#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২৯
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
রান্নাঘরে ব্যস্ত সময় পার করছিলো তখন প্রেরণা। প্রথম দুইটা পদ তার দুই শাশুড়ি করলেও মাছের পদ দু'টো প্রেরণা করে। এ বাড়িতে তার হাতের মাছ রান্নাটা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। প্রেরণার রাঁধতে খুব আগ্রহ জাগে কেউ যখন তার রান্না খুব আয়েশ করে খায়। ব্যস্ততার জীবনেও সে সবসময় মুখিয়ে থাকে ঘরের কাউকে রেঁধে খাওয়াতে। পাশে দাঁড়িয়ে কারো খাওয়া দেখতে।
রান্নাঘরে ও যখন একা ব্যস্ত ছিলো, প্রণমি গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে বললো,“আপু মা জানতে চেয়েছে আর কোনো হেল্প লাগবে কিনা!”
হাসে প্রেরণা,বলে,“কে হেল্প করবে। তুই?”
_হ্যা আমাকে শিখিয়ে দিলেই হয়। হাতাহাতি করে ঠিক পারবো। ইরফান মির্জা তো সবসময় কথা শোনায় আমাকে, বলে তুমি আর ভাইয়া আমাকে বিগড়ে রেখেছো। নয়তো আমি সব কাজ পারি।
এবার বেশ শব্দ করেই হেঁসে ওঠে প্রেরণা। বলে,“হ্যা তোর বর ঠিক বলেছে। তোকে বিগড়ে রেখেছি যাতে সে শুধরে নিতে পারে! আয় তোকে দিয়ে কাজ করাই।”
প্রণমিকে টেনে প্রেরণা সিঙ্কের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে হাতে তুলে দিলো ডিশ ওয়াশার। বললো,“নে হাতরে হাতরে সব কড়াইয়ে ভিম লিকুইড মাখ ঘঁষে ঘঁষে, আমি রান্না শেষে ধুয়ে নেবো। আজ শানুর মা আসবে না, এগুলো আমাদের করতে হবে।”
প্রণমি ভীষণ উৎসাহী ভঙ্গিতে কাজটা করতে লাগলো। প্রেরণা আড়চোখে বোনকে কয়েক পলক দেখে মাছ উল্টে বলে,“বর কি খুব বেশি ভালো বাসে রে?”
লজ্জা পায় প্রণমি আপুর কথায়। ইরফান মির্জা তার জন্য পাগল, একথা এতো ঢোল পেটাতে ইচ্ছে করে না প্রণমির। প্রেরণা আর বোনের লজ্জা বাড়ায় না, মিটিমিটি হেসে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“যা হয়েছে আর কাজ করতে হবে না, আর কল করে জেনে আয় তোর বর আজ লাঞ্চে বাড়িতে আসবে কি না! তার জন্য তো আবার ফ্রিজ থেকে বিফ নামিয়ে গরম করতে হবে। অন্যকিছু তো খেতে চায়না!”
রিতু তখন রান্নাঘরে পা রেখেছিল মাত্র, বড় বৌমার মুখে তার ছোটো ছেলের পছন্দের কথা শুনতে পেয়ে ভীষণ আপ্লুত হয়। এক সময় রিতু জোর দিয়ে বলেছিল এই মেয়ে পারবে না সংসার আপন করতে, কিন্তু মাত্র তিন দিনে রিতু দেখছে এই মেয়ে শুধু সংসার নয়, সংসারের প্রতিটি ব্যক্তির পছন্দ অপছন্দ খেয়াল রাখছে। মনে রাখছে একবার শুনেই। গা ছাড়া ভাব নেই।
রিতু জানে না চার দেয়ালের মাঝে কি হয়, জানে না তার ছেলে আর ছেলের বৌয়ের সংসার কতটা হয়, তবে বুকের মাঝে ক্ষীণ আশার আলোটা ধীরে ধীরে প্রজ্বলিত হচ্ছে তার। যেমন থাকুক,এই মেয়ে যত্ন,আবেগ আর ভালোবাসার চাদরে তার ছেলেটাকে মুড়িয়ে রাখুক।
________
পার্টির কাজ সেরে এক সেকেন্ডও অফিসে থাকেনি ইহান। শুরুতে নেমে এক মিনিটের জন্য উঁকি মেরেছিল স্বাদে আহ্লাদের ক্যাশ কাউন্টারে। ওকে দেখেই ম্যানেজার সাব্বির লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সবিনয়ে সালাম দিলো, বাকি স্টাফরা ব্যস্ত হয়ে পরলো তাদের ম্যাডামের হাজবেন্ডকে আপ্যায়ন করতে, রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল।
ইহান সবাইকে থামিয়ে শুধুমাত্র সাব্বিরকে ধীরস্থির বলল,“তোমার ম্যাডাম মাস খানেকের জন্য বিরতি নিচ্ছে। বিজ্ঞাপন দিয়ে একজন সহকারী রাখো তোমার। আর যে কোনো অসুবিধা আমাকে জানাতে পারো। আমি দেখে দেবো।”
ওখান থেকে বেড়িয়ে গাড়ি নিয়ে ইহান সোজা ছুটে যায় শুদ্ধর স্কুলের সামনে, ততক্ষণে শুদ্ধর স্কুল ছুটি হয়েছে। বাচ্চাটা ওয়াটার বোতল হাতে ঝুলিয়ে, ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে চঞ্চল দৃষ্টিতে আশেপাশে ইহানকেই খুঁজছিল। তাকে ইহান বলে গিয়েছে ছুটির পরে এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষা করতে।
ইহান গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা পার হয়ে গিয়ে কোলে তুললো ওকে। শুদ্ধ হাসলো। পাশ থেকে তখন মিমির মা যাচ্ছিলেন, ইহানের কোলে শুদ্ধকে দেখেই দাঁড়িয়ে বললেন,“আরেহ তাজওয়ার মির্জা! ওহহ আমি শুনেছি শুদ্ধর মা আর আপনার ব্যাপারে। অভিনন্দন, অভিনন্দন।”
ইহান হেসে ধন্যবাদ জানালো ভদ্রমহিলাকে। এর মাঝে শুদ্ধর ক্লাস টিচার রিতা ম্যামও এলেন। ইহান আর শুদ্ধকে দেখে এক গাল হেসে বললেন,“তো শুদ্ধর অভিভাবক তাজওয়ার মির্জা! এবার থেকে সব নালিশ আপনাকেও জানাবো!”
_জি! দুষ্টুমি করলেই আমাকে কল করবেন।
শুদ্ধ মুখ ভার করে ফেলে। চোখ সরু করে ইহানের দিকে তাকায়,বলে,“আমি দুষ্টুমি করি না ইহান আঙ্কেল!”
মিমির মা সামান্য হেসে শুদ্ধকে বলে,“আঙ্কেল নয়, আব্বু তো এটা বেটা! কল হিম আব্বু?! ”
শুদ্ধ আর ইহানের আবার চোখাচোখি হয়, ছেলেটার দ্বিধান্বিত মুখটা দেখে ইহান মলিন হেসে মিমির মা আর রিতা ম্যামকে বলে,“আচ্ছা বাই! প্লিজ এক্সকিউজ আস!”
গাড়িতে বসিয়ে সিটবেল্ট যখন বেঁধে দিচ্ছিল ইহান, শুদ্ধ হঠাৎ ভাবুক দৃষ্টি মেলে অস্ফুটে বললো,“আমি আব্বু ডাকবো তোমাকে?”
ইহান থমকায়। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, পর পর স্মিত হেসে বলে,“তুমি আব্বু মানে জানো?”
শুদ্ধ দু'পাশে মাথা নাড়ে আবারো। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ইহান সেই একই সুরে বলে,“যখন বুঝবে আব্বু মানে কি তখন ডেকো!”
কলিং বেল বাজতেই প্রেরণা ছুটে গিয়ে দরজা খুললো। বাকিরা সবাই তখন খেতে বসেছে। ইরফানও এসেছে ততক্ষণে।
শুদ্ধ দু'হাতে ললিপপ নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরে ঢুকছে, ওর স্কুলব্যাগ ইহানের হাতে। প্রেরণাকে দেখেই গাল ভরে হাসলো ইহান।
“দুষ্টুমি করেনি তো? বিরক্ত করেনি তো?”
উৎকণ্ঠা প্রকাশ পায় প্রেরণার প্রশ্নে। ইহান হালকা স্বরে বললো,“হ্যা খুব বিরক্ত করেছে। এখন আপনি প্লিজ ম্যানার্স শিখিয়ে দিন খানিক সময়।”
দূর থেকেই রিতু শুনতে পেলো সব, চোখ কপালে তুলে ছেলেকে ধমকালো সে,“বৌকে আপনি আজ্ঞে কি করছিস? লোকে কি বলবে?”
সংকোচে অবনত হয় প্রেরণার চোখ। লোকটাকে এতবার বলেও পারা গেলো না। মায়ের কথায় ইহান এবার হালকা হেসে বলে,“কিছু তো লোকে বলবে! লোকে বলবে, তাজওয়ার মির্জা তার বৌকে খুব সম্মান করে।”
ওর মস্করা শুনে খেতে খেতে হেসে ফেলে ইরফান আর ইনশিরাহ। রিতু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
প্রেরণা মুখ বাঁচিয়ে শুদ্ধর হাত ধরে দোতলায় ওঠে। ইহানও মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দোতলায় ওঠে।
ইলহাম তখন রিতুকে বলে,“সব বিষয়ে খবরদারি করো না। একটু সময় দাও।”
_হ্যা সব আমিই দেবো। দিলাম। বিয়ে করবো বিয়ে করবো বলে পাগল হয়ে গেল,এখন আপনি আর আজ্ঞে। ভালোই লাগছে শুনতে! বৌকে বলছে আপনি!
_________
শুদ্ধকে নিয়ে ওর ঘরে ঢুকে শুদ্ধর ড্রেস পাল্টে দিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকিয়ে দেয় প্রেরণা। তাড়া দিচ্ছে ছেলেটাকে,“সবাই খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছে। চলো তাড়াতাড়ি।”
শুদ্ধও গোসল সেরে ঝটপট পোশাক পাল্টে নেয়, ছেলেটার মাথা মুছিয়ে দিতেই হঠাৎ প্রেরণা লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় কিছু একটা মনে পরে যেতেই। শুদ্ধকে নিচে গিয়ে ডাইনিং হলে বসতে বলে প্রেরণা ছুটতে ছুটতে ঢুকলো নিজের ঘরে, এমন ভাবে ছুটলো যে রীতিমতো হাঁপানি উঠেছে মেয়েটার।
ইহান সদ্য গোসল সেরে বেরুতেই থমকাল। থমকাল প্রেরণাও। দু'জন দু'জনকে দেখছে চোখ বড় বড় করে। ইহান দেখছে প্রেরণার চঞ্চলতা, হাঁপানি আর প্রেরণা দেখছে ইহানের উদোম শরীরে বুকের নিচে আর বাহুতে কালসিটে দাগ দু'টো, যা খুব সম্ভবত গুলির দাগ।
চোখ নামিয়ে নেয় প্রেরণা, হাঁসফাঁস করে ওঠে। ইহানও ঘোর থেকে বেড়িয়ে আরেকটা তোয়ালে গলায় ঝুলায়। ঢেকে নেয় উন্মুক্ত শরীর। সে বারবার ভুলে যায় এই ঘরটাতে তার প্রাইভেসির দখল এখন এক নারীর কাছে বর্তমানে।
প্রেরণা কি করলো! দ্রুততার সাথে ইহানের আলমারি খুলে ওর জন্য ধোয়া ঘরের পোশাক বের করতে লাগল। মূলত এজন্যই এভাবে ছুটতে ছুটতে এ ঘরে আসা।
একটা নীল রঙের ফুল স্লিভ টি শার্ট আর কালো ট্রাউজার বের করে ইহানের দিকে না তাকিয়েই বাড়িয়ে ধরলো প্রেরণা, নিচু স্বরে বলল,“এগুলো কাল ধোঁয়া হয়েছে।”
ইহান মিটিমিটি হেসে নিলো ওগুলো। প্রেরণা হাতে শাড়ির আঁচল মোচরাতে মোচরাতে বলতে থাকে,“আপনি দুপুরে দেরি করে খান, আমি কি শুদ্ধকে খাইয়ে অপেক্ষা করবো?”
খুব স্বাভাবিক প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে ইহান বললো,“এভাবে ছুটতে ছুটতে এলেন কেন? এই একটা পোশাক বের করে না দিলে কি আমাদের দাম্পত্যে কমতি পরে যাবে? আমার ভাগে আপনার কর্তব্য কমতি পরে যাবে?”
প্রেরণা জবাব দেয়না। ইহান হঠাৎ দুষ্টু হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে খুবই ঠাণ্ডা গলায় বলে,“ওয়াশ রুমে বালতিতে আমার পাঞ্জাবি তিনটা ভিজিয়ে রাখা!”
প্রেরণা তৎক্ষণাৎ নিচু স্বরে বলে,“জি।”
বলেই এগিয়ে যায় ওয়াশ রুমের দরজার দিকে। ইহান চোখ কপালে তুলে অকস্মাৎ পেছন থেকে টেনে ধরলো প্রেরণার একটা হাত। চমকে ওঠে প্রেরণা, দৃষ্টি তুলে দেখে ইহানকে। ততক্ষণে ইহান তার আরেকটা হাত ধরে পুরোপুরি আটকে দিয়ে টেনে নিয়েছে নিজের কাছে। গাঢ় চোখের দৃষ্টি নীল দু'টো চোখে,খুব কাছ থেকে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,“এই মজা করেছি! মজা করেছি প্রেরণা! ডোন্ট টেইক ইট সিরিয়াসলি!”
সদ্যস্নাত পুরুষালি শরীরটা থেকে কড়া ম্যান শ্যাম্পুর ঘ্রাণে প্রেরণার সত্তা দুলে উঠলো, আর ওই ধরে রাখা রুক্ষ পেশিবহুল হাত দুটো তাকে জমিয়ে দিলো। তবুও প্রেরণা চেষ্টা বলে নড়েচড়ে ওঠে, এলোমেলো দৃষ্টি নামিয়ে আবার দৃষ্টি তুলে তাকায় মানুষটার দিকে। চোখে মুখে সেই গম্ভীরতা নেই, খুব প্রাণোচ্ছল লাগছিল ইহানকে।
তবে এবার প্রেরণা মুগ্ধ হয়না, উল্টো কপাল কুঁ'চ'কে চাপা স্বরে বলে,“আপনি পাগল? এগুলো তো আমার কাজ!”
প্রেরণার হাত ছাড়লো ইহান তখনই। তাকিয়ে রইল নিস্পন্দ চোখে। প্রেরণা লোকটাকে আর পাত্তা না দিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে তিনটা পাঞ্জাবি নিংড়ে ঝুঁড়ি ভরে বেলকোনিতে এনে মেলে দেয়।
ইহান চুপচাপ তখন নিজের পোশাক পরে নেয়। খোলা বারান্দায় মেলে দেয়া ছিলো প্রেরণার শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিলো সকাল এগারোটার পর থেকে, এতক্ষণে হঠাৎ ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হতেই প্রেরণা ইহানকে বললো,“আপনি নিচে যান, আমি কাপড় তুলে রেখে আসছি।”
ইহান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বারান্দার দরজার কাছে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,“আনছি আমি। ওগুলো খুব সম্ভবত আমার কাজ।”
প্রেরণা চোখ কপালে তুলে উঁকি দেয় বারান্দায়, ইহান ততক্ষণে শুধুমাত্র শাড়িটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। সায়া ব্লাউজে হাত দিতে সংকোচ হচ্ছে তার। প্রেরণা পাঞ্জাবি গুলো মেলে দিয়ে ছুটে বারান্দায় যায়। দেখলো ইহানের হাতে দলা পাকিয়ে আছে তার শাড়িটা। ইহান বোকার মতো একপলক প্রেরণাকে দেখছে, একপলক দেখছে প্রেরণার সায়া ব্লাউজ। পর পর খুব গাম্ভীর্য নিয়ে বলে,“কিছু কাজ ভাগাভাগি করে করতে হয় সম্ভবত। আপনি বাকিটা তুলে আনুন।”
এতো জোরে হাসি পেলো প্রেরণার,কিন্তু হাসলো না। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে মাথা ঝাকালো শুধু।
ইহান চলে যায় লম্বা কদমে, ততক্ষণে প্রেরণা নিজের বাকি পোশাক গুলো তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে হাঁফ ছাড়ে, বিড়বিড় করে বলে,“আপনি কাজটা এক হাতে করে দিলেও আমি কিছুই বলতাম না ডিসেন্ট মির্জা। আপনি অহেতুক ভদ্রলোকিপনা দেখান।”
_________
বিকেলে ঘরের দরজা বন্ধ করে রুমের ভেতর ছিল ইহান প্রেরণা। তবে দূরত্ব ছিল দু'জনের। দু'জনেই দু'টো ল্যাপটপ নিয়ে যে যার কাজ করছিল। দোতলার লিভিং রুম থেকে শুদ্ধর খিলখিল হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। সামিনের সাথে বল খেলছিল ও। এ বাড়িতে আসার পর থেকে শুদ্ধর খেলার সাথীর অভাব নেই। একটা দাদুকে ধরে খেলার জন্য,খানিক বাদে সেই দাদু যখন ক্লান্ত হয়ে বলে,“কোমর ব্যাথা হয়ে গেলো দাদু এবার মাফ করো।”
তখন গিয়ে আরেক দাদুকে ধরে। এবং এভাবেই কাটছে শুদ্ধর দিনগুলো।
কিছু হিসেব কষে প্রেরণা হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় ল্যাপটপ রেখে, তাড়াহুড়ো লাগিয়ে ইহানকে নিচু গলায় বলে,“আমি একটু বাজারে যাবো!”
ইহান ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলে,“জি অবশ্যই।”
প্রেরণা দ্রুত শাড়ি নিয়ে চেঞ্জিং কর্ণারে ঢুকে শাড়িটা পাল্টে নেয়। তবে বেরুতেই দেখলো ইহান পাঞ্জাবি পরে পুরো রেডি। হাত ঘড়ি পরে নিতে নিতে বললো,“চলুন। গাড়ি নেবো?”
প্রেরণা দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলো মানুষটাকে। পরপর চোখ নামিয়ে হাসলো মুচকি হাসি। লোকটা জানতেও চাইলো না প্রেরণার কি কাজ,শুধু মাথায় রাখলো যে কাজই থাকুক তার যেতে হবে তার স্ত্রীর সাথে।
প্রেরণা মৃদু শ্বাস ফেলে ড্রয়ার থেকে নিজের কার্ড বের করে নিতে নিতে বললো,“আমাদের পরিবারে সব সদস্য বাদে কাছের মানুষ বলতে শুধু নিজাম দাদু আছে তাইনা?”
ইহান মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,“হুম। কেন?”
_আজ স্যালারি তুললাম। আমি তো এ বাড়ির কাউকে কিছু দিইনি। সবার জন্য কিনবো। তো নিজাম দাদু ছাড়া আর কেউ থাকলে তাকেও দেবো।
_নাহ আর কেউ নেই।
প্রেরণা লিস্টে নিজাম দাদুর নামটা টুকে নেয়। তাড়াহুড়ো করে বলে,“চলুন। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। ইশিকে আজ ডাক্তারের কাছে নেবে, কি রিপোর্ট আসে কে জানে!”
_________
শুদ্ধকে বাড়ির সবার কাছে রেখে ওরা বেরুলো। প্রেরণা শশুর বাড়ির সবার জন্য শপিং করলো উন্মুক্ত হাতে। তার তিন শাশুড়ির জন্য তিনটা কাতান শাড়ি, শশুর,চাচা শশুর আর ফুপা শশুরের জন্য চারটা পাঞ্জাবি সেট। তার তিন ননদের জন্য তিনটা সালোয়ার স্যুট। তার দেবর আর ননদাইদের জন্য শার্ট, প্রণমির জন্য একটা লাল শাড়ি। প্রিতমের জন্য পাঞ্জাবি।
দু'হাত ভর্তি হয়ে গিয়েছে ইহানের শপিং ব্যগে। সে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু প্রেরণার উদ্যমতা দেখছিলো।
অবশেষে প্রেরণা এসে থামলো একটা শপের সামনে। ম্যানিকুইনের পরনে একটা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। সাদা পাঞ্জাবি আর ইহান একে অপরের জন্য তৈরি । তবে এই পাঞ্জাবির ডিজাইনটা খুব আলাদা। ভীষণ চোখে লেগেছে প্রেরণার। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রেরণা ইহানকে দেখলো, বললো,“কষ্ট করে একটু ট্রায়াল দেবেন? দেখে নিতাম! এটা আপনাকে গিফট করতে চাই!”
ইহান সামান্য হেসে মাথা ঝাঁকায় ! ব্যগ গুলো রেখে ট্রায়াল রুমে গিয়ে পাঞ্জাবিটা পরে এসেই যখন প্রেরণার মুখোমুখি দাঁড়ালো, প্রেরণা চেয়ে থাকলো একদৃষ্টে। ওর দৃষ্টি বেহায়া হলো কিছুক্ষণের জন্য। চোখ নামিয়ে নিচু গলায় বললো,“এটা থাকুক গাঁয়ে?”
ইহান চুপচাপ প্রেরণার সবকিছু মেনে নিচ্ছে। সংসার জীবনের শুরুর এই স্নিগ্ধতা টুকু সে দু'হাতে লুফে নিচ্ছে চুপচাপ।
শপিং শেষে ব্যাগ গুলো গাড়িতে রেখে প্রেরণা বললো,“এখন একটু নিউ মার্কেট নিয়ে যান আমাকে।”
_নিউমার্কেট কেন?
_আসলে আমার কিছু টোট ব্যাগ নিতে হবে। ওখানে কারুশৈলী নামে একটা হস্তশিল্পের দোকান আছে। ওখান থেকে নেবো।
মোট সাত-আটটা টোট ব্যাগ পছন্দ করার পরে প্রেরণা তর্ক জুড়ে দিয়েছে দরদাম নিয়ে। এতক্ষণে ইহান হতভম্ব হয়ে প্রেরণাকে দেখছে, এই ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ আগেই এক দামের দোকান থেকে মোট সাতাশ হাজার টাকার শপিং করে এখন চার হাজার টাকার ব্যাগ চারশো টাকায় চেয়ে ঝগড়া করছে?
ইহান অপ্রস্তুত হয়ে আশেপাশে তাকায়। সে সতর্ক চোখে দেখছে লোকজন তাদের লক্ষ্য করছে, মিটিমিটি হাসছে সবাই। ইহান তাজওয়ার মির্জা শহরের পরিচিত মুখ। ইহান তাজওয়ার মির্জার স্ত্রী নিউমার্কেটে দামাদামি নিয়ে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করছে এটা লোকের কাছে খুবই মজার একটি বিষয়। এমন কেউ নেই যে যেতে যেতে ওদের দেখছে না।
ইহান মান বাঁচাতে শুধু পাশ থেকে একবার বললো,“আমি পে করি এটা? অহেতুক এনার্জি খরচ করার কি দরকার প্রেরণা বলুন? জিতলে জিতে যাক!”
প্রেরণা পাত্তা না দিয়ে তর্ক চালিয়ে যেতে থাকলো, এবং খুব আশ্চর্যের বিষয় সে জিতেও গেলো।
মুখ ভর্তি বিজয়ী হাসি নিয়ে প্রেরণা ঐ গলি থেকে বেরুলো, ইহান ওর পাশেই হাঁটছে। দু'জনের হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ। আজ নিউমার্কেটে বেশ ভিড়, ওদেরকে ভিড় ঠেলে হাঁটতে হচ্ছে। গলির রাস্তাতে গাড়ি ঢুকে অহেতুক যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছে। প্রেরণা এতক্ষণে বলে উঠলো,“স্যরি আমি না খুব দরদাম করি।”
ইহান বললো,“না না। স্যরি বলার কিছু নেই। চার হাজার টাকার ব্যাগ চারশো টাকায় চেয়ে আপনি যখন খুশি তখন আমার ইজ্জতের ফালুদা করতে পারেন, ইফ ইউ ওয়ান্ট।”
হাসলো প্রেরণা লজ্জিত ভঙ্গিতে, রক্তিম হলো গাল, বাচ্চাদের মতো করে বললো,“আমি কি করবো? ওরা বেশি দাম হাঁকায়। অতিরিক্ত!”
ঠিক তখনই একটো অটো সাই করে ওদের পাশ ঘেঁষে গেলো। ঘটনাটা ঘটেছে চোখের পলকে, প্রেরণা আঁতকে ওঠে, বিকট আর্তচিৎকার বেড়িয়ে যায়। ওর হাতের শপিং ব্যাগ গুলো রাস্তায় পরলো, আর হাঁপাতে থাকলো ও।
মিনিট ফুরোতেই চোখ খুলে দেখলো শক্ত হাতটা তাকে আগলে নিয়েছে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই, তাকে টেনে বাম পাশ থেকে ডান পাশে এনেছে। নিজেকে সুরক্ষিত আবিষ্কার করে যখন স্বস্তির শ্বাস ফেললো প্রেরণা, ঠিক তখন আবারও একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠলো, চোখ দু'টো বিস্ফোরিত তার ইহানের ডান হাতটা দেখে। চলন্ত অটোর সাথে ঘর্ষণ লেগে ছাল উঠে রক্ত বেরুচ্ছে। প্রেরণা সরে গেলো লোকটার থেকে, আগলে নিলো ওর হাতটা। উৎকণ্ঠায় ছটফটিয়ে উঠতেই ইহান ওকে থামিয়ে দিল,“রিল্যাক্স! কিছুই হয়নি। ছিলেছে শুধু।”
হতভম্ব ভঙ্গিতে প্রেরণা আশেপাশে তাকায়, অদূরেই একটা মেডিকেল শপ। ইহানকে একপ্রকার টানতে টানতে নিয়ে গেলো সেখানে। ইহান তাজওয়ার মির্জাকে দেখে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পরলো মেডিকেল শপের কর্মচারীরা। হাতে ব্যান্ডেজ করে ওরা গাড়িতে গিয়ে বসলো, প্রেরণার উৎকণ্ঠা কাটছেই না ইহানের হাতের জন্য, কাঁপছে তার গলা। লোকটার চোখে চোখ রেখে বললো,“আজ এখানে না এলে এসব হতো না।”
হাসলো ইহান, বললো,“এসব হওয়ার কারণে যা যা হলো, সেসব হওয়ার জন্য এটা হওয়ার হয়তো দরকার ছিলো।”
এতো হেয়ালি প্রেরণা বুঝতে পারে না। বাড়িতে ঢুকে গিফট গুলো ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে রেখে ইহানের পিছু পিছু দোতলায় উঠলো। বাড়ি ফাঁকা তখন, সবাই ছিলো ছাদে। দোতলায় ছিলো রিতু, ছেলের হাতে ব্যান্ডেজ দেখে জানতে চায় কি হয়েছে। প্রেরণা হড়বড় করে সবটা বললো। রিতু যতটা না ছেলের দুর্ঘটনার ব্যাপারে শুনলো, ততটা মনযোগী হলো কথা বলার সময় প্রেরণার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করতে।
খুব আবেগী বয়সে এই মেয়ে তার ছেলের বৌ হয়নি, রিতু তাই দেখছিলো স্বামীর ব্যাথায় কতটা মরমী এই মেয়ে। সাদা মুখটা লাল হয়েছে উৎকণ্ঠায়,রিতুর নজর এড়ায়নি তা। ভেতরে ভেতরে স্বস্তির শ্বাস ফেলে প্রেরণাকে বললো,“আচ্ছা বুঝলাম, যাও গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে নিচে এসো। ওদিকে মুঈন তখন কল করে বললো ইশিটা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরেছে রেডিওলজি রুমে। আমি ভাবীর সাথে হসপিটাল যাবো, তুমি এদিকটা দেখো।”
শাশুড়ির কথায় মাথা ঝাঁকিয়ে প্রেরণা ঘরে ঢুকলো, দেখলো লোকটা ব্যান্ডেজ করা হাতেই পাঞ্জাবির বোতাম খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। প্রেরণাকে দেখে বললো,“আমি ইশির কাছে যাবো। আপনি গিফট গুলো তুলে রাখুন, সবাই ঠান্ডা হলে দেবেন। আজ এই এলোমেলো পরিস্থিতিতে দেওয়ার দরকার নেই।”
প্রেরণা ওসবের জবাব না দিয়ে দ্রুত গিয়ে ইহানের পাঞ্জাবির কলার থেকে ওর ব্যান্ডেজ করা হাতটা সরিয়ে দেয়, কন্ঠে সেই উৎকণ্ঠা,“আমাকে বলতে পারেন তো! হাতে ব্যাথা লাগে না?”
বলেই নিজে আঙ্গুল চালায় পাঞ্জাবির বোতাম গুলো খুলতে , ইহান আবেদন ভরা দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো প্রেরণার উদ্বিগ্নতা,যা হয়তো এই মহিলা অবচেতন মনে দেখিয়ে ফেলছে।
একটা দু'টো করে যখন তিন নাম্বার বোতামে হাত দিলো প্রেরণা, ঠিক তখন ইহান ঝুকলো সামান্য, প্রেরণা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর গালে খুব নরম একটা চুমু খেলো। এবং চুমুটা ছিল দীর্ঘসময়ের জন্য। প্রেরণা হাত সরিয়ে নিলো পাঞ্জাবির বোতাম থেকে। কেঁপে উঠলো মৃদু। চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকানোর আগেই ইহান ওর ব্যান্ডেজ করা হাতটা প্রেরণার বাম গালে চেপে ধরে, এবং দ্বিতীয় চুমুটা খায় ওর ডান গালে।
শাড়ির আঁচল খামচে ধরে প্রেরণা। চোখ বুজিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেয় নিজেকে। লোকটার ব্যান্ডেজ করা হাতটা তার গালটা চেপে ধরেই রেখেছে, এবং খানিক বাদে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,“না হাতে ব্যাথা লাগে না। এই দেখুন।”
চলমান......