#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২০
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
রাত তখন দেড়টা। প্রণমি ঘুমিয়েছে নিশ্চিত হতেই ইরফান উঠে এসে দোতলার লিভিং রুমে বসলো। ইহানের ঘরের দরজা হাট করে খোলা, তারমানে সে আসেনি তখনো। ইরফানের অপেক্ষা মূলত ইহানেরই জন্য। ইশির কলটা সকালে ধরতে না পারলেও মেসেজ দেখেছে। অফিসের ব্যস্ততায় হাঁফ ছাড়তে পারেনি সে আজ সারাদিন। মেসেজটা দেখেই মাথাটা গরম হয়েছে। সেই থেকে এক রাশ বিরক্তি আর ছটফটানি নিয়ে দাদানের জন্য অপেক্ষমাণ।
ইহান বাড়িতে ঢুকে দোতলায় উঠে ইরফানকে সজাগ দেখে দাঁড়ালো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। ইরফানের মুখভঙ্গি দেখে ও কি বলতে চায় সে কথা বুঝে ফেলে ইহান। তবে তার তরফ থেকে এই প্রসঙ্গে দু'টো শব্দ বলার আগ্রহ পায়না, চুপচাপ ঢুকে পরে নিজের রুমে। ইরফান নাছোড়বান্দা, দাদানের পেছন পেছন গিয়ে হাতটা টেনে ধরলো দাদানের।
নিস্তেজ স্বর ইহানের,ভাইকে বলল,“ইরফান আমি ক্লান্ত।”
ইরফান দাদানকে ঘুরিয়ে নিলো, মৃদু আওয়াজে চেচালো,“ন্যাকামি কেন করছো? কেন? বিয়েতে কেন রাজি হয়েছো তুমি? এটা কেমন মশকরা?”
সারাদিনের জমে থাকা হতাশা ফেটে বেরিয়ে আসে ইহান তাজওয়ার মির্জার ভেতর থেকে, হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে এক প্রকার গর্জন তুলে শুরুতে নিজের ফোনটাকে তারপর ল্যাম্পশেড আর ফুলদানিটাকে মেঝেতে ছুড়ে মেরে চেঁচিয়ে ওঠে,“তো আর কি করার আছে? কি করার আছে জবাব দে?”
অত রাতে গোটা শান্তিনীড়ে ইহানের চিৎকার চেঁচামেচি ছেঁয়ে যায়। ঘুমন্ত রিতু অকস্মাৎ লাফিয়ে উঠে ছেলের ঘরে ছুটে যায়। তেমনি যায় বাকিরাও। ইরফান দাদানের অস্বাভাবিক ক্রোধান্বিত মুর্তি দেখে মিনিট দুয়েক নিস্পন্দ চোখে। সময় দেয় ইহানকে ঠান্ডা হতে। ইহান দুহাতে মুখ চেপে নিজের রাগটাকে সামলে নিতেই ইরফান অস্বাভাবিক শীতল স্বরে বলে,“কিছু করার আছে। অবশ্যই আছে। সেটা তোমারই করার আছে। আর কারো করার নেই। তুমি না করলে দুনিয়ার ঠ্যাকা নেই তোমার জন্য করার, গট ইট দাদান?”
ইহানের মুখের ওপর কথাটা বলে দিয়ে ইরফান চুপচাপ বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে। ইহান দরজা লাগায় থমথমে মুখে। ইশি এসে ধরলো ইরফানকে, ব্যগ্র কন্ঠে শুধালো,“দাদানের কি হয়েছে? চেঁচায় কেন এভাবে?”
ইরফানও নিজের রাগটা সংবরণ করলো স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই। বড়দের উদ্বিগ্ন দৃষ্টি উপেক্ষা করে ইহানকে শুনিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,“ইশি কিছু হয়নিরে। তোর বড় দাদান বিয়ের জন্য পাগল হয়েছে। আমাকে বলেছে আজ কালের মধ্যে বিয়েটা করিয়ে দিতে। এজন্যই চেঁচামেচি করছে।”
ইহান ভাইয়ের কথা শুনে হতভম্ব । নিজের মান বাঁচাতে তৎক্ষণাৎ দরজা খুললো। তুড়ি মেরে ইরফানকে ডেকে বললো,“এই এদিকে আয় তো তুই!”
ইরফান কপাল কুঁচকে গটগট করে চলে গেলো নিজের রুমে। গিয়ে ধাপ করে দরজা লাগালো। বাকিরা হা করে ইহানকে দেখতে থাকে। সামিন বলে,“ইরফান এসব কি বলছে? এসব সত্যি?”
_ওকে আরেকটা বিয়ে করিয়ে দাও বড় বাবা। যত্তসব।
ইহানও ধাপ করে দরজা লাগায়। বড়রা কিছুক্ষণ বোকা বোকা মুখ করে দাঁড়িয়ে থেকে যে যার ঘরে গেলো। মুঈন সন্ধ্যায় এসেছে নিজের ট্রান্সফার সংক্রান্ত কাজে। ঘর থেকে হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে এসে ইশিকে বললো,“কি আমার শ্বশুর বাড়ির মিডনাইট সার্কাস শুরু হয়ে গিয়েছে ইশি? আমার পার্ট কখন আসবে? আমি কি ইন্টারভ্যালের পরে জয়েন করবো?”
মুঈনের মশকরায় কপাল কুঁ'চ'কে ফেলে ইশি। মুখ বিকৃত করে বললো,“চলো তো ভেতরে! এসব আর ভালো লাগছে না আমার। একটুও ভালো লাগছে না।”
__________
শুদ্ধ ইবনে ওয়াসীতের “মিড টার্ম এক্সাম” পরবর্তী ছুটির দিনের আজ দ্বিতীয় দিন। তার সাজিয়ে রাখা পরিকল্পনা এবং সময় সুচি মোতাবেক আজ বিকেলে শুদ্ধ যাবে “ড্রিমি ল্যান্ডে” রোলার কোস্টার চড়তে আর স্কাই ডাইভিংও করবে সে।
ছোট্ট মুখটা থেকে আনন্দ সরছে না, সকাল থেকে নিজের জামাকাপড় পছন্দ করছে। বেশ চিন্তিত শুদ্ধ, কোনটা আজ পরবে সে?
প্রেরণা একটা অফিশিয়াল ফোন রিসিভ করে এসে বসলো ছেলের সামনেই।
“শুদ্ধ আমরা বিকেলে বেরুবো। এখন জামাকাপড় কেন ঘাঁটাঘাঁটি করছো? রেখে দাও।”
শুদ্ধ মায়ের কথামত জামাকাপড় রেখে দিয়ে বললো,“আচ্ছা মাম্মা,সবাইকে ইনভাইট করেছো?”
_হ্যা করেছি তো।
_সবাই আসবে?
_তা তো জানি না বাবা। আজ তো ছুটির দিন। আসতেও পারে। এক কাজ করো, তুমি কল করে দেখো!
ছেলের দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিলো প্রেরণা। এই ছেলেটা কখনো একটা বিস্তৃত পরিবার পায়নি। পেয়েছে শুধু মামা,খালা,মিস জেনি আর প্রেরণার ফুপিকে। এই বয়সী ছেলেটা, হঠাৎ করে এতগুলো আন্টি আর আঙ্কেল পেয়ে যেন সবার সাথে মিশতে চায়। ছেলেটার মধ্যে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করছে প্রেরণা, যা আগে ছিলো না। তাই প্রেরণাও মাঝে সাঝে সায় দেয় ছেলের এমন আবদারে।
প্রথম কলটা করলো শুদ্ধ শেহাকে। ওপাশ থেকে শেহা আদুরে গলায় বলল,“কি ব্যাপার শুদ্ধ বাবু? এতো তাড়াতাড়ি ফোন? আমাদের মিটিং টাইম না বিকেলে?”
_শেহু আন্টি তুমি আসবে?
_ওমা! আসবো তো। শুদ্ধ ডাকবে আর আমি আসবো না?
_লায়ার আঙ্কেল আসবে?
কলটা লাউড স্পিকারে দিয়ে রেখেছিল শেহা। উজ্জ্বল তখন একটা কেস স্টাডি করছে গভীর মনোযোগে। শুদ্ধর মুখে “লায়ার” শুনে চোখ দু'টো বড় বড় হয়ে যায় ওর।
শেহা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরে, বলে,“লায়ার? শুদ্ধ তুমি কি করে বুঝলে এটা?”
উজ্জ্বল কপাল কুঁচকে ফোনটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে শুদ্ধকে বলে,“লায়ার না বেটা,ওটা লইয়ার। আর হ্যা, লইয়ার আঙ্কেল আসবে বাচ্চা। সাথে শেহু আন্টিকে নিয়ে আসবে।”
কল কেটে উজ্জ্বল শেহার দিকে তাকিয়ে থাকে। শেহা তখনো হাসছে মুখে শাড়ির আঁচল চেপে। হাসতে হাসতে কাশি উঠেছে তার। হঠাৎ করে হাসি থামিয়ে বলে,“লায়ার আঙ্কেল আপনি কফি খাবেন? বানিয়ে আনি?”
দ্বিতীয় কলটা যায় ইরফান মির্জার ফোনে। খালুকে শুদ্ধ বলে,“তুমি কি আসবে খালামনিকে নিয়ে?”
প্রণমি আর ইরফান পাশাপাশি বসে ছিল, আদুরে স্বরে শুদ্ধকে জবাব দিলো ইরফান,“আসবো তো বাবা। খালামনিকে নিয়েই আসবো।”
_ইশারা আন্টি আর পুলিশ আঙ্কেল আসবে না?
_হুম আসবে।
শুদ্ধ উশখুশ করছে, হঠাৎ বলে উঠল,“আর ইহান আঙ্কেল?”
পাশ থেকে প্রেরণা বলে উঠলো,“উনি ব্যস্ত শুদ্ধ!”
ইরফান সামান্য হেসে ফোনটা নিয়ে সোজা চলে যায় ইহানের কাছে, ইহান ফোনটা হাতে নিয়ে বলে,“কি?”
_শুদ্ধ। লাইনে আছে, কথা বলবে তোমার সাথে।
হৃদস্পন্দন সবেগে বেড়েছে ইহানের। ছেলেটার সান্নিধ্যে গেলেই বুকটা এমন করে ওঠে, ইহান বেপরোয়া হয়ে ওঠে,ওর অদ্ভুত রকমের তৃষ্ণা পায় ছেলেটিকে একটু দেখার,একটু ছুঁয়ে দেখার।
ফোনটা কানে চেপে ইহান বললো,“হ্যা বাচ্চা বলো!”
_আঙ্কেল আজ ড্রিমি ল্যান্ডে আসবে না? সবাই আসবে। তুমি প্রমিজ করেছিলে আমরা স্কাই-ডাইভিং করবো!
দু'চোখ বন্ধ করে নেয় ইহান অমন আদুরে প্রশ্নে। একটা ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,“আসবো আমি। আর তুমি মাকে এভাবে বারবার জ্বালিও না। তোমার মাম্মার ফোন থেকে কেন কল করো? তোমাকে বলেছি না আমি? আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হলে মামী মনিকে বলবে?”
প্রেরণা ওপাশে বসে চুপচাপ শুনছে ইহানের কথা, তার দৃষ্টি জানালার বাইরে সাদা সাদা মেঘের দলায়। শুদ্ধ আরো দুমিনিট ইহান আঙ্কেলের সাথে কথা বলে কল কাটলে ওকে টেনে প্রেরণা নিজের কোলে বসিয়ে দু'টো চুমু খেয়ে বললো,“তুমি ইহান আঙ্কেলকে খুব পছন্দ করো?”
শুদ্ধ ঘনঘন মাথা নেড়ে গলায় জোর দিয়ে বলে,“অনেক।”
_কেন এতো পছন্দ ইহান আঙ্কেলকে? তার মাসেল আছে শুধু তাই?
শুদ্ধ দু'পাশে মাথা নাড়ে। শুদ্ধ নিজেও তো জানে না ইহান আঙ্কেলকে তার কেন পছন্দ। শুধু তার ছোট্ট মস্তিষ্ক বোঝে ইহান আঙ্কেল তাকে কি যেন দেয়, যেটা শুদ্ধ কোনো আঙ্কেলের মাঝে খুঁজে পায়না, কেউ তাকে দেয়না। রিকুর বাবা দেয়না, জিসার পাপা আঙ্কেল দেয়না, কেউই দেয়না।
নিশ্চুপ বাচ্চাটাকে আরো একটা চুমু খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রেরণা, অতঃপর আস্তেধীরে বলে, যা শুদ্ধকে তার বোঝানো উচিত।
“বাবা শোনো, তোমার ইহান আঙ্কেল খুব ভালো লোক। এবং অবশ্যই তুমি তাকে পছন্দ করবে। আমি একটুও বকবো না। তবে খুব বেশি বিরক্ত করবে না তাকে। জানো , তোমার ইহান আঙ্কেল বৌ আনবে, তো সেই আন্টি যদি বিরক্ত হয়?”
_সেই আন্টি কেন বিরক্ত হবে মাম্মা?
প্রেরণা আবারও মৃদু শ্বাস ফেলে। এতো কিছু এই বাচ্চাটাকে কি করে বিস্তারিত বোঝাবে সে? তাই চুপ হয়ে যায়।
রিতু দূর থেকে শুদ্ধর সাথে তার দুই ছেলের কথোপকথন শুনছিলো। শুদ্ধকে সে বরাবর স্নেহের চোখেই দেখে, বাচ্চাটাকে নিয়ে কখনোই তার কোনো অসুবিধা ছিলোনা , এখনো নেই, না ভবিষ্যতে থাকবে। তবে আজকে ইহানের যাওয়া নিয়ে তার আপত্তি আছে। খুব সাহস করে এগিয়ে গিয়ে সে বড় ছেলেকে বললো,“আজ তোর না গেলে হয়না? ছোটোদের মধ্যে গিয়ে কি করবি?”
_কেন? গেলে কি সমস্যা মাম্মা?
_ঐ মেহেক মেয়েটার চাচা আসবে চা খেতে। কথা বলতো তোর সাথে।
ইরফান দাদানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইহান নামিয়ে নেয় মায়ের থেকে চোখ, কন্ঠে বেশ জোর ঢেলে বলে,“স্যরি। আমি শুদ্ধকে কথা দিয়েছি মাম্মা। আজ হবে না।”
রিতু আর জোর করলো না ছেলেটাকে। ওয়াসীত স্যারের বড্ড অনুগত ছিলো ছেলেটা। সে যায়গা থেকে যদি শুদ্ধকে ভালোবাসা নিজের জীবনের একটা বড় দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে নেয়, তবে নিক। শুধু রিতু প্রেরণাকে ছেলের পাশে মানতে পারবে না। এটাই সামান্য চাওয়া রিতুর। আর কোনো কিছুতে রিতুর আপত্তি নেই, একেবারেই নেই।
__________
একদফা ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েছে। যা দেখে মুখটা বেলুনের মতো চুপসে গিয়েছে শুদ্ধর। প্রেরণা হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“মন খারাপ করো না। সবাই আসবে, বৃষ্টিও হবে না।”
“ড্রিমি ল্যান্ড” ঢাকার অন্যতম একটি ফিউচার পার্ক। দু বছরে বেশ জমিয়ে চলছে এটি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট শপিং মল এবং কিডস প্ল্যানেট। ফাইভস্টার রেস্তোরাঁ আছে দুইটা। এখানে প্রেরণা কখনো আসেনি। ভীষণ ব্যয়বহুল কিনা, তবে ছেলের অনেক দিনের বায়না পূরন করতেই এখানে আসা। আজ প্রেরণা কিপটেমি করবে না। ছেলে এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের পেছনে সর্বোচ্চ খরচা করবে সে এবং মোটেও পরে আফসোস করবে না।
প্রিতম ইনু একসাথে এসেছে, ইনুকে কোচিং থেকে নিয়ে এসেছে প্রিতম। এবং মির্জা বাড়ির লোকরা এসেছে খানিক বাদেই। গাড়ি থেকে এক এক করে নামলো ইরফান প্রণমি, মুঈন ইশি, ইহান, উজ্জ্বল শেহা। ইহানকে দেখামাত্রই শুদ্ধ গিয়ে ঝাপিয়ে উঠলো ওর কোলে, আজ ইহান পরেছে একটা ব্ল্যাক শার্ট আর ব্লু জিন্স। শুদ্ধ আঙ্কেলকে চোখ বড় বড় করে দেখে এই পোশাকে, একেবারে তার সাথে মিলে গিয়েছে। মাম্মাও তাকে ব্ল্যাক শার্ট আর ব্লু জিন্স পরিয়েছে।
হেসে ফেললো ইহান, শুদ্ধর নাক টিপে বললো,“আবারো সেইম পিন্স বাচ্চা।”
প্রেরণা ইহানকে দেখে একটু গুটিয়ে গেলেও পরমুহূর্তে মুখ হাসি হাসি করে এগিয়ে যায়, সবাইকে দেখে নিয়ে বলে,“সবার ব্যস্ত জীবনে খুব বিরক্ত করলাম তাইনা?”
উজ্জ্বল হাসলো, জবাব দিলো,“না না। আসলে একদিন তো যে যার লাইফ নিয়ে অনেক ব্যস্ত হয়েই পরবো। এসব আর হবে? আমাদের হয়তো দেখাও হবে দুই তিন বছর পর পর। তাই সুযোগ থাকতে আত্মীয় স্বজনদের সাথে যত সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়ে রাখা যায় তত ভালো।”
মুঈন বললো,“এক্সাক্টলি। ইশির ক্যামেরা এনেছি। আজ অনেক ছবি তুলবো।”
সবাই মিলে ঠিক করলো শুরুতে কিডস প্ল্যানেটে ঢুকবে। তাই প্রেরণা পার্স হাতে সবার জন্য টিকিট কাটতে উদ্যত হয়। মুঈন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে,“করছেন কি? আজ শুদ্ধকে ওর আঙ্কেল আন্টিরা সেবা দেবে।”
_এ হয়না ভাইয়া। আমি কিন্তু আপনাদের ইনভাইট করেছি।
জবাব টা দিলো উজ্জ্বল,“আরে বোনের মতো আপনি আমাদের। প্লিজ এতো ফরমালিটি দেখাবেন না।”
মুঈন হেসে বললো,“জি। ভাগ্নের জন্য করছি এটা ধরে নিন। আপনি আসলেই আমাদের সবার বোনের মতো। আপনার মধ্যে একটা বোন বোন ব্যাপার আছে। আপনি সর্বজনীন বোন।”
আচমকা ইরফান আর ইশি উঠলো কেশে, তাকালো ইহানের দিকে, ইহান শুদ্ধকে কোলে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। পরপর ইরফান থেমে থেমে মুঈনকে বললো,“তোমার বোন বানাতে ইচ্ছে হলে বানাও জিজু, তুমি সবাইকে টানো কেন?”
ইরফানের কথাটা বেশি দূর গড়াতে পারলো না, এর মাঝে ইহান লম্বা কদমে এগিয়ে গিয়ে টিকিট কাটলো। তাই ইরফানের শেষ কথাটা সবাই শুনলেও অতটা ধ্যান দিলো না।
রোলার কোস্টারে চড়ে বসলো ইনু প্রিতম, উজ্জ্বল শেহা, ইরফান প্রণমি। প্রত্যেক জুটি পাশাপাশি।
ইনশিরাহ প্রেগন্যান্ট,ও এসবে চড়বে না তাই মুঈনও বৌয়ের সাথে থেকে গেলো নিচে। প্রেরণা চড়বে না কারণ প্রেরণা এসব নিতে পারে না,ওর প্যানিক অ্যাটাক চলে আসে। শুদ্ধকে নিয়ে ইহান উঠলো একটা জুটি হয়ে।
কয়েক মিনিট ধরে শুদ্ধর চিৎকার চেঁচামেচিই শোনা গেলো ঐ ব্লকে। ছেলেটা একটুও ঘাবড়ায়নি, উল্টো আনন্দে চেঁচামেচি করেই চলেছে। ঠিক বাবার মতো সাহসী হয়েছে। প্রেরণা নিচে দাঁড়িয়ে নিজের ছেলেকেই দেখছিলো, হঠাৎ আচমকাই তার দৃষ্টি যায় শুদ্ধর পাশে বসে শুদ্ধর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মানুষটার দিকে। যার একটা হাত শুদ্ধর কাঁধে,এতো এতো সিকিউরিটির পরেও শুদ্ধকে ধরে রেখেছে শক্ত হাতে, আগলে রেখেছে যেন হাত সরালে শুদ্ধ পরে যাবে। এতো দুশ্চিন্তা তার! দৃশ্যটা কিছুক্ষণ দেখে প্রেরণা চোখ নামিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,টের পেলো তার শরীরটা হঠাৎ কেন জানি তিরতির করে কাঁপছে। এই কাপুনির মানে প্রেরণা বুঝে উঠতে পারে না।
পাঁচ মিনিটের পরে ভয় পেয়ে ইনু কান্নাকাটি শুরু করে দিলো,ওকে নামিয়ে আনা হলো দ্রুত। শেহা আর প্রণমিও নেমে গেল,বুক ধরফর করছে ওদের। নামলো না ইহান আর শুদ্ধ। চেঁচামেচি করে,হৈ হল্লা করে এক রাউন্ড শেষ করে তবেই নামলো ওরা।
স্কাই ডাইভিং করবে ইহান,শুদ্ধ,প্রিতম,মুঈন, উজ্জ্বল আর ইরফান। মেয়েরা কেউ সাহস করেনি ওটাতে আগ্রহ দেখানোর। সবাই সব প্রস্তুতি যখন নিচ্ছিল তখন ঘটলো বিপত্তি, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো হঠাৎ পাঁচ মিনিটের দমকা হাওয়ার পরে। স্কাই ডাইভিংয়ের খোলা সেট থেকে সকলে ছুটতে ছুটতে ঢুকলো কিডস প্ল্যানেটের মুভি লাউঞ্জের বারান্দায়,নিজেদের মাথা বাঁচিয়ে। অথরিটির সাথে কথা বলার পরে সে জানালো বৃষ্টি শেষ হবার পরে শুরুতেই শুদ্ধদের টার্ন দেয়া হবে, আপাতত যেন তারা একটু অপেক্ষা করে।
ইরফানের সিদ্ধান্তে সকলেই ওখানে বসলো। উজ্জ্বল আর মুঈন গিয়ে সবার জন্য স্ন্যাকস আর জুস নিয়ে এলো সময় কাটাতে।
এই কামরাটাতে শুধুমাত্র ওদের ফ্যামিলি বসেছে, প্রত্যেকে জানালার দিকে তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, প্রতিক্ষায়, কখন এই বৃষ্টি শেষ হবে।
ইহান আড়চোখে দেখছিলো প্রেরণাকে, শাড়ির আঁচলে ছেলের মাথা মুছছিলো। আজ এতক্ষণে ইহান সকলের অন্যমনস্কতায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেলো তার সমুদ্রনীলার মুখে, একটু সেজেছে কি ভদ্রমহিলা আজ? ইহান বোঝার চেষ্টা করছে, হ্যা চোখে একটু কাজল দিয়েছে। চোখ দুটো যেন নীল সমুদ্র, আর ঐ কাজল সমুদ্রের পাশে ভেসে বেড়ানো বিষন্ন মেঘ।
নিমেষ হীন দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইহান চোখ সরালো ইরফানের খুকখুক কাশির শব্দে। চোখ ফিরিয়ে ইরফানকে দেখতেই ইরফান ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো,“কি দেখো?”
ইহান ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর হয়ে রইলো। বৃষ্টি থামবার নাম নেই,সময় কাটছিল না কারো। হঠাৎ টের পেলো পাশের রুমটাতে কোনো ফ্যামিলি সময় কাটাতে গানের কলি খেলছে। ইনু লাফিয়ে উঠে ইরফান প্রণমিকে ধরলো, বললো,“এখন তোমরা গান শোনাবে, বোর হচ্ছি সবাই।”
ইরফান আজ গাইলো না, ওর দুষ্টু চাউনী দাদানের মুখের দিকে, হঠাৎ বলে উঠল,“আজ দাদান একটা গান গাইবে।”
ইহান চোখ পাকালো,“আমার সাথে ফাজলামি করবি না। এসব আমার দ্বারা হবে না।”
ইরফান দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে দাদানকে বললো,“আর টিনেজার থাকতে তোশাকে তো খুব গান শোনাতে। তখন হতো কিভাবে?”
এইবার মুঈন আর উজ্জ্বল ধরলো ইহানকে। বলল,“শেহার বিদায়ের দিনও সবাই গান করেছি, তুমিই করোনি। আরে দু'টো লাইন গাও। না পারলে এক লাইন। যা মনে আসে গাও।”
একে একে ইশি,শেহা আর প্রণমি যখন ধরলো তখন ইহান থিতু হলো। প্রণমি কখনো আবদার করেনা ভাসুরের কাছে,আজ দাদানের হাতটা ধরে ঝোলাঝুলি করে বাচ্চা মেয়েদের মতো প্লিজ প্লিজ করাতেই ইহান হেসে ফেললো, বললো,“আচ্ছা দুই লাইন কিন্তু। আমি যেখান থেকে পারি গেয়ে দেবো। আর আমি কিন্তু গাইতে জানি না, আমার অভ্যাস নেই।”
_অসুবিধা নেই, শুনবো আমরা।
প্রেরণা শুদ্ধকে কোলে চেপে দৃষ্টি নামিয়ে বসে আছে, ভাই বোনের খুনসুটিতে সে অংশ নিতে ইচ্ছুক নয় বহিরাগত হয়ে। ইরফান তখন ফোনটা বের করে দাদানকে বললো,“গিটারও লাগবে না, তুমি শুরু করো, আমি টিউন সেট করে দিচ্ছি।”
ইহান চোখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকালো, না গলা খাঁকারি দিলো, না প্রস্তুতি নিলো, সহজ গলায় হঠাৎ গেয়ে উঠল,
“আমি দুহাত বাড়িয়ে আছি দাড়িয়ে
বিরহী প্রতিক্ষন...
তুমি রাঙা চরনে আমার সিথানে
এসে দাড়াও কখন..
মনেরি মনি কোঠায়,
সাজানো যে থাকবে.....
এত কিছু বোঝো আর মন বোঝো না
কত কিছু তুমি খোজো
আমায় তো খোজো না।”
বৃষ্টি শেষ হলো হঠাৎ, বাইরের লাউঞ্জে বাচ্চারা হৈ হৈ করে উঠতেই ইহান গান থামিয়ে উঠে দাঁড়ায়, না চাইতেও এক পলক প্রেরণাকে দেখে শুদ্ধকে টেনে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। বাকিরা বোকা বোকা দৃষ্টিতে দেখে ইহানের প্রস্থান। শুকনো সকলের মুখ, একটু প্রশংসাও করতে দিলো না বড় দাদান। শুধু প্রেরণা নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে আছে নিজের পায়ের নখের দিকে, যেন সে এই জগতে থেকেও এতক্ষণ ছিলো না।
চলমান......
[ পর্বটা ছোটো, এই পর্বের বর্ধিতাংশ আজ রাতেই দেবো। ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২০ [ বর্ধিতাংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে ছেলেটাকে লোকটা। এক হাত মেলে দিয়ে বাতাস মাখছে সে হাতে, আরেক হাতে ধরে রেখেছে শুদ্ধর পেট। আর শুদ্ধ দু হাত সমান্তরাল ভাবে মেলে ধরে পাখি হয়েছে। বাতাসের দাপটে চোখ দু'টো যদিও বুজে আসছে তার, তবুও সে জোর দিচ্ছে চোখ খুলে চারপাশ দেখতে। সে সত্যিই উড়ে বেড়াচ্ছে পাখির মতো? না না,ঠিক পাখি নয়। একটা বড়,মোটা তারের মতো বস্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। সীমারেখা দেওয়া আছে,এই কয় ফুটের ওপরে দড়ি ছাড়া যাবেই না।
শুদ্ধ খানিকটা ঝুঁকে মাকে দেখে, চেঁচিয়ে বলে,“মাম্মা আমি উড়ছি!”
উৎকণ্ঠা, উদ্বিগ্নতা ঠাসা প্রেরণার ফরসা মুখটাতে। বুকটা ধুকপুক করছে, কাঁপছে গলা। চেঁচিয়ে ইহানকে বলে,“ওকে ওভাবেই ধরে রাখুন। প্লিজ ছাড়বেন না।”
ইহান হেলমেটের ফাক গলিয়ে দৃষ্টি রাখলো ত্রিশ ফিট নিচে, উঁচু কৃত্রিম ঢিবিটার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেরণার মুখের দিকে, কন্ঠে গম্ভীরতা বজায় রেখে উঁচু গলায় জবাব দিল,“ছাড়বো না।”
মুঈন ডাইভিংয়ে যোগ দেয়নি বাকিদের সাথে, ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছে সবার। ইনু আর শেহা আইসক্রিম খাচ্ছে আর প্রণমি ইশির পাশে বসে আছে।
খানিক বাদে ওরা নেমে এলো। শুদ্ধর প্রনোচ্ছলতা নজরকাড়া। উত্তেজনায় মাম্মাকে কি বলছে সে নিজেও জানে না। প্রেরণা শুনলো ,“মাম্মা খুব মজা, অনেক মজা, আমি আবার চড়বো।”
_নেক্সট ভ্যাকেশনে।
_ইহান আঙ্কেলের সাথে?
সরল প্রশ্নটিতে বিরক্ত লাগে প্রেরণার, বিরক্তি চেপে রেখে বলে,“তখন একা একাই চড়বে তুমি শুদ্ধ। আর মামা আছে তো। সবসময় কি ইহান আঙ্কেল থাকবে? ওনার কাজ আছে তো।”
গাঁয়ের শার্ট টা ঠিকঠাক করে ইহান তখন ঘুরে তাকায় প্রেরণার দিকে। কিছুপল তাকিয়ে থেকে এগিয়ে গিয়ে শুদ্ধকে কোলে তুলে নেয় ইহান। অতঃপর তার দৃষ্টি প্রেরণার দৃষ্টিতে স্থির রেখে নিরেট ঠাণ্ডা স্বরে বলে,“শুদ্ধর জন্য ইহান আঙ্কেল সবসময় থাকবে। চলুন এবার ভেতরে যাই।”
দৌড়ঝাঁপ আর ছবি তুলেও ক্লান্ত হলো না কেউ। ওরা ড্রিমি ল্যান্ডের শপিং সেন্টারে ঢুকলো শুরুতেই। ইনু,শেহা,ইশি আর প্রণমি এখানে আসার আগেই মনস্থির করেছিল নতুন যায়গা থেকে টুকটাক কেনাকাটা করবে। প্রেরণা সামান্য হেসে সকলকে বললো,“ভালো কথা। তো যাও সবাই কেনাকাটা করো। আমি আধাঘণ্টার জন্য বিশ্রাম নিচ্ছি কোথাও বসে, ওহ হ্যা শুদ্ধকে টয় সেন্টারে নিয়ে যেতে হবে। তোমরা এনজয় করো। ঘন্টাখানেক পরে ডিনার করবো আর মুভি দেখবো। টিকিট নিয়ে রেখেছি কিন্তু।”
কেউ অমত করলো না। শুধু ইশি বললো,“তুমিও আমাদের সাথেই চলো না আপু, একসাথে কেনাকাটা করি?”
ইরফান বাঁধ সেধে বললো,“না ,শুদ্ধকে নিয়ে টয় সেন্টারে যাক আপু। নয়তো শুদ্ধ কষ্ট পাবে, তাই না শুদ্ধ?”
শুদ্ধ সত্যি সত্যি মাথা নাড়ায় ইরফানের কথায়। প্রেরণা ইরফানের অহেতুক কথার মানে জানে না,সে ম্লান হেসে ঘুরে দাড়াতেই ইরফান দাদানকে বলে,“দাদান আমরা তো শপিংয়ে ঢুকবো। তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে?”
ইহান আইঢাঁই করে ওঠে। শেহার হাতটা ধরে আছে উজ্জ্বল, ইশির হাত মুঈন, ইরফান প্রণমি আর ইনু প্রিতম, সবাই জোড়ায় জোড়ায় শপিং করবে। তার কি কাজ ওদের মাঝে? আমতা আমতা বললো,“হ্যা ঐ আমি এখানেই...”
ইশি খুশি খুশি গলায় বলল,“আরে শুদ্ধর সাথে যাওনা তুমি। তোমার সঙ্গ কত পছন্দ করে ও! যাও।”
প্রেরণা চুপ করে আছে। অস্বস্তিতে পরেছে ইহান। সে যাবে না, যাবে না সে। তবে সে মনের কথা রাখতে পারলো না, শুদ্ধ এসে হাত চেপে ধরলো ইহানের, ফোকলা দাঁতে হেসে বললো,“রিকু বলেছে অ্যাডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ডে ডাবল গেমার লাগে। মাম্মা তো খেলবে না। চলো না আঙ্কেল!”
শুদ্ধর কন্ঠে আকুল আবেদন। শুদ্ধর মাতা প্রেরণা আহসান আর শুদ্ধর জীবনে অযাচিত ভাবে এসে পরা ইহান তাজওয়ার মির্জা একে অপরের দিকে মলিন দৃষ্টিতে তাকালো। ওরা দু'জনেই বুঝলো,ওরা জড়িয়ে যাচ্ছে, খুব বিশ্রী ভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে একটা অদৃশ্য জালে। উপেক্ষা করা সহজ ছিলো, এখনো সহজ। তবুও উপেক্ষা হয়না, কেনো হয়না? কারণ মনের বাসনা ছাড়িয়ে এই পৃথিবীর কোনো সংকোচের সাধ্য নেই জিতে যাওয়ার। মনের আগে কিচ্ছুটি নেই।
একজনের অবচেতন মন হঠাৎ যদিও বলে,“ছিঃছিঃ এ কোন অনাসৃষ্টি কান্ড প্রেরণা? জাত গেল তোর জাত গেল। ছিঃ তুই অসংযমী বেঈমান।”
পরে ঐ মনই তাকে ফুসলে দিচ্ছে,“দ্যাখ দ্যাখ প্রেরণা। কি সুন্দর দ্যাখ। তুই বেঁচে আছিস, এই টুকু সুখ লুফে নে না! কেউ তোকে শূলে চড়াবে না বোকা! হ্যা যদিও চার পাঁচজন পিছে পিঠে কথা শোনাবে। তবে শোনালে কি হয়? পাছে লোকে কত কিছুই তো বলে!”
আরেকজনের অবচেতন মন বলে,“তুমি কি করে পারো ইহান? মনে আছে ওয়াসীত স্যারের আকুলতা? তার নীলিমাকে কেড়ে নেবে তুমি? ছিঃ।”
তবে প্রেরণার মতো ইহানের অন্তঃপুরের কোনো সত্তাই ইহানকে বোঝাতে আসে না। ইহান তাজওয়ার মির্জা খুজে পায়না তার দোলাচলের সমাধান।
শুদ্ধ হাত ছাড়ে না ইহান আঙ্কেলের। ইহান প্রেরণার থেকে চোখ সরিয়ে নিচু গলায় শুদ্ধকে বলে,“চলো।”
শুদ্ধর হাত ধরে সামনে সামনে ইহান হাঁটছে। লোকটার পেছনে ধীরপায়ে হাঁটছে প্রেরণা। তার দৃষ্টি লোকটার মাথার পেছনে। উচ্চতায় প্রেরণার থেকে খুব লম্বা লোকটা। ওনার হাটার মাঝে যে পুরুষালি আভিজাত্য রয়েছে,সেটিও প্রেরণার পরিচিত খুব। প্রেরণা আড়ষ্ট হয় বিষয়টি লক্ষ্য করেই।
টয়সেন্টার নয় তলায়। বাকিরা তিন তলায় শপিং করতে রয়ে গিয়েছে। শুরুতে ওরা তিনজন টয়সেন্টারের এক্সিটের কাছটাতে গিয়ে দাঁড়ালো। টিকিট কাটবে ঠিক সেই মুহূর্তে শুদ্ধ মাম্মার কানে ফিসফিসিয়ে বললো,“মাম্মা সুসু।”
প্রেরণা এদিক সেদিক তাকায়, ইহান কিছুটা বুঝতে পেরে বললো,“এখান থেকে সোজা হেঁটে ব্লক ডি তে গেলেই পাবেন। যায়গাটা নিড়িবিলি। ওখানের শপ গুলো খালি।”
_অসুবিধা নেই, পারবো। আপনি কি নিচে যাবেন?
_না আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। আপনি যান।
ওরা দুজন চলে গেলে ইহান তিনটা টিকিট কেটে এক্সিটের সম্মুখে অপেক্ষা করতে থাকে। অসংখ্য বাচ্চা, যারা শুদ্ধর বয়সী, বাবা মায়ের হাত ধরে ঢুকছে ভেতরে। রিসিপশনে যে মেয়েটি ছিলো, হঠাৎ ইহানকে বললো,“স্যার টয় সেন্টার ঘোরা হলে ম্যামকে নিয়ে ব্লক এ তে ঘুরে আসার আমন্ত্রণ রইলো,এই নিন লিফলেট। নতুন নতুন স্মার্ট সব কিচেনওয়্যার পাবেন শপ গুলোতে, ম্যামের দারুণ উপকার হবে। শুধু তাই না আপনাদের বাচ্চাদের যাবতীয় ফার্নিচার পাবেন, পছন্দ হবেই মাস্ট!”
ইহান নিস্পলক রিসেপশনিস্টকে দেখে হাত বাড়িয়ে লিফলেট টা নিলো। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি হড়বড় করে বলতে থাকলো,“যাবেন স্যার ম্যাম আর বেবিকে নিয়ে, কেমন?”
__________
“ছেলের বোধ হয় আগ্রহ নেই বিয়েতে। তুমি আর এটা নিয়ে এগিও না। সময় হলে ও নিজেই তো তাড়া দেখাবে তাইনা?”
ইলহাম মির্জা কথাটা বলে রিতুর দিকে তাকায়। রিতু স্বামীর ইস্ত্রি করা কাপড় গুলো ওয়্যারড্রবে রেখে দিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,“আপনি আর এক গান গাইবেন না ইহানের পাপা। যান নিচে, মেহেকের চাচা একটু পরেই আসবে। কথা বলুন ভাইয়াকে সাথে নিয়ে।”
একটু থেমে রিতু ঘুরে মুখোমুখি দাঁড়ায় ইলহাম মির্জার, এবার কন্ঠে বেশ দৃঢ়তা নিয়ে বলে,“ছেলে তো ছোটো নয় তাইনা যে নিজের ভালোমন্দ না বুঝে মায়ের মন রাখতেই বিয়েতে হ্যা বলবে। নিশ্চয়ই আমার ছেলের মানসিক প্রস্তুতি আছে। আপনারা প্লিজ আর বিষয়টা নিয়ে দোনামোনা করবেন না। ছেলেটাকে সংসারী হতে দেন। অনেক হয়েছে।”
ইলহাম মির্জা চুপ হয়ে যায়। সত্যি বলতে ইহানের বিয়ে নিয়ে সে যথেষ্ট উৎসাহী, তবে যে ছেলেকে তিনি ফিরে পেয়েছেন আল্লাহর দয়ায়, তাদের কোনো ভুলভাল সিদ্ধান্তে যদি বিন্দুমাত্র ঝামেলা হয় চাপা স্বভাবের ছেলেটার জীবনে? ইলহাম জানে, দুনিয়া উল্টে ফেলার মতো বুঝ নিয়ে চললেও ছেলেটা কত সরল। ওর পাত্রী পছন্দ না হলে সেখানে আর বিয়ে কেন?
_________
পনেরো মিনিট কেটেছে। ডি ব্লকে ওয়াশ রুম খুঁজতে খুঁজতেই লেগেছে পাঁচ মিনিট। তারপর শুদ্ধ বললো ওর আসলে বড় ওয়াশরুম চেপেছে।
প্রেরণা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। ফাঁকা এই এড়িয়াটা। কিছু বললেই সেই কথাগুলো কেমন গমগমে শোনায়। প্রতিধ্বনিত হয়। তবুও প্রেরণা বারবার জানতে চাইছে,“হলো তোমার বাবা?”
_আর দুই মিনিট মাম্মা, আমি চেষ্টা করছি তো।
চোখ মুখ খিচিয়ে জবাব দেয় শুদ্ধ। প্রেরণা হেসে ফেলে, কিছুক্ষণ হেসে বলে,“ওকে টেইক ইয়র টাইম। এতো বার বলি আজেবাজে ফাস্টফুড কেউ দিলে খাবে না, এখন কনস্টিপেশন হলো। এরপর থেকে কথা শুনবে মাম্মার?”
শুদ্ধ আবারো চোখমুখ খিচিয়ে বড় একটা শ্বাস ফেলে বললো,“শুনবো।”
এই ব্লকের অপজিটে হুড়োহুড়ির শব্দ পাওয়া গেল হঠাৎ। মনে হলো লোকজন দলে দলে ছুটছে। প্রেরণা খানিকটা বিচলিত হয়ে ওয়াশ রুমের করিডোর পেরিয়ে উঁকি মেরে বাইরেটা দেখতে যেতেই অদূর থেকে এক ভদ্রমহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন,“আরে আপনি এখানে কি করছেন?”
_ওয়াশরুমে এসেছি।
_হয়ে গেলে বের হোন তাড়াতাড়ি।
_হয়েছেটা কি?
ভীষণ উৎকণ্ঠা চেপেছে প্রেরণার কন্ঠে। ভদ্রমহিলা তাড়াহুড়ো করে ছুটতে ছুটতে যাচ্ছিল, চেঁচিয়ে বললো,“এই ব্লক দুটোর কারেন্ট ফল্ট হয়েছে। নার্সারি সেন্টারের দু'জন মারাত্মক আহত। শিগগির বের হোন।”
কেঁপে উঠলো প্রেরণা, হতভম্ব গলায় বললো,“তো মেইন সুইস বোর্ড অফ করে না কেন?”
জবাব দিলো না মহিলা, ভারী স্বাস্থ্য নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে চলে গেলো। পেছনে রেখে গেলো বাক রুদ্ধ প্রেরণাকে। আশে পাশে তাকাল প্রেরণা, আরো লোকজন ব্লক ই থেকে ছুটে যাচ্ছে ইমার্জেন্সি এক্সিটের কাছে। প্রত্যেকের রক্তশূন্য চোখমুখ দেখে গলা শুকিয়ে যায় প্রেরণার। শরীরটা সেই পুরনো দিনের মতো অস্বাভাবিক মাত্রায় ঝাকুনি দিয়ে উঠলো। অতর্কিত মানসিক চাপ এলেই প্রেরণার হাত পা ছেড়ে দেয়, এবারো তাই। তবুও শ্বাস ফেলে ছুটে যায় শুদ্ধর ওয়াশ রুমের কাছে, দরজায় সজোরে ধাক্কা দিয়ে কাঁপা স্বরে বলে,“বাবা! তাড়াতাড়ি। একটু তাড়াতাড়ি বাবা।”
শুদ্ধর কান্না পাচ্ছে, ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,“হচ্ছে না মাম্মা। আমার কষ্ট হচ্ছে, আমি আর ফাস্টফুড খাবো না।”
_আচ্ছা না হলে বের হও, পরে চেষ্টা করো, আমি ওষুধ দেবো। আর শোনো ভেতরে কোনো সুইসে হাত দিও না তুমি।
শুদ্ধ এবার অল্প কেঁদে দিলো, ফুঁপিয়ে বললো,“ওয়েট মাম্মা হয়ে এসেছে।”
ছেলেটার খুব কষ্ট হচ্ছে প্রেরণা বুঝলো, এদিকে তার হাত পা কাপার গতি বেড়ে গেলো। বুকটাও হঠাৎ খাঁখাঁ করে উঠলো যখন শুনলো করিডোরের বিপরীতে লোকজনের জোড়ালো চিৎকার চেঁচামেচি। প্রেরণা কাঁপা হাতে যেই না ফোনের লক খুলতে যাবে অমনি ধারে কাছে কোথাও বিকট একটা আওয়াজ হলো কিছু একটা ব্লাস্ট হওয়ার।
আঁতকে উঠে ফোনটা ফেলে দিলো হাত থেকে। হাত চলে গেলো বুকে, মুহুর্মুহু কাঁপতে লাগলো শরীর আর পায়ের নিচ। নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এলো। বুঝলো গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে প্যানিক এটাক এসেছে তার, সেই পুরনো নির্লজ্জ রোগটা। একহাতে শাড়ির আঁচল খামচে ধরে চেঁচিয়ে উঠল ছেলের ওপর,“বাবা বের হও প্লিজ। তাড়াতাড়ি।”
নয় তলায় কি হচ্ছে তিন তলায় ছড়িয়ে গেলো খবরটা মুহুর্তেই। ওরা শপিং রেখে লিফটের কাছে যেতেই কর্তৃপক্ষ থামিয়ে দেয় ওদের, ওপরে ওঠা যাবে না এখন। প্রিতম,মুঈন,ইরফান এবং প্রত্যেকে চিন্তিত হয়ে কল করতে লাগলো ইহান আর প্রেরণাকে। তবে কেউ ধরলো না কল।
ছোটাছুটি করা লোকদের ভীড় ঠেলে ইহান হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যায় ডি ব্লকের কর্ণারে ওয়াশ রুমের কাছে। কপালের নীলছে শিরা দৃশ্যমান উৎকণ্ঠা আর উদ্বিগ্নতায়। হাঁটল না, প্রায় ছুটে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পরলো সে। তার বিস্ফোরিত চোখ দু'টো স্থির নয়নে প্রেরণার পা মাথা দেখলো মিনিট খানেক,পর পর নিজেকে শান্ত রেখে এগিয়ে গিয়ে বললো,“হোয়্যাটস রং উইদ ইউ, এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? শুদ্ধ কোথায়? ইজ হি ইনসাইড?”
কথা বলতে পারছিলো না প্রেরণা, দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছে। যেন দেয়ালই ওর ভরসা,নয়তো এখানে লুটিয়ে পরবে।
ইহানের উৎকণ্ঠা তরতরিয়ে বাড়লো, চাপা স্বরে চেচালো,“প্যানিক এটাক? রিল্যাক্স! গুজব হতে পারে। আর আমি আছি!”
“আর আমি আছি!”
তিনটা শব্দ শুনে প্রেরণা ঝাঁপসা চোখে দেখলো লোকটাকে। নিজেকে সামলে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে মেয়েটা। ইহান বললো,“এভাবে ঘাবড়ে যেতে হয়? এটা আপনি তো নন প্রেরণা?”
চোখের পানি গড়াতে গড়াতে নামছে প্রেরণার, ঠোঁট দু'টো কাঁপছে, ঐ ঠোঁট নেড়েই অস্ফুটে বললো,“আমি এটাই। আমি অমন প্রেরণাই নই যেমন আপনারা জানেন। আমি এই প্রেরণাই! এটাই আমি।”
ইহান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই শুদ্ধ বেড়িয়ে এলো ফ্রেশ হয়ে। বাচ্চাটা আদৌও জানেনা চারপাশে কি ঘটছে। ইহান ওকে বললো না কিছু, দৃঢ় হাতে শুদ্ধকে কোলে তুলে তাড়া দিলো প্রেরণাকে, বললো,“আপনি কেমন প্রেরণা আমি জানি, এখন চলুন, নিজেকে সামলান! গুজব সম্ভবত ওটা। আর আমাকে কল দিতে পারলেন না তৎক্ষণাৎ?”
প্রেরণা ইহানের কথার জবাব না দিয়ে নিস্তেজ কন্ঠে বলতে থাকলো,“আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় আমার একমাত্র ডেস্টিনেশন মৃত্যু, এসব দুর্ঘটনায় মনে হয় এই তো, সেই দিনটা বোধহয় এলো।
শুদ্ধ! ওর জন্য এই ছয়টা বছর বেচেছি জানেন। খুব কষ্ট হয়েছে আমার। মরার কথা ভাবলেও কষ্ট হয়। ছেলেটা এই পৃথিবীতে একা হয়ে পরবে।”
কেঁদে দিল প্রেরণা। ইহান এমন ভঙ্গুর প্রেরণাকে এই মাত্র আবিষ্কার করলো। অনিমেষে কিছুপল ছটফট করতে থাকা সমুদ্রনীলার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,“ছয় বছর ধরে শুদ্ধর জন্য বেঁচে আছেন, আরো অনেক বছর বাঁচবেন। আর শুদ্ধ কখনোই একা হবে না। আমি আছি।”
“আমি আছি।”
বারবার এই কথাটা প্রেরণার গলা টিপে ধরে যেন বলছে,“এই হাদি দ্যাখ কত সরল সবটা! ঐ দ্যাখ কেউ নাকি আছে, তাকে থাকার সুযোগ দে না!”
ইহান শুদ্ধকে আরেকটু মিশিয়ে নিয়ে নিজের সাথে প্রেরণাকে নরম গলায় বলতে থাকলো,“চলুন? কিচ্ছু হয়নি তো!”
প্রেরণা যেন লজ্জায় মরে যাচ্ছে লোকটার সামনে নিজের এই বেহাল দশা তুলে ধরে ঝোকের মাথায়। ভেজা চোখ নামিয়ে নিয়ে সামলাতে চাইলেও পারলো না, এমনটা প্রত্যেকবার হয়। যেন শরীরের সব ওজন বয় ঐ বক্ষপট। সেটা ফাঁকা হয়ে গেলে দুপায়ের সাধ্য নেই শরীর ধরে রাখার।
বাইরে আরো একদলের চেঁচামেচি শোনা গেলো। ইহান তাড়াহুড়ো লাগিয়ে আর কোনো কিছু না ভেবেই ধরলো প্রেরণার হাতটা আলতো হাতে। অস্বস্তিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে দু'জনেই। তবে প্রেরণা না দিচ্ছে বাঁধা আর ইহান না ছাড়ছে হাতটা, ওকে টানতে টানতে ইহান লবি থেকে বেরুতে বেরুতে বললো,“দেখুন, কিছু হয়নি বোধহয়। সবাই গুজবে দৌড়াচ্ছে। আপনি ধীরে ধীরে হাঁটুন। ”
প্রেরণা তো হাঁটছে না, লোকটা শুদ্ধকে কোলে নিয়ে তাকে এক হাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নির্লিপ্ত, নিষ্প্রাণ প্রেরণার ভেতর থেকে তখন কেউ যেন ওকে বললো,“গেল গেল, সত্যি তোর জাত গেল বোধ হয়!”
সত্যিই গেলো? প্রেরণা বুঝতে পারছে না, সে কবে তার জাত,মান খুইয়ে বসলো লোকটার কাছে? সে কি প্রেমে পরেছে এইমাত্র এই লোকটার? না এই মাত্র পরেনি। তবে কবে পরেছে? কবে প্রেরণা সংযম খুইয়েছে? লোভী হয়েছে আর এতো অবুঝ হয়েছে? কবে?
প্রেরণা আশেপাশে তাকায়, ওয়াসীত দেখছে নাতো? ওয়াসীতকে কি জবাব দেবে? ভাবতে পারছে না প্রেরণা। মাথা ঘুরছে তার। কিছুক্ষণ আগের প্যানিক অ্যাটাকের থেকেও ভয়াবহ হলো হাল। সর্বোচ্চ দুকদম হেঁটেই লুটিয়ে পরলো মেঝেতে মেয়েটা।
চলমান......