ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 117

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৭
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

রান্নাঘরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল যদিও, প্রেরণার মনোযোগ ছিলো এদিকটাতে, ইহান আর শুদ্ধর কথোপকথনে হঠাৎ যখন তার মস্তিষ্ক ধাক্কা খেল, হাতের পেস্ট্রিসহ বাটিটা কিচেন কেবিনেটে রেখেই দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগলো ইহানকে,দেখতে লাগলো ইহানের হাতের ফোনটা, ইহান বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে প্রেরণার মুখের দিকে। প্রেরণা সংকোচের সহিত এগিয়ে এসে নিজের ফোনটা নিয়ে নেয়।

নিস্তব্ধতা কাটছেই না, নীরবতা খুব ভারি ঠেকছে দু'জনের মাঝে। ইহান আচমকা বড় বড় শ্বাস ফেলে শুদ্ধর মুখের দিকে তাকায়। তার মাথা কাজ করছে না, কম্পমান এক হাতে শুদ্ধকে টেনে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে চোখে চোখ রেখে দরাজ গলায় বলল,“তোমার পাপার নাম কি?”

_মোঃ শাওকাত ওয়াসীত শরীফ।

ঠোঁট নেড়ে আদো আদো স্বরে শুদ্ধ জবাব দিতেই ইহান তার হতবাক দৃষ্টি ফেলে প্রেরণার মুখবিবরে। প্রেরণা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে দেখছে আচমকা অদ্ভুত আচরণ করে ওঠা লোকটাকে।

বুকের মাঝে কেউ হাতুড়ি পেটা করছে,ইহান হঠাৎ টের পেতেই শুদ্ধকে মিশিয়ে নেয় নিজের সাথে। হৃদস্পন্দন যেন থমকে গিয়েছে ওর, পোড় খাওয়া শরীরটা কাঁপছে মৃদু।

প্রেরণা অস্ফুটে বললো,“কি হচ্ছে?”

ইহান ওর কথার জবাব না দিয়ে শুদ্ধকে দেখতে থাকে বিস্মিত আর আবেশিত দৃষ্টিতে, ছোঁয় শুদ্ধর গাল, ছুঁয়ে দেয় শুদ্ধর চোখের পাতা। শুদ্ধর খাড়া নাক।

আরে আরে! কি আশ্চর্য! এতো মিল? হ্যা তাইতো! ওয়াসীত স্যার ছোটো হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে যেন! ছোটো ওয়াসীত স্যার!

_ইহান আপনি ঠিক আছেন? আপনার কি হয়েছে?

প্রেরণার উৎকণ্ঠায় জর্জরিত প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ইহান শুদ্ধকে আরেকটু মিশিয়ে নিয়ে পাগলের মতো চুমু খায় শুদ্ধর দুই গালে, শক্ত দু'টো হাত কাঁপছে, ওই হাতেই শুদ্ধর গাল চেপে ধরে কপালে কপাল ঠেকিয়ে কাঁপা গলায় বলে,“তুমি জুনিয়র ওয়াসীত শরীফ?”

শুদ্ধ ইহান আঙ্কেলকে ঠিক বুঝতে পারছে না,ওর বিস্মিত চোখজোড়া মাকে দেখে। প্রেরণা এগিয়ে যেতেই ইহান চোখ তুলে তাকায়। হঠাৎ করে পাল্টে গিয়েছে ইহানের চোখের রং,এর কারণ জানে না প্রেরণা। ইহান ঢোক গেলে, নিজেকে সংযত করে বলে ওঠে,“ইন টুয়েন্টি ফোর্টি ফোর, তিব্বত শান্তিরক্ষা মিশনে আমি ছিলাম, আমি ছিলাম ওয়াসীত স্যারের সাথে।”

হঠাৎ করেই কেমন মুখটা বোকা বোকা হয়ে যায় প্রেরণার। ইহান দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়, নিজের ছটফটানি দমিয়ে রেখে বিস্ফোরিত চোখে প্রেরণার পা থেকে মাথা দেখে। হঠাৎ তার কানে বাজে একজন লোকের কন্ঠস্বর,সে বলছে,“জানো তাজওয়ার। আমি এই মিশনটা শেষ করে অবসরে যাবো।”

_কেন স্যার? সাইত্রিশেই আপনার দেশ সেবা শেষ?

হেসেছিল সে, বলেছিলো,“ডোন্ট টেইক দিস সিরিয়াসলি! আসলে মনটা বারবার ছোটো হয়ে যায় বুঝলে, তোমার ম্যাম, খুব স্ট্রাগল করেছে জীবনে। এক দেখায় ভালোলাগা,ভালোবাসাতে তাকে নিজের করেছি, কিন্তু কোথাও না কোথাও আমার মনে হয় তার সঠিক মর্যাদা আমি দিতে পারিনা, এই এতদূরে থাকি, বছরে ক'টা দিন পায়? তার স্ট্রাগল আর শেষ হয়না। ছোটো বেলা থেকে করেছে, এখনও করছে আর ভবিষ্যতেও করতে হবে হয়তো, আসলে নিজের খেয়াল খুশিতে অমন একটা অসহায় মেয়েকে জীবনে জড়ানোটাই ভুল হয়েছে, তার অসহায়ত্ব আর কমাতে পারিনি আমি.....”

_ইটস ওকে স্যার, আমি নিশ্চিত ম্যাম আপনাকে নিয়ে গর্ব করে, আপনি কোনো গ্লানি রাখবেন না। আর এই মিশন শেষে আপনার উচিৎ হবে ম্যামকে বছরখানেক সময় দেওয়া, বেশ লম্বা সময় ধরে ভুগিয়েছেন এইবার। ম্যামের আসলেই খুব ধৈর্য্য।
.
.
.
দু'জন দু'জনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ইহান সেই দৃষ্টি নামায় মেঝেতে, কানের কাছে আবারও কেউ হৈহৈ করে বলে উঠলো,“তোমার ম্যামের নাম নীলিমা। এই নামটা আমি দিয়েছি। এবং এটাই নাম তার।”
.
.
“কি বললেন?”

প্রেরণা প্রশ্নটি করে ওঠে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। ইহান লম্বা শ্বাস ফেলে চুপচাপ বসে শুদ্ধকে কোলে টেনে নেয়। আবারো দুই গালে চুমু খেয়ে ক্ষীণ আওয়াজে বলতে থাকে,“তুমি ওয়াসীত শরীফের অংশ! আরে বাচ্চাটা। আরে বাচ্চাটা! আরে বাচ্চাটা।”

কথা জড়িয়ে যাচ্ছে ইহানের। প্রেরণা এমনিতে খুবই শক্ত গোছের মেয়ে, হুট হাট ওয়াসীতের কথা মনে পরলে সে ভাঙে না, তবে আজ ব্যতিক্রম। সম্পূর্ণ একটা কাকতালীয় ঘটনার স্বীকার তারা দুজন। অবাক বিস্ময়ে সামনের মানুষটাকে দেখে কান্না মিশ্রিত গলায় বলে ওঠে,“কোন ক্যান্টনমেন্ট?”

_কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টেই ছিলাম, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ তাজওয়ার মির্জা।

এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে প্রেরণা। আর ইহান নিমেষ হীন ভঙ্গিতে দেখছে ভদ্রমহিলাকে, ইহান শুধু দেখছেই, সে হাসতে পারছে না নিজের দুর্ভাগ্যের ওপর। এভাবে হোঁচট খাওয়ার কথা ছিলো তার? এভাবে? এতটা নির্মম ভাবে?

দু'হাতে মুখ ঢেকে প্রেরণা আবার হাত দু'টো সরায়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নেয়। ইহান শক্ত হাতে শুদ্ধকে জড়িয়ে রেখেই প্রেরণাকে বলে ওঠে,“রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নিতে আসেননি কেন? তাহলে ছবি অন্তত থাকতো, আমি চিনতাম।”

চোখ বেয়ে ফোটায় ফোটায় পানি ঝরছে প্রেরণার, বললো,“আমার চাচা শ্বশুরেরা আর চাচাতো দেবরেরা গিয়েছিলো। শুদ্ধ তেরো দিনের বাচ্চা ছেলে ছিল, আমি অচেতন ছিলাম দিনের পর দিন।”

ইহানের দৃষ্টি যেন নামতেই চায়না সমুদ্রনীলার ভেজা দু'চোখ থেকে। এই সেই, তার স্যারের একান্ত নীলিমা। ওয়াসীত স্যার কি ভীষণ জেলাস ছিলেন তার স্ত্রীর ব্যাপারে। জনসম্মুখে নামটা অবধি উচ্চারণ করতেন না, বলতেন,“আমার বৌয়ের নামটাই জীবনীশক্তিতে ভরপুর জানো! ওর নামটা বারবার যখন আমি উচ্চারণ করি, নিজে ভীষণ প্রেরণা খুজে পাই লাইফে।”

জুনিয়ররা এটা নিয়ে ভীষণ দুষ্টুমি করতো মেজর ওয়াসীত শরীফের পিঠে পিছে। আজ ইহান টের পাচ্ছে ওয়াসীত শরীফ তার স্ত্রীকে নিয়ে কেন এতো জেলাস থাকতেন।

মাথা কাজ করছে না ইহানের, এক হাতে চুল টানছে, বারবার ঢোক গিলছে।

হাঁপাতে হাঁপাতে প্রেরণা বলে উঠলো,“ওই শেষ তিনদিন। আমার সাথে যে যোগাযোগ বন্ধ করেছিল লোকটা, ঐ তিনদিন আপনি ছিলেন সাথে তাইনা?”

উপর নিচে মাথা ঝাঁকায় ইহান,বলে ওঠে,“সবসময়! সবসময়। আমরা ঐ মিশনে টেন্টমেট ছিলাম।”

এইবার ডুকরে কেঁদে ওঠে প্রেরণা, চেঁচিয়ে ওঠে,“উনি কি ওনার ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন? ওনাকে না আমি নাম ঠিক করে জানাইনি। উনি কি খুব দেখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন? আচ্ছা ওনার কোথায় কোথায় লেগেছিল? শুনেছি একটা হাত নাকি ছিলো না!”

বলতে বলতে মেঝেতে হাতপা ছড়িয়ে বসে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে প্রেরণা। ইহানের চোখ দুটো ঝাঁপসা হয়ে আসে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় । দু'হাতে মুখ চেপে ধরে শ্বাস নিয়ে বলে ওঠে,“উনি । আপনার কথা বেশি বলেছিলেন। বলেছিলেন, ছেলের জন্য বাঁচতে, ওর মাঝেই সে আছে।”

থামছে না প্রেরণা, চেঁচাচ্ছে,“ঐ লোকটা। ঐ লোকটা বেশি হিরোইজম দেখাতে গিয়েছিলেন তাইনা? স্বার্থপরের মতো আমাদের কথা ভাবেননি! তাইনা বলুন।”

শান্ত হতে পারছে না প্রেরণা, ইহান বুকের সাথে চেপেই ধরে থাকে শুদ্ধকে। শুদ্ধ ভয় পাচ্ছে দেখে ওকে ফোনটা দিয়ে প্রিতমদের রুমে পাঠিয়ে দিয়ে চুপচাপ এসে মেঝেতেই বসে ঠিক প্রেরণার পাশে। হাত বাড়িয়ে পারছে না সে প্রেরণার চোখের পানি মুছতে, হাতটা আটকে দিচ্ছে কারো বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর,“তাজওয়ার এই মিশন শেষ করে তোমার ম্যামকে নিয়ে আমি ট্যুরে যাবো মালদ্বীপে, আমার ছেলেটার পৃথিবীতে আসার অপেক্ষায় আছি।”

ইহান অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। চোখের সামনে সেই অন্ধকার তিনদিন ভেসে ওঠে, ঝাপসা থেকে গাঢ় হয়, ততটাই যন্ত্রণাদায়ক হয় সেই দৃশ্য।
.
.
.
২০৪৪,২২শে এপ্রিল, তারিখ টাকে মার্ক করে ইহান বেরিয়ে যায় টেন্ট থেকে । যুদ্ধবিরতির চব্বিশ ঘন্টায় শুধুমাত্র ঘন্টা তিনেক ঘুমিয়ে শরীরটাকে স্বান্তনা দিয়েছে শুধুমাত্র। আজকের রাতটা জোৎস্না। এই এতো উৎকণ্ঠার মাঝেও বাইরে জোৎস্না স্নান করছে একঝাঁক
সৈন্যদল। বাংলাদেশ ও নেপাল সেনাবাহিনী থেকে ওরা। পরিকল্পনা করছে পরবর্তী অ্যাটাকের।
ওপাশ থেকে প্রস্তুত চীনা সৈনিক,যারা তিব্বতের দখলদারিত্ব পেতে মরিয়া।
ইহান কিছুক্ষণ বাইরে পায়চারী করে আড্ডায় অংশ না নিয়ে ঢুকলো টেন্টে,ঢুকেই স্যালুট ঠুকলো। ঘুরে দাঁড়াল মেজর শাওকাত ওয়াসীত শরীফ। শক্ত ও দৃঢ় চোয়ালের এক আভিজাত্য শীল পুরুষের অহংকার যার নাকের ডগায়। স্মিত হেসে জবাব দেয়,“তাজওয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা সবাই সৈনিক। অস্ত্র আমি আর তুমি দু'জনে তুলি সমান ভাবে, কেউ বেশি কেউ কম নয়।”

ইহান হালকা হেসে ভেতরে ঢুকলো, বললো,“স্যার ম্যামের সাথে যোগাযোগ করতে হবে? নেটওয়ার্ক কানেকশন পুরোটা অফ করে রাখা। আপনি অর্ডার দিন, আমি টিম পাঠাই নেপালে? আজ রাত তো আপনি আমি থাকবো ফিল্ডে।”

ওর কথা গায়ে মাখলো না ওয়াসীত শরীফ, উল্টো বললো,“ইউ ক্যান অ্যাড্রেস হার ভাবী!”

_নো স্যার,ম্যাম ইজ মাই কম্ফোর্ট জোন।

ইহান জবাব দিলো।

_ক্যাপ্টেন তোশার সাথে সম্পর্কটা কি যাস্ট এমনিই নাকি প্ল্যান আছে?

লাজুক হেসে ইহান বলল,“এই মিশন শেষ করে আংটি পরিয়ে রাখবো স্যার।”

বাইরে গুঞ্জন। ওয়াসীত দৃষ্টি ফিরিয়ে বললো,“যুদ্ধবিরতি পেয়ে সবাই আমোদ করছে নাকি!”

_স্যার।

_হুম, করুক, একজন সোলজারের কাছে অস্ত্র থাকার মতো জরুরি একটি ব্যাপার হচ্ছে ফুরফুরে মন থাকা। বার্নার্ড শ-য়ের আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যানে ক্যাপ্টেন ব্লান্টসলির মতো এটা আমার হাইপোথেসিস। যাও, আনন্দ করো, যেটুকু সময় পাচ্ছো।

_নো স‌্যার, ইটস্ ওকে।

টানটান হয়ে জবাব দেয় ইহান। শাওকাত হেসে বললো,“আমিও তোমার মতো ছিলাম, খুব প্রফেশনাল। ইভেন এতটাই প্রফেশনাল ছিলাম যে সিনিয়রদের ভদকা সার্ভ করাটাও দেশসেবার অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম। পরে শুধরেছি। শোনো, যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাকে সিনিয়র নয়, ভাবতে হবে তোমার কর্তব্য নিয়ে, যার জন্য তুমি অস্ত্র তুলেছো। যাও এখন। ডিফেন্সে অহেতুক বাধ্যতার স্বভাব থেকে যতক্ষণ না পর্যন্ত বেরুবে ততদিন কিচ্ছু হবে না। আজ গ্রেনেড নিয়ে রেডি থাকবো, তবে মনে হয়না ওরা আক্রমণ করবে। আমেরিকার সাথে গোলটেবিল বৈঠকে বসেছে জাতিসংঘ। এই সময়টিতে চীন কোনো বোকামি করবে বলে মনে হয়না।”

প্রেরণা মাথা তুলে তাকায়, কান্না থামিয়ে ইহানকে দেখতে থাকে। ইহান একটু থেমে যেতেই প্রেরণা বলে ওঠে,“উনি কেনো গ্রেনেডে হাত দিয়েছিলেন? এটা তো ওনার কাজ ছিলো না, কেন হাত দিয়েছিলেন? আর সবাইকে বাঁচাতে? খবরে তো সেসব কথাই ফলাও হয়েছিলো। আমি শুনতে চাই বিস্তারিত। শুনতে চাই।”

ফাঁকা ঢোক গিলে নেয় ইহান, ভদ্রমহিলার জানতে হবে, এটা তার অধিকার, ধীরে ধীরে বললো,“সেদিন চীনের কিছু সৈনিক যুদ্ধবিরতির নিয়ম তোয়াক্কা না করে আমাদের রেজিমেন্টে আক্রমণের চেষ্টা করেছিল। স্যারের কমান্ডে গ্রেনেড ফায়ারিং চলছিল। আর্টিলারি কোরের অফিসার ছিলাম আমরা তিনজন। আমি, সাদমান এবং এক নেপালী সৈনিক। আমার টার্ন ছিল তখন, ওদের অতর্কিতে ছোড়া গুলি আমার হাতে লেগে ফায়ারিং এর জন্য পিন খুলে ফেলা "রেডি টু ফায়ার" গ্রেনেডটা হাত থেকে পরে যায় ভুলবশত, আর তারপর...."

একটু দম নিয়ে নেয় ইহান, কাঁপছে তার চোখের পাতা, বলে,“কাউকে না কাউকে আত্মত্যাগ করতেই হতো নয়তো সবাই মারা পরতাম। এবং ওটা স্যারই ছিলেন যে এগিয়ে গিয়েছিলেন.....”

আর কিছু বলতে পারছে না ইহান। প্রেরণা নিস্তেজ হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলে,“কজন সোলজার ছিলেন আপনারা?”

_আঠারো জন।

অবুঝের মতো কেঁদে ওঠে প্রেরণা, চেঁচিয়ে ওঠে,“আর কেউ ছিলো না? শাওকাত ওয়াসীতই ছিলেন?”

ওর কান্নায় গুমোট হয়ে উঠেছে গোটা লিভিং রুম,ওর কান্নায় হঠাৎ একফোঁটা জল ইহানের চোখ থেকেও পরে, ভুল করে, অস্ফুটে বলে,“হ্যা। শুধুমাত্র শাওকাত ওয়াসীতই ছিলেন।”

বুকে হাত চেপে কেঁদে যাচ্ছে প্রেরণা। ইহান বাকিটা বলে না, বলে না ওয়াসীত কতটা তড়পেছিল। ইহান শেষ সময়টিতেও ওয়াসীতকে ধরতে পারেনি। একজন সোলজার হিসেবে পাশে সহযোদ্ধার লাশ ফেলে রেখেই তাকে অস্ত্র চালাতে হয়েছিলো।

ঐ মিশনে দু'টো গুলি বুকেও লেগেছিল ইহানের। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে পরে গিয়েছিল মাটিতে। কিন্তু সে বেঁচেছে, কাপুরুষরা বেঁচে থাকে, তাই হয়তো বেঁচেছে।

সময় গড়ায়, ইহান সামলে নেয় নিজেকে, প্রেরণাকে বললো,“স্যারের লাশ দেখতে দেয়নি আপনাকে তাইনা?”

দু'পাশে মাথা ঝাঁকায় প্রেরণা কাঁদতে কাঁদতে।

_স্যারের ইউনিফর্ম, স্যারের ডায়েরি, স্যারের চশমা, সব পেয়েছিলেন তো ঠিকঠাক ভাবে?

প্রেরণা এবারো মাথা নাড়ায়। ইহান বলে,“আমি আইসিইউতে ছিলাম। ফিরে এসে কত দেখা করতে চেয়েছি আপনার সাথে। আপনি অনুমতি দেননি কেন?”

_আমার কারো স্বান্তনা প্রয়োজন ছিলো না, আমার অসহ্য লাগতো তাদের নাম শুনলেও যাদের বাঁচাতে গিয়ে আমার হাজব্যান্ড শহীদ হয়েছেন। এতো মহানুভবতা ছিলো না বেঁচে ঐ সময়টিতে আমার মাঝে।

_আর এখন? আমি আপনার সামনে বসে, এখন কি রাগ লাগছে আমার ওপর? আমি ঐ একজন ছিলাম, যাকে বাঁচাতে গিয়ে আপনার হাজব্যান্ড শহীদ হয়েছে।

ইহানের কন্ঠে ফুটে উঠেছে ওর নিদারুণ অসহায়ত্ব। প্রেরণা ভেজা চোখে লোকটাকে দেখছে, পর পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“রাগ নেই কারো ওপর। আল্লাহ আপনার হায়াতের মালিক। রাগ কেন হবো?”

ইহান মাথা নিচু করে নিয়ে দম ফেলে, মলিন হেসে বলে,“স্যার সবসময় আপনার কথা বলতেন। স্যার বলতেন স্যার খুব লাকি আপনাকে পেয়ে। তবে কি জানেন? আপনার মতো লাকি এই পৃথিবীতে কেউ নেই যে স্যারের মতো লোকের সান্নিধ্য পেয়েছিল জীবনের একটা অংশে....”

_একটা অংশে? উনি হাজব্যান্ড আমার। এখনো তো আমি ওনারই বৌ!

ভীষণ আবেগী হয়ে দু চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ঘোরের মাঝে প্রেরণা বলে দিল ‌। ইহান ওর উদাস চোখ দুটো ভদ্রমহিলার নীল চোখে রাখে, নিজের ভাগ্যের পরিহাসে সে আবারো ম্লান হেসে অস্ফুটে বলে,“জি। আপনি স্যারের বৌ।”

_উনি শেষ সময়ে কিছু বলেছিলেন? কোনো কথা বলতে পেরেছিলেন?

আকুল হয়ে জানতে চাইলো প্রেরণা। ইহান মাথা ঝাঁকায়,“বলেছিলেন, তাজওয়ার আমার ওপর যেন রাগ না রাখে ও।”

শাড়ির আঁচল খামচে ধরে প্রেরণা কাঁদতে থাকে ফুঁপিয়ে। ইহান উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল হয়ে শুদ্ধকে ডাকতেই শুদ্ধ ছুটে এসে ইহানের কোলে চ'ড়ে। ওর দুই গালে আবারও চুমু খেয়ে ইহান বলে, “তোমার মাম্মার ফোন থেকে মামাকে কল করো, বলো যে, মাম্মা অসুস্থ, একটু যেন তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসে।”

শুদ্ধ তাই করলো। ইহান আবারও প্রেরণার মুখোমুখি বসলো, কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখে বললো,“আপনি স্যারের নীলিমা! কি আশ্চর্য! নতুন করে, নতুন ভাবে আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগছে প্রেরণা। আমি আমাদের এই পরিচয় জীবনে ভুলবো না, জীবনেও না।”

কথাটি বলেই উঠে দাঁড়ায় ইহান, সে টের পাচ্ছে তার বুকটা পুড়ছে। কার ওপর হচ্ছে জানে না,তবে তার ভীষণ রাগ হচ্ছে। হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ইহান,দরজা টানলো শব্দ করে, বিকট শব্দে কাঁপল প্রেরণা, ঘোলাটে চোখে সেদিকে চেয়ে রইল।

__________

শেহার বিয়ের শপিংয়ের আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো সবাই। রাত এগারোটা পর্যন্ত চলছিলো ওদের আলাপন, দোতলার লিভিং রুমে।

বাড়িতে ঢুকে ক্লান্ত পায়ে ইহান দোতলায় উঠতেই রিতু চোখ বড় বড় করে বললো,“কি হয়েছে? মুখের এই কি হাল? ইনুর শ্বশুরবাড়িতে কতক্ষন ছিলিস? বিকেল থেকে ফোন ধরিসনি কেন? খাবি? ভাত বাড়বো?”

ইহান জবাব না দিয়ে রুমে ঢুকে ধাপ করে দরজা লাগায়। ইরফান মির্জা আর ইশি একে অপরের মুখ দেখছে বড় দাদানের কান্ডে। এক ফাঁকে দূরে গিয়ে ইরফান ইনুকে কল করে,“কি রে? তোর বড় ননদের কাছে গিয়েছিলো বড় দাদান। আসার পর দেখি মুখ অন্ধকার। কিছু হয়েছে? জানিস?”

_জানি না তো দাদান, বাড়িতে এসেছি শুদ্ধর কল পেয়ে,আপু নাকি অসুস্থ। এসে দেখি খুব মাথা ব্যথা। কাঁদলে চোখ মুখ ফুলে গেলে যেমন দেখতে লাগে? অমন লাগছে।

কল কাটে ইরফান। কিছুই বুঝতে পারছে না সে। এদের মধ্যে হচ্ছেটা কি আসলে?

রাতের খাবারটা ইহান খায়নি। সবাই যে যার মতো শুয়ে পরলেও আলো ঘুমায়নি, বিকেলে ঘুমিয়েছে বলে এখন রাত জাগছে। পায়চারি করতে করতে ইহানের ঘরের বাতি জ্বলছে দেখে সে এগিয়ে গিয়ে দরজায় নক করে। কিছুক্ষণ পরই দরজা খোলে ইহান। আলো বিমূঢ় হয়ে ছেলেকে দেখে, হঠাৎ ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,“হয়েছেটা কি? তুই এমন করছিস কেন?”

গাঁয়ের পাঞ্জাবিটা অবধি বদলায়নি ইহান। আলো বললো,“দাড়া রিতুকে ডাকছি, ও কান্নাকাটি শুরু করলে ঠিক বলবি।”

ইহান হাত টেনে ধরে বড় মায়ের, নিচু গলায় বলে,“অযথা টেনশন করবে, ডেকো না। তুমি বসো।”

আলো বসলো সোফাতে, ইহান হঠাৎ বাচ্চাদের মতো আলোর কোলে মাথা রেখে মেঝেতে বসে পরলো। চমকে ওঠে আলো। অবাক,বিস্ময়ে ইহানকে দেখে অস্ফুটে বলে ওঠে,“হয়েছে কি? তোর হয়েছে কি?”

দীর্ঘসময় পরেও বুকটা হাহাকার করে উঠলো ইহানের, বলে ওঠে,“বড় মা,ইহান তাজওয়ার মির্জা যদি অন্যের জিনিস নিয়ে নেয়, সেটা কেমন দেখায় বলো? এর পেছনে হাজারটা কারণ থাকুক, হাজারটা সৎ উদ্দেশ্য থাকুক। দিনশেষে ঐ লোকটা যদি আমাকে বলে,“বেঈমানি করলে?” আমি কি জবাব দেবো?”

আলো বুঝতে পারছে না কিছু। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“জিনিসটা কি? লোকটা কে?”

ইহান জবাব দেয় না, উল্টো ছটফট করে বলে ওঠে,“কেউ বুঝতে চাইবে না জিনিসটা আমারো বহুল কাঙ্ক্ষিত, জিনিসটা পেলে আমি খুব যত্নেই রাখবো, জিনিসটা নিরাপদে থাকবে, এটা কেউ বুঝবে না। সবাই শুধু বলবে,“ঐ দেখ কান্ড জ্ঞানহীন ইহান তাজওয়ার মির্জা, বেঈমান একটা।”

চলমান........

সঙ্গত কারণে শাওকাত ওয়াসীতকে নিয়ে বেশি একটা লিখিনি ইচ্ছে থাকলেও। গল্পটা ইহান-প্রেরণার, ওদের কাহিনীতে যেটুকু বিবরণ প্রয়োজন, সেটুকু দিয়েছি। 🖤

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 117 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন