#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২২
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
প্রণমি খাচ্ছিল, ওর প্লেটে কাঁটা বেছে মাছ রাখছিল আলো। দু'জনের হাত একসাথে থামলো। এবং একসাথেই উঠে দাঁড়ালো দু'জন।
বাড়ির বাকি সবাই তখনো বেশ স্বাভাবিক,একই অবস্থা রিতুর ক্ষেত্রেও। নিস্পন্দ চোখে তাকিয়ে আছে বড় ছেলের মুখের দিকে। তার হাতে ডালের বাটি, ওটা ধরেই দাঁড়িয়ে আছে।
কথা বলে উঠলো আলো, বিস্ময়ের দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ইহানকে বললো,“প্রেরণাকে বিয়ে করতে চাস মানে? কোন প্রেরণা? আমাদের প্রেরণা?”
প্রণমি চমকে ওঠে,হাতে চেপে ধরে নিজের ওড়না। মেয়েটা পরবর্তী ঝামেলার বিশ্রী একটা ঘ্রাণ পেল তৎক্ষণাৎ, বুকটা কেঁপে উঠল মৃদু। ইরফান মির্জা কোথায়? সে কি আজ দেরি করে আসবে? ঐ মুহুর্তে শুধু ইরফানের কথাই মনে পরছিলো প্রণমির।
ইহান আলোর কথায় ম্লান হাসলো,জবাবে বললো,“জি, তোমাদের প্রেরণা বড় মা!”
নিঃশব্দে একটা বজ্রপাত হলো,সবাই টের পেলো। বজ্রপাতটার এতটাই প্রভাব যে সামিন ইয়াসার মির্জা আর ইলহাম মির্জা এঁটো হাতে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়। পরী তাড়াহুড়ো করে খাবার খাচ্ছিল লাঞ্চ সেরে চেম্বারে ছুটবে তাই। গলায় খাবার আটকে কাশতে লাগলো অনবরত।
প্রত্যেকের মুখভঙ্গি পাল্টেছে, শুধু পাল্টায়নি রিতু। তখনো নির্বাক হয়ে বড় ছেলেকে দেখছে।
_________
ফ্ল্যাটে ঢুকেই প্রেরণা তাড়াহুড়ো করে ওয়াশ রুমে ঢুকে চোখে মুখে জল ছেটালো। শুদ্ধ মাকে দেখতে পেয়েই ঢোক গিললো ঘাবড়ে যাওয়া মুখে। বাচ্চাটা জানে, আজ মায়ের বেলা তিনটায় ফেরার কথা রেস্তোরাঁ থেকে। তবে এতো তাড়াতাড়ি ফিরলো কেন? শুদ্ধর পড়া ধরবে না তো এখন? কিন্তু শুদ্ধ তো সবটা রেডি করেনি। মিস জেনি ঘুমিয়ে পরেছে দেখে গেম খেলেছে কম্পিউটারে।
প্রেরণা ছেলেকে ডাকলো না, মুখ হাত ধুয়ে শুরুতেই ঘরের দরজাটা লাগিয়ে দিলো ধাপ করে। প্রিতম লাঞ্চে বাড়িতে এসেছে আজ, আর অফিসে যাবে না। বাড়িতে বসেই প্রজেক্ট দেখবে। ইনু ওকে ভাত বেড়ে দিতে দিতে অবাক চোখে প্রেরণাকে দেখে ওর ঘরের কাছে এগিয়ে গিয়ে দরজায় টোকা দেয়, উদ্বিগ্নতা নিয়ে শুধায়,“আপু ঠিক আছো? শরীর খারাপ?”
ভেতর থেকে নিস্তেজ মলিন স্বর ভেসে আসে প্রেরণার, কান্না চেপে রেখেছে, থেমে থেমে বলছে,“একটু মাথাব্যথার ওষুধ খেয়ে ঘুমাবো আমি। শুদ্ধকে প্লিজ খাইয়ে দাও ইনু। আমাকে রাতের আগে ডাকবে না।”
_________
ঝনঝন করে ডালের বাটি পরলো ফ্লোরে। পর পর পরলো দু'টো গ্লাস এবং শেষে পরলো ভাজা রুপ চাঁদা মাছের ট্রেটা।
হাপাচ্ছে রিতু। বাড়ির সবাই যেন নিরব দর্শক হলো। সামিন, ইলহাম তখনো দু'টো শব্দ উচ্চারণ করেনি।
ইহান মায়ের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। রিতু কিছু সময় হাঁপিয়ে এবার রান্নাঘরে গিয়ে অহেতুক ভাঙচুর করা শুরু করে দেয়, আজ সে কাউকে মানলো না। না স্বামী,না ভাসুর। নিজের মনের জ্বলুনি কমানোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় সে। বাড়াবাড়ি যখন শুরু হয় তখন আলো আর পরী গিয়ে কিচেন থেকে টেনে বের করে রিতুকে। রিতুর শরীর কাঁপছে। আলো উৎকণ্ঠা নিয়ে বললো,“অসুস্থ হয়ে পরবি তুই। একটু থাম!”
প্রণমির কান্না পাচ্ছে। চুপচাপ চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যতীত তার কিছু করার নেই যে। হঠাৎ আবারও কেঁপে উঠলো সে,যখন তার শাশুড়ি চেচালো,“কি থামবো আমি? ও কি বললো শুনলে না? পাগল হয়েছে ও? ওর মাথা গেছে? এই তোমরা ওকে জবাব দিতে বলছো না কেন?”
ইহান তখনো চুপ। নীরবতা ভাঙলো সামিন, অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে হতভম্ব গলাতেই জানতে চাইলো ইহানের কাছে,“নিশ্চয়ই মজা করছো না। সেটা বুঝেই জানতে চাইছি। প্রেরণা তোমাকে চায় ? নাকি এক তরফা?”
ইহান আবারো মাকে দেখলো। মায়ের চোখ লাল। ইহান ঘুরে বাবাকেও দেখলো, ইলহাম বসে পরেছে চুপচাপ । চোখ নামিয়ে নিয়ে ইহান সাবেক দৃঢ় গলায় সামিনকে বলে,“এক তরফা না সম্ভবত। সম্ভবত উনিও, খুব সম্ভবত আমি ভুল নই। আমি তোমাদের অনুমতি নিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিতে চাচ্ছি।”
রিতু চেঁচিয়ে উঠলো,“আর একটা কথা বললে খুব খারাপ হবে ইহান। এখুনি অফ যা। নয়তো চ'ড় খাবি আমার হাতে।”
আলো রিতুকে ঘুরিয়ে নিলো,“এমন কেনো করছিস? হ্যা বিষয়টা আমাদের সবার হজম করতে কষ্ট হচ্ছে তবে এটা তো এতো উত্তেজিত হবার বিষয় নয়। তুই থাম, কথা বলতে দে আমাদের।”
রিতু বড় জা কে বললো,“উত্তেজিত হবার বিষয় নয়? এক বাচ্চার মাকে পছন্দ করে বসে আছে তোমার ছেলে, তোমার খুব শান্তি লাগছে?”
আলো বললো,“শান্তির কথা পরে, তবে ইহান তো মারাত্মক অপরাধ করেনি যে ওর ওপর এভাবে চেচাবি তুই। এতবড় ছেলেকে মারার কথা বলবি।”
রিতু শ্বাস ফেললো, তাচ্ছিল্য করে জা কে বললো,“সেই। আমারটাই তোমাদের চোখে লাগে। তবে তুমি ইশির সাথে অমন করেছিলে কেন যখন জানতে পেরেছিলে ইশির সাঈমের সাথে রিলেশন আছে? কেন ওকে জোর জবরদস্তি করেছিলে? থাপ্পড় মেরেছিলে? ”
আলো চুপ হয়ে যায়। পরী পাশ থেকে অবাকের সুরে বলল,“সাঈম ভুঁইয়া আর প্রেরণা এক হলো? সাঈম ভুঁইয়ার বাড়িতে গেলে ইশির জান থাকতো?”
রিতুর গা কাঁপুনি থামছেই না,পরীর ওপর চেচালো,“এই তোর জ্ঞানী কথা রাখ। আমার ছেলের ব্যাপারে আমি একশো বার বাড়াবাড়ি করবো। এই ইহানের পাপা? আপনি চুপ করে আছেন কেন? ছেলেকে কিছু বলবেন না?”
ইলহাম মির্জা চোখ তুলে ছেলেকে দেখলো, মলিন মুখটা ঘুরিয়ে স্ত্রীকেও দেখলো। পরপর ছেলেকে বললো,“তুমি ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো?”
_পাপা দিনের পর দিন ভেবেছি। সিদ্ধান্ত টা কিছুক্ষণ আগেই নিয়েছি।।
মৃদু শ্বাস ফেলে ইলহাম মির্জা ছেলের মুখটা দেখতে দেখতে। এই তার ছেলে, সচ্চরিত্রের স্বচ্ছ সুপুরুষ। তার মতো যুবক বয়সের পাপ আর সব বদগুণ থেকে দূরে থেকেছে। ভীষণ মেধাবী, একাডেমিক জীবনে পরিশ্রমী থেকে কত মেডেল পেয়েছে। সদ্য আর্মিতে যোগদান করেই সাহসীকতার জন্য মেডেল পেয়েছে। তারপর গিয়েছিলো শান্তিরক্ষা মিশনে। ফিরেছে আধমরা হয়ে। ইলহাম ভাবেওনি তার ছেলে বাঁচবে, আল্লাহর দয়ায় পেয়েছে ছেলেকে। তারপর সুস্থ হতে না হতেই প্রেমিকার থেকে চূড়ান্ত প্রতারিত হবার শোক পেয়েছে। এই সেই ছেলে, যে দিনে দিনে দুঃসহ দিন গুলো উতরে গিয়ে নিজের জীবনে মনযোগী হয়েছে। এখন ছেলে নিজের মনের ইচ্ছেতে কাউকে জীবনে আনতে চাইলে তার কিছু করার আছে? নেই তো।
বলে না কিছুই ইলহাম, শুধু তাকিয়ে রয়। বলে সামিন, ছেলেকে দেখে মনে হচ্ছে ছেলে এই ব্যাপারে অটল থাকবে। তাকে স্বল্প সময়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। একপলক রিতুর দিকে তাকিয়ে সামিন ইহানকে বললো,“তোমার জীবনের পছন্দ। আমরা জানি তুমি ভাইবোনদের মতো অবুঝ নও। তাই সবটা তোমার ওপর ছাড়া হলো। রিতুর সাথে সমঝোতা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রেরণার কাছে যাও। আমরা বড়রা আলাদা কথা বলি, তুমিও প্রেরণার থেকে অনুমতি আনো। যদিও সব হবে তোমার ইচ্ছেতেই।”
রিতু ভাসুরের সামনে এসে দাঁড়ায়, কেঁদে দিয়ে বলে,“কিসের সমঝোতা করবো? এক বাচ্চার মাকে ছেলের বৌ করে আনবো? নষ্ট করবো ছেলের জীবন?”
বিরক্ত হয় সামিন কিছুটা,বলে,“এক বাচ্চার মা। হ্যা এটা আপাতদৃষ্টিতে একটা জটিলতা, আর সত্যি বলতে একই পরিবারে তিন ছেলেমেয়ের বিয়ে অদ্ভুত লাগবে, যদিও অদ্ভুত না। তবে ছেলের জীবন নষ্ট হবে কেন বলছো? প্রেরণা মেয়েটা খারাপ? কোন দিক থেকে ইহানের জীবন নষ্ট হবে? রিতু আমি বা আমরা সবাই যে খুব লাফিয়ে লাফিয়ে খুশি হয়েছি ঠিক তাও না। তবে অখুশি আর হায় হায় করার বিষয়ও তো নয় এটা। ইহানকে দেখো, তোমার মনে হয় তোমার ছেলে সিদ্ধান্ত থেকে হটবে? তাই আমাদের উচিৎ সমঝোতা করা। আর ঝামেলা করতে মন চায়না ছেলে মেয়েদের সাথে।”
রিতু শাড়ির আঁচল চেপে কেঁদে ফেললো, বললো,“জীবন নষ্ট হবে না বলছেন? কেন হবে না? সেই তো আমার ছেলের জীবনে থার্ড পারসনের প্রভাব পরবে। নষ্ট হবে না?”
আলো বিস্মিত হয়ে এগিয়ে এসে বললো,“থার্ড পারসন মানে?”
রিতু চোখ মুছে নাক টানলো, পর পর কড়া গলায় বললো,“একটা বিধবা মেয়ে। প্রথম স্বামীর মতো কখনো দেবে ভালোবাসা আমার ছেলেকে? ভাবী তুমি বলো, প্রেরণার যায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভাবো তো, জীবনে প্রথম ভালোবাসার দাম কি! ভেবে বলো তো!”
আলো থতমত খেয়ে বললো,“এসব তো আপেক্ষিক রিতু। আমি আমারটা বলতে পারি, তুই জানতে চাইছিস প্রেরণার কথা। ওরটা ও বলবে! আমি কি করে বলবো?”
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে রিতু,বলে,“আমি তোমাদের মতো অত উন্নত চিন্তাভাবনা করতে পারিনা ভাবী। আমি শুধু ভাবি আমার ছেলের ভবিষ্যত। কি গ্যারান্টি আছে ঐ মেয়ে আমার ছেলেকে টেকেন ফর গ্রান্টেড হিসেবে নেবে না? কি গ্যারান্টি আছে ঐ মেয়ে আমার ছেলের মধ্যে শুধুমাত্র সোস্যাল আর ইকোনমিক্যাল সিকিউরিটিই খুজবে না? আর আবেগ আছে ঐ মেয়ের? কি দেবে আমার ছেলেকে? সংসার দেবে? জীবনেও না, আমি লিখে দিচ্ছি, এটা কখনো হবে না। ঐ মেয়ের পিছুটান আছে, আবার আমার ছেলে থার্ড পারসনের অত্যাচারে ধুকে ধুকে মরবে। ও শান্তি পাবে না এই সংসারে। তোমরা যতই বলো, আমি মত দেবো না মানে না।”
রিতুর এহেন কথার পিঠে গুছিয়ে জবাব দেওয়ার আগ্রহ দেখায়না কেউ। একজন মা হিসেবে যেটুকু চিন্তা করার রিতু করছে, এই পরিস্থিতিতে ওকে খেপিয়ে তো লাভ নেই। ইলহাম মির্জা উঠে দাঁড়ায়,ঘুরে তাকায় বড় ছেলের শুকনো মুখটাতে। স্ত্রীর চোখে চোখ মেলানোর সাহস নেই তার, তাই ছেলেকে বলে,“তুমি বুঝতেই পারছো এখানে তোমায় বোঝানোর জন্য আলোচনা সভা বসানো অযৌক্তিক। কারণ তুমি যথেষ্ট বড়। শুধু বলবো, প্রেরণার সাথে আলোচনা করে তোমরা দু'জনেই সময় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে আমাদের জানাও। আমরা পাশে থাকার চেষ্টা করবো, তোমার মনের ওপর জোর খাটানোর অধিকার আমাদের থাকলেও, ইচ্ছে নেই। তুমি খুশি থাকো এটাই চাই।"
পাশ থেকে সামিন ইয়াসার মির্জা গম্ভীর হয়ে মাথা দোলায়,“হ্যা একদম। বিধবা, বাচ্চার মা নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করার মতো সামাজিক অবস্থানে আমরা নেই। তোমার যদি মনে হয় তুমি সুখী থাকবে তবে তাই হোক। তবে আমার অনুরোধ বাবা, প্রেরণার সাথে কথা মিলিয়ে তোমরা দুজনেই সময় নিয়ে ভেবো। কারণ উনিশ বিশ হলে তোমাদের দু'জনের সাথে আমরাও তো ভুগবো তাইনা?”
বড় বাবার নমনীয় কথায় ইহান একটু স্বস্তি পেলো। সে তাকালো বড় মা আর ছোটো মায়ের দিকে। আলো মাথা নেড়ে বললো,“আমাদের মানতে অসুবিধা নেই তবে ভেবে দ্যাখ বাবা। রিতুর কথা যে একবারে ফেলে দেবো এমন তো নয়। একটু ভেবে দ্যাখ!”
ইহান লম্বা একটা শ্বাস ফেলল, ঘুরে তাকালো মায়ের দিকে। রিতু নিশ্চুপ অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। ছেলের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই রিতু চেঁচিয়ে উঠলো,“কি দেখছিস? যা প্রেরণার কাছে! তোর গার্ডিয়ানরা অনুমতি দিয়েছে। আমি কে? একটা অশিক্ষিত চিপ মেন্টালিটির মহিলা আমি। আমার কথার ওজন আছে? যা গিয়ে বিয়ে কর। ঐ নাক উঁচু অহংকারী মেয়েকেই বিয়ে কর।”
প্রণমি ডাইনিং কর্ণারে দেয়ালের সাথে মিশে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো। এতক্ষণে তার খুব কান্না পেলো। তার ভাসুর এটা কি করলেন? আপু তো অযথা কথা শুনছে যা হয়তো আপু জানেও না। আর কত আপু কথা শুনবে? তার বুকটা পুড়ছে আপুর জন্য। এই ইরফান মির্জাটা আসে না কেন?
প্রণমি দোতলায় ওঠে অতি সাবধানে। গিয়ে দরজা বন্ধ করে স্মার্ট কলিং ডিভাইসটা হাতে নিয়ে ইরফানকে কল দিয়ে কান্নায় ভেঙে পরে। ইশি মুঈনের সাথে তখন খেতে বসেছে ইরফান। প্রণমিকে কাঁদতে শুনে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,“কি হয়েছে প্রণো?”
হাপাচ্ছে প্রণমি, নাক টেনে টেনে বললো,“বাড়িতে ঝামেলা লেগেছে। একটু আসুন। আমার খারাপ লাগছে।”
ইহান বিমূঢ় হয়ে দেখছিলো ভঙ্গুর, অভিমানী মাকে। রিতু মাঝখানে একটু দম ফেলে দুমিনিট চুপ থেকে পরিবেশটাকে আরো গম্ভীর হতে দেয়। পর পর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলতে থাকে,“সত্যিই তো, আমি কে আপত্তি করার? একবার ছেলের জীবনটা নষ্ট হয়েছিল সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় পক্ষের আগমনে। ছেলে বছরের পর বছর মানসিক ডাক্তার দেখিয়েছে। আর এইবার ছেলে সরাসরি তৃতীয় পক্ষ নিয়েই একটা সম্পর্কে ঢুকতে চাচ্ছে। মা হিসেবে আবার আমি ছেলেকে ধুঁকতে দেখবো। আমি কেন কিছু বলবো? আমাকে তো মুক্তমনা মা হতে হবে! চেয়ে চেয়ে দেখবো কেউ আমার ছেলেকে ভালোবাসছে না, উল্টো নির্দিষ্ট কিছু কারনে ব্যবহার করছে। ছেলের পরিচয় ব্যবহার করছে। আমি এটা করলেই তো খুব ভালো মা হবো। নয়তো আমি খারাপ!”
এবার রিতু হুহু করে কেঁদে উঠলো। বাড়ির পুরুষেরা কিছু না বললেও আলো আর পরী একজন মায়ের কান্না দেখে একটু যেন নড়বড়ে হলো। এসে রিতুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো। অনুরোধের দৃষ্টিতে ইহানকে দেখে বললো,“একটু চিন্তা করে দ্যাখ না বাবা, তাড়াহুড়ো নেই। আমরা কিন্তু তোর পাশে আছি। তবে তুই একটু সময় নে!”
ইহান চাচীদের কথায় জবাব না দিয়ে মায়ের দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে, ধীরে ধীরে বসলো মায়ের সম্মুখে,মেঝেতে। দু'হাত রাখলো মায়ের কোলে। রিতু তীব্র অভিমান আর হতাশায় সরিয়ে দিল ঐ হাত, বললো,“পাবি না অনুমতি। অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করতে হবে তোকে। যা।”
ইহান ম্লান হাসলো মায়ের কথায়, পর পর শ্বাস ফেলে বললো,“অনুমতি চাইতে তো তোমার কাছে বসিনি মাম্মা। আগে আমার প্রেরণার সাথে কথা বলতে হবে, উনি পাত্রী। তোমার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার পালা আসবে পরে।”
রিতু কাঁদল,“পাবি না তুই। কখনোই পাবি না।”
এবার ইহান আরো বেশি মলিন করে হাসলো,বললো,“তুমি আমার ভীষণ ভালো মনের মাম্মা! আমার সাধ্য নেই তোমাকে বোঝানোর যদিনা তুমি নিজে আমার পরিস্থিতি বোঝো। এখন আমি প্রেরণার কাছে যাচ্ছি মাম্মা, ওনার মনের কথা জানতে। তার আগে তোমায় নিশ্চিত ভাবে একটা কথা বলে যাই। বিয়ে যদি করি তবে প্রেরণাকেই করবো, এবং বিয়ে যদি করি আমি আমার মায়ের অনুমতি নিয়েই করবো। আমি জানি আমার মা অনুমতি দেবে।"
রিতু কথা বলে না, মুখ ফুলিয়ে চোখ মোছে। ইহান উঠলো,মায়ের কপালে একটা চুমু খেলো। রিতু কপাল সরিয়ে আবারো অভিমানী হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ইহান ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা বড়দের। এক এক করে সবাইকে দেখে নিয়ে মির্জা বাড়ির শান্ত সভ্য বড় ছেলে অনুমতি নেয় পাত্রীর হাত চাইতে যেতে, নিচুগলায় সবাইকে বলে,“আসছি।”
___________
প্রেরণা তখন সত্যি সত্যি ঘুমোচ্ছিল। ইনু প্রিতম কিঞ্চিত চিন্তিত প্রেরণাকে নিয়ে। আপু এমন আচরণ শুধুমাত্র মাথাব্যথা হলে করে না। ইনু তখন শুদ্ধকে খাওয়াচ্ছিল। আর প্রিতম বসার ঘরেই বসেছিল ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কিছু কাজ সারতে। ঠিক তখুনি কলিং বেল বেজে উঠলো। মিস জেনি সারা দুপুর ঘুমিয়ে চোখ ডলতে ডলতে বেরুলেন ঘর থেকে। হাই তুলতে তুলতে বললো,“আজ সেলসম্যান গুলো খুব জ্বালিয়েছে। এবার আমি বকুনি দেবোই দেবো।”
দরজা খোলা হলো ব্যস্ত হাতেই, তবে মিস জেনি বকুনি দিতে পারলেন না। উল্টো বিব্রত হয়ে গোল গোল চোখে চেয়ে রইল দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত গোছের, শরীর ভর্তি প্রকট পুরুষালি আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইহান তাজওয়ার মির্জাকে।
প্রিতম আর ইনু এদিকে তাকাতেই বিস্মিত হলো। তৎক্ষণাৎ এগোলো ওরা দুজন। ইনু পা মাথা দেখতে লাগলো বড় দাদানকে। তার বোকা মস্তিষ্কে দাদানের হাবভাব ভালো ঠেকলো না। স্পষ্ট দেখছে ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে দাদান। ইনু অস্ফুটে বলে উঠলো,“দাদান তুমি?”
শ্বাস ফেলে ইহান। জলদগম্ভীর স্বরে বলে,“প্রেরণা কোথায়?"
_আপু ঘুমাচ্ছে।
_আমি একটু জরুরি কাজে এসেছি, কাইন্ডলি ওনাকে ডেকে দেবে প্রিতম?
প্রিতম ভীষণ অবাক, বললো,“তার আগে আপনি ভেতরে ঢুকুন। আমি ডাকছি আপুকে।”
ইহান ভেতরে ঢুকলো,তবে বসলো না। দাঁড়িয়ে রইল টানটান হয়ে। প্রচন্ড অস্থিরতা ছেয়ে আছে তার পা-মাথা। শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে স্নেহময় হাসি উপহার দিলো।
বেশি ডাকাডাকি করতে হলো না প্রেরণাকে। দরজায় দুইবার টোকা দিতেই ঘুম ঘুম চোখে প্রেরণা দরজা খুললো। হাই তুলে ভাইকে বললো,“ভাই একটু কফি বানিয়ে দিবি?"
_দেবো। তবে ইহান ভাইয়া এসেছ। তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে, বললো জরুরি কথা আছে।
চমকালো প্রেরণা। “জরুরি কথা” শব্দ দু'টো শুনেই ঘাম ছুটে গেলো যেন। শাড়ির আঁচলে কপাল আর গলা মুছতে মুছতে এগিয়ে গেলো বসার ঘরে। বিস্ফোরিত চোখে দেখতে লাগলো মানুষটাকে। মানুষটার অঙ্গভঙ্গিমায় লুকিয়ে আছে বেপরোয়া ভাব। প্রেরণার অবচেতন মন ঘাবড়ায়। না চাইতেও সন্দেহের সুরে বলে,“আ-বার কি পাগলামী?”
থেমে থেমে বলেছে প্রেরণা। ইহান একদৃষ্টে ঐ নীল চোখই দেখছিলো। এমন ভাবে দেখছিলো যে আশেপাশের কিছু দেখার কথা ঐ মুহূর্তে মাথায়ই এলো না। চিত্ত জুড়ে যতটুকু ছটফটানি আর আকুলতা, ব্যাকুলতা ছিলো, সবটুকু ঢেলে দিয়ে শীতল স্বরে বললো,“ওয়াসীত স্যারের জন্য নীল বেনারসী পরেছিলেন রাইট? আমার জন্য একবার লাল বেনারসী পরবেন প্লিজ?”
চলমান.....
[ আজ গল্প দিতাম না। দুদিনের পড়া জমে আছে। তবুও কি মনে করে গল্প লিখলাম। এখন পড়তে বসবো। ]