#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩৪
#ইসরাত_ইতি
“ভাবী মনি! ও ভাবী মনি! চা খাবো,ঐ যে কিসব লতা পাতা দিয়ে বানান একটা চা। একটু বানিয়ে খাওয়ান!”
চমকে উঠে প্রেরণা সেকেন্ডে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে ইহানের থেকে। বাইরে ইরফানের হেরে গলার চেঁচামেচিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলে ইহান। নিজের অনুভূতির গলা টিপে ধরে হাঁফ ছাড়ে, বিড়বিড় করে বলে,“ও জীবনে শোধরাবে না! ওকে বিয়ে করিয়েও ম্যাচিউরিটি আনতে পারলাম না! ও কেন! এ বাড়ির কেউ মানতে চায়না আমাদের নতুন বিয়ে হয়েছে!”
প্রেরণা মুখে হাত চেপে হাসে।
_হাসছেন কেন?
হাসি থামিয়ে প্রেরণা নিচুগলায় বলে,“আপনার মুখে এমনতর কথা শুনলে আর এমন আচরণ করতে দেখলে বেশ অবাক হই!”
এবার ঝুকলো ইহান, বলিষ্ঠ একহাত দেয়ালে ঠেকিয়ে প্রেরণাকে ঘেরাও করে ওর চোখে রাখে চোখ, গম্ভীর স্বরে বলে,“কেন? সবসময় আপনি আমার থেকে কেমন আচরণ আশা করেন তবে? আমার রাগ হবে না? আমি অধৈর্য্য হবো না? আমি ধৈর্য্য হারাবো না?”
লোকটার অবস্থা দেখে ভীষণ হাসি পায় প্রেরণার। খুব না হলেও ইহান কিছুটা রেগে গিয়েছে তা বুঝেছে সে। একটু আগে অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছিল তারা, অনুভূতি অনেকটাই আবেশিত ছিল। ইরফানের এমন আচরণে লোকটার বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক!
ওপাশে ইরফান আবার চেঁচিয়ে বলে,“এই ভাবী মনি। চা! চা!”
ইহান এবার সত্যি সত্যি মেজাজ হারিয়ে ইরফানকে কিছু বলে উঠবে তার আগেই প্রেরণা ডান হাতে চেপে ধরলো ইহানের মুখ। ইহান কপাল কুঁ'চ'কে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। একটু কাছে এগিয়ে ইহানকে শান্ত করার অভিপ্রায়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রেরণা ফিসফিসিয়ে বলে,“রাগছেন কেন! ও এসব মজা করেই করে আমাদের ক্ষ্যাপাতে ! আর এটা জয়েন্ট ফ্যামিলি!”
_তাই বলে প্রাইভেসি.....
প্রেরণার হাতটা সরিয়ে যখনি এটুকু বললো ইহান, পুনরায় প্রেরণা ওর ঠোঁটের ওপর রাখলো ডান হাতের তর্জনী। চুপ করিয়ে দিলো অত বড়, গম্ভীর মানুষটাকেও। ইহানের চোখে চোখ রেখে খুবই শান্ত স্বরে প্রেরণা পুনরায় ফিসফিসিয়ে বললো,“এটা জয়েন্ট ফ্যামিলি। সবার সাথে তালে মিলে থাকতে হবে! আপনার অধৈর্য্য হবার সময় রাত দশটার পর থেকে দেওয়া হলো। আমার এই বিকেলটা বাড়ির সবাই নিক না! আপাতত আমি চা খাইয়ে আসি সকলকে!”
বড্ড আবেদন নিয়ে বলা এই কথাটাতে হুট করেই মেজাজ টা পরে গেল ইহানের। চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগলো তার সামনে,খুব কাছে দাঁড়িয়ে তার চোখে রাখা দু'টো নীল চোখ।
পরপর সরে এলো ইহান মুখটা ভার করেই, প্রেরণা এবার হেসে যেতে নিলে আবার হঠাৎ হাত টেনে ধরলো ওর। প্রেরণা ঘুরে বলল,
“আবার কি?”
_ব্লাউজ! ভুলে গেলেন?
প্রেরণা জিভ কেটে হাসলো পরপর ব্লাউজটা পাল্টে নিতে ওয়াশ রুমে ঢুকলো।
___________
বাইরে তখন হৈচৈয়ের আওয়াজ, ইশি মুঈন চলে এসেছে ইচ্ছে-খুশিকে নিয়ে। হুট করে এ বাড়িতে তাদের ডাক পরার কারণটা অবশ্যি ওরা জানেনা। মুঈন ডিউটি থেকে বাড়িতে গিয়ে ইশিকে নিয়ে এসেছে।
প্রেরণা নিজেকে ঠিক করে ঘর থেকে বেড়িয়েই মুখোমুখি হলো ইরফানের। গো বেচারা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কিচ্ছুটি বোঝে না। প্রেরণা হেসে বলল,“একটু সবুর করো চা দিচ্ছি। প্রণো কই? ইশিরা কই? ওদের রুমে?”
ইরফান ভাবী মনির পা-মাথা দেখে বলে উঠল,“অভিনন্দন ভাবী মনি!”
কপাল কুঁচকে নিলো প্রেরণা,“কেন? কোন আনন্দে?”
মিছিমিছি হাই তোলার ভান করে ইরফান বললো,“আজ গাইনোকলজিস্টের কাছে গিয়েছিলেন সেই আনন্দে!”
গোটা বাড়িতে খবরটা ফলাও হয়ে গিয়েছে। এসব তার ননদদের কাজ সে খুব ভালো করে জানে।
প্রেরণা হাঁফ ছাড়ে, কদম ফেলে বলতে থাকে,“ফাজলামি না করে বৌকে খুঁজে আনো। সব কাজ আমি একা করবো তা তো হবে না!”
ইরফান ফাজলামি থামায় না, ভাবীমনির পিছু পিছু গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে জবাব দেয়,“ভাবীমনি। ভাইঝি চাই এবং হার্ট অ্যান্ড সোল চেষ্টা করবেন তার খাসলত যেন আমাদের কয় ভাইবোনের মতন না হয়!”
মিটিমিটি হাসে প্রেরণা,সেও ফাজলামির সুরে বলে,“তবে আমি কিন্তু চাই, যে আসবে একটু একটু এ বাড়ির সবার মতন হবে। সবার গুণ পাবে!”
_যেমন?
_যেমন? তোমার দাদানের মতো স্বচ্ছ, আমার শাশুড়ির মতন ওপরে শক্ত ভেতরে নরম, বড় মায়ের মতো সবাইকে আগলে রাখার গুণ, ছোটো মায়ের মতো হাসিখুশি আর আন্তরিক, বড় বাবার মতো বটগাছ হবে এবং নিঃস্বার্থ ভাবে সবাইকে ভালোবাসবে, বাবার মতো ব্যবসায়িক বুদ্ধি থাকুক, ছোটো বাবার মতো মেধাবী, ইশির মতন স্পষ্টবাদী, ইনুর মতো সরল।”
এটুকু বলে একটু থামে প্রেরণা,পর পর ইরফানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“আর তোমার মতো দস্যি!”
ইরফান চুপ করে মাথা নিচু করে নেয়। ওদের পেছনে ইহান আসছিল, দেবর ভাবীর কথোপকথন সবটাই শুনতে পেয়েছে সে। মিটিমিটি হেসেছে শুনে।
ইচ্ছে-খুশি বড় মামা আর মামীর কোলে এখন। খুব আদর খাচ্ছে তারা। ইহান ভাগ্নিদের চুমু খেয়ে বলছে,“আমাকে ভোলোনি তো তোমরা? আমি তোমাদের বড় মামা। এ বাড়িতে তোমাদের সর্বোচ্চ আবদারের জায়গা।”
ইশি টিপ্পনী কেটে বললো,“না। আদর দিয়ে বাঁদর বানানোর জায়গা বলো। তোমাদের কারো হাবভাব ভালো না। দূরে থাকবে আমার মেয়েদের থেকে!”
হাসলো সবাই। প্রেরণাকে দেখে মুঈন দুপুরে শুদ্ধর ঘটনাটির বিষয়ে একটি শব্দও বললো না যেহেতু ইহান নিষেধ করেছে। বরং খুব সহজ গলায় মস্করা করে বলে উঠলো,“মিষ্টি কোথায় ভাবিজি?”
_মিষ্টি তো দোকানে, কেন?
প্রেরণা না বোঝার ভান করে জবাব দেয়। মুঈন বলে,“এভাবে এড়িয়ে যাবেন না যেন! মিষ্টি ছাড়া সুসংবাদ শুনতে ভালো লাগে না!”
ঠিক তখনই ইরফান মুঈনকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,“এ বাড়ির ছেলেদের কিপটেমির স্বভাব অন্তত নেই। থাকলে এ বাড়ির জামাইদের আছে!”
কথাটা শুনেই মুঈন চোখ সরু করে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফান প্রণমির পাশটাতে বসে মুঈনকে বলে,“এভাবে দেখবেন না ভাইয়া! চোখে যা দেখি,তাই বললাম! অবশ্য এই বদনাম আজ ঘুঁচবে যদি ট্রিট দেন!”
ইরফান বরাবরের ঠোঁট কাটা। ইহান বিরক্ত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়, চোখ দিয়ে ইশারা করে থেমে যেতে। ইরফান তো থামলোই না বরং পরিবেশটা হঠাৎ কেমন খুব গুরুগম্ভীর হয়ে উঠলো। মুঈন তো খুবই ব্যগ্রতার সহিত অনলাইনে খাবার অর্ডার করে দিলো, আজ শশুর বাড়ির সকলকে ট্রিট দেবে সে।
বিরক্ত প্রণমি, ওর পাশে বসা চূড়ান্ত ফাজিল লোকটাকে বললো,“এতো ফাজিল কেন আপনি? দুলাভাই মাইন্ড করলে?”
_করলে করবে? বাচ্চা হয়েছে কবে! এখনো ট্রিট দিলো না!
_বাচ্চা হয়েছে ইশি আপু আর দুলাভাইয়ের। সে কেনো শশুর বাড়ির লোককে ট্রিট দেবে?
_আনন্দে দেবে। আমিও দেবো আমাদের বেবি হলে! আমার শশুর বাড়ির লোককে! আমাকে এতো বলতে হবে না।
ইরফানের হুট করে বলা বেবির প্রসঙ্গে দারুণ লজ্জা পেয়ে গেলো প্রণমি। ফরসা গাল দু'টো লাল লাল বানিয়ে দাঁত দিয়ে ঠোট চেপে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। ইরফান থামলো, আরক্ত বধূর ঐ আশ্চর্য সুন্দর লাজ টুকু ঠাওর হতেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল সে।
মুঈন যেন ইরফানের খোঁচা মেরে বলা কথাটা একটু বেশিই সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছে। প্রেরণাকে কড়া গলায় বলেছে আজকে যাতে এ বাড়ির মহিলারা কেউ রান্নাঘরে না ঢোকে। আজ ডিনারটাও থাকবে এ বাড়ির বড় জামাই মুঈন ফরাজীর তরফ থেকে।
পরিস্থিতি হালকা করতে খিলখিল করে হেসে উঠল প্রেরণা,সবাইকে থামাতে বললো,“আমি চা আনছি। তারপর সব দেখা যাবে।”
_________
শেহা উজ্জ্বল জানতো না তাদেরকে এভাবে,হুট করে কেনো ডাকা হয়েছে। জানায়নি বড়োরা। শুধু কলে বলেছে,“চলে এসো। জরুরি দরকার।”
উজ্জ্বল তার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে বাড়িতে গিয়ে শেহাকে নিয়ে এসেছে। ওরা ভেবেছিল এবাড়িতে কোনো অসুখ বিসুখ হয়েছে! উদ্বিগ্ন শেহা গাড়ি থেকে নামা মাত্রই শান্তিনীড়ের অন্দর লক্ষ্য করে ছুটলো। অথচ এসে দেখলো বাড়ির সকলে সন্ধ্যা সন্ধ্যা হাসাহাসি করতে করতে প্রেরণার হাতে বানানো চা খাচ্ছে। উজ্জ্বল অবাক হয়ে ঘুরে ঘুরে সকলের মুখ দেখে।
সামিন ইয়াসার মির্জা ওদের দুজনকেও বলে,“এসো। আগে চা খাও। এখানে তোমাদের কেনো ডাকা হয়েছে তা পরে বুঝতে পারবে।”
উজ্জ্বলের কৌতুহল দমেনি, সে ইহান মুঈন আর ইরফানকে চোখের ইশারায় প্রশ্নও ছুড়েছিল। যদিও জবাব মেলেনি কারণ ওরা কেউ জানে না।
সবচেয়ে দেরী করে বাড়িতে পা রেখেছে ইনু আর প্রিতম। প্রিতম অফিস থেকে ফেরার পর আসতে পেরেছে। বাড়িতে ঢুকেই সকলকে বিনয়ের সহিত সালাম দিলো এ বাড়ির ছোটো জামাই। হাতে তার মিষ্টির প্যাকেট! তুলে দিলো যথারীতি প্রেরণার হাতে।
সকলে চলে এলেও মোক্তারের অপেক্ষাতে ছিল সামিন, তখন অবধি মুখ খোলেনি সিনিয়র মির্জারা। আলো মাঝখানে ওদের তিন ভাইয়ের কাছে গিয়ে স্বর খাঁটো করে বলে এসেছে,“আর ঘোল খাওয়ানোর কি দরকার বাচ্চাগুলোকে? ওরা ভাবছে সিরিয়াস কোনো ইস্যু। গিয়ে বলে দিই?”
ফুরফুরে মেজাজে সামিন জবাব দেয়,“সবুর। সবুর। সারাজীবন তো ওরাই আমাদের ঘোল খাইয়ে এলো। আজ না হয় আমরা একটু খাওয়াই, আর ঘন্টাখানেকের ব্যাপার!”
_________
মোক্তার এসেছে ঠিক মাগরিব বাদ, সাথে এনেছে তার ল্যাপটপ। মোক্তারকে দেখেও কেউ কিছু স্পষ্ট করে ধরতে পারেনি। তবে খটকা লেগেছে সকলের মনেই। সবাই বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে সামিনের নির্দেশে নিচ তলার ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলো। অতঃপর আলো ধীরে ধীরে নামলো ফাইল গুলো নিয়ে।
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার সামান্য হেসে পরিস্থিতি হালকা করলো সামিন,পর পর গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,“আজ তোমাদের একটি বিশেষ কারণে জমায়েত করেছি আমি। ব্যাপারটা হলো, তোমাদের কিছু জিনিস এ যাবত কাল আমি দেখভাল করেছি। আগলে রেখেছি এবং কাজে লাগিয়েছি। আমার জীবনটা এখন নিড়িবিলি হতে চাচ্ছে , তাই তোমাদের জিনিস তোমরা আজ হাতে হাতে আমাদের থেকে বুঝে নেবে উইদাউট মেকিং এনি সাউন্ড!”
পরিস্থিতি গুমোট। প্রত্যেকে অবুঝ নয়, সামিনের কথাবার্তা আর ওর হাতের ফাইলগুলো দেখে ইতিমধ্যে সবটা বুঝে নেয় সকলে। তবে বলে না কিছুই।
মুঈন এবার উঠে দাঁড়ায়,ওকে থামিয়ে দেয় সামিন,“যাচ্ছো কোথায়?”
_বাবা এসব আপনাদের পারিবারিক বিষয়।
ওর কথায় সম্মতি জানিয়ে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায় প্রিতম আর উজ্জ্বলও। ইশমাম বললো,“তোমাদের কি হলো?”
_বাবা আপনারা কথা বলুন। আমরা যাই।
প্রিতমের বলার পরে যেন প্রেরণাও তৎপর হলো, বিব্রত ভঙ্গিতে প্রণমির কাঁধ আগলে তুলে সামিনকে বলে,“বড় বাবা! মুঈন ভাইয়া ঠিক বলেছে। আমরা যাই! আপনারা কথা বলুন।”
এবার সামিন সামান্য ধমকে ওঠে সকলকে,“বসো। যে যেই জায়গা থেকে উঠেছো ওখানেই বসো! এক্ষুনি।”
ওরা কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে আবার যখন বসলো তখন সামিন প্রথমে তিন জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে,“আমি জানি এটা আমার পারিবারিক বিষয়। তবে সেই পারিবারিক সূত্রেই তোমরা আমাদের তিন মেয়ের অভিভাবক। এসব সম্পর্কে ওদের তেমন জ্ঞান নেই, ওদের যা কিছু সব কিছু সম্পর্কে তোমাদের অবগতি থাকা প্রয়োজন। তোমাদেরও জানতে হবে।”
এবার প্রেরণার দিকে তাকিয়ে সামিন বললো,“আর তোমরা। তোমরা এ বাড়ির বৌ,এই বাড়ির লোক। তোমাদের শাশুড়িরা কিন্তু পাই টু পাই সব জানে আমাদের বংশে কোথায় কয় কাঠা জমি। নিজেদের স্বামীর যা কিছু আছে,সবকিছু সম্পর্কে অবগত থাকা প্রয়োজন।”
বাড়ির বৌ জামাইদের চুপ করিয়ে দিলো সামিন কয়েকটা বাক্যে। পরিস্থিতি থমথমে। এ বাড়ির বাচ্চারা তখনও মুখ খোলেনি। ইহান, ইরফান,ইশি,ইনু আর শেহা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে।
ওপাশে শুদ্ধ একা একা বল খেলছে।
এবার ইশমাম মুখ খোলে, ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলে,“সব বণ্টন করতে হবে শুরু থেকে। সবার আগে আমরা তিন ভাই আমাদের একমাত্র বোন ইশিতার প্রাপ্য সমস্ত কিছু দিয়ে দিতে চাই।”
শেহা উজ্জ্বলের পাশ থেকে এইবার উঠে দাঁড়ায়,কপট রাগ দেখিয়ে বলে,“এজন্য আজ এভাবে ডেকে আনলে? কেন? আমি আমার ভাগ চেয়েছি? আমার বাবা বা হাজবেন্ড চেয়েছে?”
ওর জবাবটা ওর বড় মামা দেয়, ম্লান হেসে ওর দিকে একটা ফাইল এগিয়ে ধরে সরল গলায় বলে,“এ বাড়িতে সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী বণ্টন হয়েছে। এই তোমার মায়ের ভাগ। তবে হ্যা, আমি এই শান্তিনীড়ের এরিয়া ভাগ করে দিইনি। আমার বোন যতদিন জীবিত থাকতো,ওর অধিকার ততদিন এই বাড়িতে থাকতো। তুমি ওর মেয়ে, আমি যতদিন জীবিত আছি তুমি তোমার মায়ের এই অংশটুকু যখন খুশি তখন ভোগদখল করতে চলে আসবে। আমরা তোমার তিন মামা নিজেদের মেয়েদের মতন করে তোমার নাইওরি গ্রহণ করবো। এবং আমি আমাদের বাড়ির ছেলেদের ওপর আদেশ দিলাম এই কাজটা যেন তারা আমাদের মৃত্যুর পরেও চালিয়ে যায়। ইশিতার মেয়ের সঠিক মূল্যায়ন। সম্পত্তি বণ্টন মানে সম্পর্ক আলগা হওয়া নয়।”
থামলো সামিন। ততক্ষণে শেহার চোখ দুটো ভরে উঠেছে জলে। থমকে তাকিয়ে আছে বড় মামার দিকে। সামিন আবারও চমৎকার একটা হাসি দিয়ে ভাগ্নির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ওর কোলের ওপর তুলে দেয় ফাইলটা।
মোক্তার অন্যান্য কাগজপত্র গোছগাছ করছে। বাকিরা নিস্তব্ধ। এবার সামিন নিজের দুই ভাই ও ভাইপো দের উদ্দেশ্য করে বলে,“একটা বিষয় উল্লেখ করছি। সঙ্গত কারণে এ বাড়িতে আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তির পরিমাণ বেশি আমার। কারণ আমাদের দাদা ইলহাম ইশমাম জন্মানোর পূর্বেই আমার একার নামে অনেক কিছু করে দিয়েছিল। তো আমার যেহেতু কোনো ছেলে নেই, আমার সম্পত্তি পুরোটাই পাচ্ছে ইশি। এখন আমার ভাইপো হিসেবে তোমাদের যেটুকু প্রাপ্য আমি সেটুকু দিয়েছি, তোমরা চাইলে মোক্তার সাহেব বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে পারে।”
বলেই সামিন নিজের মেয়ের কোলের ওপর তার ফাইলটা রাখে। ইশি মাথা নিচু করে বসে আছে যদিও তবে ফাইলটা দেখে না আর।
এদিকে বড় বাবার কথায় ইহান আর ইরফানের চোয়াল কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে যা সামিন বুঝতে পারছে না, সে একমনে কথা বলেই যাচ্ছে। এবার ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,“এবং আসি পরের বিষয়টিতে। এই যে তোমাদের দুই ভাইয়ের সমান সমান ভাগ এগুলো রাখো। তবে ইরফান, একটা বিষয়, তোমার দাদানের কিন্তু সম্পত্তি তোমার থেকে একটুখানি বেশি। তোমার দাদু তোমাকে জন্মাতে দেখেনি, তোমার জন্মের আগেই ওসব ইহানের নামে করেছে। তোমার কি কোনো আক্ষেপ আছে?”
এইবার ইরফান আর নিজের মেজাজ টা ঠিক রাখতে পারলো না। অকস্মাৎ উঠে দাঁড়ায়, এবং হাতে পেলো টান। ইলহাম মির্জা ছেলেকে টেনে ধরে বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মুখটা থামাতে পারলো না ওর, সামিনের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“বড় বাবা! আজ কিন্তু বাড়াবাড়ি তুমি করছো আই ওয়ার্ন ইউ তুমি এসব বেহুদা কথা থামাও নয়তো.....”
হাসে সামিন, হাল্কা গলায় বলে,“বেহুদা এবং বাড়াবাড়ি নয়। এটা উচিত। তোমাদের জানা উচিত সবটা!”
সামিন শান্ত ভঙ্গিতে ঘুরে ইশমামের হাতে ইনুর ফাইলটা তুলে দেয়। ইশমাম ফাইল হাতে নিয়ে মেয়ে জামাইয়ের মুখ দেখে। প্রিতম যেন লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। ইশমাম জামাইকে কিছু বলে লজ্জা না দিয়ে নিজের মেয়েকে বললো,“এসব কিছু তোমার। যদিও এখানে তোমার মাম্মা এবং আমার পার্সোনাল অ্যাসেটস নেই। ওসব পরে তোমাকে বুঝিয়ে দেবো।”
মেয়েকে কথাটা বলা শেষ করে ইশমাম ঘুরলো প্রিতমের দিকে, বললো,“এসব সামলে রেখো।”
শেহা,ইশি বা ইনু কেউ ফাইল গুলো ছুঁয়েও দেখলো না। ওসব যার যার কোলের ওপর বড্ড অবহেলায় পরে আছে। সবাই ভীষণ চুপচাপ। ইহান শুরু থেকে নীরব থাকলেও এবার মুখ খোলে, সরাসরি নিজের বাবা চাচাদের মুখ অবলোকন করে বলে,“সব বলা এবং বোঝানো শেষ?”
হাঁফ ছাড়ে সামিন। বলে,“আপাতত!”
এইবার ইহান উঠে দাঁড়ায়। থমথমে মুখে বসে থাকা তিন বোনের কোলের ওপর থেকে তাদের প্রাপ্য সম্পত্তির ফাইল তিনটা এবং একই সাথে ইরফান আর তার ফাইল দু'টো একসাথে করে নিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় আলোর সামনে,আলোর হাতে ফাইলগুলো সুন্দর ভাবে তুলে দিয়ে খুবই শান্ত গলায় বলে,“বড় বাবার আলমারিতেই রেখে দাও।”
আলো একবার বাড়ির বাচ্চাদের মুখ দেখে, একবার দেখে স্বামী আর দেবরদের মুখ। সে কি করবে? ভীষণ বিপদে পরেছে।
সামিন ম্লান হেসে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে,“ইহান ওগুলো নিয়ে যাও তোমরা!”
ছোটোরা কেউ কথা বলে না। সবাই দাদানের মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে। ভাইবোনের মনের সমস্ত কথা যেন পড়ে ফেলেছে ইহান, লম্বা শ্বাস ফেলে বড় বাবাকেই বলে,“না তোমরা অতটা বুড়ো হয়েছো, না আমরা এতোটা বড় হয়েছি। এগুলো তোমার এবং তোমাদের কাছেই থাকুক। এই নিয়ে আর বেশি জলঘোলা হলে আমরা সবাই আহত হবো বড় বাবা। আচ্ছা একটা কথা বলো, আমরা এই পাঁচ ভাইবোন, এদের আচরণে কখনো তোমার মনে হয়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কটাকে এই সম্পত্তি কিছুটা হলেও প্রভাবিত করতে পারে? সেজন্য বুঝি আগে ভাগে এই শান্তি চুক্তি করতে চাইছো?”
দুই পাশে মাথা ঝাঁকায় সামিন,“এমনটা নয়।”
ইহান সাথে সাথেই জবাব দেয়,“এমনটাই। তবে বড় বাবা একটা কথা বলে রাখি। তোমাদের চোখে হয়তো ছেলেমেয়ে হিসেবে অতটা যোগ্য নই আমরা, কিন্তু আমাদের সকলের কাছে এই বাড়িতে এখনো তুমিই মাথা। তুমিই সব। ইভেন আমার বাবা চাচাদের জন্যও। সে জায়গা থেকে এখন শুধু একটা কথাই বলবো,“এসব তোমার আলমারিতে তোলা থাকবে! আমাদের যখন প্রয়োজন হবে আমরা চেয়ে নেবো। আর এই নিয়ে একটা কথাও নয়। এই বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে আমি এটুকু চাইছি!”
ইহানের কন্ঠে দৃঢ়তা ছিল, সামিন ইয়াসার মির্জা পারলেন না কথা বাড়াতে আর। এক পলকে গম্ভীর ভাব ধরে বসে থাকা তার ছেলে মেয়েগুলোকে দেখে হাসলেন নির্মল হাসি। অতঃপর উঠে গেলেন ওখান থেকে চুপচাপ, যাওয়ার আগে মোক্তারকে বলে গেলেন ডিনার করে যেতে।
__________
বাড়ির পরিবেশ রাত নটার মাঝে স্বাভাবিক রূপ ধারণ করেছে। সকলে মিলে হৈচৈ করতে করতে রেস্তোরাঁ থেকে আসা খাবার গুলো খেয়ে আড্ডা জমিয়েছে নিচতলায়। মেয়ে-মেয়ে জামাই আর ছেলে-ছেলের বৌদের প্রাণোচ্ছল হাসির ঝংকারে মুখরিত নিচতলার লিভিং রুম,তিন সিনিয়র মির্জার ভরা সংসার!
অন্যদিকে সিনিয়র মির্জারা প্রসন্ন চিত্তে মাথা পেতেছে বালিশে।
আড্ডা এসে ভাঙে শুদ্ধ, তার খুব ঘুম পেয়েছে। ইহান উঠে যায় ছেলেকে নিয়ে।
খানিক বাদে প্রেরণা উঠে গেলে মজলিস ভেঙে যায় পুরোপুরি। বাকিরাও তৎপর হয় ঘুমোতে যাবে তাই। আজকের দিনের চমৎকার একটা পারিবারিক মহলের স্বাদে তৃপ্তিতে ঢেকুর তুলছিল ওরা।
শুদ্ধর ঘরের বাতি নেভানো,দরজা টেনে দেয়া। প্রেরণা চেক করেই নিজেদের ঘরে ঢুকলো। দেখলো ইহান দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ,ওর অপেক্ষাতেই। প্রেরণাকে দেখা মাত্রই ঘড়ি দেখলো একপলক। তখন রাত নয়টা বেজে বায়ান্ন মিনিট। প্রেরণা তাৎক্ষণিক ভাবে বুঝতে পারেনি এই লোকটা ঘড়ি দেখছে কেন!
মুখ হাত ধুয়ে যখন তোয়ালে দিয়ে ভেজা মুখটা মুছে নিচ্ছিল ঠিক তখন শুনতে পেলো দোতলার লিভিং রুমেও হাসাহাসি হচ্ছে তখনো। ওরা সবাই এসে হয়তো এবার ওখানে জমায়েত হয়েছে।
বাড়ির বড় বৌ হিসেবে প্রেরণা সন্ধ্যা থেকে চমৎকার ভাবে উপভোগ করেছে এদের সঙ্গ। প্রেরণার এখন হাসিখুশি থাকতে বেশ লাগে। খুব কৌতুহলে এবারো যখন ঘরের বাইরে বেরুতে চাইলো ও,ঠিক তখনি টের পেলো ইহান ওকে আটকে দিয়ে ঘরের দরজাটা লাগিয়ে দিয়েছে।
হতবাক প্রেরণা,ভ্রু উঁচিয়ে বলে,“কি হয়েছে?”
ইহান খুবই শান্ত। শান্ত ভঙ্গিতেই দরজার তিনটা লক পর পর আটকে দিয়ে এগিয়ে আসে প্রেরণার কাছে। এসে ওকে কিছু বোঝার সময়টুকু না দিয়ে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানায় রাখতে রাখতে বলে,“আমার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল রাত দশটার পর থেকে? তাইনা? তবে এখন এক পা ওদের কাছে কেন যাচ্ছে? প্লিজ বলবেন না এটা জয়েন্ট ফ্যামিলি এবং রাত্তিরের আড্ডায় বাড়ির বড় বৌ না থাকলে কেমন কেমন দেখায়!”
প্রেরণা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ইহান ঝুকলো ওর ওপর, বললো,“তখন কি বলছিলেন? যে আসবে আমার মতো স্বচ্ছ হবে, আপনার শাশুড়ির মতন ওপরে শক্ত ভেতরে নরম, বড় মায়ের মতো সবাইকে আগলে রাখার গুণ থাকবে, ছোটো মায়ের মতো হাসিখুশি আর আন্তরিক, বড় বাবার মতো বটগাছ হবে এবং নিঃস্বার্থ ভাবে সবাইকে ভালোবাসবে, পাপার মতো ব্যবসায়িক বুদ্ধি থাকুক, ছোটো বাবার মতো মেধাবী, ইশির মতন স্পষ্টবাদী, ইনুর মতো সরল আর ইরফানের মতন দস্যি হোক! তো সবার মতোই কিছু কিছু যখন হবে, আপনার মতো কিছু হবে না?”
প্রেরণা শুকনো হেঁসে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,“আমি কোনো বিশেষ গুণসম্পন্ন ব্যক্তি নই! আমার মতো কি হবে?”
ইহান একহাতেই ওর মুখটা ঘুরিয়ে চোখে রাখে চোখ, পর পর চোখের পাতা ছুঁয়ে দিয়ে বলে,“এই চোখ দু'টো! এই চোখ দু'টো যেন সে পায়!”
কথা বলে না প্রেরণা, দিনশেষের নিস্তব্ধতা ও আরামে চোখ মুদে থাকে।
“শরীর খারাপ লাগছে?”
মাথা ঝাঁকিয়ে প্রেরণা জবাব দেয়,“ক্লান্ত লাগছে।”
তখুনি টের পায় ওর পেটের কাছ থেকে শাড়ির একাংশ সরিয়ে নিয়েছে ইহান, এরপর ওখানটা ছুঁয়েই বলে,“আপনি শিয়র? এখানে আমার মতো স্বচ্ছ, আপনার শাশুড়ির মতন ওপরে শক্ত ভেতরে নরম, বড় মায়ের মতো সবাইকে আগলে রাখার গুণ, ছোটো মায়ের মতো হাসিখুশি আর আন্তরিক, বড় বাবার মতো বটগাছ হবে এবং নিঃস্বার্থ ভাবে সবাইকে ভালোবাসবে, পাপার মতো ব্যবসায়িক বুদ্ধি থাকুক, ছোটো বাবার মতো মেধাবী, ইশির মতন স্পষ্টবাদী, ইনুর মতো সরল আর ইরফানের মতন দস্যি কেউ লুকিয়ে বসে নেই? শিয়র আপনি?”
প্রেরণা হেসে ফেলে,বলে,“আপাতত নেই। শিয়র!”
চলমান......