচ্ছে,সে হাসলো সামান্য। কক্ষে থাকা প্রত্যেকটি ব্যক্তি মূক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ আগে সবাই যেমনটা পরিকল্পনা করে রেখেছিল,সে অনুযায়ী ইশমাম বলে ওঠে,“প্রণমি আম্মু। জানোয়ারটা তুমি ছাড়াও আরো অনেকের সাথে বেয়াদবি করেছে। সবাই মিলে কম্প্লেইন তুলেছে আজ। তোমার মতো আরো অনেকের সাথে হয়েছে বেয়াদবি।”

প্রণমি ছোটো বাচ্চা নয়,বুঝে যায়,সবাই ভাবতে শুরু করেছে প্রণমি মনঃকষ্টে আছে ,“তার সাথেই কেন এসব হয়”, এই কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে রেখে প্রণমি পাগলামি শুরু করবে আবারও। ইশমামের কথার জবাবে প্রণমি কিছু বললো না, সাক্ষাৎ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ঘুরে এসে তার নিজের জন্য নয়,শুধু কষ্ট হচ্ছে আপুর জন্য, প্রণমি টের পায় তার অপরাধবোধ হচ্ছে। নিজের জীবনের সমস্ত গ্লানি পাশে সরিয়ে রেখে শুধু আপুর সামনে অপরাধবোধ হচ্ছে তার।

এতক্ষণে নিস্প্রভতা ভেঙে প্রণমি স্বাভাবিক কন্ঠে বলে ওঠে,“আপু।”

ঝাঁপিয়ে পরে প্রেরণা,বোনকে আগলে নিয়ে দু গালে পাগলের মত চুমু খায়,“এই তো আমি!”

_রাগ করেছো?

অমন প্রশ্নে প্রেরণার বুকটা জ্বলেপুড়ে ওঠে,বোনকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে হুহু করে কাঁদা ব্যতীত আর কোন কথা সে খুঁজে পায়না। এইবার দু চোখের পানি ছেড়ে দেয় প্রণমি, ওর অকস্মাৎ আর্তনাদে চ'ম'কে ওঠে প্রত্যেকটি মানুষ। কক্ষ গুমোট করা ভারী কান্নার মাঝখানে মেয়েটা কোনো মতে বললো,“আপু আমি একটুও মরতে চাই না। একটুও না। আমি বাঁচতে চাই।”

প্রিতম গিয়ে বোনকে ধরলো,প্রণমি চেঁচাতে থাকে,“ভাইয়া আমি মরতে চাইনা।”

প্রেরণা বোনকে জড়িয়ে রেখেই আশেপাশে তাকায়। ইহান বাইরের ঘর থেকে ছুটে আসে,সকলেই ছুটে আসে। এর মাঝে সামিন ইলহাম,আলো পরীও আসে থানা থেকে।

“কি হচ্ছে এখানে?”

অপরিচিত মিহি নারী কন্ঠের কড়া প্রশ্নে কেবিনের প্রত্যেকে ঘুরে তাকালো। ভদ্রমহিলা এগিয়ে গিয়ে বললেন,“এতো কান্নাকাটি কিসের এখানে?”

আলো কিছুক্ষণ আগে এসেছে,তাই জানেনা ভদ্রমহিলাকে। সামিনের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই সামিন চাপা স্বরে বলল,“ডক্টর সুমেধা কবির। প্রণমিকে থেরাপি দেবে।”

কান্না থামে প্রণমির,প্রেরণা উঠে দাড়াতেই ওর হাত ছাড়ে না প্রণো,হাশফাশ করে ওঠে মেয়েটা,“আপু কে?”

_ডক্টর প্রণো, একটু কথা বলবে তোমার সাথে।

_আমি কারো সাথে কথা বলতে চাইনা।

সামান্য হাসলো সুমেধা,কাঠিন্যতা সরিয়ে কন্ঠে আদর ঢেলে বললো,“তোমাকে একটা শব্দও বলতে হবে না। তুমি শুধু শুনবে মেয়ে।”

মির্জা বাড়ির লোকগুলো বেরিয়ে যেতে নিলে সুমেধা বললো,“শুধু পুরুষ গুলো বাইরে যান, মহিলারা থাকুন। আপনাদের আমার প্রয়োজন।”

ওনার কথায় দাঁড়িয়ে পরে প্রেরণা,আলো, ইনশিরাহ,ইনায়া,শেহা,রিতু,পরী,মিস জেনি। বুঝতে পারছে না ওরা, ডক্টর কি করতে চাইছে।
ঐ নৃশংসতার পরে এখন প্রণমি যথেষ্ট শক্ত, যথেষ্ট, সে মনে করে। শুধুমাত্র আপুর জন্য, হঠকারিতায় খেই হারিয়ে মরতে বসে আপুকে ব্যর্থ প্রমাণ সে করতে চায়নি। তবে এখন প্রণমি আর পারবে না কোন আলোচনার মধ্যে যেতে,তার কারো থেকে বুঝ চাইনা, সান্ত্বনা চাইনা।

সুমেধা বসলেন, বসে সবাইকে বসতে বললেন। শঙ্কায় জবুথবু হয়ে প্রণমি আপুর কোলে মাথা গুঁজে নেয়। সুমেধা ওর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক কথাবার্তা বললেন সকলের সাথে, হসপিটাল নিয়ে কথা বললেন, প্রত্যেকের পরিচয় জেনে নিলেন। মোটকথা কক্ষের পরিবেশটাকে পুরোপুরি বাড়ির ড্রয়িং রুম,যেখানে মা চাচিরা মেয়েদের নিয়ে বসে গল্প করে,তেমন করে ফেললেন। তারপর হঠাৎ করেই তিনি তার কাজে ফিরলেন, স্বাভাবিক গলায় প্রণমিকে শুনিয়ে বলে উঠলেন,“গতবছর আর এবছর দেশে ধর্ষণ,ধর্ষণের চেষ্টা,যৌন নির্যাতন কিংবা যৌন হয়রানির হার সবচেয়ে বেশি ছিলো বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে, সর্বোচ্চ আইন প্রনয়নের পরেও এটা কমেনি। এই কাজগুলোকে যদি আমরা সৃষ্টিকর্তার দেয়া অভিশাপ মনে করি তবে আমি বলতে চাই, সব মেয়েদের দোষ কিন্তু অন্ধত্ব নয়, প্রতিটা মেয়ে বিভিন্ন দোষে এসব অভিশাপের স্বীকার হয়, জানো প্রণমি?”

প্রণমি কোনো কথা বলে না, চুপচাপ কান চেপে ধরে। সুমেধার ইশারায় প্রেরণা ওর কান থেকে আলতো করে হাতটা সরিয়ে দেয়। প্রণমি আরো মিশে যায় আপুর সাথে। সুমেধা বলেন,“সে হিসেবে বলতে গেলে এক বা একাধিকবার,বা তার চেয়ে আরও বেশি বার আমরা মেয়েরা বিভিন্ন দোষে এসবের স্বীকার হই। এবং এই পৃথিবীতে খুব কম মেয়েই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তার সাথে এমন কিছু ঘটেনা, আমিও না। তবে সেসবের কারণ অন্ধত্ব নয়।”

এবার সুমেধা সব মহিলা ও মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সরাসরি মিস জেনিকে বললেন,“এখানে সবথেকে বেশি সিনিয়র হচ্ছেন আপনি, তো বলুন, আপনার সাথে ঘটেছে এমন কিছু?”

মিস জেনি জড়তা কাটিয়ে মাথা নাড়লেন।

_বলুন বিস্তারিত। শুনি।

মিস জেনি বলতে লাগলেন,“আমি আমার সৎ বাবার দ্বারা বেশ কয়েকবার ফিজিক্যাল অ্যাসল্টের শিকার হয়েছিলাম ছোটো বেলায়।”

সবার বেশ মন খারাপ হয়, প্রণমির মনযোগ স্থির হয়। মিস জেনি এতক্ষণে কেঁদে ফেলেন সেকথা মনে করে। সুমেধা এবার বললেন,“সৎ বাবা? তো আপনার দোষ ছিলো একটা পুরুষের সৎ মেয়ে হওয়া। নিজের মেয়ে হলে তিনি এটা করতেন না হয়তো।”

এবার সুমেধা আলোর দিকে তাকায়,“আপনি মিসেস ইয়াসার মির্জা। আপনার জীবনে এমন ঘটনা ঘটেছে?”

আলো নড়েচড়ে উঠলো, কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুকনো গলায় বলে,“ছোটোবেলায় এক বড় চাচাত ভাইয়ের কাছে আব্বু আম্মু টিউশন নিতে দিয়েছিলো। ভাইয়া আমাকে প্রায়ই কোলে নিয়ে বসতো, এবং ফ্রকের নিচ থেকে হাত ঢুকিয়ে আমার বুকে।”

থেমে যায় আলো, ইনশিরাহ মলিন মুখে মায়ের কথা শুনছে, হঠাৎ আলোর গলা কাঁপছে,বলে,“তখন বুঝতাম না। কাউকে বুঝিয়ে বলতেও পারতাম না। বড় হবার পর বুঝেছি। এখনও মনে পরলে ট্রমাটাইজ হয়ে যাই আমি। কত অবুঝ ছিলাম! দিনের পর দিন আমার সাথে কি হতো!”

সুমেধা তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে,“তো আপনার অপরাধ ছিলো আপনি ছোটো ছিলেন, বুঝবেন না কিছু, তাই সে এসব করেছে,নয়তো সাহস পেতো না।”

এবার পরী ডক্টর সুমেধাকে নিজে থেকেই বলে উঠলো,“আমার সাথে তো এমন ঘটনা রিপিট হয়েছে,বেশ কয়েকবার। আমাদের অ্যানাটমি প্রফেসর ছিলেন, আমি একটু সুন্দরী হওয়ায় ওনার নজর ছিলো আমার ওপর, মেডিক্যালের থার্ড ইয়ারে মার্ক আটকে রেখেছিলেন উনি আমার,আমি ওনার সাথে ফিজিক্যালি ইনভল্ব হইনি বলে। তার আগে ওনার কেবিনে বহুবার ওনার হয়রানির শিকার হয়েছি, প্রতিবাদ করতে পারতাম না ফেল হবো তাই। শেষে তো সামিন ভাইয়াকে বলে বিপদ কাটিয়ে উতরেছি।”

ডক্টর সুমেধা হেসে বললেন,“তো আপনার অপরাধ আপনি সুন্দরী এবং ভিতু ছিলেন দেখতে।”

এবার সুমেধা রিতুর দিকে তাকায়। ছেলের দুশ্চিন্তায় অস্থির রিতু কিছু বলতে পারেন না, ওর হয়ে আলো বলে ওঠে,“গায়ের মেয়ে ছিলো, ওখানকার চেয়ারম্যানের ছেলে উত্যক্ত করতো। চাষার ঘরের মেয়ে বিধায় সাহস হয়নি প্রতিবাদ করার, ওর কাছেই শুনেছি একবার ওকে টেনে দোকানের পেছনে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করতে চেয়েছিল, বেঁচে গিয়েছে। তারপর গরীব বাবা মা বিয়ে দিয়ে দেয়।”

সুমেধা বলে,“ওনার দোষ ছিলো উনি গরীব ঘরের।”

এবার সুমেধা ইনশিরাহর দিকে তাকায়, ইনশিরাহ নড়েচড়ে ওঠে। সুমেধা বলে,“নাম?”

_জি ইনশিরাহ বিনতে সামিন।

_বিয়ে হয়েছে?

_জি।

_আচ্ছা, তোমার জীবনে এমন ঘটনা থাকলে বলো।

ইনশিরাহ কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে ধীরে ধীরে মুখ খোলে,“একবার ট্যুরে মালদ্বীপ গিয়েছিলাম বন্ধুরা সবাই। আমার একটা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো। আমরা বন্ধুরা সবাই ভাইবোনের মতো থাকতাম। কিন্তু ওখানে গিয়ে ও পুরো চেঞ্জ হয়ে যায়, আমার সাথে খুব বাজে বিহেব করে, অবশ্য মার খায় আমার হাতে। এসব কথা বাড়িতে কাউকে বলিনি আজ অবধি, নয়তো পাপা আর দাদান গার্ড দিতো।

_তোমার অপরাধ তুমি সুন্দরী হয়ে ছেলে বন্ধু বানিয়ে ছিলে। আর কখনও এমন কিছু হয়েছে?

ইনশিরাহ মাথা নেড়ে বলে,“বহুবার। আমি প্রতিবাদ করেছি সব বার।”

_বাহ বেশ ভালো।

এবার প্রেরণার দিকে তাকায় সুমেধা,“আপনার সাথে ঘটেছে এমন কিছু?”

ঢোক গেলে প্রেরণা। মাথা নাড়ে চুপচাপ। সুমেধা বলে,“বলুন শুনি। বিস্তারিত বলবেন।”

খানিকসময় বোনের মুখের দিকে চেয়ে রয় প্রেরণা, প্রণমিও যেন খুবই মনযোগী হলো আপুর জীবনের ঘটনা শুনতে। প্রেরণা বলতে থাকে,“মস্কোতে থাকাকালীন,মম ড্যাডের মৃত্যুর পরে একটা অরফানেজে ছিলাম আমরা তিনভাই বোন। আমার চৌদ্দ বছর বয়স তখন। কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে লুকিয়ে এক যায়গায় বেবী সিটিং করতাম বাড়তি কিছু টাকার জন্য। যে বাড়িতে যেতাম,সে বাড়ির কর্তা একদিন তার মিস্ট্রেসের অনুপস্থিতিতে আমাকে জোরাজুরি করলেন, আমার হাতে অনেকগুলো টাকা দিয়ে বললেন উনি আমার ভার্জিনিটি দেখতে চায়। আমি কপাল গুণে বেঁচে ফিরে আসি সেদিন।”

একটা লম্বা শ্বাস ফেললো সুমেধা,“তো আপনার দোষ আপনি অসহায় এবং এতিম ছিলেন।”

ইনায়া আর শেহার দিকে তাকিয়ে সুমেধা বলে,“তোমরাও বলো, শুনি!”

শেহা সাহস করলো, বলে উঠলো,“ইনশিরাহ আপুর মতো আমারও সেইম ব্যাপার। এক বন্ধু,ওর সাথে আমি ফ্রেন্ডলি ছিলাম। ও আমাকে ইজি গোয়িং ভেবে নিয়ে একদিন ফাঁকা ক্লাসরুমে....”

থেমে যায় শেহা,আর কিছু বলতে পারলো না। ইনায়া এমনিতেই নরম মনের,সে বলতে গিয়েই কেঁদে ওঠে,“আর আমার সাথে তো বারবার হয়, সবসময় হয়। আমার স্বাস্থ্য একটু ভারী বিধায় লোকজন তো চোখ দিয়েই গিলে খায় আমার মাংস।”

পরিস্থিতি গুমোট, সুমেধা আড়চোখে প্রণমিকে দেখে,সবাই ওকে দেখে। মেয়েটা এতক্ষণে বেশ মনোযোগী শ্রোতা, উঠে বসে চুপচাপ শোনে সবার কথা। এবার সুমেধা বললো,“তো আপনাদের সকলের দোষ জানলাম। কেউ সুন্দরী,কেউ অন্ধ,কেউ অবুঝ,কেউ গরীব,কেউ ভীতু,কেউ অসহায়,কেউ ফ্রেন্ডলি ছিলেন বলে জানোয়ার গুলো সুযোগ নিতো অথবা হামলে পরতো,আমার দোষ শুনবেন? আমি কারো ওয়াইফ ছিলাম।”

পরিবেশ থমথমে,সুমেধা বলতে থাকে,“আমার দোষ ছিলো আমি বৌ, তাই ঝাঁপিয়ে পরতো আমার ওপর।”

এটুকু বলেই সুমেধা চুপ, পরপর কন্ঠে গম্ভীরতা এনে প্রণমিকে বলে ওঠে,“আইরোনি বাদ দিই প্রণমি। এগুলো আমাদের দোষ নয়, এগুলো আমাদের পরিস্থিতি, এবং ওরা অন্যায় করে আমাদের সাথে। যার কোনো জাস্টিফিকেশন হয়না, অন্যায় মানে অন্যায় । আমাদের কোনো অধিকার নেই নিজেকে নিয়ে আফসোস করার, নিজের মাথায় এই কথাটা গাঁথার “আজ আমি এমন হলে এটা আমার সাথে ঘটতো না।” কিংবা নিজেকে দোষারোপ করার, কিংবা নিজেকে শেষ করার। এতে অন্যায়টাকে জাস্টিফাই করা হয়।
আমাকে যদি কেউ রেপ করে, সেটা শুধুমাত্র অন্যায়, ধর্ষক অপরাধী, আমি ভিক্টিম, ধর্ষক পাবে ঘৃণা। আমি চাইবো বিচার। কেউ তোমার শরীর ছুলো সেটা ভেবে নিজের শরীরের প্রতি ঘৃণা জন্মিয়ে যদি শেষ হতেই হয়,তবে তো এই বাংলাদেশে মেয়েই থাকবে না জীবিত। আমি হলফ করে বলতে পারি বাংলাদেশের অর্ধেক মেয়ে তবে অপবিত্র, কারণ কখনো না কখনো কেউ না কেউ ব্যাড টাচের শিকার হয়েছেই।”

একটু থামে সুমেধা, পর পর বলে,“কথা বাড়াবো না প্রণমি। তোমার বোন বলেছে তোমার পাস্ট হিস্ট্রি আছে। কিন্তু আমি দেখছি তুমি একটা নারী,একটা বিবেচনা দিলাম তোমায়। তোমার সাথে যে অন্যায়টা হয়েছে সেটা প্রতিদিন বহু মেয়ের সাথে হয়। এখন তুমি তোমার সাথে হওয়া অন্যায়টাকে তোমার কলংক ভেবে নিয়ে গুমরে গুমরে মরে বাকি মেয়েদের উৎসাহ দেবে তীব্র গ্লানি নিয়ে মরতে নাকি সাহসী হয়ে বিচার চাইবে।”

প্রণমি কথা বলে না, নিস্তেজ হয়ে বসে থেকে সুমেধার কথা শোনে। সুমেধা উঠে গিয়ে প্রণমির গালে একটা হাত রাখে, নরম গলায় বলে, “মা, এগুলোকে তুমি আমি আটকাতে পারবো না, তবে আমরা বাঁচার অনেক উপায় বের করতে পারি। বাকি মেয়েদের শেখাতে পারি।”

জবাব দেয়না প্রণমি। সুমেধা সকলকে চোখের ইশারা দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বললো,“পানি খাবে প্রণমি?”

দুপাশে মাথা নাড়ায় প্রণো। সুমেধা বলে,“খুব বুঝদার লাগছে এখন তোমাকে, অথচ আমার কাছে তোমার নামে কত বদনাম করা হলো। তুমি নাকি অবুঝ! তোমার স্বামী জেলে, আইন হাতে তুলে নিয়েছে,শাস্তি পাবে তাই। কিন্তু তার আগে তো ঐ জানোয়ারটার বিচার শেষ হতে হবে, কাল গিয়ে তুমি দ্রুত বয়ান দেবে। যেটা করতে চেয়েছিল ও,তার বিচার পেতেই হবে তোমায়।”

স্বামী! শব্দটা শুনেই এতক্ষণের নির্জীব প্রণমী চমকায়। অকস্মাৎ তিরতির করে কেঁপে ওঠে চোখের পাতা। সংকোচে গাঁট হলো শরীর। গিললো ঢোক, আচমকা তার হাত চলে যায় তার গালে, সমস্ত গালে,যেখানে ঐ লোকটা চুমু খেয়েছে অগণিত।
ঠাঁয় বসে থাকে কিছুক্ষণ, সবাই কৌতুহলী হয়ে ওকে দেখছে, প্রণো ধীরে ধীরে বলে ওঠে,“ওনার কি জেল হয়েছে?”

বোনের মুখের দিকে নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকে প্রেরণা, ইনশিরাহ জবাব দেয়,“কাল শুনানির প্রথম দিন।”

চোখ বুজে নেয় প্রণমি,আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ কাত হয়ে শুয়ে পরে।

সুমেধা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে প্রেরণা আর আলোও বেরোয়।
ঘরের বাইরে আসতেই সামিন,প্রিতম আর ইহান এসে দাঁড়ায়।

আলো অবাক হয়ে সুমেধাকে বলে,“আপনার থেরাপি শেষ?”

_জি, ওকে যা বোঝানোর, বুঝিয়েছি। আপনারা কোর্টে নেবেন ওকে স্বাভাবিক ভাবে।

আঁতকে ওঠে প্রেরণা, আলো বলে,“এভাবে? ওর মানসিক দিকটা....”

গম্ভীর হয়ে সুমেধা আলোকে ধমকায়,“মানসিক দিক হোয়্যাট? আপনারা সেই জিরো থেকে শুরু করছেন। আমি কি বললাম? কেউ আমাকে রেপ করতে আমার জামা খুললো সেটা আমার লজ্জায় মরে যাওয়ার বিষয় নয়, আমার সাথে অন্যায় হয়েছে, আমার রাগ থাকবে এবং আমি শক্ত হয়ে বিচার চাইবো এটা সেই বিষয়। আপনাদের মেয়েকে নিয়ে হায় হায় করে প্লিজ ওকে এটা বুঝিয়ে দিবেন না যে মেয়েদের সাথে এমন কিছু হলে তার কলঙ্ক লেগে যায়, উল্টো যেটা উচিত সেটা শেখান। এমন কনজারভেটিভ মাইন্ড নিয়ে থাকবেন না প্লিজ!”

প্রেরণা আর আলো মাথা নাড়ায়,“বুঝেছি ম্যাম।”

সুমেধা চলে গেলে গেলে প্রেরণা আবারও প্রণমির ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, চুপচাপ শুয়ে আছে মেয়েটা, একটা শান্ত নদীর মতো। ওর দু'পাশে বসে আছে ইনশিরাহ,ইনু,শেহা আর মিস জেনি।

এতক্ষণে একটু হাঁফ ছাড়ল প্রেরণা। চোখ ঘুরিয়ে দেখলো সামিন আর ইহানকে, ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে প্রেরণা উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল সামিনের কাছে উকিলের কথা। প্রিতমও এলো। সামিন বললো ওদের পুরোটা বুঝিয়ে।

এই পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকে দেখে প্রেরণা কৃতজ্ঞতায় ভরা দৃষ্টিতে। প্রতিটি মানুষ যেন তাদের তিন ভাইবোনেরই পরিবার। সারাদিনে কিছু না খেয়ে হাত পা কাঁপছে, হঠাৎ মনে পরলো শুদ্ধর কথা, ছেলেটাকে খাওয়ানো তো দূরে থাক, খোঁজই নেয়া হয়নি।

তাকিয়ে দেখলো দূরে একটি সোফাতে বসে ফোনে গেমস খেলছে চুপচাপ। প্রেরণা ডাকলো ওকে,“শুদ্ধ কার ফোন ওটা?”

_ইহান আঙ্কেলের!

মৃদু শ্বাস ফেলল প্রেরণা,“খিদে পায়নি বাবা?”

_আমি খেয়েছি মাম্মা।

_কি খেয়েছো?

_লাজানিয়া।

_কে খাইয়ে দিলো?

_ইহান আঙ্কেল!

প্রেরণা চ'ম'কে উঠে ঘুরে তাকায়, ইহান দাঁড়িয়ে ছিলো তার ঠিক পেছনেই। প্রেরণার অমন চমকে ওঠাতে সেও কিছুটা অস্বস্তিতে পরে যায়। কামরার এককোণে একটা টেবিলে বেশ কিছু খাবারের প্যাকেট, ভারী স্বরে সেগুলো প্রেরণাকে দেখিয়ে বলে,“রাত অনেক। সবার জন্য এনেছিলাম। খেয়েছে সবাই। আপনি,মাম্মা,বড় মা আর ইশি বাকি আছেন!”

◻️

“ধর্ষণের চেষ্টা করায় স্ত্রীর সামনেই ধর্ষককে বাইশটা কোপ দিলেন স্বামী । হেফাজতে সাবেক সংসদ সদস্য ইয়াসার মির্জার ভাইপো।”

একটা লোকাল নিউজ পোর্টালের হেডলাইন। কনস্টেবল ফোনের স্ক্রিনে নিউজটা দেখছে আর বারবার ইরফানের দিকে তাকাচ্ছে। যে নির্বিকার হয়ে সেলের মধ্যে তেল চিটচিটে গদিতে বসে আছে। এই সেলে সে একা। পাশেরটাতে কিছু জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের আসামি।

গদির একপাশেই নানা রকমের খাবার। যেগুলো সেভাই পরে আছে। শ্যাম সুন্দর মুখটার কঠিন দৃষ্টি কনস্টেবলের হাতের ফোনে। কনস্টেবল সেলের সামনে দাঁড়িয়েই বলে ওঠে,“একেবারে বাঘের বাচ্চার মতো কাম করছেন ভাই‌‌ । তবে ভাই এতো পরিশ্রম করলেন কেন? বাইশটা কোপ? মরেও তো নি। মাথাটা কাটতেন।”

_ছুড়িটা ভোঁতা ছিলো।
জবাব দিলো ইরফান।

কনস্টেবল হাসছে,“শালার কপাল ভালো আর কি!”

ইরফান আর কথা বাড়ালো না, কিছুক্ষণ ধরেই যেটা চাইছিল সে অকপটে বলে দিলো কনস্টেবলকে,“আপনি একটা কাজ করবেন আমার?”

_আপনাকে এখান থেকে বের করা বাদে সব করতে পারি। খালি টাকা লাগবে।

ইরফান ওর পকেট হাতায়, মনে পরে ওয়ালেট আর কার্ড রেখে দেয়া হয়েছে। চোখ তুলে কনস্টেবলকে বলে,“টাকা কাল পাবেন আমার পাপা এলে।”

_আচ্ছা বলেন। কি কাজ?

_একটা ফোন করবো।

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 98 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন