🖤 তোর কারণে বেঁচে আছি 🖤
একটি রোমান্টিক থ্রিলার উপন্যাস
🌸 পর্ব ৩ — বোনের মৃত্যুর আসল রহস্য 🌸
রাত ১১টা।
নওশিন নিজের বাবার সামনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। কিছুক্ষণ আগেই বাবা তাকে জানিয়েছেন, তিন বছর আগে মারা যাওয়া মেহের ছিল তার নিজের বড় বোন।
কিন্তু নওশিনের তো কোনো বড় বোন ছিল না! ছোটবেলা থেকে সে জানত, সে তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
নওশিন: বাবা, তুমি কী বলছ? আমার বড় বোন ছিল? এতদিন আমাকে কেন বলোনি?
নওশিনের বাবা মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
বাবা: মা, তোমার ভালোর জন্যই আমরা সবকিছু লুকিয়ে রেখেছিলাম।
নওশিন: আমার ভালো? আমার নিজের একটা বোন ছিল, অথচ আমি জানতামই না! এটা কেমন ভালো?
বাবা: তুমি তখন অনেক ছোট ছিলে। মেহেরের মৃত্যুর পর তোমার মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। আমরা চেয়েছিলাম তুমি স্বাভাবিকভাবে বড় হও।
নওশিন: কিন্তু জিহাদের সঙ্গে আপুর কী সম্পর্ক ছিল?
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
বাবা: মেহের আর জিহাদ একে অপরকে ভালোবাসত। তারা বিয়েও করতে চেয়েছিল। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা সবকিছু শেষ করে দেয়।
নওশিন: দুর্ঘটনা? কী হয়েছিল সেদিন?
বাবা: সেদিন রাতে মেহের জিহাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। তারপর একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় মেহের মারা যায়। জিহাদ বেঁচে ফিরে আসে।
নওশিন: তাহলে জিহাদই আপুকে মেরেছে?
বাবা: আমি জানি না মা। কিন্তু সেদিনের পর থেকে জিহাদ আর আগের মতো নেই।
নওশিন আর কিছু বলতে পারল না। দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে কাঁদতে লাগল।
তার মনে বারবার একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—যে ছেলেটাকে সে একটু একটু করে ভালোবেসে ফেলছে, সেই ছেলেই কি তার বোনের মৃত্যুর জন্য দায়ী?
🌸 পরদিন সকাল — কলেজে
সকাল ৯টা।
নওশিন আজ কলেজে আসতে চাইছিল না। কিন্তু ইমুর বারবার ফোনে শেষ পর্যন্ত আসতে হলো।
কলেজের গেটে ইমু তাকে দেখেই বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে।
ইমু: কী হয়েছে তোর? চোখ এত লাল কেন?
নওশিন: কিছু হয়নি।
ইমু: আমাকে মিথ্যা বলিস না। তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি তুই কেঁদেছিস।
নওশিন ইমুকে সব ঘটনা খুলে বলল। মেহেরের কথা, জিহাদের কথা, বাবার কথা—সব।
সব শুনে ইমু অবাক হয়ে গেল।
ইমু: কী! জিহাদ তোর বোনকে চিনত?
নওশিন: শুধু চিনত না, ওরা একে অপরকে ভালোবাসত।
ইমু: তাহলে তো ব্যাপারটা অনেক জটিল!
নওশিন: আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, ইমু। জিহাদ কি সত্যিই আমার আপুর মৃত্যুর জন্য দায়ী?
ইমু নওশিনের হাত ধরে বলল—
ইমু: দেখ, কোনো কিছু না জেনে কাউকে দোষী ভাবিস না। আগে সত্যিটা জানতে হবে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে অভির কণ্ঠ শোনা গেল।
অভি: কী হয়েছে তোমাদের? এত সিরিয়াস আলোচনা কী নিয়ে?
ইমু চোখ মুছে বলল—
ইমু: কিছু না।
অভি: কিছু না হলে দুজনের মুখ এমন কেন?
ইমু কোনো উত্তর দিল না।
অভি এবার নওশিনের দিকে তাকাল।
অভি: নওশিন, জিহাদ তোমাকে খুঁজছে। সকাল থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
নওশিনের বুকটা কেঁপে উঠল।
🖤 কলেজের বাগান — মুখোমুখি
জিহাদ বাগানের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নওশিনকে দেখেই এগিয়ে এলো।
জিহাদ: তুমি কাল রাতে আমার ফোন ধরোনি কেন?
নওশিন: আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই।
জিহাদ অবাক হয়ে গেল।
জিহাদ: কী হয়েছে তোমার?
নওশিন: একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। মেহের কে ছিল আপনার?
জিহাদ যেন মুহূর্তের মধ্যে পাথর হয়ে গেল।
জিহাদ: তুমি মেহেরের কথা কোথায় শুনেছ?
নওশিন: আমার বড় বোনের নাম জানতে আমার আর কোথাও যেতে হবে না।
জিহাদের চোখ বড় হয়ে গেল।
জিহাদ: মেহের... তোমার বড় বোন?
নওশিন: হ্যাঁ। আর আমি এটাও জানতে চাই, তার মৃত্যুর রাতে কী হয়েছিল?
জিহাদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
জিহাদ: নওশিন, আমি তোমার বোনকে অনেক ভালোবাসতাম। আজও তার কথা ভুলতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তাকে কখনো কষ্ট দিতে চাইনি।
নওশিন: তাহলে আপু মারা গেল কীভাবে?
জিহাদের চোখে পানি চলে এলো।
জিহাদ: সেদিন রাতে মেহের আমাকে ফোন করেছিল। সে বলেছিল, জরুরি একটা কথা আছে। আমি তাকে পুরোনো ব্রিজের কাছে অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। কিন্তু আমি পৌঁছানোর আগেই একটা গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়।
নওশিন: আপনি কি সেই গাড়িটা দেখেছিলেন?
জিহাদ: হ্যাঁ। গাড়িটার নম্বরের শেষের তিনটি সংখ্যা ছিল ৭২১। কিন্তু পুলিশ গাড়িটাকে খুঁজে পায়নি।
নওশিন: আপনি এতদিন আমাকে বলেননি কেন?
জিহাদ: কারণ আমি জানতাম না তুমি মেহেরের বোন। আর এখন তোমাকে হারানোর ভয় পাচ্ছি।
নওশিনের চোখ ভিজে উঠল।
নওশিন: আপনি আমাকে হারানোর ভয় পান কেন?
জিহাদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল—
জিহাদ: কারণ তোমাকে দেখার পর থেকে আমার মনে হয়, জীবন আমাকে আবার নতুন করে বাঁচার একটা সুযোগ দিয়েছে।
নওশিন চুপ করে রইল।
🌷 অন্যদিকে — অভি ও ইমু
কলেজের ক্যান্টিনে অভি ইমুর সামনে বসে আছে।
অভি: কী ব্যাপার? আজ আমাকে দেখে হাসছ না কেন?
ইমু: হাসার মতো কোনো কারণ নেই।
অভি: তাহলে একটা কারণ তৈরি করি?
ইমু: কীভাবে?
অভি: তোমাকে একটা আইসক্রিম খাওয়াব।
ইমু: এই সামান্য আইসক্রিম দিয়ে আমাকে পটাতে পারবেন না।
অভি: তাহলে দুইটা খাওয়াব।
ইমু হেসে ফেলল।
ইমু: আপনি আসলেই একটা পাগল।
অভি: হ্যাঁ, কিন্তু তোমার জন্য একটু বেশিই পাগল।
ইমু এবার আর কিছু বলল না। তার গাল দুটো লাল হয়ে গেল।
অভি মনে মনে হাসল। মেয়েটাকে সে সত্যিই পছন্দ করতে শুরু করেছে।
🌑 বিকেল — পুরোনো ডায়েরি
বাড়ি ফিরে নওশিন নিজের আলমারি গোছাচ্ছিল। হঠাৎ পুরোনো কিছু কাপড়ের নিচে একটা ছোট বাক্স দেখতে পেল।
বাক্সটা খুলতেই ভেতরে একটা ডায়েরি, কয়েকটা ছবি আর একটি চাবি পাওয়া গেল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
"আমার ছোট্ট বোন নওশিনের জন্য। একদিন যদি তুই এই ডায়েরি পড়িস, তাহলে বুঝবি আমি তোকে কতটা ভালোবাসতাম।"
নওশিনের হাত কাঁপতে লাগল।
এটা মেহেরের ডায়েরি!
সে দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।
এক জায়গায় লেখা ছিল—
"আজ জিহাদ আমাকে বলেছে, আমাদের জীবনে বড় বিপদ আসতে চলেছে। একজন মানুষ আমাদের আলাদা করতে চাইছে। আমি জানি না সে কে। কিন্তু আমার খুব ভয় হচ্ছে।"
আরেকটি পাতায় লেখা—
"যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে মনে রাখিস, জিহাদ নির্দোষ। আসল অপরাধী আমাদের খুব কাছের একজন।"
নওশিনের চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
নওশিন: আপু, তুমি কী বলতে চেয়েছিলে? কে সেই মানুষ?
ঠিক তখনই তার ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কল এলো।
নওশিন: হ্যালো?
অচেনা কণ্ঠ: ডায়েরিটা পেয়েছ?
নওশিন ভয় পেয়ে গেল।
নওশিন: আপনি কে?
অচেনা কণ্ঠ: তোমার বোনের ডায়েরি পড়া বন্ধ করো। না হলে তোমার পরিণতিও মেহেরের মতো হবে।
নওশিন: আপনি আমার আপুকে মেরেছেন?
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর লোকটি হেসে বলল—
অচেনা কণ্ঠ: খুব শিগগিরই দেখা হবে, নওশিন।
কল কেটে গেল।
🌙 রাত — নতুন বিপদ
রাত ১১টা।
জিহাদ নিজের ঘরে বসে ছিল। হঠাৎ দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল।
অভি: জিহাদ! দরজা খোল!
জিহাদ দরজা খুলতেই অভি একটা খাম তার হাতে দিল।
অভি: এটা তোর নামে এসেছে।
জিহাদ খাম খুলে দেখল, ভেতরে একটা ছবি।
ছবিতে নওশিনকে কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ছবির পেছনে লেখা—
"তোমার ভালোবাসার মানুষ এখন আমাদের নজরে। এবার ঠিক করো, অতীতকে বাঁচাবে নাকি বর্তমানকে?"
জিহাদের চোখ রাগে লাল হয়ে গেল।
জিহাদ: অভি, নওশিনের ওপর নজর রাখবি। ওর কোনো ক্ষতি যেন না হয়।
অভি: কিন্তু কারা এসব করছে?
জিহাদ: যারা মেহেরকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল।
অভি: তুই কি কাউকে সন্দেহ করছিস?
জিহাদ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল—
জিহাদ: হ্যাঁ। আমি একজনকে চিনি।
অভি: কে?
জিহাদ ধীরে ধীরে একটা নাম বলল।
নামটা শুনে অভি অবাক হয়ে গেল।
অভি: অসম্ভব! সে তো নওশিনের পরিবারেরই একজন!
জিহাদ কিছু বলল না।
অন্যদিকে নওশিন মেহেরের ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে জানত না, তার ঘরের বাইরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।
লোকটি আস্তে করে দরজার নিচ দিয়ে একটা কাগজ ঢুকিয়ে দিল।
কাগজে লেখা—
"তোমার বোনের হত্যাকারী তোমার নিজের ঘরেই আছে।"
চলবে... 🖤🥀
🌑 পর্ব ৪ — নিজের ঘরেই শত্রু!
জিহাদ কাকে সন্দেহ করছে? নওশিনের পরিবারের কে মেহেরের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত? আর ইমু-অভির বন্ধুত্ব কি ভালোবাসায় রূপ নেবে?