#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩২ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
[ ১ম অংশ ]
সদ্য বাজার থেকে আনা মাছগুলো দেখে,সেসবের দাম শুনে কপাল কুঁচকে ফেললো প্রেরণা। সামিন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার মাছগুলো কিচেনে হেল্পিং হ্যান্ডদের হাতে তুলে দিয়ে চলে যায়।
প্রেরণা কপাল কুঁ'চ'কে রেখেই তার চাচা শশুরকে বলে উঠলো,“আপনারা কেউ মাছ কিনতে পারেন না বড় বাবা। আপনাদের কাছ থেকে ডাকাতি করে টাকা রাখে সবাই!”
পাঞ্জাবির গলার কাছের বোতাম খুলতে খুলতে সামিন গা জুড়াতে বসলো সোফাতে, প্রেরণার হাত থেকে ঠান্ডা পানির গ্লাসটা নিয়ে জবাব দিলো,“দাম ঠিক আছে বৌমা। সবকিছু চড়া এ সপ্তাহে।”
প্রেরণা জানে না আসলে এই সপ্তাহে মাছের দাম কি রকম, রেস্তোরাঁয় তো লোক রেখেছে সে। সাব্বির মাস শেষে হিসেব বুঝিয়ে দেবে। ও মুখো তাই হয়না প্রেরণা, বাইরের দুনিয়ায় কোথায় কি হচ্ছে সেসব খুব অল্পই জানে আজকাল। আজকাল বেশি জানে এ বাড়ির কিচেনে মশলা ফুরিয়েছে কিনা, ইহানের পাঞ্জাবি কয়টা ধোঁয়া হয়েছে, তার শ্বশুররা নাস্তায় কোনদিন কি খেতে ভালোবাসে ইত্যাদি ইত্যাদি।
বাজারের কোন জিনিসের দামটা কেমন হলো সেসব কিছুদিন না ভেবে,এই এগুলোই বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে প্রেরণার জীবনে, প্রেরণার কাছে। কিছুদিন না হয় এভাবেই যাক!
“ইহান কিছু জানিয়েছে ফোনে?”
সামিনের কথায় দুই পাশে মাথা নাড়ে প্রেরণা, হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে বলে,“ফোন করছি। ধরছে না।”
বেশ চিন্তিত লাগছে সামিনকে। সামনে নির্বাচন করবে ইহান, আজ দলীয় মনোনয়নপত্র ঘোষণা হবে। সেই ব্যস্ততায় রয়েছে ছেলেটা। রাজনীতি জিনিসটা খুবই অপছন্দের সামিনের কাছে এখন, তবুও ছেলের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েই খুশি।
আজ ইনশিরাহকে নিয়ে যাবে মুঈন। বাড়িতে একটু পারিবারিক ব্যস্ততা রয়েছে। শাশুড়িদের দোতলায় পাঠিয়ে রান্নাঘর পুরোটাই প্রেরণা দখল করে নেয়। ঠিক তখনই কল আসে প্রিতমের। রিসিভ করে বলে,“হ্যা বল প্রিতম!”
_আমি প্রিতম নই। আমি তোমার ভাইয়ের বৌ ওরফে ননদ ওরফে বেয়ান।
ওপাশে কেমন ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ। উদ্বিগ্ন প্রেরণা জানতে চায়,“কি হয়েছে ইনু?”
_ঠান্ডা লেগেছে আপু সামান্য। আচ্ছা আপু, তুমি গ্রোসারিজ কোন ব্র্যান্ডের কোনটা ব্যবহার করো একটু আমাকে বলো। আসলে নতুন সংসার তো, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না আমি। হিমশিম খাচ্ছি। মাম্মা ব্যস্ত চেম্বারে, বড় মা মেজো মা ব্যস্ত ইচ্ছে খুশিকে নিয়ে। তুমিই বলো।
প্রেরণা হেসে তার ভাইয়ের বৌ ওরফে ননদ ওরফে বেয়ানকে কিছু সাংসারিক পরামর্শ দিয়ে কল কাটে। তখুনি কিচেনের দরজায় এসে দাঁড়ায় শেহা। ডাকে প্রেরণাকে,“ভাবী মনি?”
_হ্যা শেহু! আচ্ছা উজ্জ্বল ভাই দুপুরে খাবেন তো?
_সেটাই বলতে এসেছি। খাসির মাংস নামিয়ে রাখবো? উনি আর দাদু গোরু খাননা,এলার্জি!
প্রেরণা এবারো হাসে। শেহা বলে,“এতো হাসো কেন?”
_এমনিই। আমার ননদ গুলোর এক একজনের যার যার সাংসারিক টান দেখে হাসছি। ইশি সকালে বললো মুঈনের জন্য কালাভুনা করতে। ইনু কল করে জানছে প্রিতমের পছন্দের রেসিপি। ভালো ভালো! খুব ভালো!
_আর তোমার বুঝি টান নেই?
শেহা উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে। প্রেরণা লাজুক হেসে মাথা নুইয়ে রাখে।
শেহা উঁকি মারে চুলাতে। সেখানে ইলিশ মাছ লাউ পাতায় মুড়ে ভাজা হচ্ছিল। বড় দাদানের খুব পছন্দের এটা। হেসে ফেলে শেহা,বলে ওঠে,“ভালো খুব ভালো!”
একটু এগিয়ে গিয়ে শেহা পেছন থেকে এবার ধরে ভাবী মনিকে। মিহি স্বরে বলে,“আর দাদানের শুধু খাবার দাবার দেখো না, বাকি সব পছন্দ গুলোও দেখো। দাদানের পছন্দের রং লাল,নীল আর সাদা। আজ একটা পরো! একটু না সাজলে দাদান কিচ্ছুটি বলবে না এটা সত্যি, তবে একটু সাজলেও দাদান মাইন্ড করবে না। তোমার অপরাধ হবে না! বুঝলে বড় বৌ?”
ঘুরলো প্রেরণা, গোল চোখে চেয়ে রইল শেহার মুখের দিকে। শেহা হেসে ভাবীমনির গালে হাত রেখে বললো,“একটু সাজো। দুল ছোটোটার যায়গায় একটু বড়টা পরবে। এই এতটুকুই সাজ। আমার ভালো মানুষ দাদানের জন্য সাজবে, তাকে এটা ফিল করাতে, তার ঘরে বৌ বৌ দেখতে একটা বৌ আছে। স্কুলের হেডমিস্ট্রেস নয়। বুঝলেন ম্যাডাম?”
________
ইরফান তাড়াহুড়োতে ছিলো খুব। অফিসের কিছু কাগজ দেখে ফাইলটা বন্ধ করে আশেপাশে তাকিয়ে ধিমি আওয়াজে ডাকলো,“প্রণো!”
বারান্দায় ইকরি মিকরিকে নিয়ে বসেছিল প্রণমি, শুনছিলো অডিও বুক। ডাক পেয়ে ঘরে এসে দাঁড়ায়।
“দাদানের অফিসে যাবো। গুড নিউজ আছে। দাদান নমিনেশন পেয়েছে। একটু সেলিব্রেশন হবে।”
_আরেহ বাহ! কোনটা পরবেন?
_উমমমম সাদা!
প্রণমি হালকা হেসে আলমারি খোলে। একটা ছোটো আলমারি ভর্তি সবগুলো ইরফানের সাদা শার্ট। তাই বেশি মাথা খাটাতে হয়নি প্রণমির, থাবা মেরে একটা ধরেই টান দিলো যখন, ওর হাতে লাগলো একটা ফাইল।
ইরফান বসে বসে ওকেই দেখছিলো। আচমকা উঠে গিয়ে প্রণমির হাত থেকে ফাইলটা সরিয়ে নিলো চুপচাপ।
দু'জন বড্ড নীরব হলো কিছু সময়ের জন্য। তারপর আচমকাই প্রণমি মলিন হেসে বললো,“এটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন? দরকার নেই তো! বৃথা পরিশ্রম। আমি আমার এই সংকীর্ণ দুনিয়ায় বেশ আছি। এতগুলো ভালোবাসার মানুষ, আপনার মতন স্বামী, স্বামীর আদর আর দৈনন্দিন কাজ! এর বাইরে আর কি লাগে?”
বলেনা কিছুই ইরফান, চুপচাপ ফাইলটা নিয়ে আরেক স্থানে সরিয়ে রাখে। প্রণো বলতে থাকে,“নাকি আপনি পরিপূর্ণ হননি.....”
বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারেনা প্রণমি, টের পায় রুক্ষ হাতটা বেশ জোর খাটিয়েই মুখটা চেপে ধরেছে ওর। কিছু বলতে দেবে না তাই। প্রণমি হেসে ওঠে।
রাগটাকে চেপে রেখে ইরফান প্রসঙ্গ বদলায়,“থাকো! আমাকে আগে প্রিতমের অফিসে যেতে হবে।”
_কি ব্যাপার? ভাইয়ার সাথে খুব ভাব হলো নাকি?
_ওর সাথে আমার? জিন্দেগীতে না। ওটা তো ও বলেছিল ভাইয়ার এই দিনে ও থাকতে চায়। তাই নিয়ে যাবো।
প্রণমি চুপ থাকলো খানিক সময়,পর পর বলে উঠল,“আপনার আর ভাইয়ার মধ্যে এতো ঝামেলা হতো কেন বলুন তো। আপনি ভাইয়াকে খুব হিংসা করতেন জানি!”
চোখ ছোটো ছোটো হয়ে এলো ইরফানের, বললো,“হিংসা আর ওকে? ও ফার্স্টবেঞ্চার টপার হলে আমিও ব্যাকবেঞ্চার টপার ছিলাম। পপ্যুলারিটি ওর চেয়ে কম নেই হ্যা? আর শোনো, মেয়েরা ওর পেছনে পরে থাকতো নোটসের জন্য। আর আমার পেছনে পরে থাকতো হুদাই, আমার জন্য। তাহলে বলো কার লেভেল উঁচু?”
প্রণমির খুব গাঁয়ে লাগছে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বলায় এভাবে। তাই সে ঝগড়া শুরু করে,“হ্যা জানি আপনার লেভেল। আগ বাড়িয়ে আমার ভাইয়ার সাথে ঝামেলা করতেন!”
_তা করতাম! অস্বীকার করবো না। তবে শেষবার কিন্তু তোমার ভাইয়ের দোষ ছিলো।
_মোটেও না, ভাবী ভাইয়াকে অ্যাপ্রোচ করেছে।
_আরে সেই ঝামেলার কথা বলছি না, তার আগের টা। ও-ই তো সবটা জেনেও রিপ্পির পেছনে.....
কথাটা সম্পূর্ণ বলতে পারলো না ইরফান। অর্ধেকটা বের করে আবার ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়েছে। থতমত খেয়ে খুকখুক কেশে উঠেছে।
_রিপ্পি কে?
প্রণোর ভ্রু যুগল গুটিয়ে এলো মাঝখানে। ইরফান শ্বাস ফেলে বলে,“প্রণো সাদা শার্ট দাও!”
_বলুন রিপ্পি কে?
_আরে আমাদের এক বন্ধু মানুষ। খুব ভালো ফুটবল খেলে। তুমি সাদা শার্ট দাও।
মিনমিনে স্বরে জবাব দেয় ইরফান।
_ছেলেদের নাম রিপ্পি হয়?
_হবে না কেন? রুমি,নিপু,নয়ন,ইফতি ছেলেদের নাম হয় জানো না? তেমন করেই রিপ্পি। সেদিন তো দেখলাম এক ছেলের নাম প্রণমি! হাহাহাহাহ!
তুমি সাদা শার্ট দাও।
ইরফান জোর করে হাসার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার হাসি আসছে না। সত্যিটা সে বলে দিলেই পারে। তবে অষ্টাদশী ন্যাকাবোকা বৌয়ের আবেগ সামলানোর মতন সময় এখন তার হাতে নেই। ইরফান একশো শতাংশ নিশ্চিত রিপ্পির বিষয়টা জানতে পারলে তার বৌ ঠিক কি রিয়াকশন দেবে। যার জীবনে আগে কখনো প্রেমময় পুরুষ ছিলো না সেই মেয়েরা এই সব বিষয়ে খুবই সেনসেটিভ হয়। আর ইরফান জানে ইরফানকে ঠিক কতটা ভুগতে হবে। দাদানের এই বিশেষ দিনে নিজের দাম্পত্যে রিপ্পি ঢুকাতে চায়না সে। অত আহাম্মক ইরফান নয়।
প্রণমি নিশ্চুপ। ইরফান ওকে ধরলো শক্ত করে, প্রসঙ্গ পুরোপুরি ঘোরাতে কয়েক দফা,কয়েক ভাবে চুমু খেয়ে বললো,“আসছি হ্যা?”
_রিপ্পির বিষয়টা পুরোপুরি বললেন না যে?
হাঁফ ছাড়ে ইরফান, বলে,“বলবো। আরেকদিন। আজ যাই? সাদা শার্ট টা দাও।”
_________
পার্টি থেকে বিশাল মিছিল ও প্রেসক্লাবের সামনে বিশাল আলোচনা সভা সেরে একটা ব্যস্ত দিনের পরে বাড়ি ফিরলো দুই ভাই। সাথে ছিলো শুদ্ধ। তখন প্রেরণা সবে মাত্র গোসল শেষ করেছে। গাঁয়ে জরিয়েছে লাল রঙের একটা হাফসিল্কের শাড়ি। শাড়ির পাড়টা আবার সোনালি। গলার চেনটা একটু মোটা, কানের দুলটাও বড়। সব মিলিয়ে স্বর্ণালংকারে চকচক করছিলো সে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল শুকিয়ে নিতে নিতে প্রেরণা হাসে সামান্য নিজের সাজ দেখে। নিজেরই চোখে বিঁধছে তার এই সাজ। নিচ থেকে আওয়াজ আসছিল সেলিব্রেশনের। বাড়ির পুরুষ গুলোর হেরে গলার হাসাহাসি আর উচ্চশব্দে কথাবার্তা, তাদের সাথে সম্ভবত যোগ দিয়েছে বাড়ির জামাই দুজন। মুঈন আর উজ্জ্বলও এসেছে। মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি হচ্ছে।
প্রেরণা লোকাল চ্যানেলে এতক্ষণ দেখেছে ইহানকে। ঘর্মাক্ত মুখটাতে ক্লান্তি ছিলো না, অনর্গল মাইকে উচ্চ শব্দে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সাথে দোয় চাইছিল। পাহাড়সম উচ্চতার বলবান এক সৌম্য পুরুষ, ঠিক ততটাই বিনয়ী। দেখেছে প্রেরণা চেয়ে চেয়ে,বুকের মধ্যে অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করেছে কিশোরী বৌদের মতন। জীবনের একাংশে এমন একটি মানুষের সঙ্গী হয়ে সেবা করার সুযোগ পেয়েছে সে।
প্রেরণা যায়না নিচে এভাবে, দরজার সামনে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। এসব কিছু যদি কারো চোখে পরে? দীর্ঘদিন যাবত সাদামাটা থাকার কারণে প্রেরণার চিন্তাভাবনা এতটা রক্ষণশীল হয়েছে যে সামান্য সাজও তার কাছে বড্ড বাড়াবাড়ি মনে হয়।
অন্য কারো চোখে পরলো না, শুরুতেই পরলো ইরফানের চোখে। লাফিয়ে লাফিয়ে দোতলায় উঠে লিভিং রুমের কাছটাতে ভাবীমনিকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তার পা থামলো। গোল গোল চোখে চেয়ে দেখলো ভাবী মনিকে। পর পর বাঁকা হাসলো।
“হাসছো কেনো?”
অস্বস্তির শ্বাস ফেলে প্রেরণা জানতে চায়। ভ্রু উঁচিয়ে ইরফান বললো,“কেবল মাত্র বাড়িতে ফিরেছে দাদান, একটু ক্লান্ত। এখুনি সামনে যাবেন না প্লিজ। টায়ার্ডনেসে যদি ঠিকঠাক কম্প্লিমেন্ট দিতে না পারে তবে তো আবার ফুলবেন!”
_ওসব কিছু না!
চোখ রাঙায় প্রেরণা।
_বুঝি!
_কচু।
পাশের তাক থেকে মোমের পুতুলটা তুলে ইরফানের গাঁয়ে ছুড়ে মারলো প্রেরণা। ওটাকে ক্যাচ করে ইরফান হাসতে হাসতে বললো,“আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে ভাবী মনি। ঠিক দাদানের বৌয়ের মতন। আজ বেশ খানিকক্ষণ দাদানের মেজাজ উত্তপ্ত হয়ে ছিলো নির্বাচন কমিশন অফিস সংশ্লিষ্ট ঝামেলায়। সেখানে এখন বর্ষা নামাবেন আপনি। থ্যাংক ইয়ু!”
ইরফান চলে যায়। একে একে দোতলায় ওঠে বাকিরা। মুঈন-ইশি, শেহা-উজ্জ্বল। প্রেরণাকে ওভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সকলেই মিটিমিটি হেসে চলে যায়। বাকিরা ইরফানের মতন ঠোঁটকাটা নয়, তাই দু'টো লাজের কথা শুনিয়ে দিতে পারলো না প্রেরণাকে।
কিছুক্ষণ বাদেই ইহান উঠলো শুদ্ধর হাত ধরে। প্রেরণা চুপচাপ শুদ্ধকে আগলে ধরে ইহানকে অভিনন্দন জানায়। ইহান মাথা নেড়ে জবাব দিয়ে ঘরে ঢোকে। শুদ্ধকে ইউনিফর্ম পাল্টাতে হেল্প করে প্রেরণা এসে দাঁড়ায় ইহানের সামনে, লোকটা তাকে খেয়াল করেনি দেখে অদ্ভুত রকমের মজা পাচ্ছে প্রেরণা। মজা পাচ্ছে এটা দেখে, শখ করে ঘাড়ে নেওয়া দায়িত্ব গুলোর চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে ইহান তাজওয়ার মির্জা চোখে সর্ষে ফুল দেখছে। সর্ষে ফুলের কারণে বাকিসব তার চোখেই পরছে না।
ইহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার ঘামে ভেজা জবজবে পাঞ্জাবি খুলতেই যাচ্ছিল তখন প্রেরণা বলে উঠলো,“শুনুন।”
_বলুন।
_কাল থেকে বুঝি সভা সেমিনার?
_জি।
_ঐ খবরে দেখলাম দক্ষিণের মেয়রকে সেদিন গুলি করার চেষ্টা করেছে কেউ!
ইহান থমকে তাকায়, প্রেরণার মুখটাও থমথমে, দৃষ্টিতে উৎকণ্ঠা। ইহান হালকা হেসে বলে,“তোহ?”
শাড়ির আঁচল দুহাতে মুচড়ে যাচ্ছিলো প্রেরণা,ওর চেহারা মলিন। মলিন স্বরেই বললো,“তোহ সাবধানে থাকবেন।”
ইহান তাকিয়ে রয়। প্রেরণা এইবার চোখ নামিয়ে হঠাৎ ব্যগ্র ভঙ্গিতে বলে,“আপনারা এসব সভা সেমিনারে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরে নিতে পারেন না?”
কন্ঠের ব্যগ্রতা আর ব্যাকুলতায় ইহান নির্মল হাসে মাথা নুইয়ে, হাতঘড়িটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে গম্ভীর স্বরে বলে,“সামনে আসুন।”
প্রেরণা এগিয়ে গিয়ে ঠিক সামনে দাঁড়ায়। ওর হাতটা টেনে ইহান নিজের পাঞ্জাবির বোতাম ধরিয়ে দিয়ে বলতে থাকে,“আপনাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।”
একটা একটা করে বোতাম খুলে প্রেরণা,“আর আমার জবাব?”
_সিকিউরিটি থাকে আমার সাথে!
_ব্যস?
_আর থাকে আপনাদের সকলের দোয়া।
প্রেরণা চুপ হয়ে যায়। পর পর বলে,“আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। সবাই খেতে বসবেন একসাথে।”
_নাহ, আমি পরে খাবো। আজ শুদ্ধ আর আমি সুইমিং করবো!
_সেকি! আজ? আজ কত ক্লান্ত আপনি!
_জি আজই! বিকাজ আই প্রমিজড হিম!
নিষ্পলক কিছুক্ষণ লোকটাকে দেখে প্রেরণা হাঁফ ছাড়ল। বললো,“অনেকটা বেশি লাই দিয়ে ফেলছেন ওকে।”
এটুকু বলতেই প্রেরণা দেখলো লোকটা গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে। প্রেরণা ফিরিয়ে নিলো নিজের কথা, মৃদু শ্বাস ফেলে বলে,“যা ইচ্ছা করুন!”
কথাটা বলেই প্রেরণা ঘর থেকে বেরুতে নিলে ইহান পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো ওকে। ঘটনার আকস্মিকতায় নির্বাক প্রেরণা চেয়ে রইল গোলগোল চোখে, নিয়ন্ত্রণ সামলাতে ধরলো ইহানের গলা, খানিক বাদে বললো,“কি এটা?”
_আপনি যাবেন আমার সাথে!
_ওমা কেন?
_আপনাকে সাঁতার শেখানো হবে।
_হঠাৎ তা কেন?
_বিকজ আই প্রমিজড হিম! শুদ্ধর মাম্মাকে সাঁতার শেখাবো।
প্রেরণা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে, লোকটার কথাবার্তা শুনে হতবাক। এরপর খানিকসময় মৃদু ধস্তাধস্তি হয় প্রেরণার সাথে। লোকটার পাহাড় সাইজ শরীরের মাঝে প্রেরণা একটা খ্যাংরাকাঠি। পেরে ওঠা প্রেরণার সাধ্যি? শুধু অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলল,“ছাড়ুন ! ছাড়ুন আগে। আমি গোসল করেছি।”
_গোসল বহুবার করা যায়। বিকেলে আরেকবার করবেন!
খুবই সহজ ভঙ্গিতে একটা লাজের কথা বলে দিলো লোকটা। প্রেরণা লজ্জা পাবে নাকি রাগ করবে? সে দ্বিধান্বিত! শুধু আওয়াজ তুলে বলল,
_ইহান!
_চেচাবেন না! লোক ছুটে আসবে!
দু'পাশে ঘনঘন মাথা নাড়ে প্রেরণা,“এটা আপনার সাথে যায়না। কেউ দেখলে কেলেঙ্কারি!”
অবাক ইহান,ফিরতি প্রশ্ন ছোঁড়ে,“আমার সাথে যায়না? তবে কার সাথে যায়? কে আপনাকে কোলে নেবে আর? হোয়্যাট দ্যা.....”
_নো নো আই ডিন্ট মিন ইট! শুনুন কেউ দেখবে!
_কেউ দেখবে না।
এগিয়ে যেতে থাকলো ইহান, পুরো লিভিং রুম ফাঁকা, সবাই যে যার ঘরে গোসল সেরে ডাইনিংয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে হয়তো।
প্রেরণা চালিয়ে যায় প্রতিবাদ,“দেখবে। শুদ্ধ তো দেখবে!”
_দরজায় নামিয়ে দেবো। আর দেখলেও ফিরে তাকাবে না, বেটা ওয়েল ট্রেইনড আছে!
বলতে বলতেই পুল সাইডে যেতে বড় দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে পরে ইহান থমকে। সেকেন্ড ফুরোতেই প্রেরণাকে কোল থেকে নামিয়ে দিল তড়িঘড়ি করে। দু'জনেই বিব্রত বেশ। প্রেরণা মাথা তুলে সামনে দেখার সাহস করে না আর, এক পলকে সামনে শশুর শাশুড়িদের পায়ের আংশিক দেখেই চুপচাপ ঘুরে ঘরে চলে যায়। মেয়েটা দারুণ লজ্জা পেয়েছে। লজ্জায় ঘাম ছুটে গিয়েছে।
শুদ্ধ পুলের একসাইডে মাম্মার জন্য ফ্লোয়াটিং জ্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে ছিল ,ইহান তাকে যেখানে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গিয়েছিল সেখানেই। ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সকলে। সামিন,ইলহাম, ইশমাম, এই বাড়ির গিন্নীরা, মেয়ে জামাই সকলে। শীতের দুপুরে গোসল সেরে সবাই ঘটা করে ভিটামিন ডি নিতে গিয়েছিলো ওখানে।
ইহান চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শক্ত হয়ে। ইশি মুঈনেরা মিটিমিটি হেসে চলে যায়। মুরব্বিরাও পিছু পিছু।
লিভিং রুম পর্যন্ত এসেই সামিনের পা থামে, তাকে অনুসরণ করে পা থামায় বাকিরা। তখন সামিন থমথমে গলায় আলোদের বলে ওঠে,“ছেলে আর ছেলের বৌদের আলাদা করে দেওয়ার সময় এলো নাতো?”
আলো বেশ বিরক্ত, তেতো স্বরেই জবাব দিলো,“না, সময় এসেছে আমাদের ঘরময় অহেতুক পায়চারী কমিয়ে দেওয়ার। চলুন খেতে চলুন।”
চলমান.....
[ ২য় অংশ আছে এটার। কখন দিতে পারবো জানি না। জ্বর কমলে দেবো। ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩২ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
বিকেলে আবহাওয়া বেশি ঠাণ্ডা হবার পূর্বেই মুঈন ঠিক করলো বৌ বাচ্চাদের নিয়ে বেড়িয়ে পরবে। ওদের বাড়ি থেকে নামার কথা ছিলো সন্ধ্যায়,তবে শেষ বিকেলেই মুঈন তাড়া লাগায় ইশিকে।
অলসতা ঘিরে রেখেছিল ইশিকে। তার একটুও মন চাইছে না উঠতে। ইচ্ছে-খুশিকে একসাথে কোলে নিয়ে দোল খাওয়াচ্ছিল মুঈন,ইশির এহেন আচরণে কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে বললো,“ওদের ঠান্ডা লেগে যাবে সন্ধ্যার পরে! বোঝো তুমি?”
ইশি হা করে তাকিয়ে আছে, লোকটা ধমকের মতন বললো না কথাটা? পর পর গুটিয়ে নেয় ভ্রু যুগল। আঙুলে নাকের ডগা ঘষে প্রত্যুত্তর করে,“না বুঝি না। আপনিই বুঝেন। মাসাজ ওয়েল, টেলকম পাউডার, সোপ থেকে শুরু করে টাওয়ালের রংটা অবধি বুঝে এসেছেন আপনি! তো আমি বুঝে করবো টা কি? ওরা আপনার। আমার কিছু হয় নাকি?”
বলতে বলতেই মুখটা ফুলিয়ে নেয় ইশি। অপারেশনের পরে পাতলা ফিনফিনে শরীরটা একটু ফুলে গিয়েছে, মাতৃত্বকালীন স্থূলতার প্রথম লক্ষণ। তবুও পবিত্র স্নিগ্ধতা ঠিকরে পরছে ঐ শ্যামবর্ণের শরীরটা থেকে।
হেসে ফেলে মুঈন সামান্য,জবাবে বলে,“আমি তোমার অধিকার খর্ব করে রাখি নাকি?”
বিছানার হেডসাইডে হেলান দিয়ে দিয়ে ইশি মুখ ভার করে রাখে। এগিয়ে যায় মুঈন বাচ্চাদের কোলে আগলে নিয়েই। মুখটা বাড়িয়ে চুমু খায় ইশির কপালে, হাস্কি স্বরটা খুব কৌশলে খাঁটো করে আদুরে ভঙ্গিতে বলে,“হ্যা সত্যিই রাখি! Because it's worth it !”
_তা কেন?
_তোমার সুস্থতার অপেক্ষায়। তুমি সুস্থ হলে আমি ফিরেও চাইবো না ইশি। সারাদিন বাইরে কাজ শেষে বাড়িতে এসে দেখবো তুমি স্মুথলি সবকিছু সামলে নিয়েছো! আমার বাচ্চাদের! আর আমার পরিবারকে, তোমার মতো করে।
তখন ওদের টেলকম পাউডারের ব্র্যান্ড নিয়ে জ্ঞান কপচাতে যাবোনা কেমন? কজ আমি জানি তুমি চমৎকার একজন মা হবে! মা হিসেবে তুমি নির্ভুল হবে!
ইশি তাকিয়ে আছে, নিমিষেই চোখ দু'টো বাষ্পাকূল হয়,বলে,“কিভাবে বুঝলে?”
মুঈন বলেনা কিছু, সামান্য হাসে। তখনই ইচ্ছে-খুশি কেঁদে ওঠে। ওদের একটা ব্যাপার আছে, কাঁদলে দুজনেই একসাথে কেঁদে ওঠে! দু'জনকে একসাথেই সামলাতে হয়। ভবিষ্যতে ইশির ভোগান্তি বাড়বে বৈ কমবে না।
মুঈন মেয়েদের খুবই দক্ষতার সহিত ধরলো ইশির সামনে, ইশিও ওদের খাওয়াবে বলে উতলা। প্রতিবার হিমশিম খেতে হয় বাচ্চাদের খাওয়ানোর সময়টিতে। তবে এতদিন মাম্মা আর চাচীরা সামলেছে বলে ইশির কষ্ট হয়নি। আজ মুঈনের সামনে লজ্জায় মিশে যায় মেয়েটা।
মুঈনের চোখ মুখের ভঙ্গি খুবই সহজ এবং স্বাভাবিক, পাতলা একটা ওড়না টেনে অতি যত্নে ঢেকে দেয় ইশিকে। চোখ রাখে না ইশির চোখেও, জানালার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে ধীমি আওয়াজে টুকটাক তার ডিউটি জীবনের কথা বলে যায়। ইশি মিটিমিটি হেসে দেখে তার ফরাজীকে। লোকটা কেন এতো আলাদা বুঝলো ইশি! লোকটা জানে তার সীমারেখা। জানে বৌয়ের সাথে চূড়ান্ত অসভ্য লোক হলেও তাকে একজন মাকে লজ্জা দেওয়ার এখতিয়ার নেই। বিয়ের পর থেকে লোকটা প্রতিটা দিন এক অসহ্যকর ইনশিরাহর সকল ধরণের অনুভূতি সামলেছে খুবই নমনীয় হয়ে, বিভিন্ন পরিস্থিতি বিভিন্ন অবতারে সামলেছে। এখন ইশির মাতৃত্ব টাকেও কি চমৎকার ভাবে সামলে নিচ্ছে! এজন্যই তো লোকটা ইশির ফরাজী, তার মুঈন ফরাজী!
ইশি শুধু মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে।
__________
মেয়ে জামাইয়ের প্রতি আলো সামিনের যেন কোনো অনুভূতিই নেই, সবটুকু নিয়ে নিয়েছে ইচ্ছে খুশি। দু'জনকে ছাড়বে না এমন ভঙ্গিমায় বুকের সাথে আগলে ধরে রেখেছে।
শান্তিনীড়ের সামনে গাড়ি দাঁড় করানো। ইচ্ছে খুশি ঘুমে নিমগ্ন,টেরও পায়নি আজ তারা যাচ্ছে তাদের পাপার কাছে। দু গালে, কপালে কতশত চুমু এঁকেছে সকলে! নানী নানুরা, মামা মামীরা, খালা খালুরা। ওরা টের পাবে কি! ঘুমেই অচেতন প্রায়।
সব মালামাল গাড়িতে তোলা হয়েছে। গাড়ির দরজা খুলে মুঈন তাকিয়ে আছে তার শ্বশুরের মুখের দিকে। মেঘ সম গম্ভীর ওই ফ্যাকাশে মুখটা। মুঈনের আসলে হাসি পাচ্ছে। এই হাসি ততদিন হাসবে যতদিন না তার মেয়ে বড় হয় এবং তাকেও একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
শশুর শাশুড়িকে অনেক বলেছে তাদের সাথে যাওয়ার কথা,তারা নিজেদেরকে তথাকথিত বাঙালি আত্মমর্যাদায় বলীয়ান রেখেছে। এখানে মুঈনের কি করার আছে? তবুও শেষ পর্যন্ত মুঈন বললো,“মন খারাপ করবেন না বাবা। এখান থেকে আধাঘণ্টার পথ। আমি খুব ভালো করেই জানি মর্নিং ওয়াকের নাম করে আপনি রোজ উপস্থিত হবেন। তাই আপনাকে আসলে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না! আসলে আমার ভেতর থেকে সান্ত্বনা আসছে না।”
জামাইয়ের কথায় থমথমে সামিনের মুখটা। বাকিরা সবাই হাসতে থাকে।
“আমি রোজ যাবো মানে? এটা কেমন কথা বললে? নেমন্তন্ন ছাড়া রোজ মেয়ে জামাইয়ের বাড়িতে যাওয়ার মতন লোক আমি নই! আর তোমার আমাকে সান্ত্বনা দিতে হবে না। উল্টো আমি দোয়া করি তোমাকে একদিন যেন কেউ সান্ত্বনা দেয়!”
মুঈন থতমত খেলো, অসহায়ের মতন মুখ করে তাকালো ইশির দিকে, চোখে চোখে জানতে চাইলো সে কি খুব জঘন্য মস্করা করে ফেলেছে শশুরের সাথে?
পরিস্থিতি সামলে নিতে ইহান তাড়া দিলো ওদের,“আচ্ছা শীত নামছে খুব। এবার তোমরা বেড়িয়ে পরো মুঈন।”
ইরফান গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসেছে। বোন জামাই আর ভাগ্নিদের পৌঁছে দেবে সে। ইশি বিদায় নেয় সবার থেকে, মায়ের দু গালে চুমু খেয়ে শেষে গিয়ে দাঁড়ায় পাপার সামনে। সামিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“একজন দক্ষ জীবনসঙ্গী হও,একজন শক্তিশালী মা হও! ওদের সামলে রেখো। ভালোমন্দ মুঈনের সাথে শেয়ার করার পরেও যদি অস্থিরতা না কমে, নির্দ্বিধায় আমাকে কল করবে। আমার জীবনটাই তোমার।”
ইশি এবার আটকাতে পারেনি নিজেকে, পাপাকে জরিয়ে ধরে দু দণ্ড কাঁদার পরেই ওর মা চাচীরা জোর করে বসিয়ে দিলো গাড়িতে। পরিস্থিতি হঠাৎ কেমন গুমোট হয়ে এলো বাপ বেটির এই হৃদয় বিদারক মুহুর্তে, যেটা বরাবর হয়।
ইরফান পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করতে বললো,“ভাই আমিই কেনো সবসময় তোর ড্রাইভার হবো? এটা ঠিক নয়।”
হাসলো মুঈন, বললো,“বেড়িয়ে এসো!”
_কেন? মাইন্ড করলেন নাকি ভাইয়া? আই ওয়াজ জোকিং!
_না মাইন্ড করিনি! গিয়ে পেছনে বোন আর ভাগ্নিদের নিয়ে বসো। ড্রাইভ আমি করবো!
ইরফান তাই করলো। গাড়ি বেড়িয়ে পরলো শান্তি নীড়ের গেট থেকে। ইশির চোখ থেকে জলের নীরব ধারা বহমান। ইরফান একাই ভাগ্নিদের দু'হাতে আগলে ধরে রেখেছে, ইশির মুখটা আড়চোখে বারকয়েক দেখে মিনমিনে সুরে বলে,“একদম তোর মতন দেখতে হয়েছে ওরা! খাসলত তোর মতন না হলেই হয়!”
হাসে ইশি,হাতের পিঠে চোখের জল মুছে বলে,“হু! আসলেই! খাসলত আমার মতন না হলেই হয়!”
__________
একঘন্টার মাথায় গোটা বাড়িতে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইচ্ছে-খুশি চলে যাওয়াতে এতদিনের হাসিখুশি ভাবটাই যেন উবে গিয়েছে কর্পূরের মতন। এমনকি শুদ্ধও চুপচাপ,ইকরি মিকরিকে নিয়ে বসে আছে। তারও কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে সবকিছু।
সন্ধ্যার চা পর্ব সবাই বেশ মনমরা হয়ে শেষ করেছে। ইশিরা পৌঁছেছে,আলো কল করে জানলো সে কথা। ভিডিও কলে দেখলো আবার নাতনিদের। এত দেখে, তবুও মনটা ভরে না যেন।
প্রেরণার শশুরেরা সকলেই নিচতলায় ছিলো। শাশুড়িরা দোতলায়। ইহান বাড়িতে নেই,পার্টির একটা বিশেষ কাজে বেড়িয়েছে। ফিরবে রাত দশটা নাগাদ।
প্রেরণা ঘর থেকে বেড়িয়েই শুদ্ধকে চোখে পরতেই বলে উঠলো,“শুদ্ধ পড়তে বসতে হবে না? আজ কিন্তু পড়া ইহান আঙ্কেল ধরবে তোমার!”
কথাটা বলে নিজেই বোকা বনে যায় প্রেরণা, অস্বস্তি লুকিয়ে ত্বরিত তাকায় শাশুড়ির মুখের দিকে। দেখতে পায় ততক্ষণে সে তার শাশুড়িদের শীতল দৃষ্টির শিকার হয়ে গিয়েছে।
ঢোক গেলে প্রেরণা। আলো বলে ওঠে,“ক'বার বলবো তোমাকে? আমরা কি বাড়াবাড়ি করছি? তুমি নিজেই আগ্রহ দেখাও না। ইহান শুদ্ধকে পিতৃ স্নেহ দেয় প্রেরণা। বাবা,পাপা অবশ্যই ডাকবে না! তবুও অন্যকিছু ডাকা শেখাও! খুবই বিরক্ত হচ্ছি আমরা! ইহান সবকিছু তোমার মতের ওপর ছেড়ে দেয় বলে তুমি এতো অবুঝ হতে পারো না!”
রিতু থমথমে মুখে বসে আছে, আসলে এবার তার রাগ লাগছে। রোজ এ লোক,সে লোক টিটকারি মেরে জানতে চায় শুদ্ধ ইহানের বন্ডিংয়ের ব্যাপারে। রিতুর সহ্য হয়না তার ছেলের নৈতিকতা নিয়ে কোনো কটু কথা!
প্রেরণা মাথা নুইয়ে নেয়, ধীরে ধীরে বলে,“চেষ্টা করছি বড় মা!”
শুদ্ধর হাতটা নরম করে ধরে এইবার শাশুড়িদের সামনে থেকে চলে যায় প্রেরণা। শুদ্ধর ঘরে ঢুকে ওকে বিছানায় বসিয়ে প্রেরণা হাঁটু ভেঙে ছেলেটার সামনে বসে। আসলেই সে অলসতা করছে, গাঁয়ে না মেখে সে ভুল করছে। তাকেই কিছু একটা করতে হবে। এটা তো ঠিক, ইহান শুদ্ধর আঙ্কেল নয়, আরো অনেক কিছু! এটা একটা খুবই জাদুময় সম্পর্ক!
মাম্মা বকুনি খেয়েছে দীদুদের থেকে,শুদ্ধ এতটুকু বুঝতে পারলো। তবে কারণটা অবশ্যি ধরতে পারলো না। বললো,“দীদু তোমাকে ধমকালো কেন?”
মলিন হাসলো প্রেরণা, ছেলের গালে হাত বুলিয়ে বলল,
_দীদু ধমকালো কারণ আমি শুদ্ধকে একটা জিনিস শেখাতে পারছি না। অলসতা করছি।
_কি শেখাতে পারছো না মাম্মা?
এবার ছেলের গাল টেনে দিয়ে প্রেরণা বললো,“শুদ্ধ ইহান আঙ্কেলকে আব্বু ডাকবে সেটা!”
_কিন্তু ইহান আঙ্কেল কি আমার আব্বু?
_তোমার কি মনে হয়?
_আব্বু মানে কি?
হাঁফ ছাড়ল প্রেরণা। নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল ছেলের মুখপানে দীর্ঘ সময়, তারপর ধীরে ধীরে বললো,“আব্বু মানে একজন অভিভাবক। যে সবসময় একটা বাচ্চাকে আগলে রাখে, তার যত্ন করে। তার হোমওয়ার্ক দেখে, রাতে ঘুমানোর আগে তাকে একগ্লাস দুধ খাইয়ে দেয়, তাকে পিঠে নিয়ে বুক ডাউন দেয়, তার সাথে সুইমিং করে। একজন আব্বুর বৈশিষ্ট্য এটা। তুমি এখন ভাবো ইহান আঙ্কেল তোমার আব্বু হলো কি না! কেমন?”
শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে মেলাতে থাকে মাম্মার কথার সত্যতা। আব্বু মানে যদি এসব হয় তাহলে তো ইহান আঙ্কেল আব্বুই! যেমন নিনিতার আব্বু আছে, রাহির আব্বু আছে, মাহিমের আব্বু আছে! শুদ্ধরও তো আব্বু তবে ইহান! কি আশ্চর্য! বিষয়টা শুদ্ধর মাথায় এখন খেলে গেলো।
ছেলের সম্মুখে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছে করলো না প্রেরণার। ওকে রেখে ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে দোর আঁটে। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দিয়ে হাঁপাতে থাকে ক্রমাগত, পরপর অস্ফুটে বলে,“আমি তোমাকে বোঝাতে পারবো না বাবা। এটুকু জানি হয়তো আব্বু মানে তোমার ইহান আঙ্কেল। এ তোমাদের মধ্যকার সমঝোতার বিষয়। তুমি আর তোমার ইহান আঙ্কেল বুঝে নাও। হচ্ছে না আমার দ্বারা। হচ্ছে না!”
___________
বেশ রাত করেই ফিরেছে ইহান, সাথে ইরফানও। কিছুদিন ভাইয়ের পলিটিক্যাল বিষয়ে দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিয়েছে সে। দাদানের সাথে সাথেই থাকবে। তবে ওকে সাথে নিতে নারাজ ছিলো ইহান, স্বভাব চরিত্র যা বলে তাতে ওকে বেশিদিন সহ্য করা যাবে না ইহানের পক্ষে। কটা দিন ধৈর্য্যের পরিক্ষা দেবে এই যা।
প্রেরণা জেগে ছিল ইহানের জন্য, বাকিরা যে যার ঘরে ঘুমিয়েছে। শুদ্ধও জেগে আছে চোখ পিটপিট করে। ঘুম আসছিল না তাই মাম্মার কাছে এসেছিলো।
ইহানকে দেখেই উঠে দাঁড়ায় প্রেরণা, বললো,“খেয়ে এসেছেন দুইভাই? আমি কিন্তু সব তুলে রেখেছি! না খেয়ে আসলে বলুন সব গরম করছি!”
একটু খানি হাসে ইহান। হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা শুদ্ধকে কোলে নিয়ে বলে,“খেয়ে এসেছি! আপনি বসুন।”
প্রেরণা বসে। আলাপ তোলে সামনে রিইউনিয়ন নিয়ে। একটা পিকনিক করবে তারা শীতের মাঝামাঝি। গাজীপুরে মির্জাদের যে বাগান বাড়িটা আছে, সেখানেই যাবে তারা।
এসবের পরে ইহান শুরু করে শুদ্ধর সাথে রাজ্যের আলাপ। সে এ ঘরে কেন,তার কি মাম্মার সাথে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে আজ? এ কথা সে কথা কৌশলে জানতে চায় ছেলেটার কাছ থেকে।
শুদ্ধর এবার ঘুম পাচ্ছে,হাই তুলতে তুলতে ছেলেটা গম্ভীর হয়ে বলে,“না আমি আমার ঘরেই ঘুমাবো।”
ঘুমের ঘোরে নিভু নিভু অবস্থা হয়েছে ওর। ইহান আদুরে জীবটাকে দু'হাতে কোলে তুলে নিয়ে বলে,“ঠিক আছে। ঘরে দিয়ে আসছি। তুমি চোখ বন্ধ করো!”
শুদ্ধ তাই করলো, ছেলেটাকে ঘরে বিছানায় রেখে ওর ঘুমানোর অপেক্ষা করে তবেই বেরুলো। ঘরে ঢুকে দেখলো প্রেরণা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে বিনুনি করছে।
নিজের ঘরে,নিজের আশ্রয়ে নিজের কাঙ্ক্ষিত নারীটিকে এমন স্নিগ্ধ রূপে রোজ রাতে আবিষ্কার করে ইহান শান্তি পায়, বাইরের দুনিয়ার সমস্ত বিরক্তি ফানুস হয়ে উড়ে যায় তার, শরীরের ক্লান্তি সরে গিয়ে চনমনে হয় বত্রিশের শক্ত মনটা।
কোমরে লোকটার কঠিন দু'টো হাতের স্পর্শে প্রেরণা চোখ বুজে নেয়। বিনুনি থেকে হাত সরিয়ে পর পর চোখ মেলে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে। লোকটার দৃষ্টিতে কোনো মলিনতা নেই, কেমন সবসময় খুবই ঠাণ্ডা থাকে। যতটা সহজ ভাবে প্রেরণার কাছে আসে, ওকে ছোয় সবটুকু অধিকারের জোর আর কোমলতা মেশানো স্পর্শে,প্রেরণা একটিবারও পারেনা ফেরাতে! ও পারেই না।
ছোয়াছুয়ির এই সময়টিতে দু'জনে আলাপ পাড়ে সারাদিনের। একজনের ক্লান্তি আরেকজন ঘুচিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায়। একে অপরের আশ্লেষে মিশতে মিশতে কত রাজ্যের কথা বলে, শুধু নিস্তব্ধ রাতের দেয়াল সেসবের সাক্ষী হয়।
হঠাৎ ইহান থামে। গা থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। প্রেরণা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে ওঠে,“কি হলো?”
জবাব না দিয়ে ইহান খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। খানিক বাদে আবার একই ভঙ্গিতে ফিরে এলে প্রেরণা বলে,“সমস্যা কি আপনার?”
_শুদ্ধর ঘরে গিয়েছিলাম।
_কেন?
_আমার ওর মাথার কাছে তখন পানির বোতল রাখতে মনে ছিলো না!
চেয়ে থাকে প্রেরণা ফ্যালফ্যাল করে। ইহান এবার নিশ্চুপ হেসে সেই চিরায়ত স্বরে বলে,“নয়তো রাতে ঘুম থেকে উঠে পানি না পেয়ে নক করতো এখানে এসে হুট করে।
আসলে বাচ্চার প্যারেন্টসদের একটু সতর্ক থাকতে হয় সবসময়!”
কোনো কথা আসে না আর প্রেরণার। চোখ দু'টো বুজে ফেলে কম্ফোর্টার টেনে ঢেকে নেয় আরক্ত মুখটা। ইহান এগিয়ে গিয়ে কম্ফোর্টার শক্ত হাতে সরিয়ে দেখে প্রেরণা চোখ বুজেই আছে। কি হয়েছে বুঝতে না পেরে ইহান ঝুঁকে জানতে চায়। প্রেরণা জবাবটা অস্ফুটে দেয়,“আপনি প্লিজ ওকে আব্বু ডাকতে বলবেন। আমার ছেলেটা খুবই বাধ্য। ও শুনবে। ও ওর পাপাকে একভাবে জেনেছে,আপনাকেও জানুক একভাবে। যেমন করে আমি জেনেছি। জীবনে যখন জটিলতা ঢুকিয়েছি মা ছেলে তখন জটিলতাকেই সহজ ভাবে নিবো। শুদ্ধকে আপনি অবশ্যই কাল বলবেন এ কথা! ও আপনার কথাই শুনবে। আমি চাই ও আপনাকে আব্বু ডাকুক। তারপর আপনি গভীর রাতে ওর মাথার কাছে পানি রেখে আসেন,ওর আব্বু হয়েই। প্লিজ ইহান।”
তিরতির করে কাঁপছে প্রেরণা, কথাগুলো বলেই মুখ গোজে শক্ত পুরুষালী লোমশ বুকটাতে। ইহান চুপ করে থাকে, দীর্ঘসময় চুপ করে থাকে, ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে হালকা হাসির ঝলকানি। হাসিটা ছিল পরিপূর্ণতার।
_________
মিসেস সাবিনা হকের চেম্বারে সকাল সকাল এসেছে ইহান প্রেরণা। মূলত তাদেরই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিলো শুরুতে। শুদ্ধকে স্কুলে রেখে এখানে আসা।
আজ ভোর বেলা প্রেরণার ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরেই হঠাৎ সে অনুভব করলো সে অসুস্থ। তার বমি পায়,মাথা ঘোরে। এমনটা আসলে রোজ সকালে হয়, তবে আজ মাত্রা ছাড়িয়েছে। ইহান সাথে সাথে এনেছে গাইনোকলজিস্টের কাছে। পরী গিয়েছে শহরের বাইরে এক সেমিনারে,তার পরামর্শে সাবিনা হকের কাছে আসা।
সাবিনা হক সামান্য হাসলেন। প্রেরণাকে ঠিকঠাক ভাবে চেক না করেই সামান্য কিছু তথ্য নিয়ে বলে উঠল,“তোমাকে পিলটা স্যুট করেনি। আমি লিখে দিচ্ছি আরেকটা। আর ফ্যামিলি প্ল্যানিং করেছো কোনো?”
আরক্ত মুখটা নামিয়ে বসে থাকে প্রেরণা, ইহান চুপচাপ হেসে যায় চোখ নামিয়ে। সাবিনা হক ইহান প্রেরণা দুজনকেই উদ্দেশ্য করে বলে,“বিয়ের বয়স কম হলেও দুজনের বয়স কিন্তু কম নয় হ্যা? খুব চমৎকার একটা প্ল্যানিং করতে পারো এখুনি। এখন কতশত অসুবিধা থাকে মেয়েদের বলো তো?”
প্রেরণা জবাব না দিলেও সাবিনা হক বলতে থাকেন,“ইহান, নির্বাচনের পরে বেবি নিয়ো। বাচ্চা এসে দেখুক তাদের বাবা যে সে কেউ নয়!”
_জি আন্টি! আপনার কথা ভেবে দেখবো, আগে আপনার মূল্যবান ভোটটা আমাকে দিবেন!
মস্করা ইহানও করে বসে। হাসলেন সাবিনা হক,বললেন,“হ্যা এখন ঘুমের ঘোরেও নিশ্চয়ই এই কথা আওড়াও? আপনার মূল্যবান ভোট আমাকে দিয়েন?”
সাবিনা হকের চেম্বার থেকে বেরিয়ে ওরা দুজন পার্কিং লটে যায়, এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারটা শহরের সবথেকে ভিওআইপি এড়িয়াতে।
“এখন কি করবেন?”
প্রেরণার কথায় ঘড়ি দেখলো ইহান, বললো,“আপনাকে আর শুদ্ধকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাবো বাড্ডা। সভা আছে!”
_দুপুরে ফিরবেন না?
_না সন্ধ্যায়।
ওরা কথা বলতে বলতে যখন গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল ঠিক তখনই কারো গাঁয়ের সাথে ধাক্কা লেগে থামলো ইহান। প্রেরণাও দাঁড়িয়ে পরলো।
ইহান ঘোরে, বিনয়ী সুরে “স্যরি” বলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দম্পতির মুখটা অবলোকন করেই মুখটা ঘুরিয়ে নিলো বিতৃষ্ণায়।
তোশা চুপ করে আছে। এখানে তাদেরও আজকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিলো। রিশাদ আর তোশা দু'জন পদমর্যাদায় মেজর এখন। ছুটিতে শহরে আছে।
এতগুলো বছর পর ইহানকে এভাবে অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখে রিশাদ একটু সহজ ভঙ্গিতেই হাত বাড়ালো, একটা সময় তাদের বন্ধুত্ব খুব গাঢ় ছিলো।
“কেমন আছিস! কংগ্রাচুলেশনস! অবশেষে ইউ আর ম্যারেইড!”
আচমকা ভীষণ রাগ উঠলো ইহানের। পুরনো ঘা দগদগে হলে যেমন জ্বলুনি হয় ঠিক অমন ভাবেই জ্বলে উঠলো ভেতরটা। রিশাদের হাত উপেক্ষা করে যেতে যেতেই অস্ফুটে বললো,“বাস্টার্ড!”
ওর হাতটা ঠিক তখনই টেনে ধরলো রিশাদ। প্রেরণা তখনো বিষয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, তবে তোশা বুঝে ফেলে রিশাদকে সরিয়ে দেয়।
কিন্তু রিশাদ হেসে ওঠে তাচ্ছিল্যের হাসি, ভ্রু গুটিয়ে হাসতে হাসতে বলে,“বাস্টার্ড কে ? আমি? তুই কি তবে? স্যারের বৌকে উল্টে পাল্টে আদর করার সময় এই কথাটা তোর নিজেকেও বলা উচিত!”
প্রেরণা খুব বড় একটা ধাক্কা খেলো আগন্তুকের মুখে এমন অশ্লীল বাক্য শুনে। পর মুহুর্তেই মৃদু চিৎকার দিয়ে সরিয়ে নিলো ইহানকে। রিশাদের মুখে ঘুষি বসাতেই যাচ্ছিল ও।
কাঁপছে ইহান, বিধ্বংসী লাগছে হঠাৎ এই চির ঠান্ডা অমায়িক মানুষটাকে। প্রেরণা ধরে রেখেছে,নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,“শান্ত হোন! আপনার ইলেকশন সামনে! কি দরকার?”
ইহান গর্জন তুলবে তার আগে প্রেরণাই চিবিয়ে চিবিয়ে রিশাদকে বললো,“আপনি শাওকাত ওয়াসীতের জুনিয়র ছিলেন? ওহহ! তবে শুনুন, আপনার মরহুম স্যারের অনুপস্থিতিতে ধর্মীয় মতে দায়িত্ব নিয়েছে উনি আমার, আমাকে বিয়ে করেছেন। আর যেসব ইঙ্গিত করলেন আপনি, ওসব বিয়ে নামের একটি সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ সম্পর্কের অন্যতম পবিত্র শর্ত। নিজের নষ্ট মস্তিস্ক দিয়ে সেসব বিচার না করে আপনি নিজের চরকায় তেল দিন। আমার স্বামী আপনাকে গালি দিয়েছে সেজন্য দুঃখিত। সরুন সামনে থেকে।”
তোশা চুপচাপ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে,প্রেরণাকে দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। প্রেরণা ইহানের হাত ধরে টানতে টানতে এগিয়ে যায় গাড়ির কাছে। ইহান কিছু একটা করবে সে সুযোগ দেয়না প্রেরণা, দু'চোখ ভরা অনুনয়, চোখ দু'টো ছলছল করে। ওর চোখে দৃষ্টি দিতেই দমে যায় ইহান।
মেজাজ টা পুরো বিগড়েছে, গাড়ি চালাচ্ছে বেপরোয়া হয়ে। প্রেরণা খুব ভয় পাচ্ছে, হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“ও বুঝি তোশা?”
ইহান জবাব দেয়না, প্রেরণাই বলে যেতে থাকে,“আপনি বলেছিলেন আমরা দু'জনে চাইলেই হয়, এই বিয়েটা না হবার পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই। আপনিই বলেছেন আমরা দু'জন ম্যাটার করি শুধু। তবে মানুষের কথায় রিয়াক্ট করার কি আছে?”
এবারো চুপ ইহান। প্রেরণা তার কাঁপা হাতটা রাখলো হঠাৎ ইহানের হাতের ওপর, থেমে থেমে বললো,“আমি সম্মান করি আপনার আদর। আপনি আপনার স্ত্রীকে ছুঁয়ে থাকেন, যাকে অনেক সম্মান দিয়ে বিয়ে করেছেন! মোহরানা উসুল করেছেন।”
চুপচাপ শুনেই যাচ্ছে ইহান। গাড়ি তখন শুদ্ধর স্কুলের সামনে। গাড়ি থামতেই প্রেরণা নামলো, লোকটাকে একটু সময় তো দেওয়া উচিত ঠিক হতে। চূড়ান্ত ধৈর্যশীল মানুষও তো হঠাৎ হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলে!
“আপনি থাকুন। আমি শুদ্ধকে আনছি।”
বলেই প্রেরণা এগিয়ে যায় সামনে। স্কুলের গেটের সামনে প্রচুর ভিড় দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় প্রেরণার। দপ্তরি আর দাড়োয়ান দেখলো শুরুতেই প্রেরণাকে, দেখা মাত্রই শুকনো ঢোক গিলে নেয়। আশেপাশে দাঁড়িয়ে নিনিতার মা কাঁদছে, সবার মধ্যে আতঙ্ক ভাব লক্ষ্য করছে প্রেরণা। কিছু জানতে চাইবে তার আগেই রাহির মা ছুটে এসে হুমরি খেয়ে পরে প্রেরণার সামনে, চেঁচিয়ে কেঁদে ওঠে,“শুদ্ধ,রাহি,নিনিতা আর রাকিনকে পাওয়া যাচ্ছে না ভাবী কোত্থাও!”
চলমান......
[ গল্প কিন্তু শেষের পথে প্রায়,আগেই বলে রাখি! এটা সম্পূর্ণ পারিবারিক গল্প ছিল,আর কোনো টুইস্ট থাকবে না ]