#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩৫
#ইসরাত_ইতি
ফোনের ভাইব্রেশনের কর্কশ শব্দে প্রেরণার চোখ থেকে ঘুম ঘুম ভাবটা পুরোপুরি উবে যায়। চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমানোর অভ্যেস টা প্রেরণার খুব বাজে। এতবার,এত ভাবে চেষ্টা করেও ফেরানো গেলো না। কলটা এসেছে তার শাশুড়ির কাছ থেকে। নাম্বারটা দেখেই নড়েচড়ে বসল প্রেরণা। কোনো এক অজানা কারণে বিয়ের পর থেকে শাশুড়িকে সে কারণ রেখে অকারণেও ভয় পায়। তার মনে হয় শাশুড়ি তাকে সবসময় ধমকানোর জন্য প্রস্তুত। এখন যেমন মনে হচ্ছে এই বুঝি ফোনের মাঝেই ধমকে উঠবে,“এসব কেন করো? এটা কেন বোঝো না তুমি এত বড় মানুষ?”
প্রেরণা অবশ্যি এসব গায়ে মাখে না কখনো,কারণ সে এই ক'মাসে চিনে নিয়েছে শাশুড়িকে। বরং তার মনে হয় রিতু তাকে না ধমকালে প্রেরণার মোটেই ভালো লাগবে না। তাদের সম্পর্কের মিষ্টতা কমে যাবে, পানসে হবে।
একটা সংক্ষিপ্ত হাই তুলে ব্যস্ত হাতে প্রেরণা কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে তার শাশুড়ির গমগমে স্বর,“চিলি ফ্লেক্স কই রেখেছো?”
_পূব পাশের কেবিনেটে মা।
_তেজপাতা গুঁড়া আর আদা গুঁড়া?
_লাল তাকটাতে,খুললেই পাবেন।
_কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না, কোনটা যে কোন পাশে সরিয়ে রেখেছো এই ক'মাসে! সব একেবারে অগোছালো লাগছে। সকালে একটু বুঝিয়ে যাবে তো আমাকে!
হাসে প্রেরণা,“আমি তো সকালে রান্নাটা করে রেখে আসতেই চাইলাম মা। আপনারা করতে দিলেন না। আচ্ছা আজ বাড়িতে এসে বুঝিয়ে দেবো সব।”
_হয়েছে। অফিস করতে চাইছো অফিস করো, এ বাড়িতে রান্নার লোক বহুত আছে। কর্মজীবী বৌয়ের ডানা ছেঁটে তাকে দিয়ে সারাক্ষণ রান্না করানোর মতো অতটা জাঁদরেল শাশুড়ি বোধ হয় হতে পারবো না। শুধু আমি দেখতে পাচ্ছি পুরো রান্নাঘরটা নিজের কায়দায় সাজিয়ে রেখেছো এই কয়মাসে। চিনতেই পারছি না কিছু।
প্রেরণা জবাব না দিয়ে হাসে। ওপাশে তার শাশুড়ি বলে যেতে থাকে,“দুপুরে ফিরলে ইহানকে সাথে নিয়ে ফিরো। কই কই যায় কে জানে! ঠিকঠাক মত বাড়িতে শ্বাস ফেলতে পারেনি এই সপ্তাহে। আমি বললে তো শোনে না এখন আর! ভাবলাম এখন সময়টা তোমার, রাজত্ব তোমার। তোমার কথা যদি শোনে!”
শাশুড়ির আদেশে যথা আজ্ঞা বলে কল কেটে প্রেরণা মিটিমিটি হাসে। সত্যি কি চার মাসে প্রেরণা শুধু ঐ রান্নাঘরের সাজবদল করতে সক্ষম হয়েছে? রিতু নামের ভদ্রমহিলার ভরসার পাত্রী হতে পারেনি? হয়তো পেরেছে। প্রেরণা তো টের পায় সবটাই।
প্রেরণার সামনে টিভিটা মিউট করে রাখা। লোকাল চ্যানেলে তখন ইহানকে টুকটাক দেখানো হচ্ছিল। কালকের জনসভার কিছু ক্লিপ পুনঃ প্রচার হচ্ছে। প্রেরণা শব্দ কমিয়ে শুধু মানুষটাকে দেখছিলো গালে হাত রেখে, এমন করে তার শশুর শাশুড়িরাও দেখে রোজ। ইয়াসার মির্জা ওপরে গা ছাড়া ভাব দেখালেও তিনি ভীষণ পছন্দ করছেন তাই ভাইপোর প্রতিটি পদক্ষেপ।
________
রিতু কল কেটে হাত বাড়িয়ে চিলি ফ্লেক্সের কৌটাটা নিয়ে ঘুরতেই দেখল রান্নাঘরের দরজার ওখানটাতে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রণমি। মুখটা অন্ধকার তার। এই মেয়েটার জন্য বড্ড মায়া রিতুর। সে কখনো তুলনা না করলেও এটা সত্যি দুই বৌয়ের মধ্যে ছোটো ছেলের বৌটা তার বেশি ভালোবাসার,আদরের। বাড়িতে ইরফানের অগোচরে দিনের মধ্যে বার বার এভাবে মেয়েটার হীনমন্যতা সংকীর্ণতায় ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে-বসে থাকা রিতুর ভালো লাগে না। বাকিদের মতন মেয়েটারও এইটা বাইরের দুনিয়া ছিল। অথচ রিতুর কথাতে সেসব কিছু থেকে কত সাবলীল ভাবে সরিয়ে রেখেছে নিজেকে। রিতুও মাঝে মাঝে অনুশোচনায় ভোগে, তবে পরক্ষনেই গা ঝাড়া দেয়। সে যা করেছে ঠিক করেছে। মুসলিম তারা, বাড়ির বৌয়ের অত গায়িকা হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই! এমনিতেও ধর্ম কর্মের বালাই নেই বাড়িটাতে, রিতু সবার রাশ টেনে রেখেছে এই যা।
“কি ব্যাপার? এখানে কি করো? ইরফান কই?”
_ঘরে। ওনার কাছেই ছিলাম এতক্ষণ।
_তো এখানে এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন?
প্রণমি হালকা হেসে বলে,“আর কি করবো মা? আর কি করার আছে আমার?”
আলো আর পরী ডাইনিংয়ে বসে বিভিন্ন পদের ভর্তা করছিলো দুপুরের জন্য। রিতু হাতের চিলি ফ্লেক্স টা তার বড় জায়ের হাতে দিয়ে প্রণমিকে বলে,“করার ইচ্ছা থাকলে অনেক কিছু করা যায়। আমি আমার শাশুড়িকে দেখেছিলাম। খুঁটে খুঁটে এক একটা কাজ বের করে করতেন।”
প্রণমি এবারো হালকা হেসে বলে,“আমি তো খুঁটতেও পারবো না মা। আমি তো চোখেই দেখি না!”
রিতু তাকিয়ে থাকলো মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ, শ্বাস ফেলে বলে,“বড্ড বেশি কথা বলো। চুল টানতে পারো?”
_পারি, আমি রাগ উঠলে নিজের চুল টানি।
আলো পরী হেসে ওঠে উচ্চশব্দে প্রণমির কথাতে। রিতু ভাবুক ভঙ্গিমা করে বলে,“চলো দোতলায়। তোমার চুল টানার দক্ষতা ঠিক কতটুকু আমাকে দেখাবে।”
_কিন্তু এখন তো রাগ নেই মা। আপনার ছেলেকে বলেন রাগ উঠাতে আমার।
আজকাল প্রণমি চুপটি করে থাকে না, তার শাশুড়ির কথার পিঠে সব জবাব দিয়ে দেয়। জবাব গুলো এতোটাই সরলতায় ভরা থাকে যে,রিতু না হেসেও পারেনা। এবারো উচ্চশব্দে হেসে উঠলো, বললো,“চুল আমার টানবে। মাথা ধরেছে। চলো।”
প্রণমি বাধ্য বৌয়ের মতো তার শাশুড়ির পিছু পিছু দোতলায় উঠে গেল। ওকে একটা সোফাতে বসিয়ে ওর কোল ঘেঁষে মেঝেতে বসে রিতু চুল খুলে দেয়। প্রণমি অতি যত্নের সহিত শাশুড়ির চুল টানে।
“মুখ থমথমে কেন তখন থেকে ?”
রিতুর প্রশ্নে প্রণমি চমকায়। তার শাশুড়ি সবসময় তাকে একটু গভীর করেই বুঝে ফেলে। তার মুখটা থমথমে ছিল কারণ একটু আগে ইরফান মির্জার সাথে নীরব ঝগড়া হয়েছে তার। বিষয়টা রিপ্পি। ইরফান আজ বাড়িতে,ওরা পাশাপাশি শুয়ে ছিল এতক্ষণ। হঠাৎ ইরফানের কাছে তার বন্ধু নিক্সনের কল আসে। প্রণমি পাশে শুয়ে স্পষ্ট শুনেছে নিক্সন বলেছে রিপ্পির নাকি বেবি হয়েছে, রিপ্পির হাসবেন্ডের আইডি থেকে পোস্ট দেয়া হয়েছে। সেদিনের পরে আবার খটকা লাগে প্রণমির।
আচ্ছা রিপ্পি যদি ছেলে হয় তবে রিপ্পির হাসবেন্ড কোথা থেকে এলো? নিশ্চিত এটা মেয়ে। আর মেয়ে হলে এতো লুকোচুরি কেন? আর রিপ্পির বেবি হলে ইরফান মির্জার কি?
প্রণমি জানতে চাওয়ার পরে এবারো ভুজুং ভাজুং দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে ইরফান। উচ্চবাচ্য করেনি প্রণমি শুধু চুপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
শাশুড়িকে মিথ্যা করে বলে,“নাহ,কিছু হয়নি মা।”
_আচ্ছা কিছু না হলে নাই।
বলেই রিতু টিভির রিমোটটা হাতে তুলে নেয়। টিভি অন করতে গিয়েও আবার থেমে প্রণমিকে বলে ওঠে,“আচ্ছা একটা গান শোনাও। টিভির ঘ্যানঘ্যান শুনতে মন চায়না। তুমি খালি গলায় একটা গেয়ে শোনাও,দেখি কেমন গুণী।”
গান গাইতে বলার পরে প্রণমির মুখভঙ্গি পুরোটাই পাল্টে গেলো । সে খুশি খুশি গলায় বলল,“সত্যিই গাইবো?”
_মিথ্যা গান গাওয়া যায়? কি অদ্ভুত!
শাশুড়ির আদেশে নড়েচড়ে বসে মেয়েটা। কিছুটা সময় নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে গাইতে শুরু করে,
“প্রাণ চায় চক্ষু না চায়, মরি একি তোর দুস্তরলজ্জা।
সুন্দর এসে ফিরে যায়, তবে কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জা॥
মুখে নাহি নিঃসরে ভাষ, দহে অন্তরে নির্বাক বহ্নি।
ওষ্ঠে কী নিষ্ঠুর হাস, তব মর্মে যে ক্রন্দন তন্বী!”
ঘর থেকে প্রণমিকেই খুঁজতে বেড়িয়েছিল ইরফান। বাইরে এসেই এমন একটা চমৎকার দৃশ্য দেখে সে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে প্রণমি গান থামিয়ে দেওয়ায় রিতু বলে,“শেষ?”
_আরো গাইবো মা?
_তো আমি কি তোমার রিডিং পড়া নিচ্ছি যে দুই লাইন শোনাবে? অদ্ভুত। গাও!
প্রণমি হেঁসে আবার যখন গাইতে যাবে ঠিক তখনই শুনলো তার নিজের একান্ত পুরুষটির স্বর। তার হয়ে গেয়ে দিলো,
“মাল্য যে দংশিছে হায়, তব শয্যা যে কণ্টকশয্যা
মিলনসমুদ্রবেলায় চির- বিচ্ছেদজর্জর মজ্জা॥”
রিতু তাকালো ছেলের দিকে। একে একে যার যার ঘর থেকে উঁকি ঝুঁকি মারতে শুরু করলো বাকিরা । সামিন ইয়াসার মির্জাও কম যান না, খুব কৌতুহলে দরজা ফাঁক করে দেখলো এক পলক। পরপর দরজা আটকে দিল।
এদিকে মুখটা আবার ভার করে বসে রইল প্রণমি। তার ভেতরে যে চাঁপা রাগটা জমেছে তা কি এসবে কমবে? মোটেও না। প্রণমিকে ঘোল খাওয়ানো এতটাও সহজ হবে না। আজ বাড়িতে সবাই চলে আসবে রাতে। বড় দাদানের জনসভা তিন দিন বাতিল তাই এই ফাঁকে গাজীপুরে একটা ট্রিপ দিতে চাচ্ছে সকলে। সন্ধ্যার মধ্যে ইশি আপু দুলাভাই, শেহু উজ্জ্বল ভাই আর ইনু ভাবী আর ভাইয়াও চলে আসবে। আগামীকাল ভোর ভোর এখান থেকে রওনা দেবে। ভাইয়াকে সামনে বসিয়ে প্রণমি ঠিক জেনে নিতে পারবে রিপ্পির ব্যাপারে। আপাতত চুপচাপ থাকাই শ্রেয়।
__________
দ্বিতীয় দফায় কল বাজতেই প্রেরণার ঘোর কেটে যায়। শশুর বাড়ি আর স্বামীর কল্পরাজ্য থেকে বেরিয়ে সে এবারের কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ বলে,“ম্যাম ডিলটা নিয়ে কিছু জানালেন না তো আমাদের। আমরা কি আগাবো?”
হাঁফ ছাড়ল প্রেরণা। সে ভুলেই গিয়েছিল সেই ব্যাপার টা। দু'দিন আগে চৌধুরীর ছোটো ভাই প্রেরণার কেটরিং সার্ভিসের অফিসে কল করে একটা অর্ডার দিতে চেয়েছিল,মোটা অংকের। তখন প্রেরণা শুধুমাত্র ভেবে জানাবে বলে কলটা কেটেছিল। আজ অবধি এই নিয়ে সে ভাবার ফুরসৎ টুকু পায়নি। এমনকি টানা চার মাস পরে আজ প্রথম এই অফিসের চেয়ারে সে বসলো। খুব অলসতা ঢুকেছে তার মধ্যে।
ফোনের ওপাশে অপেক্ষারত লোকটাকে প্রেরণা আর বেশি অপেক্ষা না করিয়ে বলে,“দুঃখিত। আসলে এ ব্যপারে আমি আমার হাসবেন্ডের সাথে আলাপ না করে কিছু বলতে পারছি না। আমি সন্ধ্যা নাগাদ তোমাকে জানাবো সুমন। ততক্ষণে আমার হাসবেন্ডের সাথে আলাপ করে দেখি।”
কল কেটে প্রেরণা তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে কল করে বসে ইহানকে। যখন ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হয়, প্রেরণা হড়বড় করে বলতে থাকে,“আপনি কোথায়? বাড়িতে ফিরবেন না? আজ কোথাও গিয়েছেন সভায়?”
_বাড়িতে ফিরবো।
গমগমে স্বরটা কেমন আরো খানিকটা অদ্ভুত শোনালো। যেন দেয়ালে বারি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
_কি ব্যাপার? আপনি কোথায় বলুন তো! আপনার স্বরটা কেমন যেন শোনাচ্ছে। আপনি কোথায়? কোনো রুমের ভেতর?
ইহান হেসে বলে,“আছি এক জায়গায়। আপনি বলুন, আমার ফেরা নিয়ে এতো কৌতুহল?”
_মা বললেন আপনি নাকি এখন শুধু আমার কথাই শুনবেন, তাই আপনাকে ধরে বেঁধে বাড়িতে নিয়ে যেতে বললেন।
এবারও মৃদু হাঁসি হেঁসে ইহান বললো,“তারপর?”
_তারপর কি? আচ্ছা শুনুন না,সেদিন বলেছিলাম না চৌধুরীর ছোটো ভাই অর্ডার দিয়েছে। তো ঐটা কি আমি হ্যা করে দেবো?
_কেন নয়? আপনার ক্লায়েন্ট। টাকাও তো মোটা অংকের!
আমতা আমতা করছিলো প্রেরণা। ইহান একটু থেমে বললো,“কি অসুবিধা হচ্ছে?”
_না মানে, আপনার অপজিশনের রিলেটিভ! উনি হয়তো জানে না আমি আপনার বৌ। জানলে এমন করতেন না!
ইহান হাসে আবার,বলে,“হুম, হয়তো। তবে কিছু ভাববেন না, কাজটা নিতে মন চাইলে অবশ্যই নিবেন। যদি কোনো ঝামেলা হয়, সেক্ষেত্রে আমি আছি!”
প্রেরণা এবার ফোন কানে চেপে রেখেই উঠে দাঁড়ায়, তার তখন থেকে মনে হচ্ছিল কিছু একটা অস্বাভাবিক। তার ফোনে সমস্যা? নয়তো এভাবে শোনাচ্ছে কেন স্বর?
নিজের কেবিন খুলে সামনে যায় প্রেরণা, হয়তো নেটওয়ার্ক ভালো পাচ্ছে না তাই ভেবে। গিয়েই এবার সে থমকাল, তার অফিসের ড্রয়িং রুমের জানালা ঘেঁষে কানে ফোন চেপে দাঁড়িয়ে থাকা বলিষ্ঠ লোকটার দিকে চেয়ে। ঘেমে নেয়ে একাকার সে।
প্রেরণার অস্তিত্ব টের পেয়ে ইহান ঘুরলো হাসিমুখে, কানে তখনো ফোনটা চেপে ধরে রাখা। প্রেরণার অবাক চোখের দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে নিরেট ভারি স্বরে সমস্ত আবেদন ঢেলে বলে,“সেক্ষেত্রে আমি আছি....আপনি নির্দ্বিধায় নির্ভয়ে হাঁটতে থাকেন যেখানে খুশি, পথের কাঁটা সরানোর জন্য আমি আছি।”
প্রেরণা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেই ধীরে ধীরে কান থেকে নামিয়ে নিলো ফোনটা। শ্বাস ফেললো ধীরে ধীরে। দীর্ঘ থেকে সুদীর্ঘ সময় মুগ্ধ নয়নে ঘর্মাক্ত মানুষটাকে শুধু দেখেই চলেছে। তারপর যখন ইহান নিজের কান থেকে ফোনটা নামালো,প্রেরণা নড়েচড়ে উঠে বললো,
“আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন?”
ইহান তিন কদম এগিয়ে প্রেরণার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,“না এই খানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি!”
_এসে ডাকলেন না কেন?
_ফোনে আপনার ভয়েসটা দারুণ লাগছিল। আমি আপনার ঘুম ঘুম ভয়েসটার ওপর একপ্রকার অবসেসড!
প্রেরণা লজ্জা পেয়ে আশেপাশে তাকায়। স্টাফরা আপাতত কেউ অফিসের ভেতরে নেই। এই সুযোগে প্রেরণা শাড়ির আঁচল দিয়ে ইহানের কপালের ঘাম মুছে দেয় পরম যত্নে। সুযোগে ইহান বৌয়ের সেবা সবটুকু নেয় মাথা ঝুঁকিয়ে, আরক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে নির্লজ্জের মতন।
“এলেন কেনো? আরো বেশ কিছুদিন বিশ্রাম নিতেন! আমি তো দেখেই যাচ্ছি রোজ একবার করে!”
ওর গলার কাছটাও মুছিয়ে দিয়ে প্রেরণা বলে,“আপনার চাপ বেড়ে গিয়েছে। তাছাড়া আমি অলস হয়ে গিয়েছি। আমি মোটা হয়ে যাচ্ছি।”
এই পর্যায়ে প্রেরণা নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালো সে সত্যিই মোটা হয়েছে। ইহান নিশ্চুপ হেসে ওকে ঘুরিয়ে ডানহাতে কোমরটা পেঁচিয়ে ধরে।
কপাল কুঁ'চ'কে ফেলে প্রেরণা,“এটা কি?”
_মাপ নিচ্ছি কতটুকু মোটা হয়েছেন।
_এটা অফিস ইহান।
_তবে বাড়িতে চলুন। ভালো করে মাপ নিয়ে আপনাকে জানাবো।
গম্ভীর স্বরে এমনতর কথা শুনতে ভীষণ অদ্ভুত লাগে। প্রেরণার কান দু'টো গরম হয়ে উঠলো লাজে। ঘুরে সে টেবিলের ওপর থেকে নতুন অর্ডার করা ওয়ালমেট গুলো তুলে নিতে নিতে বলে,“এগুলো সাজিয়ে রেখে বেরুবো। আচ্ছা আপনি সিকিউরিটি ছাড়া এসেছেন নাকি? খবরদার চলবেন না এভাবে খোলামেলা।”
দেয়ালে সেঁটে দিতে চাইলো ওয়ালমেট গুলো, তবে পেরেক গুলো কিছুটা উঁচু হওয়াতে বেগ পেতে হয় প্রেরণার। ইহান এসে ওকে উঁচু করে তুলে ধরে। অকস্মাৎ এই কান্ডে প্রেরণা চমকালেও ধীরে ধীরে সইয়ে নেয় নিজেকে। মুখ ঘুরিয়ে দেখে ইহানকে। যার গম্ভীর মুখটাতেও লেপ্টে আছে অমায়িক হাসি, ভারি স্বর খাঁটো করে ধীরে ধীরে বলে,“নিন এবার করুন। আমি আছি।”
__________
শুদ্ধ বেশ খানিকক্ষণ ধরে কপাল কুঁচকে ভাবুক ভঙ্গিতে তার সম্মুখে বিজনেস ম্যাগাজিন বইটা হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগে পড়তে থাকা ইলহাম মির্জার দিকে তাকিয়ে আছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ইলহাম মির্জাকে সে কিঞ্চিত ভয় পায়, সে বাকি দুই দাদুর মতো তার মেজো দাদুর সাথে মিশতে পারেনা। তার কারণ ইলহাম মির্জা নিজেই বাচ্চাদের নিয়ে হৈ হৈ করার মানুষ নয়।
এই যে এখন ইলহাম মির্জার ঠিক পায়ের কাছে শুদ্ধর বলটা এসে পরে আছে। শুদ্ধ চাইতেও কেমন দ্বিধাবোধ করে। তাই চুপ করে আছে।
রিতু বিষয়টি খেয়াল করেছে তখন থেকে। স্বামীকে নিচু স্বরে বলে,“শুদ্ধর বলটা এগিয়ে দিন।”
ইলহাম ম্যাগাজিন থেকে মনযোগ সরিয়ে রিতুর কথাটা শোনামাত্র তাই করলো। পর পর রিতু গিয়ে বসলো ইলহাম মির্জার পাশে, স্বর খাঁটো রেখেই বললো,“কখনো তো কাছে ডেকে আদর টাদর করে দিতে পারেন।”
ইলহাম সরাসরি, অবাক চোখে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“আদর টাদর করিনা মানে এই নয় যে আমি বাচ্চাটাকে অপছন্দ করি। তুমি জানো আমি বাচ্চাদের সাথে ওসব করতে পারি না!”
রিতু বলে,“জানি। কিন্তু আপনার বড় ছেলের বৌ তো জানে না। এটা জরুরি নয় যে আমরা এসব করবো। হ্যা আমরা এসব করতে বাধ্য নই। তবে মেয়েটার ভালো লাগতো এই যা। প্রথম জীবনে শশুর শাশুড়ি পায়নি, শুদ্ধর দীদা দাদু তো ছিলেন না।
আচ্ছা আপনার ন্যাকামি মনে হলে করবেন না। জোর নেই।”
ইহান আর প্রেরণা সবেমাত্র বাড়িতে ফিরেছে। দোতলায় উঠেই রিতুর কথাগুলো শুনে ওরা দাঁড়িয়ে পরলো সিঁড়ির কাছটাতেই ।
ইলহাম স্ত্রীর মুখটা থেকে এইবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে খেলতে থাকা শুদ্ধকে দেখে। বেশ খানিকক্ষণ নিষ্পলক দেখে ডেকে ওঠে,“শুদ্ধ!”
_জি মেজো দাদু।
শুদ্ধও সবিনয়ে সাড়া দেয়। ইলহাম অমায়িক হেসে বলে,“মেজো দাদু না। আমাকে শুধু দাদু ডেকো।”
শুদ্ধ হা করে তাকিয়ে আছে। ইলহাম এবার রিতুর দিকে ফিরে বলে,“এর বেশি আহ্লাদ আমি পারিনা রিতু। আমার ভাগের টা তোমরা করো।”
ইহান প্রেরণা সিঁড়ির মাথা থেকে পা রাখে ভেতরে। ওদের দেখে চুপ হয়ে যায় রিতু ইলহাম। কেউ কিছু শুনতে পায়নি,দেখেইনি এমন ভঙ্গিতে প্রেরণা চলে যায় নিজের ঘরে। ইহান এসে কোলে তুলে নেয় শুদ্ধকে। জানতে চায় তার দাঁতের ব্যথাটা আবার হচ্ছে কিনা।
রিতু উঠে যায় প্রেরণার কাছে। প্রেরণার মুখ চোখ তখনো স্বাভাবিক। তবে মুখমণ্ডলে অমন ক্লান্তির ছটা দেখে রিতু মেয়েটার গালে হাত দিয়ে বলে,“বলো কোনো খবর নেই, অথচ চেহারার এই হাল। পরীকে ডাকবো? ওর কাছে কিট আছে, এনে দেই? পরীক্ষা করবে?”
হঠাৎ কি হলো, ক্লান্ত অবশ্রান্ত প্রেরণা জরিয়ে ধরলো রিতুকে। ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠলো রিতু। নিজেকে সামলে নিতে বড্ড বেগ পেতে হলো। কিন্তু অতি দ্রুতই প্রেরণার মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বলল,“কি হয়েছে?”
কাঁদছে প্রেরণা, তার শরীরটা অনবরত কাঁপছে। শক্ত করলো হাতের বাঁধন, মনে হলো যেন মন ভরে ঘ্রাণ নিলো রিতুর গা থেকে। তারপর সময় নিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে বললো,“আমি আমার প্রথম সংসারে শশুর শাশুড়ি পাইনি এটা সত্যি মা। তবে আমি আমার গোটা জীবনটাতে মাকেও খুব বেশি পাইনি।”
চলমান.......
[ অসুস্থ কিছুটা আমি। দুঃখিত দেরীর কারণে ]
প্রিয় পাঠকেরা,এখন আর কোনো টুইস্ট নেই গল্পে। শেষের পর্বগুলো এমন শান্তি শান্তিই হবে। তারপর এক পর্যায়ে “সমাপ্তি।”
রেলগাড়ির মতো লম্বা এই বেহুদা গল্পটার চেইন আমি টেনে দিয়েছি,এখন শুধু ধীর গতিতে থামার অপেক্ষায়। 🖤