#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২১
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
সুদূর বান্দরবান থেকে দুই ট্রাক ভর্তি আসবাব এসে দাঁড়িয়ে আছে এই এরিয়ার সুপারিনটেনডেন্ট মুঈন ফরাজীর কটেজের সামনে। সে এক বিশাল কাহিনী, বহুত কসরত করে তবেই ট্রান্সফারটা মঞ্জুর করাতে পেরেছে মুঈন।
এবারের কটেজটা আগেরটার থেকে বেশ বড় এবং এরিয়া বিস্তৃত। ইনশিরাহ পেটে হাত চেপে ঘুরে ফিরে সবকিছু দেখছে, চোখ জোড়া চকচক করছে তার উত্তেজনায়। যদিও কটেজটা তার স্বামীর কেনা নয়, তবুও এটা তো তার সংসার হতে চলেছে আবারো। সে এক আলাদাই ভালোলাগার বিষয়। পুঁচকে দু'টো হবে এখানে, এখানে হামাগুড়ি দেবে। কতশত স্মৃতি মাখবে ওরা এই কটেজের দেয়ালে দেয়ালে।
মুঈন ডিউটিতে জয়েন করতে গিয়েছে। ইনশিরাহ একা। ঠিক একা নয়, ইহান আর ইরফান আছে বাড়িতে। বরাবরের মতো বোনের সংসার সাজিয়ে দেওয়ার ভার দুই ভাইয়ের ঘাড়ে। লোকবল খাটিয়ে কটেজ ঠিকঠাক করছে ইরফান,আর ইহান কিচেনে তিনজনের জন্য তিন মগ কফি বানিয়ে এনে কটেজের বারান্দায় ইশির কাছে এসে দাঁড়ায়। বোনকে বলে,“কফি খাবি?”
_হ্যা দাও অল্প একটু খাই।
কফির মগটা নিলো ইশি। ইরফান ড্রয়িং রুম গুছিয়ে ও ঘরে ঢুকে এসি অন করে দিয়ে গা জুড়াতে বসলো, স্বভাব সুলভ ফাজলামির সুরে বললো,“পেয়েছিস আমাদের দুজনকে মাগনা কামলা দিতে তুই আর তোর সরকারি চাকরিজীবী বর।”
ইশি ভ্রু কুঁচকে বলে,“মোটেও মাগনা না, ও কতবড় ইলিশ মাছ পাঠিয়েছে কেয়ারটেকারের হাত দিয়ে সকালে জানিস? ওটা খাওয়াবো তোদের।”
_কত বড় ইলিশ?
_বিশাল সাইজ!
_বাপরে ! আমরাই তো ইলিশ কিনতে হিমশিম খাচ্ছি। তোর সৎ পুলিশ অফিসার এতো টাকা কই পায়?
বলতে বলতেই হেসে ওঠে ইরফান। ইশি ঠোঁট ফুলিয়ে কফির মগে চুমুক বসায়। ইহান বিরক্ত ভঙ্গিতে ভাইয়ের দিকে তাকাতেই ইরফান হাসি থামিয়ে দেয়, বোনকে খেপানো শেষ, এখন তার খেপাতে হবে দাদানকে, বললো,“ইলিশের কথায় মনে পরলো, প্রেরণা আপার ইলিশ রান্না বেস্ট বেস্ট বেস্ট।”
কথাটা দাঁত বের করে বলেছে ইরফান। কপালে দৃশ্যমান যে দু'টো বিরক্তির ভাজ ছিলো, নিমিষেই তা বিলীন হলো ইহানের। ফ্যালফ্যাল করে ভাইয়ের মুখের দিকে কিছু মুহূর্ত চেয়ে থেকে কফির মগ আর ফোনটা নিয়ে আড়াল হলো। ইশি বুঝলো না দাদানকে, ইরফানকে শুধালো,“কি হলো দাদানের?”
_বুক জ্বলুনি। একটু পানি ঢালতে গিয়েছে প্রেরণা আপার নামে।
_______
ইনু ফোনটা নিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে শুদ্ধর পড়ার ঘরে যায়। শুদ্ধকে ডাকতেই একটা ভদ্র ছেলের মতো এগিয়ে আসে শুদ্ধ। ইনু ওর কাছে হাতের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে আদুরে স্বরে বলল,“ইহান আঙ্কেল কল করেছে, নাও কথা বলো।”
সকাল থেকে মাম্মা জোর করে পড়ার টেবিলে বসিয়ে রেখেছে, পাহারায় রেখেছে মিস জেনিকে, একটুও ফুরসৎ পায়নি শুদ্ধ। এই বিপদের সময়ে ইহান আঙ্কেল তথা শুদ্ধর সুপার ম্যান কল করেছে শুনে শুদ্ধর মুখটা উজ্জ্বলতায় ছেয়ে গেলো। উচ্ছ্বসিত হয়ে ফোনটা নিয়ে কানে চেপে ধরলো বাচ্চাটা।
হ্যা সুপার ম্যানই তো। সেদিন তো শুদ্ধ দেখলো, অসুস্থ মাম্মাকে রেসকিউ করেছে ইহান আঙ্কেল। শুরু থেকেই ইহান আঙ্কেলের চেহারার আদল তার কাছে সুপার ম্যানের মতো লাগে, গত পরশু শুদ্ধ একেবারে নিশ্চিত হয়েছে ইহান আঙ্কেল সুপার ম্যানের মতো শক্তিশালীও।
ওপাশ থেকে ডাকলো ইহান,“শুদ্ধ?”
_হুম।
_তুমি কেমন আছো?
_আমি খুব ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
_আমিও খুব ভালো আছি। তোমার মাম্মা কেমন আছে? তার শরীর কি ঠিক হয়েছে?
সেদিন কারেন্ট ফল্টের ঘটনাটা পুরোটাই গুজব ছিলো। সেটুকু জানার আগেই জ্ঞান হারিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা অতিরিক্ত মানসিক চাপে। সেন্সলেস হয়ে যাওয়ার পরে, আধাঘণ্টা পর প্রেরণার জ্ঞান ফিরেছিল। তারপর থেকে কথা হয়নি ইহানের সাথে।
শুদ্ধ তাড়াহুড়ো করে বললো,“মাম্মা সুস্থ,মাম্মা রেস্তোরাঁয় গিয়েছে।”
একটা স্বস্তির শ্বাস বের করে দেয় ইহান। শুদ্ধর সাথে আরো কিছুক্ষণ বার্তালাপ চালিয়ে কল কেটে সময় দেখে। যদিও আজ তার পার্টি অফিসে কোনো কাজ নেই, তবুও সেখানে যাবে বলে মনস্থির করেছে ইহান। ইশিকে গিয়ে বললো,“আমি একটু পার্টি অফিস থেকে ঘুরে আসি। বাকিটা ইরফান দেখবে।”
ইশি চোখ কপালে তুলে বললো,“আজ কেনো? আজ তো কাজ নেই তোমার! ”
ইশির কথা শেষ না হতেই জবাবটা দেয় ইরফান, আড়চোখের দৃষ্টি দাদানের গম্ভীর মুখটাতে রেখে বললো,“আরে আজ সোমবার,প্রেরণা আপু তো রেস্তোরাঁয় থাকবে আর ইলিশের মজার মজার পদ রাঁধবে। দাদান সম্ভবত সেটা মিস করতে চাচ্ছে না।”
ইশি বহু কষ্টে হাসি চেপে রেখে বললো,“না দাদান, ইলিশ আমিও ভালো করে রাঁধতে শিখেছি। তুমি প্লিজ লাঞ্চের আগে চলে এসো।”
ইহান দুই ভাইবোনের মস্করায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, ফোনটা নিয়ে চুপচাপ বেড়িয়ে যায় কটেজ থেকে। গাড়িতে উঠে বসে স্টিয়ারিংয়ে যখন হাত রাখলো ইহান তখনই বাড়ি থেকে এলো কল। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সামিনের গলা শোনা গেল,“আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরো ইহান। তোমার সাথে কথা আছে আমাদের।”
পার্টি অফিসের সম্মুখে গাড়ি থামিয়েই অবাক হলো ইহান আজ। সচরাচর এই এরিয়া আগে নিড়িবিলি ছিলো। স্বাদে আহ্লাদে এখানে স্থানান্তরিত হবার পরেও বাইরের রাস্তায় এভাবে উপচে পরা ভিড় ছিল না। প্রেরণা সবকিছুতেই শৃঙ্খলা বজায় রাখা মহিলা, সবকিছু গোছালো তার, আজ এভাবে গেটের ভেতরে হল্লার কারণ কি? না, তার দলের ছেলেদের গলা নেই। এক ভদ্রমহিলা চেঁচাচ্ছে। কিন্তু কেন?
ইহান দ্রুত গাড়ি পার্ক করে লম্বা কদমে ভেতরে ঢুকতেই থমকাল। স্বাদে আহ্লাদের স্টাফ সহ কিছু কাস্টমার ঘেরাও দিয়ে রেখেছে যায়গাটা। ঐ ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে কি ঘটছে সেটি সম্পর্কে অবগত নয় তখনো ইহান। চোখ বড় বড় করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো এক কোণে অন্তর মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইহানের চোখে চোখ পরতেই অন্তর লাফিয়ে লাফিয়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“ভাই ভাবী!”
_ভাবী কি? ভেতরে কি হচ্ছে? এই মহিলা কে?
_ভাই চিনিনা মহিলাকে, ওনার স্বামীকে চিনি। ব্যবসায়ী জিহাদুল কবির। এই মহিলা এসে তখন থেকে ভাবীকে সবার সামনে অপমান করছে।
হতভম্ব ইহান, ভ্রু গুটিয়ে যায় কপালের, অন্তরকে ধমক দিয়ে বলল,“অপমান করছে মানে? কেন?”
_মহিলা বলতেছে ভাবী নাকি তার হাসবেন্ড কে সিডিউস করার চেষ্টা করে, ভাই আরো কি সব বিশ্রী কথা, আমি মুখে আনতে পারছি না। ভাবী এখনো একটা থাপ্পর মারলো না মহিলাকে, আর ঐ মহিলার হাবভাব এমন যে এক্ষুনি ভাবীর চুলের মুঠি ধরবে।
বড় একটা শ্বাস ফেললো ইহান এইবার, ভেতরের ভীষণ ক্ষুব্ধ সত্তাটা বেসামাল হলো, কোনো কিছু না ভেবে ভিড় ঠেলে এগোলো সে।
প্রেরণা শান্ত দৃষ্টিতে জেরিন নামের ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে আছে। এই প্রেরণা আগের প্রেরণা হলে কেঁদে কেটে হয়তো বুক ভাসাতো এমন অপবাদে। যেমন করেছিল চার বছর আগে, যখন ওর এক ফুপাতো বোন, স্নেহা প্রেরণাকে অপবাদ দিয়েছিল “বিধবা প্রেরণা স্নেহার স্বামীর থেকে সহানুভূতি নিতে হ্যাংলামি করে তার সাথে।”
ঐ অপবাদ শুনে মরা কান্নায় লুটিয়ে পরেছিল প্রেরণা। আর আজ, আজ তার হাসি পাচ্ছে কেন জানি। নিজের বিধি লিখন দেখে হাসি পাচ্ছে দুঃখে।
জেরিন স্বভাব গত ভাবে ঝগড়ুটে প্রকৃতির মহিলা, আজ যেন বেশিই লাগাম ছাড়া সে। বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করছে প্রেরণাকে,“আর কাউকে পেলে না? আমার স্বামী? তোমাদের মতো মহিলার সাথে কি করা উচিত জানো? রাস্তায় নামিয়ে তারপর জুতাপেটা করা। চোখ থাকে সবসময় সুখের সংসারের দিকে তোমাদের।”
প্রেরণা তখনো ভীষণ শান্ত। বারবার ঠান্ডা গলাতেই নিজের সাফাই গাইছে। এবার হাতের ফোনটা তুলে জেরিনকে বললো,“আমি আবারো বলছি আপনি লাগাম টানুন জিহ্বায়। এই দেখুন জিহাদুল ভাইয়ের সাথে আমার কনভারসেশন। যেটুকু কথা হয়েছে রিকু আর শুদ্ধের বন্ধুত্বের প্রয়োজনে আর কাজে। ওনার প্রতি ইন্টারেস্ট আমার নেই। যদি আপনি বিনা প্রমাণে এভাবে আমার মান নষ্ট করতে থাকেন তবে কিন্তু আইনী ব্যবস্থা নিবো আমি, ভাববো না আপনি রিকুর মাম্মা!”
জেরিন আরো চেতে উঠলো, তেড়ে গিয়ে দুকদম সামনে এগিয়ে বললো,“আইনী ব্যবস্থা? আইনী ব্যবস্থা আমি তোমাদের দু'জনের বিরুদ্ধে নেবো।”
_তাই নাকি? তা কি প্রমাণ আছে রিকুর বাবা আমার সাথে পরকীয়া করছে? পুলিশের কাছে গিয়ে বলবেন,“এটি আমার বেহুদা মনের সন্দেহ অফিসার?”
প্রেরণার ত্যাড়া কথায় জেরিন হতবুদ্ধি হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো এবার আকাশ পাতাল এক করে, বললো,“প্রমান বের করতে সময় লাগবে না বেশরমা মেয়ে কোথাকার। তোর ঘামন্ড খুব দ্রুত ভাঙবো আমি! তুই কি সবাই খুব ভালো করে জানে হ্যা? সোস্যাইটির কোন পুরুষটার দিকে নজর নেই তোর বল? হাসতে হাসতে গায়ে পরিস সবার। কি মনে করেছিস? কেউ খবর রাখে না?”
ইহান কয়েক সেকেন্ড বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ওই দুই মহিলার মুখের দিকে, এই কথার পরেও প্রেরণার শান্ত এবং দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে ইহান মেজাজ হারিয়ে এগিয়ে গিয়ে জেরিনকে ধমকে উঠলো,“এসব কি? আপনি কে এভাবে কথা শোনানোর? পুলিশ ডাকবো আমি?”
ইহান তাজওয়ার মির্জাকে জেরিন খুব ভালো করে চেনে, একটু যেন থিতু হলো সে এইবার, তবে দমলো না, এবার কেঁদে দিয়ে বললো,“আপনি তো মেয়ে নন, বুঝবেন না আমাকে। এই মহিলা আমার হাসবেন্ডের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে, আপনিই বলুন, আর কোনো মানুষ নেই দুনিয়ায় যে আমার হাসবেন্ডের মাথাটাই খেতে হবে এই ভোলাভালা দেখতে অসভ্য মহিলার?”
ইহানের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে রাগে, হাত দু'টো মুষ্টিমেয় করে আশেপাশে তাকায় রক্তচক্ষু নিয়ে, তাকায় প্রেরণার দিকেও। ভদ্রমহিলা নির্বাক, ওনার এই নির্লিপ্ততা আরো রাগিয়ে দিচ্ছে ইহানকে, কেন এখনো এই মহিলাকে চড় মারছেন না উনি?
পরিবেশ টা ইহান তাজওয়ার মির্জা আসার বদৌলতেই একটু পাল্টে গেলো। বাইরের রোড থেকে আসা কিছু মানুষ কেটে পরলো। তবে যাওয়ার আগে প্রেরণাকে ছিঃ ছিৎকার করে যেতে ভুললো না। অবশ্য তাতে প্রেরণার কোনো হেলদোল হয়নি এইবার। সে যেন পাথর হয়েছে।
ওখানে তখন চলে এসেছে জিহাদুল কবির, ইহানকে দেখে ফাঁকা একটা ঢোক গিলে এগিয়ে এসেই জেরিনকে একটা থাপ্পড় মেরে দেয়। প্রেরণা ইহান দু'জনেই চমকে ওঠে। জেরিন গাল চেপে চেঁচায়,“কি এই বেশ্যাটার জন্য আমাকে চ'ড় মারলে? এখন তো দেখছি লোকের কথা আর আমার সন্দেহ ঠিক। কু*ত্তার বাচ্চা তোর নামে এইবার আমি মামলা করবোই করবো!”
জিহাদুল রাগে কাঁপছে, গত এক সপ্তাহ ধরে জেরিনকে কেউ উড়ো খবর দিচ্ছিলো তার আর প্রেরণার নামে,যেসব আদৌও সত্য নয়। আর গতকাল জিহাদুল অতি প্রয়োজনেই প্রেরণাকে কল করেছে,তাও প্রেরণার কেটরিং সার্ভিসের একটা কাজে,ওটা অফিশিয়াল আলাপ ছিলো আধাঘণ্টার। প্রেরণার কেটরিং সার্ভিসে একদিনের জন্য বুকিং দিয়েছে তার অফিসের প্রোগ্রামের জন্য। সকালে প্রেরণা মেসেজে তার উত্তর পাঠিয়েছে ,বলেছে সে রাজি। আর সেই থেকেই লেগেছে ঝামেলা। জেরিন থামেনি। পোস্ট পার্টাম পিরিয়ডে সে, এমনিতেই বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। আজ সবকিছুর সীমা ছাড়ালো।
জেরিনের চেঁচামেচি শুনে এবার প্রেরণা মুখ খুলে চেঁচায় জিহাদুলের ওপর,“প্লিজ ভাই এখানে বৌয়ের গায়ে হাত তুলে আর তামাশা করবেন না। ওনাকে নিয়ে যান, এবং আপনারা দুজন স্বামী স্ত্রী আমার থেকে দূরে থাকবেন!”
জিহাদুল আমতা আমতা করছে,“স্যরি প্রেরণা...”
_একদম নাম ধরে ডাকবেন না। প্রেরণা ভাবী বলেন আমাকে।
প্রেরণার কন্ঠের দৃঢ়তায় ইহান তাকিয়ে রইল, মাঝখানে তাচ্ছিল্য করে উঠলো জেরিন,“নাটক হচ্ছে? বদমাইশ মহিলা! অথচ মেসেজে তো খুব কথা আদান প্রদান হয়।”
প্রেরণা হাঁসফাঁস করে উঠলো এইবার, তবে চেচালো না জেরিনের ওপর। বরাবরের মতো শান্ত সুরে বললো,“সে হিসেবে রোজ বহু পুরুষের সাথে আমার মেসেজিং করতে হয়। তাদের ক্লায়েন্ট হিসেবে হ্যান্ডেল করতে হয়, আপনি এখন বলবেন সবার গায়ে পরি আমি? সবাইকে সিডিউস করি?”
জেরিন চোখের পানি মুছে নেয়, তবে কোনো জবাব দেয়না। জিহাদুল আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো লোকজনকে, দেখলো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইহান তাজওয়ার মির্জাকে। তার এরিয়ায় এসে এভাবে সিনক্রিয়েট করে মার খেতে ইচ্ছুক নয় জিহাদুল। জেরিনের হাত ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“চলো বাড়িতে, মিশু কাঁদছে।”
জেরিনের সাথে ধস্তাধস্তি শুরু হয় জিহাদুলের, কান্না চেপে রেখে জেরিন কঠিন গলায় স্বামীর ওপর চেঁচাতে থাকে,“কয়টা লাগে তোর? বদমাইশ ছাড় আমাকে! এই বেশ্যাটার কাছে থাক তুই নাটক না করে, আমাকে আর আমাদের বাচ্চাদের ছাড়। পরের বাচ্চার জন্য তো খুব দরদ তোর।”
ইহান কিছুই বলছে না, সে দেখছে প্রেরণাকে, যত দেখছে তত তার রাগ তরতরিয়ে বাড়ছে। একপর্যায়ে সেখানে চলে আছে জেরিনের বড় বোন, এখানকার গার্লস স্কুলের বাংলা টিচার মেহজাবিন। বোন আর ভগ্নিপতিকে ঠেলে গাড়িতে তুললো ভদ্রমহিলা পাঁচ মিনিটের মাথায়। অতঃপর এসে প্রেরণার সামনে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,“সবই শুনেছি। প্লিজ কষ্ট নিয়ো না, তবে আমার বোনের অবস্থাটা তোমাকে বলি। বেশ কয়েকবার জিহাদুলের পরকীয়া ধরেছে ও। খুবই সন্দেহ বাতিক হয়েছে তাই বর্তমানে। এবং একই সাথে মানসিক কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে তোমাকেও একটা কথা বলি বোন,কিছু মনে করো না, বিধবাদের একটা সীমার মধ্যে নিজেকে আটকে রেখে চলতে হয়। পুরুষ মানুষ কেমন জানো তো? হাতে গোনা কয়েকটা মহাপুরুষ ছাড়া সব পুরুষ তোমার মতো সুন্দরী এক বিধবার থেকে সুযোগ নেওয়ার ধান্দায় থাকবে। কারণ তারা জানে,এতে কোনো রিস্ক নেই। তোমার উচিত রয়ে সমঝে চলা।”
প্রেরণা তখনো চুপ, নিষ্পলক দেখছে ভদ্রমহিলাকে। ইহান ভীষণ খেপে গিয়ে এবার ঐ ভদ্রমহিলাকে বললো,“হয়েছে আপনার জ্ঞান বিতরণ? এখন আমি আমার মেজাজ হারানোর আগে আপনার পাগল বোন আর গর্দভ ভগ্নিপতিকে নিয়ে এখান থেকে যান। এবং তাদের অপেক্ষা করতে বলুন একটু পর একটা চমক আছে তাদের জন্য।”
ইহানকে খেপতে দেখে আশেপাশের মানুষ যায়গাটা ফাঁকা করলো সেকেন্ডের মাথায়। মেহজাবিন আরো দুমিনিট প্রেরণার কাছে মাফ-টাফ চেয়ে চলে যায় বোন আর ভগ্নিপতিকে নিয়ে। একই স্থানে একই ভাবে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেরণার মুখটাতে ইহান রাখলো তার ক্ষুব্ধ দৃষ্টি। চেচালো না,তবে বেশ শীতল স্বরে বললো,“ন্যাকামি?”
_কি ন্যাকামি?
নিস্তেজ স্বর প্রেরণার।
_থাপড়ালেন না কেন?
সামান্য হাসলো প্রেরণা, বললো,“থাক বাদ দিন। বেচারী!”
ইহান নিজের রাগ থামাতে পারছে না, ইচ্ছে করছে ভদ্রমহিলার হাত টেনে নিয়ে যেতে থানায়। তবে সে এই বাড়াবাড়ি করলো না,শুধু শান্ত স্বরে বললো,“চলুন।”
_কোথায়?
_থানায় যাবেন,মান হানির মামলা করতে। চলুন।
যেন খুব অধিকার আছে ইহানের প্রেরণার ওপর। তেমন করেই আদেশ করছে লোকটা। প্রেরণা বিস্ফোরিত চোখে কিছুক্ষণ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষ্যাপাটে লোকটাকে দেখে নিয়ে বললো,“বাদ দিন, আর জলঘোলা করে কি লাভ? আ'ম ইউজড টু ইট!”
ইহান নিজের মেজাজ হারিয়ে ফেললো পুরোপুরি প্রেরণার শেষ কথাটাতেই, আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে একটা ধ'ম'ক দিয়ে বললো,“যাস্ট শাট আপ! চলুন আমার সাথে। আমি আছি। এটুকু আপনার করতেই হবে,চলুন।”
প্রেরণাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ইহান গাড়ির দিকে যেতে নেয় পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে। প্রেরণাকে হঠাৎ খুব বিচলিত লাগলো, দৌড়ে গিয়ে আটকালো ইহানের পথ। ইহান পাশ কাটিয়ে এগোতে লাগলো। আর প্রেরণা ওর পেছনে পেছনে পায়ে পা মিলিয়ে ছুটে বলছে,“প্লিজ বাদ দিন। এসব করে কি লাভ হবে? প্লিজ এসব আমি বহু আগে থেকে সামলাই। প্লিজ থামুন তো ইহান।”
নিচতলায় স্বাদে আহ্লাদের বারান্দা থেকে প্রেরণার স্টাফ এবং কাস্টমার আর দোতলার বারান্দা থেকে ইহানের ছেলে গুলো দৃশ্যটা দেখছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। প্রেরণা ইহানকে অতিক্রম করে আবারো তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলে,“এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি বুঝবো কি করা উচিত আর কি করা উচিত না।”
ইহানের কানে যেন প্রেরণার কোনো কথাই ঢুকছে না। আবারো পাশ কাটিয়ে ইহান গাড়ির দরজায় হাত দেবে তখন প্রেরণা এক কাজ করে বসলো। ইহানকে থামানোর প্রচেষ্টায় হতবুদ্ধি হয়ে ওর পিঠের কাছের পাঞ্জাবি টেনে ধরলো ডান হাতে।
থমকালো ইহান, আটকে গেলো ওর পা। বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকা লাভা যেন একটু খান্ত হলো,বিরতি নিলো দু দণ্ড। অনুভব করলো যে হাতে ভদ্রমহিলা তাকে আটকেছে, ভদ্রমহিলার সেই হাতটাই কাঁপছে। কিছুপল থ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ইহান ঘুরলো, এবার ঘুরে ইহান প্রচন্ড ধাক্কা খেলো। চেয়ে চেয়ে দেখলো তার সামনে এখন “ডোন্ট কেয়ার” ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা,শান্ত প্রেরণা নেই। দাঁড়িয়ে আছে ক্রন্দনরত ভঙ্গুর এক মেয়ে। ইহান তাকিয়ে রয় শুধু, কিচ্ছুটি
বলে না। বলে ওঠে প্রেরণা। এতক্ষণের জমিয়ে রাখা হতাশা নোনাজল হয়ে বেড়িয়ে এলো, না চাইতেও ধরা দিল ইহানের কাছে, আকুল হয়ে অনুরোধ করলো,“I'm used to it ইহান! প্লিজ।”
ইহান নিস্পন্দ চোখে শুধু দেখেই যাচ্ছে প্রেরণাকে। প্রেরণা হাতটা সরিয়ে নিলো নিজের। নামিয়ে নিলো চোখ। তবে যায়গা থেকে নড়লো না, আবারো বলতে লাগলো,“I'm used to it!”
ইহান অনুভব করছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে খুব করে, অনুভব করছে আগাগোড়া প্রেরণাকে। বিগত দিনগুলোতে ইহানের অন্তঃপুরে চলতে থাকা দোলাচল, যার সমাধান কেউ দিতে পারেনি ইহানকে, ভদ্রমহিলার চোখের নোনাজল ইহানের সেই দোলাচলের সমাধান দিলো। ইহান পেলো তার উত্তর, সত্যিই পেলো। মুহুর্ত কাটে, ইহান বেশ সময় নিয়ে শান্ত হয়ে বলে,“গাড়িতে উঠুন।”
_কেন?
_বাড়িতে পৌঁছে দেবো আপনাকে।
প্রেরণা একটু বিশ্রাম চাচ্ছিল। অমত করলো না ইহানের প্রস্তাবে। ভেতরটা ছটফট করছে যদিও, তবে আর বেশি প্রকাশ করলো না নিজের এলোমেলো ব্যক্তিত্ব এই মানুষটার সামনে। কি লাভ? মানুষটাকে সে বুঝে ফেলেছে আগাগোড়া। একে উস্কে দিতে চায়না প্রেরণা, কোনো কারণ দিতেও চায়না প্রেরণা।
গাড়িতে চুপচাপ বসে রইল প্রেরণা। ইহান যারপরনাই গম্ভীর, কোনো কথা বলছেই না সে। প্রেরণা চোখ মুছে উশখুশ করলো কিছুক্ষণ, অতঃপর নিচু গলায় বললো,“আপনি জিহাদুল ভাইকে বা তার ওয়াইফকে কিছু বলবেন না আমার অনুরোধ।”
ইহান জবাব দিলো না। গাড়ির গতি বাড়িয়ে একটানে ইহান এপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে প্রেরণাকে নামিয়ে দিয়ে কিছু না বলেই গাড়ি ঘোরালো। প্রেরণা শূন্য দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো রাস্তার ধুলো, ইহান তাজওয়ার মির্জার গাড়ি যা উড়িয়ে দিয়ে গেলো।
অনিয়ন্ত্রিত গতিতে ইহানের গাড়ি শান্তিনীড়ের সামনে এসে থামলো দুপুর একটা নাগাদ। বাড়ির দারোয়ান সুরুজ আজ ভীষণ অবাক, ইহান তাজওয়ার মির্জা কখনো এভাবে রাফ ড্রাইভিং করে না। তাড়াহুড়ো করে গেট খুলে দিল সে। ইহান নামলো মুখ চোখ গম্ভীর করে, কোনোমতে গাড়িটাকে পার্ক করে লম্বা কদমে, রুদ্ধশ্বাসে অন্দরে ঢুকলো সে। বাড়ির বড়রা আজ একটা নাগাদ খেতে বসে কেউ কেউ। খাবার টেবিলে বসেছিল সামিন, ইলহাম, আলো, রিতু, প্রণমি আর পরী।
ইহানকে তখন দেখে সবাই অবাক হলো ভীষণ। ইলহাম বললো,“তুই এখানে কেন? আজ তো ইশির বাসায় খাওয়ার কথা তোর?”
ইহান জবাব না দিয়ে এগোলো। ওর জলদগম্ভীর মূর্তি দেখে সবার চোখে বিস্ময় খেলে যায়। রিতু উঠে দাঁড়ায় ছেলের দুশ্চিন্তায়। সামিন তখন বলে ওঠে,“বেশ,হাত ধুয়ে খেতে আসো, তোমার সাথে কথা আছে মেহেকের বিষয়টি নিয়ে।”
ইহান তখনো কিছুই বলে না,আরো দুকদম এগিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ায় বাবা চাচার সামনে, সবাই ওকে চোখ বড় বড় করে দেখছে। ইহান দম ফেললো, মুখভঙ্গি পাল্টে গেলো নিমিষেই। নিচু স্বর, তবে খুব দৃঢ়তা নিয়ে এবার স্পষ্ট করে বললো,“পাপা, বড় বাবা। আমি প্রেরণাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি। এবং এটাই আমার বিয়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত। এবং এটাই সবকিছু, এটাই.....”
চলমান.....