#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০২
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
একইসাথে সামিন,ইলহাম,মুঈন আর ইহানকে দেখে অবাক হলেও প্রেরণা বুঝতে দেয়না,সে স্মিত হেসে তাদের স্বাগত জানায় নিজের কেটরিং সার্ভিসের অফিসে।
উঠে বিনয়ী হয়ে সালাম দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। সামিন ওকে হাত দিয়ে ইশারা করে থামিয়ে বলে,“ব্যস্ত হয়ো না,আমরা বসছি। তোমার সাথে আড্ডা দিতে এলাম।”
প্রেরণা বসল,তবে এবার অবাক হয়না সামিনের কথায়। বয়স ও অভিজ্ঞতা তাকে বুঝতে শিখিয়েছে সব,সে বুঝেছে সবকিছুই। নির্বিকার চিত্তে একপলক ইহানকে দেখেই অপ্রস্তুত আর ছটফটে দৃষ্টি সরিয়ে মুঈনকে দেখে,বিনয়ী সুরে বলে,“মিষ্টি কোথায়? কিপটেমি চলবে না।”
_মিষ্টি বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। গিয়ে আয়েশ করে খাবেন।
প্রেরণা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে মুঈনের কথার জবাবে। অ্যাসিস্ট্যান্ট এলো ঠান্ডা ঠান্ডা জুস নিয়ে,সাথে কিছু স্ন্যাকস। প্রেরণা নিজেই উঠে কুটুম বাড়ির মানুষদের সার্ভ করে দিচ্ছিল। ইহান থমথমে মুখে নিচ্ছে শরবতের গ্লাসটা, এখানে তাকে টেনে এনেছে মুঈন, যদিও সে জানে প্রেরণা কি সিদ্ধান্ত দেবে, ইয়াসার মির্জা মুরব্বি বলেই যে তার কথায় গদগদ হয়ে এক ধাক্কায় প্রেরণা রাজি হবে এমনটি ইহানের মনেই হয়না,তাই সে আসতে চায়নি, সবসময় ভদ্রমহিলার মুখে “ঠাশ ঠাশ” উচিত কথা শুনতে ইচ্ছে হয়না তার।
ইলহাম যেন ছটফট করছে,তার ছটফটানি বাড়তে না দিয়ে সামিন গলা খাঁকারি দিয়ে শুরুতেই প্রেরণাকে বলে ওঠে,“মা।”
_জি।
_ইরফান ও প্রণমিকে নিয়ে কিছু বলবো।
_শুনছি আঙ্কেল,শুরু করুন।
এবার কিছুটা নার্ভাস সামিন নিজেই, বাড়ির জামাইকে নিয়ে এসেছে সাথে করে, এর সামনে এই মেয়ের বয়সী মেয়েটার হাতে অপমানিত না হতে হয় আজ। তবুও,সে কিছু ভুল বলবে না,তার বিশ্বাস।
“দেখো, আমি জানি তুমি আপত্তি করবে। তবুও, তুমি মাথা ঠান্ডা করে ভেবে দেখো, প্রণমি এবং ইরফানের উচিৎ কিছুদিন একসাথে থেকে নিজেদের সময় বা সুযোগ দেয়া, অনুভূতি বদলায় এটা তো মানো তাইনা?”
_জি মানি। অনুভূতি বদলায়। কিন্তু আমি বা আমার বোন তো অনুভূতি বদলানোর সুযোগটাই দিতে চাইবো না ইরফানকে।
_তুমি কি তোমার বোনকে বিয়ে দিতে চাও না? চাওনা ওর সংসার হোক।
_হাস্যকর প্রশ্ন আঙ্কেল। অবশ্যই চাই।
_তবে ইরফান কেনো নয়?
চার জোড়া চোখ উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে প্রেরণার থেকে উত্তর জানতে। প্রেরণার অস্বস্তি হয়, নিমিষেই তা কাটিয়ে নিয়ে বলে,“আমার একার নয়, এটা স্বয়ং প্রণমির ইচ্ছে, আপনারা ওর সাথে কথা বলে দেখতে পারেন।”
তর্কাতর্কিতে না গিয়ে প্রেরণা বলে দিল সাফ সাফ। সামিন হতাশ চোখে তাকিয়ে রইল। ইহান তো নিরব দর্শক হয়েই দেখছে সব,সে জানে এই মহিলা টলার নয়। তবে মুঈন এবার মুখ খুলল,“দেখুন, আপনি ভাববেন না আমি কারো পক্ষ নিয়ে কথা বলছি। আমি যা বলছি সব নিরপেক্ষ কথা, প্রথমত বিয়েটা মানেন না, হ্যা আমরা বলবোও না অমন বিয়ে মানতে, ভুলে যান সব, আজ শুধু দেখুন, বোনের জন্য প্রস্তাব এসেছে, একটা ভীষণ ভদ্র পরিবার থেকে, এবং আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি এই পরিবারের সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে প্রণমিকে ভালো রাখতে,যেটা দরকার ওর। প্রণমির এখন চারপাশে কিছু জীবন্ত শীল্ড প্রয়োজন,এটা ফ্যক্ট,ইউ কান্ট ডিনাই প্রেরণা!”
হাসে প্রেরণা,“অবশ্যই ডিনাই করছি না,তবে আমিও একটা ফ্যাক্ট মনে করিয়ে দিই মুঈন ভাইয়া, প্রণমি চার দেয়ালের কামরায় তার স্বামীর সাথে জীবন পার করবে, শশুর বাড়ীর লোকদের সাথে নয়। এবং আমার এখনও মনে হয়না ইরফান প্রণমির জন্য সেরকম কেউ যাকে প্রণমির দরকার।”
_ইরফানকে কেমন মনে হয় এখন আপনার?
_দূরন্ত, ছটফটে স্বভাবের। অথচ আমার বোন শান্ত,অবুঝ। দু'জন খাপ খাওয়াতে পারবে না। তাই আমি জোর করবো না প্রণমিকে এই সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে। ওর মত নেই, আমারও নেই। ইরফান ভালো ছেলে, ওর জন্য উপযুক্ত মেয়ে পেয়ে যাবেন এক চুটকিতে। প্রণমির প্রয়োজন ধৈর্য্যশীল কাউকে,প্রণমিকে আগলাতে যে ধৈর্য্যহারা হবে না। আমি তো হলফ করে বলতে পারি, যতটুকু চিনেছি ইরফানকে, ও আমার এই আজকের রিজেকশনও নিতে পারবে না, চলে যাবে তুলে আনতে প্রণমিকে। ভীষণ অধৈর্য,ডমিনেটিং,জেদি ছেলেটা। এবং এসব বজায় থাকবে। শত ওর মন ভালো থাকুক, আমার বোনটা পদে পদে কষ্ট পাবে হঠাৎ হঠাৎ।”
কথা গুলো দৃঢ়তা নিয়ে বলে প্রেরণা, এবং ওখানে চারজন পুরুষের একজনেরও সাধ্যি নেই তর্কে যাওয়ার। তারা কোনো যুক্তি খুজে পাচ্ছে না। তবে মুঈন বলল,“অনুভূতি বদলানোর সাথে সাথে মানুষের স্বভাবও বদলায়, তার জন্য একটা কারণ লাগে শক্ত। আমি বিশ্বাস করি প্রণমি সেরকম একটি কারণ হতে পারে। যাই হোক, আমি শুরুতেই বলেছি আমি নিরপেক্ষ, মনের ওপর চাপ দেবেন না। যা-ই করবেন একশো বার ভেবে করবেন যে এতে প্রণমির ভালো হবে কিনা নিজের জেদ থেকে নয়, দ্যাটস অল।”
সামিন লম্বা শ্বাস ফেলে, শেষ বারের মতো বলে,“আমি তোমার সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না মা, রাতে কল করবো তোমাকে। তুমি সারাদিন ভাবো, ভালো করে ভাবো। ভেবে তোমার মন যা সায় দেবে সেটাই জানিও, আক্ষেপ থাকবে না আমার। আসছি।”
আলো দুপুর নাগাদ কল করলো সামিনকে, ব্যগ্র কন্ঠে বলল,“কি ব্যাপার। সেইযে সকালে বেরুলেন। এখন অবধি একটাও খবর নেই! প্রেরণা জানিয়েছে কিছু?”
শ্বাস ফেলে সামিন,“প্রথমে না বলে,আমি রাত অবধি ভাবতে দিয়েছি। রাতে জানাবে। তোমরা খেয়ে নাও। আমরা কেউ বাড়িতে ফিরবো না দুপুরে।”
_ওমা কেনো?
_মুঈনকে অফিসটা ঘুরিয়ে দেখাই,ও তো কিছুই দেখলো না এখনো। আমরা বাইরে খেয়ে নেবো, সন্ধ্যা নাগাদ ফিরবো।
কল কাটতেই রিতু আলোকে পাকড়াও করে জানতে চাইলো,“কি বলেছে?”
_না করে দিয়েছে। তোর ভাইয়া তবুও অনুরোধ করেছে রাত অবধি ভাবতে।
রিতুর মুখটা কালো হয়ে গেলো নিমিষেই, গজগজ করে উঠলো,“জানতাম আমি। দাঁড়াও দেখছি।”
তাড়াহুড়ো লাগিয়ে রিতু শাড়ি পাল্টায় তক্ষুনি, আলো অবাক হয়ে জানতে চাইলো,“কোথায় যাবি?”
_ইনুর শশুর বাড়ি।
_তোর মাথা খারাপ? যা কথা বলার তোর ভাইয়া বলুক,সবাই মিলে বিরক্ত করবো ওদের?
আলোর আপত্তি তো রিতু মানলোই না, নিজের আলমারি থেকে সবথেকে দামী গলার সেটটা নিয়ে নেয় সাথে, এবং আলোকেও ছাড়লো না, টানতে টানতে নিয়ে গেলো সাথে করে।
পুরো রাস্তায় আলো বুঝিয়েছে,“দেখ কথা শোনাবি না ওদের।”
_না না। কথা কেন শোনাবো আত্মীয়দের?
দরজা খুললো প্রেরণা, অফিস থেকে ফিরেছে সে,রিতু আর আলোকে দেখে অবাক হলো না, ঠান্ডা গলায় বলল,“আসুন।”
ওদেরকে বসতে দিয়ে নিজে শরবত বানাতে চলে যায়, ইনু এসে শুকনো মুখে দাঁড়ায় বসার ঘরে। মেজো মামীকে ঠিক লাগছে না তার কাছে, আচরণ অতিরিক্ত চঞ্চল। কে জানে আজ কি সিনক্রিয়েট হবে এখানে।
রিতু সিনক্রিয়েট করলো না, বরং নম্র হয়ে ডাকলো,“প্রণমি।”
এলোমেলো বিছানায় শুয়ে ভাবুক হয়ে ছিলো প্রণমি,মাথার মধ্যে কিলবিল করছে দুশ্চিন্তা। এক্সিডেন্টাল শাশুড়ির গলার আওয়াজ পেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। ওড়না সামলে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় বসার ঘরের দিকে।
প্রেরণা শরবত নিয়ে এসে আলো আর রিতুর হাতে দিয়ে প্রণমিকে নিয়ে মুখোমুখি বসলো ওদের,সে জানে এখন কি কথা হবে, জবাব গুলো দিতে প্রস্তুত সে।
শরবত রিতু খায়না, কোনো রকম ভনিতা না করে দু'বোনকেই বলে ওঠে,“বৌ নিতে এলাম।”
হকচকাল আলো, এই তবে রিতুর পেটে ছিলো? ছেলের জন্য মাথাটা খারাপ হলো নাকি? এখন এখানে ধুন্ধুমার লেগে না গেলেই হয়!
প্রেরণার মুখভঙ্গি শান্ত বেশ,রিতুর কথার জবাবে বলল,“কে বৌ?”
_প্রণমি। আমার ছোটো ছেলের বৌ।
হাসে প্রেরণা,হাসতে হাসতে বলে,“আন্টি অবুঝপনা করার চেষ্টা একটা লিমিট আছে। ওটা আদৌও বিয়ে?”
_ওটা বিয়েই। বিয়ে বিয়েই। কবুল বলেছে না? কবুল বলেছে তো সজ্ঞানে, আমার ছেলে জোর করেছে মানলাম, তো তোমার বোন সারাজীবন সংসার করতে হবে এটা ভেবেই তো কবুল বলেছে, তাহলে বিয়ে কি করে নয় ওটা? কবুল বলার পর আমার ছেলে ওকে ছেড়ে দেবে এটা ভেবে নিশ্চয়ই কবুল বলেনি তাইনা?
রাগ চাপলো প্রেরণার মাথায়,আলো পরেছে বিপদে, রিতু এসব কি বললো আবোলতাবোল! এখন এখান থেকে অপমানিত হয়ে বেরুতে না হয়!
প্রেরণা অপমান করলো না, শুধু ধীরে ধীরে বলল,“আমার বোন কবুল বলেছিল, কারণ ও ভেবেছিল ওর সাথে খারাপ কিছু হবে, হয়তো ওর ইজ্জত চলে যাবে। ঘর সংসারের কথা ভেবে নয়। আপনি সম্ভবত বুঝতে পারেন না আন্টি, অথবা চান না বুঝতে, তাই আবারও বলা,ও আপনার ছেলেকে রেপিস্ট ভেবেছে। এবং মুসলিম মানসিকতার হওয়ায় ওর এলোমেলো মস্তিষ্ক তখন ভেবে নিয়েছে এমনি রেইপ হবার থেকে বৈধতা দেওয়া ভালো। বুঝলেন?”
থতমত খায় রিতু, সে তো জানে সব, তবুও মায়ের মন যে মানে না, এবার সে ভীষণ আকুলতা নিয়ে বলে,“আচ্ছা বিয়ে নয় ওটা, তাহলে এখন হোক না প্রেরণা? একটু মন নরম করলে কি হয়?”
প্রণমির মুখটা ফ্যাকাশে হচ্ছে ক্রমশ, চোখের পাতা কাঁপছে,হাত মুঠি করে গুটিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
প্রেরণা সাফ সাফ গলায় বলে,“এখনও হবে না বিয়ে। ইরফানের প্রতি চির কৃতজ্ঞ আমি,ওকে নিজের ভাইয়ের মতো ভেবে নিয়েছি। তবে পাত্রকে আমার আর আমার বোনের পছন্দ নয়। ক্লিয়ার?”
আলো উঠে যেতে চাইল, এখানে থাকলে লজ্জায় সে শেষ হয়ে যাবে। তবে রিতু ওর হাতটা ধরলো টেনে, ছেলের জীবনের প্রশ্ন, মা হিসেবে চাইলো না হাল ছাড়তে। নারীমন,নরম হতে কতক্ষন? সে তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে গলার হারটা বের করতেই প্রেরণার চক্ষু চড়কগাছ।
রিতু এগিয়ে যায় প্রণমির দিকে,জেদ করে বলে,“যা-ই বলো,তাই বলো, ও বৌমা আমার। এতো সহজে আমি হটবো কেন? এইটা আমার বৌমার, তোমার সাধ্য থাকলে আমাকে আটকে দেখাও দেখি!”
আলো টেনে ধরলো রিতুকে,“করছিস কি তুই?”
রিতু শোনেনা,হারটা প্রণমির গলায় রাখতে যাবে অমনি প্রেরণা সরিয়ে নেয় বোনকে,“আন্টি প্লিজ! আমরা রাখবো না এটা! আপনি অযথা কষ্ট পাবেন।”
রিতু জেদ বজায় রাখে নিজের, আর প্রেরণাও। প্রণমিকে নিয়ে টানাহেঁচড়া লেগে গেলো মুহুর্তেই। তার শাশুড়ি তাকে হার পরাবে,তার বোন তাকে সরিয়ে নিচ্ছে। একবার প্রেরণা টানছে, একবার রিতু টানছে মেয়েটাকে। আর আলো বারবার টেনে আনছে রিতুকে। রিতুর গলা কাঁপছে উত্তেজনায়, এবার সে কেঁদেই ওঠে, প্রণমিকে বলে,“আমার ছেলে ভালো রাখবে তোমাকে প্রণমি,ওর মনটা খুব ভালো, যা হয়েছে ভুলে গিয়ে চলো মা, তোমার আপুর কথা শুনো না।”
প্রেরণা হার সহ রিতুর হাতটা সরিয়ে দেয়,রিতু আরো জেদি হয়, জোর করেই প্রণমির গলায় চার ভরির হারটা পরিয়ে দম নেয়। প্রণমিকে আগলে নিয়ে কপালে চুমু খায়,“আমার ছেলে ভালোবাসে তোমাকে।”
প্রেরণা আর সহ্য করতে না পেরে দ্রুত হারটা খুলে দেয়,জানে ওটা একটু বেয়াদবি হলো,তবুও সে করলো। ইনায়া দূরে দাঁড়িয়ে ছলোছলো চোখে এই কান্ড দেখছে, সে আর ঢোকেনা এদের মাঝে, বিগত দিনে বহু ঝামেলায় সে জরিয়েছে,আর চায়না সে কোনো পক্ষের সাফাই গাইতে।
এতো ধস্তাধস্তিতে এবার প্রণমি দিলো কেঁদে,বোনকে কাঁদতে দেখে প্রেরণা শক্ত গলায় রিতুকে বলল,“আন্টি আপনার থামা উচিত। দেখছেন আমার বোন কাঁদছে?”
রিতু থমকায়, লজ্জায় মাথা কাটা যায় আলোর। ছোটো জা কে ধমকে ওঠে,“হয়েছে তোর? চল বাড়িতে।”
রিতু ছটফটিয়ে ওঠে,প্রণমিকে বলে,“বোকামি করো না প্রণমি,কেউ সুযোগ চাইছে,দাও। একবার তালাক হলে সব শেষ। যেটা সুন্দর করে গুছিয়ে নেয়া যায়,সেটাকে আফসোসের বিষয় কেন করতে চাইছো? তোমার বড় বোন বুঝতে পারছে না, আল্লাহ জানে তার সমস্যা কোথায়!”
মেজাজ খারাপ হয়েছে আলোর,রিতুর হাত ধরে টানতে টানতে বের করলো প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে,সাথে নিলো বংশীয় হারটা। বহু আগের স্বর্ণালঙ্কার।
প্রেরণা নির্বাক দাঁড়িয়ে দেখেছে তাদের প্রস্থান, অতঃপর ঘুরে প্রণমির দিকে তাকাতেই একটা ধাক্কার মতো খেলো। দু'চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পরছে প্রণমির। এগিয়ে যায় প্রেরণা, উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,“তুই কাদছিস কেন?”
জবাব না দিয়ে প্রণমি ঘরে ঢুকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে চুপচাপ। প্রেরণা চেঁচাতে থাকে,“বলবি তো সমস্যা কি?”
প্রণমির সমস্যা কি সে জানে না,তবে সমস্যা কিছু হচ্ছে সেটা সে অনুভব করছে, ছটফট করছে ভেতরটা, আপুর কথার জবাব দিতে ইচ্ছে হয়না ওর, কিছুক্ষণ আগে,রিতু আন্টির সাথে করা ব্যবহারে আপুর ওপর ওর মেজাজ খারাপ হলো কেন? আপুকে কেনো অসহ্য লাগছে প্রণমির অবচেতন মনে? ভাবতে ভাবতে নিজেকে ধিক্কার দেয় সে। বিছানার চাদর খামচে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে।
প্রেরণা দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে,অবাক হয়ে দেখতেই থাকে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদতে থাকা প্রণমিকে।
_________
স্পোর্টস ক্লাবটা এই বিকেলে আজ বহু, বহুদিন পরে গমগম করছে। দু'পক্ষের সবল যুবকের দল বসেছে মুখোমুখি,তবে আজ দু'পক্ষ ক্ষান্ত হলো। কেউ কাউকে আক্রমণাত্মক দৃষ্টিতে দেখছে না বরং চেয়ার টেনে একে অপরকে বসতে সহযোগিতা করেছে।
ইরফানের মস্তিষ্ক ফাঁকা, বুঝতে পারছে না প্রিতমের মতলব। ওকে বোঝাতে জামি এগিয়ে এলো,তার হাতে একটা পেন আর পেপার। সবার মাঝে একটা টেনিস বোর্ড, সেটির ওপরে খুবই সিরিয়াস মুডে জামি পেপারটা রাখে, তারপর বড় করে “এ” আর “বি” লিখে গম্ভীর হয়ে বলে ওঠে,“আমাদের হাতে দু'টো প্ল্যান আছে।”
_কি প্ল্যান?
বিস্মিত দৃষ্টি মেলে অস্ফুটে জানতে চায় ইরফান। জামি হাসে সামান্য, বড় গলা করে বলে,“প্ল্যান নাম্বার “এ”, প্রেরণা আপুকে পটাতে হবে! আর প্ল্যান নাম্বার “বি”.....”
_আবার প্রণমিকে তুলে আনতে হবে?
ব্যগ্র গলায় নিক্সন বলে ওঠে কথাটা। প্রিতম নিজের বোন সম্পর্কে এসব শুনে চোখ গরম করে তাকায় নিক্সনের দিকে, সাথে সাথে ইরফানের হাতের একটা জোরালো গাট্টাও পরে নিক্সনের মাথায়। দাঁতে দাঁত চেপে ইরফান বললো,“চুপ থাক!”
জামি গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠে পরিবেশ শান্ত করতে, আবারও সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে,“প্ল্যান নাম্বার “বি” ও হলো, প্রেরণা আপুকে পটাতে হবে।”
ইরফান হতাশ, নিমিষেই আবার চোখমুখ শক্ত হয় ওর, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“প্রেরণা আপুকে পটাতে হবে এটা তো আমিও জানি বলদের দল। এখন ঘটে কিছু বুদ্ধি থাকলে আলোচনা কর নয়তো আমি উঠলাম।”
তারপর প্রিতমের দিকে দৃষ্টি দিলো ইরফান,“এই তোর মিশনের পরিকল্পনা?”
_আরে শোন না, অধৈর্য হচ্ছিস কেন? আমাদের হাতে বেশি সময় নেই, মনে হচ্ছে দু-তিন দিনের মধ্যেই আপু ডিভোর্সের জন্য আপিল করবে, তার মাঝে কিছু একটা করতে হবে। তুই ওদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চল, আর বাড়িতে তো আমি আছিই প্রণমিকে আপুর আড়ালে আবডালে বোঝাতে।
প্রিতমের কথায় এবার বেশ শান্ত হলো ইরফান, কৌতুহলী দৃষ্টি মেলে জামির দিকে তাকিয়ে বলল,“বল! শুনি!”
দুই গ্যাং-য়ের বারো মাথা একসাথে হলো,নিচু গলায় ধীরে ধীরে জামি বলতে লাগলো তার পরিকল্পনা। বলা শেষ করে যখন দম নিলো সে, ইরফানের মেজাজ হলো গরম,“হাউ ক্রিঞ্জ! শা'লা তোদের এখানে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে। এসব নাটক ফাটক আমার দাঁড়া হবে না। আমি এমন, এমনই, এতো ভং ধরতে পারবো না ।”
জামি বিরক্ত হলো,“এই কারণে তোকে আমাদের পছন্দ নয়। আরে বাবা, এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার। যদি প্রণমিকে চাস,তো আমাদের সাথ দে। নয়তো নিজেরটা নিজে বুঝে নে। আমরাও দেখি তুই প্রেরণা আপুকে কি করে পটাস। বাট লিসেন, অধৈর্য হয়ে যে তুই আবারও প্রণমিকে তুলে আনবি এটা আমরা জানি, এই কাজ ভুলেও করো না চাদু। সব হারাবে তবে!”
জামির কথায় হাশফাশ করে উঠলো ইরফান, এবার তার চোখের দৃষ্টি হলো অসহায়, তাকাল প্রিতমের দিকে, যে তাকিয়ে ছিলো ওরই দিকে,চোখের পলক ফেলে ওকে ইশারায় বোঝায়,“ধৈর্য রাখ! এতে কাজ হতেও পারে!”
_______
শান্তিনীড়ের পরিস্থিতি গুমোট হয়ে আছে সন্ধ্যাতে, রিতু প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে সিনক্রিয়েট করেছে শুনতে পেয়ে ইলহাম আর সামিন দু'জনেই রেগেছে ভীষণ।
সামিন ওভাবে না ধমকালেও ইলহাম ধমকায়,“তোমরা মহিলারা এতো অধৈর্য কেন? কি দরকার ছিল এসব আমাদের না জানিয়ে করার? প্রেরণা তো ভাবার সময় নিয়েছে,একটা হঠকারিতা করে দিলে মেজাজ খারাপ করে তার।”
রিতুর চোখমুখ শক্ত হয়ে আছে, ঐ মেয়েটা তার নামে নালিশ করেছে তার স্বামী-ভাসুরের কাছে ফোন করে? রিতু তো বাজে ব্যবহার করেনি কোনো, তবুও? প্রেরণার ওপর রাগটা রিতুর চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে তার।
ঘরে এসে আলো খোঁচায় ওকে,“হলো তোর? বকা খেয়ে ভালো লাগছে?”
রিতু বলেনা কিছু, চাপা ক্ষোভ জমছে বুকে, বড় বড় শ্বাস ফেলে সেসব সরাতে ব্যস্ত সে। নিচে তখন কলিং বেলের আওয়াজ হয়। এই সন্ধ্যা বেলা কে এলো ভেবে আলো দ্রুত পা চালিয়ে নিচে নামল,ওর সাথে সামিনও। দরজা খুলেই দেখলো ইশমাম দাঁড়িয়ে আছে মুখ হাসি হাসি করে,তার পাশে ব্যারিস্টার উজ্জ্বল মাহমুদ।
সামিনকে দেখেই ইশমাম উত্তেজিত গলায় বলল,“কাকে এনেছি দেখো! সদর রোড লাইব্রেরীর সামনে দেখা, একেবারে ধরে এনেছি।”
উজ্জ্বল খানিকটা অপ্রস্তুতও,তার হাতে একগুচ্ছ কদম,এই বর্ষার প্রথম কদম, বাজারে দেখে লোভ সামলাতে পারেনি, গাড়ি থামিয়ে সবগুলো নিয়েছে, নিজের ঘরটা সাজাবে বলে কিনেছিল, প্রায় বিশটা কদম, হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে এখন, মুখ হাসি হাসি করে সালাম দেয় সামিনকে।
আলো বর্ষার প্রথম কদম দেখে ভীষণ খুশি হয়,প্রায় চেঁচিয়ে বলে,“পেলে কোথায় বাবা, এটা তো বিলুপ্ত প্রায়।”
হাসলো উজ্জ্বল, নির্মল সরল গলায় বলল,“সৌভাগ্যক্রমে পেলাম। এটা আপনারাই রাখুন আন্টি আমি খুশি হবো। আমার তরফ থেকে উপহার আপনাদের জন্য।”
আলো ঘুরে দাঁড়ায়, হাসতে হাসতে বলে,“এসবে আমরা ভাগ পাবো না, একজনকে ডাকছি দাঁড়াও, এলেই দেখবে সবগুলো লুফে নিয়ে যাবে।”
অতঃপর উৎফুল্ল হয়ে হাক ছেঁড়ে শেহাকে ডাকল আলো,“শেহু নিচে আয়, আরে এক্ষুনি আয়। দেখ কি চমৎকার হলো! তোর প্রিয় কদম, একেবারে প্রথম ফোটা। নিজে হেঁটে এসেছে বাড়িতে। কত খুজলি সারাদিন,পেলি না। এখন এসে নিয়ে যা। আরে কি চমৎকার হলো! কি কাকতালীয়!”
_______
মাগরিবের আজান দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে, নামাজ আদায় করে প্রেরণা শাড়ি পাল্টে যখন ব্যাগ কাঁধে নিলো, প্রিতম চোরের মতো মুখ করে এসে ওর দরজায় দাঁড়ায়।
“আপু।”
প্রেরণার তাড়াহুড়ো ছিলো, ব্যস্ততা নিয়ে বললো,“গ্রোসারি আইটেম কিনতে যাচ্ছি খান বাজার সুপার শপে। রাত হবে ফিরতে। শুদ্ধর হোমওয়ার্ক টা দেখিস।”
চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো ঘাড় কাত করে প্রিতম। প্রেরণা বলে,“প্রণমির মনটা ভালো নেই,আজ রিতু আন্টি এসে কাহিনী করে গিয়েছে,ওকেও দেখিস একটু।”
এবারও প্রিতম ঘাড় কাত করে জবাব দেয়, প্রেরণা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে যেতেই দ্রুত আঙুল চালিয়ে “স্পোর্টস ক্লাব” গ্রুপটাতে একটি ছোটো বার্তা লিখে দেয়,“আপু বেরিয়েছে,খান বাজার সুপার শপ। তোরা রেডি?”
পর পর কয়েক বার টুং টুং শব্দে কয়েকটি জবাব আসে,“ইয়েস!”
চলমান.....