#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১২
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
প্রেরণা চুপ করে দেখে লোকটাকে, কিছু পল বাদে বলে,“আমি কেন ভয় পাচ্ছি তা আপনার আজকের এই বেপরোয়া স্বভাবটাই বলে দিচ্ছে। শুধু একটা কথাই বলব, এসবে যদি এখনি লাগাম না টানেন তবে বিপদ। খুব বিশ্রী ঝামেলায় ফাঁসিয়ে দেবেন আমাকে,অতি দ্রুতই, আপনার ভাব ভঙ্গি বলে দিচ্ছে। অথচ আপনি কথা দিয়েছিলেন আপনার জন্য আমার মান হানি হবে না কখনো!”
_______
ইহান প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়,ঘাড় ঘুরিয়ে চোয়াল শক্ত করে গাড়ি স্টার্ট করতেই প্রেরণা কন্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বলে ওঠে,“প্লিজ আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে যান। আমি অটো নিয়ে চলে যাবো।”
ইহান যেন শুনছেই না, মনোযোগী দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে সামনে, শক্ত দু'টো হাত রেখেছে স্টিয়ারিংয়ে। প্রেরণা চেঁচামেচি করে না,শুধু হাঁফ ছেড়ে বলে,“আপনি সুযোগ নিচ্ছেন আমার নীরবতার ইহান!”
সামান্য হাসে এবার ইহান, পরপর মুখটা গম্ভীর করে ভরাট স্বরে বলে,“তো চেঁচান। কে বারণ করেছে? দাঁড়ান আমি জানালা খুলে দিচ্ছি!”
ইহান সত্যি সত্যি জানালা খুলে দিলে প্রেরণা মুখ ঘুরিয়ে চুপচাপ বসে থাকে কপাল কুঁচকে। আবারো নীরবতা ঘিরে ফেলে দু'জনকে।
গাড়ি রেডিও কলোনির মোড় ঘুরতেই ইহান নীরবতা ভাঙে,গমগমে স্বরে সরল সুরে বলে,“আমি একজনকে পছন্দ করি। ভীষণ পছন্দ করি। স্পষ্ট করে বলতে গেলে “আ'ম ম্যাডলি ইন লাভ উইদ দ্যাট লেইডি”। একজন সুপুরুষ হিসেবে অবশ্যই আমি চাইবো তাকে পাওয়ার জন্য সব করতে। লাইক বাড়াবাড়ি, ছ্যাবলামি, আপনার ভাষায় অবুঝপনা। আমি এসব করবোই। এসবে যদি তার অসুবিধা হয় সে তার মতো পদক্ষেপ নিক। লাইভে গিয়ে আমার নামে কম্প্লেইন করুক, আমাকে জেলে ভরুক। ভরা বাজারে আমায় গনপিটুনি খাওয়াক। আমি তো আপত্তি করছি না!”
প্রেরণা সিটে গা এলিয়ে বসে ছিলো, হঠাৎ তেঁতে উঠল এমন ফাজলামি ধরণের কথায়,“খুব চালাক আপনি তাইনা? আপনি খুব ভালো করে জানেন আমি আপনার সাথে বেয়াদবি করতে পারব না,আমি অমন মেয়ে নই যে পছন্দের মানুষদের প্রতি খুব কড়া হব,এই সুযোগটাই আপনি নিচ্ছেন,কি মজা পাচ্ছেন জানিনা!”
_আমি আপনার পছন্দের মানুষ বুঝি?
মুখ হাসি হাসি করে ইহান জানতে চায় উৎসুক হয়ে। প্রেরণা হতাশ গলায় বলে,“আপনি দু'দিন আগেও এমন ছিলেন না ইহান!”
_আপনি “ভাইয়া” কেনো ডাকবেন আমায়?
কড়া গলায় ইহান জানতে চায়।
_তো সেটাই তো হন!
জোর দিয়ে বলে প্রেরণা।
_নৌ! অ্যাবসুলেটলি নট! আমার তিনটা বোন আছে হ্যা? এবং ফারদার এধরণের ফালতু ট্রিক আমার সাথে চালবেন না! আমাদের বংশের রক্ত অতটা ভালো নয় কিন্তু প্রেরণা, আমরা সব সহ্য করতে পারি, অপমান না! এসব লেইম ট্রিক চেলে উল্টো আমায় খোঁচাচ্ছেন আপনি।
ভীষণ ঠান্ডা ইহানের কন্ঠস্বর। সেদিন রাতের সেই রাগটা অবশেষে উগড়ে দিলো। প্রেরণা হতবিহ্বল হয়ে শুধু আগাগোড়া পরিবর্তিত মানুষটাকে দেখছে। বিপরীতে কিছু বলছে না,তবে মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েছে আর এই লোকটার মুখোমুখি হবেই না সে আজ গেলে। একটা অজানা আতঙ্ক তাকে ক্রমশ গ্রাস করছে। এই ক্ষেপে যাওয়া লোকটা সর্বনাশের জন্য ক্ষেপেছে। তার,প্রেরণার,দু'জনের। একে প্রশ্রয় দিলে চলবে না।
শুদ্ধ স্কুলের গেটের বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে পিয়ন কাকার হাত ধরে, গোমড়া মুখে। ইহান গিয়ে কোলে তুলে নেয় ছো মেরে ওকে। ইহানকে দেখে সেই মুখে সামান্য হাসি ফুটলো, সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে দেখে ইহান বলল,“কাকে খুজছো?”
_রিকা। ওকে দেখাতে চাই তোমাকে। ওকে তোমার কথা বলি। ও তোমার মাসল দেখতে চায়।
_আচ্ছা আমি আরেকদিন আসব,তখন দেখিও। তবে বাচ্চা? এতো হালকা হয়ে গেলে কেন তুমি? এমন হলে তো ক্যাপ্টেন বাংলাদেশ হতে পারবে না!
প্রেরণা দুর্বল ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়ে শুদ্ধকে নিতে চাইলো ইহানের কোল থেকে,“ধন্যবাদ লিফটের জন্য। আপনি এখন যান।”
ইহান দিলো না, প্রস্তাব দিলো,“আমি পৌঁছে দিই বাড়িতে?”
_না।
কিছুক্ষণ দু'জনে আলতো টানাটানি করলো শুদ্ধকে নিয়ে। শুদ্ধ মজা পাচ্ছে ব্যাপারটাতে, সে খিলখিলিয়ে হাসছে। পুরুষালি শক্তির কাছে প্রেরণা অপারগ,তার ওপর শুদ্ধটাও ইহানের ন্যাওটা ,শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরেছে ইহানের। প্রেরণা হাল ছেড়ে দিয়ে থমথমে মুখে আবারো গিয়ে বসলো ইহানের গাড়িতে। ইহান পাশের একটা শপ থেকে আইসক্রিম কিনে শুদ্ধকে নিয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট করতেই প্রেরণা ক্লান্ত গলায় ডেকে ওঠে,“ ইহান!”
_বলুন। শুনছি।
কাঁপছে প্রেরণার গলা, একপ্রকার হাঁসফাঁস করে উঠে বলে,“শুনুন।”
_বলুন না।
_আপনার শুদ্ধর প্রতি এই এতো অগাধ স্নেহের পেছনে যদি নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য থাকে তবে আমি অনুরোধ করব প্লিজ এটা করবেন না। আপনাকে বুঝতে হবে ও একটা বাচ্চা,যে কখনো বাবাকে পায়নি।
কথাগুলো বলতে বলতে ভেঙেচুরে আসে প্রেরণার শরীর। আবারো ইহান গাড়ির ব্রেক কষে। শুদ্ধর সামনে এসব কথা আলোচনা করতে স্বস্তি পাচ্ছেনা ইহান তাই শুদ্ধর হাতে নিজের ফোনটা দিয়ে দেয় গেইম খেলতে। তারপর প্রেরণাকে বলে,“গাড়ি থেকে নামুন।”
রাস্তার যায়গায় যায়গায় পানি জমেছে। প্রেরণা শাড়ি সামলে ইহানের পেছনে এসে দাঁড়ায়। একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে বুকে হাত বেঁধেছে ইহান, দৃষ্টি প্রেরণার উদাস চোখে। প্রেরণা দম ফেলে আবারো বলে,“ওর ছোটো অবচেতন মন সবসময় বাবাকে খোজে। এবং ওর আশেপাশে প্রিতম ছাড়া ঘনিষ্ঠ পুরুষ বলতে আপনিই আছেন কেবল,আপনিই ওর এতটা নিকটে যান। আমি আর কাউকে আসতে দিইনি ওর আশেপাশে। শুদ্ধর বাবার মৃত্যুর পরে ওর জন্ম। ওর যখন দেড় কি দুই বছর তখন থেকেই ওকে আমি সামলে সামলে রেখেছি। একবার একটা কেলেঙ্কারি হয়েছিল, আমার কাজিনের হাসবেন্ড ওকে খুব আদর দিতো, একপর্যায়ে ঐ অতটুকু ছেলেটা তাকেই বাবা ডাকতে শুরু করেছিল । তারপর থেকে যেকোন ধরণের পিতৃসুলভ স্নেহের সান্নিধ্যে ওকে আমি যেতে দিইনা। আমার ছেলেটা বড্ড ফাঁকা ইহান। ওর মস্তিস্কে প্লিজ ভুলভাল কিছু ঢোকাবেন না, ও কষ্ট পাবে পরে, আপনাকে বুঝতে হবে এটা।”
_তো আমি তো বুঝতেই চাই!
ধীর স্থির জবাব ইহানের। প্রেরণা চোখ তুলে তাকায়,ইহান বলতে থাকে,“শুদ্ধর বাবা নেই,এটাই তো আমি বুঝে নিতে চাই আজীবনের জন্য।”
থরথরিয়ে কাঁপছে প্রেরণা। ইহান দেখছে শক্তপোক্ত ভদ্রমহিলার ভঙ্গুর দশা। আচমকা প্রেরণার ফোনটা বেজে উঠলে সে রিসিভ করে কানে চেপে ধরে। ইহান নির্নিমেষ দেখতে থাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে প্রাপ্তবয়স্ক সুশ্রী মুখটাতে নারীসুলভ আভিজাত্য। ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলতেই প্রেরণা দুর্বল কন্ঠে জবাব দেয়,“কেটরিং সার্ভিসের অফিসে বিকেলে বসব সাব্বির। আমি বাড়িতে যাচ্ছি, দুপুরে খেয়েই আসবো। এখন ক্লান্ত,তুমি সামলে নাও এখন।”
কল কেটে দিতেই ইহান ঠান্ডা সুরে বলে,“শুদ্ধ ফাঁকা.....আপনি ফাঁকা নন?”
এই প্রশ্নটিতে চমকালেও প্রেরণা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। চুপচাপ গাড়ির দিকে যাওয়া ধরলে ইহান হাত বাড়িয়ে ওর পথ আগলে দেয়। প্রেরণা ক্লান্ত বিরক্ত হয়ে সরাসরি তাকায় ইহানের চোখে। লোকটার চোখে কেমন আকুলতা,সেই আকুলতা কন্ঠেও প্রকাশ পায়, লম্বায় প্রেরণা ওর বুক সমান, মস্তক নত করে বলতে থাকে,“এই যে এতো পরিশ্রম করেন প্রেরণা। আই সয়্যার এসব কিচ্ছু করতেই দেবো না আপনাকে,খুব আরামে রাখবো। আপনার ঐ পরিশ্রমী দুটি হাতের কাজ হবে শুধু আমাদের বাচ্চাদের বড় করা। আমাদের সহ্য করা!”
লোকটার লাগাম ছাড়া কথায় প্রেরণার মাথা দুলে উঠছে। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না সে। আর এক মিনিটও না দাঁড়িয়ে গাড়িতে গিয়ে বসে পার্স থেকে হেডফোন বের করে কানে লাগিয়ে সিটে হেলান দিয়ে বসে থাকে সে।
__________
বেলা সাড়ে তিনটা তখন, চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে প্রেরণা। ইরফান ঢুকেই হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট অন্তু ফিসফিসিয়ে বলে,“এটা স্বাভাবিক ঘটনা। ম্যাম অফিসে রোজ ঘুমায়।”
অন্তুর ডাকাডাকিতে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ খুলে চোখের সামনে ইরফানকে দেখতে পেয়েই লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,“এসো। কতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলে? বাড়িতে যাওনি এখনো? আজ শেহার পানচিনি না? আমিও যাবো , সন্ধ্যা হবে আমার।”
অফিস থেকে দ্রুত বেড়িয়েছে আজ ইরফান। চেয়ার টেনে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসতে বসতে বলল,“আপনাকে ক্লান্ত লাগছে আপু।”
_তোমাকেও।
বলেই প্রেরণা অ্যাসিসট্যান্টকে আইসক্রিম অর্ডার করে ইরফানের দিকে তাকিয়ে হাসে। টেবিলের ওপর একটা ফাইল। ইরফান কৌতুহলী হয়ে সেখানে তাকিয়ে আছে দেখতে পেয়েই প্রেরণা বলে ওঠে,“অন্ধ বৌকে সামলানো খুব ভারি পরে গিয়েছে সাতদিনে?”
ইরফান শান্ত স্বরে জবাব দেয়,“মনের মধ্যে কেমন বাসনা তৈরি হয়েছে ও আমাকে দেখুক।”
প্রেরণা ফাইলটা ঠেলে ইরফানের সামনে দিয়ে বলে,“এক্সিডেন্ট থেকে আজ অবধি সকল ট্রিটমেন্টের হিস্ট্রি এখানে আছে। দেশের নাম্বার ওয়ান আই স্পেশালিস্ট দেখেছে ওর ব্যাপারটা। সাধারণত এক্সিডেন্টে চোখ গেলে চোখ ফিরে পাওয়া যায়। তবে এটা সাধারণ কর্ণিয়া প্রতিস্থাপনের বিষয় নয়। ওর ড্যামেজ হয়েছে ভেতর থেকে। পাঁচজন স্পেশালিস্ট মিলে বসে আলোচনা করেছে। ইউএসএর ডক্টরদের সাথে কনসাল্ট করেছে। প্রণমির যখন দশ বছর বয়স তখন শুদ্ধর বাবা এটা নিয়ে ব্যাপক ছোটাছুটি করেছে। তারপর হঠাৎ শুদ্ধর বাবা মারা যান, এবং প্রিতম আর আমি পেরে উঠিনি। চোখ ভালো হবার সম্ভাবনা নেই বললেই ধরতে পারো। স্বামী হিসেবে মনে আফসোস থেকে যাবে তোমার,তাই ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইলে করতে পারো। তবে লাভ হবে না।”
কথাগুলো বলেছে প্রেরণা মুখস্থ বলে যাওয়ার মতো, নিরুদ্বেগ ভাব নিয়ে ইরফান শুধু শুনেছে। হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিয়ে দেখছে। প্রেরণা পরিবেশটাকে একটু হালকা করতে চেয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“এমনিতে খুব লক্ষ্মী মেয়ে। তুমি ভালোবাসায় মুরিয়ে রাখলে ও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে তোমার জন্য জান দিয়ে দিতে। এটাই দাম্পত্যের সৌন্দর্য। হোপ আমার বোনটার অক্ষমতা এসব নষ্ট করবে না।”
_আপনি আমার ওপর ভরসা পাচ্ছেন না আপু?
_পাচ্ছি। সেজন্যই একটা ছোট সাজেশন দিচ্ছি। এসবের পেছনে সময়,টাকা নষ্ট করো না তুমি, লাভ হবে না। দু'জনে সুন্দর একটি সংসার গঠন করো। ওর দুনিয়াটা তোমার ঐ বদ্ধ কামরাটাই থাকুক। দুনিয়াটা যদি স্বামী কেন্দ্রিক, স্বামী নির্ভরশীল হয় সেটা নারীর কোনো ব্যর্থতার কথা না। ওর কান্না দেখে তুমি হতাশ হয়ো না। তুমি তোমার মতো ওকে আগলে রাখো। এক জীবনে সব পেতে হবে এমন কোন কথা নেই। ও যা পায়নি সেসব নিয়ে না ভেবে,ওর যা যা আছে,যা পেয়েছে সেসব নিয়ে মাতিয়ে রাখো।
__________
আজ শেহাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে দেখতে আসবে উজ্জ্বল এবং তার দাদু নিজাম মাহমুদ। এই পরিবারটি খুবই ছোট,দুই সদস্যের। পাত্রী দেখাশোনা করার মতো ব্যক্তিগত পারিবারিক ব্যাপারে অহেতুক বাইরের স্বজন টানতে নারাজ নিজাম মাহমুদ। শেহা বিষয়টা শুনেই স্বস্তি পেয়েছে। বড়দের মুখের ওপর এমনিতে সে ততটা কথা বলতে পারে না, লোকটার সাথে যতটুকু ফ্রি হয়েছে হয়েছে,তবে যদি আজ সেকেলে মেয়েদের মতো শাড়ি পরে ঢ্যাংঢ্যাং করে পাত্রপক্ষের সামনে যেতে হতো তবে লজ্জায় মরে যেত শেহা। হতাশ হতো।
বাড়িতে শেহার পানচিনি উপলক্ষে উৎসব উৎসব সাজ। শেহার তিন মামী রান্নাঘরে উপুড় হয়ে ব্যস্ত। আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান মেন্যু পিঠা। শেহার দাদু বাড়ি বরিশাল, উজ্জ্বলদের আদি নিবাসও বরিশাল। আলো শুনেছে এসব অনুষ্ঠানে নাকি হরেক রকম পিঠা করা হয়।
অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে বাড়ির সবাই ইরফান ব্যতীত। পাত্রপক্ষ আসবে আসর বাদ, গল্প করবে ঘরোয়া পরিবেশে, আলোচনা হবে। মাগরিব বাদ ছেলে মেয়ে উভয় উভয়কে আংটি পরাবে যদি তাদের সায় থাকে।
শান্ত ছটফট করছে একমাত্র মেয়ের পানচিনি নিয়ে। কতক্ষন সামিনদের তিনভাইয়ের কাছে গিয়ে জানতে চাইছে আর কি কি বাজার করতে হবে, কতক্ষন রান্নাঘরে সম্বন্ধি বৌদের কাছে গিয়ে গল্প করছে। আলো শেষে তিতিবিরক্ত হয়ে তাকে ঠেলে বসার ঘরে বসিয়ে হাতে একগ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত ধরিয়ে দিয়ে বলে,“বসে বসে এটা খান শান্ত ভাইয়া। আমরা সবাই আছি।”
ভীষণ আবেগী হয়ে পরেছে সোহানুর ইসলাম শান্ত, আসলে সবটাই নিজের স্ত্রীর রেখে যাওয়া ধন শেহার কথা চিন্তা করে। মেয়ের প্রতি যদি কোনো অন্যায় করে বসে তবে?
আসরের ঠিক আগে আগে শেহাকে সাজাতে বসেছে ইনু। ইনু এসেছে সকালেই,সাথে এনেছে শুদ্ধকে। তার শ্বশুর বাড়ির সকলেই নিমন্ত্রিত। প্রেরণা আর প্রিতম আংটি বদলের ঠিক আগেই চলে আসবে সন্ধ্যায়।
ইনুর ঘরে জটলা মেয়েদের। শেহাকে মাঝখানে বসিয়ে চারপাশে জটলা পাকিয়ে বসে আছে ইনশিরাহ,ইনু আর প্রণমি। শেহা ভিডিও কলে কথা বলছে মুঈনের সাথে। মুঈন বান্দরবান ফিরে গিয়েছে সাতদিন। জিজের থেকে দোয়া নিতে কল করেছে শেহা। এদিকে ওকে নিয়ে চলছে গবেষণা। একটা নীল সালোয়ার স্যুট আর সামান্য অলংকার, প্রসাধনীতে খুব চমৎকার ভাবে সাজিয়ে ফেললো ইনু। কল কেটে শেহা প্রণমিকে দেখে,“ভাবী?”
_হু।
_তুমি সাজাবে না?
প্রণমি গুটিয়ে বসে ছিল এতক্ষণ। শেহার কথায় মিনমিনে স্বরে বলে,“আমি কিভাবে সাজাবো?”
বড় বড় দু'টো ঝুমকা ওর হাতে তুলে দিয়ে শেহা হাসে,বলে,“এটা পরিয়ে দাও তুমি।”
প্রণমি উচ্ছ্বসিত হয়ে এগিয়ে বসে। দুল জোড়া পরিয়ে দিতেই তার ডাক পরে বাইরে। তার শাশুড়ি ডাকছে। প্রণমি উঠে এগিয়ে এসে সাড়া দেয়,“জি মা?”
রিতু দরজায় দাঁড়িয়ে তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে বলে,“কথা হয়েছে তোমার আপুর সাথে? সে যেন মিস জেনিকে নিয়ে আসে!”
_মা বড়রা সবাই ফোনে বলল তো, আপু অবশ্যই আসবে। আমার বলার প্রয়োজন নেই।
রিতু মুখ বিকৃত করে বলে,“সবাই বললেই তোমার আপু শোনে নাকি? তার তো ব্যাপার স্যাপারই আলাদা।”
মুখটা মলিন হয় প্রণমির হঠাৎ। রিতু শাশুড়ি হিসেবে তার কাছে চমৎকার,একদম মায়ের মতো আদর করে। মেকি নয় সেসব, ভীষণ যত্ন করে। তবে আপুর প্রসঙ্গ উঠলেই কেমন কঠিন কঠিন কথা শোনায় প্রণমিকে, সেদিনের সেই অপমান এখনও ভোলেনি তার শাশুড়ি। প্রণমি বুঝলেও জবাব দিতে পারে না, কাউকে বলতেও পারে না এসব গোপন কথা। এমনকি ঐ লোকটাকেও না। সে একা একা মন খারাপ করে থাকে।
প্রণমি ঘুরে দাড়াতেই রিতু বলতে থাকে,“তুমি বসে আছো কেন?”
আবারো দাঁড়ায় প্রণমি। বলে,“কি করবো মা?”
শ্বশুর বাড়িতে এ পর্যন্ত প্রণমি কোনো কাজ করেনি, সেই যোগ্যতাই তো তার নেই। কাজ নিয়ে খোটা শুনলে সে ভীষণ কষ্ট পাবে। এসব তখন আপু ভাইয়ার সাথেও বলতে পারবে না সে, কারণ এই জীবন সে নিজে বেছেছে। সত্যি বলতে এই জীবনের প্রতি প্রণমি দায়বদ্ধ, সেই ভাবনা থেকে রোজ সকালে বরের জামাকাপড় বের করে দেয়া, বরের প্ল্যান্টস গুলোতে পানি দেয়া কিংবা বরের প্রশ্বস্ত বুকটাতে লুকিয়ে রোজ ঘুমানোর মতো “স্ত্রী দায়িত্ব” গুলো প্রণমি পালন করার চেষ্টা করে, তবে বাড়ির কাজের বেলায় কি করবে সে?
ওর বেজার মুখটা দেখে রিতু হাসলো, বলল,“নিচে এসো। খাবারের নুন চিনি টেস্ট করতে হবে। এসো এসো।”
প্রণমি সামান্য হেসে এগিয়ে আসে শাশুড়ির কাছে। রিতু হাতটা ধরে ওর ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে যায়, প্রণমির হাতের কব্জি ধরে বলে,“এতটুকু কেনো এই হাতটা? বেশি বেশি খাবে। বাড়ির বৌ একটু গোলগাল নাদুসনুদুস না হলে ভালো লাগে না দেখতে।”
ইহান পার্টি অফিস থেকে ফিরে হন্তদন্ত হয়ে দোতলায় উঠেছে মাত্র,ইনুর ঘর থেকে হাসাহাসির আওয়াজ আসছে দেখে সেদিকটায় এগিয়ে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে ইনুকে ডাকলো,“ইনু, প্রেরণারা এসেছে?”
এভাবে হুট করে প্রেরণার কথা আজ তিনবার জানতে চেয়েছে ইহান ইশি-ইনুর কাছে। ইশি-ইনু মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে নিজেরা নিজেরা। তারপর ইনু জবাব দিলো,“আসছে। পথে।”
ইহান আর কথা বাড়ায় না, সেদিন যে ঐ ভদ্রমহিলা হুমকি দিয়েছিল গাড়িতে, আর এই মুখো হবে না সে,এই কথাটি ভেবেই ইহান চিন্তিত ছিলো। এখন একটু স্বস্তি পেয়ে বাঁকা হাসলো ইহান, ইরফানের জ্ঞানী আপা ঠিকই বলেছে, সে ভীষণ বাজে ভাবে ফেঁসেছে এই আত্মীয়তায়। না ধরা দিতে পারছে, না এড়াতে পারছে ইহানকে।
সাজগোজ শেষে শেহা উঠে দাড়াতেই ওকে মন ভরে দেখতে থাকে ইনশিরাহ আর ইনু। অসম্ভব রূপবতী এই চাশমিশ মেয়েটিকে একটা ইন্দ্রানী থেকে কম কিছু লাগছে না। যত সময় গড়াচ্ছে তত তার নার্ভাসনেস বাড়ছে। আজ কি তবে সত্যি সে কারো বাগদত্তা হবে? তারপর হবে বৌ? এ যে এক অনেক ভারি কথা। শেহা এতো সাহস দেখালো? হাতের ফোনটা বেজে ওঠে হঠাৎ, স্ক্রিনে সদ্য সেইভ করা নাম্বারটা। মিস্টার মাহমুদ!
হাঁসফাঁস করে ওঠে শেহা, কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে বলে ওঠে,“শেহা?”
শেহা চমকায় এই ডাকে। পরপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,“জি!”
_আসলে দাদু তাড়া দিচ্ছে খুব। এখনি বের হতে চাইছে। বুঝিয়ে পেরে উঠছি না। আপনারা প্রস্তুত তো?
_হ্যা অলমোস্ট। আপনি আসুন দাদুকে নিয়ে। সবাই প্রায় রেডি।
_আর আপনি?
জবাব জানার খুব তাড়া ছিলো উজ্জ্বলের কন্ঠে। শেহা চুপ হয়ে থাকল কিছু পল। পরপর নিজেকে দৃঢ় করে জবাব দেয়,“জি। আপনারা আসুন।”
গায়ের পাঞ্জাবিটা পাল্টাতে হবে,সেই ভেবে ঘরে যেতে নিলে হঠাৎ তার পা থামলো। দ্রীপ্তর ঘরে কেউ গেমস খেলছে কম্পিউটারে। পা বাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই দেখলো ইহান তার সবথেকে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে। দু'হাত বাড়িয়ে ইহান লুফে নেয় হালকা শরীরটাকে। শুদ্ধ ফোকলা দাঁত বের করে হাসছে। ওর গাল টিপে দিয়ে ইহান বলে,“একা এসেছো কেন? মাম্মাকে নিয়ে কেনো এলে না?”
_মাম্মা তো অফিসে।
_মাম্মা সারাদিন অফিসেই থাকে নাকি?
_হু,মাম্মা বিজনেস ওম্যান যে।
হাসে ইহান,শুদ্ধর গালে টকাস করে একটা চুমু খেয়ে বলে,“ভুল বললে, তোমার মাম্মা ঔন্ডার ওম্যান।”
_________
ইরফান এসেছে উজ্জ্বল আর নিজাম মাহমুদ আসার কিছুক্ষণ পরেই। দু'জন মাত্র মেহমান। বসার ঘরে তাদের ঘিরে রেখেছে মির্জা বাড়ির এত এত লোক। ইরফান বাড়িতে ঢোকা মাত্রই সবার দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসলো। তাকে দেখাচ্ছে উদ্ভ্রান্তের নেয়। আলো ওর হাতের ফাইলটা দেখে বলল,“এটা কি তোর হাতে?”
ইরফান জবাব দিলো না, আশেপাশে তাকিয়ে প্রণমিকে দেখতে পেলো না, উজ্জ্বল এবং নিজাম মাহমুদের সাথে করমর্দন শেষ করে চুপচাপ দোতলায় উঠতেই দেখা হয় শেহার সাথে। নীল সালোয়ার স্যুটের ওড়না মাথায় টেনে বসে আছে দোলনায়। ইরফান বোনকে পা-মাথা দেখে সামান্য হেসে বলল,“খুব সুন্দর লাগছে তোকে। নিচে যে এলো,সেও নীল পরেছে। খুব মানাবে। মোটেও বুড়ো বুড়ো লাগছে না তাকে।”
শেহা জবাবের পরিবর্তে হাসি ফিরিয়ে দিলো, ইরফান ঢুকলো নিজের ঘরে, তাকে দ্রুত তৈরি হয়ে এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে। ঘরে ঢুকেই হাতের ফাইলটা ছুঁড়ে রাখে টেবিলে, শব্দ পেয়ে ত্বরিৎ মাথা তোলে প্রণমি, বলে ওঠে,“এটা আপনি?”
ইরফান জবাব না দিয়ে বিছানায় বসে দেখতে থাকে মেয়েটাকে। মেয়েটার চোখ দুটোকে। বলে ওঠে,“নিচে কেনো যাওনি? তোমার যাওয়া উচিত! তৈরি কেনো হওনি?”
প্রণমি মৃদু হেসে বলল,“আমি কি করবো গিয়ে? আমার যাওয়া না যাওয়া তো সমান কথা।”
হঠাৎ ভীষণ কঠিন হলো ইরফানের চোয়াল,দপ করে রাগ উঠে গেলো। এসে প্রণমির হাত টেনে ধরে বিছানা থেকে নামিয়েই শক্ত গলায় বলল,“না সমান কথা নয়। তোমার যাওয়া মানে অনেক কিছু। তুমি আমার স্ত্রী। তোমার মর্যাদা আমার জীবনে ঠিক যেমন,তেমন আমার বাড়ির ড্রয়িং রুমে মেহমানদের সামনেও। তোমার প্রয়োজনীয়তা আমার জীবনে যেমন তেমনি আমার বাড়ির পারিবারিক অনুষ্ঠানেও। গট ইট ?”
প্রণমির হাতে লাগছে খুব, লোকটার আকস্মিক আক্রমণে ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নেড়ে ঢোক গিলে বলে,“আই গট ইট!”
ফ্যাকাশে মুখটা দেখে আবার নিমিষেই রাগ পরে যায় ইরফানের। এবার বেশ আলতো হাতে সামলায় প্রণমিকে। ওকে খানিক সময় দেখে আচমকা প্রণমির গলা থেকে ঘরে পরার সুতি ওড়নাটা কেড়ে নেয় ইরফান। প্রণমি চমকে উঠে বলে,“করছেন কি।”
জবাব না দিয়ে ইরফান কাবার্ড থেকে প্রণমির ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করা একটা দোপাট্টা এনে ওর গা জড়িয়ে ঘোমটা টেনে দেয়। প্রণমি বুঝতে পারছে না লোকটাকে। হঠাৎ টের পেলো লোকটা তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক জাতীয় কিছু ঘষছে। কানে দুল পরিয়ে দিচ্ছে। প্রণমি চুপচাপ সহ্য করছে এমন আদুরে অত্যাচার। কিছুপল ওকে দেখে ইরফান চ কারন্ত শব্দ করে তেতো স্বরে বলে ওঠে,“ধূর এটা মানায়নি। এই শেডটা। হালকা কিছু দরকার। লিপগ্লস লাগিয়ে দেবো।”
বলেই ইরফান আশেপাশে টিস্যু পেপার খুঁজছে লিপস্টিক মুছতে। প্রণমি নিচু গলায় এবার বলে ওঠে,“টিস্যুটা আমাকে দিন। আমি মুছে নিচ্ছি।”
_কেন?
_আপনি যেভাবে ঘষামাজা করেন মনে হয় আমি ফার্নিচার আর টিস্যু পেপার সিরিজ কাগজ। আমার বড্ড লাগে।
কথাটা মিনমিনে স্বরে বলে প্রণমি,অনেকটা সংকোচ নিচে। ইরফান ওকে ঠাণ্ডা চোখে কিছুক্ষণ দেখে হ্যাচকা টানে বুকে নিলো মেয়েটাকে। প্রণমি কিছু বলবে তার আগেই ওকে চুপ করিয়ে দিয়ে ইরফান বলে,“আচ্ছা এবার অন্যভাবে তুলে দিচ্ছি। তুমি টেরই পাবে না!”
চলমান.....
[ আগামীকাল ইহান-রিতু-প্রেরণা স্পেশাল পর্ব দেবো একটা। 🫣 ]