ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 133

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩৩
#ইসরাত_ইতি

ওপাশে কলটা রিসিভ হতেই সামিনের কন্ঠস্বর থেকে কিছুটা ধ'ম'ক বেরুলো,“কি তুমি আসবে না?”

শান্ত জবাব দিলো,“ভাইয়া আপনাকে বলেছি এসবে আমাকে জড়াবেন না। এসবের প্রতি ইন্টারেস্ট আমার ইশিতা জীবিত থাকতেও ছিলো না, এখনও নেই। সত্যি বলতে আমার জীবনে ইশিতা ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই। ওসব শেহার,আপনি ওর সাথে বুঝে নিয়েন।”

কল কাটতেই হাঁফ ছাড়ল সামিন। আলো এসে পাশে দাঁড়ায় তখন,“মানা করে দিলো? আপনি বাদ দিন তাকে। উজ্জ্বল আর শেহাই যথেষ্ট। ওদের ডেকে নিন। শান্ত ভাইয়াকে তার মতো ছেড়ে দিন।”

মাথা নাড়ে সামিন। আজ একটা বিশেষ দিন, আজ ছেলেমেয়েদের মাঝে যার যার সম্পত্তি ভাগ করে দলিল লিখে দেবে তারা তিনভাই। সাব রেজিস্ট্রার আসবে মাগরিব বাদ।

বিছানায় বসলো সামিন। আলো বসলো তার ঠিক পাশেই। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা নানা রঙের ফাইল। মির্জাদের সকল সম্পত্তির দলিল আর নথিপত্র। সেসবের দিকে চেয়ে চেয়ে হাসে সামিন ইয়াসার মির্জা। আলোকে বলে,“এসেছে নতুন শিশু,তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান! বিষয়টা এমন,তাই না আছিয়া?”

আলো মুচকি হাসি ফিরিয়ে দেয় তবে জবাব দেয়না। সম্পত্তির প্রতি আদতে লোভ নেই তার। শুধু উৎকণ্ঠা সামান্য। এই লোকটা নিজে বারবার ভেঙেছে,গড়েছে। তবুও সবকিছুর মধ্যে পারিবারিক সম্পত্তি আগলে রেখেছে যক্ষের ধনের মতন। একটুও তাল বেতাল হতে দেয়নি। এসব ইয়াসার মির্জার আবেগ। বাচ্চারা সবাই পারবে তো এসবের সঠিক মূল্যায়ন করতে?

__________

আগন্তুক লোকটা পাঁচ মিনিট যাবত থমকে দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের ইউনিফর্ম পরিহিত তিন হাত সাইজের ফুটফুটে বাচ্চা চারটার দিকে। দু'জন ছেলে আর দু'জন মেয়ে। মেয়েদের মধ্যে একজন আবার চোখ ডলে ডলে কাঁদছে।‌ বেশ শব্দ করেই কাঁদছে। বাকিরা ওকে থামানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। এদের মধ্যে একটা বাচ্চাকে খুবই গম্ভীর লাগছে,তার ভাবভঙ্গি এমন যে সে সবটা সামলে নেবে। ঠিক সেই ভঙ্গিতেই মেয়ে বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

“কাদিস না রাহি, আমরা খুঁজে নেবো স্কুল।”

শুদ্ধর কথাতে শান্ত হতে পারছিলই না রাহি, কারো কথাই তার ভালো লাগছে না। মাম্মার কাছে যাওয়ার জন্য ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে। শুরুর দিকে নিনিতা শান্ত থাকলেও এবার সেও কেঁদে উঠলো।

শুদ্ধ ঘামছে। তার নিজেরও কান্না পাচ্ছে। তবে মাম্মা শিখিয়েছে কেউ কাঁদলে আগে তাকে শান্ত করতে হয়।

দাড়োয়ান আংকেলকে ফাঁকি দিয়ে বেঞ্জিম্যানের স্টিকার আর গলা ভেজাতে আইসক্রিম কিনতে বেরিয়ে যে এভাবে বিপদে পরবে জানতো কি ওরা? স্কুল রোডের দুই গলি পরে ছিল টয় হাউজ। ওরা তো তেমনটাই জানতো! এখন পাচ্ছে না খুঁজে কোথাও, উল্টো পথ হারিয়ে ফেলে আন্দাজ করে এ গলি ও গলি হেঁটে পুরোটাই এলোমেলো করে ফেলেছে। কোন রোড থেকে এখানে ঢুকেছিল সেটাই মনে নেই কারো এখন, তার ওপর রাহি কাঁদছে সেই তখন থেকে।

শুদ্ধর ভয় হচ্ছে খুব,এখন সে কি করবে? নিনিতা চোখ মুছে ধমকায় রাকিনকে, রিনরিনে স্বরে বলে,“সব তোর জন্য হয়েছে। আমি বলেছিলাম মাম্মাকে বলবো ছুটির পরে। আমি আসতে চাইনি।”

বলেই আবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে নিনিতা। এবার শুদ্ধরও চোখ ভিজে উঠেছে। আজ মাম্মাকে যদি সে খুঁজে না পায়? আর ইহান আঙ্কেল? মামা? খালামনি? কেউ তাদের খুঁজে বের করবে না? ঠিক তখনই শুদ্ধর মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়, আচ্ছা কোনো আঙ্কেলকে বললেই তো হয়ে যায় সানরাইজ স্কুলে ওদের দিয়ে আসতে! তবেই তো হয়ে যায়!

__________

অভিভাবকরা সকলে তখন পাগল প্রায়। চড়াও হয়েছে দাড়োয়ানের ওপর। এক কোণে কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে দাড়োয়ান মনসুর। চাকরির এতো গুলো দিন পরে এসে এমন একটা অঘটন ঘটে যাবে সে তো বুঝতেও পারেনি। তার মনে আছে লকটা সে বেশ করেই লাগিয়েছিল। বেশ ক'দিন ধরে ক্লাস ফোর ফাইভের কিছু দস্যি বাচ্চাদের থেকে শিখেছে হয়তো এসব।

এই ঝলমলে জীবনে হুট করে চলে আসা এই অশনির ধাক্কায় যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো প্রেরণা। স্থির থাকতে পারেনি এক সেকেন্ডও। সকাল থেকে তো শরীরটা এমনিই খারাপ। দুর্বলতায় চৈতন্য হারিয়ে লুটিয়ে পরেছিল রাস্তাতেই। তারপর যখন চেতনা ফিরলো,মুখের সামনে দেখলো একজোড়া গভীর কালো চোখ প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে চেয়ে আছে তার মুখে। গাড়িতে ছিল প্রেরণা, বড় বড় শ্বাস ফেলে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন আছড়ে পরেছিল ইহান বুকে।

যেন ওখানেই ওর ভাঙার কথা। বহু বছর পর এভাবে ভাঙতে পারছে প্রেরণা নিজেকে কারো বুকে, তাই ভাঙছে।

“আমার ছেলে! আমার ছেলেকে এনে দিন।”

ধড়ফড় ধড়ফড় করে হাঁপরের মতন উঠেছে ওর। বা হাতে মুচড়ে চলেছে ইহানের কলার। চোখের জলে ভিজে গিয়েছে পাঞ্জাবির বুকের কাছটা।
ইহান ধৈর্য্য হারায়নি এক সেকেন্ডের জন্যও, গাড়ির কাঁচ গলিয়ে উঁকি মেরে দেখে স্কুলের হেড মিস্ট্রেস এবং বাকিরা ছোটাছুটি করছে,সবার কানে চেপে আছে ফোন।

বলশালী একহাতে প্রেরণার কোমর পেঁচিয়ে ধরে রেখেই এবার পকেট থেকে ফোনটা বের করে ইহান। কল লাগায় মুঈনের কাছে, ফোনটা রিসিভ হতেই ব্যগ্র কন্ঠে বলে,“মুঈন ব্যস্ত? শোনো ওসির নাম্বারটা খুজে পাচ্ছি না, তুমি ইমার্জেন্সি কিছু করবে? শুদ্ধসহ তিনটা বাচ্চা স্কুল থেকে মিসিং ফর গড শেইক ডু সামথিং!”

_হোয়্যাট!

হতভম্ব মুঈনের গলা কাঁপল। ইহান ঘন শ্বাস ফেলে বলে,“মুঈন তুমি বুঝতে পারছো?”

_ইহান। ভাবীকে সামলাও। আমি দেখছি! তোমার কাউকে সন্দেহ হয়?

_সন্দেহ হচ্ছে না। কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করলে ওদের চারজনকে তুলতো না। আর তাছাড়া ওরা নিজেরা লক খুলে বেড়িয়েছে। এটা ইম্পসিবল। তুমি প্লিজ ওসিকে বলে এলার্ট করে দাও। বাড়িতে জানিয়ো না এখুনি।

কলটা কেটে ফোনটাকে দূরে রেখে ইহান দুই হাতে আগলে নেয় প্রেরণার দুই গাল। ভেজা দু'টো আতঙ্কিত চোখে নিজের দৃঢ় দৃষ্টি রেখে বলে,“আপনার ছেলেটাকে এনে দেবো মানে? আমি তো আমার ছেলেকেও খুঁজব!”

প্রেরণা বলতে পারছে না কিছুই,মাথাটা ইহানের বুকে ঠেকিয়ে হাপায়,“শুদ্ধকে এনে দিন! আমি মরে যাবো!”

_প্রেরণা চুপ!

_এনে দিন ওকে।

নিজেকে প্রেরণা হারিয়ে ফেলেছে ইহান বোঝে,ও নিজে প্রেরণার মাথাটা বুক থেকে সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায়, অস্থির শ্বাস ফেলে বলছে,“এখানে। এভাবেই বসে থাকবেন। আপনি আমার কাছেই ভাঙবেন, তবে খবরদার আমাকে ভাঙার চেষ্টা করবেন না। চোখ মুছুন! মুছুন বলছি!”

শেষটায় ধ'ম'ক ছিলো, প্রেরণা শাড়ির আঁচল চাপলো দু'চোখে । ইহান চুমু খেলো ওর কপালে। পাহাড় সম শরীরে রাজ্যের ছটফটানি, আতঙ্ক ‌। বাইরে কিছুই না দেখিয়ে শুধু বলে গেল,“খুব দুষ্টু ছেলে! তবে আমি জানি ও সীমার মধ্যেই আছে! আর যদি কেউ এটা করে থাকে, তবে কারো বাপের সাধ্যি নেই আমার থেকে বাঁচার। শুদ্ধ আপনার ছেলে, কিন্তু শুদ্ধ আমার বাচ্চা! আমার এক জন্মের দায়িত্ব,ও আমার আদর! সরুন! এখানে চুপ করে বসে থাকুন!”

_আমি যাবো!
হাতটা টেনে ধরলো ইহানের প্রেরণা। দু'চোখে ভর করেছে রাজ্যের অসহায়ত্ব। গাড়ি থেকে নামতে না দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে ফেলল ইহানকে আবার। ঠিক তখনই ইহানের নাম্বারে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এলো।

“হ্যালো! আমি কি ইহান তাজওয়ার মির্জার সাথে কথা বলছি?”

উৎকন্ঠায় গলা কাঁপছিল ইহানের, ভেবেছে হয়তো পার্টির কোনো কল। উপেক্ষা করতে চেয়েছিল তবে কি মনে করে রিসিভ করে ফেলেছে।

_জি বলছি!

ওপাশে ট্রাকের বিকট আওয়াজ, কানে ঢুকে পরছে ইহানের। ওই শব্দের মাঝেই লোকটা আবার চেঁচিয়ে জানতে চাইলো,“আপনি কি ইহান তাজওয়ার মির্জাই বলছেন?”

_জি বলছি।

_আপনি কি শুদ্ধর আব্বু বলছিলেন?

থমকাল ইহান, প্রেরণা কাঁদছিল ওর গা ঘেষেই। দুর্বলতায় নেতিয়ে পরেছিল প্রায়। ত্বরিৎ চোখ তুলে তাকায় ইহানের দিকে। দু দণ্ড স্থির থেকে ছটফটিয়ে উঠল ইহান,“জি! জি! আমি ওর আব্বু বলছি। আপনি কে?”

এক লোকের সামনে পরেছিল ওরা চারজন। রাস্তায় গাড়ি ছুটছে অবাধে। একপাশে চারটা বাচ্চা হাত ধরাধরি করে রাস্তা পেরুনোর চেষ্টা করছে দেখে এগিয়ে যায় নুহাশ টেলিকমের মালিক। ঝিলটুলি মোড়েই তার বিশাল দোকান। আপাতত বাচ্চা চারটাকে আগলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে, আতঙ্কে কাঁদছিল ওরা। লোকজন জড়ো হয়ে গিয়েছে আশেপাশে।

স্কুল থেকে ত্রিশ মিনিটের দূরত্বে ছিলো ওরা। প্রেরণা আর ইহান গাড়ি থেকে নামলো, উন্মাদের ন্যায় ক্ষিপ্র গতিতে ছুটতে ছুটতে গিয়ে দাঁড়াল শুদ্ধর সম্মুখে। ততক্ষণে ছেলেটা কেঁদে অস্থির। ছোটো বাচ্চা, কতক্ষন শক্ত থাকবে?

লোকটার নাম রিয়াজ। ইহান তাজওয়ার মির্জাকে দেখে গদগদ হয়ে বললেন,“একটা বাচ্চাও নিজেদের প্যারেন্টসদের ফোন নাম্বার বলতে পারছিলো না। সবটা গুলিয়ে ফেলেছে। বাপ মায়ের নাম বলে শুধু। তখন ভাবলাম স্কুলেই নিয়ে যাই। পরে আবার ভাবলাম আমি একা কি করবো,এমনিতেই শহরের অবস্থা ভালো না, লোকজন এসে ছেলেধরা ভেবে গনপিটুনি দেবে আগে কিছু জানার আগেই। তখন এই বাবুটা বলে ওর আব্বুর নাম ইহান তাজওয়ার মির্জা। আপনার নাম্বার আমার কাছে ছিলো ভাই, কত ভয়ে ভয়ে যে ফোন করেছি আপনার মতো মানুষরে। ভবিষ্যত এমপি আপনি।”

ইহান চকিতে ফিরে তাকালো ক্রন্দনরত আদুরে জীবটার মুখপানে। প্রেরণা কাঁপছিল,ইহানকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল।

“কি বলেছে ও আবার বলেন?”
ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে ইহান, নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে জানতে চায় পুনরায়।

লোকটা বলে,“বলেছে আমার মাম্মার নাম প্রেরণা আহসান। আর আব্বুর নাম ইহান তাজওয়ার মির্জা। আমি সানরাইজ কিন্ডারগার্টেনে পড়ি।”

ইহান দাঁড়িয়েই আছে। প্রেরণা খেই হারিয়ে কেঁদে ফেলে,পর পর তেড়ে যায় শুদ্ধর দিকে, ছেলেটাকে দুই হাতে লুফে নিয়ে ঝাঁকুনি দেয়,“কেন এসেছো এখানে তুমি?”

ইহান সরিয়ে আনে প্রেরণাকে তৎক্ষণাৎ, ওকে চোখ রাঙিয়ে শুদ্ধকে তুলে নেয় বুকে। মুখটা ফুলে উঠেছে, বুকটা ফুলে উঠেছে, হঠাৎ ঘন শ্বাস ফেলে শুদ্ধকে বলে,“তোমার আব্বু ইহান তাজওয়ার মির্জা?”

শুদ্ধ চোখ মোছে। বলে না কিছু। বাচ্চাটা ভীষণ ভয় পেয়েছে, একসময় তো ভেবেই নিয়েছে মাম্মাকে আর দেখবে না।

প্রেরণা এগিয়ে গিয়ে নিজেও আগলে ধরলো শুদ্ধকে,বলতে থাকলো,“এমন করে কেউ? তোমার কোথাও লাগেনি তো বাবা?”

ঘুরলো ইহান ছেলেটাকে কোলে নিয়েই। যেন প্রেরণাকে এই মুহুর্তের ভাগ সে দেবে না। যেন এই মুহুর্ত টুকু শুধুই তার। এই সময়ে,এভাবে এমন অনুভূতি হবার কারণ সে জানে না। তবে বুকটা বড্ড প্রশান্ত। শুদ্ধর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,“আমি তোমার আব্বু?”

শুদ্ধ মাথা ঝাঁকায়। সম্মতি দেয় সে। ইহান ঘোলাটে দৃষ্টিতে বাচ্চাটাকে দেখে। অস্থির শ্বাস ফেলে বলে,“তুমি বোঝো আব্বু মানে কি?”

শুদ্ধ মাথা নাড়ায়, সে গতকাল রাতে বুঝেছিল, তবে এখন মনে নেই। শুধু জানে ইহান আঙ্কেল তার আব্বুই।

ইহান এবার মিশিয়ে নেয় বুকের সাথে, এমন শক্ত করে মিশিয়ে নিয়েছে যে শুদ্ধর জো নেই ছোটার। বড় বড় শ্বাস ফেলে ইহান বলে,“বুঝতেই হবে না তোমাকে। তুমি শুধু বুঝবে আমি তোমার আব্বু। আমি ইহান তাজওয়ার মির্জা। তোমার আব্বু। মনে থাকবে?”

শুদ্ধ মাথা নাড়ায়। তার মনে থাকবে।

“সবসময় মনে থাকবে?”

শুদ্ধ এবার ঘন ঘন মাথা নাড়ায়। তার সবসময় মনে থাকবে।

________

গাড়িতে নিরব তিনজন, এতো ঝক্কি সামলে অবশেষে বাড়ির পথে ফিরছিল ওরা। মুঈনের কথায় ওসি তক্ষুনি ফোর্স পাঠাতেই যাচ্ছিল ঠিক তখনই ইহানের কল পেয়ে থামে। স্কুলে হেড মিস্ট্রেস আর বাকি প্যারেন্টসদের সাথে আজকের দূর্ঘটনা নিয়ে মিটিং শেষ করে দুপুর দুইটার দিকে বাড়িতে ফিরছে তিনজন।

প্রেরণা সিটে তার বিধ্বস্ত গা এলিয়ে রেখেছে। শুদ্ধ তার “আব্বুর” কোলে সেঁটে বসে আছে। তখনো নামেনি। দু'হাতে গলা জরিয়ে রেখেছে চুপটি করে।

ইহান এক হাতে স্টিয়ারিং সামলে আরেক হাতটা রাখে প্রেরণার হাতে। ক্লান্ত চোখে প্রেরণা তাকাতেই ইহান চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলে। পরপর মুখটা ঝুঁকিয়ে শুদ্ধর গালে চুমু খায়। আতঙ্কে জর্জরিত বাচ্চাটাকে ধিমি আওয়াজে বলে,“কেদেছিলো নাকি খুব আমার শুদ্ধ?”

শুদ্ধ মাথা নাড়ায়। সে খুব বেশি কাঁদেনি।

“কেন কাঁদোনি?"

_মাম্মা বলে ছেলেরা বেশি কাঁদে না।

_ছেলেরা কাঁদলে কি হয়?

_জানি না।

হাসে ইহান,বলে,“তোমার মাম্মা ভুল বলেছে। ছেলেরাও কাঁদে, সবাই কাঁদে। তবে অকারণে কাঁদতে নেই। এই যে এখন মাম্মা আর আব্বু আছে। এখন তো একেবারেই কাঁদবে না।”

বাড়িতে ঢোকার আগে আগে দরজায় দাঁড়িয়ে ইহান বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে প্রেরণাকে বলেছে,“মুডটা প্লিজ ঠিক করুন। সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলে কি লাভ বলুন? ওকে আমরা দু'জন মিলে রাতে খেলার ছলে বোঝাবো।”

মাথা নাড়ে প্রেরণা। মুখ থেকে অন্ধকার ভাবটা সরিয়ে সেও বুক ভরে শ্বাস নেয়। যথারীতি শান্ত ভঙ্গিতে বাড়িতে ঢোকে ইহানের পিছু পিছু।
সবাই তখন খাওয়া দাওয়া সেরে যে যার ঘরে ঢুকেছে মাত্র। রিতু ছেলে আর ছেলের বৌয়ের মুখ দেখে সরাসরি বললো,“এত দেরী কেন? তোদের খিদে পায়নি? আরো কয়ঘন্টা বাইরে থাকতিস! এতো দেরি হবে যখন তখন কল করতিস, ড্রাইভার পাঠিয়ে শুদ্ধকে আনতাম।”

ইহান মায়ের কথায় শুকনো হেঁসে জবাব না দিয়েই ওদের নিয়ে উঠল দোতলায়। শুদ্ধকে নিয়ে ঢুকেছে ঘরে, কোল থেকে সরাসরি বিছানাতে বসিয়ে প্রেরণাকে বললো,“ওর জামাকাপড় নিয়ে আসুন। এই ঘরেই ফ্রেশ হোক। ছেলেটা ঘেমে গিয়েছে খুব।”

প্রেরণা মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরুতেই দেখলো রিতু উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে শুদ্ধর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। সাথে ছিলো ওর বড় চাচী শাশুড়ি। প্রেরণার মলিন মুখটা তারা খেয়াল করেছে ঘরে ঢোকার পরেই।

“কোনো খবর আছে?”

রিতু ফিসফিসিয়ে জানতে চায় ছেলের বৌয়ের কাছে। প্রেরণা বুঝতে না পেরে বলে,“কিসের খবর মা?”

রিতুর নিজেরও খুব লজ্জা লাগছে এভাবে সরাসরি জানতে চাইতে। তবে পাশ থেকে আলো কোনো রাখঢাক না রেখে বলে,“ভালো খবর। তোমার আর ইহানের। আছে ভালো খবর?”

চকচক করছে আলোয় চোখ দু'টো,বেশ ক'দিন ধরে প্রেরণার দুর্বলতা দেখে সে এটা নিশ্চিত হয়েছিল প্রায়ই।

শাশুড়িদের কথায় এই বার প্রেরণা ব্যাপক লজ্জা পায়, বেচারী হাঁসফাঁস করে উঠে বলে,“মা এসব কি বলেন। আমাদের বিয়ের দেড়মাস হলো মাত্র।”

_তো? ইহান আমার বিয়ের একমাসের মাথায় পেটে এসেছিল। তো কি হয়েছে?

রিতু যেন গজগজ করে উঠতে চাইলো। প্রেরণা লাজুক মুখটা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এবার রিতু ধীর গলায় বলে,“প্রণমি ছোটো। তাই ওকে বলি না। তুমি তো ছোটো না। এতো অবাক হও কেন? যুগ ভালো? কি সব ওষুধ টষুধ খেয়ে কত মেয়েরা পরে বিপাকে পরেছে। অমন কিছু করো না। আমি সুস্থ সবল আছি, আমরা পেলে দিতে পারবো। তোমার ঝামেলা হবে না। তুমি শান্তিতে তোমার পেশা সামলাতে পারবে।”

প্রেরণার গাল দু'টো ক্রমশ অতিমাত্রায় রক্তাভ হয়ে উঠলো। পর পর মাথা নুইয়ে বাতাসের বেগে শাশুড়ির সামনে থেকে গিয়ে শুদ্ধর ঘরে ঢুকলো।

আলো হাসছে,রিতু বিরক্তির সুর টেনে বলে,“হেসো না তো! অবশ্য কাদের কি বলছি! এরা তো এখনো আপনি আজ্ঞে থেকেই বেরুতে পারেনা, আর এরা দেবে নাকি আমাকে নাতি! ঢং করতে বিয়ে করেছে! ”

__________

ঘরের ভেতর মৃদু একটা আওয়াজ হলো। শুদ্ধর মৃদু চিৎকার। প্রেরণা ওর পোষাক নিয়ে এসেই দরজায় দাঁড়িয়ে পরলো। উদ্বিগ্ন হয়ে ভেতরে দিলো উঁকি। ততক্ষণে শুদ্ধ থেমেছে, কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে কোমরের সামনের দিকটাতে হাত চেপে।
ওর পাশেই হাঁটু ভেঙে বসে আছে ইহান, সেকেন্ড ফুরোতেই শুদ্ধকে আড়াল করে নিয়ে প্রেরণাকে বললো,“পোষাক রেখে প্লিজ লিভ!”

হতবাক প্রেরণা,চোখ কপালে তুলে বললো,“হয়েছেটা কি?”

শুদ্ধ থমথমে গলায় বলে,“মাম্মা আই হ্যাড অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট। লজ্জা। প্লিজ লিভ!”

প্রেরণা ছেলেটার অস্বস্তি বোঝে। বুঝে যায় ওর অসুবিধাও। সেও থমথমে গলায় বলে,“প্যান্টের চেইন টা ঠিকভাবে টানবে তো বাবা! ইটস্ নট দ্যাট ডিফিকাল্ট! আচ্ছা তোমার ইহান আঙ্কেলকে দেখাও.......”

কথাটা বলেই প্রেরণা থামলো, ততক্ষণে ইহান ঘুরে দেখলো প্রেরণাকে। চোখাচোখি হতেই আবার তীব্র সংকোচে প্রেরণা নামিয়ে নিলো চোখ । কন্ঠে দৃঢ়তা এনে বলে,“তোমার আব্বুকে দেখাও শুদ্ধ।”

ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা জমেছে ইহানের‌। সে মন দিলো শুদ্ধর প্যান্ট টা ঠিক করাতে। প্রেরণা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে টের পেয়ে বললো,“কিছু বলবেন?”

প্রেরণা আর চেপে না রেখে মুখ খুললো, তখন গাড়িতে যে কথাগুলো বলেছিল, সেগুলো টেনেই বলে উঠলো,“শুদ্ধ আপনারও ছেলে! আমি ওকে কেবল আমার ভাবি না! আমি কথা গুছিয়ে বলতে পারিনা আপনি জানেন। আপনি হুটহাট আমার কথায় এভাবে....”

ইহানের মুখভঙ্গি খুবই স্বাভাবিক, হাসে ফিচেল। বলে,“শুদ্ধ ওয়াসীত স্যার আর আপনার পরে পুরোটাই আমার! এটা আমি আজ থেকে জানবো। এবং আপনার বলতে হবে না। যান গিয়ে টেবিল সাজান। আমরা আসছি!”

__________

পারিবারিক মিটিং বসবে রাত আটটায়। বাড়ির সিনিয়র তিন মির্জা মিলে দলিল নিয়ে সামিন ইয়াসার মির্জার ঘরে আড্ডা দিচ্ছে, রাজনৈতিক আলাপ, দেশের বাড়ির জমিজমার আলাপ। বাকিরা সবাই যে যার ঘরে।
শুদ্ধ ছিলো আলোর কাছে, অবসর সময়ে আলো প্রায়শই শুদ্ধকে কমিক পড়ে শোনায়।

প্রেরণা হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে গিয়েছিল তখন। ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হলো গোসল সারবে তাই। দেখলো ইহান কারো সাথে মিটিং করছে। ল্যাপটপের স্ক্রিণে নিবদ্ধ তার গম্ভীর মনযোগী দৃষ্টি। লোকটা বেশ চাপে আছে এমনিতেই। তার ওপর সবদিকের ঝক্কি সামলে যাচ্ছে।
ওর মনযোগ টানতে প্রেরণা অনেক ধরণের শব্দ করেও লাভ হলো না, ইহান চুপচাপ হেডফোন চাপিয়ে বসে আছে।

গোসলটা আজ তাড়াতাড়ি সেরে নেয় প্রেরণা। ওদিকে বিকেলে মেহমান আসবে, নাস্তাটা তো তাকেই করতে হবে। তাই তার বড্ড তাড়া।

ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে ভেজা শাড়ি বারান্দায় মেলে দিয়ে চুলটা শুকিয়ে নেয় ব্যস্ত হাতে। পুরোটা সময়,প্রেরণা খেয়াল করেছে ইহান দেখলোও না তাকে। জরুরি কিছু কথা ছিল প্রেরণার, ইহানের অতি ব্যস্ততা মেনে নিয়ে মিটিমিটি হাসে । পরপর আয়নায় দেখে নিজের অবয়ব, মনে মনে ভাবে, সে তো অমন আকর্ষণীয় হুর নয় যে একজন পুরুষ কাজ ফেলে তার দিকেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকবে। আর এমনিতেও, প্রেরণার সৌন্দর্য এই লোকের কাছে হীনমন্যতায় ভোগে না‌ । এই লোক যে দু দণ্ড প্রেরণাকে দেখে ঐ দু দণ্ড প্রেরণার কারাবাস। প্রেরণার অনুভূতি শ্বাস আটকে থাকে।

ভাবতে ভাবতেই স্মিত হাসে প্রেরণা। সে সম্ভবত পাগল হচ্ছে, তার গাঁয়ে হয়তোবা ইনু,ইশি,প্রণমি,শেহার বাতাস লেগেছে তাই লোকটা এতো ব্যস্ততার মাঝে তার দিকে কেন দেখছে না এই সামান্য এবং ফালতু বিষয় নিয়ে একা একা ভাবছে। নিজেকে শাসালো প্রেরণা, বললো,“একটা এমন থাবড়া মারবো, ন্যাকামি বের হয়ে যাবে স্টুপিড ওম্যান অব থার্টি।”

এবার লম্বা একটা শ্বাস ফেলে যেই না ঘর থেকে বেরুবে অমনি তার পা থামে ইহানের শীতল স্বরে,

“ব্লাউজ টা পাল্টে যান। পিঠের দিকটা বড্ড খোলা। বাড়িতে সবাই আছে।”

থমকাল প্রেরণা, ত্বরিত হাত দিয়ে নিজের পিঠের পেছনটা ছুলো। আসলে আজকে বাড়িতে না থাকায় শানুর মা নিজের আন্দাজ মতন সব কিছু ধুয়েছে। প্রেরণা খুঁজে খুঁজে অন্য একটি ওয়্যারড্রোবে পেলো এসব। ঝটপট তৈরি হওয়ার দরুন অতটা খেয়াল হয়নি।

আরক্ত মুখটা ঘুরিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে প্রেরণা।‌ ইহানের দৃষ্টি তখনও ল্যাপটপেই নিবদ্ধ, কিন্তু মুখে ছেয়ে আছে ফিচেল হাসি।

“আসলে, আসলে সব কিছু বুঝি ভিজিয়ে ফেলেছে শানুর মা। আমি এসবই পেলাম। তাড়াহুড়োতে খেয়াল করিনি।”

_ইটস ওকে না? বা দিকের ওয়্যারড্রোবে আরো আছে। ওখান থেকে খুঁজুন একটা মন মতো পেয়ে যাবেন।

প্রেরণা সেই ওয়ারড্রোব খুলেই সব চেক করলো, দাড়িয়ে থেকে হঠাৎ হাঁফ ছাড়ল, মিনমিনে স্বরে কপট রাগ দেখিয়ে বললো,“এই ইশিটা আসলে খুব অবুঝ। কেমন কান্ড জ্ঞানহীনের মতন এমন মাপ দিলো বলেন তো? এখানের সব ব্লাউজ তো একই মাপের!”

ইহান তখনো তাকায়না প্রেরণার দিকে, গম্ভীর হয়েই বলে,“আমার বোন কান্ড জ্ঞানহীন নয়। অহেতুক দোষারোপ করবেন না ওকে।”

_না দোষারোপ করছি না তো! ভুল বুঝছেন।

প্রেরণা ভাবলো বোনের বিরুদ্ধে বলায় লোকটা নিশ্চয়ই মাইন্ড করেছে। মুখটা ছোটো হয়ে গেলো প্রেরণার। ঠিক তখন ইহান আড়চোখে ওকে দেখে মিটিমিটি হাসে খানিক সময়, পর পর বলে ওঠে,“আমার বোন মোটেও কান্ড জ্ঞানহীন নয়। ও সম্ভবত এসব বানিয়েছে এসব আপনি আমার সামনে পরবেন তাই, বাইরে নয়। বাইরে পরার গুলো সম্ভবত ডান পাশের ওয়্যারড্রোবে আছে, খুঁজে দেখুন। আমি ঠিক জানি না অতটা।”

চারপাশটা কেমন ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে, যে ধোঁয়া প্রেরণার কান থেকে নির্গত হচ্ছে। ইহান এবার চোখ তুলে প্রেরণার চোখে চোখ রাখে, বাঁকা করে হেসে বলে,“তব্দা মেরে আছেন কেন? ইজ এনিথিং রং?”

প্রেরণা বলে না কিছুই, ইহান এবার উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে এগোয় প্রেরণার কাছে। নিশ্চুপ প্রেরণাকে ঘুরিয়ে নিয়ে ওর কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে দিয়ে বলে,“আমার চোখ দু'টো সবসময় আপনার ওপরেই থাকে। হাতের চুরি ঝাঁকিয়ে ডাকছিলেন কেন? সরাসরি বলতে পারেন না,“এই ইহান।” আগে তো ডাকতেন, এখন এতো নিত্য নতুন ঢং কেনো?

প্রেরণার বধূ মনটা হুটোপুটি খাচ্ছে লজ্জায়, কোথায় লুকাবে সেই জায়গা খুজে পাচ্ছে না। লোকটা ওর আরেকটু ঘনিষ্ঠ হতেই বলে,“ইহান।”

_সে ইট অ্যাগেইন!

প্রেরণার মুখের কাছে নিলো কানটা। প্রেরণা আবার বললো,
_এই ইহান।

ইহান হাসলো আবার। বললো,“মিথ্যা বলেছি। আমার চোখ দু'টো সবসময় আপনার ওপর থাকে না। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেয়। আর এই বিশ্রামের সময়টিতে আমার মনযোগ পেতে কখনো চুরি ঝাকাতে যেন না দেখি। এভাবে কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকবেন। কি ডাকবেন?”

_এই ইহান।

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 133 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন