#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০৪
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
নিজেকে সামলে নেয় দ্রুত ইহান। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ঝিঁঝিঁ পোকা গুলো খুচিয়ে তাকে দিয়ে এইমাত্র তার স্বভাব বিরুদ্ধ একটা কাজ করিয়ে নিল। এত রাতে একজন ভদ্রমহিলাকে অকারণে কল দিয়ে বসেছে সে। ওপাশে হতভম্ব প্রেরণা। তার ঘুম ঘুম কন্ঠস্বর টা ইহানকে আকৃষ্ট করছে খুব, কল কাটতে ইচ্ছে করছে না। ভেবে ভেবেই ইহান লাজুক হাসে, তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে সামলে নেয়।
“সব ব্যাপারে জেদ করি মানে? এই ইহান? আপনি কি ঝগড়া করতে চাচ্ছেন আমার সাথে?”
কথাগুলো কাঠ কাঠ বললেও,ঘুম ঘুম কন্ঠে সর্বোচ্চ কমনীয় লাগল,একটা আলাদা অনুভুতিতে ভাসছে ইহান। বলতে পারছে না কিছু। প্রেরণাই বলতে থাকে,“যা বলার আপনার মাম্মা, আপনার বড় বাবা, মুঈন ভাইয়া আর ইরফানকে বলেছি আমি। যদি এই বিষয়ে আপনাকে আমার বোঝাতে হয় তবে আমি খুবই হতাশ হবো। আপনার কাছ থেকে অন্তত এগুলো আশা করি না।”
নিশ্চুপ হাসে ইহান,পর পর বলে,“কেন? আমার থেকেই আশা রাখেন না কেন?”
থমকায় প্রেরণা, অস্বস্তিতে পা-মাথা ছেয়ে যায়। লোকটার কন্ঠস্বর কেমন যেন ঠেকে,অতি নমনীয়। পুরুষের কন্ঠের আবেদন বোঝাটা জটিল কিছু নয়। রাত বিরেতে কল করেছে আবার। এতো সাহস কই পায় এ? প্রেরণার অস্বস্তি হয় এতেও, ছটফটিয়ে বলে,“কাল আসবেন। রাখছি। আমি বিতর্কে জড়াতে চাচ্ছি না। ধন্যবাদ।”
ইহান কিছু বলবে তার আগেই খট করে কল কাটলো প্রেরণা। ফোনটা চুপচাপ রেখে বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে ইহান আকাশ দেখে রাতের।
_________
বাড়িতে প্রসেস করা মাছ ঢুকছে, মাংস ঢুকছে। বিভিন্ন স্ন্যাকস আইটেম ঢুকছে। প্রেরণা ভীষণ ব্যস্ত সকাল থেকে রান্নাঘরে, ইনুকেও টেনে এনেছে। রাজ্যের রান্না হচ্ছে বাড়িতে। মনটা প্রেরণার খুশি,রাদিফ সুস্থ হয়েছে, দ্রুত ওর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই ফ্ল্যাট প্রেরণা ছাড়বে ভাবছে, ইতিমধ্যে বিজ্ঞাপন দিয়েছে।
মিস জেনি এসে মলিন মুখে কিচেনে দাঁড়ায়, উৎফুল্ল প্রেরণার মুখটা দেখে বলে,“এত রান্না কেনো?”
কচুরির রুটি বেলতে বেলতে প্রেরণা বলে,“আত্মীয় আসবে আজ,জানেন না?”
ইনু শুকনো মুখে খুন্তি নাড়ছে,একটু পর পর দীর্ঘশ্বাস ফেলছে শুধু।
মিস জেনি বলে ওঠে,“আসবে তো ডিভোর্স দিতে। এসব খাবে তারা?”
_বুঝদার হলে খাবে। অবুঝ হলে খাবে না।
মিস জেনির রাগ ধরে গেল প্রেরণার ত্যাড়া কথায়,তিনি তার মনের উত্তরটা না দিয়ে পারল না,“সবাই অবুঝ। আর সুবিবেচক একমাত্র তুমিই?”
শান্ত ভঙ্গিতে ঘুরে তাকায় প্রেরণা, মিস জেনি বলে যায়,“স্বীকার করো প্রণমি ভালো শ্বশুর বাড়ি পাবে?”
_করি। মির্জা পরিবার অসাধারণ। আমার ইরফানকে নিয়ে দ্বন্দ্ব মনের ভেতর।
আবারো রুটি বেলায় মন দেয় প্রেরণা।
_স্বীকার করো তুমি যদি প্রণমিকে ইরফানের থেকেও উত্তম কারো সাথে বিয়ে দাও পরবর্তীতে, তবে সেখানে এতো অমায়িক, অসাধারণ শ্বশুর বাড়ির মানুষ নাও থাকতে পারে,হতে পারে তারা প্রণমিকে কষ্ট দিল?
_জি স্বীকার করি,হতেও পারে।
_তখন স্বামীসুখ দিয়ে কতটুকুই সুখ পাবে সে? সবদিক বিবেচনা করতে হবে প্রেরণা। প্রণমির অবস্থা আর পাঁচটা মেয়ের মতো নয়। ওর সবাইকে প্রয়োজন। এটা তুমি জেদ করে মানতে চাইছো না। প্রেরণা ইরফানকে আমি বিগত দুই মাস ধরে দেখেছি ছায়ানটে। আমার ধারণা বদলেছে অনেকটাই।
প্রেরণা আর কোন জবাব দেয়না মিস জেনির কথায়, উল্টো প্রিতমকে ডাকে,“ড্রয়িং রুমে আরো কিছু চেয়ার দে না প্রিতম।”
প্রণমি চুপচাপ বসেছিল, বিছানার চাদর খামচে ধরে। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে নিতে নিতে প্রেরণা ঢুকল, প্রণমি আপুকে টের পেয়ে সতর্ক হয়ে মুখটাকে স্বাভাবিক করে রাখল। প্রেরণা কিছু না বলে ওকে মিনিট খানেক দেখে চুপচাপ আলমারি থেকে একটা লাল রঙের একেবারে নতুন সালোয়ার কামিজ বের করে বিছানায় রেখে বলে,“গোসলের পর এটা পরবি।”
_কি?
_লাল সালোয়ার স্যুট।
_কেন?
_মেহমান আসবে শুনলি না?
_সাজার কি আছে? তালাকই তো হবে।
কথাগুলো বলতে বলতে জিভ আড়ষ্ট হয় প্রণমির,থেমে যায়। প্রেরণা ওকে চেয়ে চেয়ে দেখে, নির্বিকার চিত্তে বলে,“পরে নিস।”
বেরিয়ে যায় প্রেরণা, সাথে সাথে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় প্রণমি। সারারাত না ঘুমিয়ে তার শরীরটা কাঁপছে এখন, মিস জেনিকে ধরে কেঁদেছে সারারাত, কেনো কেঁদেছে জানে না সে,নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছে, উত্তর দেয়নি কেউ।
________
সামিনের ফোন থামছে না। সকাল দশটা থেকে শুরু করেছে। প্রেরণা পনের মিনিট পরপর কল করছে,বলছে,“আঙ্কেল আপনারা কই? কতক্ষণে আসবেন? ইরফান কোথায়?”
উত্তর দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত সামিন। দেড়টা নাগাদ তৈরি হয়ে ইনশিরাহর ঘরের সামনে যায়, দরজায় নক করতেই মুঈন দরজা খুলল।
_যাবে না? রেডি হও।
মুঈন দোনামোনা করছে,“বাবা,আপনারা মুরব্বিরা যান। আমি কেন?”
_প্রেরণা বলেছে বাড়ির সব পুরুষ লোক যেন থাকে।
মুঈন মৃদু শ্বাস ফেলে বলে,“আসছি।”
তৈরি সবাই,তবে ইরফানের কোনো সাড়াশব্দ নেই। শেহা ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিল। ইরফান শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। এক নজরে ঘরের সবটা দেখল শেহা, বিছানা সে গতকাল বিকেলে যেভাবে গুছিয়ে রেখে গিয়েছে ঠিক সেভাবেই আছে। এই লোক পিঠ দেয়নি বিছানায়, তবে কি ঘুমায় নি? তাজ্জব হয়ে আয়নায় ইরফানের প্রতিবিম্বের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলে,“রাগী মির্জা।”
_আয়।
নম্রস্বরে বলতেই শেহা ভেতরে ঢোকে,ইরফানকেই দেখে অবাক চোখে, দেখতে দেখতে বলে,“তুমি সত্যিই তালাক দেবে?”
অসুস্থ মানুষের মতো হাসে ইরফান,“তোর কি মনে হয়?”
_মনে হয় ত্যাড়ামি করবে।
ইরফান ওর গালে চাপড় মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,“তুই আমায় সবথেকে ভালো বুঝিস,তবে এই ব্যাপারে তোর ধারণা ভুল।”
_দেবে তালাক? ভালো থাকবে? দেবদাস হয়ে ঘুরবে যে? এটা মানায় না তোমার সাথে।
দাঁড়ায় ইরফান, ঘুরে বলে,“কি মানায়?’
_তুমি যা করে বেড়াও সেসব কিছু।
ইরফান হেসে বেরিয়ে যায় চুপচাপ। শেহা দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ইনুকে কল করে,ইনু কল রিসিভ করে কাঁদছে। উত্তেজিত হয় শেহা,“কাদছিস কেন?”
_আপু মানলো না। উকিল এসেছে,কাজী এসেছে।
_আর প্রণো?
_ও কি বলবে?
_ওকে দে।
ইনু প্রেরণাকে লুকিয়ে প্রণমির কাছে যায়, আশেপাশে চোখ বুলিয়ে ব্যগ্র কন্ঠে বলে,“শেহা একটু কথা বলতে চায় প্রণো, একটু ধরো।”
______
আলো বলল,“আমি যাই? শেষ বারের মত বুঝিয়ে দেখি।”
সামিন কপাল কুঁ'চ'কে নেয়,“না এটা বাড়াবাড়ি হবে।”
আলো মলিন মুখে ইরফানকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখে আড়াল হলো। ইরফান নামতেই ইহান বলল,“তোর মনে কি চলছে জানি না। তবে সবার সামনে সিনক্রিয়েট না করার অনুরোধ। মত প্রকাশের নানা পথ আছে।”
জবাব দেয়না ইরফান। গোটা রাস্তায় কথাও বলেনা। প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছেছে তারা দু'টো নাগাদ। সব গুছিয়ে প্রেরণা আয়েশী ভঙ্গিতে দরজা খুলল, তার মুখ হাসিহাসি। ওর মুখের হাসি দেখে মির্জা বাড়ির পুরুষদের মুখ থমথমে হয়। ইহান তাকিয়ে আছে, মনে মনে সে অবশ্য বলে দেয়,“আজ আপনার হাসি অসুন্দর লাগছে প্রেরণা।”
সবাইকে বসতে বলে প্রেরণা ইরফানকে দেখল একনজর। যার মুখের কোনো ভাব নেই। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে আছে, চুপচাপ, বাবার পাশে।
নিউ মার্কেটের কাজী সাহেব আফতাব উদ্দিন এসেছেন, তাকে দেখাচ্ছে অপ্রস্তুত। এই প্রথম কোনো তালাক অনুষ্ঠানে এসেছে সে, চারদিকে খাবারের সুঘ্রাণে মঁ মঁ করছে। আড়চোখে বারকয়েক ইরফানকেও দেখেন তিনি। দেখে ঢোক গিলে নেয়।
প্রিতম আসেনি বসার ঘরে, আপুর ওপর অজানা কারণে মেজাজ বিগড়েছে তার, ওর মন আপু পড়ে ফেলে কষ্ট পাবে, তাই আসেনি। ওর ঘরে জামিরাও বসেছিল থমথমে মুখে।
প্রণমির ঘরে ঢুকেই প্রেরণা ধাক্কার মতো খায়। লাল সালোয়ার স্যুট গায়ে জড়িয়ে প্রণমি কাঁদছে। নিশ্চুপ কাঁদছে। প্রেরণা ছুটে যায়,আগলে ধরে বোনকে। এক গালে হাত রেখে বলে,“এই বোকা মেয়ে কাদছিস কেন?”
প্রণমি জানেনা কাঁদছে কেন,সে জানে না, হাঁপাতে হাঁপাতে আপুকে বলে,“আপু তুমি আমাকে ধরে রাখো। আমার আর কিছু লাগবে না। তুমি ধরে রাখো শুধু।”
অনিমেষে চেয়ে রইল প্রেরণা ছটফট করতে থাকা বোনের মুখবিবরে। দেখে নেয়,পড়ে নেয় ওকে। অবুঝ মেয়েটা নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগছে, জ্বলছে। প্রেরণার বুক পোড়ে। বোনকে জরিয়ে ধরে কান্না চেপে রেখে বলে,“কি চাস তুই? কি চাস বল?”
প্রণমি বলে না,শুধুই ফোপায়। একসময় ফোঁপানিও বন্ধ হয়, থেমে গিয়ে বলে,“আপু আমি সম্ভবত পাগল হচ্ছি। আবার আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে প্লিজ? উল্টো পাল্টা ভাবছি আমি,যা ভাবা উচিত নয়।”
প্রেরণা কোনো জবাব দেয়না, শুধুই বোকার মতো দেখতে থাকে বোনকে। দু'হাতে দু চোখের পানি মুছে প্রণমি লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“চলো আপু।”
শান্ত হলেই প্রণমিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরোয় প্রেরণা। ইরফান এই বার মেঝের কার্পেট থেকে দৃষ্টি তুলে প্রণমিকে দেখল। শ্যামলা মুখটা আরো অন্ধকার হলো নিমিষেই, প্রণমির গায়ে লাল, ঐ দূর্ঘটনার বিয়ের দিনেও লাল পরেছিল প্রণমি। আজ বুঝি উদযাপন করছে মেয়েটা লাল পরে? খুশি হয়ে? এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে ইরফান বড় বাবার দিকে তাকায়, সামিন তারই দিকে তাকিয়ে আছে। ইরফান তাকায় পাপার দিকে,ইলহামও তারই দিকে তাকিয়ে আছে। ছটফটানি দমিয়ে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে ইরফান মেঝের কার্পেট দেখে আবার।
ইনু আর মিস জেনি এসে দাড়িয়ে থাকে এক কোণে। প্রিতম ও তার বন্ধুরাও আসে। প্রেরণা ইরফানের বন্ধুদেরও ডেকে নিয়েছে যারা বিয়েতে সাক্ষী ছিলো। প্রত্যেকেই মলিন মুখে দেখছে প্রণমিকে। প্রেরণা যাকে টেনে ঠিক ইরফানের মুখোমুখি সোফায় বসিয়েছে। ইরফান আবারো চোখ তুলে দেখছে প্রণমিকে, শান্ত নদীর মতো মেয়েটা, স্নিগ্ধতা ঠিকরে পরছে শরীর থেকে। কে যেন হঠাৎ ওর কানের কাছে বলে ওঠে,“তালাক দিবে,মানেই হচ্ছে ঐ মেয়ে আজীবনের তরে তোমার জন্য হারাম।”
শিউরে উঠছে ইরফান,তবে শান্ত রাখছে নিজেকে। তাকায় প্রেরণার দিকে, ভদ্রমহিলা নির্লিপ্ত। প্রেরণা একটা চেয়ার টেনে বসল এইবার, এইবার কাজীর দিকে ফিরলো, মুখ হাসি হাসি করে বলল,“বিয়ে পড়ান।”
কাজী তব্দা খেল। কেশে উঠল। এবং তব্দা খেয়ে গেল ওখানে উপস্থিত প্রত্যেকে। প্রেরণার মুখ হাসি হাসি,সামিনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“আজ বৌ নিয়ে যেতে পারবেন না। বিয়ে পরানো থাকবে শুধু। অনুষ্ঠান হবে। তারপর বৌ নেবেন।”
খামচে ধরে প্রণমি নিজের সালোয়ার স্যুটের ওড়না,চোখের পাতা কেঁপে ওঠে আপুর কথা শুনে, নিমিষেই হাঁসফাঁস করে ওঠে অন্দর, কেঁপে ওঠে শরীরটা, কাঁপে গলা, অস্ফুটে বলে,“আপু।”
ইরফান বোকার মত দুই বোনকে দেখছে,প্রেরণা হাই তোলার ভান করে প্রণমিকে বলছে,“কাল সারারাত ঘুমাসনি,আমাকেও ঘুমাতে দিসনি। এইসব চুকে গেলে ঘুমাবো আমি। একটা লম্বা ঘুম।”
ইরফান ছটফটিয়ে ওঠে,ওর কন্ঠে আকুলতা,“আপু।”
প্রেরণা দৃষ্টি দেয় ওর দিকে, এবার চোখমুখ শক্ত করে বলে,“পাত্র হিসেবে তোমাকে আমার বোনের জন্য পছন্দ নয়। আমার বোকা বোনের সম্ভবত পছন্দ। দুই মাস ছায়ানটে কি করেছো কে জানে। যাই হোক, বিয়ে পড়ান কাজী সাহেব। আমার ঘুম পাচ্ছে।”
ইহান আর মুঈন একে অপরকে দেখছে শুধু। ইলহাম মির্জার মুখটা হয় উজ্জ্বল, উঁচু গলায় বলে ওঠে,“বিয়ে পড়ান। বিয়ে পড়ান।”
ওখানের কেউই হতভম্ব ভাব কাটাতে পারছে না। ঠিক তখুনি প্রণমি কান্নাভেজা কন্ঠে বলে ওঠে,“আপু। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়ে কিছু বুঝতে তাইনা।”
প্রেরণা স্বাভাবিক গলায় জবাব দেয়,“জীবনটা তোর। সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়স হয়েছে। তোর ইচ্ছেতে কর সব। আপু হিসেবে সবসময় পাশে পাবি। শুধু বলব,যা করবি ভেবে চিনতে করবি। আবেগ জিনিসটা বড্ড খারাপ প্রণমি।”
প্রণমি অস্থির শ্বাস ফেলছে,বলছে,“আপু আমার ছটফটানির এমন মানে নয়।”
_কেমন মানে?
প্রণমি বলতে পারেনা কিছু। তার আপু কষ্ট পাবে আজ তার কারণে? কখনো না। বলে ওঠে,“আমি ওনাকে সুযোগ দিতে চাইনা। তুমি এসব বন্ধ করো। প্লিজ বন্ধ করো।”
হাসল প্রেরণা এবার ছোটো মেয়েটার অবুঝপনা দেখে, বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় সে প্রণমিকে,প্রণমি কাঁদছে আবারো,নিজেকে সামলাতে পারছে না। লাগুক তার লোকটার জন্য খারাপ,সে আপুকে কাদাবে না। তার মা-বাবাকে কাদাবে না। কখনো না।
বোনের চোখের পানি মুছে দেয় প্রেরণা, একপলক ইরফানের দিকে তাকায়, অতঃপর ধীর স্থির বোনকে বলে,“সুযোগ দিতে চাসনা?”
_না
নাক টেনে বলে প্রণমি।
_বিয়ে হোক চাসনা?
_না।
এবারও নাক টেনে বলে প্রণমি।
_পছন্দও করিসনা ওকে?
_না।
প্রেরণা হাসে মৃদু,অবুঝ আবেগে কাঁদতে থাকা, ছটফট করতে থাকা অষ্টাদশী বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“ঠিক আছে। তবে এটা আরেঞ্জ ম্যারেজ হোক। নানাভাই আপনি বিয়ে পড়ান তো।”
সংকোচে গুটিয়ে যায় প্রণমি। ইরফান দেখছে প্রেরণাকে। প্রেরণাও ওর দিকে হাসিহাসি দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ঘর কাঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
চমকে উঠল প্রত্যেকে, তড়পাচ্ছে প্রেরণা। কান্নার তোড়ে গুমোট হয়েছে পরিবেশ। প্রেরণা শুধু ইরফানের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিল,ওকে কিছু বলতে চাইছে,পারছে না কান্নার বেগে।
ওর তড়পানি দেখে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায় ইরফান। দ্রুত গিয়ে প্রেরণার পাশে বসে প্রেরণার হাত দু'টো মুঠি করে ধরে, প্রেরণা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“আমার প্রণো, আমার প্রণো।”
ভদ্রমহিলার অসহায় দুটি ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে ইরফান দম ফেলে, অবনত কন্ঠে বলে ওঠে,“আপু? কেন এমন করছেন? দিতে হবে না বোনকে। আপনার বোনকে আপনি রেখে দিন।”
প্রেরণা কাঁদতে কাঁদতে দু'পাশে মাথা নাড়ে,ওর হাত দুটো আরো শক্ত করে ধরে ইরফান, আকুল হয়ে বলে,“আপু। যদি মনে করেন বোনকে আর কোথাও বিয়ে দিতে পারবেন না তাই নিরুপায় হয়ে আমাকে বেছে নিতে হবে তাহলে আমি বলব,প্লিজ না। আমি ওকে তালাক দিয়ে যাবো আজ। সত্যি বলছি আপু, কিছুক্ষণ আগেও আমার বুক পুড়েছে,মন চেয়েছে জেদ করে বলেই দিই ওকে তালাক আমি দিচ্ছি না। তবে এখন বলছি,আপনি যদি মুখ থেকে একবার স্বীকার করেন প্রণমিকে নিয়ে আপনি অসহায় সেটা ভেবে আমার হাতে তুলে দিচ্ছেন তবে আমি তালাক দিয়েই যাবো আজ। আপনি বলেন, আপনি নিরুপায় হয়ে দিলেন? বলেন আপু! একটুও কি ভরসা পেলেন না? আচ্ছা ভরসা বাদ এক বিন্দুও কি প্রত্যাশা জাগছে না আমার ওপর? এক বিন্দুও না?”
প্রেরণা হাত সরিয়ে নেয়, বড় বড় শ্বাস ফেলে, উপর নিচে মাথা ঝাঁকায় শুধু। মুখে কিছু বলে না।
দম ফেলে ইরফান। তাকায় প্রণমির দিকে, প্রেরণাকে আকরে ধরে গুটিয়ে আছে মেয়েটা, ওকে বলেনা কিছুই। ওর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে কাজীকে বলে,“বিয়ে পড়াতে শুরু করেন আবারো। তার যদি সায় থাকে কবুল বলবে। সায় না থাকলে উঠে যাবে। আমি চুপচাপ তিন তালাক উচ্চারণ করে বেরিয়ে যাবো। আজ হয় ভালো কিছু শুরু হবে নয় খারাপ কিছু শেষ হবে। আপনি বিয়ে পড়ান।”
কাজী তাকালেন প্রেরণার দিকে, আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে প্রেরণা কাজীকে সায় দিল, কাজী তাকালেন মির্জাদের দিকে। সামিন মাথা নাড়লেন।
প্রিতম আর ইরফান গ্যাংয়ের প্রত্যেকের শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রণমি কবুল বলছে, ততক্ষণে তারা নিঃশ্বাস নেবে না এমন ভাব।
ছটফটানি কমেনা মেয়েটার। এ এক অসহ্য আবেগ, শেষ করে দিচ্ছে তাকে। কি হচ্ছে এসব তার? ওদিকে কাজী বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন। প্রণমির চোখের পানি ফেলা থামে না। কাজী বারবার বলছে,“কবুল বলো।”
বলছে না প্রণমি কবুল। ইরফানের দৃষ্টিতে আজ অস্থিরতা নেই। সে শান্ত এখন,দেখছে জ্ঞানী আপার আদরের বোনের গাল বেয়ে ফোটায় ফোটায় গড়িয়ে পরা পানি, যেগুলো তার গালের লাল তিল ছুঁয়ে নামছে।
উদ্বিগ্ন প্রেরণা,বোনকে আগলে নিয়ে বলে,“কি রে? শরীর খারাপ লাগছে?”
_ওকে সময় দিন আপু। কান্না থামুক। কবুল আস্তেধীরে বলুক।
ভীষণ ধৈর্য্য ইরফানের,এই কথাটা বলে সেটাই বোঝাল। বাড়ির সবাই হা করে ওকে দেখছে।
প্রণমির হাবভাব ঠিক নেই। শত চেষ্টা করেও স্থির রাখতে পারছে না নিজেকে। এই লোককে সে চাচ্ছে সুযোগ দিতে, আবার মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে এই লোককে আজীবন সহ্য করতে হবে এটা ভেবে। এই অস্থিরতার নাম কি? “এটা ঢঙের অস্থিরতা”। প্রণমি নিজেই একটা নাম দিয়ে দু'চোখ বন্ধ করল, দু'চোখ থেকে গড়িয়ে পরল জ্বল, তারপর চোখ মুখ খিচিয়ে আস্তেধীরে বলল,“কবুল।”
বলতে দেরি,বাকিদের চিৎকার দিতে দেরি নেই,ইনু আর ইরফানের বন্ধুরা নাচানাচি শুরু করে দিল। ইরফান শুধু চেয়ে রইল প্রণমির মুখের দিকে নির্নিমেষ। প্রেরণা বোনকে ছেড়ে পিঠ এলিয়ে দিল সোফায়। আবারো দুচোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল,“পানি খাবো। কেউ পানি দাও।”
________
বাইরের ঘরে আলোচনা চলছে। প্রণমিকে কবে মির্জা বাড়িতে নেয়া হবে সেই ব্যাপারে। প্রণমির কানে ওসব কিছু যাচ্ছে না। সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে। কবুল বলার পর থেকেই যে ঘোর থেকে সে বেরুতে পারেনি। শরীরটা ছেড়ে দিয়েছিল। তাকে এখানে ধরে ধরে এনেছে ইনু আর মিস জেনি। বসিয়েছে বিছানায়। এর মাঝে কত সময় গড়িয়েছে। ডাইনিংয়ে সবাই খাওয়া দাওয়া করেছে। শুধু ঠিক হতে পারেনি সে, বুক কাঁপছে তার, তার বিয়ে হয়েছে? তার অপছন্দের লোকটার সাথে? তাকে সুযোগ দেওয়ার অভিপ্রায়ে চোখ থেকে পানি ঝরিয়েছে সে? থরথরিয়ে কাঁপছে প্রণমি। এসব হচ্ছে টা কি তার?
একটা সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে দেয় সামিন। প্রত্যেকে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে ডেজার্ট খেতে খেতে আলোচনা সেরে নেয়। প্রেরণা চুপচাপ শুনছে ও বাড়ির মুরব্বিদের কথা। তার পাশে ইরফান, যে কবুল বলার পর থেকে সেই যে দৃষ্টি নত করেছে আর তোলেনি,দুই লোকমা ভাতও খায়নি ঠিকভাবে ছেলেটা। প্রেরণা ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে দেখল,পর পর নিচু গলায় বলল,“এত ভং ধরতে হবে না। শুধরাতে বলেছি, নিজস্বতা বাদ দিতে বলিনি। বিয়ে করে আনন্দ পেলে দাঁত বের করে হাসতে পারো।”
ইরফান মাথা তুলে প্রেরণাকে দেখল। তবে কিছু বলল না। আবারো মাথা নিচু করে বসে রইল। প্রেরণা সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,“তাহলে ঐ কথাই রইলো। দশ তারিখে তুলে নেবেন। আমার সময় চাই ক'টাদিন, প্রস্তুতি নিতে হবে। আমার বোন ছোটো,ওকেও একটা সংসারের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত করতে হবে,অনেক কিছু শেখাতে হবে। এর মাঝে ওরা ফোনে কথা বলুক সপ্তাহ খানেক।”
সামিন,ইলহাম, ইশমাম,ইহান কিংবা মুঈন কেউই দ্বিমত করে না। সামিন উঠবে এখন, বাড়ির মহিলাদের কিছু জানায়নি,বাড়িতে গিয়ে সারপ্রাইজ দেবে বলে। তাড়াহুড়ো তার আচরণে,সবাইকে তাড়া দিচ্ছে,“চলো ওঠো সবাই, বেরোই এখন।”
মুঈন তার শ্বশুরকে দেখে হতাশ, ইনিও নাকি একসময় পাগল প্রেমিক ছিলেন তার শাশুড়ির। ভাবা যায়?
সামিন জামাইয়ের দৃষ্টি দেখে নিচুগলায় বলে,“কি? উঠব না? বাড়িতে সবাই চিন্তা করছে।”
_আপনারা যান। আমি ইরফানকে নিয়ে আসব, প্রণমির সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলবে না?
মুঈনও নিচুগলায় বলল। সামিন লজ্জা পেল, সে ভুলেই গিয়েছে এসব, লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসে। প্রেরণা আর প্রিতমকে বলে বেরিয়ে যায় ওরা। থেকে যায় শুধু মুঈন,ইরফান।
ইরফান তখনো শক্ত হয়ে বসে আছে। ঘামছে সে। মুঈন ওর বেহাল দশা দেখে হাসে, ছটফটে দুরন্ত ছেলেটাও নাকি ঘামছে নার্ভাসনেসে,ভাবা যায়?
দৃষ্টি ঘুরিয়ে সে প্রেরণাকে বলে,“আই থিংক দু'জনের পাঁচ মিনিট আলাদা কথা বলতে দেয়া উচিত,তাইনা প্রেরণা?”
এবার প্রেরণাও লজ্জা পেল,এই ব্যাপারটা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকা ইরফানের দিকে তাকিয়ে প্রিতমকে দেখে,প্রিতম চোখ দিয়ে ইশারা করে বোনকে অনুমতি দিতে। প্রেরণা ধীর স্থির মাথা নেড়ে ইরফানকে বলে,“যাও।”
ধীরে ধীরে উঠল ইরফান,আড়ষ্ট কদমে এগিয়ে যায় প্রণমির ঘরের দিকে। ঘরের দরজায় কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে প্রণমি নড়েচড়ে বসল। টের পেল কেউ দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। নাকে এল সেই স্বল্প পরিচিত ঘ্রাণ। বুঝলো প্রণমি লোকটা কে। ইরফান ওকেই দেখছে নিস্পন্দ নয়নে, দরজায় ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে টানটান হয়ে। অতঃপর ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে বসল প্রণমির সম্মুখে। কথা বলছে না ইরফান,কথা বলছে না প্রণমি । তবে প্রণমি টের পাচ্ছে কেউ তাকে দেখছে, তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে তাকে।
ঠিক তখুনি প্রণমির মাথায় এই প্রথম একটি প্রশ্ন এল, কৌতুহল জাগলো,“এই লোকটা কেমন দেখতে?” এর চোখ দুটো কেমন? যে দুটো দিয়ে প্রণমিকে দেখছে?
ইরফান উঠে বসল প্রণমির পাশে,ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়েই থাকল গোল মুখে। প্রণমি গুটিয়ে বসল। চলতেই থাকল নীরবতা, সেকেন্ড গড়ায়, মিনিট গড়ায়, হঠাৎ কারো আশ্লেষে থরথর করে কেঁপে উঠল প্রণমি। খামচে ধরল বিছানার চাদর, ঘাবড়ে গিয়ে বলল,“ক-করছেন কি?”
জবাব ইরফান দেয়না,সে একটি কথাও বলে না,বলবে না সে একটি কথাও। দু'হাতে আগলে নেয় প্রণমির গাল দু'টো, গাল দুটোতে চুমুর বর্ষণ নামায় অস্থির ভঙ্গিতে। এ যে সে বর্ষণ না। ঝুম বর্ষণ। সামলাতে পারেনি প্রণমি এ অকস্মাৎ আক্রমণ। থরথর করে কেপেই যাচ্ছে, কাঁপতে কাঁপতে বলেই যাচ্ছে,“ছা-ছাড়ুন।”
ঐ মানুষটা নীরব,তার গালে যত জবাব দিচ্ছে। এ কেমন পাগলামি? প্রণমি হাঁসফাঁস করছে। কাঁপা স্বরে বলছে,“আ-আপুকে ডাকবো।”
ইরফান চুমুর বর্ষণের গতি বাড়িয়েছে। প্রণমি নিজের হৃদয় সামলাতে পারছে না,ওদিকে কাঁদো কাঁদো হয়ে হুমকি দিচ্ছে,“না-লিশ করব।”
“ডা-ডাকবো আপুকে?”
“ডা-ডাকলাম আপুকে।”
“শু-শুনুন।”
কেউ শুনলোই না। প্রণমির দু গালে মোট একশো আটানব্বই টা চুমু দিয়ে ক্ষান্ত হলো।
চলমান.......