ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 5

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৫.
বহুদিন পর বুকভরে নিশ্বাস নিচ্ছেন ফরিদ। বিগত দশটা দিন এই শীতল বাতাস নাকের নিচে দিয়ে চলে গেছে আর তার বুকের ছাতিতে জমা হয়েছে কামারের হাপড় থেকে নির্গত ধোঁয়া। শ্বাস ছাড়াও বাঁচতে পারেননি, নিয়েও যন্ত্রণায় কাতরাতে হয়েছে।

রিজভীর কথাবার্তার ভাঁজে তিনি ভেবেই ছিলেন—লোকটা কোনোভাবেই মানবে না। এক্ষেত্রে যা হয়—এলাকার মানুষ ডেকে বিচার বসানো—সেটারই ভয় করছিলেন ফরিদ। তিনি বেসরকারি কলেজের ছাপোষা শিক্ষক। লোক জড় করে মীমাংসা করা আর তার ভাসমান সম্মানের জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়া একই কথা। কাজেই কীভাবে দুকূল বাঁচাবেন সে চিন্তায় চোখের নিচে কালো মেঘ জমেছিল।

কীভাবে কী হয়েছে তিনি জানতে চান না। রিজভীকে যে আল্লাহ সুবুদ্ধি দিয়েছেন—এজন্যই তিনি কৃতজ্ঞ। ভেবে রেখেছেন—এই বিপদ কাটার খুশি উপলক্ষ্যে তিনটা রোজা থাকবেন।

ফরিদ আহমেদ এক কাপ ঠান্ডা চা নিয়ে বারান্দায় বসে আছেন। অবশ্য এই এক হাত জায়গাকে বারান্দা বলা, আর বারান্দাকে প্রহসন করা একই কথা। কিন্তু অন্যকিছুও বলা যায় না। টু-লেটে গাঢ় কালোতে লেখা ছিল— নিচ তলার ফ্ল্যাট ভাড়া দেয়া হবে। তিন রুম (একটি বারান্দাসহ), দুই বাথরুম এবং একটি কিচেন।

ফরিদের মতে একটি বারান্দা না লিখে ওখানে ‘একটু’ বারান্দা লিখলেই মানুষকে আর ধন্দে পড়তে হতো না।

ঠান্ডা চা খেতে খেতে তিনি রাস্তায় নজর দিলেন। একটা বিড়াল অনেকক্ষণ ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাতের পাউরুটি ওকে সেই কখনই দিয়েছেন। সেটা খেয়ে তার আধা হাত জিহ্বা এক হাত হয়ে গেছে। ফরিদের চা খাওয়ার পাঁয়তারা করছে বলেই তার ধারণা। অন্ধকারে ওর জ্বলজ্বলে চোখ জোড়া তার হাতের দিকে নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।

“অন্ধকারে বসে আছো কেন, বাবা?” ফাবিহা একটা টুল নিয়ে এসে ফরিদের পাশে বসল।
“বিড়ালটা দেখছি।”
“চায়ে ফুঁ দিচ্ছ কেন? ওটা তো ঠান্ডা করেই তোমাকে দিয়েছি।”
“বদভ্যাস হয়েছে রে মা। তুই বিড়ালটা দেখ। সুন্দর আছে না?”
“অন্ধকারে বুঝব কীভাবে সুন্দর কি না?” ফাবিহা খানিকটা বিরক্ত হয়েই বলল। “আর সুন্দর হলেও কী? তোমার মতলব বলো তো, বাবা!” সন্দেহী চোখে তাকালো সে।
ফরিদ আহমেদ একগাল হেসে বললেন, “কোনো মতলব নেই রে মা! বিড়াল যদি ঘরে তুলি তোর মা তো আমাকে রাখবে না। থাক, সে আলাপ বাদ। নতুন একটা প্লট মাথায় এসেছে। শুনবি?”
“বলো।” আগ্রহী চোখে তাকালো ফাবিহা।
ফরিদ বাকি চা-টুকু শরবতের মতো খেয়ে বললেন, “দাঁড়া, একটা অধ্যায় লিখেছি। তোকে দেখাই।”

কয়েক মিনিটের মাঝে হলুদ রঙের একটা পুরোনো বাঁধাই করা খাতা নিয়ে হাজির হলেন তিনি। ফাবিহা ফোনের আলো জ্বালালো। বারান্দায় শুরু থেকেই কোনো বাতি নেই। বসার ঘরের আলোও এদিকে খুব একটা আসে না।

ফাবিহা খুব মন দিয়ে লেখাটা পড়ল। প্রায় আড়াই হাজার শব্দের অধ্যায়। খাতার বিশটা পাতা লেগে গেছে।

ফরিদ আহমেদের লেখার আলাদা একটা ঢং আছে। দেখা যায়, আজকালকার উঠতি লেখকেরা বড় কোনো লেখকের ছায়া ধরেই এগিয়ে যায়। এগিয়ে যেতে যেতে এমন অভ্যস্ত হয় যে—নিজের আর কোনো রোদ থাকে না। সূর্য বোধহয় ওরা হতেও চায় না। সূর্যের আলো ধার করে চাঁদ হয়ে খেয়ে-পরে একটা জীবন কাটিয়ে দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য।

সেদিক দিয়ে ফরিদ আহমেদ বেশ স্বতন্ত্র। পড়তে শেখার পর থেকেই বাবার লেখা পড়ে আসছে ফাবিহা। তার জন্য কখনও ফরিদ ছড়া লিখেছেন, কখনও কবিতা। কখনও ছোট গল্পে ঘুম পাড়িয়েছেন, কখনও আবার উপন্যাসে কিশোরী ফাবিহার ঘুম ভাঙিয়ে তাকে তারুণ্যের রাস্তায় তুলে দিয়েছেন। কাজেই, নিজের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বাবা নামক সে লেখকের চড়াই-উৎরাই দুটোই দেখেছে সে। একুশ ছুঁই ছুঁই এ জীবনে—এপার বাংলা, ওপার বাংলা—দু-দিকের সাহিত্যই তার পড়া হয়েছে। নকশী কাঁথার মাঠ থেকে বিষাদসিন্ধু অথবা পরিণীতা থেকে জলপাইগুড়ির চা-বাগান—এসব অলিগলিই তার চেনা। সে পাঠক চোখের নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে সে বলতে পারে—তার বাবার লেখা জনসম্মুখে এলে প্রিয় না হয়ে পারেই না।

“তোর আম্মুর কিছু হয়েছে মনে হয়। কথাবার্তা কম বলছে। বলুক, মেয়ে মানুষের মন! এখনই সকাল, এখনও মধ্যরাত। সে যাক। কিন্তু আমার পাঠক যে কমে গেলো।” ফরিদ হতাশ কণ্ঠে বললেন।
ফাবিহা বলল, “তুমি যে চিঠি পাঠিয়েছিলে, ওরা কোনো উত্তর দিয়েছে?”
অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’পাশে মাথা নাড়লেন ফরিদ।
বহুবছর আগে থেকেই জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিজের লেখা পাঠিয়ে আসছেন তিনি। কোনোবারই সেসব কেউ ছাপায়নি। মঞ্জিল কমিয়ে ছাটতে ছাটতে ম্যাগাজিন থেকে জেলাভিত্তিক ত্রৈমাসিকে এসে থেমেছেন—আজ অবধি কেউ তার লেখা ছাপায়নি।

বাবার এই চাপা কষ্টটা অনুভব করতে পারে বলেই ফাবিহার অস্থির লাগে। ফারদিনের মতো ভোঁতা অনুভূতি হলে এত সমস্যা ছিল না। এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরামসে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়া যেত।

ফরিদ আহমেদের শুকনো চেহারার দিকে তাকিয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠল ফাবিহা। বাবার হাত ধরে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল, “বাবা!”
ফরিদ তাকালেন, “কী হলো?”
“তোমাকে ফেসবুকে একটা পেজ খুলে দেই আসো!”
“কেন?” বিভ্রান্ত কণ্ঠ জিজ্ঞেস করলেন তিনি। তার একটা ফেইসবুক আইডি আছে বটে। পেইজ জিনিসটা তার কাছে অপরিচিত নয়।
“ওখানে তুমি লিখবে। কারো ছাপানোর জন্য আর অপেক্ষা করতে হবে না। যখন ইচ্ছা হবে লিখে ফেলতে পারবে!” ফাবিহার কণ্ঠে অসম্ভব আগ্রহ।
ফরিদ বললেন, “কে পড়বে আমার লেখা?”
“কত্ত মানুষ পড়ে জানো! ওখানে মানুষের অভাব নাকি! তুমি লিখেই দেখো না!”

ফরিদের দোলাচলকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ফাবিহা তৎক্ষণাৎ একটা পেইজ খুলে ফেলল। আগ্রহ ভরে জিজ্ঞেস করল, “কী নাম দেব, বাবা?”
ফরিদ খানিকক্ষণ ভেবে চিন্তে বললেন, “ময়ূখমালা দে।”
“কেন, তোমার নামটাই দিই?”
“না, এটাই দে।”
টাইপ করতে করতে ফাবিহা জিজ্ঞেস করল, “ময়ূখমালা অর্থ কী?”
“রাশি রাশি মেঘ।”
ফরিদ আহমেদ খাতায় লিখছেন—পেছন থেকে এমন একটা ছবি বহুদিন আগে তুলেছিল ফাবিহা। তখনও তার চুলে পাক ধরেনি। সেটাই প্রোফাইলে দিয়ে দিলো।

ফাবিহা বলল, “এই গল্পটার নাম রেখেছ, বাবা?”
“না, এখনও রাখিনি।”
“তাহলে চটপট একটা নাম ভাবো। তারপর প্রথম পর্বটা পোস্ট করে দিই। মানুষ খালি পেইজে এসে কী পড়বে? এটা কোন জনরার লেখা হবে বলো তো!”
“মধ্যবিত্ত জনরা।” হেসে বলেন ফরিদ।
“তাই আবার হয় নাকি!”
“হওয়ালেই হয়।”
“আচ্ছা তুমি নাম বলো।”
“নওরোজ।”

সেভাবেই বিশাল পর্বটা টাইপ করে পোস্ট করে দিল ফাবিহা। সাথে মানানসই একটা ছবি সংযুক্ত করে দিলো। ফরিদকে বলল, “প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে পোস্ট করবে। তাহলে ভালো রিচ হবে।”

সাদা স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ফরিদ। তিনি জানেন কেন তার লেখা কোথাও ছাপানো হয় না। দৈনিক পত্রিকায় নাম ওঠাতে গেলে আগে কলকাতাকে সাহিত্যের কেবলা মানতে হয়, আর রবীন্দ্রনাথকে গুরু। সাথে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের ট্যাগ থাকলে লেখাটা কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আলোর মুখ দেখে।

কিন্তু তিনি বেসরকারি এক কলেজের শিক্ষক। যেখানে দু’মাস পরপরই বেতন নিয়ে গড়িমসি করা নিয়ম। তাদের অধ্যাপক ডাকার নিয়ম নেই। তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে ‘মাষ্টার’ ডেকেই মানুষ কৃপা করে। তার উপরে তিনি লেখেন নিম্নশ্রেণীর মানুষের কথা। পশ্চিমের ডিকশনারি অনুযায়ী যারাই ইসলামের পাবন্দী করে তারাই ঊনমানুষ। তার খাতা জুড়ে সে সব ঊনমানুষের ছড়াছড়ি।

ফরিদের বুকের ভেতর একটা আশার বাতাস ঘাই মেরে যায়। এখানে তো কোনো ছাঁকনি নেই। অধ্যাপকের পদ, ঊনমানুষের নিয়ম তো এখানে নেই। আর কেউ না হোক, তার মতো লোকেরা নিশ্চয়ই তাকে গ্রহণ করে নেবে?

*****

মাটির জিনিসগুলো প্রায় বুকে জড়িয়েই বাড়িতে ঢুকল সাকিন। সাবিহার বাড়িটা তার অসম্ভব পছন্দের একটা জায়গা। হুমায়ূনের পছন্দের জায়গা ছিল তার স্বপ্নের ময়ূরাক্ষী। সাকিনের পছন্দের জায়গা সাবিহার এই ‘কুন্দকলি’। তবে সমস্যা হলো—মন চাইলেই এখানে আসা যায় না। বোনের বাড়িতে আসার জন্য বঙ্গ দেশের ভাইয়েদের বহু নিয়ম-কানুনের পথ পাড়ি দিতে হয়। সাকিনের পক্ষে যা বহুসময় সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এজন্যই প্রায় সাত মাস পর শ্যাওলা পড়া নামফলকে ‘কুন্দকলি’ লেখাটা ছুঁয়ে ভেতরে ঢুকলো সে। সামনের এক ফালি উঠান মুড়িয়ে আছে গাঢ় সবুজ ঘাসে। শুনেছে, সাবিহার শ্বশুর প্রতিদিন ফজরে লন মোয়ার দিয়ে উঠানের চেহারা ঝালাই করেন।

সদর দরজার সাথে মূল দালানের দূরত্ব পনের গজের বেশি হবে না। এর মাঝেই জায়গাটা ভূস্বর্গে রূপান্তরিত হয়েছে। উত্তরের জলপাই, বেল আর নিমের মেলবন্ধনে যে ঘনছায়া তৈরি হয়েছে তার যথার্থ মূল্য কেবল বিভূতিই চোকাতে পারে।

দক্ষিণের আকাশটা একেক সময় একেক রঙে সাজে। কাঁঠালের পেছনে উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা হাসনাহেনার গাছ। ওর রুগ্ন স্বাস্থ্যের কমতি পূরণ করে ফুলের সুগন্ধি। কাঁঠালের পেট মোটা ডাল তখন চোখ রাঙিয়েও সে ঘ্রাণকে কাবু করতে পারে না।

বৃক্ষবন্ধনের সে লাইন বাড়তে বাড়তে বাড়ির পেছনদুয়ারে পৌঁছে গেছে। দোতলা দালানের স্বাস্থ্যবান দেহের পেছনে ঢেকে গেছে শিউলির রূপ আর জারুলের সৌষ্ঠব। সাকিন আর এক ঝলক আকাশের দিকে তাকালো। আকাশ না দেখতে পারাও যে এতখানি আনন্দের তা কুন্দকলিতে না এলে সে কোনোদিন জানতে পারত না।

দালানের রংটা একটু মলিন। পুরোনো দেয়ালের গায়ে স্মৃতির ছাপ লেগে যেরকম হয়—ঠিক তেমন। লাল দেয়ালের মেরুদণ্ড মেরুন হয়ে গেছে। সেই বরাবর ছাদ থেকে চুইয়ে পানি পড়ার ফল। দূর থেকে দেখে মনে হয় ইটের ওপর আর কোনো আস্তরণ দেয়া হয়নি। অথচ ওটাই দেয়ালের নকশা। ছাদের কাছে হলুদ বর্ডার টানা হয়েছে। তাতেও জমেছে যুগের ইতিহাস।

বারান্দায় উঠতে না উঠতেই কোত্থেকে সাবিহা উড়ে এলো। চোখের পলকে সাকিনের ডান ধরে ঝুলতে ঝুলতে বলল, “এতদিনে আমার কথা মনে পড়েছে?” বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল সে। সে কান্না দেখেও সুখ। সাকিন কেবল দেখেই গেলো।

সাবিহার বসন্তের বর্ষণ যখন থামার নাম নিচ্ছিল না তখন ওর মাথায় আলতো করে হাত রেখে সাকিন বলল, “রিফাত কোথায়?”
“আছে। তুমি কী এনেছো আমার জন্যে?”
সাকিন বাম হাতের ব্যাগটা এগিয়ে দিলো। ওটা খুলতেই ঝিলিক খেলে গেলো সাবিহার চোখেমুখে। শেষ বিকেলের কনে দেখা আলোয় সে চেহারাটা দেখে সাকিনের মনে হলো, এমন একটা হাসির ঝিলিক দেখার জন্য সে আরও বহু দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। অথচ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতে পারল না।

সাবিহা ঝলমলে চোখে সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। মেকি বিরক্তি চোখেমুখে মাখিয়ে বলল, “খালি মাটির জিনিস আনো কেন ভাইয়া? আমার কি কাঁচের জিনিসের শখ হয় না?”
“দামি জিনিস দিবে রফিক ভাই। আমার এত টাকা কোথায়?”
সাবিহা পারলে চোখ দিয়ে সাকিনকে ভস্ম করে দিত।

এক হাতে ওকে ধরে প্রায় ছুটে ভেতরে গেলো সাবিহা। এক বছরের রিফাত বিছানায় বসে অদ্ভুত চোখে মামার দিকে তাকাচ্ছে। হাত বাড়াতেই সাকিনের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে।
সাবিহার ঘরের কোণে ছোট্ট একটা শোকেস আছে। সেটা ভর্তি মাটির জিনিসপত্র। নতুন আনা জিনিসগুলোও একে একে ওখানে সাজিয়ে রাখল সাবিহা।

রিফাতকে কোলে নিয়ে সাকিন বলল, “রফিক ভাই বাসায় নেই?”
“না। সে বাড়িতে থাকার মানুষ? আমাকে বিয়ে করেছে ভূতের বাড়ি পাহারা দেয়ার জন্য।” সাবিহার কণ্ঠে ক্ষোভ।
“তোর শ্বশুর কই?”
“ভেতরেই আছে। ডাকছি দাঁড়াও।”

রিফাত সাকিনের দাড়ি টানার চেষ্টা করছে। কিন্তু খুব বড় না হওয়ায় ওগুলো তার ছোট্ট মুঠিতে আসছে না। সাকিন ফিসফিস করে বলল, “মামা বলো তো রিফাত!”
ভাগ্যের পরিহাস! রিফাত ডাকল, “বা বা!” যে লোকটা তার সামনে থাকেই না।

সাবিহা ঢুকতে ঢুকতে সে ডাক শুনে ফেলল। শুনেই তার বিরক্তি আরেক ধাপ বাড়ল।
“বংশ বলে কথা! পেটে ধরলাম আমি, জন্ম দিলাম আমি আর এই ছেলে মুখ ফুটেই বাপ বাপ করে! ভাইয়া! আমার কিন্তু এসব একেবারেই সহ্য হয় না!”
সাকিন সে কথা শুনেও হাসে।

পেছনে সাবিহার শ্বশুরকে দেখে সাকিন উঠে দাঁড়ালো। সালাম দিয়ে বলল, “কেমন আছেন চাচা?”
হীরা চৌধুরীর কণ্ঠস্বর বেশ গম্ভীর। মুখটাও গম্ভীর করে রাখেন। দুই বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি নাকি হাসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে তার চেহারার দিকে তাকালেই মনে মেঘ ডেকে ওঠে।

ভারী কণ্ঠে হীরা বললেন, “আছি ভালো। তোমার কী খবর?”
“আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি চাচা।”
“এবার সাথে করে কী বই এনেছ? ঐ আরণ্যক?”
সাকিন হাসল।
ভদ্রলোক বেজায় বিরক্ত হলেন। তিনি প্রবন্ধের একনিষ্ঠ ভক্ত। উপন্যাস পড়া খুব একটা পছন্দ করেন না।
সাকিনের প্রতি জন্ম নেয়া বিরক্তি লুকানোর কোনো প্রয়াস তার মাঝে দেখা গেলো না।
“সারাক্ষণ উপন্যাস পড়ে লাভটা কী, আমাকে বোঝাও তো! তিনটা প্রবন্ধ পড়ার পর একশ পাতার একটা গল্প পড়া যেতে পারে। কিন্তু সর্বক্ষণ এই বানোয়াট উপন্যাস পড়ে কী উদ্ধার হচ্ছে? বোগাস কথাবার্তা, কেবল সময় নষ্ট! প্রবন্ধের মতো এমন তথ্যবহুল আলোচনা আর কোন সেক্টরে হয়?”
সাকিন কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। কেবল হাসল।

সাবিহা শ্বশুরের আসন্ন বক্তব্যের আয়োজনকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলল, “ভাইয়া খাবি না? তাড়াতাড়ি আয়, আমি যাচ্ছি।”
হীরা চৌধুরীও সায় দিলেন। রিফাতকে নিয়ে বললেন, “যাও যাও! খাওয়া-দাওয়া করো আগে।”

টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সাবিহা নিচু কণ্ঠে বলল, “লোকটাকে প্রাইমারি স্কুলেই পার্মানেন্টলি রেখে দেয়ার দরকার ছিল। রিটায়ার্ড করে দেয়া একদমই উচিত হয়নি। আব্বাকে হেড-মাস্টার হিসেবেই মানায়। প্রবন্ধ মাস্টার।”
সাকিন হেসে বলল, “তোর সাথেও এই আলোচনা চলে নাকি?”
“এত না। আমি কেন অনার্সে ভর্তি হইনি এই নিয়ে বকে সময় পেলে না আলোচনা করবে! তুই এসব কথা বাদ দে! আমাকে বল তো, আজকে সারাদিন কোথায় ছিলি?”
“বলাই লাগবে?”
“না বলতে চাইলে জোর করব না। কিন্তু আমার জানার অনেক ইচ্ছা।” চোখে-মুখে আগ্রহ নিয়ে বলল সাবিহা।
“একটা কাজে।” ছোট করে বলল সাকিন। তার মনোযোগী দৃষ্টি প্লেটে।
সাবিহার একটু মন খারাপ হলো। কিন্তু পরক্ষণেই একটা আগন্তুক চিন্তা সে মন খারাপকে ভয়ে রূপ দিলো। সে হড়বড় করে বলল, “ভাইয়া রে! তুই কি কোনো মেয়ের চক্করে পড়েছিস? সত্যি করে বল ভাইয়া! তোকে হাবাগোবা পেয়ে কিন্তু যেকোনো মেয়ে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে। তোর পছন্দ থাকলে বল। তোর কি মনে হয়? আমি কূটনী ননদ হব? তোর বউকে আমি মাথায় করে রাখব। ছোট হলে আমার রিফাতের পাশে কোলে করে রাখব। কিন্তু তুই মেয়েটাকে আমাকে দেখা ভাইয়া। আসলেই মানুষ নাকি ডাইনি একটু দেখে নেই।”

বহু বহুদিন পর সাকিন শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে তার চোখে জল জমে গেলো। সে দৃশ্য দেখে সাবিহার কণ্ঠ রোধ হয়ে এলো। তার ভাই, তার বাবার বাড়ি—আশ্রিত এই মানুষটাই যে তার জীবন নদীর আরেক কূল—এটা সাবিহা কোনোদিন তার ভাইকে বলতে পারেনি। বলতে পারবে—সে সম্ভাবনাও নেই। তার মুখটা বড় অকৃতজ্ঞ। কেবল না পাওয়ার তালিকাই বড়াই করে ঘোষণা দিতে পারে।

চলমান~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন