#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১১
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
সকাল সকাল মুখোমুখি হয়েছে শেহা-ইরফান। ওদের মধ্যস্থতা করতে দাঁড়িয়ে আছে প্রণমি, যদিও তার অস্বস্তি হচ্ছে। একে তো সে ছোটো, তার ওপর ভাইবোনের এমন আদুরে ঝামেলায় সে কে থাকার? আপু তাকে এমন কিছু করতে বারণ করেছে। আপু শিখিয়েছে ইরফান মির্জার সাথে এ বাড়ির যে কারো সম্পর্কের মাঝে না ঢুকতে, খবরদারি না করতে, কখনো।
ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে প্রণমির সকাল থেকে,শরীরটা কেমন ভেঙেচুরে আসছে। প্রণমি উশখুশ করে আবারো চলে যেতে চাইলে শেহা হাত টেনে ধরে ওর,“বলেছি তো যেও না । থাকো তুমি। এমন কোনো আলোচনা করছি না যেটায় তুমি থাকতে পারবে না।”
প্রণমি দাঁড়িয়ে রয়। ওকে সাক্ষী রেখেই শেহা ইরফানের চোখে চোখ রেখে বলে,“গতকালকের বেয়াদবির জন্য স্যরি।”
ইরফান প্রসঙ্গটা পুরোপুরি পাল্টে ফেলে,নিরেট ঠাণ্ডা স্বরে বলে,“আগে বল কি ভাবছিস!”
_কোন ব্যাপারে?
_উজ্জ্বল মাহমুদ।
হালকা হেসে শ্বাস ফেলে শেহা,গলায় জোর এনে বলে,“আমার সায় আছে। ব্রেকফাস্ট টেবিলেই তো বড়দের জানিয়ে দিলাম তারা কথা আগাতে পারে। আমার আপত্তি নেই, লোকটার বায়োডাটা পড়েছি রাতভর। ইন্টারেস্টিং লেগেছে।”
_ইন্টারেস্টিং? শেহু বিয়েটা তো কৌতুহল মেটানোর বিষয় না যে ইন্টারেস্টিং লাগলো আর করে ফেললি!
_বিয়েটা তো জোর জবরদস্তি করারও বিষয় না। তবুও তো অমন বিয়ে করে শেষটায় এসে তোমরা ভালোবাসলে! এসব আপেক্ষিক রাগী মির্জা!
_পাকা পাকা কথা। তুই ভালো থাকবি?
_সেটা আমি এখন কি করে বলবো? তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো তো!
ইরফান শ্বাস ফেলে, এই মেয়ের জেদের কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। শেহা ওর সামনে একটুও নড়বড়ে হয়না। বরং দৃঢ়তা নিয়েই বলে,“দুশ্চিন্তা করো না। বিবাহ বিমুখ নই আমি। একটা সুন্দর সংসার করবো। আর পাত্রের বয়স নিয়ে, পাত্রের অবস্থান, পাত্রের যেকোনো কিছু নিয়ে আমার খুঁতখুঁতুনি নেই। সে একজন সুনাগরিক,দ্যাটস এনাফ। বাকি বিষয় গুলো মানিয়ে নেওয়ার, সমস্যার নয়।”
ওকে আর বোঝাতে পারে না ইরফান। বুঝলো এই মেয়ে অনেক বড় হয়েছে। চুপচাপ হেঁটে ঘরে ঢুকে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল যখন। প্রণমি এসে দরজায় দাঁড়ায়। মুখটা মলিন তার।
ইরফান হাতের শার্ট ফেলে এসে ওকে ধরে, ঘোর লাগা দৃষ্টিতে পুরো মুখবিবর অবলোকন করে বলে,“কি হয়েছে?”
_আপনি আজ অফিসে যাবেন?
_জিই। মেলা দিন যাইনি! এরপর তো হানিমুনে যাবো আমরা। তখন আরো ছুটি নিতে হবে।
প্রণমি চুপ করে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান শার্ট পরে গলার টাই বেঁধে নিতে নিতে একপলক প্রণমির বেজার মুখ দেখলো,বলল,“বাড়িতে বাকি সবাই আছে। তাদের সাথে সময় কাটাবে। ইশিকে বলে দিয়ে যাবো তোমাকে নভেল পড়ে শোনাবে।”
_থাক সবাইকে এতো তখলিফ দিয়ে কাজ নেই।
_কষ্ট কোথায়? নাথিং ইজ ফ্রি ইন দিস ওয়ার্ল্ড! আমার বোন তোমাকে নভেল পড়ে শোনাবে, বিনিময়ে তুমি ওকে গান শুনিয়ে দিও।
সামান্য হাসলো প্রণমি। ইরফান খুবই বিজ্ঞের ন্যায় বলল,“নিজেকে এতো ইউজলেস ভাবার কিছু নেই। আমিও তো ইউজলেস। সেটা ভেবে আহা উহু তো করিনা,আমিতো বিন্দাস থাকি......”
বলতে বলতে থেমে যায় ইরফান যখন তার দৃষ্টি পরে প্রণমির উরুর কাছটাতে। একটা সাদা সালোয়ার স্যুট পরেছিল প্রণমি। উরুর কাছটা ফোঁটায় ফোঁটায় রক্তে মেখে গিয়েছে।
অকস্মাৎ ভারি অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে ইরফান বড় বড় শ্বাস ফেলে। সেকেন্ডে নিজেকে দৃঢ় করে গিয়ে কাবার্ড থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট এবং প্রণমির পোশাক গুছিয়ে এনে প্রণমির ডান হাতটা টেনে ধরে হাতে ওসব কিছু তুলে দেয়। চমকে ওঠে প্রণমি,“এসব কি?”
_স্যানিটারি ন্যাপকিন আর পোশাক।
খুবই ক্ষীণ আওয়াজে বলল ইরফান।
অক্ষিপল্লব প্রশস্ত করে হাঁসফাঁস করে ওঠে প্রণমি সংকোচে। গলা কাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করে,“আজ তারিখ কত?”
_১৪ ।
সেজন্যই প্রণমির অস্বস্তি হচ্ছিল সকাল থেকে। এসব তো সবসময় আপু খেয়াল রাখতো তার,অনিয়মিত মাসিকের ভুক্তভোগী সে। গুটিয়ে যায় প্রণমি সংকোচ,আড়ষ্টতায়,লজ্জায়। সে কি অবস্থা করেছে? নোংরা হয়ে গিয়েছে পুরোটা? ঐ লোকটার সামনে? ঢোক গিলে নেয় এসব ভেবে।
কান্না পায় প্রণমির,খুব কান্না পায়। ইরফান গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলে,“টেইক আ বাথ! আমি অফিসে যাচ্ছি।”
প্রণমি আর আটকাতে পারেনা নিজেকে,চোখের কার্নিশ বেয়ে অবাধ্য তরল গড়িয়ে পরলো, দ্রুত পা চালিয়ে হাতরে হাতরে ঢুকে গেলো প্রণমি ওয়াশ রুমে। ঢুকতে গিয়ে দরজায় ধাক্কাও খেলো।
ইরফান চেয়ে চেয়ে দেখলো প্রণমির চোখে পানি,থম মেরে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটা কাঁদল কেন? ও কেন কাঁদল?
ঘঁষে ঘঁষে নিজেকে পরিষ্কার করে জলধারার নিচেই ডুকরে কেঁদে ওঠে প্রণমি। শাওয়ার অফ করে পোশাক পাল্টে কাঁদতে কাঁদতেই দরজায় ঠেস দিয়ে ভেজা মেঝেতে বসে পরে। এবং কাঁদতে থাকে নিজের প্রতি নিজের চূড়ান্ত হতাশায়।
ভেবেছে ইরফান চলে গিয়েছে, সুযোগ পেয়ে প্রণমি একটু জোরেই কাঁদল, কিন্তু ইরফান তো অফিসে যায়নি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে সে শুনছে প্রণমির কান্না।
হাতটা ঠেকিয়ে রেখেছে দরজায় ইরফান। সময় গড়াতেই বলে ওঠে নরম গলায়,“প্রণো!”
প্রণো থেমে গিয়ে মুখ চেপে ধরে নিজের। ইরফান বলতে থাকে,“আমি কিন্তু তোমার স্বামী প্রণো। এই তুমি বোঝো স্বামী মানে কি?”
জবাব নেই প্রণমির। ইরফান অস্থির হয়,একটু উঁচু গলায় বলে,“আমাদের এই সম্পর্কটা প্রণো, সেদিন রাতে যা হলো, শুধু সেসব নয় কিন্তু! আরো অনেক কিছু। অনেক কিছু! তোমার লজ্জা, তোমার অস্বস্তি, তোমার অপারগতা, তোমার খুঁত এবং তোমার এই হুট হাট অগোছালোপনাও আমার, সবটুকু আমার। শুধু ঐদিন রাতে যা হয়েছে সেসব নয় আমাদের সম্পর্কের মানে, তোমার সাথে যা যা হবে সবকিছু আমার নখদর্পণে থাকবে, আমি নাক গলাবো, তুমি লজ্জা পেতে পারবে না, হতাশ হতে পারবে না। স্বামী হিসেবে এই বেয়াদবি আমি কিন্তু মানবো না।”
চোখের পানি মোছে প্রণমি, কাঁপছে গলা, জবাব দেয়,“আপনি যতই মন ভুলানো কথা বলেন ইরফান মির্জা। আলটিমেটলি আমি তো একটা ইউজলেসই তাইনা? এতদিন যার নারীত্বের গোপনীয়তা, এই বিশ্রী ব্যাপার গুলোও সামলাতে হতো তার আপুকে,আমি প্রতিবন্ধী বলে,আর এখন....”
আবারো চাপা কান্নায় ভেঙে পরে প্রণমি।
_তুমি দরজা খোলো প্রণো...
দরজায় চাপড় মারে ইরফান। প্রণমি শ্বাস ফেলে জবাব দেয়,“আমি ঠিক আছি। আপনি যান।”
_দরজা ভাঙবো আমি?
লোকটার ধমকে ঘাবড়ে গিয়ে প্রণমি উঠে দরজা খুলে দেয়। ওর ভেজা দু'টো চোখ কয়েক সেকেন্ড দেখে ওকে টেনে বের করলো ইরফান। টেনে এনে বসালো বিছানায়।
প্রণমির রাগ বাড়ছে,জেদ বাড়ছে, মস্তিস্কের স্নায়ুকোষে যে ঝিঁঝিঁ পোকা গুলো এসে প্রণমিকে ঠেলে দেয় হতাশায়, ওগুলো ফিরে এসেছে। নিজের অপারগতা নিয়ে চূড়ান্ত হতাশ হলে রাগে প্রণমি নখ কামড়ায়, দাঁতে দাঁত ঘষে, হাত কামড়ায়। এটা তার শ্বশুর বাড়ি। আপু বলেছে ভাঙচুর না করতে এখানে খুব রাগ হলেও, আর তাছাড়া রাগটা যখন নিজের ওপর তখন জিনিসপত্র কেন ভাঙচুর করবে? নিজের হাত কামড়ানোই সই!
নিমিষে প্রণমি ডান হাতটা তুলে নেয় মুখের কাছে। ইরফান বসে বসে ওর কর্মকাণ্ড দেখছে,বুঝতে পেরে আচমকা ওর হাত টেনে নিয়ে নিজের হাতটা দেয়।
কামড়টা তীব্র জেদের ছিলো। দাগ বসেছে বিশ্রী রকমের ইরফানের শ্যামলা হাতে। প্রণমি ছিটকে সরতে গেলে ইরফান ওকে ধরে রাখলো, উৎসাহী গলায় জানতে চাইলো,“এতে রাগ কমে? হতাশা কমে? কমেছে রাগ?”
_আমি আপনাকে কামড়াতে চাইনি!
ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে ওঠে প্রণমি। ইরফান হাসে, প্রাণ খুলে কিছুক্ষণ হেসে নিয়ে ক্রন্দনরত বৌকে টেনে বুকে নেয়। কান্না থামায় না ওর,চোখের পানি মোছায় না। পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধু বলে,“যতটা কঠিন ছিলো তোমাকে পাওয়া,তোমাকে সামলানো আরো কঠিন হবে বুঝতে পারছি! অনেক ভোগাবে আমাকে মেয়ে!”
_________
চশমার নিচে ভাসা ভাসা গোল দুটি চোখে চেয়ে অনেক কিছু বোঝার চেষ্টা করছে উজ্জ্বল। কিন্তু ছোটোখাটো মেয়েটি দেখতে আপাতত দুর্বোধ্য। শেহা আন্তরিক হাসলো। ওকে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে উজ্জ্বল বললো,“প্লিজ সিট!”
শেহার হাতে উজ্জ্বলের বায়োডাটা। ওরা আছে একটি রেস্তোরাঁয়। শান্ত,সামিন আর নিজাম মাহমুদের যৌথ সিদ্ধান্তে পাত্র পাত্রীকে আনুষ্ঠানিক দেখাদেখির আগে নিজেরা কথা বলে নেওয়ার জন্য এই স্থানটি নির্বাচন করে দেয়া হয়েছে। একটা “ফরমাল মিটিং ”
শেহা স্বাভাবিক ভাবেই বসে আশেপাশে তাকায়,তার আচার আচরণে কোনো জড়তা নেই! উজ্জ্বল ওয়েটারকে কিছু আইটেম অর্ডার করে শেহার দিকে ঘুরতেই শেহা চোখ নামিয়ে নেয়, আসলে সে ইরফানের বলা “আধবুড়ো আধবুড়ো” কথাটার সাথে উজ্জ্বলকে মেলাচ্ছিলো চোরা চোখে। চোখাচোখি হলেও উজ্জ্বল তাকিয়ে থাকে। এটাই হয়তো পুরুষ হবার সুবিধা। শেহা মনে মনে হাসে। কিন্তু সে মেয়ে বলে কেন তাকাবে না? সেও তাকাবে, যদি বিয়েই হয় সে কেন খুব ভালো করে দেখে নেবে না লোকটাকে? পরে যদি দেখা যায় লোকটার একটা চোখ ছোটো? যদিও এসব খুঁত না,তবুও!
শেহা চোখ তুললো। ভারি কাঠিন্যতা ওই দৃষ্টিতে। উজ্জ্বল হাসলো,শেহাও হাসলো। এভাবে নিশ্চুপ হাসাহাসি করেই ওরা পাঁচ মিনিট খুইয়ে ফেলেছে এটা বুঝতেই ওরা আবার হাসলো। শেহা কিছু বলবে তার আগেই ভরাট স্বরে উজ্জ্বল বলে উঠলো,“আপনি সম্ভবত মনের ওপর জোর দিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন। তবে এটা বেমানান লাগছে। নার্ভাস লাগলে সময় নিন, আমার সাথে শেয়ার করুন। আমিও নার্ভাস!”
শেহা দম ফেললো ধরা খেয়ে, আসলেই সে নার্ভাসনেস লুকাতে অমন বোকা বোকা হেসে যাচ্ছে তখন থেকে। লোকটা কি করে বুঝলো?
গলা খাঁকারি দিলো শেহা,“আসলে। আসলে,আমার কথা জড়িয়ে যেতে পারে।”
_আমি বুঝতে পারলে অসুবিধা নেই।
শেহা হাসে, উজ্জ্বল ওর হাতের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,“এটা দাদু পাঠিয়েছে আপনাদের বাড়িতে?”
_এই ফাইলটা? জি!
_পড়েছেন?
_জি।
_পড়ে কি বুঝেছেন আমার সম্পর্কে?
_আপনার আটচল্লিশটা মেডেল আছে, আপনার পছন্দের যায়গা গুলোতে আপনার ছবিগুলো দেখেছি আর আপনি খুব ভালো বাচিকশিল্পীও জেনেছি।
উজ্জ্বল হাসে,“এগুলো আমি নই। আমার কিছু অর্জন শুধুমাত্র!”
শেহা বলে উঠলো,“আমার এমন কোনো বায়োডাটা তৈরি করা হয়নি। আমার পড়াশোনা করা ছাড়া তেমন কোনো গুণও নেই।”
_ওসবও আপনি নন। আপনি আলাদা কেউ।
এতো পেঁচানো কথা শেহা বুঝে ওঠে না,সরল গলায় বলে,“আমরা কারা?”
_সেটা এইসব বায়োডাটায় লেখা নেই,কেউ লিখতে পারে না সেসব।
মহা মুশকিল হলো শেহার, বড় মামা বলেছে লোকটা সরল আন্তরিক হলেও খুবই গুরুগম্ভীর কথা বলে,শেহা যেন বুঝে শুনে উত্তর দেয়। কিন্তু শেহা তো কথাই বুঝতে পারছে না! উত্তর দেবে কি!
উজ্জ্বল হঠাৎ করে হেসে ওঠে মেয়েটার দ্বিধায় ভরা মুখটা দেখে,শেহা চমকে ওঠে ঐ অমায়িক হাসিতে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে। কিছুক্ষণ হেসে উজ্জ্বল সরল গলায় বলে,“আমরা আমরাই। দু'জন এখন যেভাবে দু'জনের সামনে বসে আছি। এরাই আমরা। আমি উজ্জ্বল মাহমুদ, আপনি শ্রাবন্তী শেহা। আসুন পরিচিত হই।”
শেহা নির্নিমেষ দেখছে লোকটাকে, উজ্জ্বলের ঠোঁটের আনাচে কানাচে অমায়িক সেই হাসিটা। হঠাৎ শেহা টের পেলো, লোকটাকে তার ভালো লাগছে। ঐ যে থাকে না কিছু পুরুষ, কোনো প্যাচ থাকে না ভেতরে, পুরোটাই খোলাসা। তেমন লাগছে।
খাবার আসে, উজ্জ্বল খাবারটা শেহাকে সার্ভ করে দিলে শেহাও ভদ্রতাসুলভ উজ্জ্বলকে সার্ভ করে দিলো। খেতে খেতে কথা এগোলো উজ্জ্বল,“সামিন আঙ্কেল বলেছিলো সেদিন, আপনার একজন কনসালটেন্ট প্রয়োজন..!”
ঘামছে শেহা,আমতা আমতা করে বলল,“হ্যা,ঐ একাডেমিক কিছু বিষয় নিয়ে আপসেট থাকছি।”
খাওয়া থামিয়ে উজ্জ্বল মেয়েটিকে দেখলো, মেয়েটির বাচনভঙ্গি বলছে প্রসঙ্গ সে এড়াতে চায়। উজ্জ্বল বলে উঠলো,“আপনি যদি বিষয়টা পছন্দ না করে থাকেন, দুঃখিত!”
_না না প্লিজ,তেমনটা নয় আসলে।
উজ্জ্বল সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বলে,“আসল কথায় ফেরা যাক, তো আপনার মতামত টা আমি জানতে চাচ্ছি। বি ইজি! ”
হাঁসফাঁস করে উঠলো শেহা, খাবারটা গিলে নিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে দম ফেলে বলল,“আমার আপত্তি নেই কথা আগাতে, বাড়ির সবাইকে তো বলেছি।”
_সে ব্যাপারে নয়।
_কোন ব্যাপারে?
_ঐ যে আমরা কারা!
_সেটা জানার ব্যাপারে? সেটা তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
হাসে উজ্জ্বল, এবার বেশ ধীর স্থির ঠান্ডা গলায় বলে,“সেটাই। সেই সময়টা কি আংটিবদলের আগে নিতে চাচ্ছেন নাকি পরে?”
সুন্দর, সাবলীল জড়তাহীন প্রস্তাবটা পেয়েও শেহা চমকালো। লোকটা সুন্দর চোখ দুটো নিয়ে তাকিয়ে আছে সহজ ভঙ্গিতে। এসব তার জীবনে এই প্রথম। লোকটা কোনো রাখঢাক রাখছে না, পেচাচ্ছে না দেখে শেহা কেন জানি স্বস্তি পেল। এর সাথে হয়তো অনেকেটাই খোলাসা করতে পারবে নিজেকে শেহা। খাবারটা শেষ করে উশখুশ করছে দেখে উজ্জ্বল কৌতুহলী ভঙ্গিতে জানতে চাইলো,“কিছু বলতে চাইলে বলুন। আমি প্রফেশনাল হয়ে সাজেশন দেওয়ার চেষ্টা করবো।”
শেহা আইঢাঁই করছে, কি বলবে সে? তার কি বলার আছে? নিজের অনুভূতি শেহা নিয়ন্ত্রণ করবে,শেহার কথামতো চলবে তার অনুভূতি এখন থেকে, নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছে সে। উজ্জ্বল ওকে খুব ভালভাবে লক্ষ্য করে বলে,“যদি সমস্যা থেকে সমাধান পেতে চান তবেই বলুন। এটা আমার পড়াশোনা বলে। কিন্তু আমার নিজেরও কিছু হাইপোথেসিস আছে শেহা, কিছু কিছু কথা এমনও থাকে, যেগুলো লুকিয়ে রাখলেই স্বস্তি পাওয়া যায়, ওগুলো খুব একান্তের একান্ত। দুনিয়াকে দেখিয়ে ফেললে উল্টো মানসিক চাপ বাড়ে। আপনাকে আপনার সমস্যার ধরণ বুঝে পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে আপনি আমার সাথে কথা বললে আমি যে সাইকোলজিস্ট সেটা মাথায় রেখেই কথা বলবেন। আ'ম সো প্রফেশনাল!”
শেহা ঢোক গিলছে বারবার, লোকটার এই জটিল কথাটার মানে বুঝেছে সে। শেহা অবাক হচ্ছে লোকটার নিখুঁত পর্যবেক্ষণ দেখে, লোকটা কি চোখ পড়তে পারে?
উজ্জ্বল সরাসরি তাকায় শেহার চোখের দিকে এবার,“কি কিছু বলবেন?”
দু'পাশে ঘনঘন মাথা নেড়ে অস্ফুটে বলে শেহা,“নাহ। কিছু বলার নেই।”
___________
স্কুটি টা গ্যারেজে পরে আছে। ওটা আর রিপেয়ার করতে ইচ্ছুক নয় প্রেরণা। যে কয়বার নষ্ট হয়েছে,রিপেয়ার করেছে, এতদিনে সে টাকা দিয়ে আরেকটা নতুন স্কুটি নিতে পারতো সে।
আপাতত প্রেরণার হাত খালি। তিনটা কিস্তি টানতে হচ্ছে তার ওপর কদিন আগে প্রণমির বিয়েতে অনুষ্ঠান পাতালো। পাঁচটা বিয়েবাড়ির অর্ডার না পেলে তার ব্যবসা ঐ খরচ তুলে দাঁড়াতে পারবে না। কটাদিন হিসেব করে চলতে হবে তাকে,প্রিতমেরও নতুন চাকরি।
ইদানীং তাই ক্যাব নেয়না সে। বাস কিংবা অটোতেই চড়ে। “স্বাদে আহ্লাদে” থেকে মেইন রোডের দূরত্ব পায়ে হেঁটে তিন মিনিট। অটো স্ট্যান্ড সেখানে। সময় তখন এগারোটা বিশ, প্রেরণা স্টাফদের বাজারের লিস্ট টা বুঝিয়ে দিয়ে তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে নামতেই থমকে দাঁড়ায়। গেটের কাছে ইহান তাজওয়ারের সাঙ্গপাঙ্গরা।
এদেরকে প্রেরণা আগে সমীহ করলেও ইদানিং করছে না। সালাম দিয়েই ভাবী বলে ডেকে ফেলে। যখনি প্রেরণা বলে,“আমাকে ভাবী ডাকছেন কেন?”
সবকটা দাঁত কেলিয়ে বলে,“ভুল হয়ে গিয়েছে ভাবী।”
গা জ্বলে যায় প্রেরণার। ইহান তাজওয়ার মির্জার সাথে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলে এতোদিনে চ'ড় খেত এরা।
প্রেরণা মুখটাকে কঠিন করে এগিয়ে যায় সামনে। ভাবটা এমন যে,তার খুব মেজাজ খারাপ। কেউ যেন তাকে সালাম দিয়ে “ভাবী” ডেকে দাঁত না কেলায়,তার কপালে দুঃখ আছে তবে।
অন্তর বুঝলো না,অতি উৎসাহী হয়ে এগিয়ে এলো,“স্লামালাইকুম ভাবী।”
লম্বা শ্বাস ফেলে প্রেরণা,“ওয়ালাইকুমুস সালাম। আচ্ছা আমি কি জানতে পারি আমি আপনাদের কোন ভাইয়ের বৌ?”
ওরা মাথা নিচু করে মিটিমিটি হাসে। প্রেরণা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে ওঠে,“ফাজলামি করবেননা, ফাজলামির লিমিট ছাড়িয়ে গেলে কপালে দুঃখ আছে।”
নাহিদ মুখ কাচুমাচু করে জবাব দেয়,“জি ভাবী।”
প্রেরণা আরো একটা লম্বা শ্বাস ফেলে গেটের দিকে পা বাড়ায়। ইহান পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে আসছে। প্রেরণাকে দেখে সে চ'ম'কে যাওয়ার ভান করলো।
প্রেরণা ভীষণ বিব্রত, সেদিন রাতের দুঃস্বপ্নের কথা নিমিষেই মস্তিষ্কে হানা দেয়। তীব্র অপরাধবোধে মস্তক নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। ইহান তিন সেকেন্ড আগে অবধি চাপা রাগ নিয়ে ছিলো সেদিন রাতে প্রেরণার “ভাইয়া” সম্বোধনে। তবে এখন নেই। হেমন্তরের হিম সকালের মিঠা রোদের ঝিলিকে ঐ সমুদ্রনীলার মুখটার দিকে বেহায়ার মতো তাকিয়ে থাকে ইহান তাজওয়ার মির্জা,পা থামিয়ে। প্রেরণা মনে মনে শ্বাস ফেলে আওড়ায়,“আল্লাহ এই লোকের খপ্পরে পরতে চাইনা আজ। এই লোকের থেকে বাঁচিয়ে নাও।”
ইহান বলে উঠল,“কেমন আছেন? কোথাও যাচ্ছেন?”
_হ্যা ঐ,শুদ্ধকে স্কুল থেকে আনতে। মিস জেনি অসুস্থ।
_ওহহ,আচ্ছা চলুন আমি নামিয়ে দিচ্ছি। ওদিকেই যাচ্ছি।
এই ভয়টাই পাচ্ছিল প্রেরণা। মিনমিনে স্বরে বলল,“আমি অটো নিয়ে নেবো।”
_কেন আমার থেকে লিফট নিলে কি অসুবিধা?
অসুবিধা অনেক,প্রেরণা সেসব উচ্চারণ করলো না। শুধু বললো,“রোজ রোজ কত লিফট নেবো?”
_রোজ রোজ নিলে কি? আমাদের সম্পর্ক তো দেওয়া নেওয়ারই!
চমকে উঠল প্রেরণা, হতভম্ব গলায় বলল,“দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক মানে?”
ইহান স্বাভাবিক গলায় বলে,“আপনি আমাদের আপনার বোন দিয়েছেন আমরা নিয়েছি, আমরা আপনাকে আমাদের বোন দিয়েছি আপনি নিয়েছেন ভুলে গেলেন?”
_ওহ!
শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে হাঁফ ছাড়ে প্রেরণা।
_তো উঠুন?
প্রেরণা উঠবে না,গো ধরে রেখেছে। ইহান শান্ত স্বরে আওড়ায়,“অটো স্ট্যান্ড থেকে সব অটো ভাগিয়ে দেবো আই সয়্যার!”
আশেপাশে তাকিয়ে প্রেরণা দাঁতে দাঁত চেপে উঠলো,মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো আজ খোলাসা ভাবে আলাপ করবে,নয়তো লোকটা বাড়ছে খুব!
ফ্রন্ট মিররে আড়চোখে বারকয়েক দেখে প্রেরণাকে ইহান। প্রেরণা ওসব বোঝে। ভেতরে ভেতরে হাঁসফাঁস করে কিছুক্ষণ, অবশেষে মুখটা খোলেই,“ইহান!”
_বলুন।
_আমরা আত্মীয় রাইট?
_আত্মীয়ের ওপরে আত্মীয়।
_তো আপনি বোঝেন না আপনার এমন অবুঝপনা এবং বাড়াবাড়িতে হয়তোবা এই সম্পর্কে প্রভাব পরতে পারে। এটা কি উচিত? আপনি কেন করছেন এসব?
_কি করছি আমি?
_আপনি খুব ভালো করে জানেন আপনি কি করছেন।
হুট করে গাড়ি থামিয়ে দিয়ে ইহান গাড়ির জানালা লক করে দেয়। প্রেরণা ঢোক গিলে বলে,“কি করলেন এটা? কেন করলেন?”
_আপনার সাথে এখন ঝগড়া করবো আমি। আওয়াজ যাতে গাড়ির বাইরে না যায় সেজন্য লক করেছি!
শান্ত স্বরে ইহান বলতেই প্রেরণা রাগ উঠিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করলো,“ইউ আর ঠু মাচ!”
_আপনি বসুন। ভালোভাবে বলুন এখন।
প্রেরণা ভীষণ ক্ষেপেছে,চাপা রাগ দেখিয়ে বলছে,“আপনি অসম্ভব বাড়াবাড়ি করছেন জানেন? এমন একটা সম্পর্ক আমাদের, যেখানে দু'জন দু'জনকে কখনো এড়াতে পারবো না ভবিষ্যতে চাইলেও,সেখানে এইসব করে.... মানুষ তো একটু বোঝে! আপনি দিন দিন অবুঝ হচ্ছেন!”
_কি বুঝবো?
_আমি আপনার কুটুম। আপনার ভাইয়ের জেঠান এবং আপনার বোনের বড় ননদ,আপনি কি করে আমার সাথে এমন....
এবার ঘুরে তাকায় ইহান প্রেরণার দিকে, আচমকাই প্রেরণা থেমে গিয়ে ইহানের চোখ দেখলো। ঐ চোখে না রাগ,না অন্যকিছু। চোখ দু'টো ভীষণ শান্ত। গলার স্বরও শান্ত, আস্তেধীরে প্রেরণার চোখে চোখ রেখেই বলে,“আপনি আমার বোনের ননদ,ভাইয়ের জেঠান তো পরে। আপনি আগে আমার পছন্দের মানুষ। এবং আমি কোনো ইমম্যাচিওরড স্টুপিড নই ঠিক আছে? এটা ইনু প্রিতমের বিয়ে নয়,তারও আগের কাহিনী। কখন বলব? আমার না ঠিক মনেও নেই কখন। তবে সবসময়, বারবার প্রেমে পরতাম আপনার। শুধুমাত্র এটাই মনে আছে।”
চুপ করে রইলো প্রেরণা। ইহান বলতে থাকে,“এটা প্রণমি ইরফানের নয়,এটা ইনু প্রিতমের নয়। এটা আমার অনুভূতি। যেটা আগে এসেছে। ওদের সবকিছুর আগে। সবাই সবার অনুভূতি জয় করলে আমি কেন বাড়াবাড়ি করবো না? কেন কম্প্রোমাইজ করবো কিছু সিলি এক্সকিউজ দিয়ে আত্মীয়তার?”
_ইউ আর যাস্ট ঠু মাচ!
অস্ফুটে বলল প্রেরণা। ইহানের রাগ বাড়লো, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,“হ্যা আমি তাই! আপনার সমস্যা কোথায়? ভালোবাসি ভালোবাসি বলে আপনার পেছনে গড়াগড়ি তো খাচ্ছি না! ইনফ্যক্ট কিছুই করছি না। এরপরও সমস্যা কোথায়? এতো ভয় কোথায় আপনার? কেন?”
ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে ইহান চেঁচাচ্ছে। প্রেরণা চুপ করে দেখে লোকটাকে, কিছু পল বাদে বলে,“আমি কেন ভয় পাচ্ছি তা আপনার আজকের এই বেপরোয়া স্বভাবটাই বলে দিচ্ছে। শুধু একটা কথাই বলব, এসবে যদি এখনি লাগাম না টানেন তবে বিপদ। খুব বিশ্রী ঝামেলায় ফাঁসিয়ে দেবেন আমাকে,অতি দ্রুতই, আপনার ভাব ভঙ্গি বলে দিচ্ছে। অথচ আপনি কথা দিয়েছিলেন আপনার জন্য আমার মান হানি হবে না কখনো!”
চলমান.......
[ গল্প এখনো অনেকদিন চলবে। তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হচ্ছে না। ]