#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০১
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
ঘুম নামেনি ইনশিরাহর চোখে। নিদারুণ অসহ্যকর ছটফটানি নিয়ে চিৎ হয়ে আছে বিছানায়। মোবাইলটা আর বাজছে না তার,বিগত এক ঘন্টা লাগাতার বেজে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে ফোনটা। ঘরের বাইরে আনন্দ উল্লাসের শব্দ থেমেছে, ক্লান্ত হয়ে ঘরে ঢুকেছে সবাই বুঝতে পারলো সে। লজ্জা রাঙ্গা মুখটায় ছেয়ে আছে চওড়া হাসি। কম্পিত, পেল্লব হাত দিয়ে বড় আদরে ছুয়ে দিলো হবু অতিথিকে। এই অনুভূতি একা সামলানো যায়? কে জানতো হিসেব করে চলা নাক উঁচু মেয়েটা এতটা নাজুক হয়ে পরবে নিজের অনুভূতি নিয়ে। এসপি আর কল করেনি, আধাঘণ্টা হয়েছে। ইনশিরাহ হাসে দুষ্টু হাসি, পাঁচদিন আগেও ঝগড়া হয়েছে ইনশিরাহকে সময় কম দেয় সেই ব্যাপারটি নিয়ে, আজ কেমন লাগছে এসপির? যাকেই কল করছে সে-ই বলে দিচ্ছে ইনশিরাহ আশেপাশে নেই, কাল সকালে যখন উত্তপ্ত মেজাজটা নিয়ে আসবে, ইনশিরাহ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন বলবে কারো আগমনের খবর তখন দেখবে কেমন হয়?
সামিন বিছানায় শুতে গিয়েও শু'লো না,ওকে আমতা আমতা করতে দেখে আলোর প্রশ্ন,“কি হয়েছে?”
_মেয়েকে একটু গরম দুধ খাইয়ে দিয়ে আসবে? তখন যে কিছু খেলো না।
আলো হাসে চিন্তিত মানুষটাকে দেখে, তারপর বলে,“তো আপনি খাইয়ে দিয়ে আসুন না! তখন থেকে থম মেরে বসে আছেন।”
_আমার যে লজ্জা লাগে!
উঠে বসলো আলো,প্রকট দৃষ্টি দিয়ে কিছুপল তাকিয়ে থেকে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে,“হ্যা! আপনার মেয়ের সামনে যেতে লজ্জা লাগছে, মেয়ের আপনার সামনে আসতে লজ্জা লাগছে! আপনারা বাবা-মেয়ে মুখ দেখাদেখিই বন্ধ করে দিন। আশ্চর্য!”
উশখুশ করছে সামিন। কাত হয়ে শুয়ে পরতে পরতে আলো আবারও বলে,“দুধটা গরম করে নিয়ে মেয়েকে খাইয়ে দিয়ে আসেন। আশ্চর্য!”
________
অপটু হাতে চুল বাধছিল প্রণমি। প্রেরণা আর প্রিতম এসে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,“আসব?”
প্রণমি উঠে দাঁড়ায়। মুখটা থমথমে হয়ে আছে। প্রেরণা বোনকে খুব ভালো করে লক্ষ্য করে বলল,“কোর্ট থেকে ফেরার পর থেকে এমন হয়ে আছিস কেন?”
_কেমন হয়ে আছি?
_কিছু চলছে তোর মধ্যে। ছটফট করছিস।
প্রণমি সামান্য হাসে,প্রিতম বলে ওঠে,“দেখ তুই অস্বাভাবিক আচরণ করছিস।”
_আশ্চর্য আমি স্বাভাবিক আচরণ করছি দেখে সেটা অস্বাভাবিক আচরণ হয়ে গেলো? আচ্ছা যদি ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁদি তাহলে ঠিক হবে? তবে বের হও, কাঁদি কিছুক্ষণ।
এবারও কথাটা হাসতে হাসতে বলে প্রণমি। প্রেরণা আর প্রিতম একজন আরেকজনকে চোখ দিয়ে ইশারা করে বলল,“একটু সময় প্রয়োজন মেয়েটার ঠিক হতে।”
ওরা ঘর থেকে বেরুবে বুঝতে পেরে প্রণমি আইঢাঁই করে উঠলো হঠাৎ,গলা কাঁপল তার ডাকতে গিয়ে,“আপু। ভাইয়া!”
প্রেরণা,প্রিতম দাঁড়িয়ে পরলো।
“বলবি কিছু?”
মুখের ভঙ্গিমা পুরোটাই পাল্টে যায় প্রণমির, রাজ্যের উতলা ভাব এসে ভিড় করে সেখানে,এবারও গলা কাপে তার,বলে ওঠে,“দু-তিন দিন গেলে ওনার সাথে ডিভোর্সটা করিয়ে দেবে প্লিজ? আমি একটু তাড়াতাড়ি চাচ্ছি এটা হোক!”
_______
এবার বোধহয় ফরাজী ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে,আর কল আসেনি ফোনে। ইনশিরাহ কিছুক্ষণ আনমনে হেঁসে উঠে বসে। ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে এগারোটার কাছে। দরজায় কড়া ঘাত পরতেই ইশি গিয়ে দরজা খুলে দেখলো সামিন দাঁড়িয়ে আছে,হাতে একটা দুধের গ্লাস।
চুপচাপ ভেতরে ঢুকলো সামিন,ইশি পাপার থেকে চোখ নামিয়ে নিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আবারও চোখ তুলে দেখলো পাপাকে পরপর বললো,“তুমি কি কিছু চুরি করেছো পাপা?”
_না তো।
থমথমে গলায় জবাব দিলো সামিন।
_তবে মুখটা এমন কেন?
চোখ মুখ থেকে সংকোচ ভাব সরিয়ে দুধের গ্লাসটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে সামিন বলল,“মাম্মা পাঠিয়েছে তোমার।”
দু চোখে পানি এলো ইনশিরাহর, এতো বড় যে,কাদলো না পাপার সামনে, কাঁপা গলায় বলল,“মাম্মা পাঠিয়েছে?”
_হুম।
_আমি দুধ খাইনা।
সামিন তবুও গ্লাসটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইনশিরাহর মনে পরে যায় ছোটো বেলার সেই নাছোড়বান্দা বান্দা বাবাকে,দুধ না খাওয়া অবধি গ্লাস নিয়ে পেছনে পেছনে দৌড়ানো লোকটাকে। আর বেশি পরিশ্রম করালো না পাপাকে, চুপচাপ গ্লাসটা নিয়ে নাক চেপে দুধটা খেয়ে নেয় ঢকঢক করে। সামিন এতক্ষণে সংকোচ কাটিয়ে নিচুগলায় একেবারে মিনমিন করে বলল,“তুমি থেকে যেও আম্মা। মুঈনকে বলো,আমরা তোমার খুব ভালো খেয়াল রাখতে পারবো।”
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না ইনশিরাহ, দুর্বল শরীরে ঝাঁপিয়ে পরলো পাপার বুকে, হুহু করে কেঁদে উঠলো,“এটা কোনো কথা পাপা? তোমার মেয়েকে তুমি রাখবে এতে এতো সাফাই দিয়ে রাখতে হবে? মেয়েকে ভিক্ষা চাইছো নাকি?”
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সামিন,“না। বিয়ে হয়ে গিয়েছে না? নাউ,ইউ বিলং টু হিম ফার্স্ট!”
_নো,আই বিলং টু বোথ অফ ইউ অ্যাট দ্য সেইম টাইম!
বড় বড় শ্বাস ফেলে সামিন হাসে সামান্য,মেয়েকে বুক থেকে সরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলে,“ঘুমিয়ে পরো। বেশি রাত জেগো না।”
বেশি রাত জাগবে না ইনশিরাহ,এখন থেকে তাকে নিজেকে একটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলতে হবে। পাপা চলে যেতেই বিছানায় গা এলিয়ে দু'চোখ বুজলো সে,ঠিক তখুনি ফোনটা আবারও বেজে উঠল,মুঈনের ফোন। এবার বেশ মায়া হলো ইনশিরাহর মানুষটার জন্য, সে একটু বাড়াবাড়ি করছে না? কলটা ধরলো ভেবেচিন্তে, ওপাশ থেকে স্পষ্ট ভেসে এলো মানুষটার নিঃশ্বাসের শব্দ। হাপাচ্ছে মুঈন। ইশি কিছু বলতে যাবে তখুনি গমগমে স্বরে মানুষটা বলে উঠলো,“দাড়োয়ান গেট খুলে দিয়েছে। দরজাটা তোমার খুলতে হবে।”
ধড়পড়িয়ে উঠে বসলো সে, তব্দা খাওয়া মুখটা নিয়ে ছুটতে ছুটতে নামছে সিঁড়ি বেয়ে, অন্দরে উৎকণ্ঠা, লোকটা এলো, এই এতো রাতে? ইনশিরাহ সকাল থেকে ফোন ধরেনি বলে? ছয় ঘণ্টায় উড়ে এলো!
ওর গাঁয়ের সাথে ধাক্কা লেগে সিঁড়ির মধ্যভাগে রাখা বিশালাকার পেতলের ফুলদানিটা ঝপাং করে পরলো,বেশ জোরালো আওয়াজ হলো ঘর কাঁপিয়ে। ইনশিরাহ না দাঁড়িয়ে ছুটে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, উদ্ভ্রান্ত লাগছে মানুষটাকে।
মুঈনের মুখভঙ্গি শান্ত, ভাবলেশহীন হয়ে ইনশিরাহকে পা মাথা দেখছে। অতি উত্তেজনায় ইনশিরাহ কাঁপছে ঠকঠক করে, এখুনি বলবে? এখুনি বলে দেবে নাকি?
এদিকে ফুলদানি ভাঙার শব্দে সামিন-আলো, ইহান, ইরফান,বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। সামিনের মুখ থমথমে। গত ক'দিন ধরে খুব রহস্যজনক কল আসছে, মন তার সারাদিন কু-ডাকে, বাড়িতে ডাকাত পরেছে নাকি?
ইহানের দিকে তাকিয়ে বলল,“সাবধানে নাম। সেইফটি ফার্স্ট।”
ইরফান গা ছাড়া ভঙ্গিতে হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে,“ডাকাত আসার সাহস করবে না। ছিঁচকে চোর টোর হবে। গেলেই বুঝবো।”
ইহান ঠিকই এলো তার রিভলবার নিয়ে,পেছন থেকে ইরফানের কলার টেনে ধরে নিজের পেছনে নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে নামছে সে। ইহানের পেছনে সামিন,তার পেছনে চোখ ডলতে ডলতে নামছে আলো,তার পেছনে ইলহাম,ইশমাম এক এক করে সবাই উঠেছে। আলো আর রিতু নামতে নামতে দু'টো ছুড়িও হাতে নিলো কারন সেইফটি ফার্স্ট!
ঠিক সিঁড়ির মধ্যবর্তী স্থানে এসে দাঁড়িয়ে পরলো সকলে, শুরুতে ছিলো ইহান, বিমূঢ় দৃষ্টিতে দেখছে ইনশিরাহ কতটা শক্ত করে মুঈনকে জরিয়ে ধরে রেখেছে। মুঈনের মুখ থমথমে। তৎক্ষণাৎ থমথমে হয়ে গেলো বাড়ির বড়দের মুখ, তবে উচ্চশব্দে হেসে উঠলো ইরফান, তার হাসি থামছেই না, চেঁচিয়ে বলে ওঠে,“বড় বাবা এতো পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ডাকাত। কি ভয়ংকর।”
মুঈনকে ছেড়ে লাফিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায় ইনশিরাহ। বাড়ির বড়রা পরেছে বিপদে, কি একটা বিব্রতকর ব্যাপার! এখন তারা মুখ বাঁচাতে দোতলায় উঠবে নাকি জামাইকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাবে বুঝতে পারছে না।
আলো, রিতু দ্রুত নামে মেয়ে জামাইকে দেখে, আলো হাতে ছুড়ি নিয়েই এগিয়ে যায়, উত্তেজনায় সে হাত থেকে ফেলতে ভুলে গিয়েছে, জামাইকে বলল,“আসতে অসুবিধা হয়নি তো?”
মুঈন উত্তর দেবে কি সে শাশুড়ির হাতের ছুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে বিমূঢ় হয়ে,ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে আলো লজ্জা পেয়ে তৎক্ষণাৎ হাত থেকে ছুড়ি ফেলে দিয়ে বলে,“স্যরি বাবা!”
মুঈন দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে বাড়ির সকলকে, তার বৌ যেমন তার ধৈর্য্য নিয়ে খেলে ঠিক তার শশুর বাড়ীর লোকেরাও।
মুঈন এগিয়ে গিয়ে সবার সাথে টুকটাক কথা বলল, ইরফানের সাথে কথা বলল, ইনশিরাহ দেখছে মানুষটাকে, খুব যে রেগেছে সেটা বলাই বাহুল্য।
রিতু তৎপর হয়,মুঈনকে বলে,“নিশ্চয়ই কিছু খাওনি। যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো, আমরা সবাই নিচে আছি।”
মুঈন চাচী শাশুড়ির কথায় চুপচাপ মাথা নেড়ে ওপরে উঠতেই সামিন অবিশ্বাসের নজরে মেয়েকে দেখে বলল,“করেছো কি তুমি? রেগে আছে কেন?”
_আমি কি জানি?
ইনশিরাহ গা ছাড়া ভঙ্গিতে জবাব দিয়ে হাসি চেপে রেখে দুলতে দুলতে দোতলায় উঠলো। চঞ্চল পায়ে রুমের দরজায় পা রাখার সাথে সাথে মুঈন ওর হাতের কব্জি চেপে ধরে টেনে নিলো ভেতরে।
“আস্তে এসপি!”
ইনশিরাহ ছটফটিয়ে ওঠে।
_কি আস্তে? তুমি আমাকে কি পেয়েছো বলো? আমি তো মানুষ নই। আমাকে তুমি এক্সাক্টলি কি ভেবে বসে আছো বলো? শোধ নিচ্ছো?
ওর ধমকে উল্টো হাসি আসে ইনশিরাহর, খিলখিলিয়ে হাসছে, মুঈন হচ্ছে বিরক্ত,ধমকে বলে,“এখন হাসি না থামালে আমি এখনই বেরিয়ে যাবো ঘর থেকে। এখনই।”
_কোথায় যাবে?
_যাওয়ার তো যায়গা নেই আমার! রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো।
ইনশিরাহ হকচকাল,সে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করেছে, রাগ ভাঙাতে মুঈনের দুগালে আদুরে হাত রাখলো। ওর হাত দুটো সরিয়ে দিলো মুঈন রেগে মেগে, ইনশিরাহ আবারও হাত রাখতে রাখতে বলল,“আমি কিন্তু অনেক সুন্দর করে রাগ ভাঙাতে শিখে গিয়েছি।”
_আমাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হচ্ছে? সেদিন এতো তেজ দেখালে,বললে আমি তোমায় সময় দিই না, আমি ইচ্ছে করে করি। আর এই ক্রুসিয়াল মোমেন্টে তুমি কি করেছো? তুমি ইচ্ছে করে করেছো তাইনা? ইনশিরাহ বিয়ে শোধ বোধ খেলা নয় এবং বিয়ে শোধ নেওয়ারও খেলা নয়, বোঝো তুমি!
হাসে ইনশিরাহ,
_আরে বাবা সত্যিই ব্যস্ত ছিলাম।
_আমার থেকেও ব্যস্ততা বড় হয়ে গেলো?
_হুম হয়ে গেলো।
_কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলে তুমি?
_কি নিয়ে নয়,বলো কাকে নিয়ে।
_কাকে নিয়ে?
ইনশিরাহর চোখের দৃষ্টি পাল্টে যায় মুহুর্তেই, সেখানে এসে ভিড় করে যত রাজ্যের লজ্জা। মুঈন তাকিয়ে আছে অবাক চোখে, ইনশিরাহ ওর হাতটা ধরলো ধীরে ধীরে তার আলতো হাতে, এবং ধীরে ধীরেই ওটা তার পেটে রাখলো, কাঁপছে ইনশিরাহ, গলার স্বর পাল্টে গিয়েছে নিমিষেই, স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে,“ওকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম ফরাজী, আজ খুব জ্বালিয়েছে জানো!”
মুঈন তাকিয়ে আছে, হতবিহ্বল হয়ে, ধীরে ধীরে তার বিস্মিত চোখ দু'টো নিজের হাত দেখে,যে হাত ইনশিরাহর পেট ছুঁয়েছে। সেকেন্ডে মুঈন ঢোক গেলে,অক্ষিপল্লব প্রশস্ত করে তাকিয়ে থাকে ইনশিরাহর পেটের দিকে। ইনশিরাহ বলে না কিছু, তাকিয়ে আছে, তার চোখে মুখে উপচে পরছে খুশি, চোখ দিয়েই এসপিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এই খুশি ভাগ করে নিতে।
মুঈন দীর্ঘক্ষণ কিছু বলে না, শুধু ধীরে ধীরে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে ইনশিরাহর পেটের সাথে গাল চেপে রাখে, ইশির কম্পিত হাত ওর চুলে বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,“এতো ব্যস্ত রেখেছে আমায়, একটিবার তোমার কথা মনে করতে দেয়নি। তুমি আবার হিংসা করো না, কেমন?”
মুঈন হাশফাশ করে ওঠে, পরক্ষনেই থিতু হয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে নরম গলায় বলে,“আমি তো সেবার এমনি বলেছিলাম। তুমি সিরিয়াসলি নিয়ে নিলে? ইশি তোমার মত ছিলো তো? তুমি তৈরি ছিলে তো? ইশি আমি ইমোশনাল হয়ে বলেছিলাম বাচ্চার কথা,তোমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে পেতে চাইনি।”
চোখ বেয়ে ফোটায় ফোটায় পানি ঝরছে ইনশিরাহর, লোকটা এতো মায়া কেন করে তাকে? কেন? ধীরে ধীরে ইনশিরাহও বসলো মেঝেতে মুঈনের মুখোমুখি,চোখের পানি মোছে না আর, স্বামীর দু'গাল ধরেই কান্নাভেজা কন্ঠে বলে ওঠে,“প্রস্তুত ছিলাম না এসপি, আমার এখন মনে হয়না মা হতে কোনো প্রস্তুতি লাগে!”
বাড়ির লোক উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছে নিচতলায়, ভেবেছে হয়তো ইনশিরাহ মুঈন ঝগড়া করছে কিছু নিয়ে। এর মাঝে ইরফান উঠতে চাইলে ইহান থামিয়ে দেয়,“খবরদার তুই যাবি না! তোর মুখ ঠিক নেই, দেখা যাবে বুঝিয়ে কথা বলতে গিয়ে মুঈনকে উল্টো খেপিয়ে দিয়েছিস! জামাই মানুষ! একটু ইগো থাকবে না?”
ইরফান শুনলো না, সবার কথায় ঘাড়টা বাঁকা রাখার খুব শখ যে তার। লম্বা কদমে উঠলো দোতলায়, দাঁড়ায় গিয়ে ইনশিরাহর ঘরের সামনে। দরজাটা হাট করে খোলা, খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ভেতরকার দৃশ্যটা চক্ষু গোচর হতেই পা থামায় ইরফান। ইশি মুঈনকে শক্ত করে ধরে রেখে কাঁদছে, আর মুঈন তার বধূর গালে পরম আবেশে আদর মাখিয়ে দিচ্ছে।
ইরফান তরিৎ ঘুরে হন্তদন্ত হয়ে নামলো নিচে, চোখে মুখে অস্বস্তি ভাব,নিজের বেয়াক্কেলেপনা দেখে সে নিজেই অবাক। ওর থমথমে মুখটা দেখে বড়রা কৌতুহলী দৃষ্টি ফেলতেই মুখচোখ গম্ভীর করে ইরফান বলল,“হু খুব ঝগড়া চলছে ওদের মাঝে, আমি তো ভয় পেয়ে চলে এসেছি! তোমরা আবার কেউ ঝগড়া থামাতে যেও না। নাউ গো অ্যান্ড স্লিপ, যার বৌ তাকে ভাত বেড়ে খাওয়াতে পারবে!”
ইরফানকে আগাগোড়া চেনে শান্তিনীড়ের প্রত্যেকটি লোক, বুঝে যায় ওর কথা আর বাচনভঙ্গি দেখে সবটা। মিটিমিটি হাসতে থাকে প্রত্যেকে।
________
সকালের ঝুম বৃষ্টি দেখেই আলো খিচুড়ি বসিয়েছে। জামাই এসেছে, খিচুড়ির সাথে কালাভুনা করেছে মুঈনের পছন্দ বলে। সকাল বেলা নাস্তার টেবিলে সবাই একযোগে বসেছে। ইনশিরাহ বসেছে তার পাপার পাশে, সবার প্লেটে খিচুড়ি,কালাভুনা আর সালাদ থাকলেও ওর প্লেটে সেসবের সাথে রয়েছে দু'টো সেদ্ধ ডিম,একটা বাটিতে কিছু বাদাম আর এক কাপ দুধ। ওগুলো দেখছে আর আশেপাশে তাকাচ্ছে,সবার মুখে তাকাতেই দেখে সবাই মিটিমিটি হাসছে। নাস্তার টেবিলে ইরফান ছিলো না, মুঈন আশেপাশে তাকিয়ে জানতে চাইলো ওর কথা।
ইলহাম মুখ বিকৃত করলো,“শুধরোবে জীবনে? বাইক নিয়ে বেরিয়েছে। একটু সংকোচ বোধও নেই। আল্লাহ বানিয়েছে এক পিস!”
পরিবারের সবাই যখন উপস্থিত তখন রিতু কথাটা তোলে এইবার, ভাসুরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,“এ ধরণের ছেলেদের রিহ্যাব আর জেল হাজতে লজ্জা আসে না, এতদিনে আমি বুঝেছি ভাইয়া। আমার বড় ছেলের তো কোনো খবর নেই,ওর বিয়ের আশাও আমি ছেড়ে দিয়েছি। আমি ইরফানকে নিয়ে ভাবছি, আপনারা যান, বড় জামাইও এসেছে, ওকে নিয়ে পুরুষেরা সবাই যান প্রেরণার কাছে। প্রস্তাব দিন। নয়তো আমিই যাবো।”
ওর কথাগুলো সবাই খুব মনযোগ দিয়ে শুনছে, মুঈন হঠাৎ বলে,“কিন্তু মেজো আন্টি, প্রণমি রাজি হবে?”
_কেন নয়? দেখলে না কি বেরোলো? ওদের বিয়ে রেজিস্টার হয়েছে। এবং ওর কোনো অধিকার নেই আমার ছেলেকে তালাক দেওয়ার যতক্ষণ না আমার ছেলে দেয়, ওকে আসতে হবে, এসে আমার ছেলের সাথে সংসার করে দেখবে, তারপর যদি মনে হয় তালাক চাই, তবে তালাক। এতো খামখেয়ালিপনা আমি আর মানতে পারছি না আহসান পরিবারের। আমার অসহ্য লাগছে। ঐ মেয়ে পাবে এতো ভালো শশুর বাড়ি? স্যরি তোমরা কিছু মনে করো না তবে ঐ প্রেরণা আর প্রণমি দু'জনের খুব ইগো। গতকাল যখন বাড়িতে এলো যাওয়ার আগে আমি আড়ালে নিয়ে কথা তুললাম, পাত্তাই দিলো না আমাকে?
আলো হাসে,“সেই ইগোওয়ালিকেই তো আবার চাইছিস ছেলের জন্য।”
লম্বা শ্বাস ফেলে রিতু,“না চেয়ে উপায় আছে? আমার ছেলের লাগবে!”
পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক,সামিন কোনো কথা বলছে না দেখে রিতু বলে দেয়,“চুপ করে থাকবেন না। এ ছাড়া সুন্দর আর কিছু হতেই পারেনা এই পরিস্থিতিতে, সেটা আমার ছেলের জন্যও আর ঐ মেয়ের জন্যও। এই কথাটা ঐ মেয়ের দাম্ভিক বড়বোনের মাথায় ঢুকান। অনুরোধ আপনাকে ভাইয়া।”
সামিন ইয়াসার মির্জা তার মেজো ভাইয়ের বৌয়ের অনুরোধ রাখলেন, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি ইলহাম মির্জা আর মুঈনকে নিয়ে প্রথমে যাবেন প্রেরণার কাছে, কথা বলতে। যা হয়েছে সবকিছু ভুলে দু পক্ষ বসে সুন্দর একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
________
প্রিতমের নতুন অফিসেই তার নাম ডাক বেশ, সবচেয়ে গুণী এবং মেধাবী একজন প্রোগ্রামার হিসেবে। আঠারো তলা ভবনের এই বিশালাকার সফটওয়্যার কোম্পানির রিসিপশনে এসেই ইরফান খোঁজ পেয়ে যায় প্রিতমের। তেরো তলায় সাত নাম্বার কেবিনে রিসেপশনিস্ট কল করেই প্রিতমকে বলল,“স্যার কেউ দেখা করতে এসেছে। ইরফান মির্জা নামের।”
অবাক হবার মতো ধীর কন্ঠে প্রিতম বলল,“পাঠিয়ে দিন।”
কেবিনে ঢুকতেই ইরফান দরজা চাপিয়ে দিলো। প্রিতম প্রকট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখেই সে স্মিত হাসলো,“তোকে স্যার বলছে যে!”
_বোস।
ইরফান বসতে গেলে প্রিতম উঠে দাঁড়ায়,হালকা গলায় বলল,“বসিস না,চল স্মোকিং জোনে যাই! সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। ইনুর মেজো দাদান আবার মাইন্ড করবে না তো?”
হেসে ফেলে ইরফান, দু'পাশে মাথা নেড়ে বলে,“চল।”
অফিস অ্যাসিস্ট্যান্টকে দু'টো ড্রিঙ্কসের কথা বলে প্রিতম আর ইরফান স্মোকিং জোনে গিয়ে দাঁড়ায়। রেলিং ধরে বাইরের দিকে দৃষ্টি রাখে প্রিতম, তারপর ফিচেল হেসে পাশে নম্র হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে বলে,“ডোন্ট অ্যাক্ট তুই আমার অফিস দেখতে এসেছিস। এমন বিল্লু বিল্লু ভাবও তোর সাথে যায়না, বি ইরফান মির্জা। ঝেড়ে কাশ।”
ইরফান একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর স্পষ্ট করেই বলে,“আমার আর তোর বোনের বিয়েটা ভাঙার চেষ্টা করিস না। তোর বোনটাকে দে।”
প্রিতম জানতো ইরফান এটাই বলবে,সে দৃষ্টি বাইরের দিকে রেখে চুপ থাকে। এদিকে ইরফান বলতে থাকে,“গতকাল সারারাত ভেবেছি। ট্রাস্ট মি এক ফোঁটাও ঘুমাইনি আমি। তোর বড়বোনের সাথে আমি পারবো না। এখনও খামখেয়ালি করবে কিছু স্টুপিড কথা বলে, প্রস্তাব দিলেই বলবে,“কি ভেবেছো? দয়া করবে আমার বোনকে বিয়ে করে? ওই দয়া চাইনা আমাদের। ব্লা ব্লা ব্লা” আমার হেল্প দরকার তোর প্রিতম।”
আড়চোখে তাকায় প্রিতম,বলে,“শুধু প্রিতম? শা'লা-টালা লাগাবি না আগে পিছে?”
লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান,“দেখ আমি সিরিয়াস মুডে আছি। প্লিজ বোঝ আমাকে এবং হেল্প কর।”
_আমি কেনো তোকে হেল্প করবো আমার বড় বোনের বিরুদ্ধে গিয়ে?
গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলে প্রিতম। এতক্ষণে অধৈর্য হয়ে ওঠে ইরফান,ছটফটে ভাব নিয়ে বলে,“কারন আমি তোর বোনকে ভালো রাখবো!”
_তাই নাকি! এই কথা তো আমিও একদিন বলেছিলাম। বিশ্বাস তো করলি না,উল্টো মারলি!
_সব বুঝেই শোধ নিচ্ছিস?
_হু।
ইরফান শক্ত চোখে তাকিয়ে আছে,প্রিতম হাসছে। ওর হাসি ইরফানের গা জ্বালানো। কিছুক্ষণ হেসে হাসি থামিয়ে প্রিতম বলে উঠলো,“বোন চাই আমার?”
_হু।
ইরফান জবাব দিলো।
_ভালো রাখবি ওকে?
_কসম রাখবো।
ছটফটে ভাব নিয়ে বলে ওঠে ইরফান,ঠিক তখুনি সবেগে একটা প্রকাণ্ড ঘুষি পরলো ওর নাক বরাবর। মুহুর্ত যায়,হতবাক হয়ে ইরফান তাকিয়ে আছে নাক চেপে ধরে প্রিতমের দিকে, মুখ দিয়ে টু-টা সাউন্ড করলো না, প্রিতম পকেট থেকে টিস্যু পেপার বের করে এবার কন্ঠে দরদ ঢেলে বলে,“দেখি রক্ত বের হয়েছে? আরে হাত সরা।”
হতভম্ব ভাব কাটছে না ইরফানের। প্রিতম ওর হাত সরিয়ে নাক দেখলো, ঠান্ডা গলায় বলল,“তোকে এরকম একটা ঘুষি মারার আমার বহুকালের শখ। এখন মনটা শান্ত হলো, আর হ্যা। দেবো,তোকে আমার বোন দেবো।”
ইরফান চুপচাপই তাকিয়ে আছে,প্রিতম হেসে ওঠে,হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরে, ইরফান এবার দাঁতে দাঁত চেপে ওর কলার ধরে ঝাকুনি দিয়ে ওঠে,“শা'লা,তুই আসলেই মিচকে শয়তান।”
_কলার ছাড়,কলার ছাড়, মাথায় রাখ, আমার বোন চাস কিন্তু তুই!
ইরফান ছেড়ে দিল কলার। প্রিতম ধরালো সিগারেট,একটা ইরফানকেও দিলো। এবার বেশ গম্ভীরতা নিয়ে বলল,“চল সিরিয়াস আলাপে যাই। কথা হচ্ছে তুই যেমন গতকাল সারারাত ঘুমাসনি, তেমনি আমিও ঘুমাইনি বোনের চিন্তায়। ভেবেছি সারারাত। সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছি। কিন্তু বিধিবাম, প্রণমি রাজি নয় রে, ও বলেছে তালাক চাই-ই চাই।
সিগারেট রেখে চোখ তুলে তাকায় ইরফান,বুকে অসহ্য এক তীরের ফলা এসে বিধল,তবুও খামখেয়ালি ভাব নিয়ে বলল,“ও অবুঝ। ওকে যে আমি একটু বোঝাবো, সেজন্য তো একটু সময় চাই, সুযোগ চাই। ও আসুক আমার কাছে,আমার ঘরে,এসে বুঝুক,দেখুক আমায়। এটুকু সুযোগ করে দে না রে!”
প্রিতম কিছুক্ষণ ওকে দেখলো,পর পর সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বলল,“সমস্যাটা হচ্ছে আপু। আপুর ওপরে কথা আমি বলতে পারবো না, অন্তত প্রণমির ব্যাপারে, প্রণমিকে মম ড্যাড শুধু জন্মই দিয়েছে, ওর ওপর এই পৃথিবীতে আপুর সবথেকে বেশি অধিকার।”
হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে ইরফান,প্রিতম এগিয়ে যায়,একটা হাত ওর কাঁধে রেখে এবার নরম গলায় বলে,“চিন্তা করিস না, উপায় একটা বের করবোই। বিকেলে স্পোর্টস ক্লাবে আয়,তোর পুরো গ্যাং নিয়ে। আমার গ্যাং-ও থাকবে। একটা মিশনে নামার প্রস্তুতি নিয়ে আসিস।”
চলমান........