#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩৬
#ইসরাত_ইতি
কনস্টেবল বেল টিপতেই ভেতর থেকে এক বুয়া ইন্টারকমে জানতে চাইলো,“কে?”
_স্যার এসেছেন।
বুয়া দরজা খুলতেই কনস্টেবল মুঈনকে সালাম দিয়ে চলে যায়, মুঈন ক্লান্ত ভঙ্গিতে তার কটেজে ঢোকে, হাত দুটো স্যানিটাইজ করে ক্লান্ত শরীরটা নিয়েই গিয়ে দাঁড়ায় মেয়েদের সম্মুখে, চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ঠিক সে মুহূর্তেই যেন মুঈনের সব ক্লান্তি গায়েব। সে জীবন দেখছে চোখের সামনে। তার ফুটফুটে জীবন দু'টো সেইফলি,কতটা আড়ম্বরে শুয়ে আছে। হাত পা নেড়ে যেন সাইকেল সাইকেল খেলছে তার জীবন দু'টো।
মুঈনের মুখ চোখের গম্ভীরতা সরে গিয়ে সেখানে এসে ভিড় করে বাবা সুলভ সরলতা। মুখ দিয়ে কতশত ভঙ্গিমা করে মেয়েদের সাথে কথোপকথন আগায়।
ইচ্ছে-খুশির বয়স এই সাড়ে তিনমাস। দেখতে যেমন গোলুমলু,ঠিক তেমন ভাবে বাড়ছে। এখনি তারা মাম্মা পাপার মুখের অভিব্যক্তি বুঝে সে অনুযায়ী সাড়া দিতে শিখেছে।
ঘরের মধ্যে ইশি নেই। খুব সম্ভবত ওয়াশরুমে, জলধারার ছপছপ শব্দ আসছে।
ইচ্ছে খুশির মাথার কাছে মিঠি বসে আছে। মুঈন চোখে মুখে রাজ্যের মুগ্ধতা নিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে, হেঁসে হেঁসে, ফিসফিসিয়ে মেয়েদের বলে,“কি ব্যাপার? মাম্মা এভাবে একা রেখে গিয়েছে? ভয় করছে আমার মা'দের? দাঁড়াও বকুনি দেবো মাম্মাকে!”
হাত নেড়ে হাসছে ইচ্ছে-খুশি। ঠিক তখনই ইশি ওয়াশ রুম থেকে বেড়োয়। মুঈন কিঞ্চিত বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,“এভাবে একা রেখে কেন যাও ওদের?”
ভেজা চুল তোয়ালে পেঁচিয়ে ইশি ত্যক্ত স্বরে বলে,“ওমা! বলে কি! আমি ওদের নিয়ে ঢুকবো গোসল করতে?”
_আয়া কোথায়? বসিয়ে রাখবে না পাশে?
_এতক্ষণ তো বসেই ছিল। ওরা ঘুমিয়েছিল তাই নামাজে দাঁড়িয়েছে।
মুঈন দুই হাতে দুটো মেয়েকে তুলে আগলে নিয়ে বলে,“এভাবে একা রাখবে না। তুমি একটু পরে গোসলে ঢুকলে খুব ক্ষতি হয়ে যেত না! ”
_একা কোথায়? ঐ যে মিঠি বসে! তাছাড়া ওরা ঘুমাচ্ছিল, দরজার সিটকিনি খোলা রেখে আমি গোসল সেরেছি ।
স্বামীর কাছে কৈফিয়ত দিয়ে বিছানায় বসে হাপাচ্ছে ইশি। মুঈন এবার হেসে ইচ্ছে খুশিকে চুমু খেয়ে শুইয়ে রেখে মিঠিকে কোলে তুলে নেয়,ওকেও একটা চুমু খেয়ে বলে,“তুমি কি রাগ করেছো আজকাল? আমার কাছে আসো না কেন? সব আদর আমি ইচ্ছে খুশিকে দিই তাই?”
ইশি এগিয়ে গিয়ে মুঈনের হাত থেকে মিঠিকে নামিয়ে রাখে। ইউনিফর্মের বোতাম খুলতে থাকে ওর। মুঈন এতক্ষণে তার সবটুকু মনযোগ ইশির দিকে দেয়। না ঘুমিয়ে চোখ মুখের বেহাল দশা করেছে। গালে দু'টো ব্রণ। মুঈন হঠাৎ দেখতেই ওটা ছুঁয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,“পিম্পল?”
_হুম। ওই যে ওরা ঘুমাতে দেয়না তাই।
হাই তুলে মুঈন বলে,
_রাত তো আমিও জাগি। আমার এসব হচ্ছে না কেন?
ইশি হেসে ফেলে,“এসব কেমন কথা? এমন ভাবে বলছো যেন তোমার আফসোস হচ্ছে পিম্পল নেই তাই!”
কথাটা শেষ করতে পারলো না ইশি, মুঈন একহাতে ইশিকে পেঁচিয়ে ধরে থুতনি ঠেকায় ওর কাঁধে। রুমের এক কোণে একটা বিশাল সাইজের আয়না রাখা। ওরা ঠিক সম্মুখেই দাঁড়িয়ে আছে। ইশির পা থেকে মাথা মুঈনের ঘোর লাগা দৃষ্টি বুলিয়ে, অবনত স্বরে বলে,“ঠিক। আফসোস হয়। এই মুটিয়ে যাওয়া, এই মুখটা ফ্যাকাশে হওয়া, এই হেয়ারফল প্রবলেম না হবার আফসোস হয়। তবে বাবা হওয়ার জন্য ভীষণ আনন্দ হয়। আর সেজন্য, থ্যাংকস ইশি!”
ইশির কানের লতিতে একটা গাঢ় চুমু এঁকে মুঈন তার ধন্যবাদ টা সম্পূর্ণ করে।
এর মাঝে ইচ্ছে খুশি কেঁদে উঠলে দু'জনে ব্যস্ত হয়ে পরে দু'জনকে কোলে তুলে সামলে নিতে। বাইরে কলিং বেলটাও তখন বাজছিল। ওরা ভাবলো হয়তো ও বাড়ি থেকে কেউ এলো। তবে না, মেইন দরজার ফাঁক গলিয়ে উঁকি দিতেই ওপাশ থেকে কনস্টেবল বললো,“স্যার কার্পেন্টার এসেছে।”
দরজার বাইরে দু'জন মধ্যবয়সী কার্পেন্টার দাঁড়িয়ে আছে। ইশি কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে মুঈন তাদের দেখে কিছু একটা মনে করার ভঙ্গিতে বলে ওঠে,“ওহহ হো! আমার আসলে মনেই নেই, কিন্তু আজ আমরা ব্যস্ত। আপনারা নেক্সট সানডে চলে আসবেন! যেসব জিনিস প্রয়োজন, কেয়ারটেকারকে বলে রাখবেন সে অর্ডার করে নেবে।”
লোক দু'টো মাথা নেড়ে চলে যেতেই ইশি প্রশ্ন করে। মুঈন খুশিকে কোলে দোলাতে দোলাতে জবাব দিলো,“দক্ষিণের ঘরটা বেশ আলো বাতাসের। ওটা হবে তোমার ওয়ার্কিং প্লেস! ইচ্ছে খুশির জন্য স্পেস টা সুন্দর করে ডেকোরেট করে দেবে। থিমটা আমি পছন্দ করে রেখেছি।”
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইশি বলে,“ওয়ার্কিং প্লেস?”
মুঈন এবার হেসে জানায়,“এটা বাবা আর আমার তরফ থেকে তোমার জন্য গিফট। দেখো তোমায় ফোটোগ্রাফি করতে সাথ দিতে বনে বাদারে ঘুরে বেড়াতে তো পারি না। আমি সর্বোচ্চ তোমায় একটা এমন ঘর বানিয়ে দিতে পারি। চাকরি ছাড়ার প্রয়োজন নেই। ছয়মাস গেলে ফুলদমে কাজ শুরু করবে। নিজেকে বেস্ট মা প্রমাণ করার জন্য নিজের ক্যারিয়ার স্থগিত করার প্রয়োজন নেই। তুমি ওদের মা, তুমি একসাথে দুটোই সামলাতে পারবে আমি জানি। এবং একটা কথা, একজন ওয়ার্কিং ওম্যান কখনোই একা একা বেস্ট মা হতে পারে না, একজন পুরুষের সাহায্য ব্যতীত।
সম্ভবত আমি অতটুকু কনসিডার করতে পারবো। এবং আমি অবশ্যই নিজের প্রফেশন সামলে বাড়িতে এসে হাতে টিভির রিমোট নিয়ে বসে যাওয়া পুরুষটি নই।
রোজ সকালে তোমার সাথে রান্নাঘরে ঢুকতেও আমার পৌরুষ খাটো হবে না। ইচ্ছে খুশি আমাদের দু'জনের, আমরা দু'জন খুব চমৎকার ভাবে প্যারেন্টিং শেয়ার করে নেবো আই থিংক! এজন্য ওদের লেখাপড়া জানা এতো স্মার্ট একজন মায়ের চাকরি বাকরি ছেড়ে মনমরা হয়ে ঘরে বসে থাকতে হবে না নিজের ক্যারিয়ারের এমন হাই টাইমে!”
শান্ত ভঙ্গিতে মুঈন কথাগুলো বলে চুপ হয়ে যায়। ইনশিরাহ তাকিয়ে থাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘসময়। পর পর লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলে,“একটা কথা বলবো এসপি?”
_হুম!
_তুমি অমন পুরুষটি নও। আর আমিও আর অমন নারীটি রইনি যার স্বামীর উপার্জন খেতে, তার কাছে নির্দ্বিধায় হাত পাততে অস্বস্তি হয়। চাকরিটা আমি নিজের যোগ্যতা ধরে রাখতে করেছি। নয়তো আমি বছরের পর বছর তোমার উপার্জন খেতে পারবো। আমি সংসার করতে পারবো শুধুমাত্র তোমার হাউসওয়াইফের পরিচয় নিয়ে। মাস শেষে তোমার স্যালারির দিকে চেয়ে থাকতেও আমার লজ্জা হবে না। আমি চাকরিটা করলে শুধুমাত্র নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য করে যাবো। আমাদের সংসার কিংবা আমার মেয়েদের জীবনে তোমার কন্ট্রিবিউশনকে টেক্কা দিতে নয়!”
হাসছে মুঈন নিশ্চুপ। সে এক চমৎকার দৃশ্য। ইচ্ছে কেঁদে উঠলে দু'জনের ঘোর কাটে।
মুঈন নাক কুঁচকে এইবার বলে,“কিছু অস্বাভাবিক ঠেকছে না?”
হাসতে হাসতে মাথা ঝাঁকায় ইশি! বলে,“ইচ্ছে পটি করেছে!”
চোখজোড়া বড় বড় করে ফেলে মুঈন। বিব্রত ভঙ্গিতে মেয়েকে কোল থেকে বিছানায় নামিয়ে রাখে আলতো হাতে। আসলে নতুন বাবা তো, সবটা সামলাতে পারলেও এসবে ঠিক অভ্যস্ত নয় এখনো মুঈন।
মুঈনের কান্ড দেখে ইশি এবার বেশ শব্দ করে হাসতে হাসতে বলে,“কি? প্যারেন্টিং নাকি শেয়ার করবে? সব হাওয়া বেড়িয়ে গেলো?”
শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকে মুঈন। ইশি হাসতে হাসতেই খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ইচ্ছেকে পরিষ্কার করে দেয়। মুঈন খেয়াল করলো বিন্দু পরিমাণ বিরক্তি ভাব নেই ইশির চোখে মুখে। অথচ এই মেয়েটা ভীষণ খুঁতখুঁতে ছিল একটা সময়।
পর পর আরেক কান্ড হলো, খুশিও পটি করেছে। ইশি ওকেও পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়। তার মুখের ভাবখানা এমন যে খুবই আনন্দিত হচ্ছে কাজটি করে। কাজটা করার সময় আবার মেয়েদের সাথে রাজ্যের কথাও বলছে।
মুঈন সম্মুখেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের দেখে, তার জীবন দেখে,তার পরিবার দেখে। যেমন পরিবার মুঈনের কখনো ছিলো না।
হাত ধুয়ে এসে ইশি বিছানায় বসতেই মুঈন চুপচাপ গিয়ে বসলো ইশির পাশে, ওকে বুকে টেনে বললো,“এভাবে খুব পরিশ্রম যায় তাইনা?”
শক্ত,চওড়া বুকে নাক ঘষে ইশি নাভিশ্বাস ছেড়ে এইবার স্বীকার করে,“রাতটা খুবই কষ্টে যায়। ওরা দু'জন একদম আপনার বিপরীত। আপনি আমাকে যেটুকু শান্তি দিয়েছেন, ওরা হয়তো দেবে না।”
মুঈন অবাক হবার ভঙ্গিতে বলে,“শান্তি দিয়েছি? কই? আমিও তো এভাবে কত রাত জাগিয়েছি। জাগাতে চাইলে কত অভিযোগ শুনেছি!”
ক্লান্তিময় হাসি হেসে ফেলে ইশি,বলে,“যাই হোক, তোমাকে সারারাত কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি তো করতে হয়নি আমার!
আপনার মেয়েরা তো এক সেকেন্ডের জন্য চোখের পাতা মুদবে না রাতে!
সেই রাত গুলো খুব মিস করি ফরাজী। এমন রাত আবার কবে? বলো কবে কবে? কবে? ”
নরম চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মুঈন তাকায় মেয়েদের দিকে। দু'জনে খেয়েদেয়ে একেবারে যেন দুপুরে ভাতঘুম দিয়েছে। সাদা রঙের বিছানাতে ফুটে আছে মুঈন ইশির দু'টো গোলাপ।
ওদের দিকে দৃষ্টি রেখেই ইশির কোমর চেপে ধরে মুঈন। হাত বাড়িয়ে লাগিয়ে দেয় দরজা। হাত বাড়িয়েই টেনে দেয় বিছানার সাদা পর্দা।
এবার শক্ত হাতে ইশিকে টানতে টানতে কক্ষের এককোণে পরে থাকা কাউচের দিকটাতে এগোতে এগোতে ভারি স্বরে বলে,“এমন রাত খুব সম্ভবত ওদের ছয়মাস পূর্ণ হবার আগে পাবে না। তো কেমন হয় যদি দিনগুলোকে কাজে লাগানো যায়?”
লজ্জায় মরিমরি ইশি মিছিমিছি আপত্তি দেখিয়ে কদমে কদমে পিছিয়ে যায়। মুঈন ফিসফিসায়,“পাশের ঘরে?”
এমন নির্লজ্জ কথায় ইশি কান চেপে ধরে খানিক সময়, পর পর ইন্টারকমে কল করে নিজেই আয়াকে বলে,“মিস রিটা, ইচ্ছে খুশির ঘরে আসুন আপনি। বাকিদের বলুন রেস্ট নিতে রুমে গিয়ে। আপনাদের স্যার দক্ষিণ পাশের ঘরটাতে রেস্ট নিতে যাচ্ছে। ঐ কর্ণারে আপাতত কোনো কাজ করতে হবে না!”
________
আজ শেহা উজ্জ্বল দু'জনেই বাড়িতে ছিল। শেহার ক্লাস ছিলো না এবং উজ্জ্বলের হাতে কোনো কেস ছিলো না।
বিকাল তখন চারটা। নিজাম মাহমুদের ওষুধটা খাইয়ে দিয়ে শেহা ঘরময় উজ্জ্বলকে খুঁজলো। লাঞ্চ শেষ করে মানুষটা যেন লাপাত্তা, শেহাকে বলে অবধি গেলো না।
অবশ্য এসব ছোটো খাটো বিষয় নিয়ে শেহা কখনোই উজ্জ্বলের সাথে খুঁতখুঁতে আচরণ করে না। ওরা সবসময় সম্পর্কে দু'জন দু'জনকে স্পেস দেওয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী।
উজ্জ্বল ছিলো তার স্টাডি রুমে। একটা বিঘত সাইজের ল এর বই মুখের সম্মুখে ধরে বসে আছে। শক্ত গম্ভীর চোয়াল, মুখভঙ্গি। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা।
দরজায় দাঁড়িয়েই শেহা চুপচাপ দেখতে থাকে। বড্ড বেশি সুদর্শন তার স্বামী। তবে ততটাই নিরামিষ। অথচ নিজাম দাদুর কাছে রোজ সন্ধ্যা বেলা বসে মুড়ি মাখা খেতে খেতে এর অতীত জীবনের কীর্তি শুনেছে শেহা। লোকটা নাকি বড্ড বেপরোয়া ও প্রেমিক পুরুষ ছিলো। কিন্তু এখন, সম্পুর্ণ বিপরীত। নিজেকে সভ্য শান্ত পুরুষের খোলসে পেঁচিয়ে অর্ধাঙ্গিনীর কাছে উপস্থাপন করে।
শেহার মাঝে মাঝে খুব বলতে ইচ্ছে করে,“আপনি একটু উশৃঙ্খল হতে পারেন, আমি কিছু মনে করবো না। বৌ আমি আপনার, কলিগ নই।”
উজ্জ্বলকে স্পেস দিতে শেহা দরজাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও উজ্জ্বলের চোখে পরে যায় শেহাকে। হাতের বইটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায় তৎক্ষণাৎ, অবাক চোখে তাকিয়ে শেহাকে বলে,“ওভাবে কাঠবিড়ালীর মতো উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এটা তোমার হেড স্যারের কেবিন নয়। এসো!”
শেহা হেসে ভেতরে ঢোকে, আমতা আমতা করে,“আসলে আপনি স্টাডি করছিলেন।”
_যেটা তোমার থেকে জরুরি নয়।
বলেই শক্ত হাতে শেহাকে টেনে কোলে বসিয়ে নিলো উজ্জ্বল। ওর কপালের চুলগুলো কানে গুজে দিয়ে বলে,“কিছু বলতে এসেছিলে?”
_হ্যা ঐ আজ বেরুবেন বলেছিলেন। ওদের কল করেছেন?
_জি। তবে ইরফান-প্রণমি যাবে শুধু।
_আর বাকিরা?
_বাকিরা? মুঈন ভাই তার বৌ বাচ্চা নিয়ে শান্তিনীড়ে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ আগে। তারপর কি করেছে জানো? ইচ্ছে খুশিকে কোনমতে তার নানুদের হাত তুলে দিয়ে ইশিকে নিয়ে সে ঘুমিয়ে পরেছে। তারা নাকি বিগত দুই মাস ধরে ঠিকঠাক ভাবে ঘুমাতে পারেনি ইচ্ছে খুশির তাড়নায়। আর প্রেরণা ভাবী এখন ইচ্ছে খুশিকে সামলাচ্ছে, প্রেরণা ভাবী যাবেনা তাই ইহানের যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ইনু আর প্রিতম যাবেনা কারণ ইনুর কোচিং আছে। প্রিতম সেজন্য স্যরি বলেছে ফোনে।
শেহা সামান্য হাসলো, পরপর মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
“ঠিক আছে, আমি যাই, আপনি পড়ুন।”
জবাবে একটা আন্তরিক হাসি ফিরিয়ে দিলো উজ্জ্বল, ওকে আটকালো না। তার আসলেই এখন কেসের বাকিটুকু স্টাডি করে রাখতে হবে। অথচ শেহা আশা করেছিলো লোকটা একটু রোমান্স করবে। এই নিভৃতে তেমনটা হলে মন্দ হতো না। কিন্তু বরের ব্যস্ততা দেখে নিজের মাথায় নিজেই চাটি মেরে ঘর থেকে বেরোয় ও। নিজেই বিড়বিড় করে নিজেকে হ্যাংলা সম্বোধনে টিটকারি মারে।
হাতে আপাতত কোনো কাজ ছিলো না। হাঁটতে হাঁটতে শেহা নিচতলায় নামে। আজ বাড়িতে সার্ভেন্ট নেই, সিঙ্কে জমে আছে কিছু এঁটো বাসন। আপাতত পড়াও নেই। শেহা কি করবে বুঝতে না পেরে ওসব ধুতে শুরু করে। পর পর নিজের সাথে নিজেই মজা করে,“স্পেস দেওয়ার নাম করে নিজেই লোকটাকে ছাড় দিয়েছিস বিয়ের পর থেকে। এখন তুই থালাবাটিই মাজ অসভ্য মেয়ে।”
“শ্রাবন্তি”
তার পুরুষটির ঘন স্বর শুনেই চমকে উঠে ঘুরে তাকায় শেহা। রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে উজ্জ্বল। তার হাতে নিজের ফোন। শেহার জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টির বিপরীতে বলে,“বাবা ফোন করেছে। নাও কথা বলো।”
_আমার হাত আটকা তো। পরে কথা বলে নেবো। আপনি রেখে দিন।
_ওসব সার্ভেন্ট এসে করবে। তুমি এসো।
_না আমার নোংরা লাগছে। এখুনি করবো।
উজ্জ্বল সাথে সাথে এগিয়ে এসে ফোনটা শেহার কানে চেপে ধরে বলে,“জরুরি কিছু হতে পারে, বাবা আমাকে কল করে কখনো তোমাকে চায়না। আমার সাথেই কথা বলে। আজ যেহেতু চেয়েছে তার মানে জরুরি ব্যাপার।”
শান্ত মেয়েকে কল করেছিলো তার ব্যাংক একাউন্টের বিষয়ে জরুরী কিছু কথা জানাতেই। বাপ বেটিতে আলোচনা করেছে প্রায় আধাঘণ্টা। উজ্জ্বল ফোনটা শেহার কানে চেপে ধরে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। ভাবটা এমন,সে বাবা মেয়ের কথা আড়ি পেতে শোনার মতন অভদ্র লোক নয়। শেহা বাবার কথা শুনছিলো ঠিকই কিন্তু তার মনযোগ ছিলো স্বামীর দিকে, মুখে মিটিমিটি হাসি। এর মাঝে হাত ধুয়ে ফেললেও আর ফোনটা নিজে থেকে ধরলো না সে।
কথা শেষ করে কল কাটার পরও শেহা নিশ্চুপ হাসে, উজ্জ্বল বলে,“হাসছো কেন? তোমার মনে হয়েছে আমি তোমার আর বাবার কথা শুনেছি?”
দু'পাশে নেড়ে শেহা বলে,“না এমনিই হেসেছি। আপনি যান।”
উজ্জ্বলের যাওয়ার পথে একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসে শেহা। যখনই সম্পুর্ন আড়াল হলো লোকটা, শেহা হাতের ফোমে ডিশ ওয়াশার লাগিয়ে নিতে নিতে লম্বা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলে,“এতো ব্যস্ততার মাঝে নির্বিকার ভঙ্গিতে স্ত্রীর কানে ফোন চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আপনিটা আসলেই মারাত্মক রোমান্টিক। অথচ এই চার চোখা আমিটার চোখে তা পড়েই না। সময়ে অসময়ে চেপে ধরে দু'টো চুমু দিলেই কি প্রেম হয়, রোমান্স হয়? এই এটাকি প্রেম ছিলো না? এই যে আমার তরুনী বুকটা বড্ড ঠান্ডা হলো, অথচ আপনি আমার ঠোঁট ছুলেনও না ঠোঁটে। তবুও হলো।
মানুষ লাইফ পার্টনার নিয়ে কনফিউজড হয়। আর আমি হই নিজের চাহিদা নিয়ে। এখন বুঝলাম আমার চাহিদা ওটাই,যেটা আমি আপনার থেকে পাই উকিল সাহেব। আমার ভীষণ রোমান্টিক উকিল সাহেব।”
হাত ধুয়ে দোতলায় উঠলো শেহা। ততক্ষণে উজ্জ্বল কেস স্টাডি সম্পূর্ণ করে ও ঘরটা লক করে রুমে ঢুকে তৈরি হয়ে নিচ্ছিল। বরাবরের মতো শেহা সবকিছু এগিয়ে দেয়। সাথে নিজেও তৈরি হয়। একটা শাড়ি পরেছে । রং হলো উজ্জ্বলের পছন্দের রং, সবুজ । শাড়ি পরেও ওটাকে খুলতে হয়েছে শেহার। সবুজের মধ্যে একটা মোলায়েম দেখে শাড়ি পরেছে এইবার। সবটাই উজ্জ্বলের আদেশে। দাম্পত্যে দুজনের ব্যস্ততার দরুন রোমান্সের ঘাটতি শেহা কখনো-সখনো খুজে পেলেও, যত্নের কোনো ঘাটতি নেই যেন। সব যেন উপচে পরে। আর শেহা, ইশিতার সেই নরম মনের দুঃখী মেয়েটি তার জীবনে আসা এই অচেনা পুরুষটির সেই যত্ন দু'হাতে লুফে নিয়ে গায়ে মাখে। স্বানন্দে,বড্ড আন্তরিকতা নিয়ে,বড্ড বিনয়ে।
___________
মেজাজ খারাপ করে টেবিলের সামনে এক গাদা বইয়ের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ইনু। তার মেজাজ খারাপ কারণ তাকে কোচিং যেতে হবে অথচ আজ উজ্জ্বল ভাইয়ার তরফ থেকে একটা ট্রিট পেতে পারতো সে। কতদিন হলো হ্যাংআউট করেনি ওরা। প্রায় মাসখানেক তো হলোই। এদিকে তার বর, না নিজে নিয়ে যাবে না একা যেতে দেবে কোথাও।
ইনায়ার জীবনটা যেনো এক একটা থিসিসে আটকে পরে আকুলি বিকুলি করছে। বিয়ের আগের জীবন আর পরের জীবনে আদতে কোনো পরিবর্তন আসেনি তার। সেই একরকম,একঘেয়ে। শুধু বিছানায় কোলবালিশের বদলে একটা হ্যান্ডসাম দেখতে মানুষ পাশে ঘুমায় এই যা তফাৎ। নয়তো সকালে ওঠো, দাঁত মাজো, থিসিস পেপার রেডি করো, ঘুমানোর আগে দাঁত মাজো, থিসিস পেপার রেডি করো। জীবনটা একই প্যাটার্নে পাক খাচ্ছে ঘুর্ণির মত।
আর তার বরের তো দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। চাকরি পাওয়ার পরে দেখিয়ে দিচ্ছে আসল রূপ। অথচ এই নরম আচরণের ছেলেটার পিছনে ইনু ঘুরঘুর করে পটিয়েছে একে। ভাবা যায়?
এখন পদে পদে তার কত মেজাজ! এই মেজাজ কেন এতো? আপু যাওয়ার পরে পুরোদস্তুর সংসারী পুরুষ হয়েছে বলে নাকি মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ইনকাম করে বলে? মাঝেসাঝে হতাশ হয়ে ভাবে ইনু।
প্রিতম অফিশিয়াল একটা কল রিসিভ করে ফোনটা রেখে ইনুর দিকে তাকায়। ওর মন খারাপকে বিশেষ পাত্তা প্রিতম দেয়না। কাল থেকে তিন দিন এমনিতেই ফার্ম হাউসে উড়ো উড়ি করে বেরুবে, আজ কোচিং বাদ দিয়ে ঘুরতে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। সন্ধ্যার পরে ও বাড়িতে গেলে পড়াশোনা এমনিতেই শিকেয় উঠলো বলে।
দু'জনের চোখাচোখি হতেই ইনু মুখটা আরেকটু শক্ত করে ফেলে। প্রিতম মুখ বিকৃত করে গায়ের টি-শার্ট টা খুলে ওয়াশরুমের পথে পা বাড়ায়, গোসলটা এখন করে নেবে সে।
ইনু আরো কিছুটা আহত হয় প্রিতমের ব্যবহারে। নাহ! আসলেই খুব বাড় বেড়েছে এই প্রিতমটা। ইনু যত বুঝদার হয়েছে, ইনুর ত্যাড়ামি আর ন্যাকামি কমিয়েছে। তত এই ছেলে ইনুকে পেয়ে বসেছে।
“কেন রোদের মতো হাসছো না, কেন আমায় কদর করছো না,
কেন বিয়ের পরে আর আমার প্রেমিক হয়ে থাকছো না।
এতো স্বামী স্বামী হয়ে থাকা ভিত্তিহীন,
আমার চুপ করে থাকা বড় কঠিন,
এমন চলতে থাকলে খুব খারাপ হয়ে যাবে ঠিক একদিন।
লালালালা লালালালা।”
বেজার মুখে বইগুলো ব্যাগে গুছিয়ে নিতে নিতে ইনু গান গায় গুনগুনিয়ে। হঠাৎ পা থামে প্রিতমের। মেয়েটার আজগুবি গানটা শোনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তারপর একটা মৃদু শ্বাস ফেলে ওয়াশ রুমে ঢোকে।
ইনুর মুখটা ক্রমশ অন্ধকার হয়। মাঝে মাঝে মনের গোপন কোথাও,একটা সন্দেহ উঁকিঝুঁকি মারে ওর। প্রিতমের কাছে ও পুরনো আর টেকেন ফর গ্রান্টেড হয়ে গিয়েছে কি? বিশেষ করে মিসক্যারিজের পরে? নাকি প্রিতম অফিসে গিয়ে আশেপাশে এতো হাইলি কোয়ালিফাইড,ব্রেইনি মেয়েদের দেখে ইনুর প্রতি অবচেতন মনে বিতৃষ্ণ হচ্ছে। প্রিতম বৌকে ঐ সব মেয়েদের মতো বানিয়ে নিতে উঠেপড়ে লেগেছে এই কারণে তবে?
কল বাজছে প্রিতমের। ইনুর ভাবনার ঘোর কেটে গেলে মলিন মুখে ফোনটা হাতে তুলে নিতেই দেখে প্রিতমের কলিগ শানাজের কল। এই মেয়েটিকে বড্ড অপছন্দ ইনুর। অপছন্দ কারণ মেয়েটি সবদিক থেকে পার্ফেক্ট। যেমন সুন্দর ফিগার,তেমন সুন্দর ব্যক্তিত্ব। তাই সবসময় খুব “ইনসিকিয়রড” থাকে সে প্রিতমকে নিয়ে।
ফোন বাজছে তা প্রিতম শুনতে পেয়েছে। শাওয়ার বন্ধ করে কোমরে তোয়ালেটা পেঁচিয়ে দরজা খুলে প্রিতম বলে,“কে কল করেছে?”
_শানাজ আপু!
_ওহহ, তো ফোনটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছো কেন?
ইনু বলে,“স্যরি আসলে তোমার ফোন এভাবে ধরতে চাইনি।”
ওর কন্ঠের চাপা অভিমান টের পেয়ে প্রিতম ফ্যালফ্যাল করে মিনিট খানেক ওকে দেখে বলে ওঠে,“ফোন তো ধরবেই। রিসিভ না করে দাঁড়িয়ে আছো কেন সেটা জানতে চাইছি!”
অবাক গলায় ইনু বলে,“তোমার কলিগের ফোন আমি রিসিভ করবো? কি বলবো?”
_বলবে “আমার হাসবেন্ড ব্যস্ত, আমি ওনাকে জানিয়ে দেবো আপনার কথা।” এটুকু।
ইনুও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ওর কিছু বলার দরকার পরলো না আর। কলটা ইতিমধ্যে কেটে গিয়েছে। ইনু ফোনটা হাত থেকে রেখেও তাকিয়ে আছে প্রিতমের দিকে। ভেজা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াশ রুমের দরজায় যে লোকটা, যে লোকটা তাকে ব্রেইন ওয়াশ করে বিয়ে করেছিল। যে লোকটা বদলে গিয়েছে ভেবে ইনু কষ্ট পাচ্ছিলো। আসলেই তার প্রিতম বদলেছে, ভীষণ বদলেছে। তবে এই বদলে ইনায়া শান্তি পেলো। খুব শান্তি পেলো।
“কি হলো? দাঁড়িয়ে আছো কেন? রেডি হও,তোমাকে কোচিংয়ে নামিয়ে দিয়ে আমি মিস জেনিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”
ইনুর ঘোর কাটে। পর পর বড় বড় শ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে চলে যায়।
_______
“প্রণো রেডি তুমি?”
_হু।
_স্লিপার নেবে নাকি স্নিকার্স?
_নিয়ে নেবো একটা। আপনার দেখতে হবে না আমার বিষয়। আপনি সরুন।
ইরফানকে যেন পাত্তাই দেবে না এমন ভঙ্গিতে প্রণমি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজের পায়ে জুতো পরে নেয়।
ইরফান চোরা চোখে শুধু দেখেই চলেছে প্রণমির চাপা অভিমান। তবে এই অভিমান ভাঙানোর কোনো তাড়া কাজ করছে না তার মধ্যে। এখন যাবে শেহা উজ্জ্বলের সাথে ঘুরতে। এই অভিমান ভাঙানোর উপযুক্ত সময় রাত।
গটগট করে প্রণমি ঘর থেকে বেরুতে নিলে ইরফান শান্ত গলায় বলল,“আচ্ছা তুমি যখন বলেছো তখন তোমার বিষয় দেখবো না। তুমি যে জুতো দুই পায়ে আলাদা দু'টো পরেছো এটাও দেখলাম না।”
থামে প্রণমি। মুখটা থমথমে হয়ে আছে। মেজাজ খারাপের ভঙ্গিতে গিয়ে হাতরে হাতরে ঠিক জুতোটা পরে নিতেই ওদের ঘরে ঢোকে প্রেরণা। ইচ্ছে খুশিকে সামিন আলোর কোলে দিয়েছে খানিক আগে।
“আসার সময় শেহা আর উজ্জ্বল ভাইকে নিয়ে আসবে। আমি রাতে রান্না করবো। খিচুড়ি, কালা ভুনা আর দই ইলিশ। মদিনা সুইটস থেকে দধিও আনবে। বাড়ির মুরব্বিরা বিশ্রাম নিচ্ছে,তাদের এ বেলা বাজারে পাঠাবো না। তোমার দাদান বেরুবে, সে ফিরবে রাত করে। তুমিই ভরসা ভাই!”
ইরফান মাথা নেড়ে বোঝায় ভাবী মনির কথা সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।
প্রণমি কপাল কুঁচকে ঘর থেকে বেড়োয়। বোনের শুকনো মুখটা দেখে প্রেরণা ঘুরে ইরফানকে ফিসফিসিয়ে বলে,“রেগে আছে কেন? ও তো রাগলে জিনিসপত্র ভাঙে। এমন করে রেগে থাকতে এই প্রথম দেখলাম। কতটা শান্ত!”
ইরফান হেসে ফিসফিসিয়ে ভাবীমনিকে জবাব দেয়,“রাতে এসে সব বলবো। এখন আসছি। উজ্জ্বল ভাই অপেক্ষা করছে।”
ইরফানদের বিদায় দিয়ে প্রেরণা লিভিং রুমে কিছুক্ষণ পায়চারী করে। সবাই যে যার ঘরে ব্যস্ত। শুদ্ধকে ওর মিস পড়াতে এসেছে। ইহানও ঘরে কোনো কনফারেন্স মিটিং করছে সম্ভবত।
হাই তোলে প্রেরণা, তার খুব ক্লান্ত লাগছে। ইদানিং এমন হচ্ছে। শরীরটা এতো অবসন্ন লাগে। মাথা ব্যথা আর ঘুম হয় শুধু। খুদামন্দাও দেখা দিচ্ছে দু'দিন ধরে।
সন্ধ্যায় মেহমান আসবে এ বাড়িতে। বড় বৌ হিসেবে প্রেরণা থাকবে অসম্ভব ব্যস্ত। এখন একটু ঘুমিয়ে নিলে মন্দ হয়না। ভেবেই প্রেরণা ঘরে ঢুকলো।
ইহান হাসলো ওকে দেখে। সে মিটিংয়ে ব্যস্ত। প্রেরণা একা একা কিছুক্ষণ বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে থেকে এসে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিতেই ফোনের নোটিফিকেশনের আওয়াজে আবার উঠে বসে। একটা মেসেজ এসেছে। চোখ ভর্তি ঘুম ছিলো প্রেরণার,মেসেজটা দেখেই হঠাৎ মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হলো। কপালে ভাঁজ পরলো তিন চারখানা। এবং মনমরা হয়ে ওভাবেই বসে রইল।
মিটিং শেষ করে ইহান উঠে গিয়ে ওর পাশে বসে কাছে টানে ওকে। নরম গলায় জানতে চায়,“আবার মাথাব্যথা? কি হয়েছে?”
প্রেরণা হাতের ফোন থেকে মেসেজটা ইহানকে দেখায়, শুকনো গলায় বলে,“বলেছিলাম না ওয়াসীত শরীফের চাচারা খুব একটা ভালো না? সেদিন বড় বাড়ির জমির ঝামেলা নিয়েও আলোচনা করেছিলাম আপনার সাথে। আজ দেখুন বড় বাড়ির জমিটাতে নালা কেটেছে অথচ আমার পারমিশন অবধি নেয়নি। কিছু যদি বলতে যাই এখন তবেই মুখের ওপর বলে,“তুমি কেন এতো বেশি বুঝবে আমার ভাইপোর জমির ব্যাপারে। তুমি তোমার নতুন স্বামী নিয়ে থাকো। এতো এসবে নাক গলাও কেন?”
জানেন ওনাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতেও মন চায়না। সবাই বৃদ্ধ। মায়াও লাগে।”
বলতে বলতেই মাথা ঘুরে পরে যেতে চাইলে ইহান ওকে শক্ত হাতে ধরে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,“আচ্ছা টেনশন কম করেন। আমি আছি। আমি দেখছি। ওনাদের বাড়াবাড়ি থামানোর বহু রাস্তা আমার জানা।”
প্রেরণাকে বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেই কাকে যেন কল করে ইহান। কলটা রিসিভ হতেই বলে,“জি চেয়ারম্যান আঙ্কেল। আমি ইহান তাজওয়ার বলছি। জি, ঐযে সেদিন আলাপ করেছিলাম তিলপাড়ার মরহুম ওয়াসীত শরীফের মালিকানায় থাকা বড় প্লটটা নিয়ে। হ্যা, আপনি আগামীকাল জুম্মাবাদ মসজিদে মুসল্লিদের সামনে ঘোষণা দেবেন তিলপাড়ার বড় প্লটটাতেও একটা মসজিদ নির্মাণ করা হবে। কোনো ডোনেশন তুলতে হবে না। ডোনেশন আমি দেবো। এসপি আর ডিসির পারমিশন লেটার পৌঁছে যাবে। ঐ এরিয়া ব্যারিকেড দিবেন কাল বিকেলেই। রাখছি।”
প্রেরণার মনটা বড্ড শান্ত হলো হঠাৎ, ঠোঁটে ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি। কল কেটে ফোনটা রেখে এবার ইহান দুই হাতে আগলে নিলো প্রেরণাকে। পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। গালে চুমু খেয়ে বলল,“এখনো মাথা ব্যথা করছে? এতো টেনশন কেন নিতে হবে সবদিকের? আমি আছি তো?”
প্রেরণা আচানক উঠে দাঁড়ায়। ইহান কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও ওয়াশ রুমে ছুটে গিয়ে বমি করে একদফা। ওকে গিয়ে ইহান সামলে নিয়ে অবাক গলায় বলে,“বমি কেন?”
দুর্বলতায় নেতিয়ে পরে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে প্রেরণা, হঠাৎ ঠোঁটে লাজুক হাসি এনে অস্ফুটে বলে,“কি জানি! সবদিকের টেনশনে হয়তো বমি পেয়েছে। আপনি যান পার্টি অফিসে।
চলমান.......