ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 124

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৪ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

[ ১ম অংশ ]

শেষ বিকেলের কনে দেখা আলোয় লেকের ঘোলাটে জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে প্রেরণা উঠে দাঁড়ালো। আকাশে মেঘ করতে শুরু করেছে, পার্কের লোকসমাগম কমে যেতে শুরু করেছে। প্রেরণা সময় দেখলো, সন্ধ্যা হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। এখন শুদ্ধকে নিয়ে বেরুনো দরকার। আজ বহুদিন পর ছেলেটাকে নিয়ে বেরিয়েছে প্রেরণা। একটু আলাদা সময় কাটাতে। শুদ্ধর দোলনায় চড়া হয়ে গেলে প্রেরণা ডাকলো ওকে,“বাবা চলো বাড়িতে যাবো।”

উত্তেজিত শুদ্ধ, মাথা নাড়লো,“আরেকটা রাইড মাম্মা।”

ঠিক সেসময় ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হতে শুরু করলো। পার্কে গুটিকয়েক বাচ্চা ও তাদের মা বাবারা ছুটতে ছুটতে ছাউনীর নিচে চলে যায়। প্রেরণা দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টির মাঝে, সে ভিজতে থাকে, শুদ্ধর মাথার ওপর ছাউনী ছিলো বিধায় সে ভিজছে না।

ভাবুক দৃষ্টি প্রেরণার কাঁপল হঠাৎ,যখন টের পেলো কেউ তার মাথার ওপরে ছাতা ধরেছে। প্রেরণা ঘাড় ঘোরালো, মানুষটাকে দেখে আবারো ঢোক গিললো।

সেদিন রাতে না নিজে পেরেছে, না পেরেছে প্রিতম। প্রেরণার মনের দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে, আর হয়তো পারবেও না। অহেতুক অনুভূতির দড়ি টেনে লম্বা করে কি লাভ? কেটে দিয়ে ওপাশের মানুষটাকে স্পষ্ট করে দেয়াই সমীচিন।

একটা বড় ছাতার নিতে দাঁড়িয়ে আছে দু'জন। প্রেরণা শ্বাস ফেলে বললো,“কেউ ভিজছে দেখলেই তার ছাতা প্রয়োজন একথা আপনাকে কে বললো ইহান?”

প্রেরণার ঐ কথাটা শুনে ইহান ছাতাটা বন্ধ করে দিলো। দু'জনেই ভিজতে লাগল ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে। ওপাশে শুদ্ধ হাত নেড়ে বললো,“ইহান আঙ্কেল এখানে খুব মজা।”

ইহান বাচ্চাটাকে চমৎকার একটা হাসি উপহার দেয়। শুদ্ধ ছুটতে ছুটতে আসে বৃষ্টির মাঝেই। এসে ইহানের কোলে ওঠে। হঠাৎ কাছে কোথাও একটা ছোটোখাটো বাজ পরে। শুদ্ধ খুব সাহসী হলেও প্রেরণা সাহসী নয়, ভীষণ চমকে উঠে বললো,“আল্লাহ মাফ করো!”

ইহান বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাকিয়ে আছে প্রেরণার হাতের দিকে। যে হাতে ইহানের পাঞ্জাবি খামচে ধরেছে। আকাশের বজ্রধ্বনি কিছুটা কমে এলে প্রেরণা যখন হুশে ফিরলো, নিজের কান্ড দেখে গালি দিলো নিজেকে। হাত সরিয়ে নিয়ে মুখটাও ঘুরিয়ে নিলো।

ইহান তখন বললো,“ঠিক বলেছেন, কেউ বৃষ্টিতে ভিজছে দেখলেই তার ছাতা প্রয়োজন এমনটা কোথাও লেখা নেই। তবে কেউ বৃষ্টিতে একা ভেজার থেকে সাথে আরেকটা মানুষ হলে এমন ছোটোখাটো বজ্রপাতে ভয়টা একটু কম লাগে তাইনা?”

প্রেরণা মাথা নিচু করে নিলো। ইহান মলিন হেসে বললো,“পালাচ্ছিলেন?”

মৃদু শ্বাস ফেলে প্রেরণা জবাব দিলো,“এমনটা করার কোনো কারণ নেই। আমি তৈরিই ছিলাম আমার উত্তর নিয়ে।”

ইহানের উৎকণ্ঠা ওর অঙ্গভঙ্গিতে প্রকাশ পায়না। দু'টো দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকেছে, আজ প্রেরণার বাড়িতে গিয়ে ওকে না পেয়ে খোজ নিয়ে ছটফট করতে করতে এখানে এসেছে, সেসব কিছু বুঝতে না দিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ইহান। নিরুদ্বেগ ভাব নিয়ে বললো,“বলুন আপনার উত্তর।”

প্রেরণা সরাসরি ইহানের চোখে চোখ রাখলো এটা বোঝাতে,তার মধ্যে কোনো লুকোচুরি নেই, জড়তা নেই, দুর্বলতা নেই, কিচ্ছুটি নেই। স্পষ্ট করে বলার চেষ্টা করে বললো,“এটা হয়না। এটুকুই আমার উত্তর।”

বলেই শুদ্ধকে টেনে নিলো ইহানের কোল থেকে প্রেরণা। ইহান চেয়ে রইল নির্নিমেষ, বললো,“আপনি তো শর্ত মানলেন না প্রেরণা।”

_কি শর্ত?

_বলেছিলাম,উত্তর "না" হলে এমনভাবে বলবেন যাতে কখনো আমি হ্যাংলামি করার সুযোগ না পাই।

_বাচ্চামি করছেন ইহান।

ইহান তৎক্ষণাৎ জবাব দিলো,“আপনার মতো?”

প্রেরণা লোকটার সাথে কথায় জড়াবে না, সর্বোচ্চ সে যেটা করতে পারে, সেটা হলো, এড়িয়ে যাবে লোকটাকে। একদিন,দুদিন,তিনদিন। দশদিনের মাথায় লোকটাও বুঝে যাবে। তবুও পারবে না প্রেরণা নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বে এই লোকটার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে, কখনো অসম্মান করতে।

প্রেরণা শুদ্ধকে নিয়ে এগিয়ে যায় গটগট করে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে ইহান, আজ প্রেরণার পিছু নেয়না সে, ওকে গাড়িতে উঠতেও বলেনা। ঠোঁটে তার স্মিত হাসির রেখা। অস্ফুটে বলে,“আপনি ফেল! আপনার অ্যাক্টিং লেভেল খুব জঘন্য।”

কাকভেজা হয়ে বাড়িতে ফেরার পর থেকেই ইহান চুপচাপ,তবে স্বাভাবিক তার আচরণ বিধি। পার্টির ছেলেদের সাথে কফি খেতে খেতে দলীয় পরিকল্পনা সেরেছে ড্রয়িং রুমে বসে।

বাড়ির সবাই আড়চোখে ওকেই দেখে চলেছে তখন থেকে। রিতু তার গোমরা মুখ নিয়ে এসে বড় জায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল,“কিছু বলছে না কেন তোমার ছেলে? ঐ মেয়ে নাক ডলে দিয়েছে তাই না? এখন তাকে বলো প্লিজ ওসব বাদ দিয়ে নিজের রাস্তা দেখতে।”

আলো চোখ পাকালো,“থামবি তুই?”

_থামলাম।

মুখটা মলিন করে রিতু দোতলায় ওঠে। ছেলেটা বুঝলো না, একটা অহেতুক অনূভুতিকে লাই দিলো। বেশ হয়েছে, এখন কষ্ট কে পাচ্ছে? মায়ের কথা তো শুনবি না!

তবে শান্তিনীড়ের কেউ প্রেরণার ব্যাপারে ইহানের কাছে কিছু জানতে চাইছে না, সবার মধ্যে দ্বিধা কাজ করছে আসলে। কিভাবে সরাসরি ওকে জিজ্ঞেস করা যায়,“প্রেরণা মত দিয়েছে?”

ইয়াসার মির্জা আর ইলহাম মির্জা বড় মেয়ের জামাইকে ধরলেন। মুঈন শ্বশুরের আদেশে ডিউটির ফাঁকে কল করলো ইহানের কাছে, জানতে চাইলো,“প্রেরণা কিছু জানিয়েছে?”

_হুম, না করে দিয়েছে!

_মানে? এখন?

ইহানের যেন কোনো উদ্বেগ নেই, ঠান্ডা গলায় বলল,“যতটা দ্বিধা নিয়ে না বলেছে,ততটাই জোড়ালো হবে সম্মতি। সেই দিনের অপেক্ষা করছি!”

মুঈন দ্বিধাগ্রস্ত। তার শ্বশুর বাড়ির সবগুলো লোক দুর্বোধ্য তার কাছে। কল কেটে এই জবাবটা বড়দের জানিয়ে বাড়ির জামাইয়ের দায়িত্ব পালন করে মুঈন বৌয়ের কাছে যায়। ইশি ততক্ষণে গ্রুপে ভিডিও চ্যাট করছে বাকিদের সাথে। দাদানের জন্য সবার মন খারাপ,ততটাই চাপা রাগ জমেছে প্রেরণা আপুর প্রতি। এভাবে তো চলতে দিলে হয়না। তাই ঠিক করেছে তারা নিজেরাই কিছু একটা করবে।

__________

বাড়িতে ফিরে সেদিন সন্ধ্যেটা চুপচাপ থেকেছে প্রেরণা, ইরফানের কল পেলো হঠাৎ সে। লাগাতার কল করেই চলেছে ছেলেটা। তার পরপরই কল করছে ইশি, শেহা, মুঈন ভাইও। প্রেরণা জানে সবার কি কাজ তার সাথে। কিন্তু এই ব্যাপারে প্রেরণা কারো মুখাপেক্ষী নয়। প্রেরণা আবেগী মেয়েটি হলেও আবেগে ভেসে যাওয়া সেই মেয়েটি নয়।

চোখে জমা জল মুছে প্রেরণা ঘর গোছায়। তাকে এই অসহ্যকর পরিস্থিতি থেকে বেরুতে হবে। যত তাড়াতাড়ি বেরুতে পারবে ততই তার মঙ্গল, মঙ্গল ঐ লোকটার, মঙ্গল সবার।

আয়নার সামনে দাঁড়ায় প্রেরণা, নিজের ফ্যাকাশে মুখটা দেখে চেয়ে চেয়ে। স্বস্তির বিষয় ও বাড়ি থেকে বড়রা এসে কিছু বলেনি তাকে। ভেবেছিল আর কেউ না হলেও রিতু আন্টি এসে কৈফিয়ত চাইবে,“আমার ছেলেকে ফাসালে কেনো?”

প্রেরণা তো ফাসায়নি মানুষটাকে। সে তো চায়নি কেউ ফাসুক। কারো ওর মতো অভাজনের জন্য ভালোবাসা আসুক, ভালোবাসা এনে ওকেও একটা স্বার্থপর মানুষ বানিয়ে দিক।

ওয়াসীত শরীফের ইউনিফর্ম গুলো অনেকদিন পর আবারো বের করে গোছায় প্রেরণা। ইউনিফর্ম গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে চোখের পানি ফেলে। কি যে বিষাক্ত বেদনার সে জল। যে মেয়েটি কখনো প্রেরণা হয়নি সে মেয়েটি বুঝবে না এর জ্বালা।
হঠাৎ প্রেরণা ওয়াসীতের ইউনিফর্ম নিয়েই কান্নায় ভেঙে পরে। দু'হাতে খামচে ধরে ইউনিফর্ম। গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে, হাউমাউ করে কাদে। বোবা যেন কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে,তেমন করে বলে,“আপনাদের দু'জনের মধ্যে একজন একটু খারাপ হলে আমার জীবনে এই অসহনীয় যন্ত্রণা আসতো না। না আমি সংযম হারাতাম, আর না এভাবে ফাসতাম, না আমার জাত যেত। না বেইমানি করার গ্লানি হতো,না জীবনে আরেকটি বার সর্গসুখ হাতে পেয়েও না ছুঁতে পারার যন্ত্রণায় বুক পুড়তো। শুধু একজন একটু খারাপ হতেন। একটু হতেন!”

ওর কান্না শুনে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় মিস জেনি। ভদ্রমহিলা প্রেরণার হাউমাউ করে বলা কথাগুলোই বুঝতে পেরে কাঁদেন। প্রিতম এসে দাড়াতেই ফুঁপিয়ে ওঠেন সে, হাহাকার করে বলে,“এক জীবনে এমন প্রেরণা যেন কোনো মেয়ের হতে না হয়। ঈশ্বর মেয়েটিকে শান্তি দিক। বুদ্ধি দিক এই পরিস্থিতি থেকে বেরুতে। আহারে আমার বাচ্চাটা কি কষ্ট পাচ্ছে! ওকে সামলানোর কেউ নেই!”

প্রিতম তাকিয়ে দেখে শুধু আপুর ঘরের বন্ধ দরজা, আর শোনে আপুর চাপা ফোপানি।

এটা আসলেই প্রেরণার কাছে স্বস্তির বিষয় ছিলো যে ও বাড়ি থেকে বড়রা কেউ তার কাছে জবাবদিহিতা চায়নি। নয়তো প্রেরণা টিকতে পারতো না এই শহরে সম্ভবত। এমনিতেও এই অ্যাপার্টমেন্ট টা বিক্রি করার প্রস্তুতি নিয়েছে সে, কাস্টমার রেডি। এর মাঝে যদি এই বিষয়টি নিয়ে প্রেরণা দু কথা শুনতো তবে হয়তো শহরটাই ছাড়তে হতো তাকে। তবে যে তার খুব কষ্ট হতো। হাজার হলেও প্রেরণা খুব লোভী, তার সন্তান সমতুল্য ভাইবোনের সাথে বিচ্ছিন্নতা ঘটিয়ে দূরে সে যেতে পারবেই না।

রাতে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই প্রেরণা ভাই আর ভাইয়ের বৌয়ের সাথে ডিনার সেরে ঘরের দোর আটলো। ইনু প্রিতম আড়চোখে প্রেরণাকে দেখেছে, ও বাড়ি থেকে ও বাড়ির ছেলেমেয়েরা কিছুক্ষণ পর পর খোঁচাচ্ছে ইনু প্রিতমকে,“প্রেরণা আপুকে বোঝাও,প্রেরণা আপুকে বোঝাও।”

কি করে বোঝাবে তারা? ভাঙাচোরা প্রেরণার কাছেই যেতে পারছে না ভয়ে।
প্রেরণা শুদ্ধর বিছানা আলাদা করেছে সপ্তাহখানেক হয়েছে।
খালি বিছানায় যখন গা এলিয়ে দিলো প্রেরণা , তখন তার ফোনে কল এলো শুদ্ধর ক্লাস টিচারের, বললো,“আপা কি শুনছি,শুদ্ধ নাকি পিকনিকে অংশ নেবে না?”

প্রেরণা নিস্তেজ কন্ঠে বললো,
_জি ঠিক শুনেছেন, আমার শরীরটা ভালো নেই আসলে।

শরীর ভালো নেই এটা একটা বাহানা মাত্র। পিকনিকে সব বাচ্চার প্যারেন্টস আসে। প্রেরণা আর সামাজিক হতে চায়না তাদের সাথে। প্রেরণারা সামাজিক হলে লোকে গাঁয়ে পরা ভাবে, অপবাদ দেয়। প্রেরণা আর অপবাদ নিতে চায়না, লোকে অহংকারী ভাবলে ভাবুক।

__________

সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রেরণা একটা চমক পেলো আজ। প্রণমি তাকে কল করেছে। অনেক সময় পরে হাসি ফুটলো প্রেরণার মুখে। ইদানিং বরের ভালোবাসায় আপুকে তো ভুলেই গিয়েছিলো এই মেয়ে। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে প্রণমি বলে উঠলো,“আপু। তুমি কি আজ ব্যস্ত থাকবে?”

_না তো? কেন?

প্রণমি ইহানের প্রসঙ্গ টানলোই না, যেন সে কিছুই জানে না এই ব্যাপারে। বললো,“আজ ইরফান মির্জা তোমাদের সবাইকে ট্রিট দিতে চাচ্ছে। তুমি থাকবে না?”

_ট্রিট কেন?

_ওনার বেতন বাড়িয়ে দিয়েছে বড় বাবা তাই।

_মাশাআল্লাহ!

হেসে এটুকু বলে প্রেরণা থামলো । এবার গলা জড়িয়ে এলো তার, আমতা আমতা করে বললো,“আচ্ছা তোর ভাসুর থাকবেন?”

_না তো, দাদান কোথায় গিয়েছে যেন, শহরের বাইরে। দলের কাজে! কেন?

স্বস্তির শ্বাস ফেলল প্রেরণা। বললো,“এমনিই। আমি আসবো, মিটিং প্লেস কোথায় ইরফানকে জানিয়ে দিতে বলিস গ্রুপে। শুদ্ধ পিকনিকে যেতে পারবে না বলে মন খারাপ। ওর মনও ভালো হবে।”

দীর্ঘসময় বোনের সাথে কথা বলার পর হঠাৎ প্রেরণা একটু থেমে জানতে চাইলো,“প্রণো!”

_জি?

_ও বাড়ির বড়দের কি অবস্থা?

প্রণো অস্বস্তিতে পরলো, তার জানা মতে আপুর প্রত্যাখ্যানের পরে বড় দাদান চুপ হয়ে গিয়েছে,এ নিয়ে বড়দের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। এমনকি তার শাশুড়িকেও দেখেছে ইনিয়ে বিনিয়ে জা'দের বলছে ইহানের সাথে আলাপ করার কথা। প্রেরণার বিষয়টি নিয়ে অবশ্য প্রণমিকে তার শাশুড়ি কিছুই বলেনি।

প্রণমি মিনমিনে স্বরে বলল,“সব ঠিকঠাক।”

_ও আচ্ছা।
প্রেরণা আবারো স্বস্তির শ্বাস ফেলে। বিষয়টা যত তাড়াতাড়ি ধামাচাপা পরে যাবে ততই ভালো।

ওদিকে প্রণমি ফোনটা রাখতেই টের পেলো দু'টো শক্ত হাত তার কোমর চেপে ধরেছে। প্রণমি অস্ফুটে বললো,“যা শিখিয়ে দিতে বলেছিলেন তাই বলেছি। এখন একটা কথা বলি?”

ওর ঘাড়ে নাক ঠেকিয়ে ইরফান আদুরে স্বরে বললো,“বলো।”

_করতে চাচ্ছেন কি আপনারা আসলে? আমাকে বললে হয়না?

ওর নাক টিপে দিয়ে ইরফান জবাব দিলো,“এটা একটা কনফিডিনশিয়াল মিশন।”

_আমি দুলাভাইয়ের জায়গায় দাদানকে অন্তত ভাবতে পারছি না।

বলতে গিয়ে প্রণমির গলা কেঁপে উঠল। ভীষণ আবেগপ্রবণ মেয়েটির মলিন মুখটাতে ইরফান দৃষ্টি রেখে বললো,“আমিও তো তোমার দুলাভাইয়ের জায়গায় দাদানকে বসাতে চাইছি না। আমার দাদান আলাদা ভাবে রাজ করবে, যদি আপু চায়! যদি আপু আসলেই চায়।”

_আপু কি চায়? না বললো তো।

জবাবে ইরফান এবার কিছুই বলেনা। শুধু মলিন হাসে।

___________

ওয়েস ক্যাফেতে সবাই এক হয়েছে। আজ বহুদিন পরে আবারো “উই” গ্রুপের সদস্যদের রিইউনিয়ন। শুদ্ধকে সবথেকে বেশি উৎফুল্ল দেখা যাচ্ছে। শেহা উজ্জ্বল, মুঈন ইশির সাথে দেখা হবার পরে প্রেরণা স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছে কোনো জড়তা না রেখে। যেন এ'কদিন কিছুই হয়নি। ইহান তাজওয়ার মির্জা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন-ই নি।

গোপন মিশনে অংশ নিয়েছিল সবাই। প্রিতম রাজি ছিল না শুরুতে, আপু জানতে পারলে প্রথম থাপ্পড় টা যে সে খাবে সেটা তো সে জানে। কিন্তু ইরফানের সাথে পারেনি কেউ। আর ওদিকে ইনুর ইমোশনাল ব্লাকমেইল তো আছেই। অগত্যা রাজি হয়ে এলো এখানে।

খাওয়া-দাওয়ার শেষে যখন ইরফান বিল দিলো, তখন তার ফোনে একটা কল এলো। এটা তাদের পরিকল্পনা করা। কলটা রিসিভ করে কিছুক্ষণ কথা বলে ইরফান উঁচু গলায় বললো,“দাদান কোথায় এখন? কিভাবে হলো এটা?”

বাকি সবাই খুব চিন্তিত হওয়ার ভান করলো। দৃষ্টি যদিও প্রেরণার মুখের দিকে। ওরা পড়তে চাইছে প্রেরণাকে আজ, ধরে ফেলতে চাইছে প্রেরণাকে।

ইরফান হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো, সবাইকে বললো,“দাদানের একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে।”

ইনু মুখ চেপে কেঁদে ওঠার ভান করলো। ইশি কাঁদতে পারেনা তাই ছটফটিয়ে ওঠার ভান করলো। বাকি সবাই গম্ভীর। প্রেরণা হাঁসফাঁস করে উঠে বললো,“মানে?”

জানতে চেয়ে গলা কাঁপল তার। ইরফান তেরছা নজরে একপলক তাকে দেখে জবাব না দিয়ে মুঈনের দিকে ফিরে বলে,“এক্ষুনি দাদানের পার্টি অফিসে যেতে হবে। প্রেরণা আপু! আপনি শুদ্ধকে নিয়ে বাড়ি যান। আমরা ওদিকে যাচ্ছি।"

উঠে দাঁড়ায় প্রেরণা, কাঁপা স্বরে বলে,“আমি বাড়ি যাবো মানে? আর অর্ধেক কথা বলছো কেন? কি হয়েছে ওনার, বলো না?”

_সেটা তো জানি না, সবাই গেলেই দেখতে পাবো।

_তো আমিও যাই!

চাপা আকুলতা ঠিকরে বেরিয়ে যেতে চায় ওর কন্ঠ থেকে। প্রেরণার নিজেকে লুকানোর সাধ্যি নেই। ইরফান ঠোঁট টিপে হাসলো। দারুণ একটা ঝটকা দিতে পেরেছে ভদ্রমহিলাকে। আজ তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক বাকি কাজটা হয়ে গেলেই কেল্লাফতে। দু'জনের ভাব করিয়ে আজই আংটি বদল সেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছে তারা।

সবাই যেন শোকে মুর্ছা যাচ্ছে এমন ভাব করলো, শুদ্ধ বারবার ইহান আঙ্কেলের কথা জানতে চাইছে প্রেরণার কাছে। প্রেরণা ছেলেটার মাথাটা বুকে চেপে রেখে চুপ করে রইলো পুরোটা রাস্তা। ওর মাথায় অন্য চিন্তা এলোই না, শুধু লোকটার সুস্থতার প্রার্থণায় ছিলো। একটা লোক,একটা অতি ভদ্র আর চমৎকার লোক। একা পথে ক্লান্ত প্রেরণা যাকে দেখে হঠাৎ থামলো,সংযম হারালো, সেই লোক। সাদা পাঞ্জাবি পরনে সফেদ এক লোক। দৃশ্যপটে বেহায়ার মতো সুদর্শন মুখটা এনে প্রেরণা দৃষ্টি ঝাপসা করে গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।

ঐ লোকটা সুস্থ থাকুক সর্বসময়, ঐ ইহান তাজওয়ার মির্জা। ব্যক্তিত্ব হীন প্রেরণার জীবনে হুট করে, প্রেরণার অগোচরে স্থান নেওয়া দৃঢ় মানুষটা সুস্থ থাকুক। প্রেরণার জীবনে আর সুখ না আসুক তবে তাকে একটা মানুষ সুখের আশ্বাস দিয়েছিল সাদা মনে, সেই মানুষটা সুস্থ থাকুক।
আর ব্যক্তিত্বহীন প্রেরণা থাকুক তার ন্যাকামি নিয়ে। দ্বিতীয় পুরুষের প্রেমে পরে ওয়াসীত শরিফের কাছে অকৃতজ্ঞ তো হয়েছেই, ঐ লোকটাকে ফিরিয়ে দিয়ে তার কাছেও “কঠিন নারী” হয়ে থাকুক। প্রেরণা এমন নিঃসঙ্গই থাকুক।

________

ইহান বিকেলে পার্টি অফিসে এসে ভীষণ অবাক হলো,দলের ছেলেগুলো অফিস সাজাচ্ছে। ফুল দিয়ে। ইহান বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলো,“এসব কি? এসব কেন?”

ওরা যদিও সবটা জানে,তবুও বললো,“ইরফান সাজাতে বলেছে। তারা আসছে।”

_তারা আসছে মানে? তাদের এখানে কি? আর ফুল দিয়ে তাদের কাজ কি?

কাঁধ ঝাকালো অন্তর। বললো,“কি জানি।”

ইহান ফোন বের করে কাউকে কল করে পেলো না, প্রত্যেকের ফোন বন্ধ।

ঠিক তখুনি পার্টি অফিসের সামনে গাড়ি থামার শব্দ পেলো। আজ রেস্তোরাঁ বন্ধ, জায়গাটা ভীষণ নিড়িবিলি। ইহান এগিয়ে গিয়ে থমকালো। সবার সাথে উৎকণ্ঠিত ভঙ্গিতে ছুটতে ছুটতে গেট পেরুনো রমনীকে দেখে আরো বেশি থমকালো।

জানালা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে অবাক হয়ে দরজা খুলে দিতেই ইহান প্রেরণা মুখোমুখি হলো। দু'জন দেখছে দু'জনকে নিস্পন্দ চোখে। লোকটার পা মাথায় সুস্থতা পরখ করে প্রেরণা হতবিহ্বল ভঙ্গিতে তাকায় ওর আশেপাশে থাকা প্রত্যেকের দিকে। সবার মুখ চোখ স্বাভাবিক, এতক্ষণের নাটুকে ভাবটা নেই। হতভম্ব প্রেরণা ইরফানকে কঠিন চোখে দেখে। ইরফানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। প্রেরণা শ্বাস ফেলে তাকায় মুঈনের দিকে, তাকায় উজ্জ্বলের দিকে। যত রাজ্যের হতাশা এসে ভিড় করলো তার গলায়, মুঈনকেই বললো,“ওরা ছোটো। আপনি আর উজ্জ্বল ভাই তো নন। এমন একটা ফালতু প্ল্যানে ওদের সাথ দিলেন মুঈন ভাইয়া?”

বলতে গিয়ে প্রেরণার গলা কাঁপল, ইহান তখনো দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে ভদ্রমহিলাকে দেখছিলো।

চলমান......

[ পর্বটি শেষ হয়নি। গল্পে মানুষের অনুভূতি, পরিস্থিতি বর্ণনা করে করে লিখি তাই ধীর লাগতে পারে। ২য় অংশ কাল সকালে পোস্ট হবে । ২য় অংশে ধামাকা আছে! প্রেরণা ন্যাকামি ছেড়ে নাস্তানাবুদ হবে!🫣]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৪ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

[ ২য় অংশ ]

চার দেয়ালের মধ্যে যতটা ভঙ্গুর থাকে প্রেরণা। এখানে ততটাই শক্ত। মুঈন আর উজ্জ্বল হঠাৎ হকচকাল। ওরা দুজন আদতেই এসবে রাজি ছিলো না। সবটা ইরফানের বুদ্ধি, খামখেয়ালিপনা।

প্রেরণার কথা নিজের দিকে টেনে জবাব টা দিলো ইরফান, স্পষ্ট করে বললো,“ফালতু প্ল্যান, নাটক, এসব না করলে তো হবে না আপনার সাথে আপু। যস্মিন দেশে যদাচার!”

প্রেরণার রাগ উঠেছে খুব। বিপদ আপদের হাত পা নেই, এমনিতেই লোকটা পলিটিশিয়ান। ঘাড়ের ওপর বিপদ নিয়ে ঘোরে। এসব নিয়ে নাটক?
তবে বললো না কিছু ইরফানকে, মানুষটা সুস্থ আছে এটাই অনেক, এটাই স্বস্তির।
ইরফান বলতে থাকলো,“দাদানের কাছে এভাবে না আনলে তো আসতেন না আপু। আসতেন আপনি?”

_আমি কিভাবে এসেছি? আত্মীয় বলেই এসেছি।
প্রেরণার কাঠকাঠ জবাব।

_তাই? আত্মীয় বলেই এসেছেন?

এবার বাকা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রেরণা ইহানের দিকে তাকায়। ছোটো ভাইবোনদের এমন পাগলামিতে ইহানও খুব বিরক্ত হলো‌। রাগ দেখালো ইরফানকে,“এটা আমার আর ওনার ব্যাপার। তোরা একদম ঢুকবি না!”

ইশি হঠাৎ মেজাজ দেখালো দাদানকে,“না,এটা শুধু তোমাদের দু'জনের ব্যাপার হয়ে থাকেনি! এটা আমাদেরও ব্যাপার। আমার দাদানের ব্যাপার,যে বহুকাল পরে নিজের জীবন নিয়ে ভেবেছে। এটা ঐ ভদ্রমহিলার ব্যাপার যে আমার দাদানের প্রতি দুর্বল হয়েছে। আমরা চাইনা এই দু'টো মানুষ কষ্ট পাক বেহুদা কারনে,নাটক আমরা করিনি আজ। নাটক তোমরা দুজন করছো,এতো ম্যাচিউরড হয়েও।”

নাটক শব্দটা শুনে প্রেরণা ছটফটিয়ে উঠল, ইশিকে বললো,“একটুও নাটক নয় ইশি। আমি জ্ঞানত চাইনা এসব। যেটা মনে ভাবছি, মুখে সেটাই বলছি।”

_সেটা তো আমরাও দেখতে পাচ্ছি তুমি চাচ্ছো না, কিন্তু আমরা এটাও দেখতে পাচ্ছি তুমি প্রয়োজন বোধ করছো। আমরা এটাও দেখতে পাচ্ছি, তোমার,দাদানের আর আমাদের শুদ্ধর একটা চমৎকার পরিবার হবে!

ইনশিরাহর কথায় ইহান ঢোক গিললো,তার বোন তার স্বপ্নটাকে কি সুন্দর উপস্থাপন করলো। ইরফান হঠাৎ দাদানকে টেনে সোজা দাড় করালো প্রেরণার সামনে, প্রেরণার চোখে চোখ রেখে বললো,“আই কান্ট বিলিভ কেউ এই মানুষটাকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। আপনার হিম্মতের জবাব নেই আপু।”

একেবারে মুখোমুখি দু'জন, দু'জনের চোখে দু'জনের মলিন দৃষ্টি। ইরফানের কথায় প্রেরণা চোখ নামালো। তবে খানিক বাদে প্রেরণা হাঁসফাঁস করে উঠলো,ধরলো শুদ্ধর হাতটা। ও এখান থেকে বেরুবে এমন ভঙ্গিতে বললো,“তোমরা বড্ড অবুঝ ইশি। প্রিতম বাড়িতে যাবি তুই? চল।”

_আর তুমি খুব বুঝদার?

বাকিরা যেখানে চুপ, সেখানে তর্ক চালাচ্ছে ইশি। মুঈন হঠাৎ গুরুগম্ভীর স্বরে ওদের থামাতে বললো,“আমার মনে হয় এসব এখানে থামানোই উচিত। লেট প্রেরণা এলৌন! অতিরিক্ত কোনোকিছু ঠিক না ইশি।”

উজ্জ্বলও ভীষণ বিব্রত, বিব্রত ভঙ্গিতেই বললো,“ইয়াহ। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ঠিক না।”

অতিরিক্ত কোন কিছু ঠিক না তা তো ইহানের ছোটো ভাইবোনেরাও জানে,তবে ওদের মন মানে না। গোটা একদিন দাদানের নির্লিপ্ততাকে দাদানের দুর্বল হয়ে পরা ভেবে নিয়ে ওরা এসব করছে, চেষ্টা শুধুমাত্র দাদানের খুশি আনা।
প্রেরণা ইহানের দিকে দৃষ্টি দিলো শেষ সময়ে, লোকটার চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে আকুতি নিয়ে বলতে লাগলো,“ওদের এসবকে আপনি লাই দেবেন না।”

একটু থেমে আবারো বললো প্রেরণা,“বলেছিলেন না যদি উত্তর না হয় তবে যেন সেটাতে জোর থাকে? শুনুন তবে, এবার জোর দিয়েই বলছি, এটা কখনো হবার নয় ইহান।
আপনার অনুভূতির চমৎকার একটা পরিসমাপ্তি টানতে চাই আমি আজ। আমাদের একসাথে চলা হবে না। আপনি ভালো থাকুন, অসম্ভব ভালো থাকুন। আপনার অনুভূতির প্রতি রইলো আমার আজন্ম শ্রদ্ধা এবং সমর্থন। এটুকু জেনে তবে এবার শেষ টানুন? এতে আপনার ভাইবোনরাও দুঃখ পাবে না।

ওয়াসীত শরিফ নেই, আসলেই হয়তো নেই। মানুষটা মরে গিয়েছে, তবে তার সাথে আমার একটা অতীত আছে, তার দেয়া আমার একটা শুদ্ধ আছে। শুদ্ধর আমার ভবিষ্যৎয়ের ওপর অধিকার আছে। আমি প্রেরণা, একটি ব্যর্থ নারী। ওয়াসীতের ওপর অবিচার হয়তো করেই ফেলেছি, হয়তো! তবে শুদ্ধর ওপর তো করতে পারিনা তাইনা?”

এটুকু বলেই প্রেরণা কথা থামিয়ে দিলো, পরক্ষনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেককে উদ্দেশ্য করে বললো,“তোমাদের দাদানকে কষ্ট দেওয়ার জন্য তোমাদের সবার কাছে দুঃখিত। বিষয়টা নিয়ে জলঘোলা করে আর আমার কষ্ট বাড়িও না। কিছু জিনিস অপ্রাপ্তিতেই সুন্দর। এটা তোমাদের এই ডিসেন্ট দাদান খুব ভালো করেই জানেন, আমাদেরকে আমাদের মতন ছেড়ে দাও প্লিজ! তাকে উস্কে দিও না।”

ইহান নিমেষ হীন তাকিয়ে আছে শুধু। প্রেরণা আবারো লোকটার চোখে চেয়ে বললো,“এই নিন, নাটক করিনি। দ্বিধা রাখিনি। সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছি। চললাম! আর একটা কথা, শুদ্ধকে যেটুকু দিয়েছেন, আপনার প্রতি আজন্ম কৃতজ্ঞ আমি।”

সবাই চুপ করে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। প্রেরণা হঠাৎ ইরফানের দিকে তাকিয়ে উদাসীন হাসি দিয়ে বললো,“আর পাগলামি না প্লিজ। “তোমার দাদানের যদি আমাকে বিয়ে করতে হয় তবে আমাকে তুলে নিয়ে বিয়ে করতে হবে।” তোমার মাথা থেকে নিশ্চয়ই পরবর্তীতে এই প্ল্যান বেরুবে? তোমরা সবাই পরবর্তীতে যদি এসব করো! তাহলে আমি সত্যিই হতাশ হবো ইরফান।”

ইরফান চুপ একেবারে। সত্যি বলতে অধৈর্য সে ছিলো। তার ইচ্ছে করছিলো কাজী ডেকে এখানেই বিয়ে পরিয়ে দিতে। আরে অনুভূতি আছে, তবে এতো নাটক কেনো? তবে সে থিতিয়ে গেলো যখন প্রেরণার পুরো অনুভূতিটা বুঝলো। শ্বাস ফেললো ইরফান।

প্রিতম এগিয়ে গিয়ে আপুকে ধরে বললো,“স্যরি আপু তুমি নিষেধ করার পরেও তোমাকে বিব্রত করেছি। চলো বাড়িতে।”

ক্লান্তিতে পা জড়িয়ে যাচ্ছে প্রেরণার। প্রেরণা এক ব‌্যর্থ নারী, শাড়ির আঁচল টেনে ডান কাঁধ ঢেকে ছেলের হাতটা ধরে হাসিমুখে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। শুদ্ধ যেতে চায়না, তবুও ওকে প্রেরণা টানতে টানতে নিয়ে যায়। ইহানের উদাস দৃষ্টি ওর প্রস্থান দেখে। বাকিরা গম্ভীর হয়েই থাকে, গুটিয়ে থাকে, হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষের মতো। এরপর আর কোনো কথা থাকে না, আসলেই থাকে না।

ইহান ঘুরে তাকালো হঠাৎ মুঈনের দিকে। মুঈনের মুখটা থমথমে। এ নিয়ে কথা হয়েছে তাদের দুজনের মধ্যে। তখন ইহান বলেছিল,“কি চমৎকার নাটক করে দেখবে।”

মুঈন দেখতে থাকে ইহানকে, ইহান দৃষ্টি নামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে সকলকে বলে,“বাড়িতে যা সবাই!”

__________

বাড়িতে ফেরার পর থেকে রিতু যেন নিজের বড় ছেলেকেই চিনতে পারছে না। অস্বাভাবিক সহজ সাবলীল তার আচরণ। অথচ রিতুর জানামতে তাদের বাড়ির ছেলেমেয়ে গুলো প্রেরণা-ইহানের মিলেমিশ করাতে গিয়েছিলো। মিলমিশ হয়নি। তবে ছেলে এমন করছে কেন?

বাড়তি কথা না বলে ইহান সহজ ভঙ্গিতেই বড় বাবা,পাপা, বাড়ির সকলের সাথে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছে। রিতুর মনটা তখন থেকে উশখুশ করছে, ভীষণ চিন্তিত হয়ে বড় জা'য়ের কাছে গিয়ে বলছে,“একটু দেখবে ও এমন করছে কেন?”

আলো বিরক্ত হয়, মৃদু ধমকে বলে,“মনমরা হয়ে থাকলে খুশি থাকতি? ছেলে নিজের রাস্তা মাপছে। এটাই তো চাইতিস? তুই খুশি নোস? যা পাত্রী দেখ!”

সেদিন সন্ধ্যায় মায়ের সাথে বৃষ্টিতে ভিজে শুদ্ধ ঠান্ডা লাগিয়েছে। বিগত একদিন যদিও গা গরম ছিলো তবে আজ বাইরে থেকে বাড়িতে আনার পরে প্রেরণা টের পেলো তার ছেলের গায়ে ভালোই জ্বর। শুদ্ধ সন্ধ্যা থেকে খিটখিটে আচরণ করছে, বাচ্চাদের অসুখ হলে যেমন করে আরকি।

ওকে স্যুপ খাওয়াতে পারলো না প্রেরণা, না কোনো কথা শুনছে। শুধু “খুনখুন” ধরণের আওয়াজ করছে।

প্রেরণা উদাস চোখে ছেলেকে দেখে বলে,“চাচ্ছো টা কি? একটু বলো? আমি যে ক্লান্ত বাবা।”

_তুমি পিকনিকে যেতে দাওনি। আজ বাইরে থেকে আমাকে ধরে নিয়ে এসেছো, ওখান থেকে টানতে টানতে এনেছো। আমি নেক্সট সানডে প্যারাগ্লাইডিং করতে যাবো। আমি করবোই করবো।

_আচ্ছা করবে,এখন স্যুপ খাও।

শুদ্ধ স্যুপ খায়না, বললো,“সত্যিই যাবো?”

_হ্যা, তোমার মামা মামী আমি আর তুমি। জেনি নানুও যাবে।

শুদ্ধর কৌতুহলী প্রশ্ন,“আর ইহান আঙ্কেল?”

বাচ্চাটার প্রতি বিরক্ত হতে পারে না প্রেরণা। সত্যি বলতে দোষ তো তার, নিজের অগোচরে সে-ই তো শুদ্ধকে লাই দিয়েছে ইহানের সাথে মিশতে। তার মতো এক মহিলার অনুভূতি লোকটা ধরাশায়ী করে দিয়েছে,শুদ্ধ তো সরল!
তবে এরও যে ইতি টানতে হবে। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে প্রেরণা বললো,“না বাবা, ফ্যামিলি ট্যুরে ফ্যামিলি মেম্বাররা যায়। তোমার মামা মামীমনি, খালামনি খালু, জেনি নানু,এরা ফ্যামিলি মেম্বার। ইহান আঙ্কেল নন। বুঝেছো?”

শুদ্ধ বুঝতে পারে না, ফ্যামিলি মেম্বার হতে কি কি থাকা লাগে সে জানে না। তবুও জেদ করে,“না, ইহান আঙ্কেল আমাকে প্রমিজ করেছে। তুমি আঙ্কেলকে ফোন দাও।”

_শুদ্ধ আবার শুরু করলে?

_এক্ষুনি, এক্ষুনি, এক্ষুনি।

ইনু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কান্ড দেখে। প্রেরণার প্রতি রাগ নেই, শুধু কপাল কুঁচকে এগিয়ে এসে ফোনটা নিয়ে বড় দাদানকে কল করতে করতে প্রেরণাকে বলে,“তোমার মতে তোমার হয়তো প্রয়োজন নেই, তবে আপাতত অসুস্থ ছেলেটার প্রয়োজন আছে সম্ভবত দাদানকে। প্লিজ না করো না।”

প্রেরণা তো না করার সাধ্যি রাখে না। দুর্বল প্রেরণা, ভীষণ দুর্বল। ওর দ্বিধান্বিত অনুভূতির সাধ্যি নেই এই দুর্বলতার সামনে ধোপে টেকা।

ইহান যখন শুদ্ধর কল পেলো তখন রাত দশটা। শুদ্ধকে ফ্যাকাশে মুখে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে উৎকণ্ঠা বাড়লো তার, বললো,“জ্বর কি বেশি?”

শুদ্ধ মাথা নেড়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে,“তুমি কি আমার ফ্যামিলি মেম্বার হবে আঙ্কেল?”

ইহান অবাক, বললো,“কেন?”

_মাম্মা বলেছে প্যারাগ্লাইডিং করতে ফ্যামিলি মেম্বার নিয়ে যাবে শুধু। তুমি নাকি আমার ফ্যামিলি মেম্বার না, তুমি হবে?”

প্রেরণা ছটফট করছে ছেলের হাত থেকে ফোনটা নিতে,পারলো না। ওপাশে ইহান অনিমেষে চেয়ে রইল ছেলেটার মুখের দিকে। শুদ্ধ বলতে থাকে,“মাম্মা পিকনিকে যেতে দেয়নি, আমি প্যারাগ্লাইডিং করবো, তোমার সাথে।”

শ্বাস ফেলল ইহান অস্থির হয়ে, বুঝতে পারলো মা ছেলে দুজন তাকে চরম ভোগাচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে ইহান বললো,“সে দেখা যাবে। তোমার মাম্মাকে ফোনটা দাও।”

ইতস্তত ভঙ্গিতে প্রেরণা ফোনটা নিতেই দুজনের চোখাচোখি হয়। প্রেরণা দৃষ্টি নত করে। ইহান গম্ভীর তবে সহজ ভঙ্গিতে বলে,“ওর জ্বর কি বেশি? আমি কি আসলে ভালো হয়?”

কি সহজ তবে কি সুন্দর একটি প্রশ্ন! কি নিদারুণ অযাচিত অধিকার বোধ মিশে আছে। প্রেরণা মৃদু শ্বাস ফেলে দু'পাশে মাথা নাড়ে শুধু। ঠোঁট কাঁপছে তার, দাঁত দিতে চেপে রেখেছে।
ইহান বলে,“আপনার তো শুদ্ধকে নিয়ে যত রাজ্যের চিন্তা বিকেলে বললেন, তবে উত্তরটা তো প্রেরণা হয়ে দিলেন, শুদ্ধ হয়ে না।”

প্রেরণা ঢোক গিলে চুপচাপ শুদ্ধর মুখের সামনে ফোনটা ধরলো,ইহান আদুরে ভঙ্গিতে শুদ্ধকে বলল,“আসবো বাবা? কি খাবে তুমি?”

প্রেরণা চোখের ইশারায় শুদ্ধকে না বলতে বলছে। ইহানের তীক্ষ্ম দৃষ্টি জোড়া থেকে শুদ্ধর চেহারার অভিব্যক্তি লুকায় না। নির্বোধ তো নয় ইহান। জেদ চাপছে তার মাঝে। ঐ অবুঝ মহিলার প্রতি রাগ চাপছে।
শুদ্ধ মায়ের কথা মতো মলিন মুখে না করে দিলেও ইহান পরক্ষণে বলে ওঠে,“আচ্ছা। আসবো না। তবে তোমার মাম্মাকে বলে দিও, প্যারাগ্লাইডিং করবো আমরা নেক্সট সানডে। করবোই করবো।”

কল কাটতেই রিতু হঠাৎ চলে আসে, মলিন স্বরে ছেলেকে বলে,“শুদ্ধর কি জ্বর বেশি?”

_হ্যা,ঐ আছে আরকি।

শ্বাস ফেলল রিতু। তার মধ্যে তো কোনো কপটতা নেই, বললো,“সত্যি বলতে ছেলেটার জন্য আমার খুব মায়া লাগে।”

মায়ের কথার জবাব না দিয়ে ইহান হেসে বললো,“আর প্রেরণার জন্য?”

রিতু চোখ নামিয়ে নেয়। ইহান মায়ের মুখটাকে দেখে নিয়ে পুনরায় বলে ওঠে,“আমি কখনোই চাইনি মাম্মা তুমি প্রেরণাকে মায়া থেকে মেনে নাও। আমি চেয়েছি প্রেরণার ছোটোবড় ভালো গুণ পছন্দ করেই ওকে মানো তুমি। তাই মায়ার কথাটা স্বীকার করতে দ্বিধা করো না। বলে দাও। মায়া লাগে না?”

রিতু ঢোক গেলে, ছেলের সামনে লুকাতে পারে না নিজেকে। মাথা নাড়ে। ইহান মাকে আগলে নেয়, মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“তুমি জানো তুমি কত ভালো একজন মা?”

_আমাকে পটাচ্ছিস?

ইহান দু'পাশে মাথা নাড়ে। স্পষ্ট করে জবাব দেয়,“সময় হয়নি। কাল পাত্রী নিয়ে এসে তখন চেষ্টা করবো!”

রিতু চোখ তোলে, ছেলের দৃঢ় মুখটা দীর্ঘক্ষণ দেখে বলে,“তুই আবার যাবি?”

_আমাকে যেতেই হবে মাম্মা। বিশ্বাস করো,আমার যাওয়াই উচিত!

রিতু থমকায় এমন জবাবে। এই ছেলে কখনো কোনো দ্বিধা রেখে কথা বলেনা রিতু জানে‌। এই ছেলে কখনো অবুঝ পনা, ভুলভাল কাজও করেনা রিতু জানে। এই ছেলে যেটুকু করে,করা উচিত বলেই করে। হঠাৎ ছেলের ঐ শেষের কথাটাতেই রিতু থেমে গেলো, তার নাখোশ ভাবটা লুকিয়ে ফেলে চলে গেলো নিজের ঘরে, নিজেকে বোঝাতে।

___________

নভেম্বরের শেষ হয়ে এসেছে। সকাল দশটায়ও বেশ শীত শীত ভাব। পাঞ্জাবির ওপর জ্যাকেট পরবে নাকি চাদর , ইহান বুঝতে পারছে না। আলো ঘরে ঢুকলো তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে। ব্যগ্র কন্ঠে বললো,“শুদ্ধর জ্বর কমেছে রে?”

ধূসর রঙের চাদরটা জরিয়ে নেয় ইহান। চুলটা ঠিক করতে করতে জবাব দেয়,“স্কুলেও গিয়েছে।”

_আর তুই কোথায় যাচ্ছিস?

ইহান এবার জবাবে হাসে শুধু। পর পর বলে,“আজ বাড়িতে একটু ভালোমন্দ রান্না করো তো বড় মা!”

আলো চোখ বড় বড় করে দম ফেললো, বললো,“আসবে সে? আসবে?”

রিতু ছেলের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কান পেতে আছে, মূলত বড় জা'কে সে-ই পাঠিয়েছে। ভেতর থেকে ছেলের জবাব এলো,“আসবে!”

_যদি ফিরিয়ে দেয়?

_দেবে না, আসবে। আমাকে ওনার প্রয়োজন বড় মা। আসবেই। এবং আমার সাথে মাম্মার কাছেও অনুমতি চাইবে। উনি নাক উঁচু,তবে ভীষণ মিষ্টিও!

রিতু মুখটা মলিন করে ছেলের এই কথাটা শুনলো। ইহান বড় মাকে বলে যাচ্ছে,“বহুবার ভেবেছি হাল ছেড়ে দিই। কিন্তু আমি পারিনা বড় মা। উনিই আমাকে সুযোগ করে দেন। কাল রাতেও দিলো।”

আলো জানতে চাইলো না কাল রাতে প্রেরণা কিভাবে সুযোগ দিয়েছে, ইহানও বললো না। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে বেরিয়ে গেলো এক নতুন শুরুর সূচনা টানতে।

শুদ্ধর জেদের কাছে হার মেনে ওকে স্কুলে পাঠিয়েছে প্রেরণা, অবশ্য বলেছে “হাফ ডে” তে নিয়ে আসবে। শুদ্ধ আজ জ্বর নিয়ে স্কুলে গিয়েছে পিকনিকের গল্প শুনতে বন্ধুদের কাছে।

সারারাত ছেলের মাথার কাছে নির্ঘুম রাত কাটানো প্রেরণা আজ রেস্তোরাঁয় এসে সোজা ক্যাশ কাউন্টারে ঢুকলো। একটু ঝিমুবে সে। মানসিক শারীরিক ভাবে চনমনে হয়ে পুরো উদ্যমে যখন নতুন দিন শুরু করার প্রয়াসে ছিলো, ঠিক তখুনি তার দুয়ারে এসে দাঁড়ায় ইহান তাজওয়ার মির্জার গাড়ি।

আবার কেন? কারণ ঐ যে, প্রেরণাকে লোভ দেখাতে, প্রেরণাকে স্বার্থপর বানাতে।

আজ শ্বৈত প্রবাহ চলছে, সূর্য ওঠেনি। শীতের হিম হাওয়ার দাপটে প্রেরণা আঁচল টেনে গা ঢেকে নিয়ে বিব্রত ও আতঙ্কিত মুখ করে উঠে দাড়ালো। তাকালো আশেপাশে। সবাই আছে এখানে। এই লোক কি করবে এখন?

প্রেরণা 'নেগেটিভ' কিছু ভাবতে চাইছে না, দেখলো যখন সফেদ পাঞ্জাবির লোকটা তার সম্মুখে এসে নির্মল হাসিতে প্রেরণাকে আটকাতে চাইলো। ইতস্তত করে প্রেরণা বলে উঠলো,“আপনার এ মাসের ভাড়া আমি আজ বিকেলেই দিতাম, আপনার এভাবে কষ্ট করে....”

গোটা একটা রাত ইহানও ঘুমায়নি। ক্লান্ত তবে স্বপ্নালু দৃষ্টিতে প্রেরণাকে দেখে বললো,“কি বলেছিলেন কাল বিকেলে আমার ভাইবোনকে? যাতে আমাকে না ওস্কায়। কিন্তু প্রেরণা, শেষটায় তো আমি আবারো উস্কে গেলাম। উস্কানিটা শুদ্ধ দিয়ে দিলো, আমার চ্যাম্প!”

পরিস্থিতি কি হতে চলেছে ভেবেই প্রেরণা শাড়ির আঁচলে ঘাম মোছে এই শীতেও। কিছু বলতে যাবে তার আগে ইহান অমায়িক একটা হাসি দেয়। যা দেখে গোটা সত্তা নড়ে যায় প্রেরণার। থেমে থেমে বললো,“কেন এসেছেন?”

ইহান জবাব দিতে এক মুহুর্তও দেরী করলো না, ধিমি আওয়াজে বললো,“কি বলেছিলেন আপনি কাল বিকেলে? বলেছিলেন আপনাকে বিয়ে করতে হলে আপনাকে তুলে নিয়ে যেতে হবে। আমি আপনাকে তুলে নিতে এসেছি প্রেরণা। আপনি যদি বাঁচতে চান,তবে প্লিজ চেচান।”

চমকে উঠলো প্রেরণা। কথা হারালো, প্রেরণা হুশও খোয়ালো যখন মানুষটা তার হাতটা ধরলো আলতো হাতে। চারদিকে স্টাফরা যেন দেখেও দেখছে না। ইহান আলতো হাতে টানতে টানতে প্রেরণাকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে, ভীষণ আকুল হয়ে বলছে,“এভাবে চেয়ে থাকবেন না। আমি আপনাকে সত্যিই তুলে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি প্লিজ চেচান!”

প্রেরণা চেঁচায় না, ফ্যালফ্যাল করে লোকটাকে দেখে। এই লোকটা, এই আলাদা লোকটা, যার সবকিছু আলাদা। লোকটার কথাবার্তা,চলনবলন লোকটার পাগলামিও আলাদা। এই পাগলামিকে অপমান করার সাধ্য কোথায় পায় প্রেরণা?

ও যেন হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছিল লোকটার সাথে সাথে। চোখের কোণে জল জমছে, ভেতর থেকে কেউ বলছে ,“প্রেরণা সব বাদ। তুই একটু এই লোকটার নির্মল পাগলামি তে মাত। আরেকবার,একটু কষ্ট করে।”

রেস্তোরাঁর বাইরেই ইহানের গাড়ি। ওকে গাড়ির কাছে এনে সুন্দর করে দাঁড় করিয়ে ইহান আবারও ভীষণ আকুলতা নিয়ে সতর্ক করছে,“আমি কিন্তু তুলে নিয়ে যেতেই এসেছি প্রেরণা। সময় আছে, আপনি চেঁচান।”

প্রেরণা চেঁচায় না, শুধু চোখ বেয়ে ওর উষ্ণ জল গড়িয়ে পরে। গাড়িতে বসে ছিল মুঈন, দরজা খুলে দিতেই ইহান প্রেরণাকে আলতো হাতে বসিয়ে দিয়ে এবার আরো জোরে বলে,“শেষ সুযোগ! প্লিজ চেঁচান,আমি আপনাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি।”

মুঈন হাসছে মিটিমিটি। প্রেরণা সিটে চুপচাপ ওর পরিশ্রান্ত শরীর এলিয়ে দেয়। ইহান উঠে ওর পাশে বসে কিছুটা দূরত্ব রেখেছে মাঝে। ঝাপসা চোখে মুঈনের হাসি দেখে প্রেরণা, মুঈন আন্তরিক হাসি হেসে বলে,“ভাবীজি!”

প্রেরণা বড় বড় শ্বাস ফেলে। এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে ইহানকে কাতর স্বরে বলে,“ভুল হচ্ছে।”

মুঈন গাড়ি স্টার্ট করে। ইহান জবাব দেয়,দৃঢ় স্বরে বলে,“জি। চলুন একসাথে মাশুল গুনবো তবে।”

প্রেরণা ভেঙেচুরে যাচ্ছে। সে চায়, চায় সে ভুলটা করতে। দু চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে মেয়েটা মুঈনের দিকে তাকায়। ও চাইলেও পারে না শক্ত হতে,কাতর স্বরে বলে ওঠে,“আমাকে সাহায্য করুন একটু।”

মুঈন হাসলো,ড্রাইভ করতে করতে বললো,“এতক্ষনে লাইনে এলেন!”

প্রেরণা তাকায় ইহানের দিকে,চাপা আওয়াজ বলে,“আমি বলেছিলাম শুদ্ধর কথা? আপনারা বোঝেননি না?”

_বুঝেছি। সেখানেই তো যাচ্ছি!

প্রেরণা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ি একটানে শুদ্ধর স্কুলের সামনে গিয়ে থামলো। শুদ্ধকে তুলে এনে মুঈন সোজা গাড়ি নিয়ে একটি নিড়িবিলি পার্কে গেল। ততক্ষণ প্রেরণা নিশ্চুপ হয়ে কেঁদেই চললো।
ইহানকে এতক্ষণ ধরে রেখেছিল শুদ্ধ। দু'টো মুখোমুখি বেঞ্চিতে বসেছে ওরা। একটাতে ইহান প্রেরণা, একটাতে মুঈন আর শুদ্ধ।

ওর হাতে চিপসের প্যাকেট তুলে দিয়ে মুঈন এবার খুব আদুরে স্বরে বলে,“তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করি বাবা?”

প্রেরণা হাঁসফাঁস করে উঠলো,“মুঈন ভাই। ও ছোটো।”

মুঈন শুনলো না প্রেরণার কথা, শুদ্ধকে বললো,“করি?”

শুদ্ধ ভদ্র ছেলেটির মতন মাথা দোলায়। মুঈন হেসে বাচ্চাটাকে কাছে টেনে বলে,“ইহান আঙ্কেলকে তুমি পছন্দ করো তাইনা বাবা? তোমার তাকে খুব ভালো লাগে?”

_খুব।
সাথে সাথে আনন্দের সহিত জবাব দেয় শুদ্ধ।

_বাবা তোমার স্কুলের প্যারেন্টস টিচার মিটিংয়ে যদি তোমার বন্ধুদের পাপার মত তোমার সাথেও তোমার ইহান আঙ্কেল যায় তখন তোমার কেমন লাগবে? কেমন হবে?

শুদ্ধ হঠাৎ ভাবতে লাগলো, এবং খানিক বাদে উত্তেজিত হয়ে জবাব দিলো,“ভীষণ ভালো লাগবে।”

প্রেরণা চোখ বন্ধ করে দু'পাশে মাথা নেড়ে ফুঁপিয়ে বললো,“ও ছোটো মুঈন ভাইয়া। বড় হলে এই ছেলে আমার কাছে কৈফিয়ত চেয়ে বসলে আমি মুখ দেখাতে পারবো না।”

ইহান একেবারে চুপ করে দৃষ্টি নত করে রাখে। মুঈন জবাবটা দেয় প্রেরণাকে,“ও ছোটো বলেই তো ভুজুং ভাজুং দিয়ে ওর কাছ থেকে অনুমতি টা আপনাকে পাইয়ে দিচ্ছি প্রেরণা। বড় হলে এই ব্যাটা কখনোই ওর মাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখতে পারতোনা, কখনোই না।”

প্রেরণা ভেজা চোখে ইহানের দিকে তাকায়। ইহানের ঠোঁট জুড়ে মলিন হাসি। মুঈন আবারো শুদ্ধকে বলতে লাগলো,“বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও শুদ্ধ?”

_জাহাজের ক্যাপ্টেন।

_বেশ বেশ। তো বড় হবার পরে তুমি যখন জাহাজের ক্যাপ্টেন হবে তখন তোমার মাম্মা আর ইহান আঙ্কেল যদি একসাথে তোমাকে ক্যাপ পরিয়ে দেয় তখন কেমন লাগবে?

শুদ্ধ তাৎক্ষণিক ভাবে কল্পনা করলো এই দৃশ্যটি। এই দৃশ্যটি একেবারে তার পছন্দের কার্টুন “ডোডো অ্যান্ড হিজ ফ্যামিলির” সাথে মিলে যায়। মুঈনের কথায় ভাবুক তবে উচ্ছ্বসিত হয়ে শুদ্ধ জবাব দেয়,“খুব ভালো হবে।”

মুঈন এবার চোখ তুলে দেখলো প্রেরণাকে, সামান্য হেসে বলতে লাগলো,“শুদ্ধ তার ইহান আঙ্কেলের হাতেই বড় হতে চাচ্ছে দেখলেন? সে কি করে বড় হয়ে তার মায়ের কাছে কৈফিয়ত চাইবে?”

একটু থেমে মুঈন বলে,“আজ ছোটোদের আনিনি সাথে। ওদের ধৈর্য্য কম তাই। কিন্তু দেখলাম আপনি আমাদের ধৈর্য্যকেও হার মানাবেন। প্রেরণা কিছু দ্বিধার কোনো ফয়সালা হয়না। আপনার মনের দ্বিধাটাও ঠিক সেরকম। শুধু নিজেকে একটু এগিয়ে আনুন, আপনার পাশের মানুষটা ভীষণ শক্তিশালী, সে টেনে নিয়ে যেতে পারবে আপনাকে।”

প্রেরণা ভেজা চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে আবার দেখে মানুষটাকে, শুদ্ধ ততক্ষণে ইহানের কোলে গিয়ে উঠে বসেছে। বুকটা হুহু করে কাঁপছে প্রেরণার, দু'চোখ বন্ধ করে এবার দম ফেললো । পরপর চোখ খুলে লোকটাকে আবার দেখে বললো,“রিতু আন্টি?”

ইহানের বিষন্ন আকাশে ঘন কালো মেঘ সরে যেন মিঠা ঝলমলে রোদ খেলে উঠল,লোকটা তেমন করেই ইহান তাজওয়ার মির্জা হাসলো। তার শখের নারীটির সরলতায় ভরা দ্বিধা দেখে হাসলো। যে হাত সে আরো বহু আগে বাড়িয়ে ছিলো, এবারো, আরো একবার, শুদ্ধকে মিশিয়ে রেখে বুকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল প্রেরণার দিকে,আজন্ম স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললো,“সম্ভবত সে দোয়া দেবে বলেই বসে আছে। চলুন দু'জনে গিয়ে জিজ্ঞেস তো করি!”

__________

সদর দরজা রিতুই খুলছে। হয়তো সে সদর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থেকেছে। হতাশা, উৎকণ্ঠা আবার একটু ভরসা, একটু আশা সবকিছুর সমন্বয়ে মাতৃ মুখটা শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়েই ছিলো। দরজা খুলেই রিতু দেখলো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ওরা, শুদ্ধটাকে কোলে তুলে ইহান এক হাতে ঐ মেয়েটার হাত ধরে রেখেছিল, আলতো করে। ওদের পেছনে মুঈন, সানগ্লাস খুলে চাচী শাশুড়ির দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে।

দোতলা থেকে ধীর কদমে নেমে এলো সবাই, তবে কেউ কিছুই বলে না, এমনকি ইহানের বাবা চাচারাও চুপচাপ তাকিয়ে রয়। যেন তারা সবাই দর্শক সেজেছে আজ। সংলাপ আদান প্রদান হবে রিতু আর তার ছেলে এবং ছেলের নির্বাচিত পাত্রীর মাঝে। হয়ও তাই। মায়ের শুকনো মুখটার দিকে ইহানের আকুল দৃষ্টি, প্রেরণার হাতটা ধরে রেখেই বলে,“মাম্মা আমি চাইনা ওনাকে তুমি সহানুভূতি দেখিয়ে মেনে নাও, কিংবা মায়া দেখিয়ে। শুধু তুমি একটু জবাব দেবে আমায়, আমার পাশে ওনাকে খুব বেশি বেমানান লাগছে? একটুও কি লাগছে? কয়েকটা অযোগ্যতা বলো তো ওনার।”

রিতু নিস্পন্দ চোখে একবার ইহান, একবার প্রেরণাকে, একবার শুদ্ধকে দেখছে। শেষটায় এসে তার দৃষ্টি জোড়া স্থির হলো প্রেরণার নিচু করে রাখা মুখটাতে। রিতু ওদের ধরে রাখা হাতটাও দেখে,দেখে ওই মেয়ের নমনীয়তাও। রিতু স্পষ্ট দেখে তার চোখের সামনে আর সেই নাক উঁচু মেয়েটা নেই, দাঁড়িয়ে আছে নমনীয় কেউ। হঠাৎ রিতু টের পায়, ছেলের পাশে প্রেরণা কতটা মানিয়ে যায় রিতু সেটা দেখলোই না ,সে তো দেখেছে প্রেরণা আর শুদ্ধর পাশে তার ছেলে কি সুন্দর মানিয়ে গিয়েছে। একটা পরিপূর্ণ দৃশ্য দেখলো রিতুর অবচেতন মন।

খানিক বাদে প্রেরণা চোখ তোলে, দৃষ্টি রাখে রিতুর চোখে, থেমে থেমে বলে,“যদি আমার কোনো আচরণ আপনার খুব বেশিই অপছন্দের হয়ে থাকে তবে বলুন,আমি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করবো আন্টি। আমার তরফ থেকে এটুকুই বলার আছে।”

রিতু মেয়েটাকে ফ্যালফ্যাল করে দেখে, আবার দেখে ছেলেটাকে। আর ওখানের প্রত্যেকে উদ্বিগ্ন হয়ে দেখে রিতুকে। মুহুর্ত যায়, দম ফেললো রিতু, তাকালো ছেলের দিকে, নিস্তেজ গলায় বললো,“তোমার পছন্দ করা পাত্রীর অযোগ্যতা আমি এখনি কি করে বলবো? বিয়ে করে নিয়ে এসো। একসাথে সংসার করি। তাকে দেখি,জানি! তারপর না হয় নালিশ দেবো তোমাকে!”

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 124 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন