ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 128

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৮
#ইসরাত_ইতি

🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

একবার, দুবার, তিনবার রিং হবার পর মুঈন কলটা রিসিভ করলো। এপাশে বড্ড গম্ভীর ইশি, মুখটা বেশ অন্ধকার। সকাল থেকে শরীরে যুত নেই খুব একটা। বড্ড কাহিল লাগছে। ওকে অমন করতে দেখে ওপাশে উদ্বিগ্ন মুঈন। স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখে ব্যগ্র কন্ঠে শুধালো,“সব ঠিক আছে?”

ইশি মিথ্যা করে বলে,“হুম। ঠিকই আছে। তুমি আসবে না আজ?”

_আমি? আমি সন্ধ্যায় এসে তোমাকে চেক আপের জন্য নিয়ে যাবো।

সন্ধ্যায়। শব্দটা ইশি মস্তিষ্কে গেঁথে নেয়। বেচারা চাইলেও তো এর আগে আর পারছে না। মুঈন সামান্য হাসলো, ফোনের স্ক্রিনেই ছুঁয়ে দিলো ইশিকে, ব্যস্ততায় হাঁফ ছাড়ার জো নেই, ইউনিফর্ম পরে নিতে নিতে বললো,“আজ রাতটা আমি ও বাড়িতে আসবো।”

ইশি এবার মুখটা আরো ভার করে নেয়,বলে,“কি দরকার? লোকে ঘর জামাই বলবে না তোমাকে? কি দরকার?”

হেসে ফেললো মুঈন ইশির খোঁচাতে। সত্যি বলতে তার ঘনঘন ও বাড়িতে এভাবে রাত্রিযাপন করতে দ্বিধা হয়, ইশির অসুস্থতার সময়টুকু তাই আসছে এভাবে।

ইশিকে বললো,“না, সপ্তাহে বৌয়ের কাছে একরাত গেলে কেউ ঘরজামাই বলবে না। বলবে ঘরের জামাই এসেছে।”

ওপাশে নির্মল হাসি দিলো মুঈন, ইশি চোখ তুলে কিছুক্ষণ ওকে দেখে বললো,“আমি কতদিন তোমার ইউনিফর্মের বোতাম লাগাই না!”

হাত থামিয়ে মুঈন তাকিয়ে রয় বৌয়ের দিকে, মিনিটখানেক পানপাতার মতো মিষ্টি মুখটা দেখে নিয়ে বলে,“আমিও বহুদিন তোমার হাতে ইউনিফর্ম পরিনা। তুমি ভালোয় ভালোয় আমাদের বেবিদের নিয়ে আমার এখানে চলে এসো! আমি সেই অপেক্ষায়!”

কলটা কাটে ইশি আরো কিছুক্ষণ আলাপ সেরে, সকাল বেলা এই এতটুকুই ছিলো তার স্বস্তির, পরিশ্রান্ত লাগছে এখন খুব নিজেকে। চনমনে মেজাজটা নিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরুতেই ইশি মুখোমুখি হলো বাবার। সামিন নিচেই যাচ্ছিলো, মেয়েকে দেখে নির্মল হেঁসে মেয়ের হাত ধরে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে, বলে,“আজ ডাক্তারের কাছে যাবে আম্মা? মা'কে নিয়ে?”

_ও সন্ধ্যায় আসবে পাপা। ও নিয়ে যাবে!

মিনমিনে স্বরে ইশি বললো। সামিন মুখ তুলে ঘুরে তাকায় মেয়ের দিকে, চোখেমুখে তার পরিতৃপ্তির ঝিলিক। ভেতরে ভেতরে শ্বাস ফেলে স্বস্তিতে, মেয়েটি কি অবলীলায় স্বামীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হলো। এটাকে নারীর দুর্বলতা ভাববে সামিন? না তো! এটাই নারী জীবনের চরম প্রাপ্তি। যেকোনো কিছুর আগে ভরসাতে যার স্বামীর মুখটা ভাসে।

অসুস্থ মেয়েটাকে হাতে ধরে সিঁড়ি থেকে নামতে সাহায্য করছে ইয়াসার মির্জা। নিচতলায় ডাইনিং হল থেকে সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছে সে দৃশ্য।
এ বাড়ির বড় বৌমা প্রেরণা মাথায় ঘোমটা টেনে এগিয়ে যায়, সামান্য হেসে অসুস্থ ননদের হাত ধরে এনে চেয়ারে বসিয়ে দেয়, সামনে বেড়ে দেয় স্বাস্থ্যকর সব খাবার।

ডাইনিং হলে আলাপের গুঞ্জন। ইরফান-প্রণমি ব্যতীত সকলেই উপস্থিত সকালের নাস্তা খেতে। সবাইকে পরিবেশন করে দিচ্ছে প্রেরণা, এ বাড়িতে বৌ হয়ে তার তৃতীয় সকাল আজ। প্রেরণাকে সাহায্য করছে তার বড় শাশুড়ি।

কথায় কথায় ও বাড়ির কথা উঠলো। ইশমাম মির্জা প্রেরণার দিকে তাকিয়ে বলল,“তোমার ফ্ল্যাট টা তো বিক্রি করবে। শুনলাম ইনু প্রিতম নতুন ফ্ল্যাট দেখছে ভাড়া নেবে তাই।”

_জি আঙ্কেল।

_তো মিস জেনির বিষয়টা বুঝলাম না, সে কি তোমাদের দুবোনের সাথে এসে থাকতে ইচ্ছুক নয়?

ইলহাম মির্জার প্লেটে সবজি তুলে দিতে দিতে প্রেরণা স্মিত হেসে বলে,“তার কোনো সিদ্ধান্ত নেই সে বলে দিয়েছে। তবে আমি চাই মিস জেনি প্রিতমদের সাথেই থাকুক। দেখুন আঙ্কেল, ওরা দু'জন ছোটো, এবং অতটাও সংসারী নয়। হুট হাট ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেলে। আমার মতে,একটি সংসারে একজন অভিভাবক খুব প্রয়োজন। এতে দম্পতি সংযত থাকে। মিস জেনি ওদের দু'জনের জন্য উপযুক্ত একজন অভিভাবক। আমি জন্ম থেকে দেখছি ওনাকে। আর কার কি মত জানি না, তবে আমার মতে সংসারে একজন মুরব্বি অবশ্যই থাকা উচিত। মিস জেনি ওখানেই থাকুক, আমাদের দুই বোনের মাথার ওপর তো আপনাদের হাত আছেই।”

প্রেরণা খুবই ধীরে ধীরে বলেছে কথাগুলো। রিতু আর ইলহাম মির্জা একে অপরের দিকে তাকায় হঠাৎ। অতঃপর আবার তাকায় বড় বৌমার মুখের দিকে। আজ দু'দিন ধরে খুব কাছ থেকে তারা দেখছে প্রেরণাকে, কথাবার্তায়, আচরণে যথেষ্ট বিনয়ী এবং শান্ত। তাদের ধারণামতে উদ্ধত এবং স্পষ্টবাদী নামের বেয়াদব নয়। দূর থেকে মেয়েটিকে কাঠকাঠ মনে হলেও মেয়েটি আদতে বেশ নমনীয়। রিতু চোখ নামিয়ে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলে,“হুম। তোমার কথা ঠিক আছে। ইশি ইনু দু'জনেই আদরে বড় হয়েছে, ওদের সাংসারিক জ্ঞান নেই। কিন্তু ইশি যথেষ্ট ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলাতে জানে,মুঈনও ধৈর্য্যশীল। তবে আমাদের ইনু একটু মেজাজী,ফট করে চেতে যাওয়া মেয়ে। মিস জেনি থাকুক ওর সাথে।”

বড়দের কথার মাঝে হঠাৎ শুদ্ধ আলাপ জুড়েছে ইহানের সাথে। আজ তিনদিনের ছুটি কাটিয়ে স্কুল যাবে সে, ইহান আঙ্কেল নিয়ে যাবে। এজন্য তার উত্তেজনার শেষ নেই। ওদের আলাপেই সকলের মনযোগ চলে যায়।

হঠাৎ শুদ্ধ খিলখিলিয়ে হেসে উঠে ইহানকে বললো,“আজ মিমিকে দেখাবো তোমাকে আঙ্কেল। ও অনেক দেখতে চায় তোমাকে। রিকুকে দেখাবো না, রিকু আমার সাথে কথা বলে না। ওর মাম্মা নাকি বারণ করেছে আমার সাথে কথা বলতে।”

রিতু আজ তিনদিন ধরে দেখছে শুদ্ধকে। ছেলেটা ইহানকে আঙ্কেল বলে ডাকে,বিষয়টা খুব চোখে বাঁধে রিতুর। বলবে না বলবে না করেও আজ বলেই ফেলে, সরাসরি ইহানের দিকে তাকিয়েই নিচু স্বরে স্পষ্ট করে বলে,“বাবার মতোই যখন ভালোবাসিস তবে ওকে আব্বু ডাকতে বলতে তো পারিস! আঙ্কেল আঙ্কেল কতদিন?”

থমকায় ওখানে খেতে বসা প্রত্যেকে। বিষয়টি তাদের ভাবনাতে তখনো আসেনি। রুটির বাটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেরণা শাশুড়ির দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়। ইহান জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে থামে।
আলো বলে ওঠে,“এখনি? একটু সময় না গেলে?”

রিতু ম্লান হেসে বলে,“অভ্যাস না করালে তো হবে না ভাবী! আমি চাইনা লোকজন আমার ছেলের কোনো সিদ্ধান্তের ওপর আঙুল তোলার সুযোগ পাক। বা এসব নিয়ে আড়ালে আবডালে মজা নিক।”

অস্বস্তিতে গাঁট হয় প্রেরণা। শাশুড়ির কথার জবাবে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারে না। আড়চোখে দেখে ইহানকে,ইহান মাথা নুইয়ে বসে আছে।

শুদ্ধ রিতুকে মেজো দীদু বলে ডাকছে। এতক্ষণ তার মেজো দীদুর কথা শুনে হঠাৎ অতটুকু মাথা দ্বিধান্বিত হয় বেশ, বললো,“আমি আঙ্কেলকে আব্বু কেন ডাকবো মেজো দীদু?”

এবার বাড়ির সবাই পরলো অস্বস্তিতে। ইহান বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চায় আপাতত,সে চায় প্রেরণা আর শুদ্ধ যেন অস্বস্তিতে না পরে কোনো। কিন্তু সামিন ইয়াসার মির্জা শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলে উঠলো,“তুমি ইহান আঙ্কেলকে আব্বু ডাকবে কারণ সে তোমার আব্বু হয়ে গিয়েছে তাই দাদু।”

_আব্বু হয়ে গিয়েছে কিভাবে?

শুদ্ধ বড় দাদুর দিকে গোল গোল চোখে চেয়ে আছে। সামিনের চোখে মুখে নেই কোনো জড়তা, আস্তেধীরে বলে,“কারণ সেদিন তোমার ইহান আঙ্কেল তোমার মাম্মাকে বিয়ে করে নিয়েছে। তোমার আব্বু হয়ে গিয়েছে। আমি যেমন তোমার দাদু হয়েছি, ওরা যেমন তোমার দীদু হয়েছে। এবং জানো, তোমার খালুও তোমার চাচ্চু হয়েছে, তোমার খালামনি হয়েছে তোমার চাচী। তোমার ইশি আর শেহু আন্টি হয়েছে তোমার ফুপ্পি। ইন্টারেস্টিং না?”

খেলার ছলে,মজার ছলে সামিন ছেলেটাকে স্বাভাবিক করতে চাইছে। কিন্তু শুদ্ধ হাসলেও বেশ কনফিউজড আসলে। সে তাকায় ইহান আঙ্কেলের দিকে। ইহান মলিন হেসে তৎক্ষণাৎ ছেলেটাকে কোলে তুলে নেয়। শুদ্ধ বলে,“তুমি সত্যিই আমার আব্বু হয়েছো?”

প্রেরণার চোখের পাতা কাঁপছে,সে তোলেনা দু'চোখ। সামিন গম্ভীর হয়ে ওদের দুজনকেই উদ্দেশ্য করে বলে,“আমি তোমাদের বুঝি। কিন্তু সবার আগে আমাদের প্রায়োরিটি হওয়া উচিত শুদ্ধ। জানো বেড়ে উঠতে উঠতে শুদ্ধ কতটা অপ্রস্তুত হবে বাইরের লোকের কাছে ওর আর তোমাদের সম্পর্ক ব্যখ্যা করতে করতে? তোমরা স্বাভাবিক করে নাও বিষয়টা এখুনি।”

প্রেরণা আর বলেনা কিছু। আলো বলে,“দেখো তোমার শশুর খুব একটা ভুল বলেনি।”

ইহান সামিনের কথা মন দিয়ে শুনে শুদ্ধর গাল ধরলো। কৌতুহলী শুদ্ধ তাকিয়ে আছে, ইহান নিচুগলায় ছেলেটাকে বললো,“তুমি বোঝো আব্বু মানে কি?”

শুদ্ধ দু'পাশে মাথা নাড়ে, সে বোঝেনা। ইহান আরো মিশিয়ে নিলো ছেলেটাকে, নরম গলায় বললো,“ঠিক আছে, যখন বুঝবে তখন ডাকবে।”

প্রেরণা মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে থাকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ইশি আলাপ তোলে অফিসের বিষয়ে। তখনের মতো বিষয়টি ধামাচাপা পরে যায়। ইহান উঠে শুদ্ধকে নিয়ে দোতলায় চলে যায়, প্রেরণাও যায় পিছু পিছু।

_________

“আজ কি পরবেন?”

আলমারির কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো প্রণমি। ইরফান সদ্য গোসল সেরে বেরিয়েছে সকাল সকাল। প্রণমির ডাকে ওর দিকে তাকায়,তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে নিতে নিতে বলল,“আজ নীল শার্ট।”

প্রণমি তৎপর হয়। তার মনে আছে বেশ, সাদা,আকাশী, ধূসর তারপর নীল রেখেছিল ডানদিক থেকে।

শার্টটা টেনে বের করতেই ইরফান থমকায়। প্রণমির হাতে নীল ছিল না, ছিলো নেভী ব্লু।

একপলক সেটি দেখে এগিয়ে গিয়ে আগলে নেয় মেয়েটিকে ইরফান,এক হাতে প্রণমির কোমর পেঁচিয়ে,আরেক হাতে ওর থেকে শার্টটা নিতে নিতে খুবই হালকা গলায় বলল,“যদি কারো হাত থেকে ভালোবেসে পাওয়া যায়, আমি নেভি ব্লু শার্টকেও নীল ভেবে পরে নেবো নির্দ্বিধায়!”

প্রণমি থম মেরে রইলো মিনিট খানেক। পর পর উচ্চশব্দে হেসে উঠলো। ইরফান সেই খিলখিল হাসি দেখতে লাগলো মুগ্ধতা ভরা দৃষ্টিতে। আগে হলে মেয়েটা বিষন্ন হতো, এই যে ছোট ছোট ভুল করলে ইরফান সাদরে সেসব মেনে নিচ্ছে,মেয়েটাকে ওর স্বাভাবিকতা বুঝিয়ে দিচ্ছে। এতেই হতাশা নামের ফাড়াটা হয়তো কাটছে প্রণমির।

প্রণমি হাসি থামিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বললো,“আবার ভুল হলো তাই না? আসলে ইদানিং মাথাটাতেও গন্ডগোল দেখা দিচ্ছে।”

ইরফান প্রসঙ্গ পাল্টে বলে উঠলো,“আজ ছায়ানটে যাবে? এক ঘেয়েমির জীবনে মাথায় গন্ডগোল হওয়াটা স্বাভাবিক।”

ম্লান হাসলো প্রণমি, বললো,“মা রাগ করবেন। সামনে রমজান মাস। মা কাল আমাকে, আপুকে আর ইনশিরাহ আপুকে আরবী শেখাতে এক ম্যাডাম ঠিক করে দিয়েছেন। এর মাঝে গান?”

ইরফান বিষয়টি শুনে চুপ হয়ে যায়। প্রণমির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“তুমি খুশি তো প্রণো?”

_এসব কি বলেন? অখুশির কি আছে? মা তো আমার মা। মায়েরা তো এমনই হয়। মা তো খারাপ কিছুই বলেনি। আর মা বলেছে, আরবীটা শিখে নেয়া উচিত। আর এটা শেখার পরে মা সব সিদ্ধান্ত আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছে,আমি প্রকাশ্যে গান গাইবো কি না তখন যেন সিদ্ধান্ত নিই। মা বলেছেন,তুমি সময় নিয়ে নিজের সাথে বোঝাপড়া করো।

ইরফান হঠাৎ খুব আদরে চুমু খায় প্রণমির কপালে, প্রণমির হঠাৎ গলা কেঁপে ওঠে, বলে,“জানি না আমার সিদ্ধান্ত কি হবে, আমি শুধু চাই আপনি আমাকে একটু সাহায্য করবেন সিদ্ধান্তটা নিতে। আমি একটা খুব সুন্দর জীবন চাই। যার রঙ আমি দেখতে হয়তো পাবো না, কিন্তু প্রতি ক্ষণে ক্ষণে আমি টের পাবো সেটাকে,যেমন করে টের পাচ্ছি আমার গাঁয়ে আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাস। আমার জীবন অন্ধকার হোক, কিন্তু আমি হাত বাড়ালে যেন সব শান্তি অনুভব করি,যা লোকে চোখেও দেখেনা।”

ভীষণ আবেগী মেয়েটার চোখ বেয়ে টুপটাপ জল ঝরে। ইরফান চুমু খায় ওতে, ভীষণ নরম গলায় বলে,“তোমার মনের ওপর আমার কখনোই জোর নেই প্রণমি। গান তোমার কাছে কি আমি জানি,যাই করবে, তুমি তোমার ইচ্ছেতে করবে।”

_মা বলেছে গান শুধুমাত্র আপনাকে আর বাড়ির লোকদের শোনাতে। মাকেও প্রতিদিন একটা করে শোনাতে। আমার এতেই হবে।

ইরফান ঠিক তখন বুঝতে পারছিলো না মেয়েটাকে, বোকার মত বলে উঠলো,“তোমার দুনিয়াটা কি ছোটো হয়ে গেল প্রণো?”

দু'পাশে মাথা নাড়ে প্রণো চোখ মুছে, বলে,“আমার দুনিয়াটা সবার থেকে বড় হয়ে গেলো। আগে অধিকার দেখানোর দু'জন মানুষ ছিলো। দিনে দিনে কতজন হয়ে গেলো দেখুন তো!”

___________

শুদ্ধকে রেডি করানোর সময় প্রেরণার ফোন বেজে ওঠে। শুদ্ধকে ওর ঘরে রেখে প্রেরণা ছুটে যায় নিজের ঘরে, ইহান তখন রেডি হচ্ছিল। প্রেরণা গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে বারান্দায় চলে যায়। আজ রেস্তোরাঁর স্টাফদের স্যালারি ডে। তাই একটু ব্যস্ত সে।

শুদ্ধ মায়ের পিছু পিছু ও ঘরে ঢুকে বললো,“মাম্মা আমার টাই বেঁধে দাও!”

ইহান পাঞ্জাবির বোতাম লাগিয়ে নিয়ে ঘুরে তাকায় প্রেরণার দিকে, প্রেরণা ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত ভীষণ। ইহান শুদ্ধকে বললো,“মাম্মা ব্যস্ত। আমি দেই?”

শুদ্ধ মাথা নাড়ায়। ইহান ঝুঁকে বসে ছেলেটার সামনে। নেভি ব্লু রঙের টাইটা গলায় বাঁধছে খুব যত্নে। অমন সময় প্রেরণা বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে দেখলো এই দৃশ্যটা। সে থেমে রইলো, অনিমেষ চেয়ে রইল।

পর পর যখন ইহানের চোখে চোখ পরলো তখন প্রেরণা মাথা নিচু করে সংকোচ লুকিয়ে বললো,“ওকে প্লিজ ওর কথামত এটা সেটা কিনে দেবেন না আজ। বড্ড বিগড়েছে।”

ইহান উঠে দাঁড়িয়ে হাসলো, বললো,“এটাই তো সুন্দর। আমি একটু বিগড়ে দেবো, আপনি একটু ম্যানার্স শিখিয়ে দেবেন। বেটা ব্যালেন্সড থাকবে। দুটোর একটাও বেশি হওয়া ঠিক নয়।”

শুদ্ধ স্কুল ব্যাগ নিতে ছুটে চলে যায় ওর ঘরে। প্রেরণা তাকিয়ে দেখছে ইহানকে, হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বলে ওঠে,“আপনি শাল নিবেন নাকি কোট? কোনটা বের করবো?”

ইহান ফোনটা হাতে তুলে নিতে নিতে চোখ বড় বড় করে তাকায় ফর্সা স্নিগ্ধ মুখটার দিকে। খানিক সময় থেমে থেকে বলে,“কোট।”

প্রেরণা মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে গিয়ে আলমারি খোঁজাখুঁজি করছে। খুঁজে খুঁজে একটা কালো কোট নামিয়ে ঘুরতেই দেখে ইহান অতি সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃদু কেঁপে উঠে পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করছে প্রেরণা,বলে,“কালোটা?”

ইহান চুপচাপ কোটটা নিলো। প্রেরণা তোলে না চোখ, লজ্জা আর আড়ষ্টতার প্রকোপে জমে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয়, আলমারির সাথে মিশে। ইহান কোটটা পরে নিতে নিতে বললো,“আজ রেস্তোরাঁয় যাওয়ার খুব বেশি প্রয়োজন না হলে যাওয়ার দরকার নেই। বা আমাকে বলুন কোনো হেল্প লাগলে। আপনাকে ক্লান্ত লাগছে।”

দৃষ্টি তোলেনা প্রেরণা, ধীরে ধীরে বলে,“প্লিজ আমাকে আপনি ডাকবেন না।”

একটু থেমে বলে,“আসলে। স্যালারি শীট টা পাঠিয়ে দিয়েছি সাব্বিরকে, টাকাটা এবার আমার একাউন্ট থেকে পাঠিয়ে দেবো। আপনার যেতে হবে না।”

প্রেরণার দিকে ইহানের মনযোগী দৃষ্টি, ধীরে ধীরে বললো,“কিছুদিন বিশ্রাম নিন। এর মাঝে যদি হেল্প লাগে তবে একজন লোক রেখে দিন বা আমি আছি।”

প্রেরণা মাথা নুইয়ে রেখেই চুপচাপ মাথা নাড়ে। শুদ্ধ আসে স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে। ইহান ওর হাত ধরে চলে যায়।

পায়ের পাতার নখে নিবদ্ধ প্রেরণার দৃষ্টি জোড়া। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসির রেখা তার। ইহানের বলা “আমি আছি” কথাটা গেঁথে থাকে মস্তিষ্কে দীর্ঘসময়।

হাঁফ ছেড়ে প্রেরণা হুশে ফিরে আশেপাশে তাকায়। ঘরটা অগোছালো। শুদ্ধ সকালে এসে এই রুমে ক্রিকেট খেলেছে ইহানের সাথে তাই। লাল শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে সাত সকালে প্রেরণা গোটা ঘরটাই গুছিয়ে ফেলে, একবার গোছাতে গিয়ে টের পেলো তার পছন্দ হচ্ছে না। আবার এলোমেলো করে আসবাব এপাশ ওপাশ করে দেখে, পর পর নিজেই নিজের কান্ডে হেসে ফেলে। এ কেমন চঞ্চল হলো তার মন!

ঘর গুছিয়ে প্রেরণা ঘরের পশ্চিম কোণে তাকায়, ওখানে গতকাল একজন কার্পেন্টার ডেকে একটা চেঞ্জিং কর্ণার বানিয়ে দিয়েছে প্রেরণার জন্য ইহান তাজওয়ার মির্জা। বিয়ের পরেরদিনের একটা লজ্জার ঘটনা মনে পরে যায় প্রেরণার। হঠাৎ চেঞ্জ করার মাঝে ঘরে ঢুকে পরেছিল ইহান। দু'জনেই অপ্রস্তুত হয়ে কথা হারিয়ে চেয়ে থেকেছিলো দু'জনের দিকে। ঐ লোকটা ঐ ঘটনার পরে গিয়ে এই কান্ড করেছে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একা একা হেঁসে ফেলে প্রেরণা। সত্যি এমন লোকও আছে পৃথিবীতে? কৌতুকের হাসি খানিক বাদে মিলিয়ে গিয়ে প্রেরণার ঠোঁটে ভর করে মুগ্ধতার হাসি। হয়তো আছে, এই একজনই হয়তো আছে। যে আছে শুধু প্রেরণার জন্য।

দোতলার লিভিং রুমে তখন লেবু চায়ের আসর বসেছে। প্রণমি,ইশি আর আলো রিতু। প্রেরণা দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো তাদের। আসলে প্রণমির মতো অতটা নৈকট্য তো হয়নি এ বাড়ির মহিলাদের সাথে তার। তাই খুব সংকোচ তার আগ বাড়িয়ে গিয়ে আড্ডা দিতে। এমন সময় রিতুর চোখে পরে যায় প্রেরণাকে,প্রেরণা ওভাবে উঁকি মেরে তাদের দেখছে দেখে রিতু বেশ অবাক হয়। আবার হঠাৎ করে তার হাসিও পায়। মেয়েটি গম্ভীর হলেও একটু বাচ্চাসুলভ,মাঝে মাঝে ধরা পরছে রিতুর চোখে।

কন্ঠের গম্ভীরতা বজায় থাকে রিতুর, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে,“ইহান ঘরে ছিলো তাই ডাকিনি, ভেবো না আমি ছোটো বৌমাকে বেশি ভালোবাসি। আসলে ভালো কাউকেই বাসিনা। ফ্ল্যাক্সে তোলা আছে তোমার চা। খেলে এসো। রান্না করতে যাবো একটু পর।”

চলমান.....

[ একটু দিলাম। আসলে আসছে না লেখা। একটু সময় নিয়ে নিয়ে লিখলে হয়তো পারবো। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 128 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন