#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০৭
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
ইরফান ঝুকলো কিছুটা। লজ্জায় রক্তাভ মুখটা দেখে লজ্জার কারণ খুঁজে পাচ্ছে না সে,ভরাট গলায় শুধাল,“কি?”
_কিছুনা।
অস্ফুটে বলে প্রণমি মাথা নাড়ায় দু'পাশে। সে হাঁসফাঁস করছে তার বোকা-সরল অনুভূতি নিয়ে,এই বাঁদর টাইপ লোকটাকে জানতে দেবে না সে,কে জানে হয়তো আবার বাঁদরামি শুরু করবে শুনলে, চুমে চুমে লয় করে ফেলবে প্রণমির গাল!
গলা খাঁকারি দিয়ে প্রণমি নত কন্ঠে বলে,“আর কি কি চিনিয়ে দেবেন? চলুন।”
_হাটতে কষ্ট হচ্ছে?
_উহুম!
ইরফান আবারো প্রণমির হাতটা ধরলো,ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো সিঁড়ির দিকে,“এখন আমি আমাদের রুমটাকে চিনিয়ে দেবো,যেখানে তোমার দিনের, তোমার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটবে।”
ভালোলাগায় ঘিরে তো ছিলোই,কথাটা শুনে প্রণমি আরো খানিকটা আরক্ত হয়,তার ভবিষ্যৎ দিনগুলোর কথা ভেবে। সত্যি বলতে এতকিছু কল্পনা করার ফুরসত সে পায়নি। তার আবেগ তো তাকে শুধু বলেছে,“লোকটা থাকুক প্রণো,লোকটা থাকুক। লোকটা থেকে যাক।”
এই লোকটার সাথে বদ্ধঘরে তার জীবন কাটবে ভেবেছে তবে কিভাবে কাটবে সেই দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলে প্রণমির ছোটোখাটো শরীরটা তিরতির করে কাঁপছে। চোখের পাতা কাঁপে প্রণমির বিস্ময়ে,সে এতো বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ? আসলেই? কেঁদে বুক ভাসিয়েছে এমন কিছুর জন্য?
ঘরে ঢুকে ওয়াশ রুম,বারান্দা,জানালা,সেল্ফ সবকিছু হাতে ধরে ধরে চিনিয়ে দিচ্ছে ইরফান। খুব নিকটে প্রণমির সে, লোকটার গা থেকে একটা অদ্ভুত সুন্দর ঘ্রাণ আসছে,এটা ঐ পারফিউম নয় যেটা প্রণমি জানতো,এটা অন্য একটা। এই ঘ্রাণেও প্রণমি তিরতির করে কাঁপছে।
বেলকোনির প্ল্যান্টস গুলোকে ছুঁইয়ে দিয়ে ইরফান ওকে ঘোরালো,প্রণমি বলল,“কোথায় যাচ্ছি?”
_ঘুম।
_বাসর শেষ?
বলেই প্রণমি চমকে উঠল। এসব কি বলেছে সে? ইরফান ওর মুখটাকে ভালো করে লক্ষ্য করে প্রসঙ্গ এরিয়ে গেল যেন বধূ লজ্জা না পায়,বলল,“চলো ঘুমাবে।”
বিছানায় বসে প্রণমি আবারো সংকোচে গুটিয়ে গেলো। তার কি বলা উচিত? ইরফান ওর মুখোমুখি বসলো। এবার ধরলো ওর দু'টো হাত। প্রণমি সতর্ক হলো,ইরফান এতক্ষণের স্বাভাবিকতা সরিয়ে এবার গম্ভীর তবে আকুল হয়ে বলতে শুরু করলো,“বাড়ির হিসেবটা বুঝেছো না?”
_জি।
_এবার তবে আরেকটা হিসাব বুঝতে হবে।
_কিসের?
লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান,“যা হয়েছে,যা ঘটেছে,যা অতীত। এসব পার্ট অব আওয়ার লাইফ প্রণমি। বাট নট দ্য রেজাল্ট অব লাইফ। স্যরি ফর এভরিথিং উইয়ার্ড আই ডিড টু ইউ, প্লিজ এক্সেপ্ট মাই স্যরি। এবং সেই সাথে পারমিশন দাও। আমাদের জীবনের হিসেব ভবিষ্যতে মিলবে তাইনা? তাহলে চলো একসাথে হিসেব কষতে শুরু করি। এটা অনেক সহজ হতে পারে তাইনা? দু'জন মিলে। সে ইয়েস?”
ভীষণ আকুতি ইরফানের কন্ঠে। প্রণমি স্থির হয়ে বসে থেকে মাথা ঝাঁকায়।
স্বস্তির শ্বাস ফেলে প্রণমির হাত ধরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ইরফান নিমেষ হীন। প্রণমি কেমন গম্ভীর,ওর ইতস্তত ভাব দেখে বলল,“কিছু বলতে চাও প্রণো?”
_জি।
ইরফানের মুখটা ফ্যাকাশে হলো হঠাৎ, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,“ডু ইউ নিড সেপারেট স্লিপিং প্লেস?”
দু'পাশে নিশ্চুপ মাথা নেড়ে প্রণো জবাব দিলো,“জি না।”
প্রণমি দেখল না ইরফান বুকে হাত চেপে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরলো একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ত্বরিৎ। বিছানা কাঁপতেই কাঁপল প্রণমি, উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,“কি হয়েছে?”
চাপা আনন্দ আটকে রেখে গম্ভীর কন্ঠে জবাব এলো,“শুয়ে পরলাম। খুব ক্লান্ত তো,তুমি যেখানে বসে আছে ওখানেই শোও। ও পাশটা তোমার।”
প্রণো আরো কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে বলল,“কথা ছিল।”
ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো ইরফান, অনিমেষে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে রইল প্রণমির মুখে,চিন্তা এলো, দু'টো মিষ্টি কথা কি বলবে মেয়েটা? খুশি খুশি গলায় ইরফান বলল,“শিয়র!”
_মশা খুব, মশারী লাগাবেন না?
আবারো মুখটা ফ্যাকাশে হলো ইরফানের, হতাশ হয়ে আবারো চুপচাপ শুয়ে পরলো ধপ করে। প্রণমি বলল,“কি হলো?”
_মেশিন অন করেছি মাত্র,মশারীর প্রয়োজন নেই। শুয়ে পরো,দু'মিনিটে চলে যাবে সব।
প্রণমি আড়ষ্ট হয়েই গুটিয়ে শুয়ে পরলো একপাশে, কেমন অদ্ভুত লাগছে তার। এ কেমন জীবন মেয়েদের? তিন কবুল বললো অমনি একটা পুরুষের সাথে পাশাপাশি শুয়ে গেল? সংকোচ হলেও খারাপ লাগছে না তার। কি আজব মেয়েদের জীবন। কি অদ্ভুত ঐ তিন কবুলের শক্তি। রাতারাতি সত্তা বদলে দেয়। আপুর কাছে আপুর বিয়ের গল্প শুনতো প্রণমি, ভাবতো,“ইশশ কিভাবে আপু দুলাভাইয়ের সাথে প্রথম রাতেই বেড শেয়ার করেছিল?” আজ সে যখন ঐ আপুই হলো, উত্তর টা পেল সে, ঐ যে তিন কবুল? আবেগে হোক,মায়ায় হোক যেটা সে এইবার মন থেকে বলেছে।
ইরফানও শু'লো, সে যে নির্নিমেষ তাকিয়ে তার বৌকে দেখছে এটা তার বৌ যাতে বুঝতে না পারে,যাতে তার বৌ বুঝতে পেরে অস্বস্তিতে মোড়াতে না পারে তাই পরপর কয়েকটা মিছিমিছি হাই তুলে নেয়, শুনিয়ে দেয় সে ঘুমিয়ে পরেছে। নিস্তব্ধ, নিঝুম বর্ষার টিপটিপ বৃষ্টিমুখর ঠান্ডা রাতে,প্রণমি ঘুমিয়ে পরলো কিছুক্ষণ বাদেই। ঘুমালো না ইরফান, নির্নিমেষ শুধু দেখেই গেলো বৌকে। এই পরী তার? কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য!
এদিকে ঘুমালো না প্রেরণা,প্রিতম,মিস জেনি আর ইনু। ইনু জেগে থেকে সবাইকে একটু পর পর চা বানিয়ে খাইয়েছে। বোন বিদায়ের শোকে কাঁদতে কাঁদতে মাথা ধরিয়ে সোফায় গা এলিয়ে পরে আছে ওরা।
প্রণমির আরেকটা সমস্যা আছে,যেটা সম্পর্কে প্রেরণা অবগত করেনি ইরফানকে, ঘুমের মধ্যে হাত পা ছোড়ার অভ্যাস। ঠান্ডা আবহাওয়ায় নিজের চাদর ছেড়ে ঘুমকাতুরে মেয়েটা গুটিয়ে গিয়েছিল ইরফানের কাছে, নিজের চাদর পায়ে ঠেলে টেনে টেনে ঢুকে গিয়েছিল ইরফানের চাদরের নিচে, একেবারে ওর গা ঘেঁষে। শেষ রাতের ঘটনা এটা, ইরফান ঘুমিয়ে গিয়েছিলো বিধায় টের পায়নি ওর বহুল কাঙ্ক্ষিত নারী ওর শরীরের উষ্ণতায় ঠাই নিয়েছে বাচ্চাদের মতো।
গার্ডেনে চেঁচামেচির শব্দে সকাল সাতটা নাগাদ ইরফানের ঘুম ভাঙল,ঝুম বৃষ্টিময় সকালের ম্যাদাটে আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে, চোখ পিট পিট করে সেই আলোয় তাকালো সে, কাত হয়ে ছিলো বিধায় অনুভব করলো নিজের তৃষ্ণার্ত বুকটার সাথে মিশে আছে কেউ পরম আবেশে। অতি নরম, মোলায়েম কেউ। নিমিষেই ধক করে উঠল কঠিন বক্ষপট,জমে গেল ইরফান মির্জা। মেয়েটা চাদর মুড়ি দিয়েছে বিধায় মুখটা দেখলো না,বুঝলো ঘুমে বেহুঁশ।
চোখ ডলেই অস্পষ্ট হেসে ফেললো ইরফান। এটা কেমন ঘুমের ছিড়ি?
সবসময় চঞ্চল ছেলেটা স্তম্ভিত হলো এই ছোঁয়াতে। এ এক অন্যরকম অনুভুতি, তার জীবনে প্রথম এটি। এভাবে নিভৃতে কোনো বেগানা নারী শরীর তার মাঝে ঠাই নেয়নি, এই ছাব্বিশ বছরে একটি বারের জন্যও না। তার গোটা সত্তা শিহরিত করে তোলেনি। চমকে উঠে ঢোক গিললো ইরফান মির্জা। নড়াচড়া করতে ভুলে গিয়েছে সে। চুপচাপ শুয়ে অনুভব করতে থাকলো আদুরে মেয়েটাকে। সজ্ঞানে এই বুকে ঝাঁপাবে কবে মেয়েটা? কবে পৌরুষে আতঙ্কিত মেয়েটা সদিচ্ছায় চাইবে ওর আশ্লেষ? দু গালে পাগলের মত চুমু খেয়ে সম্মান দেয়া খুব সহজ ছিলো, এই পথ কি তেমন সহজ হবে? হবে না বোধহয়। ইরফান আধিপত্য চায়না,চায়না মানে চায়না। সে প্রেম চায়,সে দেবে,সমান সে পাবে। এই অপেক্ষা কবে ফুরাবে?
ভাবতে ভাবতে অবাক করা আবেগে স্থির হয় ইরফান, ঠিক তখুনি নড়াচড়া করে ওঠে প্রণমি, চাদরের নিচ থেকে একটা হাত বের করেই জাপটে ধরলো ইরফানকে। ত্বরিৎ চোখ বড় বড় করে নিলো ইরফান। ঘুমকাতুরে কন্ঠে প্রণমি বলে উঠলো,“চেচামেচি কে করছে মিস জেনি?”
ধরাক ধরাক করছে হৃদস্পন্দন,ইরফান বড়বড় শ্বাস ফেলে। প্রণমি আরেকটু এগিয়ে এসে বলে,“আরেকটা চাদর দিন মিস জেনি! ঠান্ডা খুব। আপনার গা এতো শক্ত কেন?”
বলেই হাত দিয়ে হাতাতে হাতাতে হাতটা ইরফানের চোয়াল অবধি নিতেই ইরফান চোখমুখ খিচিয়ে নিয়ে পরপর নিজেকে সামলে নেয়,ভরাট কন্ঠে বলে ওঠে,“মিস জেনির খোঁচা খোঁচা দাড়ি কেন ভাবছো?”
লাফিয়ে উঠলো প্রণো, ত্বরিৎ ছিটকে গেলো অদূরেই। চাদরে পেঁচিয়ে নিজেকে, অক্ষিপল্লব প্রশস্ত করে নিঃশ্বাস ফেলে জোরসে।
ইরফান ওকে কিছুপল দেখে উঠে বসে। পরিবেশ স্বাভাবিক করতে বলে,“গুড মর্নিং। সকাল সাতটা বাজে, চাদর এনে দেব আরেকটা?”
লাজে,সংকোচে গুটিয়ে যাওয়া প্রণমি দু'পাশে মাথা নাড়ে শুধু। ইরফান মেয়েটাকে ঠিক হবার সময় দিতে ওয়াশ রুমে ঢুকলো হন্তদন্ত হয়ে। ঠাঁয় বসে রইল প্রণমি, ঘ্রাণশক্তি তীব্র তাই টের পেল ঐ লোকটার ঘ্রাণ মাখিয়ে নিয়েছে তার শরীর,কতটা বাড়াবাড়ি করেছে প্রণমি? অকস্মাৎ পেটটা কেমন কাঁপল, কাঁপল প্রণমিও তরুণীসুলভ লাজে।
________
শ্বশুর বাড়িতে প্রণমির প্রথম সকাল। আজ বাড়িতে এতো এতো মেহমান যে বিশালাকার ডাইনিং থেকে টেবিল সরিয়ে মেঝেতে চাদর বিছানো হয়েছে ব্রেকফাস্টের জন্য। সবাই একসাথে বসেছে মেঝেতে, প্রায় জন চল্লিশ লোক। প্রণমিকে আবারো একটা হালকা সুতি শাড়ি আর সোনার গহনা পরে নামতে হলো তার শাশুড়ির কথায়। রিতু বলেছে,“কটা দিন শাড়ি পরো? লোকজন আসবে,কোনটা নতুন বৌ বোঝাই যায়না সালোয়ার স্যুট পরলে!”
প্রণমি সাথে সাথে রাজি হয়েছে, পরিবেশ শীতল বিধায় শাড়িতে অসুবিধা হচ্ছে না তার। খেতে বসেছে প্রণমি আর ইনশিরাহ পাশাপাশি। একজন নতুন বৌ,আর একজন নতুন মা হবে । ওদের আলাদা খাতির করছে রিতু। ল্যাটকা খিচুড়ি আর গোরুর মাংসের আচার চামচে নিয়ে প্রণমির মুখে তুলে দিতে দিতে বলে,“ভেবো না বৌ হিসেবে খাতির করছি। বৌমা খাতির করার টাইম নেই।”
প্রণমির মুখ বেজার হতে চাইল অমন রাগী রাগী কথায়, তখুনি রিতু হেসে ফেলে বলে,“বাড়ি থেকে যে দু'টো মেয়ে চলে গিয়েছে,তাদের খালি যায়গা ভরতে এসেছো তাই খাতির করছি।”
চোখে পানি আসে তৎক্ষণাৎ প্রণমির। এমন আদরও তার কাছে নতুন, এভাবে কেউ রাগী রাগী মা হয়ে তাকে আদর করেনি তো তাই।
ইরফান বসেছিল মুখোমুখি প্রণমির, বারবার চোখ তুলে দেখছে মা বৌকে,আর স্মিত হাসছে একা একা।
আলো এলো বেগুন ভাজা নিয়ে,প্রণমির প্লেটে তুলে দিতে দিতে বলল,“অবশ্য এই খাতির মাগনাও না প্রণমি, বিনিময়ে কিছু দিতে হবে যে!”
_কি আন্টি?
_একটা বাদর ছেলের বাঁদরামি কমিয়ে তাকে একটু স্থির করে বাঁধতে হবে সংসারে।
মস্তক নত করে হাসি চাপিয়ে রাখে প্রণমি,বাকিরা পারে না। হোহো করে হেসে উঠল সবাই।
খাওয়া শেষে শেহা হাত ধরে ওঠালো প্রণমির, বাড়ি ভর্তি মানুষ গিজগিজ করছে। ইরফান মির্জা বন্ধুদের সাথে নিচেই বসে আছে, বন্ধুদের পরিকল্পনা আজ,এখন ওদের দু'জনকে একসাথে বাগানে নিয়ে গায়ে হলুদ মাখাবে। বৃষ্টি ভেজা মাঠে হলুদ নিয়ে হুটোপুটি করবে সবাই, বাইরে বজ্রপাত হচ্ছে, সেটি কমার অপেক্ষা।
মুরব্বিরা ব্রেকফাস্ট করে সবাই দোতলায় তখন, আগামীকাল বৌ-ভাতের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আলাপ করছে,কেউ খবর দেখছে।
শেহা প্রণমিকে নিয়ে টানতে টানতে কিচেনে গেল,চা করবে সবার জন্য শেহা,প্রণমি এতো মানুষের মাঝে থাকতে চাইছে না তাই নিজের সাথে নিয়ে গেলো।
ইরফান দূর থেকে প্রণমির দিকেই দৃষ্টি স্থির রেখে দাঁড়িয়ে ছিলো। শেহা যখন চা পাতির কৌটা খুঁজছিল অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে প্রণমির সাথে আলাপ করতে করতে, প্রণমি অজান্তেই এগিয়ে গেল ইনডাকশনের কাছে, কথা বলার সময় ওর নড়াচড়া করার অভ্যাস তাই। শাড়ির আঁচল হাতে মোচরাতে মোচরাতে আরেকটু পিছিয়ে কেবিনেটে হেলান দেবে ঠিক তখনই টের পেলো ওর পিঠ আগলে ধরেছে কেউ।
বড় বড় শ্বাস ফেলে প্রণমি। মৃদু আর্তনাদ করতেই শেহা চকিতে ঘুরে তাকাতেই হতভম্ব হলো। ইরফান সামলে নিয়েছে প্রণমিকে। মুহুর্ত যায়, ইরফান ঘাড় বাকিয়েই ধমকে উঠলো শেহাকে,“ওকে এখানে আনলি কেন ?”
শেহা কেঁপে উঠলো ধমকে, অবিশ্বাস্য নজরে ইরফানকে কিছু পল দেখেই তাকালো প্রণমির দিকে। প্রণমির মুখটা ফ্যাকাশে,শেহার সাফাই গাইতে অক্ষিপল্লব কাঁপিয়ে বলে উঠলো,“আমি আপুর হাত ধরে এসেছি, এত লোকের ভিড় ওখানে তাই।”
ইরফান শান্ত ভঙ্গিতে প্রণমিকে সরিয়ে আনলো ইন্ডাকশনের কাছ থেকে। হাত ধরে কিচেন থেকেই বের করে আনলো। শেহা কিছুপল ওদের অনিমেষে দেখে দোতলায় উঠলো। ধীরপায়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে ঢুকলো ইনুর ঘরে, এরপর ছুটে চলে গেলো বারান্দায় এক কোণে,মেঝেতে বসে হাঁটুতে ঠেকিয়ে দিয়ে মাথাট, নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। এতদিন পরে, এতক্ষণে আবার অবুঝ পনা শুরু হলো।
সময় গড়াতেই যখন টের পেলো কেউ তার মাথায় হাত রেখেছে, চমকে উঠে শেহা দ্রুত ওড়নায় চোখ মুছে তাকাতেই দেখলো ইরফানকে। হাসি হাসি মুখ করে মেঝেতে বসে ঘুরে চাইল শেহার দিকে। শেহা চোখ নামিয়ে নেয়। ইরফান বলে,“সকালে একটা খবর শুনলাম।”
_কি?
_তোর জন্য পাত্র দেখছে, ছেলে ডাক্তার।
_বেশ তো, আমি তো রাজি।
_কিন্তু আমি আর বড় দাদান রাজি নই।
_কেন?
_ছেলের একটা খুত আছে, এমন খুতওয়ালা ছেলের কাছে তোর বিয়ে দেবো?
_কি খুঁত?
_ছেলের একটা জিনিস নেই।
_কি নেই?
_তোর মতো চার চোখ নেই, ছেলের মাত্র দু'টো চোখ।
বেশ শব্দ করে হেসে উঠল শেহা। ইরফান নির্নিমেষ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে আবারো ওর মাথায় হাত রাখল, শেহা স্থির হয়ে রইল। ইরফান বলে উঠল,“তুই প্রণমির যায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে,প্রণমি তোর যায়গায় সক্ষম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি ওকে ধমকাতাম না বল?”
মাথা নাড়ায় শেহা,বলে,“ধমকাতে।”
_তাহলে এভাবে স্টুপিডের মতো কাঁদার মানে কি?
শেহা জবাব দিলো না, ইরফান উঠলো, শেহার হাত টেনে ওঠালো,“চল আমার ভুল হয়েছে। আসলে নতুন নতুন বিয়ে করেছি তো। বৌ,মা, বোন সবাইকে ব্যালেন্স করে সামলাতে শিখিনি। ওর সামনে তোকে ধমকেছি,তুইও এখন ওর সামনে আমাকে ধমক দিবি চল। তবে প্লিজ আমার বৌটাকে ধমকাতে বলিস না শেহু। অনেক ভিক্ষা করে পেয়েছি, জ্ঞানী আপা শুনতে পেলে নিয়ে যাবে।”
শেহা হেসে ফেলল, খিলখিল হাসি, নিজেকে সামলে নিয়ে ইরফানকে ঠেলতে ঠেলতে ঘর থেকে বের করে বলল,“যাও তো। আমি রেগে নেই। গিয়ে সাদা লুঙ্গি আর সাদা গেঞ্জি টা পরো, আমি হলুদ নিয়ে আসছি বাগানে,সবাইকে রেডি হতে বলো। হলুদ মাখামাখি হবে জমিয়ে।”
ইরফান স্বস্তি পেয়ে ঘুরে চলে যায়, শেহা নির্নিমেষ দেখছে ওকে, মনে মনে বলছে,“তুমি সবসময় এমন অবুঝই থেকো রাগী মির্জা, নয়তো লজ্জায় আমি মুখ দেখাতে পারবো না কোনোদিন। সীমা লঙ্ঘনের লজ্জায়।”
সে পথ দিয়ে আসলো সামিন,শেহাকে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখল,“কি রে মা? কি হয়েছে? শরীর খারাপ? এতো খাটতে কে বলেছে তোকে?”
শেহা দু'পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,“মামা, তোমার খোঁজে ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট আছে?”
_সাইক্রিয়াটিস্ট কেনো?
অবাক হয় সামিন।
_এমনি, পড়াশোনা নিয়ে খুব ডিপ্রেসড, জরুরি কনসালট্যান্ট দরকার।
নিচ তলা থেকে তখন ডাক পরলো শেহার। শেহা এগিয়ে গেলো,বাইরে তখন হৈ-হুল্লোরের আমেজ। নতুন বর বৌকে মাঠের মাঝখানে বসিয়েছে। প্রণমির পায়ের নিচে ভেজা ঘাস ছপছপ করছে, আনন্দে শিহরিত প্রণমি এতো সুন্দর একটা জিনিসে পা রেখে। ইরফান উৎসুক চোখে শুধু ওর আনন্দই দেখছিলো। হঠাৎ নিরেট ঠাণ্ডা স্বরে বলে উঠলো,“এটা দূর্বা। চিকন এবং মোলায়েম ঘাস সবথেকে।”
_জি চিনি,আমি তো জন্মান্ধ নই। ছয় বছরেই গোটা দুনিয়া দেখে ফেলেছি আমি, মোটামুটি একটা এনসাইক্লোপিডিয়া আমি। আমাকে জিজ্ঞেস করেন কিছু একটা।
এই সেই প্রণমি, প্রণমির এই রূপ ইরফান দেখেছে আগেও, ভীষণ আনন্দিত ইরফান। মেয়েটা কতটা প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে,সে এই প্রাঞ্জলতা ধরে রাখতে চায়,মেয়েটাকে ডুবতে দিতে চায় না মলিনতায়।
_সব চেনো? আচ্ছা বলো তো জবা ফুল কেমন?
_কোনটার বর্ণনা দেব? রক্তজবা,ঝুমকো জবা নাকি গোলাপ জবা?
চোখ বড় বড় করে নেয় ইরফান,হেসে বলে,“বাহ! অনেক জ্ঞান তোমার। আচ্ছা বলো তবে কামিনী ফুল কেমন?”
_এটা না আমি দেখিনি, শুনেছি সাদা সাদা,বেলি ফুলের কলির মতো কল্পনা করে নিয়েছি।
_আমাকেও তো দেখোনি,শুনেছো। বলো তো আমি কেমন দেখতে। কেমন তোমার কল্পনায়?
থেমে যায় প্রণমি, পর মুহুর্তেই বলে ওঠে,“আমি কামিনী ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে কল্পনা করেছি, কেউ বললেই সেটা ইমাজিন করে নিতে পারিনা আমি। সেন্স অব টাচ খুব ভালো আমার, অন্যথায় পারিনা।”
ইরফান সামলে নেয় নিজেকে,মেয়েটাকে না চাইতেও আঘাত করে ফেলল কি? তীব্র অপরাধ বোধে জর্জরিত ইরফান দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“আমি খুব ভয়ংকর দেখতে। একেবারে মনস্টারের মতো। তুমি আমাকে দেখোনি, এ আমার সৌভাগ্য!”
প্রণমি শুকনো হাসে তার স্বামীর বাচ্চামো দেখে, লোকটা তাকে ভুলাচ্ছে যেন সে বাচ্চা মেয়ে। প্রণমিও ভুলে যাওয়ার নাটক করলো, হঠাৎ সে অনুধাবন করলো তার পাশে বসে থাকা মানুষটার একটা নরম কোমল দিক আছে,খুব সরল সেটা,যে সত্তাটা প্রণমির এক চিলতে অনুভূতি ধরে ফেলে।
শেহা আসে হলুদ নিয়ে ছুটতে ছুটতে, টকটকে কাঁচা হলুদ বাটা । ট্রে ভর্তি, মুহুর্তেই সবাই ঝাঁপিয়ে পরলো ওতে। ইরফানের বন্ধুরা,শেহা, ইনশিরাহ,মুঈন সবাই। ছেলেরা শুধু ইরফানকে হলুদ মাখালো, মেয়েরা ইরফান প্রণমি উভয়কেই। ভেজা দূর্বা মাঠে হুটোপুটি লেগে গেলো একপ্রকার। ইনশিরাহ আজ বহুদিন পর গেছোপনা করার সুযোগ পেয়েছে। দু'হাতে খামচে নিলো হলুদ বাড়ির সবাইকে মাখাবে তাই, ছুট লাগাতেই পেছন থেকে টেনে ধরলো মুঈন, কাঁপল ইনশিরাহ। ভরাট স্বর বলল,“ধীরে ধীরে ইনশিরাহ বিনতে সামিন। এতো উত্তেজিত হবেন না! কেউ এতো ঝাকাঝাকি পছন্দ করবে না, খুব ছোটো সে।”
থেমে গেল ইনশিরাহ,পিছিয়ে গিয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে বললো,“স্যরি এসপি।”
ইহানের ধমকাধমকিতে হুটোপুটি থামালো সবাই। একতলা ভবনের ছাদ থেকে চেচিয়েছে ,“জ্বর আসবে। এখন ওঠ সবাই। অনেক হয়েছে!”
ছেলেমেয়ে গুলো মলিন মুখে অন্দরে ঢুকলো। মুঈন ইশিকে বলল,“এত বেরসিক হচ্ছে দিন দিন! যেটা দরকার সেটা করবে না? ছেলেমেয়ে গুলো আনন্দ করবে না জ্বর হবে বলে?
সব সময় মুরব্বি পনা করছে। আমি তো একে নিয়ে চিন্তায় আছি খুব! বাসর রাতে কি না বৌকে ধমকে ওঠে,“ঘুমিয়ে পরো,বেশি রাত জাগলে চোখের নিচে কালি পরবে। বাসর দিনে করবো!”
মুখ চেপে হেসে উঠল ইশি, পরপর কনুই দিয়ে মুঈনকে গুতো মেরে বলল,“নৌপ,আমার বড় দাদান মস্ত প্রেমিক পুরুষ হয়ে ধরা দেবে তার বৌয়ের কাছে।”
ইশির কপালে কপাল ঠেকালো মুঈন,“আমার মত?”
_না, It's worth it টাইপের প্রেমিক পুরুষ বড়দাদান হবে না সম্ভবত। ওটা একপিসই,মুঈন ফরাজী!
ভেজা প্রণমিকে নিয়ে শেহা ঘরে ঢুকলো ইরফানের,ওকে চেঞ্জ করাতে। বিছানার ওপর বাথরোব রাখলো,একটা সালোয়ার স্যুট রাখলো। ঠিক তখনই শেহার ডাক পরলো। প্রণমি বললো,“তুমি যাও আপু, আমি পারবো, আমি আরো খানিকটা ভেজাতে চাই শরীর।”
_আচ্ছা শোনো, বাথরোব টা পরে অপেক্ষা করো, এই সালোয়ার স্যুট একা পরতে পারবে না, আমি এসে পরিয়ে দিচ্ছি।
প্রণমি ঘাড় কাত করতেই শেহা বেরুলো। বিছানার কোণা থেকে আট কদম ডানে ওয়াশ রুম। প্রণমি বাথরোব নিয়ে ঢুকলো। এক গাদা বডি ওয়াশ ঢেলে ঘঁষে ঘঁষে কাঁচা হলুদের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ দূর করেই গা মুছে গায়ে বাথরোব পেঁচিয়ে বেরিয়ে এসে আবারো বিছানার কোণে দাঁড়িয়ে রইল। মাথাটা ভালো করে মোছেনি, ঠান্ডায় কাঁপছে সে রীতিমতো।
ইরফান নিচ থেকে মাথা মুছতে মুছতে উঠছে, চঞ্চল পায়ে হেটে ঘরে ঢুকতেই অকস্মাৎ থমকাল। সামনে দাঁড়িয়ে প্রণমি। হাটুর ছয় ইঞ্চি নিচ অব্দি একটা ধবধবে সাদা বাথরোব, গলার কাছটা উন্মুক্ত, তরুণীর গোপন সৌন্দর্য ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। গলায় রিতুর পরিয়ে দেয়া একটা সিম্পল সোনার হার, হাতে দু'টো মোটা মোটা বালা, ভেজা চুলগুলো এলোমেলো,শীতে কাঁপতে থাকা রক্তাভ ঠোঁট, এ এক অগোছালো অসহ্যকর সৌন্দর্যের স্বাক্ষী হয়ে গেলো ইরফান। বাকরুদ্ধ হয়ে সম্বিৎ হারিয়ে চেয়েই থাকল নির্নিমেষ।
“ওহহ শীট!”
সেকেন্ডে যখন সম্বিৎ ফিরে পেল। ক্ষীণ আওয়াজে ঠোঁট নেড়ে চট করে পিছিয়ে গিয়ে ইরফান ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা ভেজিয়ে দরজায় ঠেশ দিয়ে চোখ বুজে হাঁপাতে লাগলো, ক্রমশ অপরাধ বোধ হলো তার। এই চঞ্চল স্বভাব বদলাতে হবে, মেয়েটির প্রাইভেসি সে এভাবে হুটহাট নষ্ট করে দেবে নয়তো। নড়েনা ইরফান, সেকেন্ডে নিজের গ্লানি সরিয়ে শ্বাস নেয়,লম্বা শ্বাস, বলে,“ওটা বৌ। তোর বৌ ইরফান মির্জা।”
প্রণমি কেঁপে উঠেছিল দরজা ভেজানোর শব্দেই। আড়ষ্টতায় পিছিয়ে গিয়ে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো কিছুক্ষণ। পর পর নিজেই স্বর স্বাভাবিক রেখে নম্রস্বরে ডেকে ওঠে,“এটা আপনি?”
ইরফান শ্বাস ফেলে, নিজেকে শান্ত রেখে নিচুগলায় জবাব দেয়,“জিইই।”
প্রণমি স্মিত হেসে বলে,“আমার আপনার সাহায্য প্রয়োজন।”
_আমি?
চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে ইরফান। তার শ্বাস আটকে আসছে।
প্রণমি বলে ওঠে,“জিই আপনি। আপনি গিয়ে শেহা আপুকে ডেকে দিন।”
সিঁড়ির কাছটাতে এসেই দাঁড়িয়ে পরে শেহা,পরীকে দেখেই বলে,“ডেকেছো কেনো?”
_একটু নিচে যা না মা, গেস্ট এসেছে দু'জন। তাদের হোস্ট কর। উনারা ভিআইপি!
_ওমা,তারা কারা?
_ঐ ব্যারিস্টার নিজাম মাহমুদ আর ব্যারিস্টার উজ্জ্বল মাহমুদ।
শেহা মিনমিন করে ওঠে,“তো ইনশিরাহ আপুকে বলো।”
_ইনশিরাহ বমি করে অসুস্থ হয়ে পরেছে,আমি তো তার কাছেই যাচ্ছি। ভাবীরা বেড়িয়েছে স্বর্ণের দোকানে যাবে বলে।
_কিন্তু আমি যে প্রণমিকে দেখছিলাম!
_ওকে ওর বর দেখে নেবে,ইরফানকে ঘরে যেতে দেখেছি। তুই যা।
চলমান.....