#বনজোছনা
৪.
পূর্বদিকের রাস্তা ধরে বাস এগিয়ে চলেছে। সকালের শক্তি সঞ্চয়কারী রোদ ওর ক্রমশ তেজী হয়ে ওঠা রোদ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারধারে। ভাঙ্গা কাচের জানালা থেকে রোদ ছিটকে পড়ছে সাকিনের চোখে-মুখে।
উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করার পরই সাবিহার বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। তখন সাকিন সবে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। মামা আকরাম একদিন হুট করে বললেন, “সাবিহার জন্য একটা সম্বন্ধ পেয়েছি। ছেলে বড় ব্যবসা করে, পরিবার ভালো।”
মামার কথার উপরে কথা বলার মতো অবস্থা তখন সাকিনের ছিল না। এখনও অবশ্য আছে বলে সে মনে করে না।
তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা চলাকালীন বাবা মারা গেলেন। মা তারও আগে। সে অকূল পাথার থেকে দুই ভাই-বোনকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন আকরাম খান। সাবিহা তখন কেবল ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। মাথার উপরে হাত অথবা পেটের ভাত—কোনোটারই ব্যবস্থা নেই। সেসময় মামার বাড়িই তাদের আশ্রয় হলো।
তখন থেকেই মামার এই ফার্মেসিতে বসছে সাকিন। উচ্চ মাধ্যমিকে উঠে দুটো টিউশনি করার চেষ্টা করল। তাতে ফার্মেসিতে বসা হয় না, ঘরের বাজার বাকি রয়ে যায়। কাজেই টিউশনি ছাড়তে হলো। সে তখনই বুঝতে পেরেছিল ভার্সিটিতে ভর্তি হবার পরও এই অবস্থাই হবে। সেটাই সত্যি হয়েছে। সাবিহাকে নিয়ে আলাদা থাকার উপায় তার ছিল না। মেয়েটা তখন বড় হচ্ছে। বাইরের পরিবেশ তার জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু বাড়ির কাছের ভার্সিটিতে চান্স পেয়েও সাকিনের স্বস্তি মিলল না। দিন যেতেই সে দেখল আদিলের চোখের গতি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যদিও ও সাবিহার চাইতে কয়েক বছরের ছোট কিন্তু ওর দৃষ্টি বয়সের সে তফাৎ গ্রাহ্য করেনি। পুরোটা দিন ক্যাম্পাস আর ফার্মেসিতে ছোটাছুটি করা সাকিন বোনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ল।
ঠিক সে সময় আকরাম খান কোত্থেকে রফিককে খুঁজে নিয়ে এলেন। আদতেই সে ভদ্রলোক। তার চেয়ে দু বছরের বড় লোকটার হাতে বোনকে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলো সাকিন। রফিক বলেছিল সাবিহাকে অনার্সে ভর্তি করিয়ে দেবে। কিন্তু সাবিহা নিজেই রাজি হয়নি।
বোনকে বিদায় দিয়েও সাকিন বিদায় নিতে পারেনি। ঋণ বড় কঠিন জিনিস। গ্র্যাজুয়েশনের সার্টিফিকেট পকেটে করে ফার্মেসিতে বসে ঋণের মূল্য চোকাতে হচ্ছে। তবে পাপড়ি কিছুটা সুবিধা করে দিচ্ছে বটে। সাকিন যখন হাঁপিয়ে উঠছিল, দিশেহারা হয়ে গেছিল— তখন পাপড়িই সমাধানসহ সমস্যা নিয়ে হাজির হলো।
নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে বাস থামতেই সাকিন নেমে পড়ল। হাসপাতালের কাজ আজকে শেষ হয়ে গেলেই তার সুবিধা। নয়তো এজন্য আবার সাবিহাকে দেখতে যেতে দেরি হবে।
তার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ ছিল। সিবিসি, ইউরিনসহ আরো কিছু টেস্টের পর জানানো হলো এবার থেকে নাকি ডোপ টেস্টও শুরু করা হয়েছে। সাকিন বিনা বাক্য ব্যয়ে সে টেস্টও সম্পন্ন করল।
নির্বিঘ্নে সবটা শেষ হলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাকিন ভাবলো একটু বাজারের দিকে যাবে। এদিকে বাজারে সুন্দর সব মাটির থালা-বাসন পাওয়া যায়। সাবিহার ছোট থেকেই এসব জিনিসের শখ।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে অটো খুঁজছে, এমন সময় বাইকে করে এক পুলিশ এলো। বয়স তার কাছেপিঠেই হবে। লোকটার পেছনে এক বয়স্কা মহিলা নিজের গায়ের ভর ছেড়ে অজ্ঞান হয়ে আছে। তাকে ঠেস দিয়ে ধরে আছে পেছন থেকে আরেকজন।
কিন্তু পুরুষ দুজনের অবস্থাই যে অসম্ভব বিপন্ন সেটা তাদের কাঁপুনি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। সাকিন দোনামনা করে এগিয়ে গেলো এবং তার পরপরই বুঝল পুলিশ ছেলেটা আসলে তার চোখের বর্ষণ ছাপিয়ে সামনের কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। অপরজনকে নিয়ে সাকিনই ভদ্রমহিলাকে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে গেলো।
চলে আসতে যেয়েও পারল না সাকিন। ছেলেটা অসহায়ের মতো একটু পরপর চোখ মুছে চলেছে। ইউনিফর্মের নেমপ্লেটে ছোট্ট করে লেখা ‘জুবায়ের’। একেবারেই অপরিচিত সে ছেলেটার প্রতি অসম্ভব মায়া অনুভব করছিল সে। অথচ স্বান্তনা দেয়ার জন্য যে দুটো বাক্য বলবে—সেটাও সে পারছিল না। কথা-বার্তায় সাকিন বড় দুর্বল।
সে সময় হন্তদন্ত ভঙ্গিতে ডাক্তার বেরিয়ে এসেই বললেন, “ইমারজেন্সি দুই ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করুন। আমাদের ব্লাড ব্যাংকে ও নেগেটিভের কোনও সাপ্লাই নেই।” বলে যেভাবে ঝড়ের বেগে এসেছিলেন ঠিক সেভাবেই আবার চলে গেলেন।
জুবায়ের মুহূর্তেই ফোন বের করল। কাকে রিং দিতে যাচ্ছে সে সময় সাকিন এগিয়ে এসে বলল, “আসসালামু আলাইকুম, ভাই!”
সাকিনের মনে হলো মনের অতৃপ্তি মেটানোর এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেছে সে।
জুবায়ের লোকটাকে চিনতে পারল না। তার কণ্ঠে প্রশ্ন, “জি?”
“আমার ব্লাড ও নেগেটিভ। মাত্রই ব্লাড টেস্ট করেছি। আপনি চাইলে আমিই রক্ত দিতে পারব ইনশাআল্লাহ্।’
জুবায়েরের মনে হলো সে কোনো কল্পনায় বাস করছে। তার দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি, শ্বশুরবাড়ি কোনওদিকেই ও নেগেটিভ রক্ত আছে এমন কেউ নেই। এক বন্ধু আছে, সে শহরে আছে কি না জানার জন্য ফোন দিতে যাচ্ছিল সে। এরই মাঝে এক আগন্তুকের আবির্ভাব।
জুবায়ের প্রায় লাফিয়ে এসে সাকিনের হাত ধরে কিছু বলতে গেলো। কিন্তু আফসোস তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরুচ্ছে না।
সাকিন এই প্রথম কোনো পুলিশ দেখল যে কি না আর পাঁচটা মানুষের চেয়েও বেশি নরম। আহা বেচারা! ও এই পেশায় টিকবে কীভাবে!
আধা ঘণ্টার মাঝে রক্ত দেয়া হয়ে গেলো। বেশ দুর্বল বোধ করছিল সাকিন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে যখন বাকি দিনের কার্যকরণ ঠিক করছে তখন জুবায়ের প্রায় উড়ে তার পাশে এলো। সাকিনের দুর্বল প্রতিরোধ ভেঙে তাকে এক গ্লাস গ্লুকোজ খাইয়ে দিলো। আপেল, কমলা কোত্থেকে কেটেই এনেছে। সেগুলোও তাকে খাইয়ে দিলো। সাকিন ক্লান্ত হয়ে বলল, “যথেষ্ট হয়েছে ভাই। অনেক ধন্যবাদ!”
“ধন্যবাদ তো আমার দেয়া উচিত ভাই। আপনার উসিলায় আমার আম্মার জীবনটা এই যাত্রায় আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আপনি আমার নাম্বারটা রাখেন ভাই। আল্লাহ যদি কোনোদিন আপনার উপকার করার সুযোগ দেয়, আমাকে দয়া করে বঞ্চিত করবেন না। আপনার নাম্বারটাও আমাকে দিয়ে যান।”
ছেলেটার ব্যবহারে আপ্লুত হলো সাকিন। হাসপাতালের মসজিদে জোহর আদায় করে বেরিয়ে পড়ল সে। তার হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তবু ঘুরে ঘুরে দুটো প্লেট, একটা জগ, একটা মগ আর ছোট দুটো বাটি নিয়ে নিলো। সবই মাটির। লাল রঙের জিনিসগুলোর উপর ফুল লতা-পাতার কারুকাজ করা। দেখতে সুন্দর বটে।
*****
ফরিদ আহমেদ দুমুখী কষ্টে নিজের ভেতর পিষ্ট হয়ে যাচ্ছিলেন। প্রথমত, আব্দুর রহমান মারা যাওয়ায় তাকে যে বিপাকে পড়তে হলো, সেখান থেকে তিনি গা বাঁচিয়ে উঠবেন কীভাবে বুঝে উঠতে পারছেন না।
পরিচিত একজন মারা গেছেন। তার জন্য শোক করার বদলে তার অনুপস্থিতিতে নিজের ঝামেলা নিয়ে চিন্তার জন্য ভেতরে ভেতরে লজ্জা পাচ্ছেন ফরিদ আহমেদ। বিবেকের দংশনে তিনি ভাবনার জল বেশিদূর গড়াতে পারছেন না।
ফাবিহা ভার্সিটি থেকে ফিরে এসে দেখল ফরিদ আহমেদ সকালে যেভাবে বসে ছিলেন, এখনও ঠিক সেভাবেই বসে আছেন। সে মায়ের কাছে যেয়ে ফিসফিস করে বলল, “আম্মু, বাবা কলেজে যায়নি?”
নূরজাহান ক্লান্ত ভঙ্গিতে দুপাশে মাথা নাড়লেন।
“লোকটার অবস্থা দেখে তো আমার ভয় লাগছে ফাবিহা। এভাবে থম মেরে গেলে..” কথা শেষ করলেন না তিনি। তার শঙ্কা ফাবিহাকেও ছুঁয়ে গেলো। সে ফরিদের কাছে ছুটে গেলো।
“আঙ্কেলের জানাজা কি হয়ে গেছে বাবা?”
“না।” ফরিদ আহমেদ ক্লান্ত চোখে বাইরে তাকিয়ে আছেন।
“তুমি জানাজায় যাবে না?”
ফরিদ কোনো উত্তর দিলেন না।
“যাও বাবা।এভাবে বসে থাকলে কি কোনো কিছুর সমাধান হবে? আল্লাহ ভরসা, একটা না একটা উপায় বের হবেই।”
ফরিদ আহমেদ জানাজার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন। বাদ মাগরিব ঈদগাহ ময়দানে জানাজা।
বাবা বেরিয়ে গেলে ফাবিহা ভাইয়ের ঘরে গেলো। নক করলেও ওপাশ থেকে কোনো সব পাওয়া গেলো না। সিমি রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে নিচু কণ্ঠে বলল, “সকাল থেকেই দরজা আটকানো।”
ফাবিহা ঠোঁট কামড়ে এক মুহূর্ত কিছু একটা ভাবল। তারপর নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
মাঝারি আকারের ঘরটা এই ভর দুপুরেও ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। জানালায় কি কালো পর্দা দিয়েছে নাকি? নিজের হাতটাও দেখতে পেলো না ফাবিহা। কিন্তু সচেতন হতেই খেয়াল করল একটা তীক্ষ্ম, কটু গন্ধ। ফারদিনের ভারী শ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কয়টায় ঘুমিয়েছে সে?
সিমি পেছন থেকে উঁকি দিলো, “ছোট আপা!”
ফাবিহা এক পা পেছালো, “কীসের গন্ধ বল তো!” ফিসফিস করে বলল সে।
সিমি ঠিক ঠিক সাত সেকেন্ড সময় নিলো। তারপর ঠিক ফাবিহার মতোই ফিসফিসিয়ে বলল, “বলব ছোট আপা?”
“বল।”
সিমির কণ্ঠ আরও এক ধাপ নিচে নামল। ফাবিহার গা ঘেঁষে সে বলল, “গাঁজার মতো লাগে। আব্বা মরে যাওয়ার আগের এক সপ্তাহ পানির বদলে গাঁজা খেয়েছিল।”
ফাবিহার বুকটা ধ্বক করে উঠল।
গলা ভিজিয়ে সে বলল, “কাউকে বলিস না।”
“কাউকে বলব না।”
“মনে কর তুইও জানিস না।”
“ঠিকাছে ছোট আপা।”
“যা তুই।” সিমি চলে গেলো।
ফাবিহা অন্ধকারেই হাঁচড়-পাঁচড় করে জানালা অবধি পৌঁছালো। একটা পাল্লা খুলে দিতেই হুড়মুড়িয়ে তপ্ত রোদ ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। সে রোদে পুরো ঘরটায় চোখ বুলিয়ে নিলো ফাবিহা। একদম পরিপাটি। কোথাও কিছু এলোমেলো নেই।
বিছানার কাছে যেয়ে সে ফারদিনকে ডাকল, “ভাইয়া! ভাইয়া?” এই গরমেও সে কাঁথা দিয়ে নাকমুখ থেকে ঘুমিয়ে আছে।
“হুঁ?” সেভাবেই বলল ফারদিন।
“রাতে কখন ঘুমিয়েছিস?”
“ঘুমাইনি।”
ফাবিহা চুপ করে বসে রইলো। খানিকক্ষণ পর ফারদিন চোখের উপর থেকে কাঁথা সরিয়ে ওকে এক পলক দেখে উঠে বসল।
“কিছু বলবি?” হাই তুলে জিজ্ঞেস করল ফারদিন।
ফাবিহা ভাইয়ের দিকে তাকালো। নূরজাহানের গায়ের উজ্জ্বল রঙে এবং চেহারার আদলের সমস্তটাই পেয়েছে ফারদিন। ওর জন্য একটুও বাকি রাখেনি। ফলে বাকি থাকা ফরিদ আহমেদের শ্যামলা জিনটাই ওকে নিতে হয়েছে। ফারদিনের টিকালো নাক আর টলমল চোখ দেখলেই যে কেউ কাবু হয়ে যেতে বাধ্য। সম্ভবত এজন্যই ফরিদ আহমেদ ওকে সরাসরি চার্জ করেন না। মিডিয়া ব্যবহার করে বকাঝকা করেন। সে মিডিয়া কখনও হয় নূরজাহান, কখনও ফাবিহা।
“তুই কি পরীক্ষা দিচ্ছিস না, ভাইয়া?”
চমৎকার ভঙ্গিতে হেসে দু’পাশে মাথা নাড়ল ফারদিন। যেন কত গর্বের একটা কাজ।
“কেন?”
“বুঝতে পারছি না। পরীক্ষা দেয়ার ইচ্ছেটা ভেতর থেকে কাজ করছে না।”
“গাঁজা খাওয়ার ইচ্ছে কাজ করছে?” ফাবিহা শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
“আরে না! এখনও খাইনি তো!”
“তাহলে ঘরে এনে রেখেছিস কেন?”
ফারদিন চুপ করে রইলো।
ফাবিহা বলল, “তোর দিকে অনেকগুলো চোখ তাকিয়ে আছে, ভাইয়া। বাবা,আম্মুর কথাটা অন্তত ভাবিস।”
সে উঠে দাঁড়ালে ফারদিন বলল, “এক জীবনের সব শখ আহ্লাদ বাবা-মার চেহারার দিকে তাকিয়ে ভুলে যাব?”
ফাবিহা অপলক তাকিয়ে রইলো ফারদিনের সুন্দর চেহারার দিকে। ওখানে এখন আর হাসির কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই।
“শখের চেয়ে দায়িত্ব অনেক বড় বিষয়। দায়িত্ব ফরজ, শখ না। মনের সব খায়েশ যদি দুনিয়াতেই মেটানো যেত তাহলে জান্নাতের আর কোনো দরকার ছিল না। জীবনটা মূলত পুলসিরাত। তুই কাজ দিয়ে ঠিক করবি জাহান্নামে পড়বি নাকি জান্নাতে যাবি।” ফাবিহা চলে গেলো।
পরের এক সপ্তাহ তাদের বাড়ির উপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলো। রিজভী যেকোনো মূল্যে আশি হাজার টাকা চান। ফরিদ আহমেদ কোনোভাবেই ত্রিশ হাজারের বেশি এক টাকাও দেবেন না। এ কথা সাফ জানিয়ে তিনি রিজভীর কলও আর রিসিভ করছেন না। টানা এক সপ্তাহ এমন হওয়ার পর রিজভী এবার নূরজাহানের কাছে ফোন দিলেন। কড়া কণ্ঠে বললেন, “ফরিদ ভাই কিন্তু ত্যাড়ামি শুরু করছে। আমি ত্যাড়ামি করলে সে বাঁচবে তো?”
নূরজাহান প্রচণ্ড ভয় পেলেন, “ভাই আল্লাহর দোহাই লাগে! টাকাটা মাফ করে দেন। আপনি তো বলেছিলেন…”
“রাখেন তো! সুদের ভেতর আল্লাহর দোহাই দেখাবেন না। টাকা ফেলেন নাহলে আমি লোক নিয়ে কলেজে যাচ্ছি। আমার সাথে এমন দেমাগ দেখানো চলবে না!” খট করে ফোন কেটে দিলেন তিনি।
নূরজাহান অপ্রকৃতস্থের মতো ফরিদকে কল দিলেন। ক্লাসের মাঝে হওয়ায় প্রথমবার তিনি ধরলেন না। নূরজাহান লাগাতার কল দিয়েই গেলেন। তিনবারের বার কল রিসিভ করে ফরিদ বললেন, “ক্লাসে আছি। পরে কথা বলছি।”
নূরজাহান হড়বড় করে বললেন, “রিজভী ভাই তোমার কলেজে যেতে চাচ্ছে! আর জেদ ধরে থেকো না, ফারদিনের আব্বু! আশি না পারি, পঞ্চাশ দিয়ে হলেও তার মুখটা বন্ধ করে দাও।”
এ কথা শুনে ফরিদ বেজায় উত্তেজিত হয়ে গেলেন।
“কলেজে আসবে মানে! আসুক। লোকজন ওর একারই আছে? আমি যে বলছিলাম সুদ ছাড়া টাকা নিব—এটা সে ভুলে যায় কীভাবে? আসতে চাইলে আসতে দাও।” তিনিও কল কেটে দিলেন।
খালি বাড়িতে বসে নূরজাহানের মনে হলো তার দম আটকে আসছে।
সিমি এগিয়ে এসে বলল, “খালাম্মা, আপনার কি খারাপ লাগছে?”
নূরজাহান উত্তর দিতে পারলেন না। রিজভীর লোকজনের অভাব নেই। ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না। অত লোক নিয়ে কলেজে যেয়ে টাকা চাইলে মান-সম্মানের আর কিছু বাকি থাকবে? লোকটা বুঝতেই চাচ্ছে না। এসব লোক তো ভদ্র ভাষায় আপোষ করার মানুষ না। শুনেছেন, এরা নাকি গায়েও হাত তোলে। নূরজাহান অস্থির বোধ করলেন।
আধা ঘন্টা ঝিম মেরে বসে থেকে তিনি সিমিকে ডেকে বললেন, “আমি আসছি। খবরদার কাউকে কিছু বলবি না!”
সিমি বিভ্রান্ত চেহারায় কেবল ঘাড় নেড়ে সায় জানাল। নূরজাহান বেরিয়ে যে বাড়ির দিকে গেলেন তা দেখে তার গলা শুকিয়ে এলো।
পরবর্তী এক ঘণ্টার মাঝে সবকিছু মীমাংসা হয়ে গেল। ফরিদ আহমেদ নূরজাহানের কাছে কল দিয়ে আনন্দিত কণ্ঠে জানালেন, “রিজভী ভাই ত্রিশ হাজার টাকা নিতে রাজি হয়েছে।”
“খুব ভালো।” শীতল কণ্ঠে বললেন নূরজাহান। এবং সেদিন বিকেলেই রিজভীকে ত্রিশ হাজার টাকা পরিশোধ করে দেয়া হলো।
চলমান.
(এটা সম্ভবত আমার সবচেয়ে বিশ্রী লেখা হচ্ছে, তাই না?)