#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০০
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
উজ্জ্বল ওর গভীর,শান্ত চোখ দু'টো মেয়েটার মুখবিবর নামিয়ে অস্বস্তিতে গলা খাঁকারি দেয়। এধরণের পরিস্থিতিতে সে কখনোই পরেনি, ভীষণ বিব্রতকর মূহুর্ত। শুধু নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণের নিমিত্তে শ্বাস ফেলে ভারিক্কি স্বরে বললো,“দুঃখিত। বিষয়টি আপনি সিক্স দেখলেও ওটা আসলে আমার দিক থেকে নাইন। একটু ঘুরে দাড়ালে বুঝতে পারবেন। তবে মনে হয়না আপনি আমার কথা বিশ্বাস করার পরিস্থিতিতে আছেন, তবুও বলছি, ভরা আদালত, চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আমি বোকামি করেও চাইবো না এতটা ঝুঁকি নিয়ে একটি মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে তার চড় থাপ্পড় খেতে, কারণ আপনারা নারী শক্তিতে বলীয়ান। আসলে আমার তাড়া ছিলো, একটা কেস আছে হাতে। তাই ছুটে ছুটে যাচ্ছিলাম একপ্রকার। সত্যিই দুঃখিত মিস।”
কথাগুলো ধীরে ধীরে বলে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে রইল উজ্জ্বল। শেহা এতক্ষণে লোকটাকে খেয়াল করে ভালো করে, সুদর্শন এই লোকটির চেহারা দেখে তাকে অমায়িক লাগছে, এর কথা বিশ্বাস করে নিতে ইচ্ছে হচ্ছে। ঐ যে কিছু লোক আছে না? যাদের কাছে তরুণী মেয়েরা নিঃসংকোচে গিয়ে বলে,“ভাইয়া একটু হেল্প করবেন?”
ঠিক ততটা ভরসাযোগ্য, সরল লোকটার চেহারা এবং বাচনভঙ্গি। কথাবার্তায় দৃঢ়তা,যেন সে যে স্বচ্ছ এটা সে না প্রমাণ করে এখান থেকে নড়বেই না।
শেহা নিমিষেই আইঢাঁই করে ওঠে, এবার নম্রতা ধারণ করে দৃষ্টিতে, চোখ নামিয়ে নম্রস্বরে বলে,“ইটস ওকে।”
লোকটা তখনও আবার খুবই ঠাণ্ডা স্বরে,হাসিমুখে বলে,“ধন্যবাদ আমাকে বিশ্বাস করার জন্য।”
আর দাঁড়ায় না উজ্জ্বল। লম্বা কদমে হেটে কোর্টের দিকটায় যায়। শেহা দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়, এতক্ষণে দেখলো লোকটার হাতে কালো কোট। চোখ কোটর থেকে বেড়িয়ে আসে শেহার। দৃষ্টি হয় প্রকট,এত সুন্দর, অল্পবয়সী উকিল এই কোর্টে?
ইনশিরাহ এক হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে হাঁটছে দুর্বল পায়ে,ইহান বোনের হাত ধরে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আনছিল, শেহার চঞ্চল দৃষ্টি সেদিকটায় গিয়ে স্থির হতেই ছুটে যায়,“আপু কি হয়েছে?”
ইনশিরাহ বলেনা কিছু, চোখমুখে ক্লান্তির ছটা,যেন বিছানা পেলে এক্ষুনি ঘুমিয়ে পরবে মেয়েটা। ইহান ওদের দু'জনকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বলল,“বাড়িতে গিয়ে ডক্টরকে কল করে নে।”
_অসুবিধা নেই, ছোটো মামী তো বাড়িতেই।
ইনশিরাহ ছটফট করছিলো তখনও,বড় দাদানকে বলল,“আর ইরফান?”
সামান্য হাসে ইহান,গাড়ির জানালা দিয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“ওকে নিয়ে ফিরবো রাতে।”
বিরতির সময় শেষে যখন সবাই আবারও বিচার কক্ষে উপস্থিত হয়েছে তখন একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে, নারী শিক্ষার্থীরা ভেতরে ঢুকে জমায়েত হয়েছে। এবং নীরব, শান্তিপূর্ণ এই অনশন।
________
বাড়ি যেতে যেতে দু'দফা গাড়ি থামিয়ে বমি করেছে ইনশিরাহ। শেহা ওকে নিয়ে যখন পা রাখলো শান্তি নীড়ে তখন নেতানো লতার মতো ঢুলে পরেছে প্রায় মেয়েটা। আলো আর রিতু ধরে ধরে ওকে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো।
ওরা বাড়িতে বসে ইরফানের পথ চেয়ে আছে, মেয়ের মুখের দিকে তাকায়নি ঠিকভাবে কেউই, নয়তোবা আরো আগেই বুঝে যেত আলো। গতকাল থেকে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বেশ অনীহা দেখিয়েছে। কিছুদিন আগে জ্বর থেকে উঠেছে বলে এমন হচ্ছে হয়তো,আলো সেটাই ভেবে নিয়েছে, কিন্তু এখন লক্ষণ ভিন্ন ঠেকছে।
ফ্যাকাশে মুখটায় সামান্য সজীবতা খেলে গেলো আলোর, মেয়ের দিকে ঝুঁকে এলো কিছুটা। মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতেই ইনশিরাহ দুর্বল চোখে তাকায়, গলা কাঁপছে আলোর,অস্ফুটে বলল,“তুমি কি প্রেগন্যান্ট?”
মায়ের হাসিহাসি মুখের এই আবেগী প্রশ্নটা শুনে ইনশিরাহ হকচকাল কিছুটা, নিমিষেই চোখের চাউনী বদলে গিয়ে দ্বিধা খেলা করে যায় সেখানে। প্রেগন্যান্ট? সে প্রেগন্যান্ট?
অবুঝের মতো মা চাচীদের মুখের দিকে তাকাচ্ছে ইনশিরাহ, তাই তোহ! সে আগে কেন বুঝলো না? এতো অবুঝ সে?
পরী ছুটে যায় নিজের ঘরে,একটা কিট নিয়ে এসে ইনশিরাহর হাতে দিয়ে উত্তেজনা চেপে রেখে বলল,“যা দেখে আয়।”
________
প্রণমি যায়নি,ওর স্বাক্ষ্য দেয়া হয়ে গেলেও যায়নি প্রণমি। প্রিতম এসে ওর হাতটা ধরে যখন বলল,“চল তোকে বাড়িতে দিয়ে আসি। আমার এখানে থাকা দরকার।”
প্রণমি যায়নি,সে এখন বসে আছে ভাইয়ের পাশে, একেবারে পেছনের সাড়ির বেঞ্চিতে। মাথা নিচু করে চুপচাপ, ভাইকে অনুরোধ করে পেছনে বসেছে কারণ প্রণমি অনুভব করেছে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লোকটা হয়তো তাকে দেখছে, প্রণমি চোখে না দেখেও সেটা অনুভব করছে, তার অস্থির লাগছে মানুষটার জন্য, তার চোখে কখনো ভীষণ বিরক্তিকর ছিল,সেই মানুষটার জন্য। সে নিজের এই অস্থিরতা ঐ ধূর্ত মানুষটির থেকে লুকাতে চায়, ধরা পরতে চায়না সে, আপুর ভাষায় বোকামি করতে চায়না সে।
এজলাসে ত্রিপক্ষীয় হট্টগোলের শব্দ আলোড়ন তুলেছে। সকালের থেকে এখন ভিড়টা একটু বেশিই। প্রণমির বুঝতে পারছে না কিছু, আস্তেধীরে মিনমিনে গলায় ভাইকে বলে,“কি হচ্ছে ভাইয়া?”
_জজ দু'জন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কাগজপত্র রেডি করছেন। প্রসিকিউটর বসে আছেন।
_আর উনি?
করবে না করবে না ভেবেও প্রণমি করে ফেলল প্রশ্নটা। প্রিতম হালকা গলায় জবাব দিলো,“দাড়িয়ে আছে চুপচাপ।”
দীর্ঘসময়ের আলোচনা শেষে সিনিয়র বিচারপতি নিজেই এজলাসের চাপা গুঞ্জন থামালেন। এতক্ষণের শান্তশিষ্ট উজ্জ্বল মাহমুদ হঠাৎ করে ছটফটিয়ে উঠে দাঁড়ায়, উঠেই দৃষ্টি রাখে সিনিয়র মির্জাদের মুখের দিকে, আজ এতো গুলো মানুষ তার মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে উদ্বিগ্নতা নিয়ে। উজ্জ্বল চোখ দিয়ে তাদের আশ্বস্ত করলো,“সব ভালো হবে!”
বিচারপতি মোর্শেদুর রহমান তার মোটা গোঁফ চুলকে কাগজপত্র গুলো আরো একবার ঝালিয়ে নিলেন। লোকটার স্বাস্থ্য ভারী, কন্ঠস্বর ফ্যাশফ্যাশে। এজলাসের সব লোকের দিকে তাকিয়ে তিনি তাদের মনোযোগ কেড়ে তার ঐ ফ্যাশফ্যাশে গলায়ই উচ্চারণ করতে লাগলেন,“আপনারা সবাই চুপ করুন। আমাকে বলতে দিন।
এই কেসের অন্যতম প্রধান সাক্ষী মিসেস প্রণমি আহসানের সাক্ষ্য এবং সকল ফরেন্সিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখে, সেসবের সত্যতা যাচাই করে এবং বাংলাদেশ বর্তমান দণ্ডবিধির চতুর্থ অধ্যায়ে “রাইট অব সেল্ফ ডিফেন্স উপ-শিরোনামের ধারা ১০০ এবং ১০৩ পর্যালোচনা করার পরে আদালত নিখুঁতভাবে বিবেচনা করেছে, এবং এই কেসের আসামি ইরফান মির্জা কর্তৃক সংগঠিত ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলো না। একই সাথে আদালত ওনার স্থায়ী জামিন মঞ্জুর করলো। এই মামলা এখানেই সমাপ্ত।”
ইরফান বোকার মতো মোর্শেদুর রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে, মুহূর্ত যায়, তার চেহারা থেকে বোকা বোকা ভাব সরে গিয়ে ওই পেট মোটা,পটকা মাছের মতো দেখতে, হাঁসের মতো ফ্যাশফ্যাশে গলার মানুষটার প্রতি নিদারুণ মুগ্ধতা এসে ভিড় করে। ইরফানের ইচ্ছে হলো এক্ষুনি গিয়ে লোকটাকে কোলে নিয়ে কতক্ষন নাচানাচি করতে।
ইলহাম মির্জা বুকে হাত রেখে কেঁদেই ফেলল আজ। এতক্ষণ এতটা অসহায় বোধ করছিলেন তিনি,এই অনুভূতি কাউকে বোঝাবার নয়। সামিন আর ইশমাম দু'পাশে থেকে আগলায় ভাইকে।
উজ্জ্বল মাহমুদ হাসিমুখে এগিয়ে যায় বিচারকের কাছে,গিয়ে একটা কাগজ নিয়ে এসে হাসতে হাসতেই সই করিয়ে নেয় ইরফানের থেকে। ইরফান এতক্ষণে মনোযোগী হলো উজ্জ্বলের প্রতি, শ্যামলাটে মুখটায় আনাচে কানাচে অপ্রস্তুত ভাব, তখন ওভাবে সিনক্রিয়েট করে সে লজ্জিত। কম্পিত হাতে কাগজটাতে সাইন করে নম্রস্বরে বলল,“আ'ম স্যরি!”
হাসলো উজ্জ্বল,তবে বলল না কিছুই। মির্জা বাড়ির লোকগুলো তাকেই দেখছে, একটা লোক কিছুক্ষণ পর পর এতো সুন্দর করে হাসি দেয় কিভাবে! উজ্জ্বল আরেকটু এগিয়ে যায় ইরফানের দিকে,ওর হাত থেকে কাগজটা নিতে নিতে হালকা গলায় বলল,“মুক্ত বাতাসের স্বাদ বড়ই আশ্চর্য তাইনা? যাও গিয়ে এবার বৌকে মন ভরে ভালোবাসো!”
ইরফান নামিয়ে নেয় চোখ, ছটফটে ভাব ওর অঙ্গভঙ্গিতে ফুটে ওঠে স্পষ্ট,না চাইতেও ওর দৃষ্টি চলে যায় তাকে খুঁজতে, জ্ঞানী আপার আদরের বোনকে, ইরফান দেখেছে সে থেকে গিয়েছে তার জন্য। অতটুকু মেয়েটা চোখে মুখে নিদারুণ দৃঢ়তা ফুটিয়ে তুলে অকপটে কথা বলেছিল আজ, আর এতক্ষণ সেই মেয়েটা এখানেই ছিলো। এখন নেই কেন?
চঞ্চল দৃষ্টি কক্ষের আনাচে কানাচে ওর, বুকের মধ্যে কেমন ছটফটে অনুভূতি। এখানেই তো ছিল মেয়েটা,এখন তবে নেই কেন?
প্রণমি বেড়িয়েছে কিছুক্ষণ আগেই, ভাইয়ের হাত ধরে,ভাইকে তাড়া দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়েছে, ক্যাবে উঠেই অবাক চোখে প্রিতম বোনকে দেখে,বিস্ময়সূচক কন্ঠে বলে,“এমন ছটফট করছিস কেন? শরীর খারাপ লাগছে? এভাবে চলে আসতে চাইলি যে?”
দু'পাশে ঘন ঘন মাথা নেড়ে প্রণমি নিচুগলায় বললো,“আমার যা জানার জানা হয়েছে তাই চলে এসেছি। এবার বাড়ি চলো।”
_বাড়ি? অ্যাপার্টমেন্টে?
_হ্যা! তো কোথায় যাবো আমি?
_ওখানে যাবি তুই? না মানে,ঐ পরিবেশে। আপু বলছিলো তোকে আমার শশুর বাড়িতে নিয়ে রাখতে একদিনের জন্য,আমি আমার অফিসের পাশে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে....
ভাইকে তৎক্ষণাৎ থামিয়ে দেয় প্রণো,
_কেন? ঐ পরিবেশে যাবো না কেন আমি? ওটা ঐ রাদিফদের অ্যাপার্টমেন্ট বলে? ভাইয়া, আপু ঐ ফ্ল্যাটের মালিক। আমি অবশ্যই যাবো, আর রাদিফ তো ঐ একজন নয় এই দুনিয়ায়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বহু রাদিফ আছে, হয়তো আবার কখনো আসবে কেউ না কেউ। আমি ক'টা ফ্ল্যাট পাল্টে বাঁচব? আই হ্যাভ টু ফাইট! আর কথায় কথায় তুমি আপুকে ছেড়ে আলাদা হবার কথা ভাববে না তো আমাকে নিয়ে! আমি কখনো কোথাও যাবোনা আপুকে ছেড়ে।
চমকে ওঠে প্রিতম বোনের কন্ঠের তেজ দেখে,কিছু মুহূর্ত বোনের নিষ্পাপ মুখটার দিকে চেয়ে দেখে ওকে আগলে নেয় প্রিতম পরম স্নেহে, টের পায় এখন প্রণমি কাঁদছে, নিশ্চুপ কাঁদছে, একটু পরপর তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে, প্রিতম বললো,“কোথাও যাবি না?”
_নাহ।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েই জবাব দেয় প্রণমি।
________
মুহুর্মুহু কাঁপছে গোটা শরীরটা, ইনশিরাহ বহু কষ্টে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাকিয়ে আছে বেসিনের ওপর রাখা কিটটায়, গাঢ় লাল দু'টো দাগ সেই সাথে পাশে ক্ষুদ্র মনিটরে ভেসে ওঠা “পজেটিভ”লেখাটা। ইনশিরাহ কম্পিত হাতে ওয়াশরুমের দরজা খুলে দিতেই ওর মা ও চাচীরা উঁকি দিলো। মেয়ের রক্তশূন্য মুখটা দেখে আলো ওকে টেনে বাইরে আনতেই মাকে জরিয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে উঠলো ইনশিরাহ। আলো ঘাবড়ায়, কাঁপা স্বরে বলে,“নেগেটিভ এসেছে? তোমরা কি প্ল্যান করেছিলে? মন খারাপ করো না, আল্লাহর ইচ্ছেতেই হয় এসব। বিয়ে হয়েছে মাত্র ক'দিন হলো।”
পরী ওয়াশ রুমে ঢুকে কিটটা দেখে উত্তেজিত হয়ে বলে,“ও ভাবী, পজিটিভ তো!”
আলো চোখ বড় বড় করে মেয়েকে দেখে,দেখে মেয়ের কান্না, মৃদু ধমকে বলে,“বোকা মেয়ে কাঁদছিস কেন তবে? চাসনি তুই? খুশি নোস?”
দুর্বল ভঙ্গিতে দু'পাশে মাথা ঝাঁকায় ইনশিরাহ, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“আমি খুশি। আমি ভীষণ খুশি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না আমি কাঁদছি কেন। আমি কি পাগল হলাম মাম্মা?”
এই বিষাদের মুহুর্তেও এতো বড় মেয়ের অবুঝপনা দেখে হাসে আলো, সে বোঝে এসব, প্রথম যখন ইনশিরাহ পেটে এসেছিল তার কি অবস্থাই না হয়েছিলো নার্ভাসনেসে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,“মুঈন কে কল করবো? ওর সাথে কথা বলবি?”
_ও ব্যস্ত মাম্মা, এই খবরটা এখন দিলে ও ছটফট করতে করতেই শেষ হয়ে যাবে। কাল আসবে সকালে ছুটি নিয়ে, কাল বলবো, এখন বলা যাবে না, কিছুতেই না।
ঠিক সে মুহূর্তে ওরা আরও একটি খুশির খবর পেলো,শেহা আসলো ছুটতে ছুটতে, চোখ কাপছে তার, খুশিতে হয়তো কেঁদেই দেবে এমন অবস্থা, এসেই রিতুকে ধরে লাফাতে শুরু করলো,“রাগী মির্জা খালাস পেয়েছে মামী!”
________
করিডোর হয়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে হাঁটছে ইরফান,ওর পাশাপাশি ইহান। দুই ভাইয়ের কেউ কোনো কথা বলছে না, ওরা এখনও কোর্টে। উজ্জ্বলের জন্য অপেক্ষা করছে ইরফান। ভালোভাবে ধন্যবাদ বলাটা তার কর্তব্য তাই।
সামিনদের তিন ভাইকে জোর করে পাঠিয়ে দিয়ে ওরা দুই ভাই থেকে গিয়েছে। থানায় যেতে হয়নি,এখান থেকেই বেরুতে পারবে তারা।
অন্য এক ক্লায়েন্টের সাথে আলাপ শেষ করে ফুরফুরে মেজাজে উজ্জ্বল এগোচ্ছিল ওদের দেখে, মুখটাতে বরাবরের অমায়িক ভাব। ইরফান দাঁড়ায়, চেহারা থেকে অস্বস্তি সরছে না তার, বিনয়ী স্বরে বলল,“থ্যাংক ইউ। অ্যান্ড স্যরি!”
উজ্জ্বল হাসল,“সত্যি বলছি,রেগে নেই। আচ্ছা কিভাবে বিশ্বাস করাতে পারি আমি আপনাদের যে আমি রেগে নেই? এক কাপ চা খেলে মানবেন?”
উজ্জ্বলের থেকে সংক্রমিত হয়ে ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে পরে ইরফানের,মাথা নেড়ে বলে,“চলুন।”
চত্বরের ভেতরের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে ওরা, আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে দেখতে পেলো বিচারপতি মোর্শেদুর রহমানের গাড়ি এগিয়ে আসছে, ইরফান ঘাড় বাঁকিয়ে দেখেছে যখন,গাড়িটা ততক্ষণে বেশ এগিয়ে গিয়েছে সামনে, লুকিং মিররে মোর্শেদুর রহমানের ফোলা ফোলা পটকা মাছের মতন মুখটা চোখে পরতেই পাগলাটে ইরফান চায়ের কাপ হাতেই চেঁচায়,আনন্দে এবং উত্তেজনায়,“ওয় জজ চাচা! যাস্ট লাভ ইউ। সামনে আমার বিয়েতে দাওয়াত দেবো আপনাকে,বড় অনুষ্ঠান হবে, অবশ্য যদি তাকে আবারও তুলে আনতে না হয় তো!”
এতক্ষণে উজ্জ্বল মাহমুদের চেহারার হাসিহাসি ভাব সরে গিয়ে ফ্যাকাশে হলো, সামনে দাঁড়ানো এক ছটফটে ছাব্বিশের যুবককে বড়ই দূর্বোধ্য ঠেকলো তার, এ তো বদ্ধ উন্মাদ! ইহান চায়ের কাপ ফেলে তড়িৎ চেপে ধরলো ভাইয়ের মুখটা, গজরাতে গজরাতে বলল,“ভাই থাম!”
মুক্তি আর সুপ্ত প্রাপ্তির সম্ভাবনার আনন্দে উল্লাসে গোটা সন্ধ্যা ঝুম বৃষ্টিতে দাদানের সাথে বাইকে করে শহর ঘুরেছে ইরফান। আজ ইহানও স্বভাব ছেড়ে বেরিয়ে বড্ড উৎফুল্ল, বাড়িতে ফিরলো ওরা কাক ভেজা হয়ে, রাতে, বাড়ির সকলে লাগাতার কল করেও ধরতে পারেনি দুইভাইকে। ছেলের মুখ দেখবে বলে কত যে অপেক্ষা রিতুর, বাড়িতে ঢুকতেই জরিয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ওঠে, মায়ের কান্না বাধ মানছে না কিছুর। ইরফান মাকে থামানোর চেষ্টা করে না আজ,মাকে কাঁদতে দিয়ে আশেপাশে তাকায়, দেখতে পায় প্রেরণা বসে আছে সোফাতে,তারই দিকে দৃষ্টি দিয়ে, নিরুদ্বেগ ঠান্ডা সরল দৃষ্টি। কিছুক্ষণ আগেই এসেছে প্রেরণা ইরফানের সাথে দেখা করবে বলে। তার দেখা দেয়া উচিৎ তাই।
রিতু ডুকরে কাঁদছে, ইরফান এইবার থামাতে চাইছে মাকে। রিতু থামছেই না উল্টো পাগলামি করে বলছে,“আর কত জালাবি? এবার শুধরোবি বল? কি চাই তোর? ওই মেয়েকে? এনে দেবো,কেউ না আনলে আমি একা গিয়ে এনে দেবো। তবে ভালো হয়ে যাবি? আর অঘটন ঘটাবি? বল? ঐ মেয়েকে পেলেই ঠিক হবি?”
ইরফান মায়ের বাচ্চামো ধরণের কথা শুনে ম্লান হেসে জ্ঞানী আপার দিকে তাকায়। প্রেরণার চোখে মুখে ছেয়ে গিয়েছে রাজ্যের অস্বস্তি। উঠে দাঁড়িয়ে সামান্য হাসার চেষ্টা করে ইরফানকে বলল,“ওয়েলকাম। তোমার সাথেই দেখা করতে এসেছি।”
এটুকু প্রেরণা মন থেকে বলেছে,তাতে ছিলোনা আন্তরিকতা আর স্নেহের খামতি। ইরফান জবাবে হাসল মৃদু, ঘুরে ফিরে বাড়ির সকলকে দেখেই চোখ পরলো ইনশিরাহর দিকে, রক্তশূন্য মুখটার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায় ইরফান,“কি রে? মার খেয়েছিস বরের হাতে? মুখের কি হাল!”
ইনশিরাহ ভাইকে জরিয়ে ধরে কাঁদল। এবং আরও একদফা বাড়ির মেয়েদের নাকি কান্নায় গুমোট হলো বসার ঘর।
রাতে ওরা খেতে বসেছে যখন। ইশি আর শেহা বসেছে দুই ভাইয়ের সাথে। ইনুও এসেছে। আবারও পাঁচ ভাইবোন হাসাহাসি করে যখন খাচ্ছিল,বড়রা প্রফুল্ল চিত্তে রাতের খবর দেখছিলো। এদিকে আলো উশখুশ করছে, খুশিতে আত্মহারা সে ভেতরে ভেতরে, মেয়ের খবরটা কখন দেবে সবাইকে সে নিয়ে তার যত উৎকণ্ঠা, ইশি মানা করে দিয়েছে তাদের,আগে মুঈন জানবে তারপর বাকিরা। তাই কিছু বলতে পারছিলো না সে।
এর মাঝে খেতে খেতেই মাছের ঘ্রাণে ফের সব কিছু পেটের ভেতর উলটে আসে ইনশিরাহর। টেবিল ছেড়ে দৌড়ে ছুটে যায় বেসিনে, হড়হড় করে বমি করে দেয়।
উদ্বিগ্নতা নিয়ে বাকিরাও ছোটে ওর পিছু পিছু। মুখে পানির ঝামটা দিয়ে ইনশিরাহ ঘুরে তাকাতেই ধাক্কার মত খেলো। তার বাবা,চাচা,ভাইয়েরা উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারই দিকে চেয়ে।
ইরফানের মুখ হা হয়ে আছে,“কি ?”
ইনশিরাহ লজ্জা আর সংকোচ লুকায় ভ্রু কুঁচকে,বলে,“কি?”
_উল্টি করছিস কেন? পেটে অসুখ নাকি তোর?
ইনশিরাহ কিছু না বলে মাথা নিচু করে দোতলায় ওঠে। সামিন অনিমেষে চেয়ে আছে মেয়ের প্রস্থানের দিকে,সারাদিনে মেয়েটার খবরটাও নেয়নি সে। এতক্ষণে খেয়াল হতেই সে তাকায় আলোর মুখের দিকে, আলো আর লুকাতে পারলো না কিছু, চোখ নামিয়ে নেয় লজ্জায়,লজ্জা সে নানী হবে তাই।
সামিনের মুখটা থমথমে,মানে? সত্যিই? বিস্ময়াভিভূত হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নিশ্চুপ। বুকে অদ্ভুত রকমের আবেগ এসে আইঢাঁই করছে। ঐ অতটুকু মেয়ে, খামখেয়ালি আর জেদী মেয়েটা তার মা হবে? কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য!
শুধু সামিনের থেকেই নয়,আলো পারলো না কারো চোখ এড়াতে। ঝক্কির দিনের শেষটায় এসে এই বিস্ময়কর শুভ সংবাদের ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত সবাই। কথা বলবে কি! ইনশিরাহর চাচা ভাইদের মুখটাও ঠিক থমথমে সামিনের মতো।
নীরবতা ভাঙলো ইহান, বোকা বোকা মুখ করে বড় মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,“আমার কি করা উচিত বড় মা? মিষ্টি আনা উচিত?”
হাসছে মেয়েগুলো, খিলখিল করে। ইরফান আর দাঁড়ালো না, চঞ্চল পায়ে দৌড়াতে দৌড়াতে দোতলায় উঠলো, ততক্ষণে ইশি দোর লাগিয়েছে,সে বুঝেছে মাম্মা আর চেপে রাখতে পারবে না খবরটা তাই।
দরজায় কড়াঘাত করে উঠলো ইরফান, উচ্ছ্বসিত কন্ঠে চেচালো,“এই ইশি! ছোটো ভাই দরজা খোল!”
ওপাশে মুখ চেপে হাসছে ইনশিরাহ। ইরফান বলতে থাকে,“আরে বের হ! তোকে একটু দেখি! মাই গড! করেছিস টা কি তুই!”
হাসতে হাসতেই চেতে ওঠে ইনশিরাহ,“যা ফাজিল এখান থেকে!”
বিছানার ওপরে সারাদিন অযত্নে ফোনটা তখন বেজে ওঠে, অনুভূতি সামলে ইনশিরাহ কাঁপা হাতে তুলে নেয় ফোনটা, জ্বলজ্বলে স্ক্রিনে লেখা,“ফরাজী।”
চলমান......
এটা পারিবারিক মেলো-ড্রামা টাইপের গল্প,তাই লিখতে গেলে সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে লিখতে হয় নয়তো খাপছাড়া লাগে,আর তাই বড় হচ্ছে,মনে হচ্ছে স্লো।
আচ্ছা পাঠকেরা, এবার বলুন, সামনে কার বিয়ে খাবেন? ইরফান নাকি শেহার? অনেক স্যাড স্যাড ঝামেলার পর্ব দিয়েছি, ১০১ পর্ব থেকে এখন শুধুই হ্যাপি হ্যাপি পর্ব দেবো।
তবে হ্যা,ইহান-প্রেরণা জুটির সমীকরণ এখনও ঢের দেরী এটা বুঝে নিন।
হ্যাপি রিডিং 💕