ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 109

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে‌ [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০৯
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

একা বেড়িয়েছে শেহা, বিকেলে নিউমার্কেটে তার টুকটাক কিছু শপিংয়ের কাজ ছিল। বড় বড় শপিং মলের থেকে শেহার সাচ্ছন্দ্য এই নিউমার্কেট। আর আজ তো বৃষ্টির দরুন ভীড় ভাট্টাও নেই। মেঘলা সাঁঝের ম্যাদাটে আলোয় শেহার নজর গেল অদূরেই একগুচ্ছ কদমের ঝাপিতে। এক প্রৌঢ় নিয়ে বসেছেন। মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশেও ফুটে আছে দূর থেকেই ঐ কদমগুলো। শেহা ব্যগ্র গলায় ড্রাইভারকে বলল গাড়ি থামাতে। সে কেবলমাত্র শপিং শেষ করে বাড়ি যাবে বলে ক্যাবে উঠেছিল। গাড়ি থেকে নামার আগে পার্সে চোখ বুলায় শেহা। খুচরা টাকা আছে কিনা দেখতে,প্রৌঢ়কে তো আর কার্ড ধরিয়ে দেয়া যাবে না।

টাকা আছে নিশ্চিত হতেই শেহা যখন চোখ তুলল,তখুনি ক্যাবের দরজা ঠেলে লাফিয়ে পরলো একপ্রকার। উত্তেজনায় গলা কাঁপল, চেঁচিয়ে উঠলো,“এই ওটা আমার!”

ছুটছে শেহা,মেজাজটা হঠাৎ গরম হলো। এক সেকেন্ডের মাথায় এই লোক এসে ফুলগুলো লুফে নিলো,আজব তো! শেহা জোরে পা চালায়,দেখতে পায় একটা লোক ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে দিচ্ছে। আবারো শেহা ডেকে উঠল,“প্লিজ আমার জন্য কিছু রাখুন, সব গুলো নেবেন না!”

লোকটা দু'হাতে লুফে নিলো ফুলগুলো, শেহা উত্তেজনায় ছুট লাগিয়ে শেষবারের মতো চেঁচায়,ফুল বিক্রেতাকে বলে,“কাকা আমি ডাবল দেবো, ওগুলো আমার।”

ধুপ করে একটা আওয়াজ হয় পেছনে। উজ্জ্বল কদমের ঘ্রাণ শুঁকে ত্বরিৎ ঘুরে তাকায়,চোখ দু'টো তার গোল্লা গোল্লা সাইজ হয়েছে, যখন দেখলো ফিনফিনে শরীরের তরুণীটি মুখ থুবড়ে পরেও আবার উঠে লজ্জিত আর অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকাচ্ছে। উজ্জ্বল দেখছে মোটা ফ্রেমের চশমার নিচে এক জোড়া টলটলে চোখ যে ভীষণ লজ্জায় কেঁদেই ফেলবে হয়তো। উজ্জ্বল দেখছে একজোড়া রক্তাভ ঠোঁট কাঁপছে। হঠাৎ উজ্জ্বল খেয়াল করলো মেয়েটা পিচ্চি নয় খুব একটা, মেয়েটা নারী, সুশ্রী এক সম্পূর্ণ নারী।

শেহা কি করবে বুঝতে পারছে না। এটা কি করে হলো? এতো মানুষের মাঝে সে এভাবে আছাড় খেল? তার এখন কি করা উচিত? পালানো উচিত? কিন্তু সেটা তো সম্ভব না, জুতা ছিঁড়েছে। তবে? সে কেঁদে ফেলবে? কাঁদলে কি হবে? সবাই হাসি থামিয়ে দেবে?

কাঁদার ফুরসৎ পায়নি শেহা, এলোমেলো দৃষ্টি যখন সামনে দাঁড়ানো স্বল্পপরিচিত পুরুষটার মুখশ্রীতে পরলো, লোকটা অভিব্যক্তি হীন দাঁড়িয়ে ছিল, বাড়িয়ে দিল হাতের কদম গুচ্ছ শেহার দিকে,নিরেট ভরাট স্বরে ব্যস্ত হয়ে বলল,“জি জি। এগুলো আপনার।‌ ডাবল দিতে হবে না, ছয়শো পঞ্চাশ টাকা দাম, ওটা দিলেই হবে।”

________

শপিং শেষ করে প্রেরণা ইহানকে আর কল করলো না, ক্লান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো গেমিং জোনের কাছে। ভেতরে বাচ্চাদের হৈচৈ-য়ের আওয়াজে সয়লাব। প্রেরণা গিয়ে এক্সিটের কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরে দৃষ্টি বুলিয়েই হঠাৎ থমকাল। দেখলো শুদ্ধ হাত পা ছুড়ছে, গেমস খেলছে । বসে আছে ইহানের কোলে। যে পরম স্নেহে শুদ্ধর পেটের কাছটা এক হাতে আঁকড়ে ধরছে আবার হঠাৎ হঠাৎ সেই হাতটা তুলে শুদ্ধর চুলের মধ্যে আঙুল চালাচ্ছে । ইহানের অন্যহাতে তার ফোন,কানে চেপে ধরে কারো সাথে কথা বলতে ব্যস্ত,তবে সেই ব্যস্ততার পাশাপাশি শুদ্ধকে আদর দিতে ভুলছে না।‌
খুব সাবলীল ঐ লোকের আচরণ, যেন ঐ লোক এটা করে নিজেই আরাম পাচ্ছে।
প্রেরণা দাঁড়িয়েই থাকলো ঠাঁয়, সে টের পেলো এই দৃশ্যটা তাকে মুগ্ধ করছে, তার দৃষ্টি তৃপ্ত করছে, আজ বহুবছর কিছু একটা সে পায়নি, এই দৃশ্যটা তাকে সেটা দিচ্ছে।
চোখে চোখ পরলো ইহানের। নিমিষেই প্রেরণা গুটিয়ে গেল, চেহারায় চেপে বসলো নিদারুণ অস্বস্তি , মলিনতা। শুদ্ধর খেলা শেষ হওয়াতে ইহান ওকে এনে প্রেরণাকে বলল,“চলুন বাড়িতে দিয়ে আসি আপনাদের।”

দু'পাশে মাথা ঝাঁকায় প্রেরণা। চোখ তোলেনা সে, হাঁসফাঁস করতে করতে “আ-আসছি” বলে শুদ্ধকে নিয়ে বেড়িয়ে যায় হন্তদন্ত হয়ে।
ইহান দাঁড়িয়ে থাকে নির্বিকার ভঙ্গিতে।

ক্যাবে বসে শুদ্ধ একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখছে। দেখছে তার মা খুব কাঁদছে, তবে শব্দ না করে কাঁদছে। এটা একটা খুব অদ্ভুত দৃশ্য শুদ্ধর কাছে। কারণ সে জানে তার মা কাঁদে না। মিনমিনে গলায় শুদ্ধ একবার জিজ্ঞেসও করলো,“মাম্মা কাঁদছো কেন?”

জবাব দেয়না প্রেরণা, শুধু নিশ্চুপ কেঁদেই যাচ্ছে।

অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে শপিং ব্যাগ গুলো কোনোমতে ডাইনিং টেবিলে রেখে মিস জেনির কাছে শুদ্ধকে দিয়ে ফ্রেশ হবার বাহানায় প্রেরণা ঘরের দরজা লাগায়, ততক্ষণ অবধি বেশ নির্বিকার থাকার চেষ্টা চালিয়েছে সে। তবে দরজা লাগিয়ে আর পারলো না,দরজায় ঠেস দিয়ে ধীরে ধীরে বসে পরলো মেঝেতে। কাঁদতে থাকলো নিশ্চুপ। হঠাৎ চোখ তুলে প্রেরণা দেখলো কেউ তার মুখোমুখি বসে আছে। আজ অনেকদিন পর ঐ মানুষটাকে দেখছে সে, মুখ হাসি হাসি তার। প্রেরণা গুটিয়ে যায়, নামিয়ে নেয় চোখ, শুধু ফোপাতে ফোপাতে বলে,“আমি না চরিত্রহীনা নই বিশ্বাস করেন, একদমই নই।”

লোকটা কিছুই বলে না,শুধুই হাসে চুপচাপ। দু'হাতে মুখ ঢেকে প্রেরণা এবার ডুকরে ওঠে,“সত্যি বলছি,আমি না চরিত্রহীনা নই।”

_________

এক গুচ্ছ কদম আর ময়লা শরীর নিয়ে বাড়িতে ফেরে শেহা, ওকে দেখে আলো চোখ কপালে তোলে,“তুই না শপিংয়ে গিয়েছিলি? তো কাবাডি খেলে এলি কেন?”

শেহা জবাব না দিয়ে দোতলায় গিয়ে কদম গুলোকে ফুলদানিতে রেখে ফ্রেশ হয়ে নেয়। মুখটা থমথমে তার, একটা ঘোরের মধ্যে আছে সে। সন্ধ্যার দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসছে, বারবার চোখ চলে যাচ্ছে কেবিনেটের ওপরে রাখা নতুন স্লিপার জোড়ায়, যেটা ঐ লোকটা কিনে দিয়েছে। অবশ্য টাকা দিয়েছে শেহা। কদম ফুলের সাড়ে ছয়শো আর জুতোর সতেরশো টাকা নগদ হাতে ধরিয়ে দিয়ে এসেছে ভদ্রলোকের।

তখন জুতা ছিঁড়ে গিয়েছিলো দেখে উজ্জ্বল কিছুপল চেয়ে থাকলো, তারপর বলল,“কোনোভাবে হেল্প করবো?”

কি বলতো শেহা? তার শুধু কান্না পাচ্ছে। উজ্জ্বল ওর উত্তরের অপেক্ষা না করেই ওর হাতে একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল ধরিয়ে দিয়ে বলল,“ময়লা ধুয়ে নিন। এটা জরুরি।”

শেহা বিভ্রান্ত হয়ে তাই করলো। হাতে ধুতে ধুতে দেখলো উজ্জ্বল তাকিয়ে আছে শেহার পায়ের দিকে, সংকোচে গুটিয়ে যায় শেহা। উজ্জ্বল আসলে ওর পায়ের সাইজ দেখছিলো, সেকেন্ড বাদে খুব কাছেই একটা শোরুম থেকে এক জোড়া স্লিপার নিয়ে এলো ঝটপট। কাজগুলো করেছে উজ্জ্বল অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে। শেহা অবাক হয়ে দেখলো লোকটাকে, লোকটার মুখে লেপ্টে আছে সেই অমায়িক হাসি। জুতোর প্যাকেট ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,“এটা প্রয়োজন সম্ভবত আপনার।”

ভীষণ সংকোচ নিয়েই হাত বাড়িয়ে নিয়েছিল শেহা প্যাকেটটা, অস্ফুটে বলেছিলো,“কত হয়েছে? একটু দাঁড়ান আপনি। আমি টাকাটা এখুনি দেবো।”

_______

উজ্জ্বল বাড়িতে ঢুকতেই নিজাম মাহমুদ চড়াও হলেন নাতীর ওপর, চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন,“রাজী রাজী,ও বাড়ির মুরব্বিরা রাজি! মেয়ের সাথে কথা বলেই জানাবে!”

উদাস চোখে উজ্জ্বল এক পলক দাদুকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে যায়, নিজাম মাহমুদ যায় পিছু পিছু,“কিরে? তব্দা মেরে আছিস কেন?”

শার্টের ওপরের তিনটা বোতাম খুলে নিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে উজ্জ্বল মুখ হাতে পানি দেয়। তার মুখ থেকে থমথমে ভাব যায়না। নিজাম মাহমুদ ভারি অবাক,হা করে বলে,“তোর মুখের এই কি হাল!”

উজ্জ্বল শার্ট খুলছে, সবসময় যে হাসে আজ কেমন গম্ভীর সে। নিজামের উদ্বিগ্নতা বাড়ছে, এবার সে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,“আচ্ছা আচ্ছা এতো রাগিস না, আমি কল করে না করে দেবো ঐ মেয়ে..... আচ্ছা কোন বয়সী খুঁজব বলতো? ২৫+ হলে ভালো হবে?”

এবার সামান্য হাসে উজ্জ্বল, পরপর বলে, “প্লিজ উনাদের বলবে ওনাকে যেন কোনো চাপ প্রয়োগ করা না হয়, আর সবার আগে আমি ওনার সাথে কথা বলে নিতে চাই খোলাখুলি!”

তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিজাম মাহমুদ, পরপর মুখটা উজ্জ্বল হয়, উত্তেজিত হয়ে বলে,“তোর পছন্দ হয়েছে মেয়েকে? হাউ? হঠাৎ? কিভাবে?”

জবাব দেয় না উজ্জ্বল। শার্ট পাল্টে টি-শার্ট পরে নিয়ে রুমের কফি মেকার অন করে।

_কি হলো কিছু বলছিস না যে?

_পছন্দ করিনি এখনো।

_তবে?

_উনি অনুমতি দিলে করবো। কনসেন্ট ম্যাটার করে দাদু! এটা বারো বছরের পার্থক্য!

নিজাম তাকিয়ে আছে, উজ্জ্বল হঠাৎ চোখ তুলল, দৃষ্টি জ্বলজ্বলে,বলে উঠল,“তবে অতটা পিচ্চি না বোধহয়!”

নিমিষেই নাতীর পিঠ চাপড়ে দেয় নিজাম,“তুই শেয়ানা আছিস। মেয়ে তোকে পছন্দ করতে বাধ্য!”

_________

শেহা স্লিপার জোড়া থেকে মাত্র দৃষ্টি সরালো যখন দোতলার লিভিং রুম থেকে আলোর ডাক পেল। আলোরা তিন জা সন্ধ্যা নাগাদ বৃষ্টি দেখে মুড়ি চানাচুর মেখেছে, শেহাকে খেতে ডাকছে তাই। শেহা গিয়ে বড় মামীর কোলের কাছে বসে পরলো। আশেপাশে তাকিয়ে বলল,“ইশি আপু আর জিজ কোথায়?”

_মুঈন-ইশি ঘরে।

হাসলো শেহা,বলল,“জিজের ছুটিও শেষ হয়ে আসছে আর আপুকে নিয়ে ঘরবন্দি হয়ে থাকছে। নিশ্চয়ই আপু পাগলামি করছে,যেতে চাইছে অথবা জিজকে চাপ দিচ্ছে ছুটি বাড়াতে।”

পরী জবাব দেয়,“তোর এই সময় আসুক। তুইও বুঝবি। মনটা কেমন করে সারাক্ষণ।”

ম্লান হাসে শেহা, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বড় মামীকে বলে ওঠে,“আপু কত সুখী এখন। শুধু শুধু ঐ সাঈম ভুঁইয়ার আসার কোনো দরকার ছিল বলো আপুর জীবনে?”

হাসে রিতু, জবাবে বলে,“দরকার ছিলো কি না তা তো জানিনা, তবে আল্লাহ বলেছেন, আমি কখনোই আমার বান্দার জন্য এমন কাউকে বাছিনা যে আমার বান্দার জন্য উপযুক্ত নয়। ধর তোর যদি এখন কাউকে মনে ধরে,তার সাথে যদি তোর মিল না হয়ে আরেক ভদ্রলোকের সাথে হয়,ভাববি আল্লাহ ঠিক করেছে সে তোর জন্য উত্তম,যে তোর জন্য উত্তম না তাকে আল্লাহ তোকে পাইয়ে দেবেন না। আল্লাহ তাআলা সর্ব উত্তম পরিকল্পনা কারী শেহা।”

শেহা গুটিয়ে যায়, হঠাৎ খুব ভীষণ কৌতুহলী হয়ে জানতে চায়,“কিন্তু ভুল মানুষের প্রতি জীবনের শুরুতে যে অনুভূতি জড়ো হয় তেমনটা কি ঐ আল্লাহর ঠিক করে দেয়া উত্তম মানুষটার জন্য হয়? ভালোবাসা তার ভাগে কম পরে যায়না? আল্লাহ তো তাকে ঠকায়।”

হেসে ফেলে আলো,শেহার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলে,“আল্লাহ কাউকে ঠকায় না। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে আল্লাহ যদি রহমত দেন,কেউ ঠকে না। এটা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পর্ক। ওসব প্রথম ভালোবাসা,প্রেম বড্ড আবেগী আর মনগড়া ধারণারে শেহু, বাস্তবতা বড্ড আলাদা। যখন তোর বিয়ে হবে,বুঝবি। ”

বাইরে মেঘের তুলকালাম। বৃষ্টি থামছে না। রাত আটটা বেজেছে তখন। ইলহাম ঘর থেকে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,“এতবার ছেলেটাকে বললাম মেয়েটাকে নিয়ে বের হোস না! এখন ফোনটাও ধরছে না। কোথায় আটকে পরলো কে জানে!”

_______

বাড়ি থেকে আসা প্রত্যেকটা কল ইগনোর করছে ইরফান, তার সম্পূর্ণ মনোযোগ ড্রাইভিংয়ে, বৃষ্টির দাপটে সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে তার। ডান হাতে স্টিয়ারিং সামলাচ্ছে, বা হাতটা পাশে বসে থাকা রমনীর হাতের ওপর। রমনী ভীষণ জেদী,যেমনটা ঐ জ্ঞানী আপা বলেছে। প্রচণ্ড হতাশায় মস্তিষ্ক এলোমেলো হয় ওর, জেদ করে, জেদী বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করে হাত কামড়ে রক্তাক্ত করে ফেলে। ইরফান ওর দুই হাত ধরে রেখেছে এক হাতে, মেয়েটাকে এমন কিছু করতে দেবে না সে। ভেজা শরীর কাঁপছে তরুণীর, তবুও জেদ করছে হাত ছাড়িয়ে নিতে। ইরফান এবার রাগ দেখায়, হাত সরিয়ে প্রণমির চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলে,“এতো ধৈর্য্য আমার নেই! ধমকাতে চাইনা আমি তোমাকে!”

প্রণমি দমে যায়না, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“আপনি কেমন দেখতে? অনেক সুন্দর? অনেক? একটা গোটা জীবন আপনাকে দিয়েছি আমি। আমি দেখবো না আপনাকে? সংসার করবো কিভাবে? আমি কেন দেখতে পারবো না! আমিই কেনো দেখতে পারবো না আপনাকে ‌অথচ সবাই দেখে আপনাকে। আপনি রেগে গেলে কপালে কয়টা ভাজ পরে? বাঁদরামি করে হাসলে কেমন লাগে? ওসব কেন আমি কখনো দেখবো না?”

এই পাগলামি থামবে না, ইরফান হাল ছেড়ে দেয়,প্রণমির হাত ছেড়ে দেয়। বাড়ি পৌঁছাতে আরো কিছুক্ষণ সময় লাগবে। শেষ কলটা ছিল ইহানের, ইরফান ফোঁস শব্দে শ্বাস ফেলে রিসিভ করে বলে,“আসছি,পথে, তোমরা খেয়ে শুয়ে পরো। অপেক্ষা করো না আমাদের!”

কল কেটে আবারও প্রণমিকে দেখে ইরফান,ভেজা জর্জেটের শাড়িটা গাঁয়ের সাথে এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে, ইরফান মৃদু শ্বাস ফেলে গাড়িটা একটু থামিয়ে রেখে আঁচল টেনে প্রণমিকে ঢেকে দেয় ভালো করে,প্রণমি পায় কঠিন হাতের উষ্ণতা। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে চলা আন্দোলন বেড়ে যায়,খপ করে ইরফানের সেই হাতটা ধরেই বলে,“এই হাতটা কেমন। ঐ চোখ দু'টো কেমন। আপনি আমাকে একা একা কেন দেখবেন!”

বলেই হাত ছেড়ে প্রণমি চুল টানে নিজের, কানের কাছে ধুপধাপ আওয়াজ হয় সিঁড়ি থেকে পরার, তারপর ঐ ভনভন শব্দ,যখন প্রণমি প্রথম টের পেয়েছে সামনে সবকিছু তার কাছে অন্ধকার।

ইরফানের শার্ট খামচে ধরে কাঁদতে থাকে অবুঝের মতো। ইরফান ব্যস্ত হলো, আকুল হলো, বা হাতে পেঁচিয়ে ধরে রাখলো মেয়েটাকে,আর ডানহাতে গাড়ি চালিয়ে সোজা পৌঁছাল শান্তি নীড়ে।

সদর দরজা খুলেছে ইশি। মুঈন আর সে দুজন জেগে ছিল। ওরা সন্ধ্যাবেলা ঘুমিয়েছে তাই এখন চোখে ঘুম নেই।
ভেজা শরীরে কাঁপতে থাকা প্রণমি আর ইরফানকে দেখে ইশি বলল,“জ্বর বাধিয়েই ছাড়বি দুজন। যা গিয়ে চেঞ্জ করে আয়, আমি আর মুঈন আছি, জেগে আছি।”

প্রণমিকে ধরে ধরে ইরফান দোতলায় নিয়ে গিয়ে ঘরে ঢুকেই দরজাটা লাগিয়ে দেয়। প্রণমি তখনো ঠিক নেই, হতাশা আর জেদে খামচে ধরে রেখেছে ইরফানের হাত, আবারো হাত উঠিয়ে মুখের কাছে নিতেই ইরফান খপ করে ধরে ফেলে হাতটা, রাগ দেখায় না, ধীরস্থির বলে,“হাত কামড়ে খাচ্ছো কেন? খিদে পেয়েছে? ভাত আনবো?”

_আমি আপনাকে দেখতে চাই।
আবারো ডুকরে ওঠে মেয়েটা, আর ইরফান দেখলো চারদেয়ালের মধ্যে সে চিৎকার কেমন গুমোট শোনায়, ভীষণ অসহ্যকর মেয়েটার হতাশামাখা চিৎকার।

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন,প্রণমি মাথাটা ঠেকিয়ে দিয়েছে ইরফানের বুকে, ইরফান ওকে আলগা করে ধীরে ধীরে থুতনি ধরে উঁচু করে মুখটা দেখে। গ্রিক মিথলজিতে বর্ণিত এক অপার্থিব সৌন্দর্যময়ী নারী যেন, ইরফানের চোখে যার রূপ সমান এই দুনিয়ার সব রূপ। ইরফান মায়াময় দৃষ্টিতে দেখতেই লাগলো দুঃখ মেয়েটার, যে দুঃখ ইরফান কমাতে পারবে না। হায়! বেচারা ইরফান !

প্রণমি ইরফানের হাতের ওপর হাত রাখে, কাঁপা স্বরে বলে,“ঠিক এভাবে দেখতে চাই। যেভাবে আপনি এখন দেখছেন।”

ইরফান কথা বলছে না। প্রণমি বলতেই থাকে,“আপনি ভালো না খারাপ, না দস্যি, না খুব শান্ত, আপনি ভদ্র হয়ে গিয়েছেন না কি হননি ওসব আমি ভাবতেও চাইনা। আমি শুধু দেখতে চাই একটু, আমি কেন কাদলাম সে রাতে তালাকের কথা ভেবে, যার জন্য কাদলাম তাকে একটু দেখতে চাই। আপনি একাই কেন দেখবেন? আমিও দেখতে চাই, আমি দেখতে চাই।”

দু চোখ বুজে ফেলে ইরফান, লম্বা একটা শ্বাস ফেলে, এরপর ধীরে ধীরে প্রণমির গালে হাত রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয়। প্রণমির ভেজা গাল ছুঁয়ে হাতটা আবার সরিয়ে নিয়ে হুট করে প্রণমিকে কোলে তুলে নেয় ইরফান। প্রণমি প্রতিক্রিয়া দেখায় না কোনো, শুধু গা কাঁপিয়ে কাঁদে, হঠাৎ টের পায় তার মাথার নিচে বালিশ ঠেকেছে। টের পায় ঐ লোক তার খুব কাছে,হয়তো তার মুখটাই দেখছে কাছ থেকে।

ইরফান প্রণমির ডান হাতটা আবারও টেনে নেয়,এরপর বাম হাতটা, দু'টো হাতে নিজের মুখ ছুঁইয়ে নরম গলায় বলে,“দেখতে হবে না, তুমি আমাকে অনুভব করো। প্লিজ।”

থেমে যায় প্রণমি। চুপ হয়ে যায়, দু'হাতে লোকটার সারা মুখ ছুঁয়ে দিচ্ছে,কিন্তু মন যে মানছে না। ইরফান নিজের ভেজা শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে প্রণমির ডান হাতটা ধরে,ধীরে ধীরে সেই হাতটা নিজের নগ্ন বুকের কাছে নিয়ে চেপে ধরে রেখে আকুল হয়ে বলতে থাকে,“দেখতে হবে না। তুমি আমাকে অনুভব করো তো! এই প্রণো, এই আমি একটা ইরফান। তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি আমায় দেখতে না পেলেও বাসি, বুঝতে পারছো? অনুভব করতে পারছো তো মেয়ে?”

ইশি বারবার কল করছে। ইরফান ফোনটা সাইলেন্ট করে দূরে ছুড়ে মারে। এদিকে নিচে ইশি চিন্তিত ভীষণ, বিড়বিড় করে মুঈনকে বলে,“এতক্ষণ হলো,খাবে না নাকি?”

মুঈন কিছু সময় চুপ থেকে লাজুক হেসে বলল,“ওরা আসবে না,খাবে না। ওরা সম্ভবত ব্যস্ত, কল করো না এভাবে। ব্যাড ম্যানার্স!”

ইশির মুঈনের কথার মানে বুঝতে এক মিনিট লাগে, পর পর তার গাল দুটো লাল লাল হয়ে যায়, অস্ফুটে বলে,“ইশশ প্রণমি কত ছোটো!”

মুঈন হাসি চেপে রেখে বলে,“সেটা ওদের দুজনের মাথাব্যথার বিষয়। ওরা বুঝে নেবে। তুমি দুধ খাও।”

ইশি দুধের গ্লাস নিয়ে বসে আছে, তবে বসে বসে সে লাল,গোলাপী বেগুনী হচ্ছে, বিড়বিড় করে আবার বলছে,“এতদিন ভাবিনি ! প্রণমি আসলেই খুব ছোটো। ইশশশ! কি লজ্জা!”

প্রণমি কাঁপা হাতে লোকটার হৃদস্পন্দন অনুভব করে,উতলা হয়, তবুও কাঁদে। ইরফান প্রচন্ড ধৈর্য্যহারা হয়ে আবারো পেলব হাত দুটো দিয়ে নিজের চোখ ছোঁয়,কপট রাগ দেখিয়ে বলে,“এই চোখ, এই ঠোঁট, এই নাক, এই গাল এসব দেখার দরকার নেই। তুমি এটা দেখো শুধু, বুঝতে পারছো? এই যে হার্ট, প্রণো এই যায়গাটা কেউ-ই চোখে দেখে না। তাই আফসোস করো না, তুমি কিছু অনুভব করতে পারছো কিনা সেটা বলো। একটুও কি শান্তি পাচ্ছো না?

প্রণমি বলে না, কাঁদে। ইরফান ধমকে ওঠে,“বলো।”

কেঁপে উঠে মাথা নাড়ে প্রণমি। ইরফান ওর দু'হাতে চুমু খায়, চুমু খায় দুগালে,গালের লাল তিলে, চুমু খায় ঠোঁটে। আর প্রণমি ধীরে ধীরে ছোটো পাখির ছানার মতো আশ্রয় নিতে থাকে অমন প্রশ্বস্ত বুকটাতে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি আজ। বাজ পরছে একের পর এক। এদিকে আবেগ হতাশা আর ব্যাকুলতায় জর্জরিত দু'জন দু'জনকে জরিয়ে ধরে থাকে। এবার নিশ্চুপ কেঁদে যায় প্রণমি, ইরফান বলতে থাকে,“যখন যখন আমাকে দেখতে মন চাইবে না? এভাবে এখানটা ছুঁয়ে দেবে। এর বাইরে আমি কিছু নই প্রণো। এই যায়গাটা ছুঁলে তোমার যা মনে হবে,আমি তাই। বলো আমি কি? বলো বলো!”

_আপনি ইরফান মির্জা।
নাক টেনে প্রণমি জবাব দেয়।

_আর তুমি প্রণো। একটা প্রণমি আমার।

ভীষণ আবেগ তাকে টেনে নিল প্রণয়ের চূড়ান্ত পরিণামের দিকে, প্রণমি দু'হাতে তখনো ইরফানের গাল হাতরে বেড়াচ্ছে। হাত সরিয়ে ইরফান নিজের অধিকার মাখিয়ে দিল অষ্টাদশীর কাঁপা ঠোঁটে, বলেনা প্রণমি কিছু, কেমন শান্ত নদীর মতো চুপ। এক হাত বাড়িয়ে ইরফান সুইচ টিপে বাতি নিভিয়ে দিলো। প্রণমির কানের কাছে মুখ নিয়ে ভরাট স্বরে আকুল হয়ে বলল,“প্রণো,জানো আমিও না তোমায় দেখবো না আজ। আমরা কেউ কাউকে দেখবো না। হলো না সমান সমান?”

কাঁদতে থাকে প্রণমি, ইরফান ধীরে ধীরে তার অধিকারের স্পর্শ মাখালো প্রণমির সারা গায়ে, ঐ হাত প্রণমির পেট ছুঁয়ে উঠলো প্রণমির গালে ওর কান্না মোছাতে, তখন প্রণমি ফুঁপিয়ে উঠলো,“প্লিজ আমি কাঁদবো।”

ইরফান হাত সরিয়ে নিয়ে আঁচলে রাখে প্রণমির, গুটিয়ে গিয়েও নিজেকে ছাড়লো প্রণমি, কাঁদতে কাঁদতে বলল,“সত্যিই দেখছেন না তো?”

_কসম একটুও দেখছি না প্রণো।
ব্যাকুল কন্ঠ ইরফানের।

_দেখলে আপনাকে মেরে ফেলবো আমি।

_আচ্ছা।

_আর শোনেন।

_জি?

_আপনাকে আরেকটু দেখবো আমি?

লম্বা শ্বাস ফেলে মেয়েটার হাতটা টেনে নেয় ইরফান বুকে, বড্ড আদরে চুমুতে চুমুতে বলতে থাকে,“দেখেছো?”

_হু।

_কাকে দেখছো?

_একটা ইরফান মির্জাকে।
বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পরে মেয়েটা। ইরফান আবারো যখন ওর কান্না মোছাতে যায়,তখন বাঁধা দিয়ে বলে,“বলেছি না আমি কাঁদবো?”
কপালে ওর কপাল ঠেকায় ইরফান, তারপর কিছু সময় ওভাবেই থেকে আঁচল সরিয়ে দেয় প্রণমির।
ইরফান সত্যিই প্রণমিকে দেখেনা,একটুও দেখে না,চুরি করেও দেখেনা, দুষ্টুমি করেও দেখে না। কারণ তার প্রণমি তাকে দেখেনা তাই। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু সে তার প্রণমিকে নিয়ে নিলো প্রণমির থেকে। আর প্রণমিকে অত্যন্ত ধৈর্য্যশীলতা,কোমলতা,স্নেহ আর পরম প্রেম স্পর্শে বুঝিয়ে দিতে থাকল “প্রণমির একটা ইরফান মির্জা আছে।”
যাকে তার না দেখলেও চলবে,শুধু অনুভব করতে হবে, ঐ বুকটাতে হাত রেখে। বুঝে যাবে প্রণমি,তার আসলেই একজন আছে। একজন ইরফান মির্জা।

চলমান........

[ প্রিয় পাঠকেরা, আপনাদের অনেকের একটি আবদার রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না। প্রণমিকে আলো বানানো সম্ভব না, প্রণমি আলাদা। অষ্টাদশের আবেগী,সরল, ভঙ্গুর মেয়ে। ওর মনস্তাত্ত্বিক বিষয় সেভাবেই দেখানো হবে। ইরফান প্রণমির আলাদাই গল্প,ওরা আলাদাই। প্রণমি ইরফানকে ঘোরাবে কেন? প্রণমি তো বুঝে না বুঝে প্রেমে পরেছেই ছেলেটার,আর পেঁচিয়ে কি হবে?

আর হ্যা,এক জুটিতে ফোকাস বেশি রাখলে গল্প আরো দীর্ঘ হবে। পরিণয় দেখানোর পরে আমার মনে হয়না তাদের কাহিনী টানার মানে আছে। গল্প শেষ হলে প্রত্যেকের প্রিয় জুটি নিয়ে আলাদা আলাদা লিখবো না হয়। আপাতত আরো দুই জুটি শেষ করতে হবে।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 109 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন