#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩০
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
মৃদু শারীরিক যন্ত্রণা সকাল থেকেই ছিলো। রেডিওলজি রুমে যখন পরী ট্রান্সডিউসারটা ইশির পেটে দীর্ঘক্ষণ চেপে রেখে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাচ্চাদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল তখনই মূলত হঠাৎ অঘটনটি ঘটে। তীব্র ব্যথায় ইশি ছটফটিয়ে ওঠে, মুঈন এসে আগলে ধরে ওকে।
পরী ধারণা করেছিলো “ফলস পেইন”, ইশিকে একটা কেবিনে রাখা হয়েছিল ঘন্টাখানেক পর্যবেক্ষণের জন্য। তবে ব্যাথা কমার বদলে হঠাৎ করেই “ওয়াটার ব্রেক” জটিলতা দেখা দেয়।
আশেপাশে মাম্মা ছিলো না,পাপা ছিলো না! মুঈন ছোটাছুটি করছিলো পরীর কেবিনে। ইশি যন্ত্রণায় নীল হয়ে পরে থেকেছে দাঁতে দাঁত চেপে।
পরী এসে পরীক্ষা করে দেখলেন সি-সেকশন ব্যতীত অন্য কোন উপায় নেই, পানি পর্যাপ্ত থাকেনি। বাচ্চাদের ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে।
মুঈন ছিলো সম্পূর্ণ একা,বাড়িতে খবরটা জানালেও কারো সাথে আর আলাপ করলো না, সরাসরি হ্যা বলে দিয়েছে পরীকে।
যন্ত্রণাটা খানিক সময়ের জন্য স্তিমিত থাকছে, ইশি পেটে হাত চেপে বসে আছে বেডের হেড সাইডে হেলান দিয়ে, মুঈন ওকে আগলে ধরেই রেখেছে, পরীর দিকে তার বিচলিত দৃষ্টি,“ছোটো মা? এটা তো হবার ছিলো না!”
পরী অনিশ্চয়তার সুরে বলে,“স্ট্রেস থেকে হয়েছে মুঈন! এতদিন এতো নাচানাচি করলো ইহানের বিয়েতে। যাই হোক, আল্লাহর মর্জি। তুমি দুশ্চিন্তা করো না, তোমার স্ত্রীকে বেস্ট টা দেয়া হবে! ও.টি. করবে ডক্টর মাহমুদা। আমি থাকবো, ডক্টর মেহরিন থাকবে। রিল্যাক্স হ্যা?”
মুঈন “রিল্যাক্সড” হতে পারছে না, গাঁয়ে তার চেপে আছে ইউনিফর্ম। ওভাবেই আছে। ইশির কান্না পাচ্ছে কেন জানি হঠাৎ খুব, জীবনের এমন একটি সময়, পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ভয়ে কুঁকড়ে আছে সময়ে সময়ে খুব সাহসী থাকা মেয়েটাও। মুঈন তো বুঝলো ওকে, তাই ছাড়লোই না ওকে নিজের হাতের বাঁধন থেকে।
এক ঘন্টার মাথায় কেবিন ভর্তি হয়ে গেলো। ততক্ষণে ইশি ভীষণ দুর্বল হয়ে পরেছে। ঝাপসা চোখে দেখছিলো মাম্মাকে, পাপাকে আর বাড়ির প্রত্যেককে।
ক্যাথেটার লাগানো হয়েছে, চলছিলো স্যালাইন। বিধ্বস্ত মেয়েটিকে আলো চেপে ধরে থাকলো বুকের সাথে, মমতা ঢালা সুরে অভয় দিতে থাকলো মেয়ের কানে। ওসবে ইশি শান্ত হতে পারছিলো না, ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছিল মাকে জড়িয়ে ধরে রেখে।
একে একে ইনায়া,শেহা,প্রণমি,প্রেরণা এসেও আগলে ধরে আদর দিয়ে গেলো। শুদ্ধও ইশারা ফুপির চোখের পানি মুছিয়ে দিলো। ইশির দুই ভাই ওর মাথায় হাত বুলিয়ে অভয় দিলো, ওর চাচা দু'জন কপালে চুমু খেয়ে গেলো, চাচীরা আদর করলো দুই হাতে। সবার আদর ও দোয়ায় জড়িয়ে গিয়েছে ইশি, তবে সামিন ইয়াসার মির্জা নির্লিপ্ত। কক্ষের এক কোণে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে।
সবার থেকে অভয় নিয়ে ইশি খুজে খুজে বের করলো তার পাপাকে, বাপ-বেটি কথাই বললো না। শুধু দেখেই যেতে থাকলো একে অপরকে।
ও.টি. রাত এগারোটায় । ততক্ষণে একটা স্যালাইন শেষ হয়েছে। রক্তের প্রয়োজন ছিলো, প্রিতম দিতে চাইলো রক্ত। ওর আর ইশির রক্তের গ্রুপ এক ।
যখন ইশিকে ও.টিতে নিয়ে যাওয়া হবে, তার ঠিক আগে আগে ইশি আবার সবাইকে ডেকে ডেকে কাছে নিয়ে হাত আগলে ধরলো, ক্ষমা চেয়ে দোয়া চাইলো সবার কাছে। মায়ের কাছে,বাবার কাছে কেঁদে বুক ভাসালো মেয়েটা।
“সবসময় তোমাদের ভালো মেয়ে আমি হতে পারিনি। তবে চেষ্টা করেছি। এবার আল্লাহ রহম করলে বাকিটা শুধরে নেবো নিজেকে। আমাকে মাফ করো।”
সামিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফ্যাকাশে মুখে, আলো হুহু করে কেঁদে দিয়ে পাগলের মতো চুমু খেলো মেয়ের দু গালে, বললো,“সবসময় তোমার খুব ভালো মা আমি হতে পারিনি। তুমি সুস্থ ফিরে এসো, আমি দেখতে চাই তুমি চমৎকার একজন মা হবে, খুব চমৎকার!”
ইহান আবার এসে বোনকে চুমু খেলো, ইরফান এসে বোনের পেলব হাতটা মুঠি করে ধরে একটু হাসাতে চাইলো,“সবার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিস? কিন্তু তোর ফোনের চ্যাট হিস্ট্রি ডিলিট করবে কে? পাসওয়ার্ড টা দিয়ে যা!”
চোখ ভেজা কান্না নিয়েও হেসে ফেললো সবাই। ইশির নাক থেকে সর্দি বেরুলো হাসতে হাসতে, কাঁদতে কাঁদতে। আলো আঁচলে মুছিয়ে দিয়ে বললো,“যাও এবার। ফি আমানিল্লাহ!”
ইশির চোখ খুঁজছিল তখন তার এসপিকে, দেখলো মানুষটা কেবিনের জানালার ধারে মুখে শুকনো হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে আসলে ইশি আর তার ফ্যামিলির এই আবেগঘন মুহূর্তে ঢুকতে চাইছে না। ইশির দৃষ্টি অনুসরণ করলো সবাই। মেয়ে আর মেয়ে জামাইকে পাঁচ মিনিটের জন্য একা ছেড়ে দিয়ে এই কেবিনের ড্রয়িং রুমে বসলো গিয়ে সবাই।
ইশি চোখ মুছে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করছে মুঈনের সামনে। মুঈন বসলো ওর সম্মুখে। ইশি বললো,“ক্ষমা চাইতে হবে?”
_কেন?
_কখনো কখনো আমি তো ভালো বৌও হইনি! চাইবো না?
মুঈন তাকিয়ে আছে শুধু। ইশির গলা কাঁপে, সুই গাঁথা হাতটা পেটে চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“ক্ষমা করে দিও যখন যখন কষ্ট দিয়েছি,তখন তখনের জন্য! এবার ফিরলে আমি চেষ্টা করব আরো ভালো সঙ্গী হওয়ার।”
ম্লান হাসে মুঈন, বলে,“আমি সম্ভবত সবসময় চেষ্টা করেছি একজন ভালো সঙ্গী হবার। আই বিলিভ আমি খুব ভালো বাবাও হবো! তুমি সুস্থ ফিরে এসো, তুমি দেখবে কেমন?”
ঝাপাতে পারলো না ইশি, ওর গায়ে সেই জোর নেই। শুধু মাথাটা ঠেকিয়ে দিলো মুঈনের বুকে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“আমি দেখতে চাই, সেটা আমি দেখতে চাই!”
ইশিকে যখন ওটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। তখনো সামিন ইয়াসার মির্জা ছিলেন চুপচাপ। চেয়ে চেয়ে দেখছিলেন তার সেদিনের মেয়েটা ঢুকছে ভেতরে, ছুড়ি কাঁচির সান্নিধ্যে যাবে তাই, নিজের নারী জন্ম সার্থক করাতে, মা ডাক শুনতে।
অ্যানেসথেসিয়া নেয়ার পরপরই ইশির যেটুকু ভয় ডর ছিলো, সৃষ্টি কর্তার অশেষ রহমতে তা নাই হয়ে গেলো। চুপচাপ শুনছিলো ছোটো মায়ের সাথে অন্যান্য ডাক্তারদের কথোপকথন। শরীর জুড়ে নিদারুণ অবসন্ন ভাব, ওষুধের প্রভাবে ইশির ঘুম চলে আসছিল। কিন্তু সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে না ঘুমাতে।
বাইরের করিডোরে উদ্বিগ্ন পায়চারী বাকিদের, মুঈন ঠিক দরজার কাছটাতে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ পঞ্চান্ন মিনিট পরে সবাই থমকালো ভেতরে গলা ফাটানো দুটো সদ্যজাত ফুলের চেঁচামেচিতে। যারা নিজেদের জানপ্রাণ এক করে চেঁচিয়ে জানান দিচ্ছে এই পৃথিবীতে তারা উপস্থিত, শিগগিরই তাদের সমাদরের ব্যবস্থা করা হোক!
ডক্টর মেহরিন আর পরী দু'টোকে ধরে উঁচুতে তুললো, ইশি তাকিয়ে আছে ঘুমঘুম চোখে, ক্লান্তির ছটা তার পান পাতার মতন মুখটাতে। ডাগর ডাগর চোখের আকুল দৃষ্টি সরে না তার মেয়েদের মুখ থেকে।
রক্তেমাখা দুজন। হাত পা এমনভাবে ছুড়ছে যেন সাইকেল রাইড করছে। বোঝাতে চাইছে ওরা মায়ের মতই ডানপিটে হবে।
ইশি দেখছে, দুটোর মুখ ঠিক পান পাতার মতন, নাক একেবারে মুঈনের মতন, চোখ আবার ইশির মতন। কান ওদের বাবার মতন। ইশি দেখছে আর কাঁদছে।
ডক্টর মাহমুদা স্টিচিং করছিলেন। পরী দ্রুত ওয়াশ করিয়ে আনলো ওদের। ইশির মুখের সামনে ঝুঁকে তুলে ধরলো তার মেয়েদের, ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইলো,“চুমু খাবি?”
দুচোখের পানি জিরোয় না ইশির, মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যা বললো। পর পর পরীর সহযোগিতায় মাতৃ জীবনের প্রথম চুমু দু'টো খেলো দু'জনের নাকে।
“বাচ্চা কার কাছে দেবো?”
পরীর এই প্রশ্নে ইশি কাঁদতে কাঁদতেই স্মিত হাসলো,নাক টেনে বললো,“ওদেরকে ওদের পাপার কাছেই দিও। আর আমাকে দিও আমার পাপার কাছে!”
__________
মুঈন দম আটকে দাঁড়িয়ে আছে। পরী বেড়িয়ে শুরুতেই বললো,“কোনো প্রশ্ন নয়! ইশি ঠিক আছে! এখনো কথা বলছে। খানিক বাদে হয়তো ঘুমিয়ে যাবে। স্টিচিং শেষে পোস্ট অপারেটিভ রুমে দেয়া হবে!”
মুঈন ঢোক গেলে স্বস্তিতে। বাকিরা হাঁফ ছাড়ে। দৃষ্টি নামিয়ে তাকিয়ে আছে তার মেয়েদের মুখের দিকে। শক্ত পুরুষালী লম্বা শরীরটা ভেতর থেকে কাঁপছে তা কারো দৃষ্টিগোচর হয়না। দু'জন নার্সের হাতে তার দুটি মেয়ে। কাকে রেখে কাকে কোলে নেবে মুঈন? বেশ দ্বিধায় পরেছে সে। তার মনে হচ্ছে একজনকে কোলে নিলে আরেকজন রাগ করবে। কিন্তু সে তার কোনো বাচ্চাকে রাগাতে চায়না।
ভেতরের আবেগী পিতৃ সত্তা কত কি যে ভাবছে! মুঈন পরীর দিকে তাকিয়ে বললো,“দুজনকে একসাথে কোলে নিই?”
পরী হেসে মাথা ঝাঁকায়। মুঈন তৎক্ষণাৎ লুফে নেয় তার মেয়েদের, দু'হাতে খুব কায়দা করে আগলে ধরেছে। যেন সে খুব অভিজ্ঞ!
সামিন এগিয়ে যায়। বাকিরা সেই কখন ঝুঁকে পরেছে নতুন অতিথিদের চাদপানা মুখ দেখবে বলে। ভিড় ঠেলে সামিন এগিয়ে গিয়ে দেখল মুঈন তার মেয়েদের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে রেখেছে। সামিনের চোখে চোখ পরতেই হাসে স্মিত হাসি।
দু'হাত বাড়িয়ে দেয় সামিন, ব্যাকুল হয়ে বলে,“আমাকে দাও!”
ইচ্ছে করছেই না মুঈনের, এতক্ষণে পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করেছে দুই মেয়ের কপালে।
সামিন ছটফটিয়ে বলে,“আরে অন্তত একজনকে দাও।”
মুঈন তাও দেয়না। সামিনের তৃষ্ণা বাড়ছে, হাত নিশপিশ করছে,থাবা মেরে নিতে ইচ্ছে করছে নাতনিদের।
মুঈন অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,“আপনি এমন করছেন কেন বাবা? দিচ্ছি তো আমি”
মুঈন কি বুঝবে সামিনের ছটফটানি? নাতনিদের কোলে নিয়ে দুটোকে দুই গালে চেপে ধরে রেখেছে, দুচোখের পাতা কাঁপছে, গলা কাপছে। নতুন প্রাণ দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে বড্ড আবেগী হয়ে বলে,“বেশি কষ্ট দাওনি তো আমার মেয়েকে? আচ্ছা ওয়েলকাম!”
ছটফটানি কমছে না মুঈনেরও, অতটুকু সময়ে তার মন ভরেনি, শশুরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,“এবার আমাকে দিন।”
সামিন ভান করছে সে জামাইয়ের কথা শুনছে না। মুঈন আরো ব্যাকুল হলো,বললো,“অন্তত একজনকে দিন!”
আলো শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে নেয়, জামাই আর স্বামীকে অভিযোগের সুরে বলে,“হ্যা তোমরাই নাও। আর আমরা এখানে দাঁড়িয়ে সবাই চেয়ে চেয়ে দেখি!”
রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে মির্জা পরিবারের আনন্দ উন্মাদনা। পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর কোল বদল হচ্ছে মুঈন ফরাজীর দুই মেয়ে। তারা নানুদের কোলে যাচ্ছে, নানীদের কোলে যাচ্ছে, মামাদের কোলে যাচ্ছে, খালাদের কোলে যাচ্ছে, মামীদের কোলে যাচ্ছে।
ইশি অচেতন ছিলো ঘন্টা দেড়েক। ওকে আজকের রাতটার জন্য পোস্ট অপারেটিভ রুমেই রাখা হবে, বাচ্চাদের নিয়ে গিয়ে বুকের দুধ খাইয়ে এসেছে প্রেরণা আর আলো।
পুরুষ এলাউ করছে না বিধায় মুঈন বা সামিন কেউই ঢুকতে পারলো না সেখানে। দরজার কাচ গলিয়ে মুহুর্তে মুহুর্তে দেখছে শুধু।
হাসিখুশি এই বৃহৎ পরিবারটির আনন্দ বাঁধ ভেঙে উপচে পরছে এই নতুন প্রাণ দুটোর আগমনে। মধ্যরাত অবধি ওরা কোল বদল হলো। নানীদের কাছে থাকলো,আদরে উষ্ণতায় জড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর পর মায়ের কাছ থেকে পেট ভরিয়েও আসছে। দু'জন গোলুমোলু দেখতে হয়েছে বেশ।
রাত আড়াইটা অবধি সবাই ছিলো সেখানে। পরে মুঈন সবাইকে বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নিতে অনুরোধ করে। হসপিটালে থাকবে আলো, রিতু আর মুঈন।
রিতু গিয়ে প্রেরণাকে বললো,“সবাইকে নিয়ে বাড়িতে যাও। এখানে বড় ভাবীকে একা রেখে আমি যাবো না। আর হ্যা, কাল সকালে খাবার পাঠিয়ো। দুপুরে ইশির জন্য খাবার পাঠিয়ো বাড়ি থেকে। কি কি পাঠাবে জানো তো?”
প্রেরণা শাশুড়ির কথায় বাধ্য বৌমার মতন দু'পাশে মাথা নাড়ে।
_________
আজ এক অন্যরকম সকাল। অন্তত প্রেরণার জন্য। বাড়িতে কর্ত্রী বলতে শুধুমাত্র সে-ই রয়েছে। প্রণমি ইরফান রাতে বাড়িতে ফেরেনি। ওরা ইনু প্রিতমের ফ্ল্যাটে গিয়ে ঘুমিয়েছে। রাত তিনটায় প্রেরণা ইহানের সাথে বাড়িতে ফিরেছিল ,তাদের সাথে ছিল শুদ্ধ আর এ বাড়ির মুরব্বি কর্তারা।
ঘুম হয়নি পর্যাপ্ত, তবুও পরিবারের এই আনন্দ ঘন সময়ে চনমনে প্রেরণার শরীর। সকাল সকাল শুদ্ধকে খাইয়ে স্কুলে পাঠিয়েছে, তিন শ্বশুরকে নাস্তা খাইয়ে কাজে পাঠিয়েছে। আজ দুপুরে হসপিটালে সবাই মিলিত হবে আবার।
ফোনকলে জেনেছে ইশি সুস্থ আছে, বাচ্চারাও সুস্থ আছে। প্রেরণার ওপর দায়িত্ব তাকে ইশি আর বাকিদের জন্য রেঁধে পাঠাতে হবে হসপিটালে। তাই রান্নাঘরে ভীষণ ব্যস্ত সে। শুদ্ধকে স্কুলে দিয়ে ইহান এলো বাজার নিয়ে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। কাকভেজা হয়ে এসেছে সে।
ব্যস্ত গলায় প্রেরণা বললো,“পেলেন দেশী কবুতরের বাচ্চা?”
ইহান মাথা নাড়ে। প্রেরণা ইহানের হাত থেকে বাজারটা নিয়ে নিতে নিতে বলল,“আমি ঝটপট রান্না করে রাখছি। একটু আগে ভাগেই যাবো।”
ইহান চুপচাপ ওঠে দোতলায়, একটা কনফারেন্স কল সামলে নিতে হবে তাকে। নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে এত বড় বাড়িটাতে। শুধু ওরা দু'জন। এর মাঝে শানুর মা এলো, প্রেরণার আরেকটু আসান হলো কাজে। সবকিছু এগারোটার মধ্যে সেরে ফেলে চলে গেলো দোতলায়। ইহান তখন ব্যস্ত ছিলো নিজের কাজে, ঘরে পা রেখেই প্রেরণা মৃদু চিৎকার দিলো,“এমা আপনি ব্যান্ডেজ খুললেন কেন? ইনফেকশন হবে!”
_ইচিং হচ্ছিল!
গাছাড়া ভঙ্গিতে ইহান জবাব দিয়ে তার কাজে মন দিলো। প্রেরণা ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে গিয়ে বসলো ইহানের সামনে, ওর হাত টেনে নিয়ে ড্রেসিং করে দিলো । ইহান থমকে চেয়ে রইল হঠাৎ, প্রেরণা বলতে লাগলো,“এতো কাণ্ডজ্ঞানহীন কি করে হন আপনি? পরে মা তো আমাকে ধরতো! বলতো আমি কেন খেয়াল করলাম না! তার এতো বড় বাচ্চাটার খেয়াল কেন রাখতে পারছি না!
ধূর ভীষণ বিরক্ত লাগে!”
ওসব প্রেরণা মজা করেই বলতে থাকলো। রান্নাঘর থেকে এসেছে বিধায় তাপে মুখটা লাল হয়ে ছিলো প্রেরণার, খুব কাছ থেকে ইহান আড়চোখে দেখতে লাগলো ওকে ভীষণ মনযোগে, ভীষণ আবেদন নিয়ে।
আচমকা চোখাচোখি হতেই প্রেরণা চোখ নামিয়ে শক্ত হয়ে বসে রইল। ইহানকে বললো,“আমি গোসলে ঢুকলাম। এর মাঝে ইরফান এলে ওকে বলবেন সবকিছু বক্সে ভরে রেখেছি ডাইনিং টেবিলে, নিয়ে যেতে।”
ইহান ওসব শুনছে না, বৃষ্টিমুখর এই ভর সকালে সে হুঁশ খুইয়ে আরক্ত বধূর সৌন্দর্য গিলছে, গোগ্রাসে।
প্রেরণা ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে, লোকটার চোখ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ছুটে যায় শাড়ি নিয়ে ওয়াশ রুমে। কল ছেড়ে কাঁপতে থাকে মুহুর্মুহু। লজ্জার ঘোর থেকে বেরুতে না বেরুতেই টের পেলো একটু ভুল হয়েছে, তাড়াহুড়োতে সে শুধু শাড়িটা এনেছে। আর কিছু নয়।
সময় গড়ায়, প্রেরণা ধীরে ধীরে খুললো ওয়াশ রুমের দরজা। ভেজা শরীর লুকিয়ে শুধুমাত্র মাথা বের করে বললো,“শুনছেন!”
দৃষ্টি মেলায়না প্রেরণা ঐ লোকটার সাথে। এ এক অন্যরকম অস্বস্তি, তার সামনে এক অন্যরকম লোক। প্রেরণা পারেনা দৃষ্টি মেলাতে।
ইহানের দৃষ্টি শান্ত, শুরুতেই সে প্রেরণাকে লক্ষ্য করেছে, ওর কি প্রয়োজন ঠাওর হতেই বললো,“দিচ্ছি।”
ইহানের হাত থেকে সায়া ব্লাউজ নিয়ে ধপ করে দরজা লাগিয়ে দেয় প্রেরণা। কাঁপতে কাঁপতেই জড়িয়ে নেয় শাড়ি গায়ে।
কলঘর থেকে বেরিয়ে আর লোকটার চোখে চোখ রাখেনা প্রেরণা, ভীষণ ব্যস্ততায় চুল থেকে ভেজা তোয়ালে সরিয়ে সেটা বারান্দায় মেলে দিতে দিতে তুতলে বলতে লাগলো,“আ-আমি নিচে গিয়ে দেখি ইরফান...”
বলতে বলতেই ও ঘুরে দেখলো ঘরের দরজা বন্ধ। পর পর ঘুরে দেখলো ইহানকে। জানালার কাছে চুপচাপ শান্ত ভঙ্গিতে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে।
আড়ষ্ট প্রেরণা একপলক বন্ধ দরজা দেখে, একপলক দেখে ঐ লোকটাকে। এটা কি আমন্ত্রণ ছিলো? এই লোকের সবকিছুই তো আলাদা!
প্রেরণার হাতে এখন দুটো অপশন, এক দরজা খুলে কাজের বাহানায় লোকটার এই অব্যক্ত পবিত্র আমন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়া, দুই চুপচাপ গিয়ে লোকটার পাশে দাঁড়ানো। কি করবে সে?
ঢোক গেলে প্রেরণা, শাড়ির আঁচল মোচড়াতে থাকে হাতে। তখন ইহান বলে ওঠে,“আরেকটু কাণ্ডজ্ঞানহীন হলে আপনি কতখানি বিরক্ত হবেন? খুব বেশি বিরক্ত হবেন?”
প্রেরণা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ইহান ঘুরে দেখতে লাগলো ওকে। মিটিমিটি হেসে হালকা গলায় বললো,“দরজার ছিটকিনি খুব শক্ত করে লাগাইনি আমি! আপনি খুব সহজে খুলতে পারেন, ইফ ইউ ওয়ান্ট!”
প্রেরণা মাথা তুলবে না বলে পণ করেছে, ওর নির্লিপ্ততা দেখে ইহান হেঁসে ফেললো শব্দ করে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে প্রেরণার থুতনি ধরে উঁচু করলো, চোখে চোখ রেখে বললো,“হবেন আমার সাথে কাণ্ডজ্ঞানহীন?”
আবারো মৃদু কাঁপল প্রেরণা, ক্ষীণ আওয়াজে জবাব দিলো,“হলে আপনি কি খুশি হবেন?”
ইহান জবাব দিলো না। প্রেরণার মনে হচ্ছিল সে মাথা ঘুরেই পরে যাবে, লোকটা যখন তাকে কোলে তুলে নিলো সে মনে মনে ভাবছিল সে এই দুনিয়াতেই নেই। পরপর দু'হাতে খামচে ধরলো লোকটার পাঞ্জাবি, মনে হচ্ছিলো সে পরে যাবে লোকটার কোল থেকেও।
বৃষ্টির বেগ বেড়েছে বাইরে, তোলপাড় চলছে প্রকৃতিতে। তবে দু'জন ততটাই শান্ত। ওদের কোনো তাড়া নেই, দু'জন জানে কি হতে চলেছে, যেটা হওয়া প্রয়োজন। তবে সেটা খুব সুন্দর ভাবেই হোক! তাড়াহুড়োতে এই সুখময় সূচনা সংক্ষিপ্ত কেউ করবে না, ওরা বুঝদার।
ঝুকলো ইহান,ভারি স্বরে উচ্চারণ করলো,“সবার বাসর রাত হয়! আমাদের না হয় বাসর দুপুর হোক!”
বালিশে মাথা ঠেকলো প্রেরণার, এতক্ষণে লজ্জা ভুলে সে বধূ সুলভ আবেগী হয়েছে, ইহানের ব্যান্ডেজ করা হাতটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে আছে শ্বাস বন্ধ করে।
ইহান হাসলো নিশ্চুপ, পাঞ্জাবিটা খুললো একটানে। এবং ঐ শক্ত হাতের একটানেই সাদা সুতির শাড়িটার আঁচল সরলো।
প্রেরণা চমকে উঠলো যেন, ঘোর কেটে যেতেই দু'হাতে আঁচল উঠিয়ে ঢেকে নিলো উদরের স্ট্রেচমার্ক গুলো। তার মনটা অকারণে খুব অবুঝ হয়েছে, ঐ কুৎসিত স্ট্রেচমার্ক নিয়ে এভাবে অকাতরে প্রকাশিত হতে হীনমন্যতায় ভুগছে। সে জানে, সে কিছু তথাকথিত খুত নিয়ে প্রবেশ করেছে এই সুদর্শন সুপুরুষের জীবনে, প্রেরণা তাই গুটিয়ে যাচ্ছে।
ইহান চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো প্রেরণার এই অহেতুক নড়বড়ে আচরণ। শক্ত হাতে সরিয়ে দিলো উদর থেকে প্রেরণার হাতটা, দৃঢ় দৃষ্টি রাখলো রমণীর নত চোখে, দৃঢ় স্বরে বলে যেতে লাগল,“কিছু স্ট্রেচমার্ক,কিছু বলিরেখা, কিছু খুঁত, আপনি আপনার স্বামীকেই দেখাতে পারেন, যদি আপনি চান।”
হাস্কি স্বরে আওড়ানো ঐ কথাগুলো শুনতে পেয়েই প্রেরণা জমে গিয়ে বুজিয়ে নিলো চোখ, ইহান সেই চোখের পাতায় চুমু খায়। লজ্জায় আড়ষ্ট বধূর চোখের পাতায় আঙুল চালিয়ে বলে যেতে থাকে,“এই স্পর্শ, এগুলোও আমরা ভাগ করে নিতে পারি তাইনা? ইফ ইউ ওয়ান্ট!”
বড় বড় শ্বাস ফেলে প্রেরণা চোখ খোলে অকস্মাৎ, দেখতে পায় লোকটা গভীর দৃষ্টিতে তাকেই তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে। প্রেরণার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই ভারি স্বরে আবার বললো,“তাই না?”
দু'চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরলো প্রেরণার, কাঁপা হাতটা ধীরে ধীরে তুলে ছুঁলো ইহানের চোখের পাতা, ছুঁলো ওর বাহুর সেই গুলির দাগ, ধীরে ধীরে হাতটা নামলো ইহানের বুকে, ছুঁলো সেখানের কুৎসিত গুলির দাগটাও।
আর তারপর। দুজনে চায়,তাই ভাগ করে নিলো সবকিছু নির্দ্বিধায়। খুব মনযোগে, খুব ধৈর্য্যে ওরা সে ভর সকালে অস্তমিত হতে থাকলো ওদের কাণ্ডজ্ঞানহীনতায়। বন্ধ দরজার ওপাশে এক দম্পতি কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে ভাগ করে নিতে থাকলো দুজন দুজনকে, কারণ তারা চায়।
__________
হসপিটালে খাবার নেওয়ার দায়িত্বটা চেপেছিল ইরফানের ঘাড়ে, ঝড় বৃষ্টি গায়ে মাখিয়েই বাড়িতে এলো। শানুর মা দরজা খুলে দিতেই তাড়াহুড়ো লাগিয়ে ইরফান বললো,“ভাবীমনিকে ডাকো। সবকিছু গুছিয়ে দাও।”
_বড় ভাবী তো দোতলায়, তার ঘরে।
_দাদান কই?
_সেও ঘরে!
_ওহহহ, আচ্ছা আমি ডেকে আনছি ভাবী মনিকে, তুমি বক্সগুলো ব্যাগে ভরো।
কথাটা বলেই ইরফান লাফিয়ে লাফিয়ে দোতলায় উঠলো, গলা ফাটিয়ে ডাকতে লাগলো,“ভাবীমনি! ও ভাবীমনি! খাবার কি বেশি দেন নি? পাপা,বড় বাবারা আসবে না লাঞ্চে। তারাও ওখানে গিয়ে খেয়ে নেবে বলেছে। ও ভাবী মনি.....”
ঘরের সামনে এসেই থামলো ইরফান, চুপ হয়ে গিয়ে তাকিয়ে রইল বন্ধ দরজার দিকে। দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকেই হুট করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে ফেললো সে। নামিয়ে নিলো চোখ, ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার সিঁড়ির কাছে যেতে যেতে বললো,“ক্যা বাত হে! ক্যা বাত হে! ”
চলমান.......#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩০ [ বর্ধিতাংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫 কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
[ ১৩০ পর্বের বর্ধিতাংশ ]
সবকটা জানালার পর্দা নামিয়ে দেয়া ছিলো। কামরা জুড়ে বৃষ্টিমুখর দুপুরের ম্যাদাটে আলো খেলা করে। বাইরের ঝড়-বৃষ্টি থামার নাম নেই। মাথার কাছে পিকপিক আওয়াজ তুলে বাজতে থাকা ফোনটাকে ইহান একচাপে সাইলেন্ট করে দেয়। পরপর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ওপাশ ফিরে শুয়ে থাকা রমনীর দিকে। বদ্ধ ঘরের জানালার পর্দার ফাঁক গলিয়ে আসা ম্যাদাটে আলোয় দৃষ্টিগোচর হয় রমনীর ফর্সা কাঁধের একাংশ। ইহান নতদৃষ্টে সামান্য হেসে বিছানা হাতড়ে তুলে দেয় শাড়ির আঁচল ঐ কাঁধে। কোনো সাড়া শব্দটি করছে না প্রেরণা। ইহান ভাবলো ঘুমাচ্ছে।
এবার ফোনটা নিয়ে কল করলো ইরফানকে, ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হতেই বললো,“কই তুই?”
_হসপিটালে যাচ্ছি! অন দ্যা ওয়ে...
_আচ্ছা, শুদ্ধকে একটু রিসিভ করে ইনুর কাছে দিয়ে দিবি আধাঘণ্টা পরে?
ইরফান হাসে নিশ্চুপ, জবাব দেয়,“শুদ্ধ আমার সাথে হসপিটাল যাচ্ছে। ওকে অলরেডি নিয়ে নিয়েছি টিচারের কাছে বলে।”
ইহান খানিকটা অবাক,তবে আপত্তি জানিয়ে বললো,“না না, ওর তো ওর মামার ওখানে যাওয়ার কথা ছিল, ওর গোসল আছে, খাওয়া দাওয়া আছে।”
_আরে চিল, শুদ্ধই আবদার করেছে ও ইশারা আন্টির বেবিদের পাঁচ মিনিট দেখে চলে যাবে। কাল রাতে নাকি ও দেখেনি ভালো করে।
ইহান আর কথা বাড়ালো না, ওপাশ থেকে ইরফান বলে ওঠে,“শুদ্ধকে গোসল খাওয়ানো সব করিয়ে দেয়া হবে। তুমি আর ভাবী মনি ধীরে সুস্থে বিকেলে এসো। এই ভর দুপুরে হসপিটালে এসে ভিড় বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।”
ব্যগ্র ভঙ্গিতে বলে কলটা কাটলো ইরফান। ইহান ফোন রেখে আবারও যখন ওপাশ ফিরে শুয়ে থাকা প্রেরণাকে দেখলো, এবার থমকে গেল সে। দেখলো প্রেরণার গা কাঁপছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে ইহান হাত বাড়িয়ে আলতো হাতে ঘুরিয়ে নিলো প্রেরণাকে। দ্বিতীয় দফায় ধাক্কা খেয়ে ইহান মিনিট খানেক চুপ থেকে উৎকণ্ঠা নিয়ে বললো,“আপনি কাঁদছেন?”
প্রেরণা চোখ মুছে নেয়। ইহানের মুখভঙ্গি ধীরে ধীরে পাল্টে যায়, সমস্ত মুখ জুড়ে দ্বিধা খেলা করে, বলে ওঠে,“আমি কি সামলে উঠতে পারিনি আপনার অনুভূতি?”
_ছিঃ এসব কি বলছেন?
নাক টেনে অস্বীকার করে প্রেরণা।
_আপনার চোখের জল আমাকে দ্বিধায় ফেলে প্রেরণা। আমি সব সময় আপনাকে বুঝবো আমার সেই ক্ষমতা নেই। আপনি একটু মুখ ফুটে কথা বলুন। এই চোখের পানি দিয়ে নয়!
বলেই ইহান প্রেরণার চোখ থেকে গড়িয়ে পরা মুক্তোর দানার মতো অশ্রুফোটা তর্জনীতে ছুঁলো। প্রেরণা ইহানের গম্ভীর মুখটার দিকে ভেজা চোখে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পরপর আবার দু চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে,“সামলেছেন, চমৎকার ভাবে, খুব যত্নে সামলেছেন!”
_তবে কষ্ট কোথায়?
উদগ্রীব হয়ে জানতে চায় ইহান। ফুঁপিয়ে ওঠে প্রেরণা, একপ্রকার হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“আমি দীর্ঘদিনের জন্য ছুটি নিলাম সবকিছু থেকে, আমার কাজ, আমার কর্মস্থল সবকিছু থেকে। আপনি আমার বাইরের দুনিয়াটাও সামলে দেবেন প্লিজ? কিছুদিনের জন্য? এভাবে যত্নে?”
ওর কন্ঠে বিষাদ ছিল, সমপরিমাণ ছিলো প্রেরণার দীর্ঘ একাকি দিনের গীত। দীর্ঘপথ খা খা রোদ্দুরে একা হেঁটে প্রেরণা আরেকটা বটগাছ পেয়ে ওর মুসাফির জীবনের ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করে। কি ভীষণ দুঃসহ সেদিন গুলো ছিল !
তার জীবনের একটি বটগাছ তার মাথা থেকে ছায়া সরিয়ে নিয়ে বিদায় নিয়েছে। তারপর একা প্রেরণা,ধূ ধূ মরুভূমিতে একা ছিল।
দিনশেষে আরেকটা বটগাছ সে পেয়েছে। শীতল ছায়া পেয়েছে। প্রেরণার মন জুড়িয়েছে,শরীর জুড়িয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে সেই বটগাছের বুকে, তার ছায়াতলে লুটায় প্রেরণা, ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটা ছেড়ে দিয়ে ক্ষীণ আওয়াজে বলে যেতে থাকে,“আমি একটু বিশ্রাম চাচ্ছি! আমার দায়িত্ব গুলো আপনি কেড়ে নিয়ে আমাকে একটু অবলা হতে দিন!”
ইহান জবাব খুঁজে পায়না। তার হাত আপনা আপনি চলে যায় প্রেরণার খোলা চুলের মাঝে। ধিমি আওয়াজে বলে,“প্রেরণা আপনি তাকান...!”
উদ্ভ্রান্তের মতন অস্থির ভঙ্গিতে দু'পাশে মাথা নাড়ে প্রেরণা,
_না আপনি প্লিজ শুনুন! আমার অনেক অনেক চাহিদা জানেন! সেসব প্লিজ পূরণ করুন। আমাকে একটু যত্ন করুন, আমার সাথে একটু আলাপ করুন অনেক সময় ধরে, আমি খেয়েছি কিনা এক বারের জায়গায় দুবার জানতে চান। আমার জন্য শাড়ি আনুন, আমার জন্য চুড়ি আনুন। আমাকে বাইরে যেতে দিয়েন না, আমার আর ভালো লাগে না বাইরেটা।
নেই প্রেরণা ওর নিজের মধ্যে, ইহান বুঝলো। বাইরের প্রকৃতি তখন খুবই শান্ত, ততটাই শান্ত ইহানের স্বর, এক খুঁত ওয়ালা ভঙ্গুর নারীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ইহান খুবই শান্ত স্বরে আওড়ে যেতে থাকলো,“যত্ন করবো, আলাপ করবো অনেক সময় ধরে, খেয়েছেন কিনা দুইবার জানতে চাইবো, শাড়ি আনবো, চুড়ি আনবো, আপনাকে বাইরে যেতে দেবো না।”
লোকটার কন্ঠে কিছু একটা ছিলো। প্রেরণার সমস্ত অস্থিরতা কর্পূরের মতন উবে গেলো। শক্ত বুক থেকে মাথা তুলে প্রেরণা দেখলো লোকটাকে, ইহানের ঠোঁট জুড়ে লেপ্টে আছে চমৎকার একটা হাসি। উঠে বসলো প্রেরণা, শাড়িতে জড়িয়ে নিজেকে এতক্ষণে আবারো লজ্জায় নিমজ্জিত হয়। তিরতির করে কাঁপে মাথা ঝুঁকিয়ে।
ইহান চোখ ফেরায়, একেবারে ওপাশ ফিরেই শোয়, হাই তুলতে তুলতে বলে,“আমি আধাঘণ্টা ঘুমাই। আমাকে ডেকে দিবেন! এই আধাঘণ্টায় আবার কাঁদবেন না যেন! এতো ঘুম পেয়েছে আমার! আমি শুনতে পাবো না, জানতে পারবো না আপনার আরো কি কি চাহিদা আছে সেসব! খবরদার এই আধাঘণ্টায় যেন কাঁদবেন না।”
__________
দীর্ঘ আট ঘন্টা পরে ইশিকে কেবিনে তার বেডে এনে রাখা হয়েছে। শোনা মাত্রই অফিস থেকে ছুটতে ছুটতে এসেছে সামিন। চলে এসেছে বাকি সবাই। সারারাত নাতনিদের পেছনে খাটনি দিয়ে আলো রিতু আর পরী সোফাতে বসে ঝিমুচ্ছিলো।
ইরফান শুদ্ধকে নিয়ে এসেছে, প্রিতম প্রণো আর ইনুকে নিয়ে এসেছে। শেহা এসেছে ক্লাস শেষ করে। আবারো দু'টো নতুন প্রাণকে কোল বদল করে উল্টে পাল্টে দেখে সবাই। শেহা আশেপাশে তাকিয়ে ইরফানকে বলে,“বড় দাদান আর ভাবী মনি এলো না?”
ইরফান হাই তুলতে তুলতে জবাব দিলো,“ভাবীমনি একটু অসুস্থ। বিকেলে আসবে!”
প্রেরণার অসুস্থতার কথা শুনে উদ্বিগ্ন হলো সবাই। প্রণমি বললো,“আপনি প্রথমে কেন বললেন না? আপু কি রকম অসুস্থ?”
ইরফান ঠোঁট দাঁতে চেপে শক্ত হয়ে বসে আছে। প্রিতম এগিয়ে আসে,“বল না আপুর কি হয়েছে?”
হাঁফ ছাড়ে ইরফান,আর হাসি চেপে রাখা যাচ্ছে না। তবে ওকে বাঁচিয়ে নেয় আলো, সবাইকে বলে,“ওইযে কাল রাতে ঘুম হলো না, বড় বৌমার তো আবার এমনিই মাথা ব্যাথার অসুখ আছে!”
ইরফান বাঁচল,বড় মায়ের কথার লেজে হরবর করে বলে,“হ্যা,হ্যা। একটু মাথা ব্যথা ভাবী মনির। ঠিক হলে বিকেলেই চলে আসবে।”
ইশি অস্থির পাপাকে দেখলো দু'চোখ ভরে। মাথা ঘুরিয়ে দেখলো অদূরেই দরজার কাছে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুঈনকে। ইশি দুজনকেই দু'চোখ ভরে দেখছে। বাবুরা দুজন এখন কোল বদল হয়ে ঘুমাচ্ছে তাদের দুই নানীর কোলে। আলো একজনকে দোলাতে দোলাতে এসে দাঁড়ায় মুঈনের পাশে, নিচুগলায় বললো,“যাও তুমি! ভেতরে যাও!”
মুঈন যায়না ভেতরে। ম্লান হেসে শাশুড়িকে বলে,“আমি আমার মেয়েদের আগে দেখেছি। বাবাও তার মেয়েকে আগে দেখুক!”
হাসে আলো স্মিত, বলে,“তোমাদের কাউকে আমি ঠিক বুঝি না।”
মেয়ের মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে সামিন। স্থির দৃষ্টিতে দেখতে থাকে ইশির ফুলে থাকা মুখমণ্ডল। নরম গলায় বলে,“কিছু খাবে আম্মা? পেটে কি ব্যাথা হয়? পানির তেষ্টা পেলো?”
ইশির চোখ ভরে ওঠে, দু'পাশে মাথা নাড়ে। সামিন কপাল কুঁচকে আপনমনে বিড়বিড় করে বলে,“রং চা আর বিস্কুট কোনো খাবার হলো? অন্তত একটু স্যুপ জাতীয় কিছু.....”
দরজা থেকে আলোর কড়া জবাব,“আজীবন পরে আছে। মেয়েকে ভালোমন্দ খাওয়াতে পারবেন। এখন নয়!”
এতক্ষণে ইশি ক্লান্ত গলায় পাপাকে বলে,“তুমি দেখেছো ওদের পাপা? নাকি আমার চিন্তায় দেখোইনি!”
সামিন মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মেয়ের,কপালে চুমু খেয়ে বলে,“তুমি আরো দু'জন ইশিকে জন্ম দিয়েছো আম্মা।”
হাসে ইশি হঠাৎ খিলখিল করে,হাসতে গিয়ে স্টিচে চাপ পরে, ব্যাথা পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে ইশি। ছুটে আসে মুঈন। সামলে নেয় ওকে। মেয়ে জামাইকে একা ছেড়ে চুপচাপ কেবিন থেকে বেরুলো সামিন। দীর্ঘ আট ঘন্টা পরে মুঈনকে এতটা নিকটে পেয়ে ইশি আবেগী হয়,“আমি ভেবেছি তুমি সবার আগে এসে দাঁড়াবে।”
হাসে মুঈন। ইশির চুলের বিনুনিতে আঙ্গুল চালিয়ে ছাড়ে পরিতৃপ্তির শ্বাস। দু'চোখ বন্ধ করে বলে,“মেয়েদের পেয়ে তোমাকে ভুলে গিয়েছি।”
___________
কালো রঙের একটা সুতি শাড়ি গাঁয়ে জড়িয়েছে প্রেরণা। ভেজা চুল গুলো হেয়ার ড্রাইয়ারে শুকিয়ে নিয়ে জানালার সবগুলো পর্দা তুলে দিয়ে মৃদু আওয়াজে ইহানকে ডেকে তোলে।
ঘুম ঘুম চোখ খুলে তাকায় ইহান, দৃশ্যপট পরিষ্কার হতেই দেখে তার সামনে কালোতে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্নিগ্ধ এক ইন্দ্রানী। ইহান তাকিয়ে থাকে চুপচাপ।
প্রেরণা তাড়াহুড়ো লাগিয়ে ব্যাগ খুঁজছিল নিজের, বলে যেতে থাকে,“আমি আমার কার্ড টা নিলাম। বাবুদের জন্য গিফট কিনবো। আমরা বড় মামা মামী। আমাদের প্রথমে দেয়া উচিত তাইনা?”
ইহান ওসব কিছু শুনছে না। মাথার নিচে ডানহাত রেখে ঠোঁটে পরিপূর্ণতার হাসি ঝুলিয়ে দেখে যেতে থাকে এক আটাশের আদুরে রমনীকে। যার আদুরে দু'হাতে জড়িয়ে যাচ্ছে ইহানের জীবন,ইহানের সংসার। ধীরে ধীরে। দায়িত্ব গুলো খুব যত্নে সামলাতে জানে এই মহিলা।
প্রেরণা বক্সে তার চুড়ি খুঁজতে খুঁজতে বলে,“আপনি কি আরো ঘুমাবেন? আমি কি একা যাবো? সেটা কেমন দেখায়?”
তড়িৎ পেটানো শরীরটা বল খাটিয়ে উঠে বসে,ভাঙে আড়মোড়া। চোখের মনযোগী দৃষ্টি ব্যস্ত প্রেরণাতে স্থির রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“না। আপনি একা কোথাও যাবেন না আর!”
ইহানের পিছু পিছু হসপিটালে পা রাখার সাথে সাথেই প্রেরণা টের পেলো সবার বিচলিত দৃষ্টি তার মুখেই স্থির হয়ে আছে। ইহান প্রেরণার দুই হাত ভর্তি হয়ে আছে নতুন বাবুর জন্য উপহার ও খেলনায়।
প্রেরণা হাসিমুখে এগিয়ে যেতেই শুদ্ধ ছুটে এলো, ওর হাতে প্রেরণা এক সেট ডল তুলে দিয়ে বললো,“এটা তুমি দিও বোনদের।”
রিতু এগিয়ে আসে তখন, কথাবার্তার মাঝেই উদ্বিগ্ন স্বরে বড় বৌমাকে বলে,“এখন কি অবস্থা?”
প্রেরণা বুঝলো না তাই জবাব দিলো না, রিতু চিন্তিত ভঙ্গিতে ইহানকে বলে,“বড় বৌমা ঠিক আছে?”
ইহানের মুখটা থমথমে। গম্ভীর তবে নিচু স্বরে আওড়ায়,“কেন?”
_ইরফান বললো খুব মাথা ব্যথা!
প্রেরণা ইহান একযোগে তাকায় ইরফানের দিকে। সোফায় বসে ছিলো প্রণমির পাশে সে। দাদান আর ভাবী মনির চোখে পরে যেতেই দৃষ্টি নামিয়ে টেবিলে রাখা বাটি থেকে এক পিস মাল্টা উঠিয়ে খায়। মুখভঙ্গি এমন যেন সে কিছুই বোঝেনা। সদ্যজাত শিশু।
চলমান.......