ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 123

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৩
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

প্রেরণার মুখটা ভাবলেশহীন। নিস্পন্দ চোখে দেখছিলো তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে। যেন ওখানে তারা দুজন ব্যতীত আর কেউ নেই, কোনো শব্দ নেই। ঐ মানুষটার কন্ঠ ছাড়া আর কিছু কানে বাজছে না।

ইহান দৃষ্টি নামায়না ঐ নীল দু'টো চোখ থেকে। দু চোখে আকাশ সমান ব্যাকুলতা, সরায় না সেটা। ওদের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিতম,ইনু আর মিস জেনি বিস্ফোরিত চোখে ওদেরকেই দেখছিলো।

প্রিতম আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে,তার দৃষ্টি ঘুরে ঘুরে একবার প্রেরণাকে দেখে, একবার ইহানকে। পরপরই হতভম্ব মুখটা ঘুরিয়ে ইনুর দিকে তাকাতেই ইনু ফোঁস শব্দে শ্বাস ফেলে, এবং আচানক ইনু একটা কান্ড করে বসলো। তড়িঘড়ি করে ইনু শুদ্ধকে কোলে তুলে প্রিতমের হাত ধরলো, এবং মিস জেনিকে চোখের ইশারা দিয়ে দ্রুত বসার ঘর থেকে প্রিতমকে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেলো ভেতরে।

প্রিতম বোন আর ইহানকে বিস্ময়ের নজরে দেখতে দেখতেই চললো ইনুর পেছনে পেছনে।

ওরা যেতেই প্রেরণা হুশে ফিরলো। নড়েচড়ে উঠে শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছলো। এবং কিছু বলতে যাবে তখুনি ইহান বলে উঠল,“আবার নতুন করে, নতুন ভাবে, একটু চেষ্টা করে, একটু কষ্ট করে, বৌ সাজবেন আমার জন্য?..... প্লিজ?”

এটা একটা সরল আবদার। প্রেরণা বড় বড় শ্বাস ফেলতে লাগল, দৃষ্টি এলোমেলো তার। জিভের আগায় কথা এসে জড়িয়ে যাচ্ছে। দম নিয়ে নিজেকে সামলে বলে,“এ কোন পাগলামি? আমাদের তো এটা নিয়ে কথা হয়েছে?”

_হ্যা সেটা বহুমাস আগে হয়েছে। এখন বহুমাস কেটে গিয়েছে, আমি নতুন করে প্রস্তাব দিলাম আপনাকে। আপনিও নতুন করে বিবেচনা করবেন‌।

_ইহান দেখুন....

_চুপ!

ভীষণ মিহি স্বরে ধমকে ওকে থামিয়ে দেয় ইহান। পর পর বলতে থাকে,“এখুনি কোনো জবাব চাই না আমি! বিয়ে শাদি তাড়াহুড়োর বিষয় না আমার কাছে। আপনি ভাববেন। আপনাকে সময় দেওয়া হলো।”

প্রেরণা টের পেলো লোকটার ঐ নমনীয় কথাগুলোতেই তার সত্তা কেঁপে উঠেছে মৃদু। দুহাতে একবার মুখমণ্ডল চেপে হাত সরিয়ে দম ফেলে বললো,“পাগলামি বন্ধ করে বাড়ি যান। সবাই জানলে....”

মৃদু হাসলো ইহান, তৎক্ষণাৎ বললো,“সবাইকে জানিয়েই পাত্রীর হাত চাইতে এসেছি আজ।”

চোখ দু'টো কোটর থেকে যেন বেড়িয়ে এলো প্রেরণার। ইহানকে ধমকে উঠলো,“মানে? সবাই জানে মানে?”

_জি! সবাই জানে।

তরতর করে কাঁপছে প্রেরণা আতঙ্কে। এসব কি হলো? এই লোক এটা কি করলো? তার রক্ষণশীল মন ঘাবড়াচ্ছে, ও বাড়ির বড়রা তো ছেলের এই পাগলামি মানবে না, উল্টো মনে মনে একটু হলেও ভাববে প্রেরণা হয়তো তাদের ছেলেকে লাই দিয়েছে,আস্কারা দিয়েছে। প্রেরণা কথা এড়িয়ে থাকতে চায়, আর কোনো বিতর্কে থাকতে চায়না সে!

ইহান যেন বুঝলো ওকে,বললো,“বড়দের আমার পছন্দের কথা জানিয়েছি। ওনারা বলেছেন আপনার সাথে কথা বলে ওনাদের জানাতে।”

প্রেরণা ভীষণ ছটফটিয়ে উঠল ভেতরে ভেতরে , এবার চিল্লিয়ে উঠল,“ইহান আপনি কিন্তু আমাদের সুন্দর সম্পর্কটা নষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছেন।”

ঠান্ডা জবাব ইহানের,“আমি তো একটা সুন্দর সম্পর্কে দুজনে জড়িয়ে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছি প্রেরণা।”

প্রেরণা ঘামছে, বারবার আঁচল উঠিয়ে গলা আর কপাল মুছে নিচ্ছে। সে তো রাগতে পারছে না লোকটার ওপর, কিন্তু কিভাবে থামাবে একে? এ হয়? এটা কখনো হয়না!

_________

ইরফান বাড়িতে এসেই সরাসরি প্রণমির কাছে গেল। প্রণমি তখন কেঁদেকেটে শান্ত হয়েছে। ধীরে ধীরে ইরফানকে খুলে বললো সবটা। বাড়ির বড়রা সবাই যে যার ঘরে ছিলো, ইহানের বিষয়টি নিয়ে যে যার মতো চিন্তাগ্রস্ত। যতই ছেলের মনের কথা শুনুক, নিজেদের মনের দোটানা ভাবটা কাটিয়ে তোলার চেষ্টা তো করা উচিত নিভৃতে। ইরফান হন্তদন্ত পায়ে সরাসরি ছাদে গেল, বাড়ির মেইড বলেছে রিতু ছাদে।

কারো পায়ের অস্তিত্ব টের পেয়েই রিতু চোখের পানি মোছে তাড়াহুড়ো করে, ইরফানকে দেখতে পেয়ে কান্না চেপে রাখতে চেয়েও পারে না, হুহু করে কেঁদে উঠে ইরফানকে জড়িয়ে ধরলো। ইরফান মলিন গলায় বললো,“মাম্মা কান্নাকাটি করার কি হলো?”

রিতু আবারও মরা কান্না শুরু করলো,ডুকরে বলতে লাগলো,“তোরা কেউ আমাকে বুঝবি না। আমার দাম নেই তোদের কারো কাছে।”

মাকে আগলে নিলো ইরফান, দু'হাতে চোখের জল মুছিয়ে বললো,“দাদান কাউকে ভালোবাসতে পারে না মাম্মা? তুমিও জানো তুমি অবুঝ পনা করছো।”

_অবুঝপনা? ব্যাখ্যা আমি দিয়েছি। হবে না তোর দাদানের সংসার। মিলিয়ে নিস। শুধু দায়িত্ব হবে। এসব ও ডিজার্ভ করে?

ম্লান হাসে ইরফান, মায়ের মন পড়ে নেয় দ্রুত। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“সংসার নাকি স্রেফ দায়িত্ব সেটা এখন বুঝবো কি করে মাম্মা? কেউ বোঝে? একটু ঠান্ডা হও। দাদানের খুশিটা দেখো, প্লিজ মাম্মা! তুমি চাওনা তোমার দুই ছেলেই হাসিখুশি সংসার করুক?”

_চাই। তাই বলে এটা মানতে হবে? মানবো না আমি। গিয়েছে তোর ভাই ঐ মেয়ের মতামত আনতে। আনুক মতামত। তাদের সংসার,মতামতটাও তাদের হলেই হবে। আমি দেবো না মত, দেবোই না।

এই বলে রিতু ইরফানকে সরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে দোতলায় নামে। ইরফানও মায়ের পিছু পিছু যায়। রিতু দোতলায় নেমেই হঠাৎ কান্না থামিয়ে তার দুই জা কে ডাকতে লাগল উঁচু গলায়। ওর ডাকে বেরিয়ে এলো সবাই। রিতু তখন নিজের ঘরে ঢুকে আলমারি খুলে নিজের বড় ছেলের ভবিষ্যৎ বৌয়ের জন্য যা যা অলংকারাদি জমিয়ে ছিলো, সবকিছু বের করে এনে নিজের জা'দের হাতে দিয়ে বললো,“এই নাও। এইসব তোমাদের বড় বৌকে দিও। সব দিলাম আমি, কিচ্ছু রাখিনি। সব দিলাম, কিন্তু মত আমি দেবো না।”

________

প্রিতম হতবিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। ইনু গড়গড় করে সবটা বলতেই মিস জেনি বলে উঠলো,“জিজাস! প্রেরণা মামণি আর ইহান? ও জিজাস! এসব কি শুনছি!”

প্রিতম গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো, অস্ফুটে ইনুকে বললো,“তোমার ভাইদের আসলে সমস্যা কি?”

ইনু মৃদু শ্বাস ফেলে কপাল কুঁ'চ'কে নিয়ে বলে,“সমস্যা আমার ভাইদের না। সমস্যা তোমার বোনদের। মাত্রাতিরিক্ত সুন্দরী।”

প্রিতম হঠাৎ হাঁসফাঁস করে উঠলো, গোটা ব্যাপারটাই তার হজম হচ্ছিলো না। সে নিতে পারছিলো না, উদাস গলায় বললো,“আপু তো মত দেবেই না।”

_তো তুমি বোঝাবে? তুমি তো এমনিতেও আপুর বিয়ে দিতে চাও!

_হ্যা চাই। সেজন্য ইহান ভাইয়া?

ইনু কপাল কুঁচকে বললো,“কেন আমার বড় দাদানের মাঝে কি সমস্যা?”

_সমস্যা হলো, সে অবিবাহিত। এবং একটা অবিবাহিত ছেলে সচরাচর আমার আপুর পজিশনের কোনো মেয়ের প্রেমে পরে না। এটা মোহ! মোহ কেটে গেলে এই পুরুষ জাত নারীকে কত ভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারে জানো? আমি চাইনা কারো মোহের শিকার হয়ে আমার আপু আবার কষ্ট পাক। আমি রাজি নই এতে!

ইনু হতাশ গলায় বললো,“এভাবে বলতে পারলে? দাদানেরটা মোহ না কি সেটা তুমি এখনি কিভাবে বোলছো? এতো আন্দাজে কথা বলো কেন? মেজো দাদান ঠিক বলে, মেধাবীদের সমস্যা এরা দুই লাইন বেশি ভেবে হায় হায় করে!”

প্রিতম সংযত হয়ে শ্বাস ফেলল,“ওকে! ইহান ভাইয়ারটা মোহ না। কিন্তু আপু তো রাজি নয় তাইনা?”

_সেটা দেখা যাবে।

ইনু ঘরময় পায়চারী করছে, বিরবির করে প্রার্থনা করছে প্রেরণা যেন রাজি হয়ে যায় দাদানের প্রস্তাবে। ভাবী হিসেবে প্রেরণাকে ভীষণ পছন্দ করেছে ইনু, একটু রাগী, তবে ততটাই তো নরম। দাদানকে সামলাতে ওর চেয়ে উপযুক্ত আর কেউ হয়?

শুদ্ধ কিছুই বুঝতে পারছে না তার আশেপাশে কি ঘটছে, বাইরের ঘরে মাম্মা আর ইহান আঙ্কেল। সে কি যাবে ওখানে? তাকালো মামার দিকে, বললো,“মামা ওখানে যাই?”

প্রিতম ফিরিয়ে নিলো ছেলেটাকে,নরম গলায় বলল,“না মামা। ওখানে বড়রা জরুরি কথা বলছে! এটা ব্যাড ম্যানার্স!”

_________

ইহান তাজওয়ার মির্জা আবারো হাসলো অমায়িক হাসি, প্রেরণার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকছে লোকটাকে। ঐ হাসি প্রেরণাকে থিতিয়ে দেয় বারবার। ঐ হাসির পরে কথা গোছাতে সময় লাগে। তবুও প্রেরণা গলায় জোর আনার চেষ্টা করে বলে,“এটা হয় না।”

ইহানের কন্ঠে দৃঢ়তা, “হয়। এটা হয়। আপনি আর আমি চাইলেই এটা হয় বিশ্বাস করুন। এটা না হওয়ার পেছনে আর কোনো কারণ নেই, কিচ্ছু নেই।”

প্রেরণা ঢোক গিলে নেয়, খামচে ধরে শাড়ির আঁচল, তেজী গলায় প্রশ্ন ছোঁড়ে,“আপনি চান!.... তবে আমি কি চাই?”

ওর চোখে চোখ রাখে ইহান,“চান সম্ভবত! শিয়র হতে দুদিন সময় নিন। একটা সুন্দর সম্মতির অপেক্ষায় আমি।”

মাথা নিচু করে নেয় প্রেরণা রাগে, লজ্জায়, নিজের প্রতি ক্ষোভে। এই লোকটার কাছে এসব লজ্জার কথা ধরা পরে গিয়েছে? ঐ মুহুর্তে প্রেরণার নিজেকে একটা খাঁটো ব্যক্তিত্বের মেয়ে মনে হলো। নিজেকে নিজেই ধিক্কার দিতে থাকলো। কঠিন হলো মুখটা।

ইহান হাঁফ ছাড়ে, নিচু গলায় বলে,“আমি বাচ্চা ছেলে প্রেরণা? না তো! আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করবেন না!”

প্রেরণার ঠোঁট কাঁপছে। ও চোখ তোলে না, ওর মনে হচ্ছে ওয়াসীত শরীফ আশেপাশেই দাঁড়িয়ে আছে। প্রেরণা চোখ তুললে তাকেও দেখবে। তারপর ঐ দুই পুরুষের সামনে প্রেরণা কি করবে? আর কত খাটো হবে? আচ্ছা প্রেরণা মানুষ না হলে খুব ভালো হতো না? হ্যা খুব ভালো হতো! এভাবে ব্যক্তিত্ব হারানোর ভয়ে ধুঁকতে হতো না!

ইহান বলতে থাকে,“উত্তরটা আমি এখনি চাইতে পারতাম, কিন্তু আমি চাইনা আপনার মাঝে কোনো দ্বিধা থাকুক। যদি হ্যা বলেন প্রেরণা, সেই হ্যা টা যেন আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকে। আর যদি না বলেন,সেটাও এমন ভাবে বলবেন যাতে আমি আর কখনো এমন হ্যাংলামি করার ধৃষ্টতা না দেখাই।”

নির্লিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রেরণা। ইহান কথাটা শেষ করে ওকে দেখলো মিনিট দুয়েক, ঘর থেকে বেরুনোর আগে বললো,“আমি আসছি! দু'দিন পরে আমি নিজে এসে আপনার উত্তর জানবো!”

হঠাৎ প্রেরণা কেঁপে উঠলো। বাচ্চামি চেপে বসলো ওর ভেতরে, জেদ করে বলতে লাগলো,“এটা হয়না! দু'দিন পরেও এই জবাব পাবেন। ইহান আপনি থামুন।”

ইহান থেমে আবারো তার সেই হাসিটা দিলো। প্রেরণা চুপ করে মাথা নিচু করে ছুটলো নিজের ঘরের দিকে, ইহান একটু উঁচু গলায় বলতে থাকে,“প্রেরণা! এটা সত্যিই হয়! আপনিও জানেন। আর আমি জানি আপনি ইমম্যাচিওরড নন। তাই অনুরোধ, কোনো ধরণের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে না আমাকে ভোগাবেন, না নিজে ভুগবেন!”

প্রেরণা দরজায় ঠেস দিয়ে কাঁদে। ইহান ততক্ষণে হয়তো চলে গিয়েছে। প্রেরণা কাঁদতে কাঁদতে নিচে বসে থাকে। তার মনে হলো এইবার ওয়াসীত শরীফ তাকে একা পেয়েছে, এইবার ওয়াসীত শরীফ জিজ্ঞেস করবে,“কি ব্যপার প্রেরণা? আমি ফিরবো না বলে অপেক্ষা করলে না?”

প্রেরণার বুক জ্বলছে, সে কেন ঐ তথাকথিত মহিয়সি নারীটা হয়ে থাকতে পারলো না? কেন আরেক পুরুষের প্রেমে পরলো দৃঢ় ব্যক্তিত্বের প্রেরণা? কেন তার তথাকথিত ব্যক্তিত্ব খাঁটো করলো? প্রেরণা কাঁদতে কাঁদতে শাড়ির আঁচল টেনে মুখের ওপর দিয়ে রাখে। তার কাছে তার ছোটো হয়ে যাওয়া মুখটা ওয়াসীতকে দেখাতে ইচ্ছে করে না। মুখটা ঢেকেই উন্মাদের মতো বিড়বিড় করে অদৃশ্য ওয়াসীতের কাছে ক্ষমা চায়,“দুঃখিত দুঃখিত দুঃখিত দুঃখিত দুঃখিত!”

এরপর কাঁদে, কাঁদতে কাঁদতে শরীর ছেড়ে দেয়। কপালটা দেয়ালে ঠেকিয়ে রাখে।

________

বাড়িতে ঝামেলা লেগেছে তার প্রভাব ইশির বাড়িতেও পরেছে। তাই তো মুঈন ডিউটি থেকে রাত আটটায় ফিরে সোজা শ্বশুর বাড়িতে এসেছে ইশিকে নিয়ে। খবরটাতে সবাই রীতিমতো একটা ধাক্কা খেয়েছে। শেহা তো কলের ওপর কল করে জানতে চাইছে,“আসলেই দাদানের বিয়ে প্রেরণা আপুর সাথে হবে?”

বিকেলের পর থেকে রিতু চুপচাপ। ইহান ফিরেই দেখেছে দোতলায় গয়নাগাটি ছড়ানো ছিটানো। রিতুর দিকে তাকাতেই রিতু বললো,“নিয়ে যা সবকিছু। আমার অনুমতি ছাড়া আমার তরফ থেকে সব থাকবে তোর বিয়েতে। তা ঐ মেয়ে হ্যা বললো? কবে বিয়ে?”

বাচ্চাদের মতো অভিমানী মায়ের গলা। ইহান উদাস চোখে চেয়ে হাসে, এগিয়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খায়, রিতু এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়,“একদম ঢং করবি না। নিয়ে যা এসব গয়না শাড়ি। তোর শখের নারীকে দিস।”

ইহান মেঝে থেকে সবকিছু একটা একটা করে তুললো, তুলে নিয়ে মায়ের ঘরে বিছানায় রেখে এসে মাকে বললো,“আমার শখের নারী তোমার শখের বৌমা হলে তবে তুমিই দিও।”

_ঐ মেয়ে? জীবনেও হবে না। মিলিয়ে নিস।

ইহান হাসে, বাড়ির সবাই থমথমে মুখে বসে আছে। রিতু মুখ ঝামটা দিয়ে ঘরে চলে যায়। মুঈন ইহানকে আড়ালে ডেকে নেয়, অবাক বিস্ময়ে বলে,“তো প্রেরণা ছিলো ঐ মেয়েটা?”

ইহান স্মিত হেসে মাথা দোলায়। গলা খাঁকারি দেয় মুঈন, বলে,“বেশ ! আমি শুনে দুই ঘণ্টা তব্দা খেয়েছিলাম। এখন ঠিক আছি। তোমার পছন্দ ভালো, কি বললেন উনি? হবে আমার সম্বন্ধি বৌ?”

রেলিংয়ে হাত রেখে ইহান অন্ধকার রাতের চাঁদ দেখতে দেখতে জবাব দেয়,“কিছুই বলেনি। দু'দিন সময় দিলাম ভাবতে।”

_রাজি হবে?

ইহান মৃদু হাসে, বলে,“সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে মিথ্যা নাটক করার। নাটকে পাশ হয়ে গেলে তো কিছু বলার নেই। এখন দেখা যাক।”

_________

রাত দশটা নাগাদ ইরফান প্রিতমের ফোনে কল করলো, প্রিতম তখনো থম মেরে বসে আছে। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইরফান বলে উঠলো,“আপু কই?”

_ঘরে।

_কিছু বলেছে?

_কি বলবে? আচ্ছা একটা কথা বলতো, ইহান ভাইয়াকে আমি বুঝতে পারছি না। সে কিভাবে আপুকে....মানে উনি অবিবাহিত!

ইরফানের হঠাৎ মেজাজ গরম হলো, এমনিতেই বিকেল থেকে মাম্মাকে বোঝাতে বোঝাতে শ্বাস গরম হয়ে গিয়েছে, এখন প্রিতমের এই প্রশ্নের জবাবে বললো,“ভাই ! ভালোবেসে ফেলেছে! ব্যস! আর কিছু চোখে দেখেনি! তুই দেখেছিলি? একেবারে আমার কলিজায় থাবা বসিয়েছিলি! এখন দাদান কি করবে? তোর কাছে গিয়ে হাত কেটে ভালোবাসার পরিক্ষা দেবে? প্লিজ ঠান্ডা মাথায় ভাব! যদি তোর কাছে এই সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য লাগে তবে দু'জনের বোঝাপড়া করতে সাহায্য কর।”

আবেগী হলো প্রিতম। সত্যি বলতে অমন ভালো একজন লোক তার আপুর জীবনে এসে তার আপুর সাদাকালো জীবনটা রাঙিয়ে দেবে, এটা ভাবতেও তো স্বর্গ সুখ হচ্ছে প্রিতমের। কিন্তু মনে যে খুব দ্বিধা। তার আপু যদি কষ্ট পায়? শ্বাস ফেলল সে, বললো,“ইরফান। আমার আপু আমার কাছে মায়ের মতো.....”

আর কিছু বলতে পারলো না প্রিতম, ইরফান চেঁচিয়ে বললো,“তো দাদানকে বাবার চোখে দেখিস! গর্দভ,যা আপুর কাছে! তাকে বোঝা! এদিকটা আমি ইশি আর মুঈন ভাইয়া সামলাবো।”

কল কাটার পরেও চুপ করে প্রিতম বসে থাকে খানিক সময়। তারপর উঠে গিয়ে প্রেরণার দরজা ধাক্কালো। কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে পরেছিল প্রেরণা, উঠে দরজা খুলতে গিয়ে টের পেলো তার শরীরটা দুর্বল। ভাইয়ের কন্ঠ শুনে দরজা খুলে দাড়িয়ে রইলো নিস্তেজ শরীরে। শুদ্ধকে ইনু খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে মিস জেনির কাছে।

প্রেরণা চোখ তোলে না। প্রিতম ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বলে,“কাদছিলে?”

ছোটো ভাইবোনের সামনে খুব একটা নড়বড়ে হয়না প্রেরণা। ও বরাবর মনে করে ওর ভাই-বোন দুটো সেই ছোট্টটিই আছে, ওদের বুদ্ধি শুদ্ধি হয়নি। তাই প্রেরণা নিজের সমস্যা গুলো ওদের সাথে খুব একটা শেয়ার করেনা। আজ প্রেরণা বিধ্বস্ত, ভাইয়ের মুখটা দেখে হঠাৎ বাবার কথা মনে পরলো। নীরবে চোখের জল ফেলে থেমে থেমে বললো,“আমি কি করবো ভাই?”

বলতে বলতে ডুকরে ওঠে প্রেরণা। প্রিতম আপুকে আগলে নিলো, দু'হাতে চোখের জল মুছিয়ে দীর্ঘক্ষণ শক্ত চিত্তের বড় বোনের মুখটা দেখে নরম গলায় বললো,“তুমি ইহান ভাইয়াকে পছন্দ করো?”

প্রেরণা জবাব দিলো না। তাকিয়ে রইল। প্রিতম বোনের মুখটা দেখে ভেতরটা পড়ে নেয়। ছটফটিয়ে ওঠে প্রিতম, দু'হাতে বোনের গাল দু'টো চেপে ধরে বলে,“গিল্টি ফিল হচ্ছে?”

প্রেরণার চোখের জল প্রিতমের হাতে লাগছে। প্রিতম আগাগোড়াই জানতো তার বোন অসহায়। তবে এতোটা অসহায় হতে প্রিতম এই প্রথম দেখলো বোনকে। হাত সরিয়ে আপুর মাথায় রেখে বললো,“আপু শোনো! তুমি পথে হাঁটছিলে। তোমার একটা জোর ছিলো,একটা সাপোর্ট ছিলো। তাকে ভর করে তুমি হাঁটছিলে। হঠাৎ সেই জোরটা নাই হয়ে গেল। এবং পরে তুমি জোর ছাড়া হাঁটলে আরো কিছুটা পথ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ক্লান্ত হলে, ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পরলে, এটা তো তোমার অপরাধ না। কতক্ষণ একা হাঁটা যায়? তুমি একটুও অপরাধ করোনি। একটুও না।”

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 123 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন