ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 103

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০৩
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

ইনশিরাহর ঘরটা সুন্দর করে গোছাচ্ছিল শেহা। মুঈন জিজের সাথে আপু ছোটো মামীর চেম্বারে গিয়েছে। ঘরটা এলোমেলো,আপু অসুস্থ তাই বোনের ঘর গুছিয়ে দিচ্ছে এ বাড়ির সবথেকে লক্ষী মেয়ে শেহা।‌আচানক বড় মামীর ডাকে চোখ কপালে উঠল ওর। কদম ফুল? কদম ফুল কোথায়? হাত থেকে ঝুল ঝাড়ু ফেলে সত্বর হেটে সিড়ি বেয়ে নামছে সে,কোমরে পেঁচানো ওড়নাটা।
বসার ঘরে কারো সাথে কথা বলছে বড় মামা, ছোটো মামা আর বড় মামী। কোমর থেকে ওড়না তুলে গলায় জরিয়ে ধীরপায়ে নামছে এবার। মিহি কন্ঠে বলছে,“কে এনেছে বড় মামী? বড় দাদান এনেছে?”

স্বল্প পরিচিত মিহি স্বরটা কর্ণ গোচর হতেই ঈষৎ ঘাড় বাকায় উজ্জ্বল। শেহা সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রেখেই দাঁড়িয়ে পরে চোখ বড় বড় করে। উজ্জ্বল নিস্পন্দ নয়নে তাকিয়ে আছে কালো মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে ভাসা ভাসা দুটি চোখে,তার মুখভঙ্গি শান্ত, স্বাভাবিক।
তবে অস্বস্তিতে গাঁট হল শেহার শরীর,চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয়।

“নে ফুলগুলো। সব তোর।”
আলো বলেই উজ্জ্বলকে দেখল একপলক, উজ্জ্বল তখনো দেখছে মেয়েটাকে,মুখ হাসিহাসি তার। আলো শেহার স্থির ভঙ্গি দেখে বলল,“কি হলো? ও আচ্ছা শোন,এ উজ্জ্বল মাহমুদ।”

তড়িৎ চোখ তুলে তাকায় শেহা। অবাক, বিস্মিত নেত্রযুগল বড় বড় হয়ে যায়, মনযোগী দৃষ্টি এবার উজ্জ্বলের মুখের দিকে। এই লোক তবে রাগী মির্জার প্রসিকিউটর?

উজ্জ্বল তখনো মুখ হাসি হাসি করে তাকিয়ে আছে, কিংবা ওর ব্যক্তিত্বই অমন। শেহা সেদিনও দেখল,কথা বলেই খুব সুন্দর করে নীরব হাসে,তখন পুরোপুরি সজীব এবং সরল লাগে লোকটাকে। শেহার দৃষ্টি নামে উজ্জ্বলের হাতে, চোখ তার চিকচিক করছে উত্তেজনায়। তবে এই লোকের কাছ থেকে কেন ফুল নেবে? বড় মামী পাগল?

ফুলটা আলো নিল, ভারী গুচ্ছটা শেহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,“এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? উইয়ার্ড লাগছে। হাস।”

হাসার চেষ্টা করল শেহা। সামিন উজ্জ্বলকে সোফায় বসতে বলে প্রফুল্ল চিত্তে বলে,“ও আমার বোনের মেয়ে। তোমার দাদু চেনে ওকে।”

উজ্জ্বল বসে চোখ নামিয়ে নিল। আলো চলে যায় কিচেনে, হেল্পিং হ্যান্ডকে চা বানাতে বলে ফ্রিজ খুলে দেখে কি স্ন্যাকস দেয়া যায় এই সান্ধ্য অতিথিকে।

শেহার নাকে কদমের সুঘ্রাণ পৌঁছাতেই এক নিমিষেই ওর গোটা মন ও শরীরে খেলে গেল এক স্নিগ্ধ সজীবতা। আজ বহু,বহু বছর পরে এই ফুল পেল সে,তাও এতগুলো। খুশি মনে এবার সে তাকায় সামনে, একটা নীল শার্ট পরনে লোকটার,হাতা ফোল্ড করে রেখেছে। এখন একে দেখলে কেউই বলবে না এ উকিল। আচ্ছা এর বয়স কত? এত ছোট বয়সে কেউ উকিল হয়?

সামিন আর ইশমাম আড্ডা দিতে ব্যস্ত লোকটার সাথে।

“তোমাকে এত বললাম তোমার দাদুকে নিয়ে এসো,এলে না।”

_আপনারা চলুন না। দাদুর কাছে বলেছি,সে তো বলেছে ইনভাইট করতে।

_আমরা? আমরা চলে গেলে বিপদে পরবে।

_বিপদে কেন?

_আমরা রাবণের গুষ্টি। সদস্য সংখ্যা কত জানো?

বলেই হোহো করে হেসে ওঠে সামিন, উজ্জ্বল হাসে নিশ্চুপ। এরপর সামিন পরিবারের সদস্যদের সবার পরিচয় দিতে থাকে উজ্জ্বলকে,“আমরা মোট তিন ভাইয়ের সংসার এ বাড়িতে। আমি বড়,আমার একটি মেয়ে, ইনশিরাহ আমাদের কোম্পানিতে চাকরি করে, জামাইয়ের সাথে বেরিয়েছে ,এলে পরিচয় করিয়ে দেব। ইহান ইরফান আমার মেজো ভাইয়ের দুই ছেলে,ইহান পলিটিক্স করে আর ইরফানও আমাদের কোম্পানিতে চাকরি করে, আমার ছোট ভাইয়ের একটি মেয়ে,ইনায়া ফিজিক্স নিয়ে পড়ছে আর ঐযে আমার ভাগ্নি,ও ডাক্তারি পড়ছে। খুব ব্রিলিয়ান্ট সব ভাইবোনেরা,তবে ভারি দুষ্টু, শান্ত কেবল ইহান আর এই শেহা, বাকি গুলো খুব পাজি। নমুনা তো শুনেছোই।”

উজ্জ্বল আরো একবার চোখ তুলে শেহাকে দেখল। শেহা চোখ নামিয়ে নিল,পর পর চোখ তুলে আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,“মামী আমার সাহায্য লাগবে?”

_না তুই যা।

শেহা চুপচাপ কদম গুচ্ছ নিয়ে ওপরে চলে গেল। আলো বসল উজ্জ্বলের হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে,“তোমার বিয়ে হয়েছে?”

উজ্জ্বল মাথা নাড়ে। আলো বলতে থাকে,“তোমার দাদুকে দেখার আমার খুব শখ,দেখতে যাবো যাবো করেও যাওয়া হয়না। লোকটার প্রতি চির কৃতজ্ঞ আমি। তোমার আঙ্কেল যখন হাজতে ছিল, আমার স্পষ্ট মনে আছে,আমি না খেয়ে তোমার দাদুর পেছনে পরে থাকতাম। তিনি একদিন আমাকে ধমকে বললেন,“মা,কিছু খেয়ে নে আগে, শরীর ঠিক না থাকলে স্বামীর জন্য দুশ্চিন্তা করবি কিভাবে ? এরপর তিনি তার টিফিন বক্স থেকে আলুর দম,চিকন চালের ভাত,কৈ মাছ মটরশুটি দিয়ে ঝোল বেড়ে আমাকে খেতে দিলেন চেম্বারে। ঐ খাবারটা আমি খুব তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছিলাম ঐ এলোমেলো পরিস্থিতিতে,যখন তোমার আঙ্কেলের যাবজ্জীবন হবে হবে খবর শুনি।”

পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করে আলোর চোখে পানি আসে, এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,“তাকে নিয়ে আসবে একদিন অবশ্যই, আমি তাকে কৈ মাছ মটরশুটি দিয়ে, আলুর দম,আর চিকন চালের ভাত খাওয়াবো।”

উজ্জ্বল বিনয়ী হাসি হেসে মাথা নাড়ায়। আলো কৌতুহলী,“তা তুমি বিয়ে করছো না কেনো? ইহানের বয়সী তো তুমি, তাইনা?”

_ওর থেকে একবছরের বড় সম্ভবত আন্টি।

_______

খান বাজার সুপার মার্কেটের ব্লক ডি এর সামনে একরাশ অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইরফান। চঞ্চল স্বভাবের ছেলেটার চঞ্চল দৃষ্টি বারবার ঘুরে যাচ্ছে আড়ালে আবডালে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রুপের সদস্যদের দিকে। জামি কন্ঠস্বর তেতো করে বলল,“তুই এভাবে আমাদের দেখলে আমরা ধরা পরে যাবো ব্রো!”

_এগুলো পারব না আমি, এমনিই ধরা পরে যাবো হেসে ফেলে।

_এহহহ, সাধু সাজিস না,তুই যে কত বড় ধড়িবাজ তা আমরা জানি।

ইরফান চোখজোড়া সরু করে নিল,“যতটা ভাবিস অতটাও না।”

এর মাঝে সিগন্যাল এল, ডানপাশের টয়লেট্রিজ কর্ণার থেকে নিক্সন বলে ওঠে,“আপা আসছে। জ্ঞানী আপা। স্নাইপার টিম লুকিয়ে পরো,কুইক।”

ওরা লুকিয়ে পরল। প্রেরণা শপিং কার্ট নিয়ে এগিয়ে আসছে এদিকটায়, আশেপাশে তাকিয়ে ইরফান শুরুতে একটা লম্বা শ্বাস ফেলল, তারপর এগিয়ে গেল, মুখ একেবারে ভদ্রছেলের মত মাসুম মাসুম করার চেষ্টা করে বলল,“আরেহ আপু! আপনি?”

প্রেরণা হাসলো,“আরে তুমি? এখানে কি?”

_এই তো আপু, বাড়ির জন্য কিছু গ্রোসারি কিনছিলাম।

_তুমি আর গ্রোসারি?

কিঞ্চিত অবাক হয়ে প্রেরণা বলে, ইরফান লাজুক ভঙ্গিতে হাসে। প্রেরণা এবার মিষ্টি করে হেসে বলে,“ঠিক আছে চলো একসাথে শপিং করি। তোমার লিস্ট কই?”

থতমত খায় ইরফান,পর পর স্বাভাবিক গলায় বলল,“লিস্ট লাগে না আমার। মনে আছে আমার।”

বলেই একটা শপিং কার্ট টেনে এনে একাধারে কিছু প্যাকেট ফেলে, সুজির প্যাকেট, আটার প্যাকেট, জুসের প্যাকেট, একটা সুগার ফ্রি-এর প্যাকেট।

প্রেরণা অবাক হয়ে দেখল,বলল,“ডায়াবেটিস কার বাড়িতে?”

ইরফান ভেবে পায়না কি বলবে,বোকার মত বলে ফেলে,“নিয়ে নিলাম,যদি কারো হয় ব্যবহার করতে পারবে আরকি।”

হাঁফ ছেড়ে প্রেরণা নিজের শপিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে, পাশাপাশি চালিয়ে যেতে থাকে ইরফানের সাথে টুকটাক আলাপ। ইরফানের দৃষ্টি এলোমেলো, অস্বস্তি বাড়ছে তো বাড়ছে। এসব করার কি খুব দরকার আছে? সে বরং প্রেরণাকে বলুক সরাসরি, আবদার করে প্রেরণার হাত ধরে ঝুলে পরুক। এমন করলে জ্ঞানী আপা কি মাইন্ড করবে?

________

সারা বিকেলটাই বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছে প্রণমি। চোখের পানি চোখেই শুকিয়েছে, একদফা ঘুমিয়েছে, মাত্র উঠেছে শুদ্ধর চিৎকার চেঁচামেচিতে , মিস জেনির সাথে সামুরাই সেজে একটা খেলা করছে সে।
দরজার বাইরে এসে ধীর পায়ে তখন দাঁড়ায় প্রিতম, প্রণমি টের পায়নি, সে তার লম্বা চুলে খোঁপা করতে ব্যস্ত। প্রিতম বোনের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে, ফরসা মুখটা আরো বেশি ফ্যাকাশে লাগছে প্রণমির। প্রণমি কেমন কপাল কুঁচকে ফেলে হঠাৎ,“ভাইয়া এলে?”

_হু রে।
ওর ঘরে ঢুকে বিছানায় বসল প্রিতম। প্রণমি মুখভঙ্গি স্বাভাবিক রেখে বলে উঠল,“কিছু বলবে?”

জড়তা কাটছে না প্রিতমের। বোনের সাথে খোলামেলা কথা কি করে বলবে সে? যদি হিতে বিপরীত হয়? কিছুটা সময় নিয়ে সে কথা গুছিয়ে নেয়, অতঃপর বলে,“তুই কি কোনো ব্যাপার নিয়ে দোটানায় আছিস?”

কপাল কুঁচকে ফেলে প্রণমি,বুঝতে পারছে না এমন ভাব করে বলে,“কোন ব্যপারে?”

সরাসরি বলতে আর পারল না প্রিতম,তার ঠোঁটে এল না, বড় একটা শ্বাস ফেলে অবনত স্বরে বলে,“প্রণো।”

_হু ভাইয়া?

_শোন তোকে একটা কথা বলি হ্যাঁ? যখন যেটা করবি সেটা কেবল মনেরটা শুনেই করবি। মনের সাথে লুকোচুরি খেলবি না, পরে আফসোস হবে।

_কিসব বলছো তুমি?

নিজেকে সামলে নেয় প্রিতম, বিস্তারিত বলে না,শুধু বলে,“তোর লাইফ। আমার কথা,আপুর কথা শুনে চলার দরকার নেই। তোর জীবনটা আলাদা, মন কোনো কিছুর জন্য অস্থির হলে মনের কাছেই সাজেশন চা। আমি আর আপু জোর করবই তোর ভালোর জন্য তোকে,সব ব্যপারে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তোর আছে। আগে ভাব, তারপর আপু ভাইয়াকে নিয়ে বস আলোচনায়,কেমন?

চুপ হয়ে যায় প্রণমি। প্রিতম উঠে দাঁড়ায়। আর বাড়ায় না কথা। ঘুরে দেখল ইনু দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। ফিসফিসিয়ে প্রিতমকে বলল,“আমি কিছু বোঝাবো?”

_না,ওকে নিজেকে বুঝতে দাও। তুমি তো বোঝানোর নামে তোমার মেজো দাদানের গুণগান শুরু করবে।

মুখটা ভার করে নেয় ইনু,ওর হাত ধরে প্রিতম ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

_______

ভালো ব্র্যান্ডের সয়া সস খুজে পাচ্ছে না প্রেরণা, চিন্তিত ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকায়। ইরফান তাকেই মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখছে, এখন অবধি মুখটা খুলতে পারেনি সে, সে টের পাচ্ছে এই মহিলাকে সে ভয় পাচ্ছে কাছ থেকে। আশ্চর্য তো!

প্রেরণা একা একা বকবক করেই যাচ্ছে,নানা রাজ্যের আলাপ। আলাপ এসে থামল ইনশিরাহতে,হেসে বলল,“ওকে আমি কিছু গাব কিনে দেব। রাশিয়ান গাব, খুব মজা, এখানে দেখলাম উঠেছে নতুন নতুন। নিয়ে যেও,কেমন?”

ইরফান ঘাড় কাত করে। প্রেরণা আজ দুপুরে রিতুর কাহিনী সম্পর্কে ইরফানকে একটা কথাও বলে না,সে ইরফান-প্রণমি প্রসঙ্গেই যায়না,বলে,“চলো এবার এ ব্লকে যাই। মাছ কিনবো। যাবে তুমি।”

ইরফান ভদ্র ছেলের মতো উপর নিচ মাথা নাড়ে, ঠিক সে সময়েই সেখানে এসে উপস্থিত হয় জামির মা ওয়াহিদা। প্রেরণাকে দেখেই উৎফুল্ল হয়ে বলে,“কেমন আছো প্রেরণা?”

_এই তো আন্টি ভালো। আপনি?

_আমিও ভালো।

এবার জামির মা ইরফানকে দেখে একপলক, অবাক হবার ভান করে প্রেরণাকে বলে,“ওমা তোর ভগ্নিপতি যে। জানো প্রেরণা,কি ভালো ছেলে। একেবারে নরম দিলের একটি ছেলে। ওর মত ছেলেই হয়না।”

এসব ছিল জামির পরিকল্পনা, আজ এখানে সব বন্ধুদের বাবা-মাকে এনেছে তাদের মিশনে, সবাই এসে এক এক করে প্রেরণার সামনে ইরফানের প্রশংসা করে গেলে প্রেরণা ইরফানকে নিয়ে কিছুটা হলেও পজিটিভ ভাবতে শুরু করবে। তারপরের প্ল্যানও রেডি তাদের।

জামির মায়ের মুখে প্রশংসা শুনে প্রেরণার চোখতো কপালেই সেই সাথে ইরফানেরও। অস্বস্তিতে কেশে ওঠে ছেলেটা। এতটা প্রশংসা করার মত কাজ সে তার সারাজীবনে করেছে কিনা সন্দেহ।

আড়াল থেকে নিক্সন জামিকে বলে,“ভাই তোর মা ওভার অ্যাক্টিং করছে। ধরা পরে যাবো।”

ওয়াহিদা একটানা সাত মিনিট ইরফানের প্রশংসা করে চলে যায়। প্রেরণা ঘুরে তাকায় ইরফানের দিকে, ইরফান চোখ নামিয়ে নেয়। পর পর বলে,“আন্টি একটু বাড়িয়ে বললেন আপু, আমি একদিন তাকে হেল্প করেছিলাম। জানতাম না উনি জামির মা, জানলে হেল্প করতাম না।”

_যাক,তবে সত্যিটা স্বীকার করলে।

হাঁটছে প্রেরণা, পাশাপাশি হাঁটছে ইরফান। এরপর হলো তারা শুভর বাবার মুখোমুখি, শুভর বাবাও দীর্ঘ সময় ইরফান আর মির্জা বাড়ির প্রশংসা করে চলে যেতেই প্রেরণা একটা লম্বা শ্বাস ফেলল। ঘুরে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,“চলো, কফিশপে বসি। মাছ পরে কিনবো।”

প্রেরণার হঠাৎ মুড বদলানোর কারণ ধরতে পারলো না ইরফান, ওরা বিল পে করে বাইরেই একটা কফিশপে বসল। ইরফানের মুখ হাসি হাসি ছিলো। ঠিক তখুনি কফি অর্ডার করে প্রেরণা ওর দিকে শান্ত দৃষ্টি বুলিয়ে নম্র স্বরে বলল,“তোমরা ছাব্বিশের সবল যুবক,অথচ খুব বাচ্চা এখনো সবাই।”

ইরফান কিছু বুঝল না,তার দৃষ্টিতে প্রশ্ন। প্রেরণা নির্বিকার চিত্তে বলে ওঠে,“এগুলো কেন করছো? কার বুদ্ধিতে? জামির?”

ইরফান থতমত খায়, প্রেরণা সামান্য হেসে বলে,“এমন বুদ্ধি ওরই হতে পারে। মাথামোটা একটা!”

অস্বস্তি ছেয়ে যায় ইরফানের পা-মাথা। রাগ হয় জামি প্রিতমের ওপর, ওদের কথা শোনাই ভুল হয়েছে,কেমন লজ্জার ব্যাপার হল। ধারালো বুদ্ধির জ্ঞানী আপা ধরে ফেলেছেন।

হাঁফ ছাড়ল প্রেরণা,তবে বলল না কিছু। বলল ইরফান,সব প্ল্যান ভারমে যায়ে, ছটফট করে উঠল ছেলেটা, চঞ্চল হলো দৃষ্টি,আকুল হলো স্বর,“আপু প্রণমিকে চাই।”

_ঠিক ভাবে বলো। প্রণমি পুতুল না,যে ওকে তুমি চাইবে আমার কাছে।

শ্বাস ফেলল ইরফান,বলল,“আপু প্রণমির সাথে বিয়েটা আমি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। প্লিজ ডিভোর্সের কথা ভাববেন না এবং আমাকে একটা সুযোগ দিন ওকে রাজি করানোর।”

প্রেরণা শুনল,শুনে খানিকক্ষণ চুপ থেকে শান্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল,“একটা কথা বলো। প্রণমিকে তুমি বৌ হিসেবে চাইছো, তোমার প্রিভিয়াস হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে ওকে কোন ভরসায় আমি তোমার কাছে দিই?”

_আপু অনুভূতি বদলেছে।

_প্রণমির বদলায়নি।

_ও সেই সুযোগটা পায়নি আমাকে বোঝার। সেটাই চাই। এবং আমার বিশ্বাস আমি জিতবো।

কথা বলেনা প্রেরণা, আবারও লম্বা সময়ের নীরবতা । অতঃপর থেমে থেমে প্রেরণা বললো,“অনুভূতি বদলেছে। তুমি কি বদলেছো ইরফান সত্যি করে বলো তো?”

ইরফান চুপ করে চেয়ে রইল কিছু সময়,পর পর নামিয়ে নিলো চোখ, দু'পাশে মাথা নাড়লো, প্রেরণা মৃদু শ্বাস ফেলল,“যাক তবে স্বীকার করলে সত্যিটা, তোমার ফ্যামিলি তো মানতেই চায়না। তাদের দাবি খুব শান্ত হয়েছো তুমি।”

ইরফান কথা বলে না,প্রেরণাই বলতে থাকে,“ভাই ইরফান। ঠান্ডা মাথায় ভাবো, তুমি কেমন আর প্রণমি কেমন। “তোমার প্রণমিকে চাই। প্রণমি বিশ্বসুন্দরী,চোখ ধাঁধানো সুন্দরী, প্রণমির প্রতি তোমার সফট কর্নার জন্মেছে” তোমার প্রণমির সাথে সংসার করার পেছনে এই তিনটা কারণ আছে। যাকে তুমি ভালোবাসা বলে ব্যখ্যা করছো। এখন তুমি আজ রাতে বালিশে মাথা রেখে ভেবে দেখবে, তোমার চাহিদা বাদে প্রণমির কি কারণ থাকতে পারে তোমার সাথে সংসার করার। তোমার মতো অধৈর্য,ছটফটে,মেজাজী ছেলের সাথে সারাজীবন পার করার, তোমার সন্তান জন্ম দেওয়ার। এটা একটু ভেবে দেখবে। হুট করে তোমার রাগ উঠে যায়, হুট করে ধৈর্য্য ভেঙে যায়, হুট করে এই করো, সেই করো। এসব যায় প্রণমির সাথে? সংসার কি আদৌও বোঝো তুমি? তোমার মা,চাচীদের থেকে শুনে নিও আজ। একটা মেয়ের কাছে সংসার মানে কি। তাদের কাছ থেকে ভেবে তুমি হিসাব করবে রাতে, নিজেই দেখবে প্রণমির সাথে তোমার হিসেব মিলছে না। উঠছি আমি, আমার যা কথা বলার সামিন আঙ্কেলকে বলব রাতে। ভালো থেকো।”

প্রেরণা উঠে চলে যায়, চুপচাপ মাথা নিচু করে শান্ত হয়ে ইরফান বসে থাকে কফিশপে, তার অন্যমনস্ক দৃষ্টি জানালার বাইরে।

________

রাতে বাড়িতে ফিরে প্রেরণা বাইরের শাড়ি ছেড়ে একটা সুতি শাড়ি পরে বসলো সোফাতে। সামনে প্রণমি বসা ছিল থমথমে মুখে। ওর দিকেই প্রেরণা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে কল করলো সামিনের কাছে। সামিন তখন ছিলো দোতলায়, ওকে ঘিরেই বসে আছে বাড়ির সব লোক। কলটা রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে প্রেরণা বলল,“আঙ্কেল।”

_হ্যা মা বলো।

_আঙ্কেল ভেবে দেখেছি। সম্ভব না। কাল উকিল ডাকব বাড়িতে। আপনারা আপনাদের ছেলেকে নিয়ে আসবেন।

হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে প্রত্যেকে। ঠিক সেসময় সেখানে এসে দাঁড়ায় ইরফান। প্রেরণার কথা সেও শুনল চুপচাপ।

সামিন ধীর গলায় বলল,“ঠিকভাবে ভেবেছো তো?”

_জি। মাফ করবেন।

খট করে কলটা কাটে প্রেরণা। সামিন‌ ঘুরে তাকায় ইরফানের মুখের দিকে। শক্ত পোক্ত ছেলেটা চুপচাপ মাথা নুইয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।
ইলহাম মির্জা এবার ধৈর্য্য হারিয়ে তেতে উঠলেন, “লাগবে না অমন মেয়ে, লাগবে না। আমি খুব সুন্দর বৌ আনব আমার ছেলের জন্য।”

বলেই তিনি পরিচিত এক ম্যাচমেকারকে কল করে বসে,রাগী রাগী গলায় তাকে বলে,“তিন চারদিনের মধ্যে শহরের সবথেকে সুন্দরী, আঠারো বছরের,নীল চোখের,গান ভালো করে এমন মেয়েদের লিস্ট আমায় দেবেন। যত টাকা লাগবে দেব আমি।”

হতাশ সামিন মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে, ছেলের কষ্টে ব্যথিত হওয়া ইলহামের রাগ দেখে মেজাজ হারিয়ে বলে,“থামবি তুই?”

কল কেটে প্রেরণা প্রণমির দিকে তাকায়, গম্ভীর স্বরে বলে,“চল খেতে চল। ভাত খাবো।”

প্রণমি দু'পাশে মাথা নেড়ে অস্ফুটে বলে,“খিদে নেই। খাবো না।”

_কেন? সমস্যা কি?

কিছু বলল না প্রণমি, চুপচাপ চলে গেল ঘরে। ওর ঘরের দরজার দিকে প্রেরণা তাকিয়ে রইল তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে।

_______

রাত বারোটার কাছাকাছি তখন, হঠাৎ প্রেরণার ফোনটা বেজে উঠল ওর মাথার কাছে, ঘুমঘুম চোখে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইহান বলে উঠল,“প্রেরণা।”

ধড়ফড়িয়ে উঠল প্রেরণা,ঘুম চোখে নাম্বারটা ঠিকভাবে খেয়াল করেনি সে। চোখ ডলে নিয়ে ধাতস্থ হয়,পর পর বলে,“আপনি কি এত রাতে প্রস্তাব দিতে কল করেছেন ভাইয়ের হয়ে?”

বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ সিগারেট ফুঁকছিল ইহান ,অ্যাশট্রেতে আধখাওয়া সিগারেটটা রেখে একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল,“না, অন্যকিছু বলতে।”

_কি বলতে?

_আপনি এত জেদি কেন?

প্রেরণা থমকাল, পরপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,“কোন ব্যাপারে?”

_সব ব্যাপারে।

চলমান........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 103 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন