ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 131

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩১
#ইসরাত_ইতি

ওদের ডাকনাম ইচ্ছে-খুশি ! ইচ্ছের ভালো নাম মুবাশশিরাহ। খুশির ভালো নাম মৌনিয়াহ। বার্থ সার্টিফিকেটে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিয়েছে তাদের বাবা।
ইচ্ছে-খুশিকে তাদের নানু বাড়িতে নিয়ে আসার আজ নবম দিন। ভালোবাসায় মুড়িয়ে আছে অবুঝ দু'টো প্রাণ, ওদের ঘিরে এই বাড়িতে প্রতিটা দিন কত আনন্দ উৎসব হয় সে খবর কি ওরা রাখে? ওরা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে খেতে-ঘুমাতে আর রাতভর জেগে মা সহ নানুবাড়ির সবাইকে পালাক্রমে জাগিয়ে রাখতে। কখনো তিন নানী ইচ্ছে খুশিকে নিয়ে জাগে,কখনো প্রেরণা। কখনো মুঈন অথবা সামিন‌।

ইশির শরীরটা ভেঙেছে এই কদিনেই, পেটের ক্ষত শুকায়নি, ঠিক ঠাক খেতে পারেনা, মুখ ফুলে আছে তবুও মুখে পবিত্র একটা হাসি সবসময় ঝুলে থাকে মেয়েটার। ইচ্ছে-খুশি যখন কেঁদে ওঠে,ওর বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। পেটে চিনচিনে ব্যথা নিয়েও দু'হাতে লুফে নেয় মেয়েদের দুধ খাওয়াবে তাই। ইচ্ছে-খুশি যখন ঘুমায়, নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে ইশি মেয়েদের দেখে। মুঈন ফরাজীর মেয়েদের। প্রথম দিন বোঝা না গেলেও মেয়ে দু'টো অনেকটাই পেয়েছে মুঈনের চেহারার আদল, ভ্রূর কাছটা অন্তত তাই বলে।

সামিন আর মুঈনের মধ্যে দু'দিন ধরে চলছে নিরব যুদ্ধ। এ বাড়িতে সাতদিন থেকেই মুঈন হাঁপিয়ে উঠেছে, ও চায় মেয়েদের নিয়ে দ্রুত নিজেদের কটেজে ফিরতে। তবে এ বাড়ির লোকের তার স্ত্রী বাচ্চাদের প্রতি অত্যধিক স্নেহ দেখে জোর খাটিয়ে মুঈন বলতেই পারে না, শশুরের সামনে গিয়ে বারবার শুধু ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝাতে চায় তাদের যাওয়া উচিত, মুঈন ইশির জন্য দু'জন আয়া রেখেছে। একজন ইশির দেখাশোনা করবে, একজন করবে ইচ্ছে-খুশির। তবুও মুঈন নিজের বাড়িতে থাকবে, দিন শেষে নিজের বাড়িতে ফিরে উন্মাদের মতো আদর করবে মেয়েদের আর মেয়েদের মাকে।

সামিন একবার শক্ত গলায় বলেছে,“কটা দিন ধৈর্য্য রাখো! তোমায় ঘরজামাই বানানোর পরিকল্পনা আমাদের নেই। ভয় পেয়ো না!”

মুঈন বলেনি আর কিছু, লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসেছে।

দোতলার লিভিং রুমে আড্ডারত বাড়ির প্রত্যেকে। একপাশে বাড়ির বড়রা সবাই। আরেকপাশে ইশি-মুঈন, ইরফান প্রণমি,শুদ্ধ এবং তাদের মধ্যমনি ইচ্ছে-খুশি। ওদের মধ্যে প্ল্যান চলছিল একটা রিইউনিয়নের। নিজেরা পরিকল্পনা করে শেহা উজ্জ্বল আর ইনু প্রিতমকে কল করবে।
রাত তখন সাড়ে নয়টা, মুঈন ডিউটি থেকে ফিরে খেয়ে দেয়েই মেয়েদের নিয়ে বসেছে আদর করতে।

শুদ্ধ ইচ্ছে-খুশি বলতে পাগল। এ বাড়িতে মিঠি,ইকরি-মিকরি আর ইচ্ছে-খুশি শুদ্ধর কাছে ভীষণ আদরের। ও খুব যত্ন নেয় প্রত্যেককে। দিনে বেশ কয়েকবার ইশারা আন্টির ঘরে ছুটে যায় ইচ্ছে-খুশির কান্না পেলে, ইশারা ফুপিকে ভীষণ তাড়া লাগিয়ে বলে,“ওদের কোলে নাও না ফুপি! তুমি পারবে না? আমি নেই তবে? কিন্তু আমি একজনকে নেবো!”

দু হাতের দুই তর্জনী দুই বোনের আঙ্গুলের ভাজে রেখে শুদ্ধ খেলছিল। মুঈন দীর্ঘসময় ছেলেটাকে লক্ষ্য করে হঠাৎ দুষ্টুমির ছলে বলে উঠলো,“বোনরা তো কিছুদিন পরে চলে যাবে ওদের বাড়িতে, তখন শুদ্ধ কি করবে?”

শুদ্ধ শুনেছে এই কথাটা বেশ কিছুদিন ধরে, তার বেশ মন খারাপ হয়। প্রতিবারের ন্যায় বলে,“দুজনকেই নিয়ে যাবে ফুপা? একজনকে রেখে যাও!”

ইশি মুঈন হেসে ওঠে, হাসে প্রণমিও। ইরফান ছেলেটার ঘাড় চেপে ধরে নিজের কোলে তুলে নিয়ে গাল টেনে বলে,“ইশশ শখ কত! ওরা কেনো তোর জন্য তাদের বাচ্চা রেখে যাবে, তাদের কষ্ট হবে না? যা তোর মাকে গিয়ে বল!”

ইরফানকে কখনো খালু,কখনো চাচ্চু ডাকছে শুদ্ধ ইদানিং। এবার ডাকলো চাচ্চু, অবাকের সুরে আওড়ালো,“মাম্মাকে কি বলবো চাচ্চু?”

_মাম্মাকে বলবি এমন দু'টো বোন এনে দিতে!

_মাম্মা কিভাবে আনবে?

_তা তো জানি না, তুই বলে তো দেখ!

মুখে হাত চেপে বসে আছে ইশি, মুঈন মিটিমিটি হাসছে। প্রণমি তাজ্জব হয়ে ইরফানের হাত খামচে ধরে বলে,“এসব কি শেখাচ্ছেন?”

হাই তোলার ভান করে ইরফান জবাব দিলো,“খুব ভালো একটি বিষয় শেখাচ্ছি। এভাবে অন্যের জিনিস চাইতে নেই বেটা। কিছু পছন্দ হলে মাম্মার কাছে গিয়ে বলবে, মাম্মা এনে দেবে, অন্যের কাছ থেকে চেয়ে নেবে কেন? যাও গিয়ে বলে এসো!”

শুদ্ধ দ্বিধান্বিত ছিলো মিনিট দুয়েক, পর পর কি মনে করে ছেলেটা ছুট লাগায় ঘরে। চাচ্চুর কথাটা মাথায় ঢুকে গিয়েছে খুব ভালো করে।

প্রেরণা ইহানের পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করছিলো, ইহান পাশেই বসে কিছু কাগজ দেখছে। এর মাঝে শুদ্ধ ছুটে এসে মাকে ধরে শক্ত করে।

হাসে প্রেরণা, কাজ ফেলে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলে,“কি হয়েছে আমার ছেলেটার?”

_মাম্মা আমাকে বোন এনে দেবে ইচ্ছে-খুশির মতো?

ইহান তখনো খেয়াল করে ওঠেনি, অভ্যাস হয়ে গিয়েছে শুদ্ধর প্রতিটি আবদারে হ্যা বলার, সেই অভ্যাস থেকে তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে আনমনে ইহান বললো,

_হ্যা দেবো কালই......!

চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে প্রেরণা, হঠাৎ থামলো ইহানও। হুশ ফিরতেই শুদ্ধর দিকে চেয়ে রইল অবাক চোখে।

শুদ্ধ খুশি হতে পারেনা ঠিক, কাল বোন এনে দেবে এই কথাটা কেন জানি তার বিশ্বাস যোগ্য মনে হচ্ছে না। ততক্ষণে প্রেরণা ঘুরে ছেলের দু কাঁধ ধরলো, সন্দেহের দৃষ্টি মেলে গম্ভীর কন্ঠে বললো,“এসব কথা তোমাকে কে বলতে বলেছে বাবা?”

শুদ্ধ জবাব দেয়না, ইহান দেখলো প্রেরণা অহেতুক রাগ দেখাচ্ছে। উঠে এসে কোলে তুললো শুদ্ধকে, চুমু খেয়ে বললো,“শুদ্ধ যখন আরেকটু বড় হবে। বেশি না, এই আর দশ সেন্টিমিটার বড় হবে, তখন শুদ্ধর জন্য বোন আনা হবে। সে বোন শুদ্ধর কাঁধে চাপবে। ওকে?”

শুদ্ধ মাথা নাড়ায়। প্রেরণা তখন আবার বলে,“কে পাঠিয়েছে তোমায় এ ঘরে?”

_চাচ্চু!

হাঁফ ছাড়ে প্রেরণা। মুখটা কঠিন হয়। জানতো সে এই কাজটি কার হতে পারে!

ইহান হালকা হাসলেও প্রেরণা ক্ষান্ত হয়না, বিড়বিড় করে বলে,“আজ ওর একদিন কি আমার একদিন!”

বলেই প্রেরণা গটগট করে ঘর থেকে বেড়োয়। দূর থেকে ভাবীমনির অগ্নিমূর্তি নজরে পরতেই মুঈনের সাথে হাসি থামিয়ে উঠে দাঁড়ায় ইরফান। প্রেরণা পায়ের গতি বাড়ায়, ইরফান ঢোক গেলে। প্রেরণা যখন আরো দুকদম এগোলো তখন ইরফান ছুট লাগায় নিজের ঘরে, ঘরে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দেয়।

লিভিং রুমে সবাই আড্ডা থামিয়ে ওদের ভাবী দেবরের খুনসুটিতে মত্ত হয়। দরজায় চাপড় মেরে প্রেরণা চেঁচায়,“ইরফান বের হও! তোমার সাথে আমার কথা আছে!”

ওপাশে হাসে ইরফান, হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলে,“ভাবী মনি! ছেলেকে ঠিকঠাক ভাবে ম্যানার্স শেখাতে পারেননি। অন্যের জিনিস দেখলেই চেয়ে বসে। বাচ্চাদের আবদার আপনারা পূরণ করবেন। ঠিক আছে? মন ছোটো করবেন না ওর, আর বেশি লোভী বানাবেন না। নয়তো সবার কাছে গিয়ে বলে বেড়াবে,“আমাকে এই বাবুটা দেবেন?”
ওর জ্বালায় তো আমরা বাচ্চা নিতে ভয় পাচ্ছি! কি না আমাদের বাচ্চা নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়!”

___________

রাতের ডিনার শেষে শুদ্ধর ঘরে প্রেরণা গিয়েছিল ওর হোমওয়ার্ক চেক করতে। এই কাজটা ইদানিং ইহান করে, কিন্তু প্রেরণা চায়না ছেলের ব্যাপারে সে অলস ও উদাসীন হয়ে পড়ুক, সবটা ছেড়ে দিক ঐ মানুষটার কাঁধে। দায়িত্ব যা ছিল সবই তো নিয়ে নিয়েছে ইহান। প্রেরণার মন,শরীর, জীবন সবকিছু নির্ভরশীল হচ্ছে ঐ লোকের ওপর। ধীরে ধীরে,পুরোটাই। এতোটাও আয়েশ চায়না প্রেরণা।

ঘরের সর্বোত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শুদ্ধর খেলনা, ওগুলো গুছিয়ে নিয়ে বিছানায় দেখতে পেলো স্টিলের বাক্সটা।

থমকে দাঁড়িয়ে রইল প্রেরণা। শুদ্ধ এটা করে প্রায়শই, ওয়াসীত শরীফের জিনিসপত্র বের করে এভাবে মাঝে মাঝে দেখে।

হাঁফ ছেড়ে প্রেরণা এগিয়ে যায়,বলে,“এই ভারি বাক্সটাকে তুমি একা বের করবে না বাবা। যখন দেখতে মন চাইবে,আমাকে ডাকবে!”

বলেই প্রেরণা বাক্সটা আটকাতে হাত বাড়ায়, কিন্তু আটকে দিতে পারে না, তার দৃষ্টি সহ সে, পুরোটাই স্থির হয়ে আছে ‌। নিস্পন্দ চোখে দেখছে ওয়াসীত শরীফের ইউনিফর্মটা।

হঠাৎ আনমনেই হাত চলে যায় সেথায়, প্রেরণা খুব যত্নে হাত বুলিয়ে দিয়ে বাক্সটা আটকে দেয়। ইহান শুদ্ধর হোমওয়ার্ক চেক করতে তখন ও ঘরে ঢুকবে মাত্র। প্রেরণাকে দেখে দরজাতেই দাঁড়িয়ে পরে। পরপর যখন প্রেরণার চোখে চোখ পরে যায়, অপ্রস্তুত হেসে প্রেরণা উঠে দাঁড়ায়। ইহান বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় চমৎকার একটা হাসি, খুবই স্বাভাবিক গলায় বলে,“বাক্সটা লক করে রাখেন না কেন? বাচ্চা মানুষ কখন কোনটা হারিয়ে ফেলে তখন তো আবার ওকেই বকবেন। লক করে রাখবেন। আর আমার কাছে স্যারের দুইটা ঘড়ি আছে। স্যার হাত থেকে খুলে গিফট করেছিলেন, শুদ্ধকে দেখাতে চাইলে এনে দেখাবেন।”

মাথা নুইয়ে প্রেরণা মাথা নাড়ে, নিচুগলায় বলে,“আপনি ঘরে যান। আমি আসছি!”

বাকিটা সময় মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে শুদ্ধর হোমওয়ার্ক দেখলো প্রেরণা। সবশেষে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দরজা টেনে পাশের ঘরে ঢুকেই দেখলো ইহান নেই।

বিয়ের প্রায় দিন বিশেক হতে চললো ওদের দু'জনের। প্রতিদিন এই বিষয়টা প্রেরণা লক্ষ্য করে, ইহান রাতের এই সময়টিতে আধাঘণ্টার জন্য কোথাও উধাও হয়ে যায়। প্রেরণা আজ অবধি জানতে চায়নি এই বিষয়ে। তবে আজ বেশ কৌতূহল জাগে, ইহানের ফোন ওর বিছানাতেই পরে আছে। ঘরের সর্বোত্র খুঁজেও ইহানকে না পেয়ে প্রেরণা উঠলো ছাদে। বাইরে ঝমঝমে বৃষ্টি তখন। ছাদে উঠেই দেখলো ইহান পোর্চের নিচে,ওদিক ফিরে দাঁড়িয়ে আছে, প্রেরণা ভাবলো হয়তো বৃষ্টি দেখছে।

নিচু স্বরে ডাকল প্রেরণা,“শুনছেন!”

চকিতে ফিরলো ইহান,এক প্রকার চমকে গিয়েছে সে। বাম হাতে থাকা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার টা নিচে পরে যায়, ডান হাতের জলন্ত সিগারেটটা পায়ে পিষে দ্রুত দু'হাত নেড়ে মুখের সামনে থেকে ধোঁয়া হটানোর প্রচেষ্টায় মত্ত হয়ে পরে ইহান।

প্রেরণা খানিকটা ভড়কে যায় লোকটার কাণ্ডে, পর পর হাসি চেপে রেখে এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে পরে থাকা সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে হাতে নেয়।

সুদর্শন লোকটার কালচে হয়ে ওঠা মুখটা দেখে প্রেরণা বুঝতে পারলো লোকটা বেশ অপ্রস্তুত হয়েছে। চোখের দৃষ্টি সিগারেটের প্যাকেটে নিবদ্ধ রেখে প্রেরণা অস্ফুটে বললো,“আধা ঘন্টায় কয়টা সিগারেট খান রোজ?”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইহান থেমে থেমে বললো,“তিনটা!”

চোখ দু'টো এভারেস্টের চূড়ায় ওঠে প্রেরণার, পরে নিচুগলায় বলে,“ভালো বিষয় না। অভ্যেস টা বদলাবেন!”

ইহান কি বলবে বুঝতে পারে না, প্রেরণাই বলে,“এগুলো আমার সামনেই খেতে পারেন। আমি স্ত্রী আপনার। কোনো জনৈক ভদ্রমহিলা নই যে মনে মনে অভদ্র বলবো আপনাকে! স্ট্রেচমার্ক লুকাতে দেননি, সিগারেট কেন লুকিয়ে খাচ্ছেন?”

পেটানো শরীরের শক্ত মানুষটা চোখ নামিয়ে হাসে স্মিত। ভরাট স্বরে বলে,“দুটো এক জিনিস নয়।”

_তা ঠিক,তবে দুটোই আমাদের দু'জনের কাছে দু'জনের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের বিষয়বস্তু। যদিও আমার খুব বেশি আপত্তি আছে আমার স্বামী সিগারেট খেলে, তবে সে এ আপত্তির কাজটা আমার সামনেই করতে পারে। এটুকু অভদ্র হলে আমি কিছু বলবো না।

ইহান তাকিয়ে রয়। প্রেরণা লোকটার পাশে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টি দেখতে দেখতে হঠাৎ আনমনে বলে ওঠে,“আজ দুই তারিখ, এ মাসের ভাড়াটা আপনাকে চার তারিখ দেই?”

_কিসের ভাড়া?

_রেস্তোরার।

অবাক হয় ইহান, মিনিট খানেক চুপচাপ চেয়ে থেকে মুখ ফুটে কিছু বলবে তার আগেই প্রেরণা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে,“উহু! যা বলবেন ওটা মানা আমার নীতি বিরুদ্ধ কাজ। আর শুনুন ইহান, আপনার অ্যাপার্টমেন্ট গুলো থেকে ওঠা ভাড়ার টাকাই তো আপনার একমাত্র ইনকাম সোর্স। ওটি আপনার ইনকাম সোর্স! আমি চাইনা আমার স্বামীর ইনকাম কমে যাক। সে দু'হাতে খরচা করুক সংসারে, কখনো তার পকেটে টান না পরুক।”

আধো আলোতে নীল দু'টো গভীর চোখে দীর্ঘসময় তাকিয়ে থেকে ইহান ভেতরে ভেতরে শ্বাস ফেলে পরিপূর্ণতার, পর পর শক্ত হাতে প্রেরণাকে টেনে ঘুরিয়ে নেয়, পেছন থেকে ওর কাঁধে ঠেকায় রুক্ষ পুরুষালি থুতনি । প্রেরণা এই অতর্কিত হামলায় চোখ বুঁজে নেয়, ইহান প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“খেয়েছেন?”

_হু।

অস্ফুট স্বরে জবাব দেয় প্রেরণা,নিরবে সহ্য করতে থাকে কাঁধে অসামাল উৎপীড়ন, প্রতিবাদ টুকুও করেনা। অস্থির শ্বাস ফেলে ইহান দ্বিতীয় দফায় জানতে চায়,“খেয়েছেন?”

_হু! বললাম তো! কবার জানবেন?

কাঁধ থেকে ঠোঁট জোড়া ধীরে ধীরে নামলো হাড্ডিসার গলার মাঝ বরাবর, ভারি শ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে জবাব দিলো,“সেদিন না বললেন খেয়েছেন কিনা যাতে এক বারের জায়গায় দুইবার জিজ্ঞেস করি?”

ঠোঁটের কোণে হাসি জমে প্রেরণার, ততক্ষণে ছেড়েছে নিজেকে, চুপ হয়ে, মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনছে লোকটার প্রতিটা বুলি। বৃষ্টির ছাঁট এসে গায়ে মাখে দু'জনের, ইহান ওকে সরিয়ে নেয় সেই জায়গা থেকে, পাশে যে ধবধবে সাদা দোলনাটা, সেখানে বসে প্রেরণাকে বসিয়ে নেয় ঠিক কোলেই।

এবার প্রেরণা লজ্জা পায়, ভীষণ লজ্জা পায়। এভাবে লোকটার কোলে চেপে বসাতে তার শ্বাস আটকে আসে লজ্জায়। ইহান বোঝে,মুখ ভর্তি খেলা করে দুষ্টুমির হাসি।

“স্যরি এভাবে বসিয়ে দিলাম প্রেরণা, আচ্ছা আপনি চাইলে নেমে আমার পাশে বসতে পারেন, আমি আপনাকে খুব শক্ত করে ধরে রাখিনি।”

কান দিয়ে ধোঁয়া নির্গত হয় প্রেরণার। লোকটা চতুর! ভীষণ চতুর। প্রেরণা মাত হবে বারবার এভাবে!

তবে প্রেরণা নিজে একটু দুষ্টুমি করতে চাইলো আজ, সে সত্যি সত্যি ইহানের পাশে বসে পরে,খুব ভাব নিয়ে বলে,“ইটস ওকে!”

থমথমে হলো ইহানের মুখ। চওড়া পিঠ বেঞ্চিতে ঠেকিয়ে দিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে থাকে, প্রেরণার হাসি চাপে খুব। লোকটার অব্যক্ত অভিমান বাড়তে না দিয়ে ধীরে ধীরে,অতি সাবধানে লোকটার দিকে ঝুঁকে সবিনয়ে আওড়ায়,“এই চওড়া বুক। রাতের একটি সময়ের জন্য কি আমি শেয়ার পেতে পারি? ইফ ইউ ওয়ান্ট!”

আচমকা দূরে কোথাও বেশ শব্দ হয় বাজ পরার, ইহান বলিষ্ঠ হাতে টেনে নেয় প্রেরণার মাথা, নিজের বুকে। আশ্লেষে, আলিঙ্গনে দু'জন তিরতির করে কাঁপে।

খানিক বাদে দু হাতের আজলায় প্রেরণার গাল দু'টো আগলে নিয়ে ইহান উঁচু করে ধরে, তার আবেশিত দৃষ্টি যুগল প্রেরণার ঠোঁটে।‌ প্রেরণা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে আড়ষ্টতায় জমে গিয়ে, পর পর নিজে থেকে বুজিয়ে নেয় চোখ। আর সময় অপচয় হয়না,টের পায় কেউ খুব বেশি ভদ্র হয়ে থাকছে না। বরং একটু বেশিই চঞ্চল যার প্রতিটি পদক্ষেপ।
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি জলের মতো ফোঁটায় ফোঁটায় আবেশ জড়ো হয় প্রেরণার বুকে, চুপচাপ মেনে নেয় কারো অভদ্রতা । কারণ দু'জনের মধ্যে বিনিময় প্রথা চালু হয়েছে, কেউ তাকে একটা চওড়া বুক দিয়েছে, বিনিময়ে প্রেরণা দিয়েছে বেলাশেষে তার নিজস্ব বাকি যা ছিলো সব, সবকিছু! দু'জন দু'জনকে দিয়েছে সমান সমান। দিয়ে যাবে এভাবে, বাকি টা জীবন।

_________

ফকফকে আকাশে উজ্জ্বল রংধনুর মতন রঙিলা প্রতিটা দিন। আজ কাকতালীয় ভাবে আকাশে রংধনুর দেখা মিলেছে, তবে অস্পষ্ট। জানালা থেকে উঁকি মেরে শুদ্ধ আকাশ দেখে, পর পর মাকে বলে,“মাম্মা আমি কি বাগানে খেলতে যেতে পারি?”

বাড়িতে মানুষ বলতে রিতু,আলো,প্রেরণা,প্রণমি,ইনশিরাহ আর বাচ্চারা। পুরুষেরা সবাই বাইরে কাজে গিয়েছে। বিকেল সময় তখন তিনটা।

প্রেরণা শাড়ির আঁচল কোমরে গুজে দোতলার বারান্দার ঝুল ঝাড়ছিলো।
ছেলের আবদারে মিষ্টি করে হেসে প্রেরণা বলে,“এখন? একা একা যেতে হবে না। উনি আসুক তারপর যাবে।”

উনি বলতে ইহানকে বুঝিয়েছে প্রেরণা। আশেপাশে শাশুড়ি আর চাচী শাশুড়িরা, যদি শুনতে পায় প্রেরণা শুদ্ধকে “ইহান আঙ্কেল” শেখায় তবে ভীষণ কথা শোনাবে। প্রেরণা শাশুড়িদের ভয় পায় খুব প্রকাশ না করলেও।

এর মাঝে চলে আসে ইহান, লাঞ্চ সেরে জরুরি প্রয়োজনে ছুটেছিল প্রেরণার কেটরিং সার্ভিসের অফিসে, প্রেরণার হয়ে তেরো লাখ টাকার একটা বিল রিসিভ করেছে। বাড়িতে ফিরেই বিলের কাগজটা প্রেরণার হাতে তুলে দেয়।

শুদ্ধ এসে ওর পাঞ্জাবি খামচে ধরে বললো,“আঙ্কেল বাগানে যাবো!’

_আব্বু বলো শুদ্ধ।

খুশিকে কোলে দোলাতে দোলাতে আলো একটু কড়া গলায় বলে এবার। শুদ্ধ মাথা নিচু করে নেয়, ইহান হেসে ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে বড় মাকে চোখ দিয়ে ইশারা করে এভাবে জোর না করতে এই অবুঝ লোকটাকে।

আলো থিতু হয়না,বলে,“না। অভ্যেস টা করাতেই হবে!”

ইহান দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টাতে শুদ্ধকে কোলে তুলে নিয়ে বলে,“চলো বাগানে যাই।”

প্রেরণা দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয়। রিতু ইচ্ছেকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছিল, প্রেরণার নত মুখটা দেখে বললো,“বাগানে তো তুমিও যেতে পারো! ঘর থেকে বের হতেই চাও না ব্যাপার কি?”

প্রেরণা চুপচাপ শাশুড়ির সামনে থেকে সরে যায় বাগানে যাবে তাই। প্রণমি শুকনো মুখ করে শোনে শাশুড়িরা কথায় কথায় আপুকে বেশ ধমকায়। এতে তার মনটা খারাপ হয় যদিও। আপুকে সান্ত্বনা দিতে মন চাইলো প্রণমির তাই রিতুকে বললো,“মা আমিও কি একটু বাগানে যেতে পারি?’

_না। তুমি তোমার স্বামীর সাথে যেও।

ছোটো বৌকে এক বাক্যে জবাব টা দিয়ে দেয় রিতু। ইশি হাসতে হাসতে ভেঙে পরে তখন, তার মা চাচীদের মুখের দিকে তাকিয়ে বড্ড আমুদে হয়ে বলে,“তোমাদের মতন দজ্জাল শাশুড়ি ঘরে ঘরে হোক!”

বাগানে কিটকট চেয়ারটাতে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে ইহান। তার হাতে একটা বল, শুদ্ধর সাথে খেলছিল এতক্ষণ। এখন শুদ্ধ বাগানের মালি দাদুর সাথে মিলে ফুলগাছের পরিচর্যা করছে। আর ইহান ওকে দেখছে চুপচাপ। প্রেরণা গিয়ে ঠিক তখন ওর পাশে দাঁড়ায় মাথায় ঘোমটা টেনে।

ইহান হেসে ফেলে,ভরাট স্বরে বলে,“মা পাঠিয়েছে ধমকে তাইনা?”

মাথা ঝাঁকায় প্রেরণা। মুখে হাসি বজায় রেখে ইহান বলে,“বসুন তবে।”

প্রেরণা বসতে গিয়েও বসলো না, ইহানের পায়ের দিকে তার মনযোগী দৃষ্টি রেখে বললো,“ইশশ! আপনি নখ কাটেন না কেন পায়ের?”

হাসে ইহান,অলস ভঙ্গিতে পিঠটা কিটকট চেয়ারে হেলান দিয়ে রেখে হাই তুলতে তুলতে বলে,“সময় পাইনা!”

প্রেরণা দাঁড়িয়ে থাকে মিনিট খানেক, অস্ফুটে বলে,“আশ্চর্য!”

কথাটা বলেই প্রেরণা চলে যায় শান্তি নীড়ের অন্দরে। ইহান হেসে হাতে তুলে নেয় পলিটিক্যাল ম্যাগাজিন বইটা। ডুব দেয় ওতে। তারপর খানিকবাদে পায়ে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই ইহান চমকে গিয়ে মুখের সামনে থেকে ম্যাগাজিন সরায়।
বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখতে পায়, প্রেরণা তার পায়ের কাছটাতেই বসে পরেছে, দু'হাতে অবলীলায় তার পা দু'টো কোলের ওপর তুলে নিয়েছে নিজের, হাতের নেইল কাটার দিয়ে ওর নখ কাটছে।

থমকে থাকে ইহান খানিকক্ষণ,পর পর মৃদু ধমকে ওঠে,“হেই প্রেরণা!”

প্রেরণা নির্বিকার ধমকে। তবে এক পায়ের নখ কাটা হয়ে গেলেই আলতো হাতে আরেক পা ধরে বলতে থাকে,“আচ্ছা ঐ যে মিস্টার শীল যে অর্ডারটা দিয়েছিলেন,ওটা আমি হাতে নেই কি বলেন? আপনার কি মনে হয়? ভালো হবে না?”

ইহান জবাব দেয়না, নিস্পন্দ চোখে দেখতে থাকে মাথায় ঘোমটা তুলে রাখা তার অর্ধাঙ্গিনীকে। প্রেরণা বকবক করেই চলেছে আপনমনে,আর নখ কাটছে ইহানের।

দোতলার বারান্দায় ইচ্ছে খুশিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো আলো আর রিতু। দু'জনের মুগ্ধ দৃষ্টি আটকে ছিলো ছেলে আর ছেলের বৌয়ের মুখে।

ওরা দু'জন বেশ খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বিব্রত হয়, চোখ নামিয়ে নেয়। রিতু তার সন্তুষ্টির দৃষ্টি রাখে বড় জায়ের মুখে,আলোও তাই। পর পর স্মিত হেসে রিতুকে বলে,“কি? এখনো বলবি তোর ছেলে ঐ মেয়ের ইকোনমিক্যাল আর সোস্যাল সিকিউরিটি হিসেবে আছে? স্বামী হয়নি ওই মেয়ের? আবেগ হয়নি?”

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 131 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন