ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 126

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৬
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

“আমাকে তোমার মাম্মার ভাগ দেবে?”

খুবই দ্বিধান্বিত শুদ্ধ। গোল গোল চোখে চেয়ে আছে ইহান আঙ্কেলের মুখের দিকে। মাম্মার ভাগ দেবে কিভাবে? কিভাবে দেয় মাম্মার ভাগ?

ইহান বাচ্চাটাকে বুঝলো, বাচ্চাটার দ্বিধা বুঝলো, বললো,“দেবে না?”

শুদ্ধ তখনো চুপ, ইহান নির্মল একটা হাসি দিয়ে শুদ্ধর কপালে লম্বা সময় ধরে একটা চুমু খেয়ে বলে,“তোমার মাম্মার ভাগ নেবো না আমি। তোমাকে আর তোমার মাম্মাকে পুরোটাই নিজের কাছে নিয়ে যাবো। তোমরা দু'জন পুরোটাই আমার কাছে থাকবে। শুদ্ধ শুদ্ধ হয়ে থাকবে আর শুদ্ধর মাম্মা শুদ্ধর মাম্মা হয়ে। ইহান তাজওয়ার মির্জার হয়ে।”

প্রেরণা তাকিয়ে আছে অনিমেষ, ঠোঁটের কোণে তার হাসির ক্ষীণ রেখা। শুদ্ধ তখনো বোঝেনা কিছু। ইহান পাঞ্জাবির পকেট থেকে বিশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল বের করে প্রণমির হাতে দিয়ে বলে,“বিশ হাজার টাকা আছে এখানে,সবাই চকোলেট খেও।”

ইনু মন খারাপের ভঙ্গি করে বললো,“মাত্র বিশ হাজার?”

পাশ থেকে প্রিতম চোখ রাঙালো, ফিসফিসিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“এটা কেমন ছ্যাচড়ামি?”

মুখ ফোলালো ইনু। ইহান মিটিমিটি হাসছে, হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলে,“তোদের মতো অনেক ভাই বোনকে চকলেট খেতে দিয়ে এসেছি। আপাতত পকেট খালি। এটাই রাখ।”

ছোটোরা, প্রিতম-ইরফানের বন্ধু বান্ধবীরা, রেস্তোরাঁর মেয়েগুলো লজ্জিত ভঙ্গিতে হেঁসে ঐ বিশ হাজার টাকাই লুফে নেয়,খুশি মনে, উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে।

শুদ্ধ নেমে যায় ইহানের কোল থেকে। ইহান আর বাকিরা ঘরে ঢুকেই আশেপাশে তাকায়। ইশি দাদানকে উদ্দেশ্য করে বলে,“উহুম, ফাঁক ফোকর দিয়েও দেখতে পারবে না এখন। সে সুযোগ নেই।”

ইহান চোখ রাঙালো বোনকে অল্পস্বল্প। মুঈন পাশ থেকে ফাজলামি করে বললো,“আরেহ ইশি বোঝো তো! রাহা নেহি যাতা না? তারাপ হি কুছ এ্যায়সি হে!"

ইহান এবার মুঈনকে চোখ রাঙায়। ওরা সবাই হাসতে হাসতে ভেঙে পরছে। ইহান প্রেরণাকে না দেখলেও প্রেরণা দেখছে অস্পষ্ট। ছোটোদের মস্করায় লাজুক হেসে গুটিয়ে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকবে তখন শুদ্ধ মাম্মার আঁচল টেনে ধরলো।

প্রেরণা ওকে কোলে নিয়ে চুমু খেয়ে বললো,“মায়ের কথা একটুও শুনতে ইচ্ছা করে না তাইনা? এতক্ষণে ফিরলে? আর ফিরলে কেন?”

_ইহান আঙ্কেল বলেছে,“চলো তোমার মাম্মাকে নিয়ে আসি।” তাই এসেছি।

প্রেরণা দেখছে বাচ্চাটার মায়াভরা মুখটা, শুদ্ধ বললো,“তোমার আর ইহান আঙ্কেলের বিয়ে হবে কখন মাম্মা?”

বাচ্চাটার মুখে ঘনঘন এই কথাটাতে প্রেরণা কিঞ্চিত অপ্রস্তুত হয়। পর মুহুর্তেই সব দ্বিধা কাটিয়ে বলে,“যখন ঐ কাজী দাদু কবুল বলতে বলবে। আমি আর তোমার ইহান আঙ্কেল কবুল বলবো,তখন।”

_তারপর তুমি ইহান আঙ্কেলের বৌ হয়ে যাবে?

থমকায় প্রেরণা, শুদ্ধকে কোল থেকে নামিয়ে হাঁটু ভেঙে ওর সামনে বসে ছেলেটাকে জরিয়ে ধরে, লম্বা শ্বাস ফেলে কাঁপা স্বরে বলে,“জি, আমি তোমার ইহান আঙ্কেলের বৌ হয়ে যাবো।”

_তারপর কি হবে?

উৎসুক শুদ্ধ বিয়ে নামক জিনিসটার পরবর্তী ঘটনা জানতে। প্রেরণা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে রেখে নিশ্চুপ চোখের জল ফেলে একফোঁটা। বলে,“তারপর অনেক কিছু হবে। ইহান আঙ্কেল আমাদের অভিভাবক হবে। শুদ্ধর স্কুল থেকে ওর দস্যিপনার নালিশ যাবে ইহান আঙ্কেলের কাছে, আমি ইহান আঙ্কেলের বাড়ির কিচেনে শুদ্ধ আর তার ইহান আঙ্কেলের জন্য রোজ ইয়াম্মি ইয়াম্মি মাফিনস বানাবো। ইহান আঙ্কেল,আমি আর শুদ্ধ খুব সুখী থাকবো। আ হ্যাপি ফ্যামিলি হয়ে।”

_ডোডো অ্যান্ড হিজ ফ্যামিলির মতো?

চোখের পানি মুছে ওপর নিচে মাথা ঝাঁকায় প্রেরণা। শুদ্ধ আবারো বুঝে যায় সবটা। ছেলের মাথায় বিলি কেটে প্রেরণা বলতে থাকে,“আরেকটা জিনিস হবে।”

_কি হবে?

_শুদ্ধকে ওর বন্ধুরা বুলি করতে পারবে না, শুদ্ধর মাম্মাকে ঐ আন্টিগুলো বুলি করতে পারবে না।

শুদ্ধ এইবার হাসে অনেক কিছু বুঝে নিয়ে, খিলখিল করে হেসে বলে,“হ্যা! তবেই ইহান আঙ্কেল ডিশুম,ডুশুম দেবে ওদের।”

_________

ইহানদের লিভিং রুমের মেঝেতে কুশনে বসতে দিয়ে শরবত পরিবেশন করেছে প্রেরণার ফুপি। মুবিনা আপ্লুত ভঙ্গিতে দেখছে নিজের জনম দুঃখী ভাইঝির হবু বরকে। সাদা পাঞ্জাবিতে সুদর্শন মুখটা দ্যুতি ছড়াচ্ছে। মুবিনা ভেজা চোখে দেখছে মুগ্ধ হয়ে।
মিস জেনি রান্নাঘরে কেটরিং থেকে আগত খাবার গুলো ঘরোয়াভাবে সাজাচ্ছে। বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলেই খেতে দেবে সকলকে তাই। ওদিকে শান্তিনীড় থেকে বারবার কল করছে আলো সামিনের কাছে ,বিয়েটা হয়েছে কি না তাই জানতে।

বিয়ে পড়ানো শুরু হবে ইরফান এলে। কাজী আফতাব উদ্দিন আড়চোখে তিন সিনিয়র মির্জাকে দেখে হঠাৎ আবারও বলে,“মানে বিয়েটা এভাবেই হবে?”

কপাল কুঁ'চ'কে ফেলে ইলহাম মির্জা এবার,বলে,“কি ব্যাপার কাজী সাহেব? বারবার এ কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”

_না কিছুনা ।

কাজী মুখ কাচুমাচু করে নেয়। তার তখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে একটা পরিকল্পিত বিয়ে সারতে যাচ্ছে এ বাড়ির। ইরফান ঘরে ঢোকে পুরোপুরি অগোছালো অবস্থায়। ওকে দেখে চেচিয়ে ওঠে ইনু,“কি ব্যাপার? এইখানে বিয়ে আর তুমি এই বেশে এলে? কোথায় ছিলে? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে ইঁদুরের গর্তে ছিলে।”

ইরফান হাতের শপিং ব্যাগটা নিয়ে প্রণমির ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,“ব্যস্ত ছিলাম। এখন পাঞ্জাবি পরছি,ওয়েট।”

ইরফান পাঞ্জাবি পরে নিতেই মুরব্বিরা তাড়া লাগায়। নিজাম মাহমুদ উঠে কাজীকে বললেন বিয়ে পড়াতে।

লিভিং রুমে পর্দার এপাশে পুরুষ মুরব্বিরা সবাই চারপাশ ঘুরে বসেছে,তাদের পেছন লাইন ধরে বসেছে বাড়ির জামাইরা, এবং ইরফান ও বাকি ছেলেরা।

পর্দার এপাশে মেয়েরা বসেছে। ইশি আর প্রেরণার ফুপি গিয়ে প্রেরণাকে ধরলো, কাঁধ ধরে খুব সন্তর্পণে নিয়ে এলো ওকে। ওপাশে পর্দার সম্মুখেই কাজীর পাশে বসেছে ইহান তাজওয়ার মির্জা। যার কোলে ঠেসে বসেছে শুদ্ধ। ওপাশটা আলোয় আলোকিত,এপাশ থেকে অস্পষ্ট হলেও দেখা যায় অবয়ব। প্রেরণা তার নত দৃষ্টি তুলে এক পলক তাকিয়ে দেখে নিলো লোকটাকে, লোকটার কোলে শুদ্ধকে। দৃষ্টি নামিয়ে ধীরে ধীরে বসলো এপাশে। ওর দু'পাশে বসলো প্রেরণার ফুপি আর মিস জেনি। দু'জনে শক্ত করে ধরে রেখেছে প্রেরণার দু'টো হাত।

কাজী যখন বিয়ে পরাতে শুরু করলেন, ইরফান উঠে এসে ইহান আর শুদ্ধর ছবি তুলতে লাগলো, ভিডিও করতে লাগলো।

এপাশে প্রেরণা অনবরত কাঁপছে,যখন কাজী বললেন,“সাত লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে তোমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে ইহান তাজওয়ার মির্জা...রাজি থাকলে কবুল বলো।”

অধীর আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে ইহান। শুধুমাত্র ঐ একটা শব্দ শুনতে। প্রেরণা সময় নিচ্ছে, সে টের পাচ্ছে তার গলা কাঁপছে। ওদিকে যখন ইরফানের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে ইহানের মনযোগ ভ্রষ্ট করলো, ইহান হঠাৎ অস্থির হয়ে ভাইকে চোখ পাকালো। এই মুহুর্তে সে পৃথিবীর কোত্থাও ধ্যান দিতে রাজি নয়, সে শুধু তার সমুদ্রনীলার মুখের ঐ শব্দটা শুনবে।

প্রেরণা অনেক বেশিই সময় নিচ্ছে। ওদিকে সিনিয়ররা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে অভয় দিয়ে বলছে,“মা কবুল বলো।”

শুদ্ধও অস্থির, কবুল বললেই বিয়ে হয়ে যাবে। তবে মাম্মা বলছে না কেন? সে নিজে এবার তাড়া দিয়ে বললো,“মাম্মা কবুল বলো!”

এবার চোখ বুজে প্রেরণা আবারো দুফোঁটা উষ্ণ তরল ছেড়ে দিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,“কবুল।”

“কবুল”। মানে আমি আপনাকে আমার স্বামী, আমার বাকিটা জীবনের সঙ্গী, বন্ধু, অভিভাবক, আমার সহযাত্রী, আমার ভরসার কাঁধ,আমার সুরক্ষিত জায়গা,আমার আরামের জায়গা হিসেবে স্বীকার করলাম। আপনাকে এই প্রেরণার শক্তি, এই প্রেরণার একাকিত্ব ও নৈঃসঙ্গের মুক্তি হিসেবে স্বীকার করলাম। “কবুল” মানে এই প্রেরণা আহসানের জীবনের একটা বিরাট অংশ, দীর্ঘ একটা সময় আপনার হলো ইহান তাজওয়ার মির্জা। আপনি রাখুন আমাকে। এই প্রেরণাকে। প্রেরণা “কবুল” করে নিলো আপনাকে।

কথাগুলো যদিও উচ্চারিত হয়না মুখে। গা ছেড়ে দিলো প্রেরণা যেন। মুবিনা ওকে বুঝতে পেরে জরিয়ে ধরলো, জরিয়ে ধরলো মিস জেনি। প্রণমি,ইশি,শেহা,ইনু যে যেভাবে পারলো ওকে ধরলো।

একটা ছোট শব্দ। শোনামাত্র ইহানের ঠোঁট ছড়িয়ে গেলো নির্মল হাসিতে। হঠাৎ সে টের পায় বুকের মাঝে খালি জায়গাটা তার ভরে উঠেছে, এই জনমে হয়তো এর বেশি তার পাওয়ার কিছুই নেই। এ এক সুখময় প্রাপ্তি। ইহানের সেরকম অনুভব হচ্ছে।

কাজী ইহানকে কবুল বলতে বলার সাথে সাথে ইহান খুব স্বাভাবিক ভাবে, তার সেই চিরায়ত গম্ভীরতা আন্তরিকতা ও বুকের মাঝে লুক্কায়িত এক জনমের ছটফটানি নিয়ে বললো,“কবুল।”

“কবুল।” মানে আমি আপনাকে আমার স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করলাম। আমার ঘরের রানী, আমার বন্ধু,আমার নীড়,আমার শান্তি, আমার আমৃত্যু সহযাত্রী ও আমাকে দেখভাল করার একজন বিশ্বস্ত সঙ্গীনি হিসেবে স্বীকার করলাম। আমি আপনার হলাম, আপনার ছায়া হলাম। আপনাকে আমার স্নেহতলে সবিনয়ে আশ্রয় দিলাম, আমৃত্যু।

কথাগুলো এবারো উচ্চারিত হয়না মুখে। দু'জন দু'পাশে চুপ করে আছে। ঘোরের মধ্যে দু'জন। কাজী সাহেব দোয়া দরুদ পড়ছেন। দু'পাশে জোড়ায় জোড়ায় হাত উঁচু করে তোলা, দোয়া করছে নতুন দম্পতির জন্য। প্রেরণার ফুপি মুখে আঁচল চেপে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে খুশিতে,কক্ষ জুড়ে সে কান্নার গুঞ্জন ওঠে।

দোয়া পাঠ শেষ সামিন তাড়াহুড়ো করে কল লাগায় বাড়িতে রিতুর ফোনে, ভীষণ উত্তেজিত লাগছিল তাকে। সেদিনের সেই ইহান,সামিন যাকে পেলে পুষে বড় করেছে, সেই ছোট্ট ইহান বিয়ে করেছে।

রিতু জাদের সাথে দ্রীপ্তর ঘরটা গোছাচ্ছিল শুদ্ধর জন্য, ভাসুরের কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সামিন শ্বাস ফেলে বলে,“ছেলে বিয়ে করে নিয়েছে রিতু। দোয়া করে দাও তোমরা।”

_______

মুরব্বিদের ডাইনিং হলে খেতে দেওয়া হয়েছে। ছেলেমেয়েরা কেউ খাবে না এখন, সবাই বর বৌয়ের সাথে খাবে। বর বৌয়ের মুখ দেখাদেখি হবে এখন।

লিভিং রুমের মাঝখান থেকে পাতলা সাদা পর্দাটা তুলে নেয়া হয়। ঘোমটায় আরো বেশি করে ঢেকে দেওয়া হয় প্রেরণার মুখটা। দু'জনকে বসানো হয় পাশাপাশি। একেবারে পাশাপাশি,গা ছুঁয়েছে এমন ভাবে।

শেহা এলো আয়না নিয়ে, বাকিরা সবাই গোল হয়ে বসেছে এই বিয়ের সবথেকে আকাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত টুকু দেখবে বলে। ইহান তাজওয়ার মির্জা তার বৌয়ের মুখ দেখবে।

প্রেরণা তিরতির করে কাঁপছে, ওর পাশে বসে ইহান সেটা উপলব্ধি করছে, মুখে তার স্নিগ্ধ হাসি,প্রশান্তির।

শেহা দু'জনের সামনে আয়না ধরেছে, ইনশিরাহ ধীরে ধীরে প্রেরণার ঘোমটা সরিয়ে মুখটা অনাবৃত করতেই ইহান দেখতে পেলো তার বৌকে, তার লাল টুকটুকে বৌকে। দেখতে পেলো তার সমুদ্রনীলাকে টকটকে লালে,ঠিক যেভাবে সে বাসনা করেছিল। অপলক দেখতে লাগলো। প্রেরণা চোখ তুললো না, ঘামে ভেজা মুখটা লাল লাল হয়েছে।

শেহা বললো,“দাদান, এখন রাগী মির্জা ভিডিও করবে। আমরা জিজ্ঞেস করবো “আয়নায় কাকে দেখা যায়?” তুমি বলবে “আমার বৌকে” ঠিক আছে?

এরপর থেমে সবাই রেডি হয়ে একযোগে বলে ওঠে,“আয়নায় কাকে দেখা যায় দাদান?”

ইহানের ঘোর কাটে না, প্রেরণা চোখ তোলে না। সবাই যখন আরো একবার জিজ্ঞেস করে উঠলো, ইহান বললো,“আয়নায় একজন প্রেরণা আহসানকে দেখা যাচ্ছে,একটা শুদ্ধর মাম্মাকে দেখা যাচ্ছে, আর আমার স্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে।”

এইবার চোখ তুললো প্রেরণা। “স্ত্রী” শব্দটা কাঁপন ধরালো বুকে তার। দু'জন তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে নিষ্পলক। এইবার ইনু বলে ওঠে,“আপু.....উপস স্যরি....ভাবীমনিআপু, আয়নায় কাকে দেখা যায়?”

প্রেরণা ইহানের দিকে চেয়েই থেমে থেমে বললো,“একজন ইহান তাজওয়ার মির্জাকে, মির্জা বাড়ির দায়িত্বশীল বড় ছেলেকে, ও বাড়ির চারটা ডানপিটে বাঁদরের গম্ভীর বড় ভাইকে, শুদ্ধর স্নেহশীল ইহান আঙ্কেল আর আমার স্বামীকে।”

লাজুক হাসলো দু'জনে সামান্য। ওদিকে হৈচৈ লাগিয়ে দিয়েছে ছোটোরা। ইরফান সিটি বাজাতে শুরু করেছে। ইশি চেঁচিয়ে বলছে,“আর আমরা দেখছি আমাদের সবার পছন্দের দু'জন মানুষের দুঃখ বিদায়ের মুহুর্তকে। উইশ ইউ আর ভেরী হ্যাপি ম্যারেড লাইফ, আ হ্যাপি লাইফ!”

__________

আসর নামাজ বাদ বৌ নিয়ে রওনা হবে সবাই। প্রেরণার জিনিস পত্র গাড়িতে তোলা হচ্ছে। ফুপি,মিস জেনি আর প্রিতমকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিচ্ছিল প্রেরণা। এপার্টমেন্টের বাইরে সাড়ি সাড়ি করে পার্ক করে রাখা গাড়িতে সব মুরব্বিরা উঠে পরলো।
ইনু প্রিতম,মিস জেনি বা মুবিনা কেউই যাবেনা ও বাড়িতে। মেয়ে বিদায় দিতে সবাই গেটের কাছে এসেই ভীষণ অবাক।
চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে প্রেরণা, রাস্তায় চারজন বেয়ারা আর পালকি দেখে।
এ ধরণের বুদ্ধি কার হতে পারে সে প্রেরণা জানে, হতভম্ব ভাব কাটিয়ে ইরফানের মুখটা দেখতেই ইরফান অমায়িক একটা হাসি ভাবীকে উপহার দিয়ে বলে,“একটু কষ্ট করে, একটু চেষ্টা করে যখন আমাদের ভাবীমনি হয়েই গিয়েছেন তখন একটু কষ্ট করে,একটু চেষ্টা করে এটাতেও উঠুন। এটা আমাদের টিনেজের ফ্যান্টাসি ছিলো জ্ঞানী আপা উপসস স্যরি ভাবী মনি।

সবাই হাসলো আরো একদফা।
এজন্যই দেরী হয়েছে ইরফানের আজ। আজকাল এসব কেউ শখ করেও করে না। কাঠমিস্ত্রিদের দুদিনের মধ্যে বানাতে হয়েছে।

_আমি এসবে চড়বো? তোমাদের মাথা খারাপ?

অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললো প্রেরণা। ওরা কেউ শুনলোই না, জেদ করে দাঁড়িয়ে আছে। হতাশ হয়ে প্রেরণা ইহানকে দেখে, ইহান চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে বললো,“আধাঘন্টার পথ, উঠুন প্লিজ।”

প্রেরণা ছেলেমেয়ে গুলোর পাগলামিতে নাস্তানাবুদ। ধীরে ধীরে সংকোচ কাটিয়ে উঠে বসলো পালকিতে, ওর জুতা নিচ থেকে তুলে প্রিতম পালকিতে রেখে বিদায়ের শেষে আপুর কপালে একটা চুমু খায়, আবেগী কন্ঠে বলে,“এই সুখ আজন্ম থাকুক। আমার আপু আজীবন হাসুক।”

কাঁদছে না প্রেরণা, ও কাঁদলে প্রিতমটা কাঁদবে। তাই কাঁদেনি আজ একটুও। ভাইয়ের গলা জরিয়ে ধরে নতুন জীবনের সূচনাতে সেও ভাইয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলে,“তোরাও সুখী থাক। দুজনে ঠান্ডা মাথার সংসারী হোস।”

মুরব্বিদের নিয়ে গাড়ি গুলো একে একে বেরিয়ে পরেছে। ইশি অসুস্থ বিধায় সেও গিয়েছে সামিনের সাথে।
বৌ যাবে পালকিতে। বর আর বরযাত্রী হাঁটবে। শুদ্ধ মাম্মার সাথে উঠবে না পালকিতে,সে ইহান আঙ্কেলের সাথে হাঁটবে।

অস্বস্তি আর লজ্জায় গুটিয়ে আছে প্রেরণা, এ এক নতুন অভিজ্ঞতা তার নতুন জীবনে। ঝাপসা চোখ দু'টো দু'হাতে চেপে বসে থাকে একা একা, এই পথটুকু না হয় সে একলা থাক। ও বাড়িতে পা রাখলে সবকিছু ঐ লোকটার সাথেই হবে, মনে মনে বুঝিয়ে শক্ত করে প্রস্তুত করে নেয় নিজেকে প্রেরণা আহসান।

ডেইলি সিটির রিপোর্টারের কল আসে পথিমধ্যে ইহানের ফোনে, রিপোর্টার উৎসুক ভঙ্গিতে বললো,“ভাই পালকির খবরটা পেলাম। বিনোদনের পাতায় একটা জব্বর খবর হয়ে যেতো। একটু কভার করার অনুমতি দেবেন?”

ইহান না করে দেয়, গম্ভীর হয়ে বলে,“এটা আমাদের ফ্যামিলি প্রাইভেসির ব্যাপার!”

_কিন্তু ভাই বিয়েতো লুকিয়ে করেননি।

_এটা আমার বৌয়ের প্রাইভেসির ব্যাপার। আর কিছু?

রিপোর্টার চুপ করে ক্ষমা চেয়ে কল কেটে দেয়। রাস্তার দুধারে মানুষ অবাক হয়ে দেখছে। তবে ইহান তাজওয়ার মির্জাকে দেখে কেউ ছবি তোলার সাহস পাচ্ছে না।

_________

দ্রীপ্তর ঘরটা মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছে শুদ্ধর জন্য, মুরব্বিরা আর ইশি ফিরেছে। খানিক বাদে খবর আসে বৌয়ের পালকি ঢুকেছে গলিতে।
মাগরিব তখন, রিতু নামাজ আদায় করে তসবিহ জপ করছিল। আলো সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত শেষ করে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দেখলো বাড়ির গেটে চলেও এসেছে। রিতুকে বললো আলো। রিতু এবারো বিরবির করছে,“আল্লাহ,কাউকে নারাজ করিনি আমি,কষ্ট দিইনি। আমি যেন কষ্ট না পাই ঠিকাছে? ঐ মেয়ের কাছ থেকে খিদমত সহবত না পাই অসুবিধা নেই, এক জীবনে রিতুকে যে সব পেতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই তাইনা? রিতুর না পাওয়াতে অভ্যাস আছে। তবে দেখো,আমার বড় ছেলে যেন কষ্ট না পায়, আমার বড় ছেলের যেন কোন কিছুতে কষ্ট না হয়,কমতি না থাকে। আর হ্যা ওদের প্রথম জীবনে মেয়ে দিও,ছেলে দিও না। ”

পরী আর আলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে জায়ের দিকে। আচমকা দু'জনেই খিলখিল করে হেসে ওঠে । পরী আলোকে বলে,“ভাবী! আল্লাহ বাঁচিয়েছে আমাদের দু'জনের মেয়ে,নয়তো এভাবে টেনশনে টেনশনে মাথার চুল থাকতোই না।"

রিতু কপাল কুঁচকে জায়নামাজ ভাঁজ করে নিতে নিতে বললো,“তোরা কি বুঝবি? মেয়ে বিদায় করে নিশ্চিন্ত আছিস। আর পরের মেয়ে গুলোর সাথে রিস্ক নিয়ে সংসার করতে হয় ছেলের মায়েদের। এ এক সংগ্রাম।”

আলো বললো,“তা মেয়ে নাতনি চাইলি কেন?”

_ছেলে তো একটা আছে ওদের।

কথাটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেই আঁচল টেনে রিতু প্রস্তুতি নেয় বৌয়ের মুখ দেখতে যেতে।

__________

পালকি থেকে নামলো প্রেরণা, ইরফান আর শেহা দু'পাশ থেকে দু'টো হাত ধরে বের করলো ওকে।

উঠে দাঁড়িয়ে চোখ তুলতেই প্রেরণা দেখলো প্রাসাদের মতো ঝকঝক করছে শান্তি নীড়। তার স্বামীর ঘর এটা, বাকিটা জীবনের তরে যেটা তার ঠিকানা। শ্বাস ফেলে প্রেরণা। সবার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই এগিয়ে যায়। শুদ্ধর হাতটা ইহান এক বারের জন্যও ছাড়েনি।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো ইশি। তার মা চাচীরা তখনো নামেনি। ইহান প্রেরণাকে দরজায় আটকে দিয়ে ইশি বললো,“কোলে তোলো বৌকে।”

বাকিরা ছবি তুলবে বলে রেডি, প্রেরণা অস্বস্তিতে গাঁট হয়, ইহান ওকে একপলক দেখে শুদ্ধকে কোলে তুলে নেয়, ততক্ষণে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামে বাড়ির মহিলারা। রিতু কৌতুহলী চোখে বৌয়ের মুখ দেখতে চায়, প্রেরণার মুখটা অর্ধেকটা ঘোমটায় ঢাকা।

ইহান শুদ্ধকে কোলে নিয়ে মিশিয়ে নেয় নিজের সাথে অতঃপর ধীরে ধীরে প্রেরণার হাতটা ধরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“গেস্ট রুমে বসাবো মাম্মা?”

প্রেরণা মাথা তুলে ধীরে ধীরে চায় শাশুড়ির দিকে। সন্ধ্যার পর শীত বাড়ায় কাঁপছে সে, বিনয়ের সহিত সালাম দেয়। রিতু সালামের জবাব দিয়ে ওর মুখটাতে দৃষ্টি রেখেই মনে মনে বলে উঠলো,“মাশাল্লাহ!”

তবে মুখে তা উচ্চারিত হয়নি। নিরেট ভারি স্বরে ছেলেকে বলে,“নিয়ে যা। সন্ধ্যার পর বৌ দেখতে আসবে মহিলারা, তার আগে নাস্তা খেয়ে নিক।”

ইহান শক্ত হাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে প্রেরণার হাত। দাদান যে কখনোই বৌকে কোলে তোলার মতো কান্ড করবে না সবার সামনে তা ছোটোরা জানতো। হতাশ সকলে।

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 126 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন