#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৩ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
[ ১ম অংশ ]
রিতু দোতলায় উঠে দেখলো দ্রীপ্তর ঘরে ইহান আর শুদ্ধকে। শুদ্ধ কিছু বলছে আর ইহান খুব মনোযোগ দিয়ে সেসব শুনে হোহো করে হাসছে। হাসিটা প্রাণোচ্ছল।
রিতু নির্নিমেষ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখ এড়ায় না বিষয়টি, ইহান এই ছেলেটির সাথে খুব মেশে। জিনিসটা রিতুর কাছে স্বাভাবিক আবার স্বাভাবিক নয়।
কিছুপল রিতু ওদের এই দৃশ্য দেখে ইহানকে বলে ওঠে,“বিয়ে করে নিলে এতদিনে এমন একটা শুদ্ধ তোর থাকতো।”
ইহান চমকে উঠে মায়ের দিকে তাকায়। পর পর ঠোঁট ছড়ানো হাসি দিয়ে বিড়বিড় করে,“বিয়ে করে নিলে এই শুদ্ধ আমারই তো থাকবে!”
_কিছু বললি?
_না তো।
_আচ্ছা নিচে আয়। সবাই নিচে,তুই এখানে ঢুকে বসে আছিস কেন? ওকে খেলতে দে।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে,আজকের বৃষ্টিটা কেমন যেন। পাঁচ মিনিট বৃষ্টি হচ্ছে, আধাঘণ্টা বিরতি নিচ্ছে। প্রিতম আর প্রেরণা হালকা ভিজে পৌঁছেছে শান্তি নীড়ে। প্রিতমের হাতে কিছু মিষ্টির প্যাকেট। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে মিষ্টি এনেছে,এনেই সরাসরি শ্বাশুড়ির হাতে দিয়েছে।
অন্দরে ঢুকতেই রিতুর মুখোমুখি হলো প্রেরণা। প্রেরণা নিচু গলায় সালাম দিয়ে চুপচাপ এগিয়ে গেলো। রিতুর মুখটা থমথমে। ইদানীং এই মেয়েটিকে দেখলে তার কেমন যেন অস্বস্তি হয়। কথা দিয়ে খুব কুপোকাত করে মানুষকে। ঐ তো দু' দিন আগের একটা ঘটনা। প্রেরণা আর ইনু শান্তিনীড়ে এসেছিলো প্রণমিকে দেখতে । রিতু ইনুর হাতে একটা দাগ দেখতে পেয়ে বলে ওঠে,“এটা কিসের দাগ ইনু?”
_তেল পরেছিল। গরম তেল।
_কেন ? তোর ননদ খুব কাজ করায় নাকি? এতো বেশি কাজ করতে হবে না। অল্প অল্প করিস।
রিতু সেদিন এই কথাটা বলেছিল মন খোলা ভাবে, সে তো আর পাশের বাড়ির কুচুটে কাকিমা নয়। মজা করেই বলেছিল । কিন্তু ঐ অহংকারী প্রেরণা মাইন্ড করে বসে সাথে সাথে ঠোঁট নেড়ে জবাব দিয়েছে,“ঘরের কাজ করাটা তো দোষের কিছু না আন্টি। আপনিও করেন, আমিও করি। ইনু কাজ করবে,ওর হাত পুড়বে, স্বাভাবিক। শুধু দেখবেন ওর বর ওকে ঠিক সময়ে ব্যান্ডেজ করে দেয় কি না।”
কথাগুলো প্রেরণাও হাসতে হাসতে বলেছিল। এই মেয়েটির কন্ঠ ঠান্ডা হলেও কথায় খুব ধার। রিতু ভীষণ অপমানিত হয়েছে সেদিন মনে মনে। তারপর প্রেরণা তাকে জ্ঞান দিয়েও গিয়েছিল,“প্রণমিকেও টুকটাক ওর যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ শেখাবেন আন্টি। আমি ওভাবে পারিনি শেখাতে।”
রিতু দীর্ঘশ্বাস ফেলে,প্রথমে কত পছন্দ করতো প্রেরণা মেয়েটাকে, ধীরে ধীরে বিরক্তি এসে যাচ্ছে এর কাঠিন্যতায়। একটা কথা বলে পারা যায়না,কথার পিঠে কথা রেডি রাখে এই মেয়ে। তবে নিজের মেজো ছেলের বৌ প্রণমি ভীষণ মনের মতো রিতুর। প্রথমে তো সে ভেবেছিল কেমন না কেমন হয়। তবে এখন বুঝছে তার ছেলের পছন্দ একেবারে ফার্স্ট ক্লাস। কি শান্ত আর সভ্য মেয়ে। ভীষণ মিষ্টি। রিতু টের পেয়েছে ইরফানকে এই মেয়ে মেনেছে স্বামী রূপে, এখন একটা বাচ্চা হয়ে গেলেই তার মেজো ছেলের জীবন ভরপুর। বাচ্চা আর কি চাই? ঐ প্রেরণার মতো প্রণমি হলে,অমন বৌ নিয়ে রিতু সংসার করতো কিভাবে কে জানে! রোজ ঝগড়া লাগতো। ঠান্ডা ঝগড়া! ভাগ্যিস প্রণমি প্রেরণার মতো খুঁতখুঁতে, অহংকারী আর নাক উঁচু নয়।
উজ্জ্বল আর নিজাম মাহমুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ইনু স্বামী আর ননদকে নিয়ে দোতলায় উঠলো,ব্যস্ত গলায় বলল,“প্রিতমের জামাকাপড় তো এখানে আছে,তোমাকে কি পরতে দিই বলো তো আপু! ইশি আপুর শাড়ি দেবো?”
_দাও,সুতি দেখে দিও।
_আচ্ছা,আর শোনো তুমি ইশি আপুর ঘরে চেঞ্জ করবে। তোমার স্বর্ণের দুল আর চুড়ি ক'গাছা এনেছি। ও ঘরের বিছানায় রাখা। পরে নিও। এটা একটা অনুষ্ঠানের মতো তো। একটু সাজো,কেমন?
প্রেরণা হেসে ভাইয়ের বৌয়ের গাল টেনে দিল, ইদানিং খুব গোছালো আর সংসারী হয়েছে ইনু, সব ব্যাপারে খেয়াল থাকে।
ঘরে ঢুকে প্রিতমকে ওর শুকনো জামাকাপড় বের করে দিয়ে ইনু তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে বেড়িয়ে যেতে চাইলে প্রিতম ওকে ডাকলো,“ইনু!”
_হু?
ঘুরে দাঁড়ায় ইনু। প্রিতম ওর ওয়ালেট বের করে ইনুর হাতে দিয়ে বলল,“আজ স্যালারি পেয়েছি। এখানে আলাদা দশ হাজার টাকা আছে, ওটা নিয়ে তোমার পার্সে রেখে ওয়ালেট টা তুলে রাখো তো।”
চশমার কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে প্রিতম গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল। ইনু অবাক হয়ে টাকা গুলো বের করে বলল,“আমাকে দিচ্ছো? কিন্তু আমাকে তো হাতখরচা দিলেই এক তারিখ!”
শার্ট টা পাল্টে নিয়ে একটা সুন্দর পাঞ্জাবি গায়ে চাপায় প্রিতম। চাকরি পাওয়ার পর থেকে প্রিতম কেমন বদলে গিয়েছে, আগে যেমন ছিলো মোটেও তেমন নেই। যদিও আগে থেকেই বুঝদার ছিল প্রিতম, কিন্তু এখন আচরণ গুরুগম্ভীর। দাদানদের মতো ভারিক্কি আচরণ। অবশ্য অফিসের যে পোস্ট তাকে সামলাতে হয় এটা স্বাভাবিক। প্রিতম পাঞ্জাবির বোতাম লাগিয়ে একপলক ইনুকে দেখে বলল,“এটা আপনার বেইসিক হাতখরচা না, বেহুদা খরচের জন্য দেয়া হলো।”
ইনু অবাক বিস্ময়ে হাতের টাকাগুলো দেখছে। এটা সত্যি ইনু বড় বাড়ির মেয়ে,অনেক খরুচে ছিলো। বিয়ের পর তো বাড়তি শপিং পুরোপুরি বাদ দিয়েছে। এটা নিয়ে ইনু কখনো আফসোস করেনি। বাড়তি খরচের টাকা পাপা মাম্মা দিতে চাইলেও সে নেয়নি।
টাকাগুলো মুঠির মধ্যে খামচে ধরে ইনু চোখ তুললো,বরের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল,“তুমি আমার অভ্যাস খারাপ করে দিও না, বহুকষ্টে মিতব্যয়ীতা শিখেছি।”
হাসলো প্রিতম,ইনুর হাত ধরে ওকে বুকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলে,“আমিও তো নতুন নতুন বৌয়ের শখ আহ্লাদ পূরন করতে শিখছি।”
প্রণমির হাতটা শক্ত করে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে ইরফান। আড়ষ্টতায় গুটিয়ে যাচ্ছে প্রণমি, এতবার করে হাতটা ছাড়তে বলছে ঐ লোকটাকে ছাড়ছেই না। সিঁড়িতে শব্দ পেয়ে ড্রয়িং রুমের সবাই দৃষ্টি দিয়ে ওদের দেখালো। তাকালো ওদের হাতের দিকেও, পর পর চোখ নামিয়ে নেয় সবাই। প্রণমি এবার ফিসফিসিয়ে অনুরোধ করে,“নামছি তো! আপনি হাতটা ছাড়েন। রুমের মধ্যে বসে ধরবেন। বড়রা আছে ওখানে!”
ইরফান তেরছা নজরে ওকে দেখে বলল,“বড়দের সাথে বৌয়ের হাত ধরার কি সম্পর্ক?”
_দেখেন আপনার লজ্জা না থাকতে পারে আমার আছে!
_আশ্চর্য হাত ধরার সাথে লজ্জার কি সম্পর্ক? বোকা বোকা কথা!
অতি আদরের সহিত হাতটা ধরে নামলো দু'জন। প্রণমি গুটিয়ে আছে,কে না কে আছে এখানে আল্লাহ জানে। ইরফান এসেই শুরুতে উজ্জ্বল আর নিজামের সাথে প্রণমির পরিচয় দিলো,“ও আমার বৌ, প্রণমি আহসান।”
উজ্জ্বল হেসে ফেলল, জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে ইরফান প্রণমিকে দেখে বলল,“ওও তাই নাকি! আমরা তো জানতামই না। ও তোমার বৌ প্রণমি আহসান। এবং প্রণমি, ও তোমার স্বামী ইরফান মির্জা। রাইট?”
দারুণ লজ্জা পেয়ে প্রণমি হাসলো। ইরফান তবুও হাতটা ছাড়লো না ওর। খুব সুন্দর করে প্রণমিকে বসিয়ে উজ্জ্বল আর নিজাম মাহমুদের পরিচয়টাও দিলো। প্রণমির জড়তা ততক্ষণে কেটে গিয়েছে। হেসে হেসেই নিজামের কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। ততক্ষণে প্রণমি ধীরে ধীরে টের পেয়েছে, আসলেই তার এখানে প্রয়োজন ছিলো। সে তো এই বাড়ির বৌ, সে কেন সহজ থাকবে না?
ঘরোয়া আলোচনা চলছে, আপাতত শরবত হাতে নিয়ে কথাবার্তা বলছে সবাই। ইহানকে কোথাও দেখতে না পেয়ে সামিন হাক ছাড়লো দোতলায়। ইনশিরাহকেও পাঠানো হয়েছে শেহাকে নিয়ে আসার জন্য।
ইনশিরাহর পিছু পিছু ধীর পায়ে নামছে শেহা। মাথায় তুলেছে ওড়নার অর্ধেকটা। সহজ স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি তার, ইনশিরাহ একবার পিছু ফিরে ওর পা মাথা দেখে বলল,“ঘাবড়াচ্ছিস নাকি?”
দু'পাশে মাথা নাড়ে শেহা। মুখে বলে,“আমার আরো মজা লাগছে।”
_মজা কেন?
_ড্রয়িংরুম ভর্তি শুধু আমাদের বাড়ির লোক। ওনারা দু'জন। তাই।
হাঁফ ছাড়ল ইনশিরাহ, পরিবার আসলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু। মুঈনকে খুব কাছ থেকে দেখেছে বিধায় ইনশিরাহ ওর কষ্টটা উপলব্ধি করে। শেহার কপালেও এতিম জুটবে। অবশ্য এটার একটা পজিটিভ দিক সবসময় ভাবে ইনশিরাহ। তাদের সব ভাইবোনের পার্টনাররা একটা চমৎকার পরিবার পাবে,যাতে করে তাদের মা-বাবা না থাকার দুঃখ কিছুটা হলেও কমবে। সামিন ইয়াসার মির্জা সবসময় একটা কথা শিখিয়েছে এ বাড়ির বাচ্চাদের,“তোমাদের যা আছে, সবসময় একটু করে অন্যদের দেবে, যাদের সেই জিনিসটা নেই।”
ইনশিরাহরা পাঁচ ভাইবোন ভুল ত্রুটির সমন্বয়ে তৈরি কিছু সাধারণ যোগ্যতার মানুষ,ওদের কিছুই নেই,আছে একটা অমায়িক পরিবার। তাই সেটাই হয়তো অন্যদের মাঝে ভাগ করে দিতে হচ্ছে।
শেহা নামতেই ইরফান উঠে এগিয়ে এসে শেহাকে নিয়ে উজ্জ্বলের মুখোমুখি সোফাতে বসায়। ভাই হিসেবে হাবভাব সহজ, স্বাভাবিক তার। শেহা একপলক ওকে দেখে অস্ফুটে জানতে চেয়েছে,“রেগে আছো?”
প্রাণোচ্ছল একটা হাসি দিয়ে ইরফান দু পাশে মাথা নেড়ে বলে,“আমার বোনদের মধ্যে তুই সবচেয়ে সুন্দর বর পেতে চলেছিস শেহু। অভিনন্দন।”
শেহা হাসলো, দুষ্টুমি করে বললো,“এসব কথা আপু আর ইনুর সামনে বলো না!”
শেহা বসতেই উজ্জ্বল চোখ তুললো। লোকটা যেন চোখ দিয়েই হাসলো,চোখ দিয়েই জানতে চাইলো শেহার অবস্থা। ভদ্রভাবে হেসে মাথা নিচু করে নেয় শেহা।
ঘরে চার্জ থেকে ফোনটা নিতে ঢুকেছিল ইহান। নিচতলা থেকে সামিন ডেকেছে তা শুনেছে সে। তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরুতেই পা থামলো তার। ঘুরে তাকালো ইনুর ঘরের দিকে। ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে কেউ নেই, তবে ইশির ঘরের দরজা ভেজানো। ইহান ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজায় নক করলো,“ইশি।”
শাড়ির আঁচল টেনে সবেমাত্র চুলে হাত দিয়েছে প্রেরণা খোঁপা বাঁধবে বলে। ইহানের ডাক শুনেই মুখটা থমথমে হলো তার,সংকোচে গুটিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো, জবাব দিলো না।
ইহান আবারও ডেকে উঠল,“ইশি প্রেরণা এসেছে নিচে?”
চমকে উঠে একটা বড় শ্বাস ফেলল প্রেরণা, নিমিষেই দাঁতে দাঁত চাপলো। এটা কেমন কথা? প্রেরণাকে দিয়ে এই লোকের কি? আর কতটা অবুঝ হবে এই এতবড় লোকটা? ইশির কাছে প্রেরণার কথা জানতে চায় কোন আক্কেলে? প্রেরণা তার কে?
দৃঢ় পায়ে হেঁটে প্রেরণা এসে আচমকা দরজা খুলে দিতেই ইহান চমকে উঠলো। প্রেরণা কঠিন মুখে উকি মেরে বাইরেটা ভালো করে দেখে নিয়ে কড়া গলায় বলল,“কেন? প্রেরণাকে দিয়ে আপনার কি?”
ইহান কিছু বলছে না,প্রেরণা বলে,“জানতে চাইবেন প্রিতম এসেছে কি না। প্রেরণাকে দিয়ে কি আপনার?”
এক মিনিটের জন্য ভড়কে গিয়েছে ইহান। পর পর নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে জবাব দিলো,“আসলে, আসলে...”
_আসলে আসলে কি?
_শুদ্ধ বারবার আপনার কথা বলছে তাই।
_শুদ্ধ বলেছে?
_জি।
মৃদু শ্বাস ফেলে প্রেরণা বলে,“শুদ্ধ আর কি কি বলেছে?”
ইহান সামনে দাঁড়ানো ছোটো খাটো দেখতে কঠিন মহিলার পা-মাথা দেখে নিলো, দেখে নিলো ঐ চোখ, ঐ নীল চোখ, কানে সুন্দর দুটি স্বর্ণের দুল, শরীরে একটা গোলাপী রঙের সুতি শাড়ি, গলায় একটা স্বর্ণের চিকন চেইন। হাতে ক'গাছা চিকন চুরি।
প্রেরণা হাঁসফাঁস করছে অমন দৃষ্টি দেখে। ইহান ওর অস্বস্তি আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েই গমগমে স্বরে বলল,“শুদ্ধ বলেছে...”
_শুদ্ধ কি বলেছে?
_শুদ্ধ বলেছ...
_বলুন কি বলেছে?
_শুদ্ধ বলেছে আপনাকে সুন্দর লাগছে, খুব সুন্দর লাগছে।
দাঁড়াল না ইহান, দ্রুত পায়ে হেঁটে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে সিঁড়ির দিকে গেলো। তার ঠোঁটে লেপ্টে আছে দুষ্টুমির হাসি। প্রেরণা দাঁতে দাঁত চেপে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ইহানের পিছু পিছু নামলো।
রিতু থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়। এই মাত্র এক ঝলকে যা দেখলো সে,যা শুনলো সে, হঠাৎ করেই এই অল্প সময়ের ঘটনাটা তার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকলো। সে এসেছিল ঘরে ফোনটা রাখতে। এইমাত্র ঘর থেকেই কথোপকথন শুনলো ইহান প্রেরণার। কোন নড়চড় করে না রিতু। এটা তার বড় ছেলে ইহান? ঐ গম্ভীর ইহান এমন হালকা কথা বলছে তাও একটা বিবাহিতা মহিলার সাথে? বিশ্বাস হচ্ছে না রিতুর, তার কান ভুল শোনেনি তো?
অল্প কিছু স্ন্যাকসের পরে নিজাম মাহমুদ কথা এগোলেন, শেহা মাথা নিচু করে বসে আছে, আর উজ্জ্বলও।
“এই ব্যাপারে আমরা বড়রা এতো কথা বলেছি যে, আমাদের আর কিছু বলার নেই। বিষয়টা এখন তোমাদের দাদুভাইয়েরা। আমরা তোমাদের দু'জনকে একে অপরের জন্য ভীষণ পছন্দ করেছি। এখন আংটি বদলের আগে যদি তোমরা দু'জন দু'জনের সাথে কথা বলতে চাও বলো।”
শেহা আর উজ্জ্বল ত্বরিৎ একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। ঘুরে তাকায় বড়দের মুখের দিকে। সবাই মিটিমিটি হাসছে,চোখে মুখে সম্মতি।
নিজাম মাহমুদ উঠে দাঁড়িয়ে ইহানের দিকে এক পলক তাকাতেই ইহান তৎপর হলো। বলল,“শেহু ওনাকে নিয়ে পুল সাইডে যা।”
নিজাম মাহমুদ ফুরফুরে মেজাজের মানুষ,বললেন,“উহু। ওরা একা যাবে না। আমরা ছোটোরাও যাবো। চলো সবাই।”
নিজামের পিড়াপিড়িতে শেহা উজ্জ্বলের পিছু পিছু দোতলায় উঠলো ইনু প্রিতম, ইরফান প্রণমি, ইহান, ইনশিরাহ। এবং প্রেরণাকেও ছাড়লেন না তিনি। ভদ্রতা দেখিয়ে প্রেরণা গেলো।
বৃষ্টিতে পুল সাইডের বেঞ্চি,মেঝে ভিজে আছে। হেল্পিং হ্যান্ড এসে সব মুছে গিয়ে যায়। উজ্জ্বল আর শেহা বসেছে পুল সাইডের সর্বদক্ষিণের একটা বেঞ্চিতে,একটা নিড়িবিলি যায়গা দেখে।
ইনু প্রিতম, ইরফান প্রণমি জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন যায়গায় বসে গল্প করছে।
নিজাম মাহমুদ দরজার কাছে একটা বেঞ্চি দেখে হেসে হেসে বললেন,“ওদের দু'জনকে এখন ওদের মতো ছেড়ে দিই। এসো দাদু ভাইয়েরা আমরা এখানে বসে গল্প করি।”
নিজামের মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলো ইহান,তার পাশেই ইনশিরাহ। প্রেরণা একটু দূরে দাঁড়িয়েছে। শুদ্ধ ইহানের ফোনে ভিডিও গেম খেলছে খানিকটা দূরে বসেই। হঠাৎ করেই নিজাম মাহমুদ ইহানকে প্রশ্ন ছুড়লেন,“কি দাদুভাই। ছোটোরা সবাই বিয়ে করে নিচ্ছে, তোমার খবর কি?”
চলমান.......
[ ২য় অংশ কাল সকালে আসবে। ]
দুই হাজার ওয়ার্ড লিখলাম কোনোমতে, আর পারা যাচ্ছে না মাথা ব্যাথায়।
আর হ্যা,এই পর্বটিতে সবার টুকটাক সিকোয়েন্স রাখার চেষ্টা করেছি। এভাবে লিখে আমার অভ্যাস নেইতো। আমি একেকটা দৃশ্য প্যারা আকারে লিখি। কাইন্ডলি জানাবেন খাপছাড়া হলো কিনা সংলাপ বিনিময়। আমার বুঝতে সুবিধা হবে।#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৩ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
হঠাৎ করেই নিজাম মাহমুদ ইহানকে প্রশ্ন ছুড়লেন,“কি দাদুভাই। ছোটোরা সবাই বিয়ে করে নিচ্ছে, তোমার খবর কি?”
__________
নিজাম মাহমুদ স্বভাবে খুবই ফুর্তিবাজ এক প্রৌঢ়। খুব অপরিচিত লোককে ও কথায় কথায় খুব টানতে পারে। প্রেরণা বৃদ্ধকে পছন্দ করলো,তাই এখানে বসে বসে তার কথা শুনছে। নিচে রাগী রাগী চোখের রিতু আন্টির সামনে ঘুরঘুর করার থেকে এই যায়গাটা ভালো। ইনু-প্রিতম, ইরফান-প্রণমি,শেহা উজ্জ্বলকে দেখছে সে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। হঠাৎ করেই আবার দৃষ্টি নামায় সে। বদনজর বলতে একটা ব্যাপার আছে। ওদের কখনো বদনজর লাগাতে ইচ্ছুক নয় প্রেরণা মনের ভুলেও।
নিজামের ঐ প্রশ্নটিতে ইহান নিশ্চুপ হাসলো। নিজাম মাহমুদ নাছোড়বান্দা,বললেন,“হাসলে হবে না। বলো। সমস্যা কোথায়? বিয়ের নামই নিচ্ছো না। পলিটিক্স দাপিয়ে বেড়ালে হবে? যত বড় নেতা হও না কেন, একজন উত্তরসূরী তো লাগবে!”
প্রেরণা না চাইতেও তাকায় ইহানের দিকে নিজামের এই কথাটায়, সাথে সাথে ইহানও তাকিয়েছে। চোখ মুখ স্বাভাবিক ইহানের,নিজাম মাহমুদের প্রশ্নের জবাবে বলল,“বিয়ে করার তো ইচ্ছে আছে।”
_তাহলে সমস্যা কোথায়? মেয়ে পছন্দ হয়না?
ইহান প্রেরণার চোখে চোখ রেখেই বললো,“মেয়েও পছন্দ করা আছে!”
প্রেরণা কপাল কুঁচকে ফেললো, দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বসে রইল। নিজাম মাহমুদ উৎসুক হয়ে জানতে চায়,“তাহলে সমস্যা কোথায়? মেয়ে তোমাকে পছন্দ করছে না?”
_নাহ।
_সেকি! ইউ আর দ্য মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর ইন টাউন! মেয়ের তো ভারি দুঃসাহস!
প্রেরণা অসহ্য হয়ে উঠছে। ইহান ওর নিস্প্রভ মুখের দিকেই দৃষ্টি স্থির রেখে নিজামকে বলে,“দুঃসাহসী নয় দাদু, খুব বোকা জানেন!”
_বোকা না,বোকা না, মাথামোটা।
নিজাম মাহমুদ হাসেন। ইহান চোখ নামায়না প্রেরণার থেকে। প্রেরণা চোখমুখ কঠিন করে বসে আছে।
_দেখতে কেমন? ছবি দেখানো যাবে?
নিজামের কথায় ইহান মাথা নেড়ে বলল,“ছবি নেই আমার কাছে। দেখতে ঠিকঠাক।”
_শুধু ঠিকঠাক?
_হু, নাক নাকের যায়গায়,চোখ চোখের যায়গায়। সবই আর পাঁচটা মানুষের মতো।
_তবে কি দেখে প্রেমে পরলে?
চেয়ারে পিঠটা ভালো করে এলিয়ে দিয়ে ইহান বলল,“এই ব্যখ্যা আমি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। আমি বুঝতে হয়রান আমি ঠিক কি দেখে প্রেমে পড়েছি দাদু, কোনটা বলব?”
দৃষ্টি প্রেরণার মুখে স্থির রেখে ইহান বলতে থাকে,“তার ক্লান্তি মাখা মুখ, তার শান্ত ধৈর্য্য শীলা মূর্তি, তার রাগে ফেটে পরা, তার চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলা, তার জ্ঞান বিলানো, তার মুরব্বি ভাব ধরা, কখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে দেওয়া, তার শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মোছা, মাঝ রাস্তায় হাঁটার সময় হোঁচট খেয়ে স্লিপারের ফিতা ছিঁড়ে গেলে সেটা ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুঃখ বিলাস করা, তার কোমরের কাছে দুলতে থাকা বেনী, তার ছোট মোটো ধমক, তার বেশি বোঝার বাতিক, একটা শক্ত আবরণে আবৃত তার নরম মনটা, আ'ম কনফিউজড দাদু যে এক্সাক্টলি কি দেখে আমি প্রেমে পরেছি। শুধু জানি,যখন যখন দেখেছি,তখনি প্রেমে পরেছি।”
________
দৃষ্টি হাতের নখে নিবদ্ধ শেহার, তার খুব পাশেই ঐ লোকটা। লোকটা নতুন, তবে নাকি লোকটা শেহার। বলছে সবাই।
শেহার দৃষ্টিতে আচরণে কোনো সংকোচ নেই, তবে ভেতরে ভেতরে শেহা নার্ভাস। হাতের অনামিকা এখন তার ফাঁকা। খানিক বাদে এখানে যায়গা নেবে একটা দামী ধাতুর আংটি, মালিক ঐ লোকটা। ক্রমশ সেই মালিকানা ছড়িয়ে পরবে শেহার সবটুকুতে। শেহা নিজে মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করছে,“শেহা খুব তো বড় বড় কথা বলেছিস সকলকে। তুই প্রস্তুত তো আসলেই? এ কিন্তু ছেলে খেলা না। লোকটা তোর হবে, তুই লোকটার হবি। লোকটার অসম্মান করবি নাতো? তুই সিরিয়াস তো?”
উজ্জ্বল আড়চোখে শেহাকে এক পলক দেখে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়, ধিমি আওয়াজে বলে,“আমাদের সম্ভবত কথা বলতে এখানে বসিয়েছে।”
সংকোচ সরিয়ে হাসে শেহা,বলে,“এবং আমাদের কোনো কথা নেই।”
এবার উজ্জ্বল হাসলো,বলল,“একটা পার্সোনাল প্রশ্ন করবো আপনাকে?”
_করুন। তার আগে তুমি বলুন,আমি আপনার থেকে ছোটো, আপনি আপনি শুনতে অদ্ভুত লাগে।
_ওহহ হ্যা। আসলে একটা প্রশ্ন আমার প্রথম থেকে মাথায় ঘুরছে।
_কি?
_তুমি যথেষ্ট স্ট্রং একটি মেয়ে আই গেস! এভাবে হুট করে আরেঞ্জ ম্যারেজে রাজি হয়েছো, এটা খুব অবাক করার বিষয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে।
_কেন? স্ট্রং হলেই বুঝি বাবার পছন্দকে দাম দিতে নেই! স্ট্রং হলেই বিয়ে নিয়ে দোনামোনা করতে হবে।
উজ্জ্বল চমকে উঠলো,বলল,“শুধুই বাবার পছন্দ? একটুও তোমার নয়?”
শেহা এবার সংকোচে হাঁসফাঁস করে উঠলো,চোখ তুলে একটি বার তাকায় না লোকটার দিকে। এভাবে কেউ সরাসরি প্রশ্ন করে? উজ্জ্বল তাকিয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। এতো বাধ্য মেয়ে তার প্রয়োজন নেই যে উজ্জ্বলকে শুধুমাত্র বাবার পছন্দে বিয়ে করবে, দু'টো দিন, দু'টো সাক্ষাৎ যথেষ্ট নয় একজনকে পছন্দ করার জন্য, উজ্জ্বল জানে, তবুও সামান্য পজিটিভ ফিলিংস কি হয়নি মেয়েটার মনে?
লোকটাকে অপেক্ষা করায় না শেহা,বলে উঠলো,“বাবার পছন্দতেই হচ্ছে সবকিছু।”
উজ্জ্বল চুপ করে আছে,মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হতেই শেহা দ্বিতীয় বারের মতো বলে ওঠে,“তবে ছোটো বেলা থেকে বাবা আর আমার পছন্দের বেশ মিল আছে।”
__________
নিচ থেকে ডাক পরে প্রিতমের। তাকে তার শ্বশুর ডেকে পাঠিয়েছে গল্প করবে বলে। ইনুকে একা ফেলে প্রিতম নিচে চলে গিয়েছে। ইশি গিয়ে ইনুর পাশে দাঁড়ালো, শেহা আর উজ্জ্বলকে দেখিয়ে বলল,“খুব মানাবে,তাইনা রে?”
_হু। ভীষণ সুন্দর মানাবে।
প্রেরণা নিজাম আর ইহানের কথোপকথন নিতে পারছিলো না আর। তাই সে উঠলো। নিজাম বাঁধা দিয়ে বলল,“হোয়্যাট হ্যাপেন্ড বিউটিফুল লেইডি! তোমার সাথে তো আলাপই হলো না,এর আগেই উঠছো?”
সামান্য হাসলো প্রেরণা, মুরব্বি হাত নেড়ে বসতে বলছে। তাই আবারো বসলো। ইহান আড়চোখে ওকে দেখে দৃষ্টি ফিরিয়ে গম্ভীর হয়ে রইলো। নিজাম মাহমুদ হঠাৎ ইহানকে বলে ওঠে,“তোমাকে ইমিডিয়েটলি বিয়ে করিয়ে দেয়া উচিত। এতো বড় পুরুষ মানুষ এখনো দেবদাস হয়ে ঘুরছো। যে বোঝেনা তাকে বাদ দাও! নতুন একটা ধরিয়ে দেবো, উজ্জ্বলের জন্য একটা বিশাল পাত্রীর লিস্ট করেছিলাম আমি, সেগুলো উপহার স্বরূপ ভবিষ্যৎ সাংসদ ইহান তাজওয়ার মির্জাকে দেবো আমি।”
বলেই হেসে ওঠেন নিজাম মাহমুদ। হাসে ইহানও, তবে খানিক বাদেই প্রেরণার দিকে দৃষ্টি দিয়ে কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সুরে বলে,“বোঝে তো অবশ্যই! আই ক্যান ফিল! ছলনা করছে, আমার সাথে, আর নিজের সাথেও!”
তড়াক করে এবার লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় প্রেরণা। মেজাজ দেখাতে না পেরে আইঢাঁই করছে, শুধু বুঝল তার এখান থেকে যাওয়া উচিত। অদূরে বসে থাকা শুদ্ধ হাতে ফোন নিয়ে গেম খেলতে খেলতে খিকখিক করে হাসছে। বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে প্রেরণা বলে উঠলো,“শুদ্ধ ওটা কার ফোন?”
_ইহান আঙ্কেলের।
বলেই শুদ্ধ আবারো হেসে কুটিকুটি হচ্ছে গেমস খেলতে খেলতে। প্রেরণা লম্বা শ্বাস ফেললো, ঐ লোকটা ছেলেটাকে বিগড়ে দিচ্ছে,লাই দিচ্ছে, নষ্ট করছে। তপ্ত মেজাজ নিয়ে আবারো বকলো প্রেরণা,“যার ফোন তাকে দাও আর তুমি এভাবে হাসছো কেন?”
ইহান অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,“মানে? একটা বাচ্চা কিভাবে হাসবে?”
ডান হাত দিয়ে বাম হাতের আঙ্গুল কচলাচ্ছে প্রেরণা। ও নিজেও জানেনা ও এমন কেন করছে, শুধু জানে সে চাইছে না শুদ্ধকে ইহানের স্নেহ তলে রাখতে। বিপদ হবে ছোটো ছেলেটার তবে। রাগটা ইহানের ওপর চেপেছে, ঝাড়ছে শুদ্ধকে। ইহানের সামনেই শুদ্ধকে আবারো ধমকাল,“শুদ্ধ হোয়াট আই সেইড?”
শুদ্ধ হাসছে ফোন নিয়ে। প্রেরণা এগিয়ে যায়,নাহ,অনেকটা দেরী করে ফেলেছে সে, ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর না। ইহান তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় প্রেরণার অমন পদক্ষেপে। ভদ্রমহিলা এখন শুদ্ধকে মারবে নাকি? খুব হতাশ হবে ইহান তবে।
মাম্মাকে এগোতে দেখে শুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দেয়,যেন ওটা একটা খেলা। প্রেরণা রেগে মেগে ছুটছে, চেঁচাচ্ছে,“শুদ্ধ যার ফোন তাকে দাও বলছি, শুদ্ধ এভাবে ছুটো না যায়গাটা পিচ্ছিল। শুদ্ধ পরে যাবে,শুদ্ধ পুলে পরে ভিজে যাবে এই অবেলায়, শুদ্ধ থামতে বলেছি আ.......”
ঝপাং করে একটা শব্দ হতেই ইরফান ঘুরে তাকালো। ইহান তাকিয়ে আছে থম মেরে। শুদ্ধ দাঁড়িয়ে চোখদুটো বড় বড় করে রেখেছে। ঠিক তখুনি ইনু চেঁচিয়ে উঠলো,“আরে আপু সাঁতার জানে না তো! কেউ নামো।”
পুলটা ঐ পাশে গভীর,যে পাশে প্রেরণা পরেছে। হাত তুলে হাবুডুবু খাচ্ছে শুধু। শুদ্ধ হাত থেকে ইহানের ফোনটা নিচে ফেলে দিলো। চেঁচিয়ে উঠল মাম্মা বলে।
সেকেন্ডের মাথায় বিশাল কান্ড ঘটে গেলো, ইহান নামলো পুলে, উজ্জ্বলের পাশ থেকে ছুটে এসে শেহা নামলো পুলে আর নামলো ইশিও।
প্রণমি আতঙ্কে খামচে ধরেছে ইরফানের হাত, অস্থির হয়ে বলছে,“আপু পরেছে? আপু পরেছে? আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনি যান! ভাইয়া তো এখানে নেই,আপু সাঁতার জানে না।”
_তুমি আমার হাত খামচে ধরে রাখলে যাবো কিভাবে?
প্রণমি হাত ছাড়তেই ইরফান উল্টো আয়েশ করে বসে দৃষ্টি দিয়ে রাখলো পুলে, ইহান পাঁজাকোলা করে প্রেরণাকে তুললো, ওকে সাহায্য করলো শেহা। পানি যথেষ্ট খেয়েছে প্রেরণা, তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। প্রেরণা সাঁতার জানেনা এই তথ্যটি দেরীতে দিয়েছে ইনু,নয়তো এতটা ভুগতো না সে।
প্রণমি কেঁদে দিয়ে ইরফানকে ঠেলে ঠেলে বললো,“কি হলো? যাচ্ছেন না? আপুকে ওঠান!”
দাদানের দিকে শান্ত দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে ইরফান,দেখছে দাদানের উদ্বিগ্নতা,দেখছে শান্ত গম্ভীর মানুষটার ছটফটানি চাপিয়ে রাখার প্রয়াস। হাঁফ ছেড়ে প্রণমিকে জবাব দেয় ইরফান,“আমার যেতে হবে না, ওখানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই! ওখানে কেউ আছে আপুর জন্য।”
শাড়ির আঁচলটা অগোছালো হয়ে আছে। ইহান ব্যস্ত হাতে ওকে জরিয়ে দিলো আঁচলে। শেহা গাল চাপড়ে যাচ্ছে,“এই আপু! আপু !”
আচমকা বড় করে শ্বাস ফেলল প্রেরণা। তবে ঠিক হতে পারলো না। তার সময়ের প্রয়োজন। চোখের সামনে সবকিছু হলদেটে লাগছে,চোখ ব্যাথা করছে,মনে হচ্ছে পানি চোখেও ঢুকেছে। হলদেটে আভায় দেখলো খুব কাছ থেকে একটা শক্ত চোয়াল, উদ্বিগ্নতায় ঠাশা, তাকে ডাকছে হয়তো। কানেও কি লিটার লিটার পানি ঢুকেছে? ঠিকভাবে শুনছে না কেন প্রেরণা? প্রেরণা বুঝতে পারলো তার স্থান এখন কারো বাহুতেই। সেইভ করার নামে প্রেরণাকে ছুঁয়ে দিলো লোকটা।
ঐ লোকটা,ঐ অবুঝ লোকটা প্রেরণার জাত,মান সব মিশিয়ে দিলো। হতাশ প্রেরণা,খুব হতাশ।
ইহান তাজওয়ার মির্জা প্রেরণাকে ঠিক যেভাবে ধরেছে,যা যা করছে উত্তেজিত হয়ে, সাধারণ চোখ গুলোতে অস্বাভাবিক লাগছে। শুধু ইরফান একাই বসে আছে নির্লিপ্ত আর নির্বিকার ভঙ্গিতে। সে দাদানের ছটফটানি দেখছে চেয়ে চেয়ে।
ইশিও পানিতে নেমেছিল হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে,উঠে পেটে হাত দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ইনুর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ইশি ইনু অবাক চোখে বড় দাদানকে দেখে, তারা তো আর যাই হোক, অবুঝ নয়। পর পর দু বোন দুই বোনের দিকে তাকায়। ইশি হিসেব কষে ফেলেছে,তার মনে পরেছে আলোর কথা। আলো একদিন কথায় কথায় ইশিকে বলেছিলো,“জানিস ইহানের একটি মেয়ে মনে ধরেছে। মেয়েটির নীল চোখ। একটা নীল চোঁখের বৌ হলে মন্দ হয়না বল!”
ইনুর মুখটা ফ্যাকাশে, ফ্যাকাশে ইশির মুখটাও, অস্ফুটে সে ইনুকে বলে উঠলো,“আমি যা ভাবছি তুইও কি সেটাই ভাবছিস ইনু?”
ইনু ঢোক গিলে উপর নিচে মাথা ঝাঁকায়। দুই বোন একইসাথে ঘুরে ইরফানের দিকে তাকায়, ইরফান যেন ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হতেই ইরফান হাসলো, দূর্বোধ্য হাসি।
ইনু বারবার ঢোক গিলছে, বিড়বিড় করে বলছে,“গালি যা দিয়েছি! সব আপুকে দিয়েছি?”
ইনু ছুটতে ছুটতে নিচে গেলো প্রিতমকে ডাকতে। ইহান সরায়না প্রেরণাকে, হুশ খুইয়ে বসে আছে। শুদ্ধ গিয়ে মাম্মাকে ধরে কেঁদে দিতেই বলিষ্ঠ এক হাতে ওকেও আগলে নিলো ইহান।
ঠিক সেসময় রিতু এলো ওখানে, হাতে ওর চায়ের কাপ, নিজাম মাহমুদের জন্য এনেছিল। পুলসাইডে জটলা দেখে এগিয়ে যেতেই ধাক্কার মতো খেলো রিতু। হতবাক হয়ে বড় ছেলেকে আর ওর সাথে লেগে থাকা ঐ মেয়েটাকে দেখছে। এবং আশ্চর্যের বিষয় তার ছেলে তাকে দেখেও সংযত হচ্ছে না, যেন ঐ মেয়েটা তার অধিকারের কেউ, পরনারী নয়। এতোটা বোধ বুদ্ধিহীন কবে থেকে হলো তার এতো বড় ছেলে?
ইশি বিপদ বোঝে, মেজো মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে গিয়ে দাদানের থেকে সরিয়ে প্রেরণাকে নিজে শক্ত করে ধরলো। এইবার ইহানের হুশ ফিরলো, সংকোচে পিছিয়ে গেলো, টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভেজা শরীরটা নিয়ে। শেহা আর ইশি মিলে উচু করে বসিয়ে দিতেই প্রেরণা বড় বড় শ্বাস ফেলতে পারলো।
__________
নিচতলা থেকে ইনুর চিৎকার চেঁচামেচিতে ছুটে এসেছে সবাই। প্রেরণাকে ধরে বসে আছে ইনশিরাহ। শ্বাস চলছে দ্রুতগতিতে প্রেরণার। প্রিতম ছুটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বোনের সামনে বসে চেঁচায়,“আপু কষ্ট হচ্ছে? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে?”
সামিন বললো,“ওকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া উচিত।”
হাত দিয়ে ইশারা করে সামিনকে বারণ করলো প্রেরণা। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেও দৃষ্টি ঘুরিয়ে অদূরে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকেই দেখলো,ইহান চোখ নামায় না,মুখ অভিব্যক্তিহীন।
“আপু ,প্যানিকড এখনো? ভেতরে যেতে পারবে নাকি আমি কোলে তুলবো?”
প্রিতমের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবারো প্রেরণা ইহানকেই দেখলো। নিজের গাল ছুঁলো প্রেরণা, ঐ লোকের শক্ত হাতটা এই গালে ছিলো, মনে আছে প্রেরণার, স্পষ্ট মনে আছে। চোখ ছেপে জল পরলো গড়িয়ে, খেয়াল করলো না কেউ। প্রেরণা হাঁসফাঁস করতে করতে বলে,“বাড়িতে যাবো ভাই! বাড়িতে যাবো।”
_মানেহ? এসব কি কথা? তুমি অসুস্থ প্রেরণা!
পরী আর আলো ধমকে উঠে বলল ওকে। ইনু এলো চারটা তোয়ালে নিয়ে, একটা প্রেরণার,একটা ইহানের আর দুটো শেহা আর ইশির জন্য। প্রেরণার পাশে বসে ইনু ওর মাথা মুছে দিচ্ছে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা একদৃষ্টে তাকেই দেখছে আর নিজের মাথা মুছে নিচ্ছে। হঠাৎ করে গা কাঁপিয়ে কান্না পেলো প্রেরণার,তবে কাঁদল না। চুপচাপ উঠে ভেতরে ঢুকলো। প্রিতম আর ইনু সাহায্য করলো ওকে।
রিতু সুইমিং পুল এরিয়ায় পা রাখেনি,সে চুপচাপ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। ইহান আসতেই ওর পথ আগলে দাঁড়ায় সে। ইহান মাম্মার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি রাখতেই রিতু থমথমে মুখে বলল,“তুই কেনো নেমেছিলি পুলে? কি দরকার ছিল? মেয়ে মানুষ, ওভাবে ধরার কি দরকার ছিলো? বোধ হারিয়েছিস?”
আশ্চর্য হলো ইহান,“মাম্মা আর কে তুলতো? সামলাতো?”
_কেন আর কেউ ছিলো না?
_ওরা পারতো? আর ইরফান কি করে নামতো? বড় জেঠান হয় ওর, কিভাবে ধরতো...
_তো তোর কি হয়?
চাপা রাগ রিতুর কন্ঠে। ইহান থেমে যায় মাম্মার প্রশ্নে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয় মায়ের থেকে। রিতু বলে,“মেয়েছেলে ওভাবে ধরিস। কুটুম বাড়ির লোকজন, মাইন্ড করে বসলে?”
জবাব দেয়না ইহান, চুপ চাপ দ্রুত পায়ে হেঁটে ঘরে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। যেন মায়ের চোখ থেকে পালাতে চাইলো।
রিতু সেই বন্ধ দরজার দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর কি মনে করে ছুটে যায় আলোর কাছে, ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,“ও ভাবি? ইহান একবার বলেছিল নাকি তোমার কাছে একটা মেয়েকে ওর মনে ধরেছে, মেয়েটার ব্যপারে তুমি কি কি জানো?”
আশ্চর্য হলো আলো,“এখন এটা বলার সময় রিতু? চল নিচে চলে,শেহা জামা পাল্টে এলেই আংটিবদল হবে।”
_না বলো।
রিতুর জেদ দেখে আলো শ্বাস ফেলে বললো,“বলেছে অসম্ভব সুন্দরী,বয়স টা একটু বেশি, আঠাশ ঊনত্রিশ আর চোখ নীল। আমার অতো কিছু মনে নেই রে। ছাড় পথ ছাড়।”
বলেই আলো চলে যায়, সে খুব ব্যস্ত। রিতু কেমন দুলে উঠল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি দিয়ে রাখলো।
________
ইশির ঘরের ওয়াশ রুমে ঢুকে কল ছেড়ে প্রেরণা দাঁড়িয়ে রইল। এখন সে সহজ স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়। অবাক বিস্ময়ে নিজের হাত দেখে, নিজের কোমর দেখে। কোথায় কোথায় ছোঁয়া লেগেছে সে বুঝতে পারছে না। তার মনে হলো যেন শাওকাত খুব বকছে তাকে। বলছে,“ওসব কি লেগে আছে? ধোও।”
প্রেরণা পানি ছেড়ে ধুলো। এমন পাগল পাগল কেনো করছে সে জানে না। আচমকা তার হঠাৎ খেয়াল হলো, কিছুক্ষণ আগে তার নাকে একটা ঘ্রাণ লেগেছে। একটা কড়া ঘ্রাণ। যখন ঐ লোকটার সাথে সে মিশে ছিলো। ঘ্রাণটা সিগারেটের, তখন খেয়াল করেনি প্রেরণা। এটা খুবই দুর্লভ ব্র্যান্ড, শাওকাত ওয়াসীত খেতো এই সিগারেট টা, কোথা থেকে জানি আনিয়ে নিতো অর্ডার করে। খুব পরিচিত এই ঘ্রাণটার সাথে প্রেরণা, দীর্ঘ ছয় বছর সংসার করেছে ঘ্রাণটার সাথে। যেটা ঐ লোকের থেকেও পেয়েছে সে। চুপচাপ মেঝেতে বসে চুল টেনে নিশ্চুপ কাঁদল প্রেরণা, কেনো কাঁদল, এতো বুঝদার, বেশী বোঝা, জ্ঞানী আপা জানে না।
চলমান....
[ জায়া ও পতি আসবে রাত ১০টায়।]