ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 115

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৫ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

[ ১ম অংশ ‌]

মুঈন পাশে নেই, হয়তো নিচে গিয়েছে ভেবে ইশি উঠেছিল। কলিং বেলের আওয়াজ সেও পেয়েছে ঘুমের মাঝে। দোতলার লবির রেলিংয়ের কাছে এসে উঁকি মেরে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা উজ্জ্বলকে দেখলো ইশি, হাতে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে কেমন ছন্নছাড়া ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা মলিন। দেখেই ইশি তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পরলো ইনুর ঘরে। শেহা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ইশি গিয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে থাকে,“এই শেহু! শেহু! এই শেহু! উজ্জ্বল ভাই এসেছে। উজ্জ্বল ভাই এসেছে।”

আচমকা ঘুম ভে'ঙে যাওয়ায় বিরবির করছে শেহা,হাই তুলে বলছে,“হ্যা এসেছে তো, লোকটা স্বপ্নে এসেছে আমার। আশ্চর্য, আমি তার সাথে কদম ফুল তুলছিলাম ঝিল থেকে। কদম ফুল ঝিলে ফোঁটে?”

ইনশিরাহ হাসলো হঠাৎ, পরপর আরো জোরে ধাক্কা মারলো ওকে,“এই ওঠ হাদী। স্বপ্নে না,বাস্তবেই এসেছে, চোখ মুখ ধুয়ে নিচে যা।”

শেহা বাস্তবে পদার্পণ করেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। মানে? উজ্জ্বল মাহমুদ এসেছে এতো রাতে? কেন? তিন ঘন্টা আগেই না কথা হলো শেহার লোকটার সাথে? সব তো ঠিকঠাক ছিলো। এই গভীর রাতে ঐ লোকের কি কাজ? কি অদ্ভুত !

দ্রুততার সাথে শেহা উঠে ওয়াশ রুমে গিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে এসে ইশির পিছু পিছু যায়। তবে শেহা নিচে নামলো না। উঁকি মেরে বড়দের দেখেই দোতলার রেলিং ধরেই দাঁড়িয়ে রইলো, দৃষ্টি তার নিচে অগোছালো পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার মলিন মুখটাতে নিবদ্ধ। যে লোকের মুখ থেকে কখনো হাসি সরতে দেখেনি শেহা,সেই লোকের মুখটা এমন অন্ধকার কেন?

শান্ত বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে হবু জামাইয়ের দিকে। উজ্জ্বল বড় বড় শ্বাস ফেলছে। সামিন ছটফটিয়ে উঠে বলে,“নিজাম কাকা হসপিটালে? কিভাবে? কখন? ফোন করলে না কেন? ”

বাড়ির মানুষগুলোর প্রত্যেকের চোখে উদ্বিগ্নতা ঠাশা। উজ্জ্বল এতকিছু গুছিয়ে বলতে পারছে না,না তার সেই মনমানসিকতা আছে। ভীষণ অস্থির হয়ে সে বলে যাচ্ছে,“সময় পাইনি। চেম্বার থেকে ফিরে বাড়িতে গিয়ে দেখেছি তখনো সুস্থ ছিলো। হঠাৎ কিছুক্ষণ পরে ডিনারের জন্য ডাকতে গিয়ে দেখি.....”

একটু থেমে উজ্জ্বল চোখ তুলে তাকায় শান্তর দিকে, শুধু ওর অস্থিরতা টুকুই প্রকাশ পায় ওর কন্ঠে, বাকি যা বলছে সব জড়িয়ে যাচ্ছে,“আংকেল! বিব্রত করার জন্য স্যরি! যদি শেহাকে ডেকে দিতেন! ঐ দাদু ছাড়া আমার না কেউ নেই! অপারেশন কাল সকালে। কোনো নিশ্চয়তা নেই, আমি কি দাদুর শেষ শখটা পূরন করতে চেয়ে আপনাদের ভোগান্তি দিচ্ছি? সে-ই আমার মা-বাবা। কিংবা তার থেকেও বেশি পেয়েছি তাকে......

বলতে পারছে না আর উজ্জ্বল মাহমুদ।

_বাবা থামো,থামো। তুমি বসো। ইশ ছেলেটা কেমন ভেঙে পরছে, আরে বাবা কিছু হবে না, একটু রিল্যাক্স হও!

পরী গিয়ে উজ্জ্বলের হাত টেনে নিয়ে বসায় সোফায়। উজ্জ্বল দু'হাতে মুখ ঢেকে নিজের ভঙ্গুর রূপটা ঢাকতে ব্যস্ত, শেহা ব্যস্ত দোতলা থেকে লোকটাকে দেখতে।

সামিনেরা ভীষণ চিন্তিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। এই ছেলেটিকে না করতে মন চাইছে না কারো। একেবারেই মন চাইছে না। এত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একটা দায়িত্ববান ছেলের এই অস্থির রূপটাও মানতে পারছে না কেউ। আসলেই মানুষ কখনো কখনো ভীষণ অসহায়।

ইরফান ইহান দুই ভাই একই সাথে বলে ওঠে,“আমাদের উচিত শেহার সাথে আলোচনা করা....”

বড়রা একপাশে সরে গিয়ে ফুসুরফুসুর করতে লাগলো। সামিন বিব্রত ভঙ্গিতে শান্তর অনুমতি চায়, শান্তও বিব্রত, মিনমিনে স্বরে বলে,“বিবেক তো সায় দিচ্ছে আমার তবে আমার মেয়ের কি মত হতে পারে? সবকিছু এভাবে মেনে নেবে একটা মেয়ে? বুঝতে পারছি না ভাইয়া। ওকে কে বলবে বুঝিয়ে?”

সামিন, ইলহাম সাথে সাথে আলোর দিকে তাকায়, আলো চমকে উঠে ঢোক গিলে নিয়ে বলে,“আমি এসবের মধ্যে আর নেই। একবার বাড়াবাড়ি করে তওবা পরেছি। যা বোঝার আপনারা বোঝেন। শেহার সাথে আমি কথা বলতে পারবো না।”

_তবে কে বলবে ওর কাছে গিয়ে? ওকে ডেকে আনি? উজ্জ্বল কথা বলুক?

শান্ত তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে কথাটা বলেই সিঁড়ির দিকে যেতে নেয়।

এদিকে উজ্জ্বল দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কপালে ঠেকিয়েই বসে ছিল চুপচাপ। ওর পাশেই মুঈন বসে আছে। কিছু পল উজ্জ্বলকে দেখে ডান হাতটা একটা কাঁধে তুলে দেয় ওর। উজ্জ্বল চোখ তুলে তাকাতেই মুঈন সামান্য হেসে ওকে ভরসা দিয়ে বললো,“দুশ্চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

উজ্জ্বল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাকায় আশেপাশে,বড়রা কেউ নেই এখানে। ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছে উজ্জ্বল। এ বাড়ির বড়রা বিষয়টা কিভাবে নিলো? খুব বেশি বিব্রত করে ফেললো উজ্জ্বল এদের? মুঈন ওর দৃষ্টি পড়তে সক্ষম হয়। ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হেসে বললো,“চিন্তা করবেন না। এখানে সবাই আপনাকে বুঝতে পারছে!”

_আসলে....

_চিন্তা করবেন না, এ বাড়ির বিয়ে গুলো এমন হুট হাটই হয়। এটা সিনেমার মতো হলেও সত্যি! আমরা সবাই অভ্যস্ত এতে। কেউ প্যানিকড হয়নি, রিল্যাক্সড!

উজ্জ্বল কিছু বুঝতে পারছে না মুঈনের কথা, মুঈন সোফাতে পিঠ এলিয়ে দিয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার শ্বশুর শাশুড়িদের দেখতে থাকে।

বাড়ির সবার মুখ থমথমে, ঐ দোতলা থেকেই নিমেষ হীন দেখছে শেহা। যখন দেখছে শান্ত এগিয়ে আসছে সিঁড়ির দিকে, উজ্জ্বল উঠে দাঁড়িয়ে বিনয়ী সুরে তাকে বলে,“আংকেল , আপনার কিছুই বলতে হবে না। ওকে আমার সামনে নিয়ে আসুন,যা কথা বলার আমিই বলবো।”

শেহা লোকটার পা-মাথা দেখছে, কেমন অস্থিরতায় ক্রমশ শেষ হয়ে যাচ্ছে লোকটা। চুল টানছে নিজের বারবার। হঠাৎ করেই কেন জানি শেহার খুব মায় লাগলো লোকটার প্রতি। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে শেহা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন ছুঁড়ল, আচ্ছা এখন বিয়ে হলে কিছু কি ক্ষতি হবে শেহার? নাহ, সম্ভবত হবে না। কোনো ক্ষতিই হবে না। শুধু বাচ্চা কাচ্চাদের একটা রোমাঞ্চকর গল্প বলবে নিজের বিয়ের রাতের, বলবে,“তোমাদের পাপার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার হসপিটালে বসে, এক মুমুর্ষ রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে কবুল বলেছি আমরা দুজন। বাসর রাত কেটেছে হসপিটালেই। তোমাদের পাপা খুব দুঃখ করছিলেন, আমি তো নতুন বৌ, তোমাদের পাপাকে চিনি না তেমন ভাবে, অত অন্তরঙ্গতা ছিলো না। তাকে সান্ত্বনা না দিয়ে বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তার কষ্ট দেখছিলাম।”

এসব নিজে নিজে ভেবে শেহা অস্পষ্ট হাসে। বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে দৃঢ় করে নেয় পরে। এরপর গায়ের সুতি ওড়নাটা মাথায় টেনে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। ধীরপায়ে শেহাকে নামতে দেখে বড়রা সবাই অস্বস্তিতে পরে গেলো। সবার মনে ভয়। শেহা ছোটো,অতটা বুঝ হয়তো নেই। যদি উজ্জ্বলের দাদুর অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা না করেই রিয়াক্ট করে বসে?

উজ্জ্বলের চোখেও পরে যায় শেহা। দু'জনের চোখে তাকিয়ে আছে দু'জন। শেহার শান্ত দৃষ্টি ঐ লোকের অশান্ত দৃষ্টিকে আলিঙ্গন করলো। উজ্জ্বল অস্থিরতা দমিয়ে,জড়তা কাটিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে জড়ানো গলায় বলে উঠলো,“শেহা....”

শেহা পায়ের গতি বাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে, দৃষ্টি উজ্জ্বলের চোখেই রেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,“দাদুর কি অবস্থা? আমাকে কি রেডি হবার সময় দিবেন? এই পোশাকে হসপিটাল যেতে চাচ্ছি না আমি।”

উজ্জ্বল তাকিয়ে আছে। শেহা ঘুরে বাবা আর মামাদের দেখলো, দেখলো মামীদের, ভাইদের,দেখলো ইশি আর জিজকে। সবাই তার কাছে যেন নীরব অনুনয় করছে, পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে বলছে। শেহা নিজেকে শান্ত রেখে বলে,“বিয়েটা তো পরের সপ্তাহে হতোই। আমার কোনো সমস্যা নেই বিয়েটা কখন কোথায় বসে হচ্ছে। আপনি আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আছি কিনা এটাই বড় কথা। আমার সম্মতি আছে। চলুন দাদুর কাছে যাই। আমাদের দুজনের বিয়ে এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত যদি এক বৃদ্ধ লোকের শেষ সময়ে একটু খুশি দেয় এতে আমি একটুও বিচলিত নই। আমি যাবো পোশাক পাল্টাতে?”

ঘরময় স্বস্তির নিঃশ্বাস, অনেক্ষণ পরে আবহাওয়া হালকা করে ফেললো সবাই। উজ্জ্বল শেহার চোখে তার কৃতজ্ঞ দৃষ্টি রেখেই মাথা ঝাঁকায়। পরপর হাতের শপিং ব্যাগটা শেহার দিকে এগিয়ে দিয়ে কাঁপা গলায় বলে,“এটা আমার দাদীর বেনারসী। দাদু খুব চাইল্ডিশ বুঝলে শেহা, সবসময় মজা করে বলতো আমার বিয়েতে আমি দাদুর বিয়ের পাঞ্জাবি পরবো আর আমার বৌ পরবে দাদীর বেনারসী। দাদু চোখ ভরে দেখবে আমাদের। তোমার এটা পরতে আপত্তি নেই তো?”

শেহা এক দৃষ্টে টকটকে লাল রঙের, পুরনো আমলের বেনারসীটা দেখলো। পরপর লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে আপ্লুত হয়ে বললো,“আপনার দাদু কি আপনার দাদীকে খুব ভালোবাসেন?”

_খুব খুব খুব।

_এই শাড়িটাতে সেগুলো লেগে আছে তাইনা?

_সম্ভবত।

শেহা সামান্য হেসে মৃদু শ্বাস ফেলে বললো,“একদমই আপত্তি নেই‌ আমার । শাড়ির ঘ্রাণটা ভালো লাগছে। একদম মায়া মায়া। শাড়িটা পরবো আমি। আপনার পাঞ্জাবি কোথায়?”

_হসপিটালে, ওখানে গিয়ে পরবো।

শেহা চুপচাপ আরো এক পলক লোকটাকে দেখে শাড়িটা নিয়ে দোতলায় ওঠে সবার চোখের সামনে থেকে। বড়রা সবাই শুধু মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেয়েটাকে দেখলো। মামীরা চোখের পানি মুছলো আড়ালে,এই মেয়েটা যেন সর্বোচ্চ সুখী হয়। স্বামী সুখ এসে এই ঠান্ডা চিত্তের মেয়েটার পায়ের কাছে যেন গড়াগড়ি খায়, এটাই সবার দোয়া।

___________

ঐ অতো রাতেই ইনুকে কল করে ইশমাম জানালো সবটা। ইনু ভীষণ মন খারাপ করলো, এটা কি হচ্ছে তাদের বাড়িতে? শেহার বিয়েতে সে থাকতে পারবে না?
প্রিতম রেডি হয়ে বৌকে বললো,“চলো, আমরাও থাকবো। মন খারাপ করার কি আছে? অদ্ভুত।”

এদিকে শেহাকে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে পরী আর রিতু। ওদিকে নিচে বড়রা আলোচনা করছে কাজীর ব্যাপারে। সবার মধ্যেই একটা চাপা উত্তেজনা। উজ্জ্বল মাহামুদ বলে লোকটা অদূরে দাঁড়িয়ে কানে ফোন চেপে হসপিটালে নিজাম মাহমুদের কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলছে। অবস্থা খুব একটা ভালো ঠেকছে না ডক্টররা। উজ্জ্বল হাঁসফাঁস করছে।

ইহান ফোন ঘেটে বেশ কয়েকজন কাজীর নাম্বার খুঁজে বের করতেই ইরফান ওর হাত ধরে থামিয়ে দিলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় ইহান, গমগমে স্বরে বলল,“কি হয়েছে? এই কাজীদের এই সময়ে পাওয়া যাবে? দেখি কোনজনকে পাওয়া যায়। সর।”

ইরফান হাসলো উচ্চশব্দে,তার হাসিটা ছিলো এমন,“হেহেহেহে।”

_তুই হেহেহেহে করছিস কেন এই সময়ে ! এটা হেহেহেহে করার সময়?

প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে ইহান বলে। হাসি থামিয়ে ইরফান বুক ভরে শ্বাস নেয়, পর পর শার্ট পাল্টাতে দোতলায় উঠতে উঠতে বাবা,চাচা,ভাই আর দুলাভাইদের উদ্দেশ্য করে হালকা গলায় বলে,“শেহুকে নিয়ে আগে রোগীর কাছে গিয়ে উপস্থিত হও তোমরা কাজী ঘাঁটাঘাঁটি না করে। ওখানে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বেশি। কাজী নিয়ে আসার দায়িত্ব আমার।”

লাল বেনারসী গাঁয়ে জড়িয়ে শেহা আয়নায় নিজেকে দেখছে। এক অদ্ভুত ছটফটানি হচ্ছে তার অন্দরে। হাত পা কাঁপছে মৃদু। ইশি এসে ওকে আগলে নিয়ে বললো,“ভয় পাচ্ছিস তুই?”

দু'পাশে ঘনঘন মাথা নাড়ে শেহা। পরপর একটা হাসি দিয়ে বলে,“একটু একটু পাচ্ছি।”

_ঠিক কি কারণে ভয়?

আশেপাশে তাকায় শেহা, পরপর ফিসফিসিয়ে বলে,“ঠিক কি কারণে জানি না।”

_আচ্ছা নার্ভাসনেস কমা। দাদুর জন্য প্রে কর।

শাড়ির আঁচল জড়িয়ে হাঁফ ছেড়ে শেহা তাই করলো, বিছানায় বসে বসে হবু দাদা শ্বশুরের জন্য প্রার্থনা করে যাচ্ছে এক ধ্যানে,“হে আল্লাহ! আমাদের দুজনের সম্পর্কের সূচনা কারো বিয়োগের শোক নিয়ে শুরু না হোক, শুরু না হোক। লোকটা ঠিক থাকুক। আমার সংসারে একজন মুরব্বি দরকার আল্লাহ। তুমি আমাকে বঞ্চিত করো না এটা থেকে। লোকটাকে ভালো রেখো।”

ওর শিশুসুলভ স্বচ্ছ আচরণ দেখে ইশি আলো পরী এই দুশ্চিন্তার সময়েও স্মিত হাসলো। আলো এসে ওর গালে চুমু খেয়ে বলে,“চল পাগল নিচে। দেরী হয়ে যাচ্ছে আমাদের।”

প্রণমির ঘুম ভেঙেছে ইরফান পাশ থেকে উঠে যাওয়ার পরপরই। লোকটা তাকে ডাকেনি। প্রণমি ঠিক জানতো না নিচে কি হচ্ছে। হয়তো কেউ তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। হয়তো সে জানলো কি জানলো না তাতে কারো কিছু যায় আসে না। ঐ লোকটাও হয়তো প্রয়োজন বোধ করলো না। এর দু'টো কারণ আছে, এক প্রণমি বয়সে খুব ছোট বলে, দুই প্রণমি অসুস্থ বলে।

কিছুক্ষণ মন খারাপ করে বসে থেকেও প্রণমি পারলো না, ধীরে ধীরে হাতরে হাতরে হেঁটে লবিতে এলো। সে তো এই বাড়ির বৌ। এই বাড়ির ভালোমন্দ নিয়ে বিচলিত তাকে হতেই হবে, আপু বলেছে বারবার।
লবিতে এসেই প্রণমি সবটা জানতে পারলো। সবার মধ্যে তাড়া, এক্ষুনি বেড়োবে সবাই হসপিটালের উদ্দেশ্যে। আর তার স্বামী যাবে কাজী ডাকতে। উশখুশ করছে প্রণমি, কিন্তু আশেপাশে কাউকে পাচ্ছে না দু'টো কথা বলার।

হঠাৎ রিতু এলো তাড়াহুড়ো করে, শাড়ি পাল্টে। প্রণমিকে লবিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বলল,“শেহার বিয়ে। ওর দাদা শ্বশুরের অবস্থা ভালো নেই। আমরা সবাই যাচ্ছি। তুমি ঘুমাও।”

মুখটা অন্ধকার করে মিনমিনে স্বরে প্রণমি বলে উঠলো,“আমি যাবো না মা?”

রিতু যেন খানিকটা বিরক্ত হলো, বললো,“ইশি আর তুমি যাবে না। তোমরা অসুস্থ। তোমাদের টানা হেচরা করার দরকার কি?”

বলেই রিতু তাড়াহুড়ো লাগিয়ে চলে গেলো। আর প্রণমি কিছুপল দাঁড়িয়ে থাকলো মাথা নিচু করে। ওর ঐ ফরসা মুখের দিকে নিমেষ হীন তাকিয়ে ছিলো ইরফান ,সে দাঁড়িয়ে ছিলো ওদের ঘরের দরজায়। প্রণমি চুপটি করে হেঁটে গিয়ে রুমে ঢুকতেই টের পেলো লোকটা যায়নি। চমকে উঠে প্রণমি বললো,“আপনি যাননি কাজী ডাকতে?”

শার্টের বোতাম লাগিয়ে নিয়ে ইরফান এসে প্রণমির মুখোমুখি দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে বলে,“তুমি রেডি হচ্ছো না কেন? বিয়ে দেখতে যাবে না?”

প্রণমি আইঢাঁই করে ওঠে, পর পর নিজের হতাশা টুকু চেপে রেখে সহজ গলায় বলে,“আমি তো অসুস্থ তাই অযথা আমাকে টানা হেচরা....”

পুরো কথাটা বলতে পারলো না প্রণমি। ইরফান তৎক্ষণাৎ ওর কপালে হাত রেখে ব্যগ্র কন্ঠে বলে,“কি অসুস্থ? কই জ্বর হয়েছে? না তো! তবে কি পেটে ব্যাথা?”

প্রণমি চমকে উঠে মাথা নাড়ে। ইরফান স্পষ্ট করে তখন বলে দেয়,“ওসব নেই? তবে তো দিব্যি সুস্থ তুমি! চলো চলো রেডি হও! কুইক।”

বলেই ইরফান কাবার্ড খুলে প্রণমির জন্য একটা কুর্তি বের করতে করতে বলে,“ননদের বিয়ে হচ্ছে তোমার। চলো। থাকতে হবে!”

চলমান......

[ ২য় অংশ কাল সকালে দেবো। ২০০০ শব্দ, এটুকুই লিখতে পারলাম আজ! ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৫ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

[ ২য় অংশ ‌]

প্রণমি রেডি হয়ে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বললো,“বাড়ির সবাই কি বেড়িয়ে পরেছে? গাড়ি স্টার্ট হবার শব্দ পেলাম, আমি যাবো না?”

ইরফান ওর হাতটা শক্ত করে ধরলো, নিচ তলায় নামতে নামতে বললো,“যাবে তো। আমার সাথে।”

বাড়িতে থেকে গিয়েছে ইশি আর পরী। শারীরিক ভাবে দুর্বল তো পরীও। এই রাতে দৌড়ঝাঁপ সহ্য হবে না শরীরে।

বাইকের কথা শুনে প্রণমি ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলো,বললো,“বাইকে উঠবো?”

_হু,এতে আশ্চর্য হবার কি আছে?

প্রণমি কথা বলে না, সে কখনো বাইকে ওঠেনি। ভাইয়া ওঠায়নি, ঝুঁকিপূর্ণ তাই । তবে তার খুব ইচ্ছে হতো বাইকে চড়তে, বরাবর। মনে মনে ভীষণ খুশি হলেও মাথা নিচু করে প্রণমি দাঁড়িয়ে থাকে। ইরফান ওকে একটা হেলমেট পরিয়ে দিয়ে বাইকে উঠে বলল,“আমাকে ধরে বসো শক্ত করে।”

প্রণমি তাই করলো, ইরফান বলল,“দুই পা ছড়িয়ে বসো। এটা সোফা সেট নয়, বাইক। ওভাবে বসাতে ঝুঁকি থাকে।”

প্রণমি তাই তাই করতে লাগলো ইরফান যা যা বলছে। ইরফানের দুই কাঁধে হাত প্রণমির। ইরফান হাত দু'টো টেনে নিয়ে নিজেকে পেঁচিয়ে ধরলো। প্রণমি লোকটার উষ্ণতায় আড়ষ্ট হলো। বুকের কাছে যে হাতটা রেখেছে প্রণমি, ঐ হাতে টের পেলো ইরফানের হৃদস্পন্দন। কি শান্ত,কি ধীর এখন। ঠিক এই লোকটার স্বভাবের উল্টো।

_________

তখন থেকে কলিং বেল বেজে চলেছে। তখন রাত প্রায় দু'টো। তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় শেষে সামান্য ভেজা চিঁড়ে মুখে দিয়ে কাজী আফতাব উদ্দিন বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বৃদ্ধ স্ত্রীর সাথে নিউমার্কেট রোডের এই ফ্ল্যাটে কাজী একা থাকেন। ছেলেমেয়েরা সব যে যার সংসার নিয়ে বিভিন্ন শহরে ব্যস্ত।

আফতাব উদ্দিনের স্ত্রীর ঘুম খুব গাঢ়। তার ঘুম না ভেঙে আফতাব উদ্দিন নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিল। এবং সাথে সাথে খেলো একটা ঝটকা। ‌

ইরফান তাকিয়ে আছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তবে কাজী আফতাব উদ্দিন থরথর করে কাঁপছে। প্রণমির হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো ইরফান, স্বাভাবিক গলায় কাজীকে সালাম দিলো। কাজী আফতাব উদ্দিন ঢোক গিলে নিয়ে সালামের জবাব দিয়ে বলে,“কি চাই নানুভাই?”

_আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।

_কো-কো-কোথায়?

_বিয়ে পড়াতে।

হাঁসফাঁস করে ওঠে আফতাব উদ্দিন। বলে,“তোমাদের না দুইবার বিয়ে হলো? আর কত?”

কথাটা শুনে প্রণমি কেন জানি খুব লজ্জা পেলো। ইরফান বলে উঠলো,“বিয়েটা আমাদের নয়। বিয়েটা আমার ছোটো বোনের। সিটি হসপিটালে যেতে হবে। রেজিষ্ট্রার খাতা আর টুপিটা নিয়ে চলুন।”

হসপিটালে? হসপিটালে যেতে হবে বিয়ে পড়াতে? এইবার কাজী আফতাব উদ্দিন চেতে গিয়ে বললেন,“পারবো না, পারবো না আমি। তোমাদের বাড়ির একটা বিয়েও আর আমি পড়াবো না। যথেষ্ট করেছো তোমরা, যথেষ্ট। অনেক ধৈর্য্য ধরেছি আমি! আমাকে যদি এভাবে বিরক্ত করতে থাকো তবে কিন্তু আমি থানায় কম্প্লেইন করবো।”

ইরফান কাজীর রাগ দেখে বাঁকা হাসলো। পরপর বললো,“কোন থানায় কম্প্লেইন করবেন। চলুন বিয়েটা পড়ানো হয়ে গেলে আমি নিজে যাবো আপনাকে নিয়ে।”

কাজী হতাশ হয়ে প্রণমিকে দেখে বলে,“কি শুরু করেছো তোমরা? এক একটা জোর জবরদস্তির বিয়ে দিয়ে কি মজা পাচ্ছো?”

প্রণমি এইবার নড়েচড়ে উঠল,নিচু গলায় কাজীকে বললো,“না না দাদু। এটা কোনো জোর জবরদস্তির বিয়ে নয়। আসলে আমার ননদের দাদা শ্বশুরের ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন। তাই তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা হচ্ছে। আমার ননদ রাজি তো।”

আফতাব উদ্দিন প্রণমির কথা শুনে সামলে নিলেন নিজেকে,বললেন,“সবসময় আমিই কেনো?”

ইরফান দু কদম এগিয়ে গিয়ে বলে,“কারণ এটা আপনার শাস্তি।”

_শাস্তি?

_হ্যা। আমার বোনের বিয়েটা আমার পরিবারের অমতে দিয়েছেন। এরপর নিজেকে আর ওদের বাঁচাতে যে ভুলভাল যুক্তি দাঁড় করেছিলেন সেদিন, তার শাস্তি এটা কাজী নানা। আপনি জীবিত অবস্থায় আমাদের বাড়িতে যেকয়টা বিয়ে হবে, সব আপনাকেও
ই পড়াতে হবে।

বাচ্চাদের মতো মন খারাপের সুরে কাজী বলে উঠলো,“আর কয়জন বাকি আছে তোমাদের বাড়িতে?”

_বেশি না, এই প্রজন্মে আর একজন আছে। ইহান তাজওয়ার মির্জা। আর পরের প্রজন্মে আপনাকে জ্বালাবো না কারণ ততদিন আপনি লাস্টিং করবেন না।

মুখটা কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো কাজী আর কোনো কিছু না বলে। ইরফান বাড়ির ড্রাইভারকে কল করে বললো,“গাড়ি এসেছে? আচ্ছা কাজী সাহেবকে রেডি করিয়ে আনছি। দাঁড়ান।”

কল কেটে কাজীকে দেখলো ইরফান,বেশ শান্ত সুরেই বললো,“চুপচাপ রেডি হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসুন নানা। সোজা সিটি হসপিটাল যাবে গাড়ি। যদি মাঝপথে নেমেছেন তো, আমি কিন্তু বাইক নিয়ে আপনার পেছনে আছি।”

__________

উজ্জ্বল কেবিনের কাঁচ গলিয়ে দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে নিজাম মাহমুদের দিকে। সৃষ্টিকর্তার কৃপায়, অবস্থা খানিকটা স্থিতিশীল। হার্টে পড়াতে হবে রিং। বিয়েটা হয়ে গেলেই যত দ্রুত সম্ভব সার্জারি হবে। দু'জন স্পেশালিস্ট আসছে।

লাল বেনারসী গায়ে জড়িয়ে দূরে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বলকে দেখছে শেহা। বড়রা ওয়েটিং রুমের বিভিন্ন স্থানে শুকনো মুখে বসে আছে। ইনু প্রিতম এসে পৌঁছেছে। ঠিক রাত আড়াইটা নাগাদ কাজী আফতাব উদ্দিন এসে পৌঁছালেন হসপিটালে। তার পেছনে পেছনে ওয়েটিং রুমে ঢুকলো ইরফান-প্রণমি। রিতু ওদের দেখে অবাক, এগিয়ে গিয়ে মৃদু ধমক দিলো ইরফানকে,“ওকে আনলি কেনো? বারণ করলাম তো! বৃষ্টিতে তো ভিজে গিয়েছিস দু'জনে।”

বাইরে খুব বৃষ্টি। বাইকে থাকায় ইরফান প্রণো দু'জনেই ভিজে গিয়েছে। ইরফান জবাব না দিয়ে মায়ের আঁচল টেনে নিজের মাথাটা মুছে নেয়, পর পর আরো একটা কাজ করে ইরফান। রিতুর আঁচল দিয়ে প্রণমির মাথাটাও মুছিয়ে দেয়। রিতু ছেলেকে দেখতে থাকে। আর প্রণমি পাচ্ছে লজ্জা। লোকটা একটু বেশিই করে। যদি তার শাশুড়ি মাইন্ড করে এসব নিয়ে কথা শোনায়? প্রণমি কটু কথা, খোঁচা মেরে কথা শুনতেই পারেনা একদম,তার কষ্ট হয়।

রিতু চুপচাপ মিনিট খানেক ছেলে আর ছেলের বৌকে দেখে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে। মনে মনে একটা বিষয় তাকে প্রশান্তি দেয়। ছেলে দু'টো যুবক ইলহাম মির্জা হয়নি। হোক,যেমন হয় হোক, বৌয়ের পাগল হোক, বৌ পাগল হোক। অন্তত যুবক বয়সের ইলহাম মির্জা না হোক।

এরপর রিতু নিজেই আঁচল টেনে নিয়ে ইরফানকে সরিয়ে দিল,“ধূর ভালো করে মুছতেও পারিসনি। আর প্রণমিকে এটা কি জামা পরতে দিয়েছিস তুই? মুরব্বি আছে এখানে এতো। তোর কি বুদ্ধ শুদ্ধি নেই?”

ইরফান হাসতে হাসতে পাশে সরে দাঁড়ায়। রিতু প্রণমির মাথা মুছিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বললো,“এসেছো আর যা-ই করেছো। বিয়ে হয়ে গেলে তাড়াতাড়ি চলে যাবে ইরফানকে নিয়ে। ভিজে একাকার হয়েছো!”

কেবিনের দরজা হাট করে খুলে রাখা হয়েছে। একজন ডক্টরের থেকে পারমিশন নিয়ে উজ্জ্বল আর শেহা এসে সেই খুলে রাখা দরজার সামনে দু'টো চেয়ার পেতে বসলো। ওয়েটিং রুমের বড় সোফা টাতে কাজী বসেছে। ইনু গিয়ে টেনে দিলো শেহার ঘোমটা। শেহা অতকিছু খেয়াল করছিলো না। তার দৃষ্টি কেবিনের ভেতরে, বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জামে আবৃত বৃদ্ধ লোকটার দিকে। না কথা বলছে,না চোখের পাতা ফেলছে। ছলছল চোখে তাকিয়ে দেখছে শেহা আর উজ্জ্বলকে। শেহা ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে বসে থাকা লোকটাকেও দেখলো। সাদা ধবধবে পাঞ্জাবিটাতে মানিয়েছে বেশ।

কাজী বিয়ে পড়াতে শুরু করে। এবং সবাইকে স্বাক্ষী রেখে উজ্জ্বল মাহমুদ এবং শ্রাবন্তী শেহা, দু'জনেই মনে কোনো জড়তা না রেখে কবুল বলে। নিজাম মাহমুদ নাতীর বিয়ে দেখে দু'চোখ বন্ধ করে নেয়। ভেতরে ভেতরে স্বস্তির শ্বাস ফেলে চোখের পানি ছেড়ে দেয় নিশ্চুপ।

____________

রাত বাড়ছে। বাড়ছে সকলের উদ্বিগ্নতা। স্পেশালিস্ট এসে এখনো পৌঁছায়নি। উজ্জ্বল তার সদ্য হওয়া শ্বশুর বাড়ির লোকের আন্তরিকতায় আপ্লুত। অনুরোধ করে সবাইকে,সবাই যাতে বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নেয়। এভাবে কতক্ষণ হাসপাতালে থাকা যায়!

শুরুতে বড়রা কেউ মানেনি কথাটা। শুধুমাত্র ইরফান প্রণমি, ইনু প্রিতম আর ইহানকে পাঠিয়ে দিয়েছে বাড়িতে। কিন্তু শেষটায় উজ্জ্বলের অনুরোধের কাছে হার মানলো সবাই। এমনিতেও এটা ঠিক,এতজন মিলে এভাবে থাকাটা উচিত নয়। এটা দৃষ্টিকটু। অথরিটি বিরক্ত হয়, অন্যান্য ক্রিটিক্যাল যে পেশেন্ট গুলো আছে আশেপাশের কেবিনে,অনেক সময় তাঁদেরও সমস্যার কারণ হয়ে যেতে হয়। তাই সবাই বাড়ি যাওয়াটাই ঠিক ধরে নিলো, সকালে সার্জারি। তখন না হয় আসা যাবে।

এক কোণে,দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেহা। ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কারণ ঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না সে। সে টের পাচ্ছে তার সমস্ত শরীর অস্বাভাবিক মাত্রায় কাঁপছে। ঘোমটা খসে পরেছে সেদিকে তার খেয়াল নেই‌। দৃষ্টি অদূরে,কেবিনের দরজার সামনে ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার সারা গাঁয়ে নিবদ্ধ। ঐ লোকটা তার স্বামী। হ্যা “স্বামী” খুব ভারী একটা শব্দ শেহার কাছে। অন্তত মামীদের দেখে সেটাই শিখেছে ছোটো থেকে। ঐ রকম একটা ভারী সম্পর্কের দাবি নিয়ে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। শেহার এখন কি করা উচিৎ সে বুঝতে পারছে না। মামীদের জিজ্ঞেস করবে?

আলো আর রিতু মেয়েকে ওভাবে কাঁপতে দেখে এগিয়ে এলো।

“কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”

দু'পাশে মাথা নাড়ে শেহা। অতঃপর লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলে,“তোমরা চলে যাচ্ছো?”

_হ্যা।

_আমার কি এখানে,ওনার পাশে থাকা উচিত মামী?

প্রশ্নটি করে শেহা দুই মামীর মুখ দেখতে থাকে আগ্রহভরে। আলো হালকা গলায় বলল,“তোর মন কি বলছে?”

_উচিত।

_তবে উচিত। স্বামীর প্রতি যেটুকু কর্তব্য পালন করতে হয়, মন থেকে করতে হয়।

শেহা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর কিচ্ছুটি বললো না। বড়রা চলে গেলেও ওখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো দীর্ঘসময়। তারপর ওর হুঁশ ফিরল তখন, যখন ফজরের আজান হলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল লোকটা কোথাও নেই, লোকটা তার দাদুর কেবিনে। শেহা ধীর কদমে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে রইল, চেয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল করে।

নিজামের বৃদ্ধ ডান হাতটা আলতো করে ধরে রেখেছে উজ্জ্বল। সেই হাতটা,যে হাতটা উজ্জ্বলের মাথায় ছিলো এতদিন। নিজাম মাহমুদ কষ্ট করে একটু হাসার চেষ্টা করে এতক্ষণে বলে উঠলো,“কেমন দিলাম?”

অতি ক্ষীণ সে আওয়াজ। উজ্জ্বল আর সামলে রাখতে পারলো না নিজেকে। দাদুর হাতটা টেনে কপালে ঠেকিয়ে কেঁদে দিয়ে বললো,“জঘন্য দিয়েছো, অতি জঘন্য।”

নিমিষেই চ'ম'কে ওঠে শেহা। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে। সে কি ভুল দেখেছে? ঐ লোকটা কাঁদছে? পুরুষ লোকটা? এ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য শেহার চোখে। তার কখনোই ছিঁচকাদুনে পুরুষ মানুষ পছন্দ ছিলো না, পুরুষের শক্ত খোলসটাই বরাবর তাকে টানতো। যেমন ছিলো রাগী মির্জা। পুরুষের চোখের জল বিরক্তিকর ছিলো শেহার কাছে। আজ চোখের সামনে নিজের সদ্য হওয়া বরকে ওভাবে অবুঝ বাচ্চাদের মতো কাঁদতে দেখে শেহা হকচকাল। এই পুরুষের সাথে তার সংসার হতে চলেছে? তবে শেহা টের পেলো, তার মোটেও বিরক্ত লাগছে না পুরুষটাকে। বরং ভীষণ মায়া লাগছে। এমন মায়া,শেহার ইচ্ছে করছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে।

নিজাম মাহমুদ নিজের দুর্বল হাত সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। পুনরায় সেই ক্ষীণ স্বরে বললেন,“হাত ছাড় আমার,হাত ছাড়। এই হাতটা আর কত ধরে রাখবি? পেছনে যে দাঁড়িয়ে আছে,ঐ হাতটা ধরতো। ধরে দাড়া। আরে ছাড়না। এই হাতটা তোর মাথায় থাকতো, ঐ হাতটা তোর বুকে থাকবে। আর কাদিস না। থাম না গাধা। নতুন বৌ,দেখ কি সুন্দর লাগছে !”

________

তখনো বৃষ্টি থামেনি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভোর রাতে নিস্তব্ধ হাইওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা, বৃষ্টি গায়ে মেখেছে খুব ভালো করে। বারবার হাঁচি দিচ্ছে প্রণমি। হাঁচি দেওয়ার দরুন নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে হচ্ছে ইরফানের থেকে বারবার। ইরফান বাইকের গতি কমিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে বললো,“ধরে বসো। ছেড়ো না আমাকে।”

প্রণমি আবার ধরলো। ওর ঠোঁট প্রশ্বস্ত হয়েছে হাসিতে। বললো,“কখনো ছেড়ো না।”

_আমার ঠান্ডা লেগেছে, মা বকবে।

হাসলো ইরফান, টের পেলো প্রণমি ঠকঠক করে কাঁপছে, হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো,“শীত লাগছে? কনসেনট্রেশান শরীর থেকে সরিয়ে মস্তিস্ক ব্যস্ত রাখো।”

_কিভাবে?

_একটা গান করো।

অকস্মাৎ চমকে উঠল প্রণমি। মনে পরে গেলো সে বহুদিন হয় গান করে না। জড়তা ঠেকেছে গলায়। ইরফানের কন্ঠে চেপেছে অনুরোধ। বললো,“করো?”

বাইকের গতি আরো কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে ইরফান। ওরা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্যটা এমন যে,ওরা রাজা রানী। আর দুই ধারের উঁচু উঁচু এই বিল্ডিং গুলো কুর্নিশ করছে ওদের।

“চুপ কেনো? একটা গান। মাত্র একটা।”

প্রণমির চোখের কোণে জল চিকচিক করছে হঠাৎ। শক্ত করে দুহাতে পেঁচিয়ে ধরে লোকটাকে গেয়ে উঠল,

“আপ কি নাজরো নে সামঝা পেয়ার কে কাবিল মুঝে,
দিলকি ইয়ে ধারকান ঠ্যাহের যা, মিল গায়ি মাঞ্জিল মুঝে।”

আচমকা বাইক থামায় ইরফান। প্রণমি চমকে উঠে গান থামিয়ে বলে ওঠে,“কি?”

ইরফান কয়েক সেকেন্ড দেখলো ওকে। পরপর শান্ত স্বরে বললো,“বাড়িতে গিয়ে শুনবো। এখন গেয়ো না।”

ভিজে পুরে বাড়িতে ওরা সবার আগেই পৌঁছাল। দরজা খুলে দিল পরী। ঘরে ঢুকে প্রণমি তখন জামা পাল্টে নিতে ব্যস্ত হলো। কুর্তির পেছনে থাকা ফিতেটা খুলতে না পেরে সাহায্য চাইলো ইরফানের কাছে। ইরফান এগিয়ে গিয়ে সুন্দর ভাবে খুলে দিলো ফিতেটা। প্রণমি যখন নতুন একটা সুতি সালোয়ার স্যুট গায়ে জড়িয়ে বেড়োলো। ইরফান ওকে দেখতে লাগলো চুপচাপ, দু'হাতে ঘুরিয়ে ওকে দাঁড় করিয়ে ভীষণ নরম গলায় বললো,“এবার গাও। আসলে তখন আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।”

প্রণমি লজ্জা পেয়ে বলল,“এখন বাদ দিন। আমার শীত করছে না।”

ইরফান চোখ মুখ কঠিন করে দাঁড়িয়ে আছে, প্রণমি যেন বুঝতে পেলো ওর রাগ। দুই মিনিট চুপচাপ থেকে গেয়ে উঠল,“জি হামে মাঞ্জুর হে, আপ কা ইয়ে ফ্যায়সালা।”

ইরফান হাত ধরে বুকে টানলো মেয়েটাকে। প্রণমি গান থামিয়ে দিতে বললো,“এই লাইনটা আবার গাও?”

প্রণমি পুতুলের মতো মাথা দুলিয়ে গাইলো আবার। ইরফান কোলে তুলে নিলো মেয়েটাকে। বিছানার কাছে ধীরপায়ে এগিয়ে যেতে যেতে ঘন প্রশ্বাস ফেলে বললো,“আসলেই মঞ্জুর? আসলেই?”

লোকটার এই হুট হাট পাগলামিতে সবসময় নাক চোখ কোচকালেও প্রণমি এইবার ফুঁপিয়ে ওঠে। ইরফান বিরক্ত হয়ে বলে,“থামা যাবে না। গাইতে থাকো।”

প্রণমি তাই করতে লাগলো,অতি কোমল আদরে ভেসে যেতে যেতে খুব আবেগে গাইতে থাকলো,

“জি হামে মাঞ্জুর হে আপকা ইয়ে ফ্যায়সালা,
ক্যাহে রাহি হে হার নাজার,বান্দা পারবার শুকরিয়া,

দো জাহা কি আজ খুশিয়া হো গায়ি হাসিল মুঝে,
আপকি নাজরোনে সামঝা পেয়ার কি কাবিল মুঝে।”

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 115 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন