ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 110

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১০
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

[ ১ম অংশ ]

বুকের মাঝে একপ্রকার লুকিয়ে আছে মেয়েটা, আঁকড়ে ধরে রেখেছে শক্ত করে ইরফানকে। নিদ্রাচ্ছন্ন গভীর নিঃশ্বাস অনুভব করছে ইরফান,বুঝলো এই মেয়ে এই জগতে নেই। মৃদু শ্বাস ফেলে ইরফান হাতরে চাদর টেনে কাঁধ অবধি ঢেকে দিয়ে অন্ধকারে প্রণমির গালে একটা হাত রাখে। তখন রাত শেষ হয়নি, কিন্তু ইরফানের তেষ্টা পেল,তেষ্টা পেল ঐ মুখটা দেখার। বুক থেকে প্রণমির হাতটা আলতো করে সরিয়ে খানিকটা উঁচু হয়,হাত বাড়িয়ে বাতির সুইচ টিপেই দৃষ্টি দেয় ফর্সা মুখটাতে। চেয়ে চেয়ে দেখে মেয়েটার চোখের কার্নিশে জমা জলের শুকনো দাগ। ইরফান ওসব ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে একা একা। দেখতেই থাকে সকাল অবধি। পাখি ডাকা ভোরে,বাড়ি ভর্তি মানুষের কোলাহল, আজ বৌভাতের অনুষ্ঠান, দুপুরে নিমন্ত্রিত সবাই। দূরের মেহমানরা সকালেই চলে এসেছে।
ইরফান শেষ রাত থেকে ঘুমোয়নি, তার জীবনের প্রথম উৎসবের ঐ রাঙা রাতটির জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আলতো তবে চীর গাঢ় এক চুমু আঁকে কপালে মেয়েটির। এবং আরো আরো সাবধানে টেনে দেয় চাদরটা।

ঘুম ভাঙছে প্রণমির, ওর নড়নচড়ন উপলব্ধি করেই ইরফান আলতো হাতে টেনে নেয় ওকে।

“অ্যালার্ম বাজেনি কেনো মিস জেনি?”

ঘুম ভাঙার পরে প্রণমির কিছুটা সময় লাগে সবসময় পরিস্থিতি বুঝতে,ঠিক হতে,এটাও তার ছোটো বেলা থেকে বদঅভ্যাস। আজো যখন বুঝতে পারছিলো না কিছু,তবে অনুভব করছে তার সাথে অনেক কিছু হয়েছে, পরিস্থিতি কিছুটা অস্বাভাবিক। নড়েচড়ে উঠতেই গাল ঠেকলো খোঁচা খোঁচা দাড়িতে,কারো শক্ত চোয়ালে। আতঙ্কে লাফিয়ে উঠবে প্রণমি তখনই ইরফান ওর গালে হাত রেখে ব্যগ্র হয়ে বলে,“এই আমি। আমি প্রণো।”

বড় বড় শ্বাস ফেলে প্রণমি। সময় গড়ায়, ইরফান হয়ে ওঠে উদ্বিগ্ন! কাল রাতের প্যানিক ফিরে এসেছে মেয়েটার? সাবধানী হয়ে প্রণমির দু'হাত আগলে ধরে,যাতে হাত না কামড়ে বসে। প্রণমি ঢোক গেলে বড় বড়, বোধ আসে, তার সাথে আসলেই অনেক কিছু হয়েছে। উহু,হয়নি, বরং প্রণমিই সে পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে। লোকটাকে কি ভীষণ ভুগিয়েছে প্রণমি,তা মনে পরে যায়। কতবার ভেঙেছে প্রণমি একরাতে, কতবার ঐ লোক ব্যাকুল হয়ে তাকে গড়ার আশ্বাস দিয়েছে তা মনে পরে যায়। পরিশেষে মনে পরে যায় সে কেমন বাধ্য মেয়ে হয়ে কাল রাতে সংসার জীবনে পা রেখেছে, মনে পরে যায় ঐ লোকটার শেষ কথাটা,“আমি একটুও দেখিনি তোমাকে বোকা মেয়ে, তুমি ঘুমাও, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পরো।”

আর প্রণমিও কেমন গদগদ হয়ে লোকটাকেই আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়েছে, ঐ সময়টায় সে বুঝতে পেরেছে সে লোকটাকে কী ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে। কতটা ভক্তি এসেছে যে নির্দ্বিধায় ছেড়েছে নিজেকে। স্পর্শ গুলো তাকে ভয় দেয়নি, উল্টো ঝরিয়েছে আবেগ। কেমন পুরোটা সময় আপ্লুত হয়ে ছিলো প্রণমি দু'চোখ ভর্তি পানি নিয়েও,স্বামী সোহাগে।

চোখের পাতা কাঁপছে মেয়েটার, মুখটা ফ্যাকাশে, মুখটা কাঁদো কাঁদো নিজের অবস্থান উপলব্ধি করে। কিছু বলল না, শুধু চাদর আকড়ে আরেকটু গুটিয়ে যায়,এবং পরপর আবার ঢুকে পরে ইরফানের বুকের মাঝে, মুখ তোলে না, মুখটা একপ্রকার পিষে ফেলছে ঐ পাথর কঠিন বুকে। কাঁপা হাত তুলে চোখ চেপে ধরে ইরফানের, লজ্জা আর আড়ষ্টতার ঘোরে সে হতবিহ্বল হয়ে কি করবে নিজেই বুঝতে পারছে না।

ইরফান মেয়েটার পাগলামি দেখে ম্লান হাসে,চোখ থেকে নরম হাতটা সরিয়ে দিয়ে কানের লতিতে চুমু খেয়ে অস্ফুটে বলে,“কসম একটুও কপটতা করিনি। দেখিনি। আমার প্রণমি আমায় দেখেনি। সমান সমান।”

প্রণমি কথা বলছে না শুধু বড় বড় শ্বাস ফেলছে। ইরফান ওকে স্বাভাবিক করতে ডাকে,“প্রণো!”

প্রণমির এই ডাকটাতেও ভীষণ লজ্জা লাগছে। ক্ষীণ আওয়াজে প্রণমি জানতে চায়,“সকাল কি হয়ে গিয়েছে?”

ম্লান হাসে ইরফান,আরেকটা চুমু খায় প্রণমির কপালে,ভরাট স্বরে বলে,“হয়েছে।”

প্রণমির কেমন কান্না কান্না পাচ্ছে লজ্জায়, ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে ইরফানের থেকে। যে চাদরটা কাঁধ অবধি ছিল,সেটি টেনে মুখ ঢেকে নিয়ে বাচ্চাদের মত বলতে থাকে,“আপনি যান। এখান থেকে যান। এক্ষুনি যান।”

উঠে বসে ইরফান, কপালে সুক্ষ্ম উদ্বিগ্নতার ভাজ পরেছে, হাত বাড়িয়ে মেয়েটা কে ছোঁয়,“প্রণমি! ফেস মি! ইউ হ্যাভ টু ফেস মি!”

_আপনি যান।

_প্রণমি!

হতাশ ইরফান। বসে থাকে চুপচাপ। খানিক বাদে প্রণমি নিজেই চাদর থেকে মুখ বের করে,চোখের পাতা কাঁপছে তার। পরপর ঢোক গিলে নিয়ে বলে,“আপনাকে আরেকটু দেখি?”

ঠোঁট চওড়া করে হেঁসে ফেলে ইরফান,মেয়েটাকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়, পরিপূর্ণতায় চোখ বুজে নিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলে ওর পেলব হাতটা নিজের বুকে ঠেকিয়ে বলে,“সবসময়। সবসময় দেখো তুমি!।”

_________

বাড়ি ভর্তি এ পক্ষের মেহমান, সবাইকে নিয়ে দুপুর নাগাদ কনভেনশন হলে যাবে এ বাড়ির সবাই। এবারের অনুষ্ঠান শান্তি নীড়ে করতে দেয়নি বাড়ির গিন্নীরা, প্রতিটা অনুষ্ঠানের পরে এতো বড় বাড়ি ভাগাড়ে পরিণত হয়,তাদের দাবি। তাই কনভেনশন হল।

ইরফানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় কড়া নাড়ছে ইনশিরাহ আর শেহা, সকাল দশটা বাজতে চললো, এখন বর বৌ সকালের নাস্তা সারলেই তারা মুয়া ডাকবে,প্রণমিকে তৈরি করতে। দেড়টার মাঝে হলে পৌঁছাতে হবে।

ভেতর থেকে ইরফানের তেতো স্বর,“দরজা ভাঙবি নাকি? এটা কেমন ধরণের আচরণ? বেকুবের দল।”

_বাপরে! তুই তো অনেক ম্যানার্স জান্তা শমসের হয়েছিস দেখছি! তা ভাই, বৌকে নিয়ে ঘর বন্দি হয়েই থাকবি? অনুষ্ঠানে যাবি না? বের হ এক্ষুনি!

_তোরা যা, আমরা আসবো।

_তোরা কি জ্বর টর বাধালি?

_নারে বাবা,যা তো!

_তাড়াতাড়ি হ্যা? প্রণমিকে সাজাতে এসেছে পার্লার থেকে!

_আবার ওসব কেন !

_নতুন বৌ,সাজবে না? এতো কথা বলিস না, তারাতাড়ি বের হ।

ইনশিরাহ,শেহা চলে যায়। ইরফান দাঁড়িয়ে আছে হাতে লাল রঙের এক সেট সালোয়ার কামিজ নিয়ে, তার পছন্দের রং এটা।

ঠিক তখুনি ওয়াশ রুমের দরজা ঠেলে বেড়িয়ে আসে প্রণমি, ধীরপায়ে, আড়ষ্ট কদমে, শরীরে জড়ানো একটা লং বাথরোব,আর মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে। ওকে দেখলো ইরফান এক পলক, দু'হাত কচলাচ্ছে মেয়েটা আড়ষ্টতায়, বাধ্য হয়ে স্বাভাবিক থাকছে মেয়েটা, সুস্থ থাকলে এই মেয়েটা ঠিকঠাক ভাবে লজ্জা পেয়ে নিতো না? এখন নিরুপায় হয়ে বেড়িয়ে এলো।

ইরফান নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে। পরপর স্বাভাবিক গলায় বলে,“বিছানায় সালোয়ার স্যুট রেখেছি। কাউকে ডাকতে হবে না, আমি বরং বারান্দায় যাই, প্ল্যান্টস গুলোতে পানি দিতে হবে।”

ইরফান চলে যেতেই প্রণমি ধীরে ধীরে সালোয়ার স্যুট পরে চুলটা মুছে নেয়, তারপর নিচুগলায় ইরফানকে ডাকে,“আপনার প্ল্যান্টস গুলোতে পানি দেয়া হলে আসতে পারেন।”

ইরফান এসে আবারো দাঁড়ায় প্রণমির মুখোমুখি, কিছুক্ষণ প্রণমিকে দেখে নিয়ে হাক ছাড়লো বাইরে,“শেহু !”

_ডাকছেন কেনো আপুকে?

_তোমাকে নিয়ে যাবে, ব্রেকফাস্টের পরে সাজাবে। বসো তুমি। আমি আসছি।

প্রণমি পা উঠিয়ে বিছানায় চুপচাপ বসে থাকে, ইরফান শাওয়ার নিতে নিতেই কোমরে একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে হঠাৎ দরজা খুলে উঁকি দিয়ে জানতে চায়,“শেহু এসেছে?”

_না তো। আসুক না ধীরে সুস্থে আপু। কত কাজ হাতে! আমার অসুবিধা নেই।

_মুশকিল হলো।

_কি হয়েছে?

_কাবার্ড থেকে আরেকটা ট্রাউজার বের করে দিতে হবে,এটা ভিজিয়ে ফেলেছি।

প্রণমি ভীষণ স্বাভাবিক, হঠাৎ ভীষণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে দাঁড়ায়, নিচুগলায় বলে,“জি,তবে, আমি বের করে দিচ্ছি। ছয় কদম তারপর বড় কেবিনেট তাইতো? আপু বলেছে আপনার যাবতীয় ঘরোয়া পোশাক ওখানে,কাল শুনেছি।”

_না না ইটস্ ওকে। আমি অপেক্ষা করছি!

_বলুন না,আমার অসুবিধা হচ্ছে না।

_হ্যা ঐ খানেই,এইতো পেলে। হ্যা খোলো,দেখো ওখানে ধূসর রঙের........

থেমে যায় প্রণমি। কেঁপে ওঠে হঠাৎ। অকস্মাৎ চোখ মুখ খিচিয়ে নেয় ইরফান। এক হাত তুলে নিজেই নিজেকে একটা চড় মেরে থামিয়ে দেয়, তারপর অপরাধীর মতো মুখটা নিয়ে তাকিয়ে থাকে প্রণমির দিকে। যে গুটিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে।

ইরফান কোনো মতে গাঁয়ের সাবান ফ্যানা ধুয়ে তোয়ালে পেঁচিয়েই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসে। নিজেই ট্রাউজার বের করে পরে নেয়। আড়চোখে দেখে প্রণমিকে,যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ভাবলেশহীন ভাবে।

গলা খাঁকারি দিলো ইরফান, বললো,“তুমি নতুন মানুষ, এগুলো,তুমি খুঁজে পাবে কিভাবে আজব!”

ম্লান হাসে প্রণো, নিজের প্রতি এক রাশ তাচ্ছিল্য নিয়ে ফিরতি জবাব দেয়,“পুরাতন মানুষ হলে বুঝি খুঁজে পাবো কোনটা ধূসর রং?”

_কালই খুঁজে পাবে।
ধীরস্থির জবাব দেয় ইরফান।

_তা কিভাবে?

ইরফান ম্লান হেসে এগিয়ে যায়, ঘুরিয়ে নেয় প্রণমিকে, কেবিনেটের দিকে মুখ করে দাড় করিয়ে পেছন থেকে দুইহাত আগলে ধরে আদুরে ভঙ্গিতে, পরপর নিরেট ঠাণ্ডা স্বরে বলে,“এসব করতে তুমি বাধ্য নও!”

_তবে বিয়ে করেছেন কেন?
উদাস গলায় জবাব দেয় প্রণমি।

ইরফান ওর কথার জবাব না দিয়ে নিজের কথা বলে যেতেই থাকল,“এসব করতে তুমি বাধ্য নও। তবুও তুমি চাইলে করতে পারো। আমি মাইন্ড করবো না বৌয়ের সেবা নিতে। তুমি নতুন মানুষ,এসো তোমাকে শিখিয়ে দিচ্ছি।”

_কি শিখিয়ে দেবেন আপনি আমায়? আমি কি শিখতে পারবো?

ইরফান প্রণমির হাত ধরে উঁচু করে কেবিনেটের ডান পাশ থেকে এক একটা শার্ট ধরে ধরে বলতে থাকে,“এটা ডান পাশ, শুরুতেই আছে আমার সাদা শার্ট টা। বলো কি আছে?”

_সাদা।
অস্ফুটে জবাব দেয় প্রণমি।

_এরপর কালো, আকাশী, নীল, নেভি, অফ হোয়াইট, মেরুন, ধূসর। বলো তো কি কি আছে?

_ডান পাশ থেকে শুরু হয়। সাদা,কালো, আকাশী, নীল, নেভি, অফ হোয়াইট, মেরুন, ধূসর।
ম্লান গলায় জবাব দেয় প্রণমি।

_আবার বলো আবার বলো।

_সাদা,কালো, আকাশী, নীল, নেভি, অফ হোয়াইট, মেরুন, ধূসর।

_গুড। তো বা পাশ থেকে খুঁজতে গেলে কিভাবে খুঁজবে বলো তো?

প্রণমিকে খুবই সিরিয়াস চিন্তিত দেখাচ্ছে,যেন একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে,সঠিক জবাবটা তাকে দিতেই হবে।
নিমিষেই চেহারায় খেলে যায় আত্মবিশ্বাসের ঝলকানি প্রণমির, উৎসাহী হয়ে বলে,“তবে বা পাশ থেকে আসবে ধূসর,মেরুন,অফ হোয়াইট,নেভি,নীল,আকাশী,কালো সাদা।”

উচ্ছ্বসিত হয়ে হেসে ওঠে ইরফান,টকাশ করে প্রণমিকে জোরসে একটা চুমু খেয়ে গাল ভিজিয়ে দিয়ে বলে,“গ্রেট! ইউ আর জিনিয়াস! শালা আমার এতো ভালো ব্রেইন নেই! এজন্যই তুমি প্রিতমের বোন!”

গালে যেখানটায় চুমু খেয়েছে ইরফান ওখানটা চেপে কপাল কুঁচকে ফেলে প্রণমি। ইরফান থতমত খেয়ে বলে,“শালা গালি অর্থে ব্যবহার করিনি!”

প্রণমি চুপ করে রয়। ইরফান ওর আরো নিকটে গিয়ে কেবিনেটের মধ্যে কিভাবে কি আছে সব বলতে থাকে সোৎসাহে। প্রণমি শুনছে চুপচাপ, সে হঠাৎ টের পেলো তার খুব খুব খুব আগ্রহ জমছে এসব মুখস্থ করে রাখতে। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা মেয়েটার। একটা ঘোরের মাঝে চলে গিয়েছে সে, ঘোর কাটে লোকটার গমগমে হাস্কি স্বরে,“হয়েছে আজকের মতো আমার বড় কেবিনেট আর এখানকার বাসিন্দাদের সাথে তোমার আলাপ চারিতা শেষ হলো,এখন চলো পাশেরটাতে। ওহহ ওয়েট,আমার তোয়ালে গুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। তো প্রণমি, এই হচ্ছে তৃতীয় তাক, এখানে থাকে ডান দিক থেকে সি-ব্লু তোয়ালে মামা, তারপর অরেঞ্জ তোয়ালে ভাই, তারপর পিংকি তোয়ালে আন্টি।”

খিলখিল করে হেসে ওঠে প্রণমি, মুখে আলতো করে হাত চেপে হাসতে লাগলো। ইরফান খুব মজা পেলো ঐ হাসিতে। মেয়েটাকে আরো হাসাতে ইচ্ছে হলো। প্রণমি আবারো খুব সহজ হয়ে ওঠে, মজা পাচ্ছে সে লোকটার বাচ্চামিতে, উৎসাহী গলায় বলে,“আর কারা কারা আছে যাদের সাথে আমি পরিচিত হইনি? পরিচয় করিয়ে দিন।”

ইরফান খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখছে, চোখে পরলো তার কিছু আন্ডারওয়্যার। নিশ্চুপ হেসে নেয় কিছুক্ষণ। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি চেপে রেখে গলা স্বাভাবিক করে বলে,“এলাকার সবার সাথে পরিচিত হতে নেই একদিনে। নতুন বৌ তুমি। লজ্জা ভাঙতে নেই এভাবে।”

প্রণমি জানে লোকটা মজা করছে,তবে ঠিক কি কারণে,ধরতে পারছে না। ইরফান ওকে ঘুরিয়ে পাশের আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,“এটা হচ্ছে আমার বাইরে পড়ার শার্টদের বাড়ি। চলো এই ভিআইপি দের সাথেও পরিচিত হওয়া যাক।”

বুকটা ক্রমশ হালকা হয়ে যাচ্ছে প্রণমির,টের পাচ্ছে অজানা কিছু ভারী বস্তু তার বুকে চাপা হয়ে ছিলো,সেটি আর নেই। লোকটার সরল দস্যিপনায় সেও মেতে উঠেছে ‌। ইরফান পেছনে দাঁড়িয়ে এটা সেটা হাসির কথা বলছে,সে খিলখিলিয়ে হাসছে। আচমকা সে হাসি থামে যখন কথা বলতে বলতে ওর কাঁধে ইরফান থুতনি ঠেকায় পেছন থেকে। প্রণমি শিহরিত হয়ে ওঠে। কেঁপে ওঠে তিরতিরিয়ে। লোকটার গা থেকে ভীষণ মায়া মায়া গন্ধটা পাচ্ছে‌, গতকাল পুরোটা রাত ধরে এই ঘ্রাণটার মধ্যে নিজের অস্তিত্ব বিলিয়েছে কোনো অভক্তি ছাড়াই। এই গন্ধটা শুধুই প্রণমির। ইরফান কথা বলেই যাচ্ছে তো বলেই যাচ্ছে। প্রণমি একা একা হাসে লাজুক হাসি, পরপর নিচু স্বরে বললো,“আস্তে কথা বলুন না দূরে সরে, আমি অন্ধ, কালা তো নই!”

ইরফান থেমে গিয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে, ত্বরিৎ হাতটা সরিয়ে নেয় কোমর থেকে ওর, থুতনি সরায় কাঁধ থেকে।

শেহা এসে দরজায় দাঁড়ায় সংকোচ নিয়ে,নক করে বলল,“আসব?”

_হু আয়।

শেহা ভেতরে ঢুকে পা-মাথা প্রণমিকে দেখলো, প্রণমির ভেজা চুলগুলো দেখে মলিন হাসলো শেহা,ওর হাত ধরে বলল,“চলো প্রণমি নিচে..”

_এই প্রণমি কি? ভাবী বল?

শেহা হাসলো ইরফানের কথায়,বলল,“একটু সময় তো দাও। অস্থির হচ্ছো কেন! তুমি যাও তোমার বন্ধুরা নিচে,কি জানি আলোচনা করবে তোমার সাথে।”

ইরফান প্রণমিকে আরো একপলক দেখে চলে যায়। এর মাঝে ইনশিরাহ আসে। শেহা প্রণমিকে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,“কে বের করে দিয়ে এই স্যুটটা? তুমি বের করেছো?”

দু'পাশে মৃদু মাথা নাড়ে প্রণমি, অস্ফুটে বলে,“উনি।”

ইশি আর শেহা একে অপরকে দেখে কিছু সময়, অতঃপর ইশি মজা করে বলে ওঠে,“বাব্বাহ! নিজের কাজ করতে পনেরো জনকে ডাকা ছেলেটা বৌয়ের পোষাক গুছিয়ে বের করেছে! এই শেহু,আমার মাথা ঘোরাচ্ছে!”

শেহা হেসে ওঠে। প্রণমি মাথা নিচু করে,মুখটা লাজুক তার। ইনশিরাহ পা থেকে মাথা ওকে দেখে ওকে গিয়ে আগলে ধরে, কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলে,“চিরসুখী হও ভাবী!”

_আমাকে ভাবী ডেকো না তো আপু!

_তা বললে হবে? ইরফান আমার বড়, দেখলে না তোমার স্বামী এইমাত্র শেহাকে ধমকালো কিভাবে !

চলমান......

[ ২য় অংশ রাত নটার পরে পাবেন। ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১০ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

[ ২য় অংশ ]

হল ভর্তি মেহমান গিজগিজ করছে। মাছের বাজারের মতো শোরগোল হচ্ছে হলের মিডল পয়েন্টে। প্রণমিকে নিয়ে মির্জা বাড়ির সবাই এখানে পৌঁছেছে ঘন্টাদুয়েক আগে। কিছুক্ষণ বাইরে বসিয়ে রেখে অতিথিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে, ফটোশুট করিয়ে ওকে একটা গেস্টরুমে বিশ্রাম নিতে পাঠানো হয়েছে।
গা কুট কুট করছে প্রণমির চুমকিপাথরখচিত লেহেঙ্গা পরে থাকায়,মেজাজটাও চটছে। এভাবে একা ফেলে সবাই চলে গেলো? সে নতুন বৌ তো কি? মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না,সবাই বুঝে নিতে পারে না? আর আপু ভাইয়াও,কোথায় তার কাছে থাকবে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইবে প্রণমির সুবিধা অসুবিধা, তা না,ওনারা কুটুমদের সাথে আলাপ চারিতা করতে ব্যস্ত, পাঁচ মিনিট জরিয়ে ধরে আদর দিলেই হয়ে গেল?
পেট খিদেয় চো চো করছে এদিকে। আশেপাশে, ত্রিসীমানায় কেউ নেই।
আচমকা দরজার নব ঘোরার শব্দ হয়, খুবই ক্ষীণ সে আওয়াজ। প্রণমির কান খাড়া হয়। নড়েচড়ে বসে। নিমিষেই নাকে সেই ঘ্রাণটা পৌঁছায়,সেই মায়া মায়া ঘ্রাণ।

প্রণমি হঠাৎ খেয়াল করলো তার অভিমান চেপে বসেছে লোকটার ওপর। এই সুদীর্ঘ সময়ে লোকটাও তো আসেনি একবার। পরপর প্রণমি নিজেকে শোধরায়। সে এতো বাচ্চামি কেন করছে অদ্ভুত! এতো উতলা হচ্ছে কেন!

ইরফান দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,এক হাতে ছাই রঙের ব্লেজার টা, গা থেকে খুলে রেখেছে যেটা, আরেক হাতে একটা বক্স। তার গায়ে ধবধবে সাদা রঙের একটা শার্ট। সাদায় শ্যামলা মুখটা দেখতে ভীষণ অপূর্ব লাগছে।

“এটা আপনি?”

প্রণমি ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করে। ইরফান স্মিত হেসে বলে,“জিইই।”

_ওরা সবাই কোথায়?

_আছে, ফটোশুটে ব্যস্ত সবাই।

প্রণমির মুখটা আবার মলিন হয় অভিমানে। হঠাৎ টের পেল মানুষটা তার পাশে এসে বসেছে। প্রণমি আরো কিছু প্রশ্ন করবে তার আগেই ইরফান বলে ওঠে,“গেস্টরা খাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে দু'টো নাগাদ খেতে বসবো। নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে?”

প্রণমির লজ্জা লাগছে খিদের কথা বলতে, কিছুক্ষণ আগেই তো স্টার্টার খেয়েছে। এখন যদি খিদের কথায় হ্যা বলে তখন লোকটা কি ভাববে তাকে? রাক্ষস?

ইরফান হাতের বক্সটা খুলে কাটা চামচে এক টুকরো ফিস কাটলেট তুলে বাম হাতে প্রণমির থুতনিতে আলতো হাত রেখে বলে,“ফিস কাটলেট!”

মুখ ঘুরিয়ে নেয় প্রণমি,“এই না! সবার সাথে খাবো। ওরা সবাই আমাদের নিয়ে খেতে বসবে যে!”

হাসে ইরফান,“তো? তখনো না হয় খাবে? এখন অল্প মুখে দিলে কিছু হবে না।”

দোনামোনা করতে পারলো না প্রণমি,এর আগেই ইরফান খাইয়ে দিল জোর করে। মুখে খাবার টা যেতেই প্রণমি তৃপ্তিতে শ্বাস ফেলল। পরপর খাবারটা চিবুতে চিবুতে বলল,“আপনি খাবেন না!”

ইরফান তখন খাচ্ছে,বলল,“তা আর বলার অপেক্ষা রাখি! ওদের ভরসায় থাকলে আমাদের দুজনের তিনটার আগে কিছু খাওয়া হবে না! অতি আনন্দে সবাই এমন ভাবে মেতেছে খিদের নাম ভুলে গিয়েছে সবাই।”

প্রণমি হাসে মাথা নিচু করে। ইরফান দেখলো প্রণমির নাকের নাকফুল টা, হঠাৎ এগিয়ে এসে নাকফুলটা ছুঁতেই প্রণমি আঁতকে ওঠে। ইরফান চেঁচায়,“এটা কি? কখন আসলো?”

_আজ সকালেই।

_মানে? কি ফালতু কাজ কারবার, কে করেছে? ব্যথা পাওনি? পারমিশন দিয়েছো কেন? আমাকে ডাকোনি কেন?

প্রণমি ঘাবড়ে যায়,“থামুন থামুন। এতো উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? হ্যা ব্যাথা পেয়েছি, তবে এটা তো ক্ষতিকর কিছু না। মা বললো করাতে!”

ইরফান চুপ করে বসে। প্রণমিকে কাটলেট খাইয়ে দিতে দিতে বলে,“মাম্মা বললো বলে?”

_হু।

_কেন এর উপকারিতা কি?

_যাতে বিবাহিতা লাগে আমাকে দেখতে। আর এটা তো সব মেয়েরা করে!

_কেন বিবাহিতা লাগবে? তোমার স্বামী কে?

_আপনি!
অবাক হয়ে বললো প্রণমি।

ইরফান বিরস মুখে কাটলেট টা খেয়ে নিয়ে কন্ঠে রাগ চেপে রেখে বলে,“তো এটা আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলে না? বিষয়টা তো স্বামী রিলেটেড। এটাতে আমার মতামত দেয়ার অধিকার সবচেয়ে বেশি।”

“স্বামী রিলেটেড!”
ইরফানের অদ্ভুত কথাটা শুনে মৃদু হেসে ওঠে প্রণমি। ইরফান হাঁফ ছেড়ে টিস্যু নিয়ে প্রণমির ঠোঁটে লেগে থাকা খাবার মুছিয়ে দিতে চাইলো। প্রণমি সাবধান হয়ে কিছু বলতে যাবে তখনই ইরফান বলে ওঠে,“ওহহ শীট!”

যা ঘটার তাই ঘটেছে। স্মাজপ্রুফ লিপস্টিক তাও তেলমশলা লেগে উঠে লেপ্টে গিয়েছে ঠোঁটের আশেপাশে।

ইরফান বোকাবোকা মুখ করে তাকিয়ে রইল। প্রণমি শ্বাস ফেলে বললো,“ঘটিয়ে ফেললেন অঘটন?”

_জিই।
লজ্জিত ভঙ্গিতে ইরফান বললো।

_এখন কি হবে! আমাকে কেমন লাগছে?
ভীষণ চিন্তিত লাগছে প্রণমিকে। ইরফান চেয়ে চেয়ে দেখছে প্রণমিকে। হঠাৎ তার হাসি পেল একটা কথা ভেবে, মেয়েরা সবসময় নিজের সাজগোজ নিয়ে সতর্ক।

ইরফান টিস্যু পেপার দিয়ে ঠোঁটের চারপাশে লেগে থাকা লিপস্টিক মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,“আরে ডোন্ট ও'রি! ইরফান মির্জা সব ঘাটতে পারে আবার সব ঠিক করতেও পারে। স্বামীর ওপর ভরসা রাখো।”

_এই না না ছাড়ুন, যা করেছেন করেছেন,এখন প্লিজ মেকআপ ঘাটবেন না, আড়াই ঘণ্টা বসে থেকে নিতে হয়েছে।

_আরে কিছু হবে না। চুপ করে বসো তো। মেকআপ বক্স এখানেই আছে দেখছি, এটা তুলে আমি নতুন করে লাগিয়ে দিচ্ছি।

ইরফান ঘষছে প্রণমির ঠোঁট,প্রণমি বাঁধা দিচ্ছে। ইরফান শুনছে না, উল্টো বলছে,“এই রংটা অতোটাও ভালো না, হালকা একটা লাগিয়ে দেবো।”

_আরে ছাড়ুন নষ্ট হবে।

_আমি সুন্দর করে সাজিয়ে দেবো।

ঠিক তখুনি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো ইশি,প্রেরণা আর ইনু। প্রেরণার হাতে একটা প্লেটে কিছু খাবার। খেতে বসতে দেরী হবে তাই বোনকে খাওয়াতে এসেছে।

ওরা তিনজন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। ওরা বুঝেছে ইরফান জোর করে চুমু খাচ্ছে মেয়েটাকে! ঘটনাটা হুট করে আসা যে কারো দৃষ্টি ভঙ্গিতে তেমনই লাগবে। শব্দ পেয়ে ইরফান তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো। ওরা সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ইশি প্রণমিকে দেখেই আঁতকে উঠলো,এতো সুন্দর মেকআপ ঘেঁটে কি করেছে! কেমন কান্ড জ্ঞানহীন ছেলে এ!

ইরফান বিব্রত,সকলেই বিব্রত। প্রণমি কিছু বুঝতে পারছে না শুধু। পরপর প্রেরণা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, হাসি চেপে রেখে বেরিয়ে যায় ইনুও। দাঁড়িয়ে আছে ইশি। ওর গোল্লা গোল্লা চোখ দেখে ইরফান বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,“ভাই এভাবে দেখিস না! তোরা যা ভাবছিস তা না...!”

_বের হ! বের হ! ইশ কি অবস্থা করে ছেড়েছে মেয়েটার। অদ্ভুত তুই! উইয়ার্ড তুই!

ইরফান চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। ইশির রাগ বাড়ছে, এতো সুন্দর সময়সাপেক্ষ মেকআপের এই হাল হলে রাগ তো হবেই! প্রণমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছে। ইশি আপু ওনাকে ভুল বুঝছে! কি লজ্জাজনক ব্যাপার।

ইনশিরাহ আবারও ইরফানকে বললো,“যাবি তুই?”

_আপু।
প্রণমি ডাক দিলো। ইশি তাকাতেই বললো,“উনি মেকআপ টা ঠিক করছিলেন, নষ্ট না। বুঝতে ভুল হয়েছে তোমার।”

ইরফান তাকায় বৌয়ের দিকে। খুশি খুশি ভাব ধরে এবার ইনশিরাহর দিকে তাকায়, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“তোদের মাইন্ডের মতো নষ্ট নই আমি হ্যা? যত্তসব!”

বেড়িয়ে যায় ইরফান। ঘরের বাইরে যেতেই দেখা হলো প্রেরণার সাথে, দু'জন দু'জনকে দেখে অপ্রস্তুত হাসে, অতঃপর পাশ কাটিয়ে চলে যায় ইরফান।

ইনশিরাহ শ্বাস ফেলে প্রণমির পাশে গিয়ে বসে,“ধূর ছাতা,সব নষ্ট হলো,এখন কে ঠিক করবে, আমি তো এসব পারিনা দাড়াও ইনুকে ডাকছি।”

ঘরে ঢোকে প্রেরণা, চুপচাপ বোনের পাশে বসে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গলায় বলল,“এখন এটা আগে খেয়ে নে।”

_কি?

_খাবার,খেতে বসতে দেরী হবে যে।

_আমার খিদে নেই আপু।

_মানে? তখন সামান্য কি সব খেলি ওতে হলো? আরে লজ্জা পাস না,এখানে কেউ কিছু মনে করবে না তুই খেয়ে নিলে বোকা। যখন সবাই খেতে বসবে তখনো না হয় খাবি।

_আমার পেট ভরা আপু।

_ভরা মানে?

_আমাকে একটু আগে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে।

_কে?

অবাক হয় প্রেরণা। প্রণমি মাথা নিচু করে নেয়,ধীমি আওয়াজে বলে,“উনি।”

প্রেরণা তাকিয়ে রইল বোনের নত মস্তকের দিকে কিছু পল, হঠাৎ তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে সরল স্নিগ্ধ একটা হাসি,চোখে পানি আসে এক সুক্ষ্ম পরিপূর্ণতার। বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“সুখী থাকো।”

__________

প্রকৃতি আজ বড়ই উত্তাল। ঝড় হচ্ছে বাইরে একপ্রকার। কমিউনিটি সেন্টার থেকে ওরা বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়িতে ফিরলো। প্রণমি ইরফান যায়নি প্রেরণাদের বাড়িতে, ঠিক করেছে দু'দিন বাদে যাবে। সারাদিনের ধকলে সকলেই যখন বিধ্বস্ত, যে যেভাবে পারছে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। ইরফান প্রণমি নিজেদের রুমে, ইহান পুলসাইডে, ইশি মুঈনও তাদের ঘরে। বড়রা নিজেরা নিজেরা আলোচনা করলো এবং ইলহাম মির্জা কথাটা তোলেন । শেহা ইনুর ঘরে ছিলো, বিশ্রাম নিচ্ছিলো, মেজো মামার ডাকে না চাইতেও দোতলায়,সবাই যেখানে বসে আছে সেখানে এসে বসলো।

ইলহাম মির্জা চোখ দিয়ে শান্ত এবং সামিনের থেকে অনুমতি নিয়েই কথাটা পারলেন। প্রস্তাব দিলেন শেহাকে উজ্জ্বলের হয়ে।

শেহা ভীষণ ভীষণ এবং ভীষণ রকমের অবাক হয়ে বলল,“উজ্জ্বল মাহমুদ?”

বড়রা সবাই থমথমে মুখেই বসেছিল, মেয়েটা আবার রিয়াক্ট করে কিনা সেই ভয়ে। আলো বুঝিয়েই বললো,“জানি এখন কথাটা তোলার সময় না তবে তোর বাবা তো রাজশাহী ফিরে যাবে শেহা, ও থাকতে থাকতেই হ্যা না যদি কিছু বলতি।”

_হ্যা না মানে?
মলিন মুখে জানতে চাইলো শেহা!

_হ্যা না মানে বিয়ের জন্য না বোকা। এই সম্বন্ধ আমরা দেখবো কি না সেটার ব্যাপারে, তোর বাবা ছেলেটাকে পছন্দ করেছে শেহু।

শেহা মুখ ঘুরিয়ে শান্তকে দেখে অপলক। সামিন বলতে থাকে,“এটা তোমার আর তোমার বাবার দু'জনের যৌথ সিদ্ধান্তে এগোবে। তুমি বলেছো তোমার বিয়েতে আপত্তি নেই, আমরা তাই পাত্র খুঁজছি, তুমি নিজেই এই দায়িত্ব তোমার বাবা এবং তিন মামাকে দিয়েছো। আমরা খুজছি সবচে উপযুক্ত কাউকে, আমরা তো বুড়ো হয়েছি আমাদের পছন্দ আলাদা, তোমার মানসিকতার সাথে মিলতে না-ই পারে। এর আগে ইশির বিয়ের সময় যথেষ্ট নাস্তানাবুদ হয়েছি আমরা। তাই তুমিই ভেবে চিন্তে বলবে,আমরা সে অনুযায়ী খুঁজব। বলো এখন, উজ্জ্বল ছেলেটাকে তোমার চোখের দেখাতে কেমন লেগেছে? তুমি কি ভাবতে চাও?”

শেহা নিশ্চুপ,মুখ ভাবলেশহীন। শান্ত কিছুই বলে না মেয়েকে। সামিন আবার বলে ওঠে,“আচ্ছা সময় নিয়ে জানাবে? জানাও। এই নাও ওর বায়োডাটা,পড়ে দেখো ভালো লাগে কি না! ভালো না লাগলে দ্যাটস ওকে!”

একটা ফাইল এগিয়ে দেয় সামিন। শেহা ঐ ফাইলের দিকে নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল উজ্জ্বল মাহমুদ বলে লোকটার হাসি হাসি মুখটা। হাঁফ ছাড়ল শেহা।

ইলহাম বলে ওঠে,“কি রে ? হ্যা না কিছু একটা বল? ওর দাদু খুব পছন্দ করেছে তোকে, আর ছেলেও মত দিয়েছে। আমরা কি ভাববো এটা নিয়ে? ওনাদের থেকে সময় চাইবো ভাবার? তুই কথা বলবি?”

শেহা চোখ তুলে তাকালো ! মেয়েটির নিষ্প্রাণ দু'টো চোখ দেখে সবাই ভীষণ চিন্তিত হয়ে পরে। সামিন তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে,“ইটস ওকে মা, ইটস্ ওকে। তাহলে বাদ....”

_আমি ভেবে জানাবো তোমাদের বড় মামা। চিন্তা করো না, সময় চাই।

নিরুদ্বেগ জবাব শেহার।

_ভেবে জানাবি মানে?
চেঁচিয়ে উঠলো ইরফান। সে এই মাত্র ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘর থেকে বেড়িয়েছে। শেহার মন্তব্য শুনে চোখ কপালে তুলে চেঁচায়,“এই আহাম্মক! তুই ভেবে জানাবি মানে কি? ওনারা সবাই বলছে আর তোকে ন্যাকা ভদ্র মেয়ের মতো রাজি হতে হবে? এটা কেমন কথা?”

সামিন উঠে দাঁড়ায়, বিরক্ত হয় খুব,ধমকে ওঠে,“ইরফান প্রণমি নতুন মানুষ ওর সামনে কোনো ফ্যামিলি ড্রামা করো না, তুমি ওভার রিয়াক্ট করছো!”

_আমি ওভার রিয়াক্ট করছি? এটা আমার বোনের সারাজীবনের প্রশ্ন। তোমাদের তো সবসময় মনে হয় ভাই হিসেবে আমি সবসময় ওভার রিয়াক্ট করি।

ভাই ভাই ভাই। এই শব্দগুলো শেহার ভীষণ কাঁটা কাঁটা লাগছে, নিজেকে শান্ত রেখে সে পাল্টা জবাব দেয় ইরফানকে,“এটা আমার জীবনের প্রশ্ন,তাই সিদ্ধান্ত তো আমিই নেবো তাইনা? বাবা,মামারা,মামীরা কেউ আমাকে জোর করছে না।”

ইরফান তেড়ে আসে ওর দিকে,“জোর তো অবশ্যই করছে, মুখে নয় ইমোশনালি। তুই বুঝতে পারিস না। দে ঐ ফাইল দে, দেখতে হবে না বায়োডাটা। এই সম্পর্ক হবে না এটাই শেষ কথা।”

প্রণমি ঘরে বসে শুনছে বাইরে চেঁচামেচি, নতুন বৌ বিধায় আসছে না ঘরের বাইরে। পারিবারিক ঝামেলায় তার অস্বস্তি হলেও একটা ব্যাপার তাকে মুগ্ধ করছে, ঐ লোকটা, ঐ উগ্র ইরফান মির্জা নিজের বোনদের ঠিক কতটা ভালোবাসে, তার কাছে চাচাতো ফুফাতো বলে কিছু নেই। স্বামীর এই শক্তিশালী দিকটা আবিষ্কার করে মনে মনে খুশি প্রণমি।

চেঁচামেচিতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ইহানও। সে সবটা শুনে বড়দের বলে,“অমনি পাগল হয়ে গেলে তোমরা? দু'দিন হয়নি সম্বন্ধ টা এলো। তোমাদের সবকিছুতে তাড়াহুড়ো।”

সামিন বলল,“তোমরা দুইভাই আমাদের ভুল বুঝছো। এমনিতেও এটা শেহার ব্যপার। ওকেই বুঝতে দাও।”

ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ইশি মুঈন। সবাই জমায়েত হয়েছে এক যায়গায়। ইরফান সামিনের কথার জবাবে চেঁচায়,“না ও বুঝবে না। ও ছোটো মানুষ। ও বুঝবে না।”

ইরফান চেঁচাচ্ছে গলা ছেড়ে,ইহান এবার ওকেই ধমকায়,“তুই ওভার রিয়াক্ট করছিস!”

_দাদান হাউ? উজ্জ্বল মাহমুদ ইজ আ নাইস পার্সন বাট শেহু কি করে একটা আধবুড়ো লোকের সাথে....!”

আধবুড়ো কথাটা গায়ে লাগলো ইহানের । সে ঠান্ডা গলায় ভাইকে বললো,“তবে তো আমিও আধবুড়ো! ওয়াও নাইস! আমি জানতাম না তো!”

ইরফান থতমত খায়,“দাদান আই ডিন্ট মিন ইট! বাট,ওদের এইজ গ্যাপ! দাদান এটা কেমন হয়?”

রিতু এবার জবাব দেয়,“প্রণমিও তো তোর থেকে আট-সাড়ে আট বছরের ছোটো। সেটা কেমন হয়েছে?”

_মাম্মা আট বছর আর বারো বছর এক হলো?

এতোসব কথা অসহ্য লাগছে শেহার। হঠাৎ ওর চোখের কোণে একটু পানি এলো অজানা কারণে। মুঈন খেয়াল করে বলল,“শেহা, তুমি বলো। আমরা এখানে সবাই আছি! তুমি কি প্রস্তাব টা নিয়ে ভাবতে চাও মন থেকে? শান্ত ফুফাকে খুশি করতে চাইছো নাতো নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে?”

_না জিজ।
অস্ফুটে জবাব দেয় শেহা।

ইরফান তেড়ে যায়,“আবার মিথ্যা বলে। এক চ'ড় মারবো ধরে।”

শেহা ফাইল হাতে নিয়ে সটান দাড়িয়ে,সেও উত্তপ্ত মেজাজ নিয়ে চেঁচায়,“তুমি ওভার রিয়াক্ট করছো!”

থমথমে মুখ ইরফানের,“আমি ওভার রিয়াক্ট করছি?”

_হ্যা করছো। আমার মাথার ওপর এখনো আমার বাবা,আমার তিন মামা এবং তিন মামী আছে। দয়া করে ওদের থেকে বেশি বুঝতে যেও না।

শেহার কথা গুলো ইরফানকে আহত করে না, বরং রাগিয়ে দেয়, জেদ দেখিয়ে বলে,“বুঝবো বেশি বুঝবো। আমি তোর ভাই! এবং আমার থেকে বেশি বোঝার জন্য তোকে একটা চ'ড়ও মারবো।”

শেহা এইবার ভীষণ রেগে চেঁচিয়ে ওঠে,গলা কাপে তার,“না বুঝবে না। আমার কোনো বিষয় তুমি বুঝবে না, খবরদার চেষ্টাও করবে না। বড়রা আছে।”

শেহার অবস্থা দেখে শান্ত ধমকায়,“মা তুই বেয়াদবি করছিস কেন এভাবে?”

শেহা কাঁদছে, তার হঠাৎ কেমন পাগল পাগল লাগতে শুরু করেছে। হাতের ফাইলটা নিয়ে ছুটে ইনুর ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ইরফানও ভীষণ রেগে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দেয়,“এই বেয়াদব দরজা খোল! বের হ! বের হয়ে কথা বল শেহু!”

শেহা দরজা খোলে না হাতের ফাইলটা শক্ত করে ধরে কাঁদতে থাকে নিশ্চুপ।

_________

প্রণমি তখনো বের হচ্ছে না। বাইরে তুলকালাম লেগে গিয়েছে। ঐ লোকটা ভীষণ রেগে গিয়েছে। কারোর কথাই শুনছে না। শেহা আপুকে অযথা বকছে লোকটা। বড়রা যে যার ঘরে গিয়েছে বিরক্ত হয়ে।

ইরফান দরজায় ধাক্কা দিয়ে আবারো চেঁচায়,“বের হ। আচ্ছা মারবো না। ঠান্ডা মাথায় কথা বলবো, আমি বুঝতে চাই বুড়ো একটা পাত্রের মধ্যে তোর সম্মানীয় মুরব্বিরা তোকে কি এমন রসগোল্লা দেখালো যে তুই একেবারে পাগল হয়ে গেলি!”

_থামবে তুমি?
ভাঙা গলায় শেহা চেঁচায়।

মুঈন আর ইহান ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। একপর্যায়ে মুঈন বিরক্ত হয়ে ইরফানকে বলে,“তোমার থামা উচিত ইরফান।”

_না থামবো না। সবকটা বেয়াদব আর ভাইদের থেকে বেশি বোঝে। ভেবেছিলাম এইটা ভালো, কিন্তু এইটা তো আস্ত বেকুব!”

মুঈন চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে চলে যায় ইশির কাছে। প্রণমি এবার ধীরপায়ে হেঁটে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ওকে ইহান দেখে ফেলে,ইরফানকে বলে,“ভাই। শেহুকে আমি বোঝাবো। তুই প্রণমির কাছে যা। ও নতুন মানুষ।”

ইরফান তখনো চেঁচিয়ে যাচ্ছে,“তুই বের হ!”

_তুমি প্লিজ যাও তো রাগী মির্জা। আর শোনো, ভাবা ভাবির কিছু নেই। আমি এক পায়ে রাজি এই সম্বন্ধে‌ । অহেতুক বাওয়াল করো না।

এবার দরজায় ভীষণ জোরে জোরে ধাক্কা পরে। ইহানও চলে যায় পাগলকে থামাতে না পেরে। প্রণমি দেখছে অবস্থা বেগতিক, সে অনেকটাই জড়তা নিয়ে ডান দিকে দশকদম এগিয়ে যায় চুপচাপ, হাতরে হাতরে ইরফানের পিঠে হাত রাখতেই ইরফান হাত সরিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,“দাদান যাও তো! ”

কেঁপে উঠলো প্রণমি। তাল সামলাতে না পেরে যেই পরে যেতে চাইলো অমনি ইরফান খপ করে ধরলো ওর হাত,হ্যাচকা টানে আনলো বুকে। হাপাচ্ছে প্রণমি। ইরফান ছটফটিয়ে উঠল,“ব্যাথা পেয়েছো? ভয় পেয়েছো প্রণো।”

বড় বড় শ্বাস ফেলে দু'পাশে মাথা ঝাঁকায় প্রণমি, নিচু স্বরে বলে,“আপু ভয় পাচ্ছে। যে জিনিসটা বুঝিয়ে পারা যায় সেটা এভাবে রেগে করছেন আপনি। আপুকে কাল সকালে বুঝিয়ে বলবেন এই সম্বন্ধের অসুবিধা গুলো,যেটা আপনার মনে হয়। আপু তো ছোটো না তাইনা? সে বিবেচনা করবে। চেঁচামেচি করে,চাপ দিয়ে আপুকে কি বোঝাতে পারবেন?”

ইরফান থামলো,চেয়ে থাকল প্রণমির দিকে। কেমন ভীষণ বুঝদার লাগছে মেয়েটাকে, যেন পাক্কা সংসারী। এই মুখটা দেখে নিমিষেই সমস্ত রাগ, মেজাজ গলে জল হলো। শ্বাস ফেলে বললো,“চলো ঘরে চলো।”

_আপুকে স্যরি বলেন!

যেন প্রণমি আদেশ করছে। ইরফান চোখ সরু করে নেয় এতো টুকু মেয়ের আদেশ দেখে। কঠিন করে বলে,“হোয়্যাট!”

_আপুকে স্যরি বলেন!

_অসম্ভব! ঐ হাদীকে কে স্যরি বলবে? আমি কি করেছি?

_আপনি তাকে গালাগাল করেছেন,আর মারতে চেয়েছেন।

_আমি ওর ভাই। ভাইয়েরা এসব করতেই পারে।

_ভাই, তবে এসব ভালো ভাইয়ের বৈশিষ্ট্য নয়। আপনি কথায় কথায় এতো বড় বড় বোনদের চ'ড় মারেন,ধমকে ওঠেন। এটা কি ঠিক? আমিও তো কত ভুল করি, ভাইয়া তো আমাকে মারেনা!

শ্বাস ফেলল ইরফান, বুঝলো জ্ঞানী আপার বোনের সাথে কথায় পারবে না,আর পারতে চায়ও না ইরফান। বলে,“হু হু। আমি তোমার ভাইয়ের মতো ভালো না জানি! এটা বারবার তিন ভাইবোন মিলে আমার চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখাতে হবে না!”

প্রণমি ঠোঁট টিপে হাসছে, ইরফান নিচুগলায় শেহাকে উদ্দেশ্য করে বলে,“আচ্ছা স্যরি! কাল সকালে তোর স্যরিটাও বলে দিস। তবে আমার সাথে আলোচনায় তোকে বসতেই হবে মনে রাখিস!”

দূর থেকে ঘটনাটি দেখে রিতু হাসছে আলো আর ইলহামের সাথে। রিতু বলে,“বৌ পাগলা ছেলে পছন্দ না ভাবী ‌। তবে কখনো কখনো বৌ পাগলা হলে মন্দ না,কি বলো?”

গটগট করে হেটে ইরফান ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে থাকে,প্রণমিও ঢোকে, প্রণমি এবার খানিকটা বিচলিত হয়ে বলে,“আপনি কি মাইন্ড করলেন? আমি আপনাকে ছোটো করিনি কিন্তু,এমনিতে তো ভাই হিসেবে আপনি ভা..”

আচমকা হাতে টান অনুভব করে প্রণমি। নিজেকে হঠাৎ আবিষ্কার করলো বিছানায়। ঘাবড়ে গিয়ে ঢোক গিলল । ইরফান ওর নরম গাল আলতো করে টিপে বলল,“কি বললে?”

_আ-আপনি এমনিতে ভাই হিসেবে ভালো।

_কতটা ভালো?

_দ-দ-শে ছয়।

হাঁপাতে হাঁপাতে বলে প্রণমি। ইরফান বৌকে কিছুক্ষণ দেখে,গালের লাল তিলে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে পাশে শুয়ে পরে চুপচাপ। আচমকা তার খুব হাসি পেল, কিছুক্ষণ হেসে অস্ফুটে বললো,“শালা এই মেয়ে এখন আমাকে রেটিং দিচ্ছে!”

ইরফান চলে গিয়েছে দেখে শেহা ফাইল নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। ওড়নার কোণে চোখ মুছে বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে দৃঢ় হাতে ফাইলটা খুলল। যেখানে আছে উজ্জ্বল মাহমুদের বৃত্তান্ত। সাথে আছে একটা হাস্যোজ্জ্বল ছবি লোকটার। ডিজিটাল যুগে কে এভাবে এনালগ পদ্ধতিতে বায়ডাটা সাজিয়ে রাখে ভেবে শেহার হাসি পায়। তবে কিছুক্ষণ দেখে শেহা মুগ্ধ হলো,বিষয়টা দারুণ। খুব গুছিয়ে লেখা সবকিছু, উপভোগ করে পড়া যাবে। উজ্জ্বলের দাদুভাই খুব যত্ন করে সাজিয়েছে শেহা বুঝলো। ভদ্রলোক উজ্জ্বলের পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের একটা ছবি দিয়েছে সাথে। নিচে তারিখ লেখা ২০৪৪। তবে লোকটার এখনকার চেহারার সাথে ঐ সময়ের চেহারায় কোন পার্থক্য নেই। শেহা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো সবকিছু। মুখ থেকে বারবার অস্ফুটে বের হচ্ছে,“কি অদ্ভুত!”

_________

বাইরে চেঁচামেচি থেমেছে ইহান দেখেছে, দেখেছে তার ভাইয়ের বৌ কিভাবে এক চুটকিতে ছেলেটাকে শান্ত করে নিয়ে গেল। মেয়েটির ওপর ইহান যতটা খুশি হলো,তার চেয়ে বেশি খুশি হলো প্রেরণার ওপর। কি সুন্দর শিক্ষা দিয়ে বড় করেছে বোনকে ভদ্রমহিলা। প্রেরণার কথা মনে পরতেই ইহানের ঠোঁটে ছেয়ে যায় চওড়া হাসি। কিছুক্ষণ একা একা হেঁসে একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় দায়। সবাইকে সামলানোর সবাই আছে। তাকে সামলানোর কেউ নেই! কি দুঃখজনক ব্যাপার। ইহানের হাসি পাচ্ছে নিজের অবস্থা দেখে। পর পর মনে পরে ইরফানের বলা “আধবুড়ো” কথাটা।
ত্বরিৎ ইহান হেঁটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে আধবুড়ো? সত্যিই? ভার্সিটির মেয়েরা তার সাথে ফ্লার্ট করে কেন তবে?

নিজেকে আয়নায় দেখতে দেখতে ফোনটা তুলে হাতে নেয় সে। অবশ্য একটা বিষয় ঠিক, সে আধবুড়োই, আধবুড়ো হয়েছে বলেই তার চাহিদা শুধুমাত্র একটা সুন্দর গোছালো সংসার, একজন বুঝদার জীবনসঙ্গীকে পাশে নিয়ে। অন্য কোনো বাড়তি কিংবা রঙিন কিংবা ফ্যান্টাসির চাহিদা তার মধ্যে বেঁচে নেই। এক অতি ধৈর্য্যশীলা,বুঝদার রমণী চার দেয়ালের মাঝে তাকে শান্তিতে একটু জরিয়ে ধরবে,তাকেও শান্তি দেবে এইটাই শুধুমাত্র ইহানের চাহিদা। তাদের দাম্পত্য হবে অতিরঞ্জিত ন্যাকামি, যৌনতা এবং কামনার উর্ধ্বে গিয়ে। একটা সুন্দর শান্তি শান্তি সংসার।

ভাবতে ভাবতে ইহান শ্বাস ফেলে, তবে পছন্দের রমনী কসম কেটেছে অবুঝ সাজার।

প্রেরণার ঘুম ঘুম ভাব কেটে যায় মেসেজের টুং টাং শব্দে। রাত তখন সাড়ে এগারোটা । একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে,“প্রেরণা শুদ্ধর কি অবস্থা?”

_কে বলছেন জানতে পারি?

_এটা আমি ইহান।

_শুদ্ধর জ্বর নেই। এটা কার নাম্বার?

_আমার , নতুন নাম্বার। ইউ ক্যান সেইভ।

মৃদু শ্বাস ফেলে প্রেরণা। লোকটাকে কি কঠিন কথা শোনানো উচিৎ না? এখনো এতো অবুঝ পনা কেন করছে উনি? শুদ্ধর প্রতি এতো অযাচিত ভালোবাসা যে শুধুমাত্র শুদ্ধর জন্য নয়,এর পেছনে লুকিয়ে আছে লোকটার ক্ষীণ আশা,প্রেরণা তাকে একদিন না একদিন মানবে। এটা প্রেরণা বোঝে। কিন্তু এটা কখনোই হবে না এটা এই ভদ্রলোক বুঝতে কেন চান না? প্রেরণা বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে চেয়েছে বহুবার লোকটাকে কটু কথা শোনাতে, সে পারেনা। সে কেন পারেনা সে জানে না, হয়ত ভীষণ শ্রদ্ধা করে বলেই।

ইহান এদিকে একের পর এক মেসেজ করেই যাচ্ছে । প্রেরণা সেসবের উত্তর না দিয়ে হঠাৎ একটা কাজ করে বসে। হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হওয়া এক দস্যি আত্মা লোকটাকে খেপিয়ে দিতে চাইলো। সে হুট করে নাম্বার টা সেইভ করে ইহানের নিকনেইম দেয় “ইহান ভাইয়া।”

থেমে যায় দ্রুত গতিতে মেসেজ লিখতে থাকা ইহানের আঙ্গুল বিষয়টি চোখে পরায়। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে “ইহান ভাইয়া” লেখাটার দিকে। বড় বড় শ্বাস ফেলে।

হঠাৎ ওপাশ থেকে টাইপিং থেমে যাওয়ায় প্রেরণা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে,এক সপ্তদশী কিশোরীর মতো। সুদর্শন ঐ লোকটার থমথমে অন্ধকার মুখটা কল্পনা করে সে হেসেই যাচ্ছে।

ইহান অফলাইন হয়ে যায় হুট করে, হুট করে মাথায় রাগ ওঠে,হুট করেই ফোনটাকে আছাড় মেরে সিগারেটের আস্ত প্যাকেট নিয়ে বারান্দায় চলে যায়।

এদিকে প্রেরণা দীর্ঘসময় হেসে ফোনটা রেখে শুয়ে পরে, সারাদিনের অনুষ্ঠানের ধকলে সে ঘুমিয়ে যায় খুব দ্রুতই। ঘুমের মাঝে প্রেরণা আজ একটা দুঃস্বপ্ন দেখলো,সে দেখলো সে নতুন একটা লাল শাড়ি পরে চেঁচিয়ে ডাকছে,“শুনছেন আমার কুচিটা একটু ধরুন।”

লোকটা এসে ঝুঁকে বসলো,কুচি ধরে প্রেরণার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসলো। প্রেরণা দেখলো লোকটা শাওকাত ওয়াসীত শরীফ নয়,লোকটা ইহান তাজওয়ার মির্জা। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে প্রেরণার কোমর জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে। চুমু খাচ্ছে ওর কপালে,ওর ঘাড়ে। আর প্রেরণা লোকটাকে সরিয়েও দিচ্ছে না, বরং সে নিজেই উপভোগ করছে ঐ গোপন স্পর্শ,আস্কারা দিচ্ছে লোকটাকে।

আচমকা ঘুম ভেঙ্গে যায় প্রেরণার এমন একটি দুঃস্বপ্ন দেখে। এবং তারপর সারারাত সে কাঁদল, চেঁচিয়ে কাঁদল, নিশ্চুপ কাঁদল অমন বিশ্রী একটা দুঃস্বপ্ন দেখে।

চলমান.....

নোট: নিকনেইম চেঞ্জ করলে অপরপক্ষ দেখতে পাবে। বিষয়টা সম্পূর্ণ আমার কাল্পনিক। হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপ গুলোতে এমন ফিচার থাকবে। সেই প্রেক্ষিতে লেখা। হাস্যকর লাগলে এড়িয়ে যাবেন। 🖤

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 110 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন