#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৮ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
[ ১ম অংশ ]
মেঘলা দুপুরের হলদেটে আলো আর গা শিরশির করা ঠান্ডা আবহাওয়ায় ঝিমুনির মত আসছিল প্রেরণার। বিগত একঘন্টা যাবত দাঁড়িয়ে আছে শুদ্ধর স্কুলের সামনে। আজ মিডটার্ম পরীক্ষা শুরু হয়েছে শুদ্ধর । এবং আজই ওদের নিমন্ত্রণ আছে মির্জা বাড়িতে, শেহাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে আজ তার শ্বশুরবাড়ি থেকে। ইনু,প্রিতম আর মিস জেনি পৌঁছে গিয়েছে। প্রেরণা অপেক্ষা করছিল শুদ্ধর পরীক্ষা শেষ হওয়ার জন্য, ছেলেটা বেরুলে ওকে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে গোসল সেরে দাওয়াত খেতে যাবে বলে মনস্থির করেছে।
দাঁড়িয়ে থেকে পা ব্যথা করছে, কোথাও একটু বসবে সে জো নেই। স্থান সংকুলানের জন্য স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টের হয়ে দাঁড়ায় কখনো কখনো। আশেপাশে পুরুষ মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে দুই একজন করে। এরাও সম্ভবত গার্ডিয়ান। সবাইকে দেখতে দেখতে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে প্রেরণা, সত্যি বলতে সে বরাবর চেয়েছে একটা নির্ঝঞ্ঝাট গৃহিণী জীবন। অথচ এই তাকে একা হাতে শুদ্ধর বাবা এবং মায়ের কাজগুলি করতে হয়। এজন্য সবাই তাকে খুব বাহবা দেয় সবসময়। কিন্তু প্রেরণা জানে,প্রেরণার বিরক্তি আসছে রোজ রোজকার এই দায়িত্বে। জীবনের তেতো স্বাদ কমাতে তাই সে কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে, সেখানে দেখে শুদ্ধকে তার বাবা রোজ স্কুল থেকে নিয়ে আসছে। বাড়িতে ফিরলে প্রেরণা দু'জনের ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছে শাড়ির আঁচলে। এখনো যখন সে দেখছিলো দৃশ্যটা কল্পনাতে, হুট করেই সেখানে চলে এলো ইহান তাজওয়ার মির্জা। ধমধবে সাদা আঁটসাঁট পাঞ্জাবি পরনে তার বলিষ্ঠ শরীরে।
আঁতকে উঠে প্রেরণা বড় বড় শ্বাস ফেলে। নিজের কল্পনা থেকে দ্রুত বেড়িয়ে ঢোক গিলে চোরের মতো আশেপাশে তাকায়, তার হঠাৎ মনে হলো তার অবচেতন মনে হুট হাট আসা এই নোংরা চিন্তাভাবনা গুলো লোকজনের কাছে দৃশ্যায়িত হচ্ছে। লোকজন মুখে থুথু জমিয়ে নিয়ে বলছে,“ছিঃ ছিঃ ভদ্রমহিলা? এই তোমার স্বামীর প্রতি ভালোবাসা? মরে গিয়েছে বলে আরেক পুরুষ নিয়ে বাসনা সাজাও?”
প্রেরণা ছটফটিয়ে উঠে তাদের কাছে মনে মনেই সাফাই গায় নিজের,“বিশ্বাস করুন আমি শুদ্ধর বাবাকে ভালোবাসি। আমি বাসনা করতে চাইনা অন্য পুরুষকে। আমার সাথে এসব কি হচ্ছে আমি জানি না। এর ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যদি থাকতো, আমি কল্পনার প্রেরণার গলা টিপে ধরে মেরে ফেলতাম, অথবা ঐ লোকটাকে বলতাম দয়া করে আমার পিছু ছাড়ুন আপনি, আসবেন না আমার কল্পনায় হুট করে। বাস্তবে বা কল্পনাতে প্রেরণা ফাঁকা নয়। আপনার প্রয়োজন নেই আমার।”
গাড়ির হর্নের শব্দে প্রেরণার ঘোর কাটে, মুখটা অন্ধকার হয়ে যায় হঠাৎ। তিন-চার দিন পেরিয়েছে ঐ লোকটার সাথে শেষ কথা হয়েছে। এমন একটি অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনায় দুই বাড়ির প্রত্যেকে বিস্মিত। ও বাড়ি থেকে বড়রা অনেকে ছুটে এসে প্রেরণাকে বিস্ময় নিয়ে দেখেছে, কথা বলেছে প্রেরণার সাথে, সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তারপর ঐ লোকটা যেন তিনদিনের জন্য ভ্যানিশই হয়ে গিয়েছেন। একটি অতীত, একটা স্বাভাবিক দূর্ঘটনা নিয়ে অপরাধ বোধে ভুগতে দিতে ইচ্ছুক নয় প্রেরণা কাউকে, সে চায়না এমনটা। কিন্তু এসব কথা বলার জন্য সময় সুযোগ সে পায়নি, নয়তো প্রেরণা কথা বলতো লোকটার সাথে। প্রেরণার ভীষণ খারাপ লেগেছে আলোর কাছে এটা শুনে যে ওয়াসীত শরীফের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইহান তাজওয়ার সাইক্রিয়াটিস্টের তত্ত্ববধানে ছিলো দিনের পর দিন! চাকরি ছেড়েছে স্যারকে বাঁচাতে না পারার অপরাধবোধে! লোকটা বুঝি এতটাই অনুগত ছিল নিজের স্যারের!
দৃষ্টি ঝাপসা হয় প্রেরণার। অদ্ভুত এই পৃথিবী আর অদ্ভুত এখানকার মানুষগুলো!
“আরে প্রেরণা না?”
পুরুষালি কন্ঠের ডাকে চকিতে ঘুরে তাকায় প্রেরণা। লোকটা হাসিহাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে। রিকুর বাবা উনি। ব্যবসায়ী জিহাদুল ইসলাম। লোকটা এগিয়ে এসে উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বলে,“কেমন আছেন প্রেরণা?”
প্রেরণা খানিকটা পিছিয়ে যায় সংকোচে। লোকটাকে রিকু আর শুদ্ধের বন্ধুত্বের খাতিরে সহ্য করতে হয় নয়তো প্রেরণার মাঝে মাঝে ওনার মুখের ওপর বলতে ইচ্ছে করে,“আমাকে প্রেরণা নয়,ভাবী ডাকুন।”
হাসার চেষ্টা করে প্রেরণা বলে,“এইতো ভাই, আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন? ভাবী কেমন আছে?”
জিহাদুল প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার চাইতে প্রেরণাকে লক্ষ্য করতে আগ্রহী বেশি। ভীষণ অমায়িক, স্মার্ট একজন ভদ্রমহিলা। হাসিতেই দম আটকে দেয়, যেকোনো পুরুষ ঘায়েল হতে বাধ্য। ভেতরে ভেতরে শ্বাস ফেলে জিহাদুল, বাড়ির বৌ গুলোই কেন এত ম্যারমেরে হয়! কেন এমন স্মার্ট এবং প্রাণোচ্ছল হয়না?
প্রেরণা শাড়ির আঁচলে ঘাম মোছে, জিহাদুল এই দৃশ্যেও অভিভূত হয়। যেমন সুশ্রী ভদ্রমহিলা,তেমন সুশ্রী এর প্রতিটি কাজ।
“এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলুন গাড়িতে বসবেন আমার। শুদ্ধ আর রিকু তো একসাথেই বেরুবে!”
প্রেরণা দু'পাশে ঘনঘন মাথা নাড়ায়,“না,তার দরকার নেই।”
এর মাঝে শুদ্ধ আর রিকু এলে রিকু পাপার কাছে বায়না করে শুদ্ধকে গাড়িতে নেবে সে। জিহাদুল ছেলের গাল টিপে দিয়ে বলে,“অবশ্যই শুদ্ধ গাড়িতে যাবে। আমরা শুদ্ধ আর তার মাম্মাকে পৌঁছে দেবো।”
_এই না না, তার দরকার নেই!
প্রেরণার বারণ শুনে শুদ্ধই শুরুতে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। সে রিকুর সাথে গাড়িতে উঠবেই। প্রেরণা ছেলেকে ধমকাতেও পারছে না লোকসম্মুখে,সে অসহায়ের মত আশেপাশে তাকায় শুধু। জিহাদুল হাসিহাসি মুখ করে গাড়ির দরজা খুলে দেয়, শুদ্ধও অবুঝের মতো লাফিয়ে ওঠে গাড়িতে আর প্রেরণা ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস।
যেতে যেতে নিউটাউন রোডে রিকুদের বাড়ির গেটে গাড়ি থামে। রিকুর মাম্মা জেরিন গেট খুলতেই গাড়িতে প্রেরণাকে দেখে কপাল খানিকটা কোচকালেও পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ হাসি হাসি করে সালাম দেয়। সত্যি বলতে প্রেরণাকে নিয়ে তাদের “ভাবী” মহলে সবার মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করে বরাবর। ভীষণ ঈর্ষা হয় প্রেরণার রূপ আর ফিগার দেখলে। সেই ঈর্ষা দ্বিগুণ বাড়ে যখন নিজেদের বরের মুখেও প্রেরণার প্রশংসা শোনে। ভাবীরা সবসময় তাই খুব একটা ঘনিষ্ট হতে চায়না প্রেরণার সাথে পাছে নিজের স্বামীদের নজরে পরে যায় সুশ্রী আর চমৎকার শারীরিক গঠনের আঠাশের এই বিধবা,নিঃস্বঙ্গ ভদ্রমহিলাকে। কিন্তু ঐ যে পুরুষ জাতের নাক লম্বা এই ব্যপারে,ঠিক গন্ধ পেয়ে যাবেই । এমন জিনিস এই দেশে আছে? রাশিয়ান এ। চোখ দিয়ে গিলতেও কত আরাম! আর তার ওপর বিধবা, নিঃস্বঙ্গ। চোখে চোখে একটু হাই হ্যালো হলেই স্বেচ্ছায় সপবে সবকিছু। আর এই পুরুষ মানুষ হচ্ছে দয়ার শরীর,হাতের কাছে সুন্দরী বিধবা অসহায় নারী দেখলেই এদের সহানুভূতি জেগে ওঠে, সহানুভূতি দেখাতে দেখাতে বিছানায় নিয়ে শাড়ি খোলে।
জেরিন স্বামীর ওপর বিরক্ত । নিজের স্বামীর চরিত্র সম্পর্কে তার তো কিছু অজানা নেই। অফিস থেকে খবর আসে, পিএর সাথে মাঝে মাঝে কেবিনের দরজা আটকে মিটিং-ফিটিং করে। বাচ্চাদের মুখের দিকে চেয়ে চুপ করে থাকে জেরিন । সরাসরি প্রমাণ পেলেই একদিন গলা টিপে ধরবে।
আজ এভাবে প্রেরণাকে দেখে মেজাজ বিগড়ে গেলেও পরিস্থিতি বুঝে চুপ থাকে জেরিন, জিহাদুল রিকুকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে দিয়ে চলে যায় প্রেরণাদের নামিয়ে দিতে।
_________
সানাইয়ের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে সকলের। সামিন গিয়ে দুইবার থামিয়েছে। ইরফান শোনেনি বড়দের কথা, সাউন্ড বক্সে সানাইয়ের সুর বাজিয়ে চলেছে সকাল থেকে। এটা না করলে নাকি বিয়ে বাড়ি বিয়ে বাড়ি লাগছে না বাড়িটাকে।
খুব আর খুবই সাধারণ ভাবে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করছে শান্ত। বলতে গেলে ঘরোয়া পরিবেশে, এজন্য একটি পয়সাও সে শেহার মামাদের থেকে নেয়নি। শেহার দাদা বাড়ির লোকজন নিয়ে খুব কাছের হাতে গোনা দুইশো মানুষ নিমন্ত্রিত। আর বর পক্ষ থেকে আসবে বিশ-বাইশজন!
বাড়িটাকে সাজানোও হয়েছে খুবই সাধারণ ভাবে, এটা শেহার ইচ্ছেতে হয়েছে।
শেহাকে সাজাতে এসেছে মুয়া। গাঢ় সবুজ রঙের বেনারসী আর হালকা সোনার গয়নায় একেবারেই দ্যুতি ছড়াচ্ছে মেয়েটা। তখনো তো মেক আপ নেয়নি। উজ্জ্বলের দাদুর সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে বলতে গালে ব্লাশ অন নিচ্ছিলো।
ওপাশে নিজাম মাহমুদ উজ্জ্বলের ফোনটা নিয়ে বসেছে নাত বৌয়ের সাথে কথা বলতে। পুরোপুরি সুস্থ নয় সে, আগের মতো হোহো করে হাসির ঝংকার তুলতে বারণ তার। নাতবৌকে দেখাচ্ছে সে নিজেও একটা শেরোয়ানি নিয়েছে উজ্জ্বলের মতো। ধবধবে সাদা রঙের।
“বরকে দেখবে নাকি দাদুভাই?”
নিজামের প্রশ্নে শেহা লাজুক হেসে দু'পাশে মাথা নাড়ে। নিজাম মাহমুদ ধীরে ধীরে উজ্জ্বলের ঘরের দিকটাতে এগিয়ে যায়, উজ্জ্বল তখন সবেমাত্র গোসল শেষ করে বেরিয়েছে। কোমরে একটা ধবধবে সাদা রঙের তোয়ালে, ভেজা ভেজা শরীরটা উন্মুক্ত।
নিজাম মাহমুদের হাতের ক্যামেরায় ও বন্দী হতেই চোখ বড়বড় করে উজ্জ্বল ত্বরিৎ ঘুরে যায়। তোয়ালে উঠিয়ে ঢেকে নেয় উন্মুক্ত বক্ষপট। শেহা চোখ নামিয়ে নেয় লজ্জায়। তার গাল দুটো ব্লাশ ছাড়াই লাল লাল হয়েছে। ওপাশে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে দাদা নাতির তর্কাতর্কি। উজ্জ্বল ধীরে ধীরে বকছে দাদুকে,বলছে,“ওটিতে কি ডাক্তাররা কমনসেন্স কেটে রেখে দিয়েছে? এটা কি করলে?”
_আরে আমি কি আর বুঝেছি তুই নেংটুপুটু হয়ে বেরুবি এভাবে?
উজ্জ্বল কটমট চোখে দাদুর দিকে তাকিয়ে আছে। নিজাম মাহমুদ বলছে,“আরে একটু দেখুক না, তুই লন্ডন থেকে থেকে কত ভালো বডি বানিয়েছিস। একটু শো অফ করবি না? এরপর কত এভাবে দেখবে তোকে.....”
রুদ্ধশ্বাসে ছুটে এসে উজ্জ্বল দাদুর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কল কাটে। শেহা থম মেরে বসে আছে,বড় বড় শ্বাস ফেলছে সে লজ্জায়। পাশ থেকে ইশি আর ইনু বলে ওঠে,“কিরে? কি বললো উজ্জ্বল ভাই? এভাবে ঘামছিস কেন?”
শেহা দুই পাশে মাথা নাড়ায় ঘনঘন। অর্থাৎ কেউ কিছু বলেনি। চুপচাপ কান থেকে ইয়ারফোন খুলে ফেলে সে, শ্বাস আটকে বসে থাকে।
__________
বাইরের বাগানে রান্নাবান্না চলছে। ইরফান খুবই দায়িত্বশীল ছেলে হয়েছে এ বাড়ির। এই প্রথম কোনো অনুষ্ঠান সে নেতৃত্ব দিচ্ছে বড়দের কোনো সাহায্য ছাড়াই, ওকে সাহায্য করছে মুঈন আর প্রিতম। সবটা ঠিকভাবে সামলে উঠতে না পারলেও তার মেজাজ তাকে সামলে নিচ্ছে খুব ভালো করে। সুইমিং পুল এরিয়া থেকে বাইরের বাগানে উঁকি দিলে বাবুর্চিদের দেখা যাচ্ছে। ঘড়িতে সময় দেখে ইরফান হাক ছাড়লো,“দাদু আর কতক্ষন?”
_জর্দা শেষ দাদু। এখন পায়েশ।
দ্রুতপায়ে হেটে ইরফান ভেতরে ঢোকে, যতটুকু কাজ করছে চেঁচামেচি করছে তার চেয়েও বেশি। বড়রা সবাই ওর কান্ড দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে। ইরফান কাউকে পাত্তা না দিয়ে হাক ছাড়তে ছাড়তে দোতলার বারান্দায় যায়,“এই ইশি আর ইনু। আমি বলে দিলাম গেটে যদি বেশি টাকা চেয়ে কাহিনী করেছিস তো তোদের কপালে দুঃখ আছে।”
রিতু আসে ওকে থামাতে,“আহহা,এতো চেচাচ্ছিস কেন? আর এত লম্ফঝম্প কেন? কাজ কি তুই একাই করছিস? গিয়ে দ্যাখ নিচে বাড়ির দুই জামাই মুঈন আর প্রিতম কত কাজ করছে। তোর মতো হাকডাক দিচ্ছে কেউ?”
ইরফান ঘর্মাক্ত শার্টের উপরের বোতাম দুইটা খুলতে খুলতে গা ছাড়া ভঙ্গিতে জবাব দেয়,“যুগটাই এমন মাম্মা, নিজের ঢাক নিজেকেই পেটাতে হয়।”
রিতু দেখে ছেলেকে, পরপর ঘুরে বড় ছেলের ঘরের দিকে তাকায়। ভেতর থেকে আপনা আপনি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে যায় তার।
কোনো কথা না বলে রিতু চলে যায়। ইরফান নিজের বৌয়ের খোঁজে রুমে ঢুকতে গিয়েও ঢুকলো না। তার পা থামলো দাদানের ঘরের সামনে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বিগত চারদিন ধরে এমনটাই দেখছে ইরফান। দাদান আর দাদান নেই! কি এমন ঘটতে পারে? নিজের স্যারের বৌকে ভালোবেসেছে বলে এমন করছে? এটুকু তো ইরফানের বোধগম্য হয়।
দরজায় টোকা দেওয়ার সাথে সাথেই ইহান দরজা খুললো। মুখটাকে হাসি হাসি করার চেষ্টা তার, গোসল সেরে নতুন একটা সাদা পাঞ্জাবি পরে হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে উদাস গলায় বলল,“বেরই হচ্ছিলাম। বরপক্ষ রওনা দিয়েছে?”
পুরো ঘর থেকে সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ইরফান কয়েক পলক দাদানকে দেখে বললো,“এভাবে আর হবে বলে মনে হয়না। তুমি ফেইল। দায়িত্বটা বড়দের ওপর দিই? অথবা আমাকে দাও।”
_কি?
কৌতুহলী হয়ে ইহান জানতে চায়।
_তোমার আর জ্ঞানী আপার বিয়ের।
ইহান চোখ তোলে ত্বরিৎ, পরপর চোখটা নামিয়ে বলে,“এসব কিছু হবে না। শাট আপ!”
মৃদু ধমকে ইহান ঘর থেকে বেরুতে নিলে ইরফান হাত টেনে ধরলো দাদানের। ইরফান ভাইয়ের মুখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি ফেলতেই হঠাৎ ইরফান বলে উঠলো,“কাউকে কারো থেকে কেড়ে নেবে না তুমি!”
ইহান ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকে। ইরফান দরাজ গলায় ধীরে ধীরে বলে,“প্রেরণা আর ওয়াসীত শরীফ একে অপরকে ভালোবাসতো। ওয়াসীত শরীফ যে প্রেরণাকে ভালোবাসতো, তার মৃত্যুর সাথে সাথে ঐ প্রেরণা সত্তারও মৃত্যু হয়েছে। একটা সুন্দর ভালোবাসার গল্প শেষ হয়েছে, আই রিপিট অপূর্ণ থাকেনি গল্পটা, ওয়াসীত শরীফ প্রেরণার ভালোবাসা নিয়েই মারা গেছেন।
এখন আরেক প্রেরণা আছে, যে শুদ্ধর সিঙ্গেল মাদার। তুমি চাইলে আরেকটা অধ্যায় ভদ্রমহিলা শুরু করতেই পারেন, এতে কারো ভাগে কম পরে যাবে না। না তোমার, না ওয়াসীত শরীফের!”
ম্লান হাসে ইহান, ভাইয়ের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,“তুই তো বিয়ে করেছিস! স্ত্রীকে ভালোবাসিস। তুই স্যারের যায়গায় নিজেকে বসিয়ে জবাব টা দেতো! অনুমতি দে আমায় পারলে!”
ইরফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,“আমি ওয়াসীত শরীফ। আমি মারা গিয়েছি। আমার এক জনমের দায়িত্ব, আমার স্ত্রী, আমি তাকে আমৃত্যু ভালোবেসেছি। এবং আমি সবসময় চাই আমার স্ত্রী ভালো থাকুক। আমাদের পথচলা ঐ অতটুকুই ছিলো, তার মতো জীবনসঙ্গী পেয়ে আমি জীবনে পরিপূর্ণ হয়েই মরেছি। এখন আমার জীবনসঙ্গী তার ভালো থাকার নিমিত্তে যা করতে চায় করুক, যাকে খুশি তাকে গ্রহণ করুক, আমার কোনো আফসোস নেই। এবং যে আমার বৌকে ভালোবেসে আগলে রাখতে চায়,আমি অবশ্যই তাকে এপ্রিশিয়েট করি, রাগ নেই তার ওপর।”
ইহান হাঁসফাঁস করে উঠলো ভাইয়ের মুখে কথাগুলো শুনে, তারপর হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো। তাকে এভাবে গুমোট হয়ে থাকলে চলবে না । সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে নিতে হবে, ঐ সমুদ্রনীলার সাথে তার নিঃশব্দে যে বিচ্ছেদ ঘটেছে সেটাও স্বাভাবিক ভাবে নিতে হবে। এতো আবেগ এই বয়সে সত্যিই হাস্যকর।
ইরফান ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর লম্বা শ্বাস ফেলে চলে গেলো নিজের রুমে। রুমে ঢুকতেই ইরফান থমকে দাঁড়াল, প্রণমি হাতের কুচিগুলো মেঝেতে ফেলে দ্রুত আঁচল টেনে ঢেকে নিলো বুক।
ইরফান চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এভাবে নক না করে ঢুকে বেচারীকে বারবার বিব্রত করাটা কি অপরাধ নয় তার? তবে প্রণমি বিব্রত হয়নি, সে খুব ভালো করে জানে এ বাড়িতে এক অস্থির বাঁদর থাকে। যার স্বভাব হৈহৈরৈরৈ। এবং তিনি ছাড়া এই ঘরের ত্রিসীমানায় কোনো পুরুষ লোক আসে না এটাও প্রণমি জানে। এ বাড়ির জামাইরা এখন রয়ে সমঝে হাঁটাচলা করে দোতলায়, বাড়িতে একটা বৌ মানুষ আছে তাই।
প্রণমি শান্ত থেকে বলে,“এটা আপনি?”
দরজা আটকে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ইরফান, বললো,“জিইই। এটা কি করছো?”
_শাড়ি পরছি, সবাই শাড়ি পরবে আজ। মুয়া তো ভারি ব্যস্ত তাই নিজে নিজে চেষ্টা করছিলাম।
ইরফান গিয়ে মেঝেতে বসলো হাঁটু গেড়ে। প্রণমির কুঁচি গুলোতে হাত দিয়ে সেগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা ঠিকঠাক ভাবে জড়াতে পারেনি শাড়িটা, এটা ওকে বলতে ইচ্ছে করছে না।
বললো,“ওদের ডেকে নিলে না কেন?”
স্বামীর এহেন কথায় লাজুক হাসে প্রণমি। নিচুগলায় বলল,“একটা কথা বলবো?”
_হু।
_আমি শুনতে পাচ্ছিলাম আপনি ঘরেই ঢুকবেন, তাই ওদের ডাকিনি।
_কেন?
এবার মাথা নিচু করে প্রণমি বলে,“আপনি আমাকে হেল্প করবেন তাই।”
কথাটা বলতে গিয়ে যেন প্রণমির দমবন্ধ হয়ে আসছে। ইরফান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, প্রণমির লাল তিলে দৃষ্টি রেখে বলে,“আমি শাড়ি পরিয়ে দেবো তাই বলে?”
প্রণমি লাজুক হাসে জবাব না দিয়ে,মাথা ঝাকালো উপর নিচে। ইরফান কি করলো, আচমকা একটানে খুলে ফেলল প্রণমির শাড়ি। কেঁপে উঠে দুই হাত আড়াআড়ি করে ধরে ঢেকে নেয় প্রণমি লজ্জা। শরীরটা থরথর করে কেঁপে ওটার আগেই ইরফান ওকে ঘুরিয়ে নিয়ে অস্থির ভঙ্গিতে শাড়ির একটা কোণা প্রণমির কোমরে গুঁজে আঁচল হাতে সামলে নিয়ে ওর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ঘোর লাগা কন্ঠে বললো,“চলো তবে। শুরু থেকে শুরু করি। আমি শুরু থেকে তোমাকে হেল্প করতে চাচ্ছি।”
চলমান.....
[ ২২০০+ শব্দসংখ্যা । পর্বটা শেষ হয়নি। ২য় অংশ কাল দিয়ে দেবো। এখন পড়াশোনা করতে বসবো, খুব ব্যস্ত আমি। ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৮ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
[ ২য় অংশ ]
বর এসেছে। সবাই মিলে চাপা গুঞ্জন তুলে হুরমুর করে নামছে সিঁড়ি ভেঙে। শেহা বসে আছে চুপচাপ, মাথার দোপাট্টা সামলে। ওর পাশেই বসে আছে প্রেরণা। সে এসেছে কিছুক্ষণ আগে। কোথাও যায়নি, নিচে বড়দের সাথে দেখা করে সরাসরি শেহার কাছে এসেই বসেছে।
খানিক সময় পেরিয়ে যেতেই উঁচু স্বরে চেঁচামেচি আর হাসাহাসির শব্দ পেল ওরা বাইরে। উশখুশ করে ওঠে শেহা, বেনারসী সামলে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দেয়। এখান থেকে গেটের কাছটা দেখা যাচ্ছে। শেহা দেখতে পেলো দেড় লাখ টাকা দাবি করে ঐ লোকটাকে নাস্তানাবুদ করছে ইশি আপু আর ইনু। মুঈন জিজ আর প্রিতম ভাইয়াও কোনো অংশে কম নয়। সবাই মিলে ধরেছে লোকটাকে। আর নিজাম দাদু সবার সাথে সমানে তর্ক চালাচ্ছে। শেহার মজা লাগছে খুব দৃশ্যটা দেখে। কোনো পক্ষই কারো থেকে কম না। শুধু ঐ লোকটা চুপচাপ একপাশে সরে দাঁড়িয়ে আছে মুখ হাঁসি হাঁসি করে। কখনো কখনো দাদুকে থামানোর চেষ্টাও করছে,“আহ দাদু। থামো না!”
নিজাম মাহমুদ খেকিয়ে ওঠেন নাতীর ওপর,“আমি নিজাম মাহমুদ, বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদিনী। তুই চুপ থাক রাজা রাম মোহন রায়! দেড় লাখ টাকা দিয়ে দিবি? বৌ দেখার তর সইছে না?”
হাসির রোল পরে গেটে। উজ্জ্বল দাদুর ধমক খেয়ে চুপ হয়ে যায়। শান্ত মুখটার দিকে শেহা তাকিয়ে রয় নির্নিমেষ, লোকটার ভাবভঙ্গি দেখে আসলেই মনে হচ্ছে দেড়লাখ টাকা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই, সে বৌয়ের মুখ দেখার জন্য পাঁচ লাখও দিতে রাজি আজ! এমন নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা! এসব কথা ভেবে ভেবেই শেহা লজ্জা রাঙ্গা হচ্ছে বেশি।
আচ্ছা ঐ লোকটাকে হঠাৎ অন্যরকম লাগছে কেন? বয়স আরেকটু কম লাগছে! ঘটনা কি? ঘটনা খানিক বাদেই পরিষ্কার হয় শেহার কাছে। ঐ লোকটা ক্লিনশেভ করেছে। রোদ লেগে চকচক করছে নীলচে-ফরসা, ধারালো চোয়াল। লম্বা শরীরটাতে সাদা রঙের শেরোয়ানিটা খুব মানিয়েছে।
হঠাৎ শেহা দেখতে পেলো রাগী মির্জা তার বৌয়ের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে গেটের কাছে। কি ভণ্ড ঐ ছেলে! সারাদিন ইশি আপু আর ইনুকে বকে এখন নিজেই গেট ধরছে! পার্টনার হিসেবে আবার বৌকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সবকটা বদের হাড্ডি! বড় দাদানকে ডেকে সবকটাকে বকা খাওয়ালে কেমন হয়? শেহা একা একা হাসে সবাইকে দেখে। পরপর মনটা খুব খারাপ হয়। এই এতগুলো মানুষের সাথে দূরত্ব বেড়ে যাবে নাতো ওর? না না,এমন দিন শেহার কখনো না আসুক। শেহার জীবনে সবগুলো মানুষ থাকুক যার যার নিজের যায়গা নিয়ে, সবসময়।
প্রেরণা নির্বাক দৃষ্টিতে বসে বসে দেখছিল শেহাকে। ঠিক এভাবেই তাকে একদিন সাজিয়ে একটা ঘরে রেখে গিয়েছিল তার ফুপি। প্রেরণা কান্নাকাটি করছিলো সে বিয়ে করবে কিন্তু স্বামীর কাছে যাবেনা ভাই-বোন ছেড়ে তাই। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে এভাবেই দেখেছিল সে, ভীষণ লম্বা-চওড়া দানবীয় শরীরের এক লোক তাকে বিয়ে করতে এসেছে। লোকটা নাকি মেজর। আর্মির নাম শুনলেই প্রেরণার ভয় হতো খুব। সব মিলিয়ে বিয়েতেই খুব একটা মত ছিলো না তার। কিন্তু যখন লোকটাকে বর বেশে হাসাহাসি করতে দেখলো, প্রেরণা অনিমেষে চেয়ে থেকেছিল তার জীবনের প্রথম পুরুষের দিকে। যে এসেছিল সরাসরি প্রেরণাকে বিয়ে করতে। এক দেখাতেই পছন্দ করে প্রেরণাকে লোকটা,খোজ খবর নিতে একদিন সময় নিয়েছিল, প্রস্তাব দিতে দশ মিনিট। বিয়ের আয়োজন করতে লেগেছিল এক দুপুর। বিয়ের গেট ধরেছিল প্রেরণার কাজিনরা। প্রিতম প্রণমি ছোটো ছিলো, আর প্রিতম তো রেগেই ছিলো শাওকাত ওয়াসীতের ওপর, শুরুতে ওরা দুই ভাইবোন দেখতে পারতো না লোকটাকে তাদের থেকে তাদের আপুকে কেনো কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে তাই! গেটে লোকটা প্রথমেই প্রিতম আর প্রণমিকে আগলে নিয়েছিল। দুটোর কপালে চুমু খেয়ে সবিনয়ে জানতে চেয়েছিলো,“কত টাকা চাও?”
প্রিতম রাগী রাগী গলায় বলেছিলো,“ত্রিশ লাখ!”
হেসে ফেলেছিল শাওকাত ওয়াসীত, বলেছিলো,“মাত্র? মাত্র ত্রিশ লাখ টাকা দিলে আমাকে তোমাদের আপুর ভাগ দেবে?”
প্রণমি রেগে রেগে বলেছিলো,“না, নব্বই লাখ।”
ওসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ হেসে ফেলে প্রেরণা। শেহা অবাক হয়ে বলে,“হাসছো কেনো প্রেরণা আপু?”
_না কিছুনা, তুমি তোমার বর দেখো। ভালো করে দেখো। রাতে এমনিতেও চোখ তুলে তাকাতে পারবে না। এখন মন ভরে দেখে নাও।
শেহার গাল দু'টো টমেটোর মতো লাল হয় লজ্জায়। প্রেরণার ওপর মেকি রাগ দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। প্রেরণা হেসে উঠে দাঁড়ায়,এখানে বসে থাকার কোনো মানে হয়না। তাকে নিচে গিয়ে আন্টিদের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। বরপক্ষের মুরব্বি মানুষ বেশি, তাদের আলাদা যত্নের একটা ব্যাপার থাকে তো! ইশি অসুস্থ,ইনু ছোটাছুটি করতে পারে না, প্রণমিও তো কিছুই করতে পারে না। সে এতো নিকটাত্মীয় হয়ে এভাবে বসে থাকবে?
শেহাকে শেহার মতো ছেড়ে দিয়ে প্রেরণা ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরুতেই আচানক ধাক্কা খেলো শক্ত একটা শরীরের সাথে। বাহুতে ব্যাথা পেয়ে প্রেরণা হাত ডলতে ডলতে পিছিয়ে গিয়েই যেই না চোখ তুললো,অমনি কথা হারিয়ে ফেললো মুখের। স্যরি বলতে গিয়েও বললো না।
ইহান চুপচাপ তাকিয়ে আছে, প্রেরণাও তাই। দোতলার ঐ কোণ জুড়ে পিনপতন নীরবতা বিরাজমান। যেন কথা বললে সর্বনাশ ঘটে যাবে, যেন জাত চলে যাবে দুজনের, তাই সাবধানতা অবলম্বন।
একটা গাঢ় বেগুনি রঙের অরগাঞ্জা শাড়ি পরেছিল প্রেরণা, হাতে-গলায় সামান্য গয়না। খোলা চুল গুলো এখনও ভেজা ভেজা। প্রেরণা টেনে নিল ঘোমটা। বরাবর যেমন করে ইহান তলিয়ে যায় ঐ হৃদয় বিধ্বংসী সৌন্দর্যে, এবারো গেলো।
কিছুপল বাদে প্রেরণাই নড়েচড়ে উঠলো, ইহানের সাথে তার কথা আছে, কিন্তু সে টের পেলো সে কিছু বলতে পারছে না। লোকটার গম্ভীরতা তাকে বাঁধা দিচ্ছে। তাই চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। আর ইহান আরো কিছু পলক তার সমুদ্রনীলাকে দেখে চুপচাপ চলে যায় সেখান থেকে,বিনা শব্দে।
প্রেরণা দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয়, লোকটার প্রস্থানের দিকে নিস্পন্দ চোখে চেয়ে।
___________
বরের আসন সাজানো হয়েছে বাইরের প্যান্ডেলে। ওখানে বরের খিদমত করার জন্য আছে ইনায়া এবং প্রণমি। ইশির শরীরটা হঠাৎ খারাপ হতেই মুঈন রেগে ধমকে ওকে দোতলায় পাঠালো। সে এখন রুমে শুয়ে আছে।
বরপক্ষ থেকে দুজন অতি প্রবীণ ব্যক্তি, নিজাম মাহমুদের বড় দুই ভাই , তাদেরকে বসানো হয়েছে অন্দরে এনে। মুরব্বি বৃদ্ধদের একটু আলাদা যত্নের ব্যাপার থাকে। এ পক্ষ,ও পক্ষ মিলিয়ে আঠারো বিশজন বৃদ্ধ লিভিং রুমে বসে আছেন।
তাদের আপ্যায়ন করছে আলো। প্রেরণা নিচে নামতেই পরী বললো,“তোমার কি শরীর খারাপ? শরীর খারাপ না হলে যাও তো বরের আসনের কাছে। ওরা ছোটো আর ফাজিল, কি থেকে কি করে ফেলে। নতুন জামাই যদি ওদের ফাজলামিতে মাইন্ড করে? তুমি গিয়ে একটু তদারকি করো।”
_আন্টি ওখানে ইরফান আছে, মুঈন ভাইয়া আছে , ফাজলামি কে করবে? আপনি আমাকে এখানের দায়িত্ব দিন। আমি দাদুদের শরবত খাওয়াচ্ছি। বাইরে যেতে মন চাচ্ছে না।
আলো তা-ই করলো, হেসে হাতের ট্রে টা প্রেরণাকে দিয়ে ওপাশে সরে যায়। প্রেরণাকে দেখে নিজাম মাহমুদ হেসে বললেন,“হেই লাভলি লেইডি! কি ব্যাপার? তুমি এই বুড়োদের এতোটা পছন্দ করো?”
হাসতে হাসতে এগিয়ে যায় প্রেরণা, উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,“জি। আপনার টানেই তো এখানে এলাম। যখন থেকে আপনাকে দেখেছি আমার তো রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে, মনটা শুধু ছটফট করেছে হ্যান্ডসাম নিজাম মাহমুদকে কখন একটু দেখবো!”
বৃদ্ধরা হাসতে হাসতে ভেঙে পরলেন সবাই প্রেরণার দুষ্টুমিতে। প্রেরণা মিষ্টি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে সবার হাতে শরবত তুলে দিয়ে ঘুরতেই থমকাল। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে ইহান তারই দিকে দৃষ্টি দিয়ে, মুগ্ধতা মেশানো মলিন দৃষ্টিতে দেখছিলো প্রেরণার খিলখিল হাসি বৃদ্ধদের সাথে। যখনি প্রেরণার দৃষ্টিতে মিলন ঘটলো ঐ দৃষ্টির, থতমত খেয়ে ইহান চোখ নামিয়ে মুখটা গম্ভীর করে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে। প্রেরণা দাঁড়িয়ে রইল বিভ্রান্তের ন্যায়। ওদিকে নিজাম মাহমুদ তাকে কি বলছে সে শোনেনা, তার সমস্ত মনোযোগ “ইহান তাজওয়ার মির্জার উপেক্ষাতেই” ছিলো।
আলো আর পরী রিতুর সামনে প্রেরণার কথাই বলছিলো। আলো বললো,“দশটা মেয়ের ক্ষমতা নিয়ে ঘোরে এই মেয়ে। কথায়, আচরণে, মেধা, পরিশ্রমে, সৌন্দর্যে , কেউ একে হারাতে পারবে না।”
পরী মাথা দোলায় আলোর কথায়,“ঠিক বলেছো ভাবী। আমার ওকে ভীষণ পছন্দ। সত্যি যদি অবিবাহিত থাকতো না? ওনকেও এই বাড়িতেই ঢোকাতাম।”
হাসে আলো, বলে,“ঠিক ঠিক! আমিও এটাই ভাবি একে দেখলে।”
রিতু চুপচাপ শোনে তার জা'দের কথা। পরপর একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায় তার ভেতর থেকে। চুপচাপ এগিয়ে যায় সে প্রেরণার কাছে।
কাঁধে কারো হাত টের পেতেই প্রেরণা চ'ম'কে উঠে ঘুরে তাকায়! রিতুকে দেখতেই পেয়েই অস্ফুটে বলে,“আন্টি আপনি!”
ওর হাত থেকে ট্রে টা নিয়ে নেয় রিতু,দরাজ গলায় বলে,“অসুস্থ লাগছে তোমাকে দেখে। দোতলায় গিয়ে বিশ্রাম নাও। জানি তুমি খুব কাজের মেয়ে। যাও।”
প্রেরণা মলিন হেসে দোতলার সিঁড়ি ধরলো। রিতু ওর পেছন পেছন উঠছে, হঠাৎ নিচুগলায় বলল,“তোমার হাজবেন্ড খুব চমৎকার এবং অমায়িক লোক ছিলো। আমাদের বাড়িতে একবার এসেছিল।”
প্রেরণা জবাব দেয়না। রিতু ওকে গেস্ট রুম খুলে দিয়ে বলে,“এখানে শুয়ে নিড়িবিলি রেস্ট নাও। বাইরে এতো ছেলে ছোকরা। তোমাকে দেখলে তো মনেই হয়না তুমি বিবাহিতা। অহেতুক বিরক্ত করবে। আজ তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।”
প্রেরণা জানে না রিতুর এতো খাতিরের কারণ। সে দ্বিধান্বিত চোখে দেখে শুধু। এমনিতেও তার এমন নিড়িবিলি একটা যায়গার দরকার ছিলো কিছু সময়ের জন্য। রিতুকে বিনয়ের সহিত ধন্যবাদ দিয়ে দরজা চাপিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে।
__________
বর বৌকে একসাথে বসিয়ে খাওয়ানো হবে। ইরফান এসে শেহাকে নিয়ে গেল বর আসনের কাছে। ওদিকে ইশিও আবার লাফাতে লাফাতে নিচে নেমে মুঈনের পাশে দাঁড়ালো, ওদের নতুন প্ল্যান উজ্জ্বলের “জুতা চুরি”।
সবুজ বেনারসীতে এক স্নিগ্ধ সরল মেয়েকে উজ্জ্বলের পাশে যখন বসানো হলো, উজ্জ্বল সাথে সাথে খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসলো, হাসলো শেহাও।
উজ্জ্বল বললো,“দাদুর সাথে বিষয়টি নিয়ে তর্ক করেছিলাম। সবুজ রঙের বেনারসী! ব্যাপারটা অদ্ভুত লেগেছিল। দাদু বলল,“সবুজ সতেজতার রং।” আমার স্নিগ্ধ নাতবৌকে এটাতে দারুণ লাগবে। দাদুর কথা ঠিক, সবুজ আসলেই তোমার রং। তোমাকে দারুণ লাগছে শ্রাবন্তী!”
শেহা মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে নিলো । নিচু গলায় বললো,“আর সাদা সম্ভবত আপনার রং। এই শেরোয়ানি আমার পছন্দ না, বাবা কিনেছে।”
পেছন থেকে হৈ হৈ করে উঠলো উজ্জ্বলের বন্ধুরা,“ভাই এখানেই সাংসারিক আলাপ শুরু করে দিলি? আমরা বিয়ে খাবো না?”
জামাই আপ্যায়নে ইনশিরাহ বসেছে, ওকে সাহায্য করছে মুঈন আর ইরফান। সবাই যখন কথাবার্তা আর হাসাহাসিতে ব্যস্ত, তখন ইনু উজ্জ্বলের জুতো জোড়া লেহেঙ্গার দোপাট্টার আড়ালে লুকিয়ে প্রণমিকে সাথে নিয়ে ছুট লাগালো অন্দরে। জুতো জোড়া কোথায় লুকাবে ভেবে পাচ্ছিলো না ইনু। বড়রা দেখলেই তো রাগারাগী করে সব প্ল্যান ভেস্তে দেবে। প্রণমির মাথাতে তখন একটা পরিকল্পনা এলো। ইনুর কানে বললো সে কথাটা।
একদফা অতিথিদের তদারকি করে ইহান বেরিয়ে এলো মাঠে। আজকের আবহাওয়াটা চমৎকার এবং আরামদায়ননক, ভালোয় ভালোয় বৃষ্টি শুরু হবার আগে সব যদি শেষ হয় তবে দারুণ হবে। সকাল থেকে ইরফান দেখেছে সবটা, বাকিটা ইহান দেখবে। মাঠে বেরিয়েই ইহান দাঁড়িয়ে পরলো। মাঠের ভেতর ছোটাছুটি করছে বাচ্চারা, শুদ্ধও আছে ওদের সাথে। ইহান কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ডেকে উঠল,“শুদ্ধ।”
শুদ্ধ ইহান আঙ্কেলের গলার আওয়াজ পেয়েই মুখ হাসি হাসি করে ছুটে গেল, গিয়েই ঝাঁপিয়ে উঠলো কোলে বরাবরের মতো। ওর দুগালে চুমু খেয়ে ইহান বললো,“খেয়েছো?”
_হু।
_কে খাইয়ে দিলো? মাম্মা তো অসুস্থ!
_মামীমনি খাইয়ে দিয়েছে।
_বেশ, আজ এক্সাম কেমন হলো?
_খুব ভালো।
_সব আন্সার করেছো?
_জি। জানো আঙ্কেল মাম্মা বলেছে নেক্সট ভ্যাকেশনে মাম্মা রোলার কোস্টারে চড়তে নিয়ে যাবে আমাকে। এবং সবাইকে নিয়ে যাবে, খালামনি-খালু, মামা-মামীমনি, ইশারা আন্টি- পুলিশ আঙ্কেল, ইকরি মিকরি, মিঠি, শেহা আন্টি আর লআর আঙ্কেল!
_লআর আঙ্কেল?
_নতুন আঙ্কেল।
_ওহহ তুমি বলতে চেয়েছো লইয়ার আঙ্কেল?
হাসতে হাসতে বলে ইহান। শুদ্ধ লাজুক হাসে। ইহান বলে,“আমাকে নেবে না?”
_হ্যা নেবো তো, তোমাকে নেবো।
_তোমার মাম্মা রাজি হয়েছে?
_প্রথমে রাজি হয়নি।
_কেন রাজি হয়নি?
_মাম্মা বলেছে তুমি ব্যস্ত।
ইহান মলিন হেসে আরো একটা চুমু খেলো শুদ্ধকে । আদুরে গলায় বলল,“মাম্মা ঠিকই বলেছে। আমি ভীষণ ব্যস্ত। তবে শুদ্ধর আগে ইহান আঙ্কেলের কোনো ব্যস্ততা নেই ওকে? আমাকে যখন যখন মনে পরবে কল করবে। তবে মাম্মাকে বিরক্ত করবে না, মাম্মাকে ফোন করতে বলবে না, মামীমনিকে বলবে। কেমন?”
শুদ্ধ মাথা দোলায়। ভেতরে বর আসনের কাছে হৈ হট্টগোলের আওয়াজ পেয়ে ইহান শুদ্ধকে নামিয়ে দিয়ে যায় সেখানে।
হৈ হল্লা করছে উজ্জ্বলের বন্ধুরা। খাওয়া শেষে যখন বর বৌকে মুরব্বিদের কাছে দোয়া চাইবার জন্য নিয়ে যাওয়া হবে তখন আবিষ্কার হলো উজ্জ্বলের জুতো নেই। ওনারা পাকরাও করলেন ইশি,ইনু,প্রণমি আর বাকি মেয়েদের। ওরা দাবি করে বসলো আরো পঞ্চাশ হাজার।
এটা নিয়েই খুনসুটি হচ্ছে। কেউ কারো থেকে কম নয়। উজ্জ্বল খালি পায়ে বর আসনে দাঁড়িয়ে আছে, শেহাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
এবার ইহানের মেজাজ বিগড়ে গেলো। গিয়েই নিজের ভাই-বোন আর বোন জামাইদের আড়ালে ডাকলো। এবং চেঁচিয়ে উঠলো ইনু আর ইশির ওপর,“ফাজলামির একটা সীমা থাকে জানিস? তখন না এক লাখ নিলি? আবার কি? এটা কেমন ছ্যাচড়ামি?”
মুঈন আর প্রিতম ভাইবোনদের মধ্যে ঢুকলো না, ওদের বকা খেতে দিয়ে দাঁত কেলাতে কেলাতে বেরিয়ে গেলো। এদিকে ইরফান পারছে না বড় দাদানকে থামাতে।
“ওরা কত বড় বড় অফিসার জানিস? ওনাদের গাড়ি দেখে কতজন সালাম ঠোকে জানিস? তাদের সাথে হেলেদুলে মস্করা করছিস আহাম্মকের মতো!”
ইশির হঠাৎ কান্না চলে আসলো বকুনি খেয়ে, বড় দাদান এভাবে কখনো বকে না। ইরফান ওর ছলছল চোখ দু'টো দেখে ইহানকে সরিয়ে নিয়ে বললো,“কেউ মাইন্ড করছে না। তুমি ওভার রিয়াক্ট করছো!”
_আমি ওভার রিয়াক্ট করছি? দে উজ্জ্বলের জুতো দে। আগে শেহাকে বিদায় জানাই তারপর সন্ধ্যায় তোদের ধরছি!
_জুতো লাগবে?
_হু।
_আমরা কেউ দিতে পারবো না, তোমার লাগলে তুমি গিয়ে নিয়ে আসো।
_আচ্ছা আনবো, কোথায় রেখেছিস?
ইরফান বাঁকা হাসলো। পর পর গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,“প্রেরণা আপুর কাছে। যাও গিয়ে নিয়ে আসো। কেউ যাবে না আমাদের মধ্যে থেকে। জুতা তোমার প্রয়োজন, তুমি আনবে। যাবে, আর প্রেরণা আপুকে বলবে,“আপনার কাছে ওরা যেটা রেখে গিয়েছে, সেটা আমাকে দিন।”
ইনশিরাহ হঠাৎ চোখ মুছে হেসে ফেললো খিলখিল করে। ইনুও হাসছে। ইরফান নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। ইহান ওদের সবাইকে কটমট দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দেখে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে সোজা দোতলায় উঠলো, গেস্ট রুমের দরজার কাছে এসে থামলো ওর পা, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে লম্বা শ্বাস ফেলে নক করলো। খানিক বাদেই প্রেরণা দরজা খুলতেই ইহান ওর দিকে না তাকিয়ে তাড়াহুড়ো গলায় বলল,“আপনার কাছে ওরা যা রেখে গিয়েছে আমাকে দিন।”
প্রেরণা দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলো লোকটার দিকে। তারপর গিয়ে একটা গোলাপ ফুল এনে ইহানের দিকে বাড়িয়ে দিতেই ইহান চোখ বড়বড় করে তাকালো,কেশে উঠল। অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেও সামলাতে পারলো না নিজের গলা, বললো,“এটা.... মানে এটা কেন?....ফুল দিয়ে কি?....কেন?”
প্রেরণা কপাল কোচকায়, অবাক হয়ে বলে,“ওরা তো এটাই রেখে গেলো আমার কাছে! এটা উজ্জ্বল ভাই এনেছে শেহার জন্য।”
নিমিষেই হাঁফ ছাড়ল ইহান। ফুলটা নিলো না, সংকোচ নিয়ে বলে,“স্যরি এটা না আসলে.....”
ঠিক তখুনি পেছন থেকে ইরফানের আওয়াজ পেলো। ইশির ঘর থেকে উজ্জ্বলের লুকানো জুতা নিয়ে সিঁড়ির কাছে যেতে যেতে বলে,“চল্লিশ হাজারে রাজি হয়েছে দাদান। যতটা ভেবেছি অতটা কিপ্টে না।”
ইহান দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গেলো, ভাইকে হুমকি দিয়ে বলল,“এই শেহার বিদায়ের পরে তোরা সবকটা আমার সাথে দেখা করবি!”
মিছিমিছি হাই তুললো ইরফান, জবাব দিলো, “ হবে না। আমরাও যাচ্ছি শেহার সাথে।”
_________
সন্ধ্যা হবো হবো করছিলো তখন, বৃষ্টিও নামবে বোধহয়। শেহা তখন শান্তিনীড়ের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বাবা,মামা মামীরা আর ভাইবোনদের কাছ থেকে বিদায় নেবে বলে।
শান্ত একটুও কাঁদছে না। নিজেকে খুব শক্ত রাখার চেষ্টা করে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলে,“আমি জানি তুমি খুব ভালো থাকবে। সেই চেষ্টা তোমার মধ্যে আছে। নিজের সাথে সাথে উজ্জ্বল আর দাদুকেও ভালো রেখো। সামান্য দায়িত্ব বাড়িয়ে দিলাম মা। সামান্য একটু দায়িত্ব!”
শেহা কাঁদছে বাবাকে ধরে রেখে। ওর মামীরা ওকে টেনে নিয়ে চুমু খেলো অজস্র। এরপর এলো ওর মামাদের পালা, ইশিতার একমাত্র সন্তানকে সব মামারাই মাত্রারিক্ত স্নেহ করেছে, বলতে গেলে নিজের ছেলে মেয়েদের থেকেও বেশি আহ্লাদ দিয়েছে শেহাকে।
শেহা মামাদের ধরে কাঁদছে, মামারা ওকে ধরে কাঁদছে। উজ্জ্বল বিব্রত ভঙ্গিতে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে।
ইনু,ইশি একপাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। ওদের কান্না শুনে কান্না পাচ্ছে প্রণমিরও। শেহা সবাইকে বিদায়ী আলিঙ্গন করে একদফা কেঁদে গিয়ে ইহানের সামনে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় ইরফানের সামনে। দুই ভাই ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে উজ্জ্বলের হাতে তুলে দেয়। ইহান গলার স্বর খুব স্বাভাবিক রেখে বলে,“আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে সরল মনের মেয়েটিকে আপনি নিয়ে নিলেন। প্লিজ.....”
উজ্জ্বল ওকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আলিঙ্গন করলো ইহানকে,ইরফানকে। নিজের শ্বশুর আর মামা শ্বশুরদের হাতে ধরে দোয়া নিয়ে বৌয়ের হাত ধরে গাড়িতে উঠলো। নিজাম মাহমুদ এসে দাঁড়ালেন এ বাড়ির বড়দের সামনে। সবার কান্না দেখে অশ্রুসিক্ত তারও চোখ। ধরা গলায় সবাইকে আশ্বস্ত করলেন,“যতদিন জীবিত আছি, ওদের দু'জনের পাশে থাকবো ইনশাআল্লাহ। খুব সুন্দর করে সংসার করা শেখাবো ওদের। এতো কান্নাকাটির কিছু হয়নি!”
শেষ সময়ে প্রেরণাও নামলো, পরী চোখের পানি মুছে এসে ওকে বললো,“ইশি-মুঈন, ইরফান-প্রণমি, ইনু-প্রিতম সবাই যাচ্ছে শেহার সাথে। তুমি যাবে? শুদ্ধর ভালো লাগতো।”
_না আন্টি,শুদ্ধর পরিক্ষা চলছে তো।
কথাটা বলেই প্রেরণা আশেপাশে তাকিয়ে শুদ্ধকে খুঁজতে লাগল। দেখতে পেলো শুদ্ধ ইহানের কোলে। শেহাকে নিয়ে যখন বরের গাড়ি শান্তি নীড়ের গেট পেরুলো, তখনো ইহান গেটের কাছে দাঁড়িয়ে শুদ্ধর সাথে কথা বলছে অনবরত,শুদ্ধকে বিবরণ দিচ্ছে,“শেহা আন্টি এখন থেকে লইয়ার আঙ্কেলের বাড়িতে থাকবে। কারণ তাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।”
শুদ্ধ গভীর মনোযোগে তার সমস্ত কৌতুহলী প্রশ্ন গুলোর উত্তর জেনে নিচ্ছে। প্রেরণা দৃশ্যটা কিছুক্ষণ দেখে ভেতরে ঢুকে মিস জেনিকে খুঁজতে লাগল। এখন তাদের বেরুতেই হবে।
চলমান......
[ এই পর্বের আরো কিছু দৃশ্য বাকি আছে। আরেকটা অংশ আসবে রাতে । এখন পড়তে বসতে হবে তাই লেখা সম্ভব না। ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১৮ [ ৩য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
[ ৩য় অংশ ]
পুরান ঢাকাতে রাজকীয় এই বাড়িটা শেহার স্বামীর বাড়ি। নেমপ্লেটে বড়সড় করে লেখা “খান প্যালেস।”
নিচের দেয়ালে আচড় কেটে ছোটো করে লেখা “খানদের খানদানি প্যালেস।” দেখলেই বোঝা যায় পাড়ার কোনো দস্যি ছেলে এটা করেছে।
ওরা যখন পৌঁছালো তখন এশার আজান দিয়েছে। আজ রাস্তায় খুব জ্যাম ছিলো। বেনারসীতে ঘেমে নেয়ে একাকার শেহা গাড়ি থেকে নেমেই ফুরফুরে হাওয়া আর চোখের সামনে সাদা রঙের বাড়িটা দেখে একটু শান্ত হলো। কেঁদে কেটে সাজগোজের অবস্থা খুব খারাপ করেছে মেয়েটা।
উজ্জ্বলের কলিগ ও বন্ধুসহ দূরের বরযাত্রীরা চলে গিয়েছে। এখানে আপাতত নিজাম মাহমুদ, উজ্জ্বল, তার কিছু চাচা-চাচী আর বাড়ির জন-বিশেক কেয়ার টেকার ছাড়া আর কেউ নেই।
নিজাম মাহমুদ গাড়ি থেকে নেমে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন,“বাড়িটা মহিলা বিবর্জিত ছিল এতদিন। নাতবৌ আসবে শুনে চারজন খালা রেখেছি।”
মুঈন বললো,“আপনাদের নিকট আত্মীয়ের ভেতরেও কোনো মহিলা নেই?”
_আছে, তবে সবাই লন্ডনে সেটেলড। এখানে যে কয়জন আছে তারা ভেতরে আছে বৌ বরণ করবে বলে। দু'দিন থেকে চলে যাবে বরিশাল।
বলেই নিজাম মাহমুদ এসে শেহার হাত ধরলো,নরম গলায় বলল “অসুস্থ হয়ে পরলে? এসো গিন্নি। তোমার সংসারে।”
শেহা দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব কিছু দেখছে। ওর পেছনে পেছনে ঢুকলো মুঈন-ইশি, ইরফান-প্রণমি, ইনু-প্রিতম। বাড়িতে ঢুকেই উজ্জ্বল আর নিজাম মাহমুদ ব্যস্ত হয়ে পরেন অতিথি আপ্যায়নে। হেল্পিং হ্যান্ডদের পর্যায়ক্রমে এটা সেটা আদেশ দিয়ে নাজেহাল অবস্থা করে ছাড়লেন। সবাই হাপাচ্ছে। উজ্জ্বলের দুজন চাচী এসে শেহাকে সামলে নিলো। এক পর্ব চলে গেলো শেহার মুখ দেখে তার হাতে উপহার সামগ্রী তুলে দিতে দিতেই।
মুঈন,ইরফান ও প্রিতম সহ বাকিদের এই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে খুব একটা সময় লাগলো না, এখানের সবাই বেশ আন্তরিক। রাতের খাবারের পরে সবাই মিলে কিছুক্ষণ গল্প করলেন নিচতলায় বসে। নিজাম মাহমুদকে সবাই ধরলো একটা গাওয়ার জন্য। নিজাম মাহমুদ গাইলেন, তারপরই তিনি ব্যস্ত হয়ে পরলেন কখন তার নাতি আর নাতি বৌকে বাসরঘরে ঢোকাবেন। বিয়ের দুই মাস কেটেছে, এখনো বিষয় টা নিয়ে ঐ কপোত কপোতীর ধৈর্য্য নিয়ে খেলার কোনো মানে হয়না। ইনু ইশিকে ইশারা দিয়ে বললেন,“বোনকে ঘরে রেখে এসো। আমি নাতিকে পাঠাচ্ছি।”
ততক্ষণে উজ্জ্বল শেরোয়ানি খুলে একটা পাঞ্জাবি পরেছে । আর শেহাকে পরানো হয়েছে হলুদ জমিন আর সোনালি পাড়ের একটি শিফনের শাড়ী। শুরুতেই ওকে গোসল করিয়ে মেকআপ তুলেছে ইনশিরাহ। এরপর ইনু হালকা করে সাজিয়ে দিলো। খোলা চুল, ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস আর চোখে চশমা, হাতে চুড়ির বদলে শিউলি ফুলের মালা, এই হচ্ছে শেহার বাসরের সাজ।
ওকে বাসরের খাটে বসিয়ে ইনু,ইশি আর প্রণমি বেরুলো ঘরে। ওদের ঘুমানোর ব্যবস্থা হয়েছে দোতলারই তিনটা কামরায়।
__________
প্রেরণা যেতে পারেনি। যখন বেরুবে বলে মনস্থির করলো ঠিক তখনই এমন ঝড় শুরু হলো, এ বাড়ির মুরুব্বিরা আটকে দিলেন ওর যাওয়া। আর শুদ্ধটাও তাল মেলালো। এরপর প্রেরণার সাধ্য ছিলো না ওকে নিয়ে বেরুনোর।
শান্ত নিচতলায় মনমরা হয়ে বসে আছে, মেয়েকে বিদায় দিয়ে একদফা কেঁদে অসুস্থ হয়েছে, শেহাকে কেউ জানায়নি সে কথা। ওকে ঘিরে বসে আছে বাড়ির সবাই,ওকে সান্ত্বনা দিতে। প্রেরণা ছেলেকে নিয়ে দোতলায় উঠলো, শুদ্ধকে পড়াতে বসতে হবে তাই।
হাতের কাছে বই নেই, আলোর কাছে চেয়ে নিলো ইশির কমন ইউজের ল্যাপটপ। এরপর শুদ্ধর ক্লাসের সব অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে শেষটায় জিহাদুল কবিরকে কল করলো সে। লোকটা প্রায়শই কল করে প্রেরণাকে,নাম্বারটা এই ফোনেই আছে। বেশি কিছু খতিয়ে ভাবলোও না প্রেরণা, তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল শুদ্ধর পড়ার বিষয়টি।
কলটা রিসিভ করলেন জিহাদুলের স্ত্রী জেরিন। প্রেরণার পরিচয় জেনে ভদ্রমহিলা কেমন গম্ভীর হয়ে বলে,“শুদ্ধদের সাইন্স সাবজেক্টের পিডিএফ তো রিতা ম্যামের কাছেই পেয়ে যেতেন।”
_আসলে ভাবী, সবার নাম্বার আমার অফিশিয়াল ফোনে,সেটা বাড়িতে রেখে এসেছি। ভাইয়ের নাম্বারটা এই ফোনে ছিলো তাই....
_জিহাদের নাম্বার আপনার পার্সোনাল ফোনে?
ভদ্রমহিলার হঠাৎ প্রশ্নে প্রেরণা বিব্রত বোধ করলো হঠাৎ, বলতে চাইলো,“মানে ভাই প্রায়শই শুদ্ধর খোজ নিতে আমাকে কল দেয়..”
পারলো না বলতে,ওপাশে জেরিন ব্যস্ত হয়ে বললো,“দিচ্ছি ফাইলটা। রাখুন।”
_ধন্য......!
ধন্যবাদটাও প্রেরণা বলতে পারলো না। বিষয়টাতে খুবই খারাপ লাগছে তার। সে তো আর অবুঝ নয় যে এসব বুঝবে না? বড় বড় শ্বাস ফেলে প্রেরণা। আর কত? এই অপমান অসহনীয়! ছেলেকে রেখে উঠে দাঁড়ায় প্রেরণা, ইশির ঘরের আয়নায় নিজেকে দেখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। সে মোটেও অত সুন্দর না যে আরেক ভদ্রমহিলা ইনসিকিউরড থাকবে নিজের স্বামীকে নিয়ে, নাকি প্রেরণার হাবভাব গায়ে পরা মেয়েদের মতো তাই ভদ্রমহিলারা ভাবে তাদের স্বামীকে হয়তো প্রেরণা ছিনিয়ে নেবে, কোনটা? আসলে কোনটা?
পিডিএফ আসে মেইলে। শুদ্ধকে আধাঘণ্টা পড়িয়েছে প্রেরণা এর মাঝে ইহান দরজায় এসে নক করলো, প্রেরণা মলিন মুখে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই ইহান ধীরে ধীরে বললো,“নিচে ডাকছে বড় মা, খেতে। মিস জেনি খেয়ে নিয়েছে, আপনি শুদ্ধকে নিয়ে যান।”
শুদ্ধ এলো লাফাতে লাফাতে,“আঙ্কেল খাওয়ার পরে আমি তোমার সাথে বাঞ্জি জাম্পিং খেলবো,আমি ডাউনলোড করেছি গেম।”
ইহান ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর দিয়ে বললো,“আজ না বাবা। তোমার এক্সাম। মাম্মা বকবে!”
_এক্সাম দুদিন পরে, আমি খেলবো খেলবো খেলবো।
এইমাত্র জিহাদুল কবিরের স্ত্রীর বিষয়টি নিয়ে প্রেরণা এমনিতেই মনমরা হয়ে ছিল। শুদ্ধর এই জেদ দেখে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না, চেঁচিয়ে উঠলো শুদ্ধর ওপর,“একদম চুপ করবে তুমি ফাজিল ছেলে! তোমার জন্য যথেষ্ট বিরক্ত হচ্ছি আমি! অনেক বিব্রত করছো আমাকে! সবসময় বিব্রত হতে হয় আমাকে।”
মায়ের ধ'ম'ক খেয়ে শুদ্ধ গুটিয়ে গেলো। একেবারেই চুপ হয়ে গেল। সে তো আর অবাধ্য ছেলে নয়! ইহান ছেলেটাকে কোলে নিয়ে অবাক হয়ে প্রেরণাকে দেখে নিচুগলায় বলল,“একটা সহজ আবদার করেছে,যেটা সব বাচ্চারাই করে থাকে। এতে বিরক্ত হবার কি আছে? আপনার হয়েছে টা কি?”
জবাব দিলো না প্রেরণা, শুদ্ধকে ইহানের কোল থেকে নিয়ে চলে গেল নিচে। ইহান থমথমে মুখে ঘরে ঢুকে ঠাশ করে দরজা লাগায়। বিরক্ত তো তারও লাগছে। মন চাইলেও কিছু করতে না পারার বিরক্তি তার গলা চেপে ধরছে ক্রমশ !
__________
প্রণমিকে একটা ঘরে বসিয়ে রেখে ইশি চলে গিয়েছে মুঈনের কাছে । প্রণমি বিশ মিনিট ধরে অপেক্ষা করে চূড়ান্ত বিরক্ত হলো ইরফানের ওপর। এটা অচেনা যায়গা,লোকটা জানেনা প্রণমি একা থাকতে পারবে না? নিশ্চয়ই কোনো চিপা চাপায় সিগারেট ফুঁকতে গিয়েছে। এরপর হেলেদুলে ঢুকবে রুমে আর গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলবে,“চলো শুয়ে পরি। মেলা রাত হলো!”
রাগ বাড়ছে প্রণমির। ভাইয়ার ঘরে ভাইয়া আর ভাবী কত খুনসুটি করছে, মুঈন দুলাভাই আর ইশি আপুও তাই। আর সে? আরে সিগারেট খেতে তো প্রণমি বারণ করে না! সিগারেট খেয়ে এসে চুমুও খায় প্রণমিকে তাহলে সামনে খেলে কি হয়? ওটা লুকিয়ে খেতে হবে কেন? ওনার যখন মর্জি হবে তখন দেখবে প্রণমিকে? প্রণমি না দেখুক, লোকটার অস্তিত্ব আশা করতে পারেনা যখন তখন?
আরো পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করার পরে হঠাৎ দরজায় শব্দ হতেই প্রণমি চমকে উঠলো, অচেনা বাড়ি বিধায় সাবধানতা বশত জানতে চাইলো,“কে?”
ইরফান দরজা চাপিয়ে হালকা গলায় বললো,“তোমার বেয়াই ইরফান মির্জা!”
হঠাৎ করেই রাগটা পরে গেল প্রণমির। মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,“তো আমার ঘরে কি? ভাইয়া আপুকে ডাকবো?”
_কেন?
_নালিশ করবো তাই।
_কি করেছি আমি?
প্রণমি যেন দ্বিধায় পরলো প্রশ্নটাতে, সত্যিই ভাবতে বসলো এই লোকের নামে কি অভিযোগ আনবে? ইরফান এসে খপ করে ধরে ওকে আগলে নিলো। থুতনি আলতো হাতে চেপে ধরে বললো,“ভাবতে হবে না। নালিশ করার পাঁচ ছয়টা কারণ আমি এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি। তুমি পরে ঠান্ডা মাথায় ভেবো আমার কোন “অপরাধ” টা পছন্দ হয়, কেমন?”
_________
ওয়াশ রুমে অনেকটা সময় লাগাচ্ছে ইনু। এখানে আসার সময় তার স্ক্রিন কেয়ারের যাবতীয় প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছে পাউচে করে। সারাদিনের মেকআপ তুলে একটু আরামে রূপচর্চা করছে। ওপাশ থেকে প্রিতম ডেকে চলেছে সেই কখন থেকে। হুট করে ইনু রেগে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলো। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে বললো,“হয়েছে কি? সমস্যা কি? এমন ভাব করছো যেন আমাকে ছাড়া ঘুমাতেই পারো না,আমি তোমার কোলবালিশ! এটা আরেক বাড়ি। এভাবে চেঁচিয়ে ডাকছো,লোক কি ভাববে?”
বলতে বলতেই ইনু দেখতে পেলো বিছানায় প্রিতমের ল্যাপটপ। হঠাৎ করে ঢোক গিলে ইনু বললো,“এটা এখানে কি করছে? আমি এখানে পড়বো না। আমাকে ক্ষমা করো! দোহাই তোমার!”
প্রিতম চুপচাপ তাকিয়ে আছে। ইনু বললো,“ওও পড়াবে না? আসলে আমাকে এতোটা আতঙ্ক দিয়ে রেখেছো এই পড়াশোনা নিয়ে। সবসময় মাথায় এই কথাটাই ঘুরপাক খায়। তুমি যখন চুমু খেতেও কাছে টানো, আমার মনে হয় যেন তুমি বলে উঠবে,“কালকে যে থিসিস পেপার রেডি করে দিয়েছিলাম সেটা মুখস্থ বলো জান।”
প্রিতম ওর দিকে খানিক সময় চেয়ে থেকে চুপচাপ ওর হাত টেনে নিয়ে বসালো বিছানায়, কিছুক্ষণ ইনুকে দেখে উচ্চশব্দে হেসে ফেলে বললো,“তোমার আমার কাপল পিক গুলো দেখবো এখন, সেজন্য এটা বের করেছি।”
বড় বড় হাঁফ ছাড়ল ইনু, যেন একটু স্বস্তি পেল। কিন্তু তক্ষুনি বাঁকা হাসলো প্রিতম,পর পর বললো,“তবে হ্যা। ঘুমানোর আগে তিন নাম্বার থিসিস টা মুখস্থ বলে ঘুমিয়ো। কেমন জান?”
__________
লবিতে নিজাম মাহমুদের সাথে দেখা। তাকে শুভ রাত্রি জানিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল ইশি। উজ্জ্বলকে শেহার কাছে পাঠিয়ে এইমাত্র সে ফুরসৎ পেলো ঘুমোতে যাওয়ার।
ঘরে ঢুকে দেখল মুঈন কারো সাথে কথা বলছে । অফিশিয়াল ফোন। ইশি ওকে বিরক্ত না করে বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসল। একদৃষ্টে চেয়ে রইল মুঈনের দিকে। লোকটা নিজের ট্রান্সফার সংক্রান্ত ঝামেলা নিয়ে এর ওর কাছে ধর্না দিচ্ছে বিগত কয়েকদিন ধরে। কাউকে বাদ রাখছে না অনুরোধ করতে। অথচ কিছু টাকা দিলেই বিষয়টা সুন্দর করে সমাধান হয়, সেই টাকাটা সে শ্বশুরের থেকে নেবে না মরে গেলেও এটাই তার পণ।
দীর্ঘসময় আইজিপি স্যারের সাথে কথা শেষ করেই ইশিকে কাছে টানলো মুঈন। মুখটা শুকনো তার, কাল খুব ভোরে এখান থেকেই চলে যেতে হবে তাকে। ইশির কপালে চুমু খেয়ে উদাস গলায় বলল,“শুনছি আমাকে প্রয়োজনে মফস্বলে ট্রান্সফার করবে তবুও এখানে আনবে না।”
ইশি লোকটার দুগালে নরম দু'টো হাত রেখে বললো,“ট্রান্সফার না হলে নাই, তোমার কারো কাছ থেকে টাকাও নিতে হবে না। আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো।”
হাসলো মুঈন, শুয়ে পরলো ইশিকে নিয়ে, ওকে পরম আবেগে জড়িয়ে ধরে বললো,“তুমি সেইফলি আমার পরীদের এনে দাও। এবং কিছুটা সময় দাও আমাকে। আমি কখনোই এক জেলাতে একবছরের বেশি টিকবো বলে মনে হয়না ইশি! চৌষট্টি জেলাতে, যেখানে যেখানে এই মুঈন ফরাজী বদলি হবে। তার বৌ আর মেয়েদের সাথে নিয়েই হবে, একটুও কাছ ছাড়া করবে না তখন তিনজনকে। শুধু আর কয়েকটা মাস!”
_তুমি বুঝলে কি করে মেয়েই হবে?
চুমু খেলো ওকে মুঈন, বললো,“এটা আমার বাবা সুলভ গাট ফিলিং!”
_________
ফুলের ঘ্রাণে মঁ মঁ করছে গোটা কামরা। সব দেশীয় ফুল। কড়া ঘ্রাণে মাথা ঝিমঝিম করে উঠতে চায় শেহার। ইচ্ছে করে স্নো হোয়াইটের মতো লম্বা ঘুমে তলিয়ে যেতে। কিন্তু না,এখন ঘুমিয়ে পরা যাবে না, লোকটা কি না কি ভেবে বসবে!
তাই ঘুম তাড়াতে হাত বাড়িয়ে একটা ফুল তুলে ফুলের পাপড়ি ছিঁড়তে থাকে শেহা, খুবই মনযোগ দিয়ে।
উজ্জ্বল ঘরে ঢোকে খুবই সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। দাদুর রুমে ছিলো এতক্ষণ সে,দাদুকে ওষুধ খাইয়েছে। ও ঘরে ঢুকতেই শেহা নড়েচড়ে উঠলো। উজ্জ্বল আন্তরিক হাসি হেসে হালকা গলায় বললো,“তো যা ফোনে বলেছিলাম শ্রাবন্তী। রাতের এই সময়টা আমি দাদুকে ওষুধ খাইয়ে ঘরে ঢুকি,একটু দেরি হয় ঘরে ঢুকতে। তুমি কি বিরক্ত হবে?”
দু'পাশে মাথা নাড়ে শেহা, বলে,“রাতের এই সময়টা আমিও পড়া রিভিশন দিই। আপনি কি বিরক্ত হবেন?”
উজ্জ্বলও হেসে চুপচাপ মাথা নেড়ে দরজা লাগায়। দরজা লাগাতে গিয়ে টের পায় উজ্জ্বল,তার হাত কাঁপছে। অতি হাস্যকর ব্যাপার!
শেহা উঠে দাঁড়ায়। উজ্জ্বল বলে,“আরে উঠে দাড়ালে কেন? বসো, প্লিজ যদি সালাম করতে চাও তবে আমি হতাশ হবো!”
শেহা লাজুক হেসে বললো,“না মানে আপনাকে দেখে দাঁড়ালাম!”
_আচ্ছা বসো। বাবার সাথে কথা হয়েছে?
_জি।
উজ্জ্বল বসলো শেহার মুখোমুখি। মেয়েটাকে দেখলো মুগ্ধ হয়ে। গত দুই মাসে দু'জন কত সহজ হয়েছে, উজ্জ্বল মাঝে মাঝে রাতে ভেবেও রেখেছে প্রথম রাতে কিভাবে প্রেমময় আলাপ শুরু করবে। অথচ চোখের সামনে বৌকে পেয়ে সেসব কথা ভুলে বসে গিয়েছে সে। কোনো কথা আসছে না তার। শুধু পাঞ্জাবির পকেট থেকে এক জোড়া চিকন সোনার চুড়ি বের করে শেহাকে বললো,“তোমার গিফট। হাত দাও।”
শেহা অবলিলায় হাত বাড়িয়ে দিলো। চুড়ি দু'টো তার গোলগাল হাতে বেশ আকর্ষণীয় লাগছে। এবার উজ্জ্বলের জন্য উপহার বের করলো শেহা। মানুষটা এই দুইমাসে প্রচুর গিফট তাকে দিয়েছে। শেহা তার নিজের জমানো টাকা দিয়ে উজ্জ্বলের জন্য একটা স্বর্ণখোচিত সাইন পেন কিনেছে। এছাড়া শেহা ভেবে পায়নি লোকটাকে আর কি দেওয়া যায়। লোকটার কাছে সবসময় একটা কলম থাকেই, এটা খুবই দরকারি হয়তো লোকটার কাছে।
উজ্জ্বল শেহাকে ধন্যবাদ দিয়ে উপহার টা তার কেবিনেটে সযত্নে তুলে রেখে বসলো। ঘড়ির কাঁটায় তখন বারোটা বেজেছে। শেহা ঘড়ির দিকে তাকাতেই সংকোচে গাঁট হলো। বেশ রাত হলো, এখন কি করবে শেহা? ঘুমিয়ে পরবে? লোকটার কাছে জানতে চাইবে এখন তারা ঘুমাবে কিনা? সেটা কেমন দেখায়? বিয়ের দুই মাস পেরিয়েছে,এখন এতো নখরা করার কোনো মানে আছে? নেই তো!
উজ্জ্বল যেন পড়তে চাইছে শেহাকে, শেহার সংকোচকে, হঠাৎ বেশ স্বাভাবিক গলায় বলে উঠলো,“যদি এখনও তুমি হঠাৎ বলে ওঠো তুমি কাউকে ভালোবাসতে তাকে ভুলে মনের সমস্ত খারাপ লাগা সরিয়ে আমাকে সহজ ভাবে মেনে নিতে আরো দু'টো দিন সময় চাও তবুও আমি মাইন্ড করবো না।”
শেহা হোঁচট খেল, পরপর নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,“ওমা! এতো ভালো আর উদার লোক আপনি?”
হেসে ফেললো উজ্জ্বল,শেহার নাক টিপে দিয়ে বললো,“না আমি সাইকোলিজস্ট! এবং আমি মোটেও চাইনা আমি আমার বৌকে যখন প্রথম ভালোবাসবো তখন সে তার কোনো এক্স ফেক্সের কথা মাথায় আনুক।”
শেহা হাসছে লজ্জা পেয়ে। নাক ডলতে ডলতে বলছে,“এক্স বুঝলাম, ফেক্স কি? এটাও এক্সের প্রজাতি?”
_হ্যা। একটা হলে এক্স। দুজন হলে এক্স ফেক্স।
নিস্তব্ধ বাড়িটাতে গভীর রাতে ওদের দুজনের চাপা হাসির রোল পরে। শেহা হাসতে হাসতে বলে,“আপনার শুনেছি তিনজন ছিলো প্রেমিকা। তবে সেটা কি হবে? এক্স-ফেক্স-টেক্স?”
উজ্জ্বল হাসতে হাসতে বলে,“দাদু কাউন্ট করতে ভুল করেছে। আমার পাঁচজন ছিল প্রেমিকা। তাহলে সেটা হবে এক্স-ফেক্স-টেক্স -মেক্স-রেক্স।”
শেহা মুখ চেপে হাসছে। লোকটার মাঝে একটা “দুষ্টু বাচ্চা” টাইপের ব্যপার আছে। যেটা শেহা বরাবর উপভোগ করে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে শেহা ধীরে ধীরে বলে,“নেই এমন কেউ আমার। এক্স-ফেক্স-টেক্স -মেক্স-রেক্স কিছুই নেই আমার। আপনাকে আপন করতেও অসুবিধা নেই।”
উজ্জ্বল চুপ করে দেখতে লাগলো মেয়েটাকে। শেহা চোখ নামিয়ে নেয়। সত্যি বলতে শেহা বহুবার চেয়েছে উজ্জ্বলের সাথে রাগী মির্জার কথা বলে দিয়ে একটু হালকা হতে। তবে শেহা পারেনি। কখনো পারবেও না। কি লাভ হবে? লোকটার সাথে দাম্পত্যে ঐ তথ্যটার আদৌও কোনো দরকার আছে? অযথা ঝামেলা হবে। শেহা নিজের আবেগ তাড়িয়েছে এটা শেহা জানে, তবে সংসার জীবনে কখনো মনোমালিন্য হলে লোকটা যদি শেহার অতীত টেনে হীনমন্যতায় ভোগে? যদি কখনো লোকটা মনে মনে এটা ভেবে কষ্ট পায় যে শেহা হয়তো তাকে প্রথম আবেগের মতো ভালোবাসতে পারছে না তখন? আর সবার মতামত কি শেহা জানে না,তবে শেহার মত হলো কিছু গোপন কথা যেগুলো সবসময় গোপন রাখাই উত্তম। কোথায় যেন পড়েছিল শেহা, কিছু গোপন কথাকে শাড়ির মতো ভাজ করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়। কাউকে দেখাতে হয়না। শেহাও ওটাই করবে।
শেহার অন্যমনস্কতা কাটলো গালে শক্ত হাতের স্পর্শ পেয়ে। শেহা গলা খাঁকারি দিয়ে গুটিয়ে গেলো। উজ্জ্বল নরম গলায় বললো,“কি ভাবছো শ্রাবন্তী?”
শেহা দুই পাশে মাথা নেড়ে আবারও বলে,“নেই! আমার কোনো অতীত নেই।”
একটা অমায়িক হাসি উপহার দিলো ওকে উজ্জ্বল। গালে হাত বোলাতে বোলাতে বললো,“আচ্ছা আচ্ছা বুঝলাম তোমার কোনো অতীত নেই। তুমি একেবারে প্রস্তুত আমাকে মানতে। তবুও এখন ঘুমাও , সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত তুমি। একটু সময় তো প্রয়োজন। আর এটা জরুরি নয় বাসরটা বাসর রাতেই করতে হয়!”
এই প্রথম লোকটার লাগাম ছাড়া কথা শুনে শেহার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে, লজ্জায় চোখ দু'টো পর্যন্ত তুলতে পারছে না। শক্ত হয়ে বসে আছে। উজ্জ্বল গোবেচারি শেহাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। পরপর এক আচানক কান্ড করে বসলো উজ্জ্বল। শেহাকে বুঝতে সময় টুকুও দিলো না, আলতো হাতে ওকে টেনে এনে পর পর তিনটা চুমু খেলো। একটা শেহার কপালে, একটা গালে আর একটা ঘাড়ে।
এই অতর্কিতে হামলায় থড়থড়িয়ে কেঁপে উঠল শেহার গোটা সত্তা। মিনিট খানেক হাঁপিয়ে অস্ফুটে লোকটাকে বললো,“তবে এটা কি ছিলো?”
উজ্জ্বল ধরে রাখলো মেয়েটাকে, গালে ঠেকালো গাল। শেহার কানে কানে বললো,“এটা মায়া, যেটা প্রথম রাতে লাগিয়ে দেয়া জরুরি!”
শেহা চোখ বন্ধ করে খামছে ধরে থাকলো বিছানার চাদর। উজ্জ্বল সরে এলো মেয়েটার থেকে। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না। পরে শেহাই ধীরে ধীরে চোখ খুলে সহজ স্বাভাবিক লোকটাকে দেখলো। লোকটা বিছানা ঠিক করছে। শেহার ফোন,পার্স সরিয়ে রাখছে। শেহা শুধু দেখতেই লাগলো লোকটাকে, ভীষণ সুন্দর লোকটাকে, বয়সে শেহার থেকে বেশ বড় লোকটাকে।
উজ্জ্বল হাতের কাজ গুলো করে হঠাৎ থামলো। চোখ রাখলো শেহার চোখে। মুখোমুখি এসে বসে ধীরে ধীরে বসলো, হাত বাড়িয়ে চশমা খুললো শেহার। শেহা নড়চড় করে না, উজ্জ্বল বলে ওঠে,“যদিও এটা প্রথম রাতে জরুরি নয় তবুও....ক্যান আই হাগ ইউ?”
শেহা চুপচাপ চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। উজ্জ্বল আরো কিছুটা এগিয়ে বসে বললো,“শ্রাবন্তী আমি সাইকোলজিস্ট হলেও সবসময় মনের কথা বুঝি না, উত্তরটা মুখে দাও।”
লজ্জায় জমে গেলো শেহা, পর পর সব সংকোচ দূরে সরিয়ে নিচু স্বরে জবাব দিলো,“এনিটাইম।”
উত্তরটা দিতে দেরি, উজ্জ্বল ওকে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। পবিত্র মিলনের প্রথম আলিঙ্গনে দু'জনেই আবেগে তিরতির করে কাঁপতে থাকলো লক্ষ লক্ষ মুহুর্ত!
শেহার ইচ্ছে করলো না নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে, উজ্জ্বলও ছাড়লো না। ঘড়ির কাঁটা যখন একটার ঘরে তখন উজ্জ্বল বললো,“আমাদের এখন ঘুমানো উচিত।”
শেহা জবাব দিলো না। হঠাৎ উজ্জ্বল টের পেলো শেহা কাঁদছে। ওকে আগলে নিয়ে গলায় দরদ ঢেলে উজ্জ্বল বললো,“তোমাকে বিব্রত করেছি?”
দু'পাশে মাথা নাড়ে শেহা, জবাবটা দেয়না উজ্জ্বলকে। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“যদিও এটা জরুরি নয় তবে আপনি আমার চোখ দু'টো মুছিয়ে দেবেন প্লিজ? আমার হাত কাঁপছে, আমি কাঁপছি! থামতে পারছি না।”
চলমান......