ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 127

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৭
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

মায়ের পাশে চুপটি করে বসে আছে শুদ্ধ। তাদের ঘিরে অসংখ্য উৎসুক দৃষ্টি। প্রেরণার অস্বস্তি লাগলেও মুখটা স্বাভাবিক । সবার সাথে নিচু স্বরে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছে।

বাড়ির বড় বৌ দেখতে এসেছে পাড়া থেকে পাড়ার মিস আর মিসেসরা। বৌয়ের রূপ নিয়ে খুঁতখুঁতুনি করার সুযোগটি না পেলেও বৌয়ের আগের ঘরের বাচ্চা নিয়ে চোখ বাকাবাকি করছে সবাই। অবশ্য সাহস নেই কারো মুখে সেকথা উচ্চারণ করার, এ বাড়ির মেয়েরা,জামাইরা এবং গুণধর ছেলে ইরফান মির্জা পাহারাদারের মতো আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, হুমায়রা রিতুকে “বাচ্চা ওয়ালা ছেলের বৌমা” নিয়ে খোঁচা মারার জো নেই।
ফল মিষ্টি খেয়ে উপহার দিয়ে দোয়া করে চুপচাপ চলে যায় তারা।

প্রণমি আসে একফাকে প্রেরণার কাছে, কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,“আপু! কিছু খাবে তুমি? লজ্জা পেও না। আমাকেও তো ইশি আপু লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক কিছু খাইয়ে গিয়েছিলো।”

হাসে প্রেরণা ছোট বোনের কাণ্ড দেখে। আদর করে কান টেনে দিয়ে বলে,“ধন্যবাদ। লুকিয়ে দিতে হবে না কিছু। আমার খিদে পেলে আমি চেয়ে খেয়ে নিতে পারি।”

রাত বাড়লে খুচরা মেহমান সব বিদায় হয় বাড়ি থেকে। ঘরের মানুষ গুলোকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেন বাড়ির বড়রা।

প্রেরণা তখন গাঁয়ের লাল বেনারসীটা খুলে একটা সুতির শাড়ি পরেছে। টকটকে লাল জমিনে কালো সুতার কাজ, পাড় কালো, ব্লাউজটা কালো, গলায় চিকন একটা চেইন আর কানে সিম্পল একটা দুল।
আলো আসে, প্রেরণাকে পরিয়ে দেয় মোটা মোটা বালা দু'টো। প্রেরণা হাত উল্টেপাল্টে দেখে। হাসে আলো, নরম গলায় বলে,“এই বাড়ির বড় বৌ গুলোর হাতের সাইজ কি এই চুড়ির মাপেই থাকে? আশ্চর্য তো! এটা চার প্রজন্মের চুড়ি। একটুও ভাঙতে গড়তে হয়নি কখনো।”

“বড় বৌ” কথাটা বেশ ভারি শোনালো। ঘুরে ঘুরে প্রেরণা বাকিদের দেখলো নিস্পন্দ চোখে। ওকে টেনে ডাইনিংয়ে বসালো শেহা।

ইহান পাঞ্জাবি পালটে ঘরোয়া টিশার্ট আর ট্রাউজার পরে নিচে নেমে কোলে তুলে নিলো শুদ্ধকে। ভাত খাবে না বলে গোঁয়ার্তুমি করছিলো, ইহান জোর করে ওকে বসিয়ে দিয়ে প্রেরণাকে বললো,“নিন খাইয়ে দিন। আমি ধরে রেখেছি।”

শুদ্ধ এটা “খেলা খেলা” ভেবে হাসছে। কতশত কথা শুদ্ধর তার ইহান আঙ্কেলের সাথে! বাড়ির সবাই রাতে খেতে খেতে বেশ উপভোগ করে ওদের আলাপ। পরিবেশ টা এমন যে,মনেই হয়নি আজ এ বাড়িতে বৌ এসেছে। একটা স্বাভাবিক ডিনার টেবিল যেমন থাকে একান্নবর্তী পরিবারে ঠিক তেমন, নতুন বৌ নিয়ে মাতামাতি নেই, আলোরা কথা বলে বলে পরিবেশটা এমন করে ফেলেছে যে মনে হয় প্রেরণা বহুদিন আগেই বৌ হয়ে এসেছে।

খাওয়া-দাওয়ার পরে বড়রা বলতে হয় তাই বললো,“সবাই ঘরে গিয়ে শুয়ে পরো। আজ আর এতো হৈচৈ করো না রাত জেগে। ক্লান্ত আছো।”

কেউই ক্লান্ত নেই, ইশিকে অবধি ক্লান্তি ছুঁতে পারেনি, ওরা প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুধ মধু রিচুয়ালের ‌।

প্রেরণা আর শুদ্ধকে নিয়ে দোতলায় উঠলো আলো আর রিতু। ঘুমে তখন টলছিলো শুদ্ধ। ওর অভ্যাস ডিনার শেষেই ঘুমানো। রিতু বুঝতে পেরে বললো,“ছেলেটার ঘুম পাচ্ছে, ওকে ওসব রিচুয়ালে বসিয়ে রেখে কি লাভ, তুমি সময় নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও।”

প্রেরণা খানিকটা অপ্রস্তুত। আলো ওকে বুঝতে পেরে বললো,“ও দ্রীপ্তর ঘরটা বেশ পছন্দ করেছে। বললো তখন, ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ডে ঢুকে পরেছে। যদিও সেভাবে সাজাতে পারিনি আমরা আনাড়ি হাতে।”

অবাক দৃষ্টিতে আলোকে দেখে প্রেরণা কিছুক্ষণ, অস্ফুটে বলে,“কিন্তু আন্টি ওটা তো দ্রীপ্তর ঘর!”

আলো মলিন হাসে, জবাব দেয়,“ওটা দ্রীপ্তর ঘর। যেটা খালি পরে আছে। আর ঐ ঘরটা তোমাদের পাশের ঘর। শুদ্ধর যেটা দরকার।”

প্রেরণা নিষ্পলক দেখে এ বাড়ির কর্ত্রীদের। মমতাময়ী শব্দটা প্রেরণা এই মহিলাদের নামের পাশে জুড়তে চায়। প্রেরণা আপ্লুত, সত্যিই তো! এসব তো বাড়াবাড়ি, যেটা প্রেরণা পাচ্ছে তার এই বেলাশেষে।

বাড়িতে ঢোকার পরে শুদ্ধ ইহান আঙ্কেলের সাথে সাথেই ছিলো, সন্ধ্যা থেকে বেশ কয়েকবার দেখে গিয়েছে ঘরটা। সে রীতিমতো “এক্সাইটেড” ছিলো এই ড্রিমি ওয়ার্ল্ডে ঘুমাবে তাই। ঘুম কাতুরে চোখে হাই তুলতে তুলতে নরম গদির বিছানায় গা এলিয়ে দেয় ছেলেটা, দাঁত অবধি ব্রাশ করলো না। প্রেরণা ছেলের মাথার কাছে বসলো, আদুরে গলায় বললো,“বাবা ভয় পাবে না তো এখানে?”

শুদ্ধ ঘুমে ডুলতে ডুলতে দু'পাশে মাথা নাড়ে। হাঁফ ছাড়ে প্রেরণা, মলিন হেসে বলে,“ওকে। শুভ রাত্রি।”

ওকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখছিলো রিতু। হঠাৎ প্রেরণা উঠে দাড়াতেই দু'জনের চোখাচোখি হয়। রিতু বলে ওঠে,“এখন একটু ওদের গিয়ে সময় দাও। দুধ মধু না কি করবে যেন। তারপর ঘরে গিয়ে শুয়ে পরো।”

_জি।

নিচুগলায় বলে প্রেরণা যেতে নিলে রিতু আবারো ডেকে উঠল,“প্রেরণা!‌ ও ভয় পাবে কি? আমি কি থাকবো এখানে আজ রাত?”

প্রেরণা নিষ্পলক রিতুকে খানিক সময় দেখে মাথা নেড়ে বলে,“না আন্টি। ও ভয় পাবে না।”

সবাই যথেষ্ট করছে তার আর শুদ্ধর জন্য। এতটাও নির্ভরশীল প্রেরণা হতে চায়না। প্রেরণা কৃতজ্ঞ সবার প্রতি,আর বেশি কৃতজ্ঞ হতে চায়না। জীবন সুন্দর হোক, তবে এতো বাড়াবাড়ি আরাম চায়না সে।

দুধ মধু রিচুয়াল ধরে বেঁধে করিয়েছে ইহানকে। ইহানের অবশ্য আপত্তি ছিলো না,তবে তার কেনো জানি মনে হচ্ছিল এসব প্রেরণাকে অহেতুক অস্বস্তি দেওয়ার কারণ। এসবের আদৌও দরকার আছে? কিন্তু ইহান ভাইবোনদেরও নিষেধ করতে পারছে না।

একটা চাদরে ঢেকে দেয়া হলো দু'জনকে। দু'জনকে দুধ মিষ্টি খাইয়ে সবাই একদফা গানের কলি খেললো। ঘন্টাখানেক বাদে মুঈন ইশি, শেহা উজ্জ্বল এবং ইরফান প্রণমি হাই তুলতে তুলতে উঠলো।

ইহান তখন পুল সাইডে গিয়েছে একটু হাঁটতে। প্রেরণাকে নিয়ে গেলো ইশি আর শেহা ইহানের ঘরে, লাল সাদা ফুলে শোভিত একটা ঘরে।

সারাদিন,সারা সন্ধ্যা, এতক্ষণ বেশ স্বাভাবিক ছিল প্রেরণা। হঠাৎ চোখের সামনে এভাবে সাজানো খাট দেখে মৃদু কেঁপে ওঠে সে। পরমুহূর্তে আঁচল খামচে ধরে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সামলে নেয় নিজেকে।
সে কারো স্ত্রী হয়েছে, ঐ লোকটা তার দ্বিধার অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য নয়, ঐ লোকটার পাওনা নয় এসব। তার যা দ্বিধা,সেসব দিয়ে ঐ লোকটার অপমান সে করতে ইচ্ছুক নয়।

নিজেকে সামলে নিয়ে প্রেরণা আশপাশটায় চোখ বুলায়। ঘরের এক কোণে তার জিনিসপত্র গুলো রাখা, এখনো গোছানো হয়নি। ওয়াসীত শরীফের জিনিসপত্র ভর্তি স্টিলের বক্সটা শুদ্ধর ঘরে দেয়া, আলমারিতে আছে।

ইশি ভাবীর কাঁধ ধরে বিছানার কাছে এনে বললো,“তুমি অপেক্ষা করো, দাদান হয়তো অস্বস্তিতে তোমার কাছে আসতে পারছে না। মুঈন আর উজ্জ্বল ভাই পাঠিয়ে দিচ্ছে।”

প্রেরণা ম্লান হেসে ইশিকে বললো,“এবার তোমার রেস্ট নেওয়ার সময়। সাড়ে সাত মাসে এতো ঝক্কি নেওয়া ঠিক নয়। যাও শুয়ে পরো।”

মুঈন গিয়ে ছাদে দেখলো ইহানকে,পেছন থেকে মৃদু ডাকলো,“ঘরে যাবে না? সে অপেক্ষা করছে!”

ইহান স্মিত হাসলো, আসলে সে দেরী করছে প্রেরণা যাতে অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠে, যাতে দু'জন বসে দু'টো কথা খুব স্বাভাবিক ভাবে বলতে পারে তাই।

মুঈন আর উজ্জ্বলের প্রশ্নে মাথা নেড়ে দৃঢ় পায়ে ইহান ভেতরে এলো, এবং ঢুকলো ঘরে। পুরো ঘরটা আলোয় আলোকিত। সুঘ্রাণে আলোড়িত। ঘরে ঢুকেই দেখলো প্রেরণা তার ফোনটা চার্জে লাগাচ্ছে। ইহানের অস্তিত্ব টের পেতেই খানিকটা চমকে বিছানার ওপাশটাতে দৃষ্টি নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

ইহান দেখতে লাগলো ভদ্রমহিলাকে, সাদামাটা বেশে, সর্বোপরি ভীষণ আকাঙ্ক্ষিত রুপে। চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো বিছানাটাকেও। গোলাপ অর্কিড আরো নানা পদের ফুল দিয়ে সাজানো।
দু'জন আচমকা দুজনের চোখে চোখ রাখে, আবার চোখ নামিয়ে নেয়।
পুরো কামরা জুড়ে পিনপতন নীরবতা। পুল সাইড হতে মুঈন, উজ্জ্বল আর ইরফানের গলার ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসছে। এখন সম্ভবত আড্ডা দিচ্ছে তাঁরা।

ইহান ওভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ করেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, গিয়ে সোজা শুদ্ধর ঘরে ঢোকে । ঘুমন্ত শুদ্ধকে কোলে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে ফুল গুলো এক হাতে সরিয়ে দেয়। প্রেরণা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, খানিক বাদে অস্ফুটে বলে,“ওকে আনার প্রয়োজন ছিলো না, ও একা ঘুমায় তো।”

কথাগুলো বলতে যেয়ে গলা কাপে প্রেরণার। ইহান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,“আজ রাতটা এখানে থাকুক। অভ্যস্ত নয় তো, হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে যদি আপনাকে খোঁজে?"

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রেরণা, সংকোচে গাঁট হয়ে, বাড়ির মুরব্বি মহিলারা যদিও অমন না তবুও যদি এসব নিয়ে কথা ওঠে? যদি তার শাশুড়ি অভিযোগ আনেন তার ছেলে মহানুভবতা দেখিয়ে নিজের প্রথম রাত নষ্ট করছে তাই?

সে আস্তেধীরে বললো,“ইহান। এটা আপনার প্রথম রাত আর....”

_আমার প্রথম রাত মানে?

ভ্রু যুগল গুটিয়ে ইহান জানতে চায়। পর পর বলে ওঠ,“বলুন আমাদের প্রথম রাত।”

প্রেরণা নিজের ভুল শুধরে নিয়ে বলে,“জি!”

ইহান বলতে থাকে হালকা হেসে,“এটা আমাদের প্রথম রাত, আমাদের প্রথম রাত হয়েই থাকবে।”

উঠে দাঁড়ায় ইহান, চেয়ারের ওপর রাখা তার শাল টা হাতে নিয়ে বারান্দায় যেতে যেতে বলে,“বাইরে আসুন, এখানে বসে কথা বললে ওর ঘুম ভেঙে যাবে।”

ইহানকে অনুসরণ করে প্রেরণা বারান্দায় গিয়ে বসলো ইহানের পাশে, মাঝখানে কিছুটা দূরত্ব। ঘরের মধ্যে টের পায়নি, এখানটায় বেশ ঠাণ্ডা, কুয়াশা পরেছে। প্রেরণার গা শিরশির করছে, কিন্তু ওর চাদর কোথায় তা এখন কি করে খুঁজবে। তবুও উঠে দাঁড়ায় প্রেরণা মৃদু কাঁপতে কাঁপতে, ইহান হঠাৎ দৃষ্টি নত রেখেই বলে ওঠে,“এটা অনেক বড় শাল। উই ক্যান শেয়ার ইফ ইউ ওয়ান্ট।”

থামলো প্রেরণা। লোকটা কথা বলছে সহজ ভাবে। প্রেরণা টেরই পাচ্ছে না অস্বস্তি। এটা এই লোকের বিশেষত্ব নাকি?

বসলো প্রেরণা, অবলীলায় চাদরের একমাথা টেনে নিয়ে কাঁধ ঢাকলো, লোকটাকে এটা বোঝাতে, প্রেরণা তার প্রস্তাবকে অসম্মান করেনি।

নীরবতার প্রতিযোগিতা চলে, একটু যখন দু'জন স্বাভাবিক হলো, ইহান বাড়িয়ে দিলো হাতটা। বললো,“দুঃখগুলোও আপনার আমার বেশি বেশি। উই ক্যান শেয়ার, ইফ ইউ ওয়ান্ট।”

প্রেরণা নির্নিমেষ দেখছে মানুষটাকে, ঐ হাতটাকে। ধীরে ধীরে নিজের পেলব হাতটা ঐ লোকের হাতে দিলো। বললো,“আমাকে তুমি করে বলুন প্লিজ।”

_একটু সময় লাগবে আমার।

দৃষ্টি নামিয়ে হাসে প্রেরণা। ইহান মুগ্ধ হয়ে সে হাসি দেখে, দেখে ভদ্রমহিলার চোখের নিচে কালি, বলিরেখা,খুব কাছ থেকে। কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে হঠাৎ বলে,“আমরা দু'জন খুব ব্যস্ত মানুষ প্রফেশনাল লাইফে। তবে আপনার ব্যস্ততা আরো বেড়ে গেলো। বাইরের কাজ গুলো খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে পরবে। তাই আপনার সব কাজ.....উই ক্যান শেয়ার, ইফ ইউ ওয়ান্ট।”

মাথা নিচু করে শুনে যাচ্ছে প্রেরণা। ওর হাতটাকে বড্ড নমনীয়তায় ছুঁয়ে রেখেছে লোকটা। এবার বলে,“আপনার ক্লান্তি, আপনার বিষন্নতা, আপনার অবসাদ। সবকিছুই......উই ক্যান শেয়ার, ইফ ইউ ওয়ান্ট!”

উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায় প্রেরণা, বলে ওঠে,“আর কি কি শেয়ার করতে পারবেন? বা আমি পারবো?”

ইহান হাঁফ ছাড়ল, নিস্তব্ধ কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে ওর কন্ঠস্বর প্রেরণার কানে ঢোকে তান্ত্রিকের সম্মোহনের মন্ত্রের মতো। ইহান বলে,“একটা গোটা দিন, একটা গোটা রাত। কখনো কখনো তাড়াহুড়োতে নিজের তোয়ালে না খুঁজে পেলে আরেকজনের তোয়ালে, আরেকজনের কফির মগ। বা একটা আস্ত শুদ্ধ। সবকিছুই আমরা শেয়ার করতে পারবো, যদি আপনি চান।”

প্রেরণা ঠিক মন্ত্রমুগ্ধের মতনই ঐ ভারি স্বরের কথাগুলো শোনে। সারাদিনের ক্লান্তি পিঠের শিরদ্বারা বেয়ে নেমে যায়। হালকা হয় প্রেরণা। নিজের হাত দেখে, দেখে মানুষটাকে আরো একবার। আধো আলোতে খাঁড়া নাক আর শক্ত চোয়ালের গম্ভীর মানুষটাকে এভাবে,কতটা কোমলভাবে পেয়ে প্রেরণা আপ্লুত হয়। এই রাত জীবনে না এলে প্রেরণা মরে যেত না এটা সত্যি। এই পুরুষ প্রেরণার জীবনে না এলে প্রেরণা মরে যেত না এটা সত্যি। তবে প্রেরণা অন্ধকারে ঐ অমলিন আর পবিত্র দৃষ্টি জোড়ায় এই রাতে এভাবে বন্দী হয়ে টের পেল, প্রেরণার জীবনে এই পুরুষটা এসে খুব ভালো করেছে। খুব কৃতার্থ করেছে প্রেরণাকে, এই অবেলায়।

না চাইতেও প্রেরণার চোখ থেকে টুপটাপ জল গড়ায়। এখন থেকে রাত গুলো তার অন্যরকম হবে তাই না? আশেপাশে সবসময় ঘুরঘুর করবে একটা লোক, প্রেরণার সবকিছু শেয়ার করে নিতে। এভাবে, ঠিক এভাবে কোমল স্বরে সবসময় বলবে,“উই ক্যান শেয়ার, ইফ ইউ ওয়ান্ট।”

অন্ধকারের ওর চোখের জল মুক্তোর দানার মতো চিকচিক করছে। প্রেরণা হঠাৎ নাক টেনে বলে,“আর কি কি শেয়ার করবেন? করতে চাইছেন?”

ইহান পকেট থেকে একটা চেক বের করে এবার প্রেরণা হাতে গুঁজে দেয়, এই পবিত্র রাতে স্বামীত্বের একটা সহজ দাবি, অধিকার বোধ,খুশি নিয়ে প্রেরণাকে ধরলো সংকোচ কাটিয়ে, একটুও দ্বিধা না রেখে প্রেরণার হাতের পিঠে একটা চুমু খেলো, মুখটা তুলে চোখে চোখ রেখেই বললো,“আর, এমন ছোটো ছোটো স্পর্শ। উই ক্যান শেয়ার, ইফ ইউ ওয়ান্ট!”

প্রেরণা মুখ ঘুরিয়ে নেয়, চোখ মোছে, হঠাৎ কি হলো প্রেরণার, ইহানের হাতটা এবার নিজে টেনে নিজের মাথায় রাখে, কাঁপা স্বরে বলে,“জি।”

ইহান দু'চোখ ভরে দেখছে একটা ভাঙাচোরা নারী সত্তা। যে নারী বহু বছর তৃষ্ণার্ত ছিল, বহুবছর এভাবে কেউ মাথায় হাত রাখেনি। প্রেরণা বেঞ্চিতে পা তুলে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকে। ইহান ধীরে ধীরে ওর হাতটা প্রেরণার মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,“আর এভাবে তৃষ্ণা পেলে নিজেই চেয়ে নিতে পারেন আমার হাত। শুধু বলবেন।
আই ক্যান শেয়ার, ইফ ইউ রিয়ালি ওয়ান্ট।”

“বাসর”। দম্পতির এই রাতটা কিভাবে পরিপূর্ণতা পায় জানা নেই। তবে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে, নির্জনতায়, দুনিয়াকে একপাশে সরিয়ে রেখে সামান্য কিছু কথা বলেই ওরা পরিপূর্ণ হলো। আরো দীর্ঘক্ষণ দুজন চুপ থাকলো। চোখ মোছে প্রেরণা, বলে, “ঘুমাবেন না?”

ঠিক তখনই কামরার ভেতর থেকে শোনা গেলো খুনখুন আওয়াজ। তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো প্রেরণা ইহান। গিয়ে দেখলো শুদ্ধ উঠে গিয়েছে । তার “হিসি” চেপেছিল তাই। তার পছন্দের রুমটা থেকে তুলে এনে এমন ফুলের মাঝে শুইয়ে রাখাতে শুদ্ধ খুব খেপে গেলো। বাচ্চারা কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে যেভাবে মেজাজ দেখায় ওভাবে পা নাচাতে লাগলো। প্রেরণা আর ইহান বহু কষ্টে ওকে সামলে আবার ওর রুমে দিয়ে আসলো।

ঘরে এসে বিছানার ফুলগুলো ইহান সরায়। প্রেরণা ঝাড়ু হাতে বাকিটা পরিষ্কার করে। রাতের সময় তখন তিনটা প্রায়। তখন ওরা গা এলিয়ে দেয় বিছানায়। মাঝখানে এক হাতের দূরত্ব, সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শুয়ে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পরলো দু'জনেই।

বাসর রাত শেষ হলো ওদের, সাদামাটা বিয়ের একটি সাদামাটা বাসর শেষে ইহানেরই ঘুম ভাঙল শুরুতে। আলোটা সরাসরি এসে তার চোখে লেগেছিল তাই। একটানা ঘুমিয়ে মস্তিস্ক জট পাকিয়ে ছিলো মিনিট খানেক, ধীরে ধীরে যখন চোখ খুললো ইহান তাজওয়ার মির্জা। চোখের সামনে হালকা পাতলা শরীরের এক ইন্দ্রানীর মতো দেখতে ঘুমন্ত রমণীকে দেখতে পেয়ে অকস্মাৎ চোখ বড় বড় করে নিলো। রোজ সকালে এভাবেই ঘুম ভাঙে তার,তবে উল্টো পাল্টা সে দেখে না।
ত্বরিত চমকে গিয়ে পর পর নিজেকে সামলে নিলো। ওহহ,এটা তো তার বৌ। সে তো বিয়ে করেছে গতকাল, “ফাইনালি” ইহান তাজওয়ার মির্জা বিয়ে করেছে। এতো বছরের “সিঙ্গেল” জীবনে আচমকা এমন ধাক্কা খাওয়া স্বাভাবিক।

এদিকে যে এতকিছু হয়ে গিয়েছে,তা টের পায়না প্রেরণা, গুটিসুটি মেরে ঘুমে বিভোর সে। ইহান হেসে ফেললো একা একা, হাসি থামিয়ে দেখতে লাগলো তার সমুদ্রনীলাকে, প্রেরণার স্নিগ্ধ মুখটাকে। যাকে সে প্রথম দেখেছিলো পার্টি অফিসের গেটে, একটা সাদামাটা শাড়ি গাঁয়ে, এসেছিল নালিশ জানাতে। এসেছিল ইহানের জীবনে সমুদ্রনীলা হতে।

মুগ্ধতা কাঁটে না ইহানের। তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখে, হঠাৎ বিড়বিড় করে বলে,“এই একটা জিনিস, আমাদের কখনো শেয়ার করা হবে না প্রেরণা। এই একটা জিনিস। আই কান্ট শেয়ার।”

__________

“হলুদ খেলা”। নব দম্পতিকে হলুদে মাখিয়ে আনন্দ করা। বিয়ের পরেরদিন সকালে সবাই আনন্দে এই খেলাটা খেলে। ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে যেতে পারেনি প্রেরণা, ওকে জোর করে নাস্তা খাইয়ে টেনে বাড়ি থেকে বের করেছে শেহা। ইনু প্রিতম সকাল বেলা এসেছে আনন্দ করতে। সব উদ্দীপনা ইরফান,শেহা আর ইনুর মাঝে ছিলো। বাকিরা সবাই শীত দেখে গুটিয়ে আছে। সবাইকে টানতে টানতে বের করেছে ইরফান।

প্রেরণাকে শুধু হলুদ ছোয়ালো মেয়েরা। ইহানকে সবাই। শুরুতে ভেবেছিল ইহান রেগে যাবে খুব, কিন্তু হঠাৎ এক কান্ড ঘটলো, ইহান নিজের গম্ভীর স্বভাব থেকে বেড়িয়ে ভাই আর বোন জামাইদের চেপে ধরে পাল্টা হলুদ লাগিয়ে দিয়েছে।

সাদা রংয়ের সুতির শাড়িটা জড়িয়ে গা ভর্তি হলুদ মেখে প্রেরণা দূরে দাঁড়িয়ে ভাইবোনের খুনসুটি দেখে। এতো বড় বড় লোক, হঠাৎ কেমন বাচ্চা হলো। মাঠময় ছোটাছুটি করে হলুদ মাখছে সবাই। শুধু দাঁড়িয়ে আছে প্রেরণা, ইনশিরাহ আর প্রণমি।

মাঠের মাঝখানে একটা চৌবাচ্চা আছে। ওতে এক গামলা হলুদ আর চালের গুঁড়া ঢেলে দেওয়া হয়েছে। শুদ্ধর আনন্দের কমতি নেই। সবথেকে বেশি হৈচৈ করছে ইরফান, শুদ্ধ গিয়ে ওকে ধরলো,“খালু, খালু আমাকে হলুদ মাখো না!”

ইরফান দাঁত বের করে হাসি দিয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে তুললো, আদুরে ভঙ্গিতে বললো,“আয় খালুর বাচ্চা! হলুদেই গোসল করি।"

ওকে নিয়ে চৌ বাচ্চায় নামলো ইরফান। এর মাঝে এক তলার ছাদ থেকে ডাক পরলো আলোর। দুপুরে কিছু মেহমান আসবে, তাড়াতাড়ি গোসল সেরে নিতে বললো প্রেরণাকে।

বাকিরা সবাই মাঠে হৈচৈ করতে লাগলো। প্রেরণা ইহান চলে গেলো ঘরে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে। দু'জনে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে যে যার তোয়ালে ও টয়লেট্রিজ বের করে ঘুরে দাড়াতেই যখন চোখাচোখি হলো তখন লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো দুজন।

প্রেরণা মিনমিনে স্বরে বলল,“আচ্ছা, আপনি আগে যান।”

ইহানও বললো,“না না,ঠিক আছে। আপনি যান।”

_না প্লিজ আপনি যান।

আবার দু'জন লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো। হঠাৎ ইহান চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,“আচ্ছা একটা কাজ করা যাক....”

এটুকু শুনেই ঘাবড়ায় প্রেরণা, হঠাৎ ঢোক গেলে। অবচেতন ভাবনা আসে,আবার এই লোক বলে ফেলবে না তো? “উই ক্যান শেয়ার,ইফ ইউ ওয়ান্ট?”

ঘাম ছুটে যায় প্রেরণার অহেতুক, ইহান ওর ভাবনাকে লম্বা করতে না দিয়ে বললো,“আমি শুদ্ধর রুমের ওয়াশ রুমে যাচ্ছি। আপনিই যান।”

চলমান...........

[ বাকি জুটি গুলোকে তাদের প্লট অনুযায়ী উপযুক্ত স্ক্রিন টাইম দেওয়া হয়েছে। এখন সময়টা শুধু ইহান প্রেরণার। আর কারো নয় ❤️ ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 127 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন