#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৫
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
একটা টকটকে লাল বেনারসী শাড়ি। যার ভাঁজে ভাঁজে লেগে থাকে প্রত্যেকটি নারীর একটি রঙিন,স্বপ্নময়,নতুন সূচনার ভরসা টুকু।
প্রেরণার চোখের সামনে ঠিক অমন একটি শাড়ি। সংকোচ, জড়তা,লাজ,ভয়ের ঘোরে থাকা প্রেরণাও ঐ শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে হাত ছুঁয়ে ভরসা খুঁজে পায়। বুকের মধ্যেকার উচাটন কমে আসে, থিতু হয় বক্ষপটের ডানপিটে অস্থির আতঙ্কিত পায়রাটা।
প্রেরণা একটি স্বপ্নময় সূচনার গন্ধ সোকে ঐ লাল শাড়ি দু'হাতে আগলে নিয়ে, একটি তুলতুলে নরম বেনারসী শাড়ি। সোনালী রঙের ডালায় অন্যান্য উপহার সামগ্রীর সাথে যেটি পাঠিয়েছেন ইহান তাজওয়ার মির্জা। এটা বিয়ের ডালা। খুব বেশি বড় নয়, সামান্য কিছু সামগ্রী তবে প্রত্যেকটি যে একজন ধৈর্য্যশীল লোক তার সবটুকু ধৈর্য্য নিয়ে বেছে বেছে কিনেছে তা প্রেরণা ঐ জিনিসগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বুঝে নেয় অবলীলায়।
একটা সামান্য ডালা, লাল শাড়ি, তার সাথে টকটকে লাল ট্রান্সপারেন্ট দোপাট্টা। একসেট সোনার গহনা,গয়না গুলো পুরনো দিনের বোঝা যায়, চিকন চিকন সোনার চুড়ি একডজন, একজোড়া স্লিপার, খোঁপার কাঠি যেটা সোনার। খোপায় লাগাতে গোলাপের গাজরা। প্রসাধনীর মাঝে আছে একটা কাজল শুধু। ব্যস এটুকুই।
প্রেরণা ওসব রেখে আবার শাড়িটা হাতে নেয়। বাইরে থেকে ভেসে আসছে প্রণমির গানের স্বর, নজরুল গীতি ওটা, যেটা রেকর্ড করা।
“হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে
কুড়ায়ে ঝরা ফুল একেলা আমি
তুমি কেন হায় আসিলে হেথায়
সুখের স্বরগ হইতে নামি ।”
গান থামায় হঠাৎ প্রিতম, উঁচু স্বরে ডেকে ওঠে,“আপু দরজাটা খুলবে একটু?”
প্রেরণা দরজা খুলতেই দেখলো ভাইয়ের ঘর্মাক্ত মুখটা। বোনের বিয়ের পরিশ্রম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পরেছে বোধহয়। কপালের ঘাম মুছে বললো,“শুদ্ধ আসতে চাইছে না আপু, শেহা আর প্রণমি আছে। চিন্তার কিছু নেই, বরযাত্রীর সাথে আসবে।”
প্রেরণা মলিন হাসলো, বাচ্চাটা আদতে জানেনা কি ঘটছে, শুধু লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। সকালে ইরফান বিয়ের ডালা দিতে এসে ধরে নিয়ে গিয়েছে ছেলেটাকে, আর আসলোই না। খালুর সাথে ড্যাংড্যাং করে চলে গেলো শান্তি নীড়ে। শুনলো না প্রেরণার একটা কথাও।
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুই এতো ছোটাছুটি করছিস কেন? খাবার আসবে কেটরিং থেকে। ইনু কোথায়? চুপটি করে বোস। অতিরিক্ত কিছুই করবি না।”
_ইনু শাড়ি চুজ করছে। মিস জেনি আর ফুপি মেহমানের জন্য শরবত তৈরি করছে।
প্রেরণা স্মিত হেসে বললো,“জামিদের খবর দিয়েছিস তো? সাদামাটা বলেছি বলে ওদের নাখোস করিস না। আমার অসুবিধা নেই।”
_সবাইকে বলেছি। তুমি দরজা লাগিয়ে রেস্ট নাও, শুধু দেড়টার আগে গোসল সেরে রেডি থেকো।
বিশ্রাম, হ্যা বিশ্রাম প্রেরণা নেবে বৈকি। দু'চোখ ভীষণ ক্লান্ত প্রেরণার সারারাত ঘুম হয়নি তাই। একটু বিছনায় গা এলিয়ে দেওয়ার আগে বেনারসীটা আবারো দুইহাতে তুললো, হঠাৎ শাড়িটার ভাঁজ থেকে নিচে পরলো একটা চিরকুট।
অবাক হয়ে প্রেরণা চিরকুটটা তুলে দেখে, গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,“আপনাকে শুধু লালে দেখতে চেয়েছি তাই জমিনে সোনালি সুতোর সিকোয়েন্স ওয়ালা শাড়িটা নিইনি। দোপাট্টাও লাল, কারণ আপনাকে লালে দেখতে চেয়েছি। গয়না গুলো আমার দাদীর, এগুলো না আপনার পছন্দের,না আমার তবে মাম্মা পরতে বলেছে। চুড়ি গুলো আর স্লিপার আমি আন্দাজ নিয়ে কিনেছি, আপনার ফিট হবে। আমার এমনিতে আপনার বেনী পছন্দ, তবে আজ খোপা করবেন, কাঠিটাও মাম্মার। গাজরাটা আমার পছন্দের। গাজরার ফুল হিসেবে লাল গোলাপ নিয়েছি, কারণ আপনাকে লালে দেখতে চেয়েছি।
আজ আপনার পছন্দের কিছু জানতে বা নিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। আপনি আমাদের পছন্দের জিনিসগুলো দিয়ে নিজের মনমতো সাজুন । মন মতো সাজুন তবে আমার জন্য সাজুন।
~ইহান তাজওয়ার মির্জা।
পুনশ্চ: আজ দেড়টার আগে আপনাকে রিচ করতে পারবো না প্রেরণা। ভীষণ ব্যস্ত থাকবো। কি আশ্চর্য এক বয়স আর পরিস্থিতি পার করছি আমরা, না আপনি অভিমানী বধূদের মতো এসবে অভিমান করবেন না আমার আপনার রাগ ভাঙানোর জন্য টিপিক্যাল কিছু পাগলামি করার তাড়া থাকবে। এসব কিছুই হবেনা, তবুও বলছি।”
চিরকুটটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে প্রেরণা । হঠাৎ আবার বাইরে থেকে প্রিতম ডেকে ওঠে,“কফি বানিয়ে দেবো আপু?”
অসহ্য আবেগ গলার কাছে এসে হুটোপুটি খায় প্রেরণার, কাঁপা স্বরে বলে,“না ভাই,ঘুমাবো। তুই যা।”
প্রেরণা আর ঘুমায় না। হাতের চিঠিখানা রেখে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে নেয়। তাকে সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে নিজের,যা কিছু ও বাড়িতে নেবে।
আলমারি খুলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে ভরে প্রেরণা হঠাৎ এসে দাঁড়ায় বড় আলমারিটার সামনে। সেখান থেকে বের করে আনে ওয়াসীতের জিনিসপত্র ভর্তি একটা স্টিলের বাক্স। বাক্স খুলে প্রেরণা সেই বড় মাপের ইউনিফর্ম টা দেখে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে, নির্বিকার ভঙ্গিতে। দেখে একটা নষ্ট রিস্ট ওয়াচ, যেটার সময় থেমে গিয়েছে আজ থেকে ছয় বছর আগের জুনের কোনো রাতে। আচমকা প্রেরণা না চাইতেও একফোঁটা, দুফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পরে ওর দু'চোখ থেকে। ঠোঁট কাপে, বলে ওঠে,“আমার সময়টা আমি চলতে দিলাম,আপনি এখানেই যত্নে থাকুন, ভীষণ যত্নে। আপনার কিশোরী সেই বধূর সবটুকু আবেগ নিয়ে যেখানে থেমে গিয়েছেন,সেখানেই থাকুন, যত্নে,ভালোবাসায়,শ্রদ্ধায় ও স্মৃতিতে, মেজর ওয়াসীত শরীফ।”
দ্রুত চোখ মুছে প্রেরণা স্টিলের বক্স টাকেও গুছিয়ে নেয়। সাথে নেবে বলে একে একে গুছিয়ে নেয় প্রেরণার কাগজপত্র, পছন্দের কিছু পোশাক,শুদ্ধর সবকিছু আর প্রেরণার একটা স্টিলের বাক্স ভর্তি “নিখাদ স্বচ্ছ মায়াময় অতীত।”
বাইরের ঘরে প্রিতম আর ইনু আবারো গান টা বাজিয়ে দেয়,
“চারিদিকে মোর উড়িছে কেবল
শুকানো পাতা মলীণ ফুলদ্বয়
বৃথাই সেথা হায় তব আঁখিজল
ছিটাও অবিরল দিবসযামী ।
এলে অবেলায় পথিক বেভুল
বিদিছে কাটা নাহি পাবে ফুল
কি দিয়ে বরণ করি ও চরণ
নিভিছে জীবন জীবনস্বামী ।”
_________
“সব কথা মেনেছি বলেই আমাকে পেয়ে বসেছে আরকি। তাই কোনো দাম নেই। বড় ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়েও আমার কোনো স্বাদ আহ্লাদ থাকতে পারে না? এভাবে সাদামাটা?”
রিতু আঁচল চেপে সকাল থেকে স্বামী,ভাসুর আর জা'দের পেছনে পেছনে ঘুরে ঘুরে গজগজ করছে। যদিও কেউ তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। সামিন আর ইলহাম ফোনে ব্যস্ত, শহরে,গ্রামে সব স্বজনদের ফোনে আকদের ঘোষণা দিয়ে দোয়া চাইছেন তাদের বড় ছেলে আর তার হবু জীবনসঙ্গীর জন্য। ইশমাম মির্জা ব্যস্ত বাজার সদাইয়ে। আলোরা ঘর গোছগাছ করতে,বিয়েটা সাদামাটা হলেও বৌ দেখতে তো কারি কারি মহিলা আসবেন। ইহান বলেছে ঘরের সব সাজসজ্জায় যেন ঘরের মানুষের হাতের ছোঁয়া থাকে।
দেয়ালে অর্কিড সেঁটে দিতে দিতে আলো রিতুকে বলে,“সাদামাটা কোথায়? যে টাকা দিয়ে অনুষ্ঠান হতো,সে টাকা দিয়ে হাজার এতিম খাওয়াবে ওরা। যাদের দাওয়াত না দিয়ে ফোন করে দোয়া চাওয়া হচ্ছে তাদের বাড়িতে মুসলিম পাড়ার মিষ্টি যাচ্ছে। যে টাকা দিয়ে বিয়ের এক্সক্লুসিভ শপিং হতো সে টাকা দিয়ে থানা পাড়া এতিম খানার প্রকল্পে ব্যয় হবে। রিতু, শহরের মানুষ ডেকে খাইয়ে অপচয় হতো, অপচয়ের বিয়েতে রহমত থাকে না। আর রহমত-ই এক আর একমাত্র জিনিস যেটা ওদের সম্পর্ক আর বিয়েতে প্রয়োজন, বুঝেছিস?
জা'য়ের কথার বিপরীতে রিতু আর কোনো কথা খুঁজে পায়না। চুপচাপ দোতলায় ওঠে। বাড়ির বাচ্চা গুলো নিজেরা নিজেরা আনন্দ করছে। গত রাতটা ছিলো জমজমাট, সবাই মিলে খুনসুটি করেছে কে কোন পক্ষে থাকবে এটা নিয়ে, অবশেষে ঠিক হয়েছে যে যে বাড়িতে আছে সে সে বাড়িতেই থাকবে।
ইশির মন খুব খারাপ, মুঈন ছুটি পায়নি। যদিও লাঞ্চ টাইমে ফট করে গিয়ে বিয়েতে স্বাক্ষী থাকবে তবুও বধূবরণের গোটা বিকেলটা ইশি একা কাটাবে ভেবেই ওর মন খারাপ। সে মলিন মুখেই কল করে মুঈনকে,মুঈন কলটা রিসিভ করতেই ইশি বলে,“বাড়ির গাড়ি যাবে কিন্তু, আবার ইউনিফর্ম পরেই কনে বাড়িতে রওনা দিও না, পাঞ্জাবি পাঠিয়েছি গাড়িতে, একটু কষ্ট করে চেঞ্জ করে নিও।”
শুদ্ধ শেহার সাথে খেলছিল দোতলার লিভিং রুমে, প্রণমি ওখান থেকে উঠে ইশির কাছে যায়, দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,“ওনাকে দেখেছো আপু?”
ইশি মজা করে বললো,“কেনাকে?”
_আরে আমার ওনাকে।
_তোমার ওনাকে দেখিনি তবে আমার একটা ভাই আছে ইরফান মির্জা নাম, তাকেও দেখিনি।
প্রণমি মুচকি হেসে বলল,“সকালে শুদ্ধকে এ বাড়িতে দিয়ে যে কোথায় গিয়েছে, কোনো পাত্তা নেই সকাল থেকে।”
বলেই ঘর থেকে বেরুলো প্রণমি। হঠাৎ ধাক্কা লাগলো রিতুর সাথে। বৌমাকে আগলে নিয়ে রিতু দেখলো ওকে কিছু পল,বললো,“সাজিয়ে কে দিয়েছে?”
_শেহা আপু সাজিয়ে দিয়েছে মা, খুব খারাপ লাগছে? বেশি বেশি লাগছে?
রিতু নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো,“সাজ বেশি বেশি লাগছে না, তোমার খুশি বেশি বেশি লাগছে। কি ব্যাপার? বোন আসলে দুই বোন মিলে শাশুড়ির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে অভিযোগ করতে পারবে সেটা ভেবে খুশি হচ্ছো?”
হাসলো প্রণমি, বললো,“অভিযোগ? মা আপুর তার শাশুড়ির ওপর অভিযোগ থাকবে কিনা জানিনা, তবে আমার তো আমার শাশুড়ির ওপর অভিযোগ নেই, করবোটা কি?”
রিতু গাল টানলো তৎক্ষণাৎ মেয়েটির, বললো,“ইরফানের সাথে থাকতে থাকতে বেশ কথা শিখেছো আমাকে মাত দেওয়ার।”
প্রণমি হাসে খিলখিল করে। রিতু বলে,“তা তোমার বর কই?”
_জানিনা মা, খুঁজছি সকাল থেকে।
রিতু কল করলো ইরফানকে তখন,“কই তুই? লাপাত্তা হয়ে গেলি?”
ওপাশ থেকে জবাব এলো,“আমি ব্যস্ত। ঠিক সময়ে বিয়েতে চলে যাবো। দাদানকে বলা আছে। এতো কল করো না কেউ।”
কল কাটতেই প্রণমি চলে যায় আবার ইশির ঘরে, যেখানে খুশি সেখানে যাক লোকটা। বাড়িতে থাকলে হাড় জ্বালিয়ে খেতো, তারচে এ-ই ভালো হয়েছে।
রিতু ঘুরে তাকায় শেহা আর শুদ্ধর দিকে, শেহা দোতলা ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে আর শুদ্ধ আন্টিকে সাহায্য করছে। রিতু শেহাকে বললো,“নিজাম চাচা যাবে না কাবিনে?”
_যাবে তো, মিস্টার মাহমুদ নিয়ে যাবে।
_আর তোর বাবা কতদূর?
_আসছে, আধাঘণ্টা লাগবে।
রিতু শুদ্ধকে দেখে, পর পর মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে হাত নেড়ে বলে,“এদিকে এসো।”
শুদ্ধ ফুল হাতে এগিয়ে যায়। ওকে কোলে তুলে নেয় রিতু,বলে,“কি করছো?”
_তোমাদের বাড়ি সাজাচ্ছি।
_কেন সাজাচ্ছো?
_মাম্মা আসবে তাই।
রিতু হাসে, ওকে কোলে নিয়েই ওর হাত থেকে ফুল নিয়ে ফুলদানিতে রাখতে রাখতে বলে,“দাও আমিও একটু সাজাই।”
_তুমি কেন সাজাবে? মাম্মা আসবে বলে?
_নাহ! সেজন্য কত লোক আছে বাড়িতে। আমি সাজাচ্ছি তুমি আসবে বলে তাই।
শুদ্ধ খুব সুন্দর করে হাসলো, রিতু বাচ্চাটাকে দেখতে লাগলো মুগ্ধতা ভরা দৃষ্টিতে, বললো,“আরেকটু হাসো তো!”
_কেন?
_তোমার ফোকলা দাঁত দেখবো।
শুদ্ধ দু'হাতে ঢেকে নিলো মুখ তৎক্ষণাৎ,সে দেখাবে না তার দাঁত। রিতু ওকে হাসানোর জন্য কাতুকুতু দিতে থাকলো।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ফিরলো ইহান। দোতলায় উঠেই তার চোখে এই চমৎকার দৃশ্যটি পরে যায়। থামে তার পা, ঘামে ভেজা সুদর্শন,ক্লান্ত মুখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয় শুদ্ধকে ওভাবে রিতুর সাথে খেলতে দেখে। ইহান দেখতেই থাকে অপলক, হঠাৎ সে টের পায়, তার বুকের ভারি যে একটা পাথর, সেটা কিছুটা সরে গিয়ে তাকে স্বস্তি দিচ্ছে।
রিতুর চোখে পরে যায় ছেলেকে, বলে ওঠে,“কতদূর কি করলি?”
_কেটরিং সার্ভিসের অফিসে কথা বলে পেমেন্ট করে এসেছি, এতিমখানা গুলোর নাম ও নাম্বার দিয়ে এসেছি। বাকিটা ওনাদের দায়িত্ব। অসুবিধা হলে কল করবে আমাকে।
রিতু ছেলেকে খুশিমনে কিছুপল দেখে বলে,“আজ ক্লিন শেভ করিস, তোকে সাদা পাঞ্জাবি আর ক্লিন শেভেই মানায়।”
মাকে একটা নির্মল হাসি উপহার দিয়ে ইহান ঘরে ঢুকলো। বিছানার ওপরে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা রাখা। এই রংটা তার ভাইবোনদের নির্বাচন করা। আজ বলা আছে,ইহান তাজওয়ার মির্জা ব্যতীত বিয়েতে কেউ সাদা আর প্রেরণা আহসান ব্যতীত অন্য কেউ লাল পরতেই পারবে না।
লম্বা সময় নিয়ে শাওয়ার শেষ করে ইহান পাঞ্জাবিটা গাঁয়ে পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তার আচরণে কিছুটা তাড়াহুড়ো ভাব। আজ জুম্মাবার, বাড়ির পুরুষেরা সবাই জুম্মার নামাজ আদায় করেই যাবে বিয়েতে। বাড়ির মেয়েদের পাঠিয়ে দেয়া হবে আলাদা গাড়িতে। বাইরের কোনো লোক থাকবে না, কেউ থাকবে না। মাগরিবের ঠিক আগে আগে বৌ উঠিয়ে আনবে।
চওড়া শরীরে শুভ্র পাঞ্জাবিটা দারুণ মানিয়েছে,বরাবরের মতো। সামান্য আতর ডান হাতের কব্জিতে মাখিয়ে ঘ্রাণ নিতে নিতে ইহান স্মিত হেসে ফেলে নিজেকে দেখে ঐ আয়নায়। মায়ের কথামত ক্লিন শেভ করতে গিয়ে বয়সটাকে দু-তিন বছর কমিয়ে ফেলেছে। কে জানে প্রেরণা আহসান এই ইহানের মধ্যে সেই ইহানকে খুঁজে পাবে কিনা!
কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে আয়নার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শক্তপোক্ত,চওড়া শরীরের ইহানকে সে বলে উঠলো,“অল দ্য বেস্ট!”
বর পক্ষ গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরেছে। আজ আকদে সামিনেরা তিন ভাই, এ বাড়ির ছেলে জামাইরা, শান্ত, নিজাম মাহমুদ, ইহানের দলের চারজন ছেলে এবং ইরফানের দুজন বন্ধু যাবে। সবাই গিয়েছে জুম্মার নামাজে, তাদের সাথে শুদ্ধও গিয়েছে।
এদিকে বাড়ির মেয়ে বৌরা বেরিয়ে পরেছে। ইনশিরাহ,প্রণমি আর শেহা। সবাই পরেছে এক রঙের শাড়ি, গোলাপী রং।
প্রেরণাদের এপার্টমেন্টে বাড়তি কেউ নিমন্ত্রিত নেই। জামিন,শুভ,সাফোয়ান, প্রেরণার রেস্তোরাঁর মেয়েগুলো আর ম্যানেজার সাব্বির । ওরা এসে ঘর সাজিয়েছে। বসার ঘরের সোফা সরিয়ে মেঝেতে কার্পেটে কুশন বিছিয়েছে। মাঝখানে একটা বিশাল পাতলা সাদা পর্দা। বর বৌ যেখানে বসবে।
ইনশিরাহ, প্রণমিরা এসে আরো একদফা গোছগাছ করলো সব। কে কোথায় বসবে,সে অনুযায়ী কুশন বিছালো, ফুল সাজালো।
বাইরে যখন ওদের সবার হাসি আনন্দের গুঞ্জন,প্রেরণা তখন সদ্য গোসল সেরে গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে লাল বেনারসীটা। চুল শুকিয়ে একটা খোঁপা করে খোপাটা আঁটকে দেয় স্বর্ণের কাঠিতে। পেঁচিয়ে দেয় গোলাপের গাজরা। দুহাতে সোনার ছয় গাছা করে চুড়ি পরে গলায় পরে নেয় রিতুর পাঠানো চিকন গলার হার আর ঝুমকা। সবশেষে উঠিয়ে নেয় দোপাট্টা মাথাতে, দোপাট্টা আটকে দেয় ক্লিপে।
অতঃপর প্রেরণা থেমে চেয়ে রইল নিজের মুখটাতে, নিজের ভুবনমোহিনী রূপটাতে। নিস্পন্দ চোখে প্রেরণা দেখে, আরেকবার, নিজেকে বধূ বেশে। তবে এবার লালে, সম্পূর্ণ নতুন রূপে।
ওদিকে হঠাৎ হৈহৈ রব শোনা যায়। বর এসেছে। কলিং বেল বেজেছে। ও বাড়ির মেয়েগুলো এ বাড়িতে এসে কনেপক্ষ সেজেছে, গেট ধরার টাকা হাতছাড়া করবে না তাই। মেইন দরজায় ফিতে বেঁধে রেখেছে, মুরব্বিদের ভেতরে ঢুকিয়ে ইহান তাজওয়ার মির্জা,মুঈন উজ্জ্বল এবং বাকি ছেলেদের আটকে দিয়েছে। শুদ্ধকে টেনে এনেছে নিজেদের দলে,লাল ফিতার নিচ থেকে।
কাজী আফতাব উদ্দিন থমথমে মুখে হাজির হলেন, যদিও গতরাতে ইয়াসার মির্জা তার সাথে কল করে কথা বলেছে, তবুও সে উৎকণ্ঠিত। এ বাড়ির স্বাভাবিক বিয়ে হজম হচ্ছে না তার। গেস্ট রুমের সোফাতে রেজিষ্ট্রি খাতা হাতেও শঙ্কিত সে,মনে মনে ভাবছে, হয়তো শেষ সময়ে এই বিয়েটাও অস্বাভাবিক হবে।
বরপক্ষের মুরব্বিদের গেস্ট রুমে বসিয়ে শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করছেন মিস জেনি আর প্রেরণার ফুপি! ওদিকে ইহানকে সবাই ধরলো একসাথে। দাবি তাদের একটাই,লাখ খানেক টাকা চাই।
ইহানের তরফ থেকে মুঈন আর উজ্জ্বল তর্ক চালাচ্ছে। হঠাৎ ইনু বলে উঠলো,“আরে মেজো দাদান কোথায়?”
_ও ওর একটা বিশেষ কাজে গিয়েছে। খানিক বাদে আসবে।
_কি কাজ?
বরপক্ষের কেউই বলছে না ,শুধু মিটিমিটি হাসছে। এবার ইনু বললো,“আচ্ছা ঠিক আছে। আগে পয়সা ঢালো, ভেতরে ঢুকবে না?”
শুদ্ধকে ওরা নিজেদের দলে করে নিয়েছে। প্রণমি বলছে,“শুদ্ধ তুমি চুপ কেন? টাকা চাও!”
শুদ্ধ টাকা চায়না। ইহান জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে ওকে দেখে দৃষ্টি দেয় ঘরের ভেতরটায়। লিভিং রুমে একটা পাতলা পর্দা ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে ইহান তাজওয়ার মির্জা না দেখতে পেলেও কেউ তাকে দেখছিলো। মেহেদী রাঙা হাতে নিজের ঘরের পর্দা সরিয়ে প্রেরণা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল মানুষটাকে। ওপাশ টায় পর্যাপ্ত আলো থাকায় সাদা পর্দা গলিয়ে স্পষ্ট দেখছিলো প্রেরণা নিস্পন্দ চোখে।
ওরা সবাই চেঁচামেচি করছে,ঝগড়া করছে টাকা নিয়ে আর মানুষটা শুদ্ধর দিকে মিটিমিটি তাকিয়ে হাসছে। হঠাৎ মানুষটা শুদ্ধকে কাছে ডাকলো। শুদ্ধও এগিয়ে গেলো, লাল ফিতার ওপাশেই ইহান ঝুঁকে শুদ্ধর দুই গালে দু'টো হাত রেখে বললো,“টাকা চাই?”
শুদ্ধ মাথা দোলালো। স্মিত হাসলো ইহান,বললো,“কত টাকা চাই?”
শুদ্ধ বুঝতে পারছে না কিছু, তাকে মামী মণি শিখিয়ে দিয়েছে যা,সেসব মনে এই, বাচ্চাটা আলগোছে জবাব দিলো,“এক কোটি টাকা।”
সবাই হেসে ফেললো। প্রেরণা অনিমেষে তাকিয়ে আছে, ইহান মুচকি হেসে শুদ্ধকে লাল ফিতার নিচ থেকে টেনে এনে কোলে নিলো, বললো,“মাত্র এক কোটি টাকা? এক কোটি টাকা দিয়ে দিলে আমাকে তোমার মাম্মার ভাগ দেবে?”
চলমান.......