#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৬
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
গুনে গুনে ষাটটা দিন পেরিয়েছে শেহার বিয়ের। অবাক দৃষ্টিতে থ্রিডি সিস্টেম ক্যালেন্ডারের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকে ব্যস্ত হাতে নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে নেয় ব্যগে । দুই মাস পেড়িয়ে গেল! কোথা থেকে কি হয়ে গেল সে টেরই পেল না কিছু? হ্যা,তবে শুধু টের পেয়েছে লোকটার সাথে তার পরিচিতি বেরেছে। লোকটার পছন্দের রং সাদা জেনেছে, লোকটা তাকে কিছু উপহার দিয়েছে, সে লোকটাকে কিছু উপহার দিয়েছে। এইতো।
এই দুইমাসে মাসে সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষাটা শেষ করেছে ভীষণ ব্যস্ততায়। রাজশাহীতে সে চলে এসেছিল বিয়ের তিনদিন পরেই, নিজাম মাহমুদের সার্জারি হওয়ার পরে তার জ্ঞান ফেরা এবং একটা স্থিতিশীল অবস্থা নিশ্চিত করেই শেহা শহর ছেড়েছিল হুট করে দেওয়া এক্সাম রূটিনের চাপে। বিয়ের দুই মাসে উজ্জ্বল প্রতি সপ্তাহে এসে দেখা করেছে রাজশাহীতে শেহার সাথে। তবে রেস্তোরাঁর বাইরে কোথাও দু'জনের সাংসারিক জীবনের আলাপ পারার সুযোগ হয়নি। দু'জন দেয়নি দু'জনকে সে সুযোগ। শান্ত বহুবার অ্যাপার্টমেন্টে নিমন্ত্রণ করলেও উজ্জ্বল যায়নি সেখানে। তার ইচ্ছে অনুষ্ঠান করে বৌ তুলে নেওয়ার পরেই হোক সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে।
শেহা ব্যগ গোছাচ্ছে কারণ আজ সে রাজশাহী ছাড়বে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই দুইমাসে মাইগ্রেশন করেছে ঢাকায়। এটা বড়দের সিদ্ধান্তে হয়েছে। সামনের সপ্তাহে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। অতঃপর শেহা চলে যাবে তার স্বামীর বাড়িতে। উজ্জ্বলের অবশ্য আপত্তি ছিলো না শেহা একাডেমিক লাইফটা দূরে থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলে। তবে শেহার মামীরা কেউ মানলেন না, সবার কথা,“বিয়ের পরের নাজুক সময়টাতে যদি হাসবেন্ড ওয়াইফের মধ্যে দূরত্ব থাকে, এই দূরত্ব থেকে যায় বরাবর, আজীবন।”
কি জানি! শেহা বোঝে না ওসব। সে শুধু আগ্রহ পাচ্ছে লোকটাকে জানতে, তাই আগ্রহ পাচ্ছে লোকটার কাছে যেতে। ব্যাগেজ গুছিয়ে শেহা নিজেও তৈরি হয়ে নেয়। শান্ত যাবে না তার সাথে, বড় দাদান ব্যস্ত, ইরফান মির্জা আসুক শেহা চায়না। তাই সবাইকে জানিয়েছে একা একাই সে পৌঁছাবে ঢাকাতে। সে তো আর ছোটো নয়।
চুলে চিরুনি বসাতেই শেহার ফোন বেজে ওঠে। লোকটার সাথে তার সকালে খুব একটা কথা হয়না। হয় বিকেল আর রাতেই। আজ এতো সকালে উজ্জ্বলের কল পেয়ে শেহা অবাক হয়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশে ব্যস্ত গলা শোনা যায়,“তুমি কি উঠেছো?”
_হ্যা,আমি তো রেডি হচ্ছিলাম। কিন্তু কেন?
আমতা আমতা করছে উজ্জ্বল,যেন খুব সংকোচ তার,“তোমাদের অ্যাপার্টমেন্টের কলাপসিবল গেট বন্ধ। আমি ঢুকতে পারছি না, তোমার ব্যাগেজ গুলো কিভাবে নামাবে?”
হতবাক শেহা, বললো,“মানে? আপনি এসেছেন?”
_হ্যা।
_কেন?
বিস্ময়াভিভূত শেহা হা করে আছে প্রশ্নটি করে।
_কেন আবার? তোমাকে নিতে? আচ্ছা কেয়ার টেকারকে কল করে বলো গেট টা খুলে দিতে। আমি নামাবো ব্যাগেজ, আংকেলকে কষ্ট করতে হবে না।
ঘোর কাটছে না শেহার। এই লোক তাকে নিতে এসেছে? কিন্তু এমন তো কথা হয়নি। তবে কেন এসেছে? এটাও বুঝি স্বামীর দায়িত্ব? সত্যি বলতে অপরিচিত থেকে পরিচিত তারা হয়েছে অনেকটাই। তবে সেখানে স্বামী স্ত্রী সুলভ আন্তরিকতা খুব কমই থাকে,থাকে জড়তা। এই দুই মাসে যে কয়বার তারা সাক্ষাত করেছে লোকটা ড্রেস থেকে শুরু করে সবকিছু গিফট করেছে শেহাকে,ঐ যে স্বামীরা যেভাবে করে। তবে আজকের এই টুকু শেহার বিস্ময়, হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিলো। খুব ব্যস্ত লোক,এই ভোরে এসেছে তাকে নিতে?
শান্তর গলার শব্দ পেয়ে শেহার ঘোর কাটল। তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে শান্ত সদর দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,“আরে কি আশ্চর্য! ছেলেটা এমন একটা কাজ করে বসলো!”
গেট খুললে উজ্জ্বল ফ্ল্যাটে ঢুকলো। আজ অক্টোবরের এক তারিখ, অক্টোবরের প্রথম ভোরের,প্রথম সাদা শিউলির মত সতেজ লোকটাকে সাদা শার্টে দেখলো শেহা। একটু অস্বস্তি হলো তার, এই লোকটাকে যে কয়বার দেখে নিজেকে খুবই ছোট মনে হয় শেহার, সৌন্দর্যের দিক থেকে। পুরুষ মানুষের এতো সুন্দর হতে নেই।
উজ্জ্বল তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ, মেয়েটাকে প্রথম যেভাবে দেখেছে, দিনকে দিন পরীক্ষার টেনশনে একেবারে স্বাস্থ্য খারাপ করে ফেলেছে, কিচ্ছুটি আগের মতো নেই, তবে যেটা বরাবর থেকে গিয়েছে সেটা হলো মায়া আর মাসুম মাসুম ভাবটা। যেটা ঐ চশমার নিচের চোখ দুটোয় আছে।
শান্ত জামাইকে নিয়ে কি করবে না করবে দিশা খুঁজে পাচ্ছে না। বসতে বলে উত্তেজিত গলায় বলল,“এভাবে আসলে! এতো ভোরে কষ্ট করে কেন আসলে! আসলে তোমাকে বলা হয়নি বাবা, অনুষ্ঠান এখনো হয়নি, সবকিছু স্বাভাবিক হয়নি তাই.....”
উজ্জ্বলের শান্ত দৃষ্টি তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্র মেয়েটির মুখে, শ্বশুরকে বলল,“সবকিছু স্বাভাবিক হয়নি, বিয়েটা তো অস্বাভাবিক নয়। অনুষ্ঠান হোক বা না হোক,আশা যাওয়া হোক বা না হোক, বৌ তো আমার!”
চমকে উঠে চোখ তোলে শেহা, “বৌ” সম্বোধন টা তার লজ্জা বাড়িয়ে দিয়েছে। উজ্জ্বলের ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসির রেখা। চোখ নামিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে শ্বশুরের হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে কাপটা রাখে, তারপর শান্তকে আগে বসতে বলে নিজেও বসে।
“নিজাম কাকার কি অবস্থা?”
_জি ভালো।
_গত পরশু কথা হয়েছে আমার। সাবধানে রেখো। আর শেহা,ঢাকা পৌছেই আগে দাদুকে দেখা দিবি, ঠিক আছে?
শেহা চুপচাপ মাথা নাড়ায়। উজ্জ্বল ঘড়িতে সময় দেখে উঠলো। সকাল সাড়ে আটটার মেট্রো রেল ধরতে হবে। শেহাকে তাড়া দিয়ে শান্তর থেকে বিদায় নিয়ে ওর ব্যাগেজ নিয়ে নামলো নিচে। সংকোচে গুটিয়ে গিয়ে শেহা লোকটার পিছু পিছু নামলো।
মেট্রো স্টেশনে ভিড়ের মাঝে হাঁটছে দুজন টিকিট টা নিয়ে, উজ্জ্বল হালকা গলায় বলে যাচ্ছে,“গাড়ি নিয়ে আসার ইচ্ছে ছিলো। তবে ড্রাইভার ছুটিতে। নিজে ড্রাইভ করবো,সে শক্তি গাঁয়ে নেই, গত তিন রাত জেগে একটা কেস স্টাডি করে যাচ্ছি!”
_তবে আসতে গেলেনই বা কেন? দাদু জোর করেছে? আমি তো ছোটো নই!
নিশ্চুপ হাসে উজ্জ্বল, পর পর বলে,“তুমি ছোটো নও। তুমি আমার স্ত্রী। এবং দেশের পরিস্থিতি ঠিক নেই। আই কান্ট টেইক এনি রিস্ক!”
শেহা মোহিত হয় লোকটার কথাতে । কথাগুলো সাবলীল,তবে শেহা ভীষণ শিহরিত হয়। একটা অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে ঘিরে ফেলে চারদিক থেকে। উজ্জ্বলের পিছু পিছু ট্রেনে উঠে শেহা বসলো। উজ্জ্বল ওকে বসিয়ে রেখে বাইরে এসে কিছু স্ন্যাকস কিনে নিয়ে শেহার সামনে এক এক করে সব সাজিয়ে রাখে, এমনকি টিস্যু পেপারটাও।
শেহা চুপচাপ দেখতে থাকে মানুষটাকে। মানুষটার চোয়ালে গম্ভীরতা। এতো ভারিক্কি এক সুদর্শন লোক! শেহা শুনেছে বয়স্ক লোক বিয়ে করলে একজন দারুণ অভিভাবক পাওয়া যায়, তবে তার কাছ থেকে যত্ন পাওয়া গেলেও রোমান্টিকতা খুব একটা আশা করা যায়না। তবে এখন শেহার মনে একটা কথা ঘুরছে, রোমান্টিকতার থেকে পুরুষের যত্নমাখা এই গম্ভীরতাটুকু বেশ উপভোগ্য, বেশ আকর্ষণীয়।
ট্রেন চলতে শুরু করলে দুজন ছেলে এসে শেহার পাশে বসতে যায়। উজ্জ্বল ত্বরিৎ উঠে মাঝখানটাতে বসে শেহাকে আড়াল করে রাখে। শেহা চুপচাপ হাসে, দৃষ্টি ঘুরিয়ে সম্মুখের জানালা থেকে শরতের ফকফকা আকাশ দেখে।
__________
টেবিলে শুধুমাত্র ইরফান ছিল। সে নাস্তা করছে। রিতু আর আলো রান্নাঘরে। প্রণমি রান্নাঘরের সম্মুখেই একটা লোয়ার কেবিনেটের ওপর বসে আছে চুপচাপ। সামিন এসে বসলো ডাইনিংয়ে, তার শান্ত দৃষ্টি ইরফানকে দেখছে।
আজ এখানে একটা ছোটোখাটো ঝামেলা বাঁধবে আলো জানে। তাই সে সরছে না চাচা-ভাইপোর মাঝখান থেকে। প্রণমিকে বললো,“ওপরে গিয়ে বিশ্রাম করো, ইশির শরীর ভালো নেই। ওর সাথে গিয়ে গল্প করো।”
_একটু পরে যাই বড় মা?
_কেন?
কয় সেকেন্ড চুপ থেকে মিনমিনে স্বরে প্রণমি বললো,“উনি অফিসে চলে গেলে যাবো।”
আলো দেখতে থাকে মেয়েটাকে। দিন দিন বড্ড মায়া মায়া হয়ে ধরা দিচ্ছে মেয়েটা এই সংসারে, তাদের ছেলের জীবনে। বহুলাংশে না হলেও ইরফান অনেকটাই গৃহস্থী,গোছালো আর শান্ত হয়েছে এই মেয়েটির আগমনে।
খাওয়া শেষ করতেই ইরফান বড় বাবার মুখের দিকে তাকায়। সে জানে না সে কি করেছে, তাই ভ্রু উচায়। সামিন বললো,“এসব কি শুনছি?”
_কি শুনছো?
_তোমার নামে সবসময় কমপ্লেইন আসছে, কর্মচারীদের সাথে তোমার আচরণ ঠিক নয়। আর কত ইরফান? অফিসটা এখন থেকে পুরোপুরি তোমাকে সামলাতে হবে, তুমি যদি কর্মচারীদের সাথে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না গড়তে পারো..... তোমার বাবা কিন্তু অনেক দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন, প্লিজ তার মতো হও। কর্মচারীদের সাথে ফ্রি হও, এতো টা কঠোর.....”
পানি খেলো ইরফান, বললো,“সে কি কথা বড় বাবা! আমি কঠোর? আমি তো গতকালও একজনের চাকরি বাঁচাতে হেল্প করলাম....!”
_কি করে?
_কি করে আবার! মুখের গালি নিয়ন্ত্রণ করে।
গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল ইরফান। সামিন থমথমে মুখে বসে আছে। প্রণমি আর আলো হেসে ফেলে,তবে শব্দ না করে। রিতু এসে ছেলের বৌকে বলে,“এতো হাসি পাচ্ছে? তোমাকে আনা হয়েছে ওকে শোধরাতে, উল্টো তুমি ওর মতো হয়ো না।”
প্রণমি মুখ চেপে ধরে। সামিন ছেলেকে কিছু বলতে যাবে ইরফান ব্লেজার হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়,বলে,“কঠোর নই, মাসে মাসে দেড় দুই লাখ টাকা চুরি হয় তাই একটু রাগারাগী করি সবাইকে। একটু বকি! তুমি আরাম করো।”
রাগ নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকে সামিন। ইরফান টিফিন বক্স নিয়ে বেড়িয়ে যায়।
আজ শেহা আসবে, উজ্জ্বল দুপুরে খাবে। রান্নাঘরে প্রচুর কাজ। সামিন অফিসের থেকে মনযোগ সরিয়ে মনযোগ দেয় বাজারের লিস্টে। আগে এসব গৃহস্থালি ব্যাপার-স্যাপারে আগ্রহ পেতনা সামিন। আশ্চর্যের বিষয়,এখন পাচ্ছে। এখন তার বাজারের লিস্ট করতে ভালো লাগে, ছেলেমেয়েদের জন্য চিন্তা বাদ দিয়ে ওদের বাচ্চা কাচ্চা কেমন দেখতে হবে,সেসব ভাবতে ভালো লাগে।
_________
আজ দেড়মাস পরেই, হ্যা ঠিক দেড়মাস পরেই মুখোমুখি হলো ওরা। শেষ দেখা হয়েছিল হসপিটালে,নিজাম মাহমুদের অসুস্থতায়। পারিবারিক ভাবে দেখা। এরপর দুই মাসের দালান ভাড়া প্রেরণা তার অ্যাসিস্ট্যান্টের মাধ্যমে পাঠিয়েছে। বহুবার, বহুবার ঐ ভদ্রমহিলা তার আচরণে বুঝিয়েছে সে কতটা নির্বোধ, বহুবার রাগিয়ে দিয়েছে ইহান তাজওয়ার মির্জাকে।
লুকিয়ে পালিয়ে কোনো সত্যি থেকে বাঁচা যায়? লুকিয়ে পালিয়ে কারো প্রেমময় আমন্ত্রণ থেকে বাঁচা যায়? নিজেকে বাঁচানো যায়? নির্বোধ ভদ্রমহিলা বুঝতে চান না! সেজন্য মানসিক দৃঢ়তা থাকলেই যথেষ্ট! তা যদি না-ই থাকে তবে এতো লুকোচুরি কেন? মনকে স্বাধীনতা না দিয়ে মনের গলা চেপে ধরলেই সব হয়ে যাবে?
আজ অক্টোবরের এক তারিখ, হ্যা, আপন সকাল সকাল কোথা থেকে জানি এক ঝুড়ি শিউলি এনে ক্লাবে রেখেছে। শুভ্র পাপড়ি আর গাঢ় কমলা বোটা। কাকতালীয় ভাবে ভদ্রমহিলা আজকে অক্টোবরের প্রথম শিউলি হয়েছে । ধবধবে সাদা শাড়ি আর গাঢ় কমলা রঙের ব্লাউজ। এবং,তাকে শিউলি ফুলের মতোই মোহনীয় লাগছে,সতেজ লাগছে।
ইহান গেটে ঢুকতে গিয়েও ঢুকলো না, মনে হলো তার পা দু'টো কেউ আঁটকে রেখেছে, অদৃশ্য কেউ বলছে,“দেখতে থাক মন ভরে। এটুকু দেখলে খুব বড়সড় অপরাধ তুই করবি না।”
প্রেরণার মুখের সতেজতা ততক্ষন বজায় ছিল যতক্ষণ যতক্ষণ সে ইহানকে দেখেনি। লোকটাকে দেখেই থামলো তার পা, অদ্ভুত ঝাঁকুনি দিল ফিনফিনে শরীরটা। জানতো এভাবে পারা যাবে না এড়িয়ে থাকতে, এটা কি সম্ভব?
বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নেয় প্রেরণা। সেদিন হঠকারী হয়ে লোকটাকে ব্লক করেছে সে, প্রেরণা নিজেও জানে ইহান তাজওয়ার মির্জা বুদ্ধিমান মানুষ, এই বাচ্চামোর মানে পড়ে নেবে, এবং হয়তো খুব বেশিই ভেবে নেবে যে প্রেরণা নিজের মন নিয়ে দৃঢ় নয়।
এখন? এখন কি করবে সে? লোকটা ইনুর দাদান,প্রণোর ভাসুর। প্রেরণার নিজের কাছেই তার যায়গাটা খুব সম্মানের, কেনো পারেনা প্রেরণা রেগে যেতে?
ইহানের কঠিন চোয়াল দেখে আরো আড়ষ্ট হয় প্রেরণা। এগিয়ে গিয়ে সালাম দেয়।
ইহান চুপচাপ সালামের জবাব দিয়ে চলে যায়। ভদ্রমহিলার কাঁপুনি তার নজর এড়ায়নি। যেতে যেতে দুর্বোধ্য হাসে ইহান, ঠোঁটে ঈষৎ হাসির রেখা, অস্ফুটে বললো,“নির্বোধ নীলিমা।”
প্রেরণা দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয়। এটা কি হলো? লোকটা তাকে দেখলে আটকে রাখার ফন্দি খুজে বেড়াতো,আজ এভাবে ইগনোর করলো? খুব বেশিই মানে লেগেছে নাকি ব্লক করাতে? হঠাৎ কেন জানি খুব হাসি পেল প্রেরণার, ইহানকে তার এই মুহূর্তে একটা আঠারোর ইগোওয়ালা তরুণ ছেলেটিই মনে হচ্ছে। হাসতে হাসতে প্রেরণা এসব ভাবে, আবার ভাবতে ভাবতে মুখটা ফ্যাকাশে হয়।
___________
“লীলাবালি,লীলাবালি, বর অযুবতী সইগো, কি দিয়া সাজাইমু তোরে.....”
_প্রণমি,ইরফান এসেছে, হয়তো তোমাকে খুঁজছে, ঘরে যাও।
শাশুড়ির ডাকে উঠে দাঁড়ায় প্রণমি। এইমাত্র ইশির ঘরে আড্ডা দিচ্ছিলো গানে গানে ইশি আর শেহার সাথে। এর মাঝে আসতে হলো লোকটাকে? আর আসলেও খুঁজতে হবে কেন এতো? প্রণমি তো কোনো কাজ করেই না। লোকটা বাড়িতে থাকলে সবসময় দরজা বন্ধ করে প্রণমিকে সামনে বসিয়ে রেখে চোখ দুটোকে উটপাখির ডিমের সাইজের মতো বানিয়ে দেখে কি আনন্দ পায় কে জানে! এতো সুখ সুখ বিরক্তিটাকে প্রণমি লুকায় না, হাঁফ ছাড়তেই ইশি কপাল কুঁচকে বললো,“এমন ভাব করছো ইরফান খুব জ্বালায় তোমাকে! সে আমরা বুঝি!”
_বুঝেছো বুঝেই থাকো।
কপট রাগ দেখিয়ে প্রণমি চলে যায়, শেহার ফোন বেজে উঠতে শেহাও উজ্জ্বলের সাথে কথা বলতে একপাশে চলে যায়। চারদিন পরেই তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান।
ইশি ওকে ওর মতো ছেড়ে দিয়ে ইকরি-মিকরিকে নিয়ে ঘর থেকে বেড়োয়। ইকরি মিকরি মিঠির দু'টো ছানা। বয়স আড়াই মাস। ভারি গোলুমলু হয়েছে। এই দুটোকে শুদ্ধকে দিয়ে দেওয়ার প্রমিস করেছিলো ইশি। যখন জন্মেছিল তখন দিতে চাইলেও প্রেরণা নেয়নি,বলেছে,“একটু বড় করে দাও। আসলে খুব ছোট তো। আমি সারাদিন বাড়িতে থাকি না, শুদ্ধ টেইক কেয়ার করতে গিয়ে যদি ক্ষতি করে দেয় এত ছোটো বাচ্চার?”
ইশিও তাই দেয়নি, তবে ওরা এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। শুনেছে শুদ্ধ সাতদিন ধরে “ঘ্যানঘ্যান” করছে ইকরি মিকরির জন্য।
দোতলার লিভিং রুমে বাড়ির প্রত্যেকে ছিলো। এখন অলস বিকাল। ইহান ভাতঘুম দিয়ে ফ্রেশ হয়ে কোথাও যাবে বলে বেরুচ্ছিলো ঠিক তখনই আলো ডেকে উঠল ব্যগ্র কন্ঠে,“বেরুচ্ছিস? আচ্ছা কার্ড দুটো নিয়ে যা।”
_কিসের কার্ড?
_শেহার অনুষ্ঠানের। একটা খন্দকার আঙ্কেলকে দিবি, আরেকটা দিবি প্রেরণাদের। আর মিষ্টি নিয়ে যাস।
ইহান বলল,“ইনুর বাড়িতে যাবো?”
_হ্যা। অসুবিধা কি! বাড়িতে গিয়েই তো কার্ড দিবি।
রিতুর মন খচখচ করে উঠলো শুনে, বললো,“ওর যেতে হবে কেন? ইরফান গিয়ে দিয়ে আসবে, শ্বশুর বাড়ি ওর!”
আলো বিরক্ত হলো,
_কি আশ্চর্য কথা! আজই দিতে হবে। ইহান গেলে অসুবিধা কি?
ইহান একপলক মায়ের মুখ দেখছে, একপলক দেখছে বড় মায়ের মুখ। এর মাঝে ইশি এলো। প্রেগন্যান্সির পাঁচ মাস চলছে, পেটটা অস্বাভাবিক রকমের বড়, কারণ ভেতরে যে একজন নেই, আছে দু'জন। মুঈন ফরাজীর দ্বিগুণ খুশি। বাবা চাচা আর ভাইদের সামনে পেট নিয়ে খুব একটা আসেনা ইশি। বড় একটা সুতির ওড়নায় ঢেকে ইকরি মিকরিকে নিয়ে এগিয়ে এসে ইহানকে বললো,“ও বাড়ি গেলে ইকরি মিকরিকে নিয়ে যাও দাদান। শুদ্ধ জেদ করছে নাকি ওর মায়ের সাথে।”
বলেই ইশি আড়চোখে রিতুকে দেখে নিলো। মেজো মা মনে মনে তাকে চিবিয়ে খাবে ইহানকে এমন সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তা তো নিশ্চিত।
অকস্মাৎ কপালের রেখা বিলীন হয় ইহানের। শুদ্ধ! হ্যা,ছেলেটাকে বহুদিন দেখে না সে। শেষ দেখেছিলো পনেরো দিন আগে। একটা কাজে ওদের স্কুলের আশেপাশে গিয়েছিল, তখন এক ঝলক দেখেছিলো।
ইহান আর কিছু শুনলো না,বুঝলো না। ইকরি মিকরিকে রাখা বাকেটটা,ওদের প্রেসক্রিপশন,ওদের ডায়েটবুক এবং অনুষ্ঠানের কার্ড দু'টো নিয়ে বেরিয়ে যায় সে।
__________
প্রেরণা দরজা থেকে নড়ে না। এটা খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার। ইহান হাঁফ ছেড়ে বলেই বসে,“বেগার নই যে দরজা থেকে তাড়াতে পারবেন! আই হ্যাভ টু কাম ইনসাইড।”
বহুদিন,আজ বহুদিন পরে ঐ লোকের ঠান্ডা তবে হাস্কি স্বর শুনলো প্রেরণা। হুশ খুইয়ে দাঁড়িয়ে ছিল প্রেরণা, চুপচাপ সরে গেল একপাশে। বাড়িতে ইনু, প্রিতম, মিস জেনি কেউই নেই। এই লোকটার টাইমিং খারাপ নাকি তার কপাল? ইহান ঘরে ঢুকতেই শুদ্ধ এলো ছুটে। মাম্মার ফোনে গেমস খেলছিল সে। আচমকা ইহান আঙ্কেলকে আর তার হাতে ইকরি মিকরিকে দেখে অতি আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠলো বাচ্চা ছেলেটা। প্রেরণার কানে বাজতে থাকলো ছেলের উল্লাস।
ইহান শুদ্ধকে কোলে নিয়ে গুছিয়ে বসলো সোফাতে, প্রেরণাকে গম্ভীর কন্ঠে বলল,“ইনভিটিশন কার্ড নিয়ে এলাম, আর মিষ্টি। আগামী ছয় তারিখ যাবেন।”
প্রেরণা ওসব কিছু শুনছিলোই না, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে প্রাণবন্ত শুদ্ধকে। লোকটার আগমনে খিটখিটেপনা নাই হয়ে গিয়েছে। এতক্ষণ ভারি জ্বালিয়েছে প্রেরণাকে।
“রাদিফের তো জেল হয়েছে, শুনেছি এই অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়তে চাইছেন, কাস্টমার পাচ্ছেন না। আমার কাছে আছে কাস্টমার। আমার নববিবাহিত বন্ধু আর ওর স্ত্রী। ওরা এই এরিয়ায় অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজছে। আপনার ওদের নাম্বার লাগলে ইনুকে বলবেন আমাকে কল দিতে।”
প্রেরণা তখনো কোন জবাব দেয় না। প্রেরণার অন্যমনস্কতা ভাঙে ইহানের ডাকে,“আই থিংক আই শ্যুড গো। অ্যান্ড প্লিজ ডোন্ট ফিল হেজিটেট, আমরা সোস্যাইটির লোক, সামনা সামনি ব্লক দেয়া যাবে না।”
দারুণ লজ্জা পেয়ে চোখ নামালো প্রেরণা, মুখটা ফ্যাকাশে করে বললো,“চা খাবেন?”
শুদ্ধ উঠে ইহান আঙ্কেলের হাত টেনে ধরলো, বললো,“মাম্মা পেস্ট্রি বানিয়েছে আঙ্কেল। তুমি খাবে?”
হাসলো সামান্য ইহান,শুদ্ধর গাল টেনে দিয়ে বললো,“যে বানিয়েছে, সে না দিলে তো খাওয়া যাবে না।”
সংকোচে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে প্রেরণা কাঁপা স্বরে বলল,“আপনি বসুন! আনছি। প্লিজ সিট।”
ইহান কি মনে করে বসে পরলো। তার লোভী মন চাইছে না এখান থেকে উঠতে, একটুও চাইছে না। বসে পায়ের ওপর পা তুলে পা নাচাচ্ছে। শুদ্ধ সরু চোখে ইহানকে দেখে বললো,“এভাবে পা নাচিও না আঙ্কেল। এটা ব্যাড ম্যানার্স, মাম্মা বকবে।”
ইহান হেসে পা নামিয়ে নেয়, দুষ্টুমি করে বলে,“তাই নাকি। তাহলে তো নামাতেই হয়। আমার একটুও ইচ্ছে নেই তোমার মাম্মার বকা খাওয়ার!”
প্রেরণা রান্নাঘরে ঢুকেছে। ইকরি মিকরিকে সুন্দর মতন আরাম করতে দিয়ে শুদ্ধ ইহান আঙ্কেলের ঠিক পাশেই বসে মাম্মার ফোনটা হাতে নিলো, একটা গেমস সে অসম্পূর্ণ রেখেছিল, ওটা খেলবে।
ফোনটা গরম হয়ে প্রায় অকেজো হয়েছে। স্ক্রিনে আঙ্গুল চালালে কাজ করছে দেরীতে। অধৈর্য শুদ্ধ দ্রুত আঙুল চালায়, এলোপাথাড়ি। ওর এলোপাথাড়ি ছোঁয়ায় হঠাৎ ফোটো গ্যালারি সামনে আসে। আর সেখানে একটা ছবি। ইহান এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুদ্ধর কাজ কারবার দেখছিলো। আচমকাই তার দৃষ্টি একেবারে স্থির হয়ে যায় ফোনের স্ক্রিনে। এবং আচমকাই শুদ্ধর হাত থেকে থাবা মেরে নিলো ফোনটা। শুদ্ধ কেঁপে উঠলো।
ইহান চোখ বড় বড় করে ছবিটা কিছুক্ষণ দেখলো, শ্বাস ফেলল বড় বড়। অতঃপর শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে,“এই লোকটাকে চেনো তুমি?”
শুদ্ধ উপর নিচে মাথা ঝাঁকায়। হাঁসফাঁস করে ওঠে ইহান, ঢোক গিলে নিয়ে বলে,“কে?”
_পাপা।
চলমান........