#বনজোছনা
৬.
সকালের ঘুম ভাঙা রোদটা পড়েছে ঠিক বাড়ির লাল দেয়ালে। ওই যুগ পুরোনো লাল রঙের গায়ে লেগে থাকা স্মৃতির দল তাতে জ্বলজ্বল করে উঠছে। ধুলো গায়ে মেখে উড়ে বেড়াচ্ছে রোদের ধূপে। সাকিন জানে এসব পরাজিতদের স্মৃতি। বিজয়ীদের ইতিহাস এতিম হয়ে পথে-প্রান্তরে ঘোরে না, মুকুট পরে ওদের ঠাঁই হয় বইয়ের পাতায়। রাস্তার ফুটপাথগুলো মূলত পরাজিতদের স্মৃতি বহন করার জন্য তৈরি হয়েছে। ওরা আজীবন পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে যাযাবর হয়েই ঘুরবে।
ভোরটা আড়মোড়া ভেঙে সকাল হয়ে উঠল। সেই ফজর পড়ে উঠানে বসেছে সাকিন। উঠব উঠছি করে আর যাওয়াই হলো না। সাবিহা কয়েকবার চা খাওয়ার জন্য তাড়া দিয়ে গেছে। সে যায়নি। মূলত চা খাওয়ার চাইতে এখানকার বাতাস খেতেই তার বেশি ভালো লাগছে।
কিছুক্ষণের মাঝেই হীরা চৌধুরী বেরিয়ে এলেন। এদের নিচ তলায় তো আগে ভাড়া দেয়া ছিলো। এখন বোধহয় খালি। কাল সন্ধ্যায় জানালাগুলো খোলা দেখেছিল, এখনও খোলাই পড়ে আছে। সাকিনের একটু চিন্তা হলো। সাবিহার শ্বশুর বেরিয়ে গেলে, ও বাড়িতে একদম একা থাকে?
হীরা চৌধুরী এক কাপ চা হাতে এগিয়ে আসছেন। তার অন্য হাতে ছোট একটা মোড়া। সেটা সাকিনের পাশে রেখে আরাম করে বসলেন। শব্দ করে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “কী করছ আজকাল?”
“ফার্মেসিতে বসছি।”
ভদ্রলোক বেশ বিরক্ত হলেন, “কতদিন আর ওখানে বসবে! এবার নিজের জীবনটা একটু গোছাও। বিয়ে-শাদী তো করা লাগবে, না কি?”
সাকিন কোনো উত্তর দিল না। হীরা চৌধুরী তাতে নাখোশ হলেন।
“কথা বললে উত্তর দিবা, বুঝতে পেরেছ?”
“জী চাচা।”
“শোনো, চাকরি-বাকরি কিছু খোঁজ। আমার পরামর্শ যদি নাও, তাহলে ওই বাড়ি ছাড়ো। বাইরে বের হও, দুনিয়া দেখো।”
“জী।” সাকিন উপর-নিচে মাথা দোলালো।
ভদ্রলোক বিরক্ত হলেন। ছেলেটার সাথে কথা বলে বিশেষ আরাম নেই। নিজে থেকে কিছুই বলে না। কেবল প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়। তিনি দ্রুত চা শেষ করে লন মোয়ার নিয়ে এলেন। তার অন্যতম কাজ—উঠানের এই ঘাস ছাটাই করা।
সাবিহা ছেলেকে সাকিনের কাছে দিয়ে বলল, “সকালে কী খাবা ভাইয়া?”
“যা রান্না করবি, তাই খাবো।”
“না, তাও একটা কিছু বলো।”
সাকিন না করতে গেলেও বিশেষ সুবিধা হলো না। সাবিহা তার মুখ থেকে একটা খাবারের নাম না শুনে যাবে না। সাকিন দম ছেড়ে বলল, “বাড়িতে আচার আছে?”
“আছে আছে!”
“তাহলে একটু খিচুড়ি রান্না কর।”
সাবিহা তাই করল। সাকিনের নিয়ে আসা মাটির থালা-বাসনে তাকে খেতে দিয়ে বলল, “তুমি একটু মজা করে খাও ভাইয়া। আমি দেখি।”
সাকিন বেশ অস্বস্তি বোধ করছিল। সাবিহা দেখব বলে একদৃষ্টে তাকিয়েই আছে। সাকিন বিরক্ত হয়ে বলল, “চোখ সরা তো!”
“না, আমি দেখব। এক বছর পরপর আসো তুমি। তোমার চেহারাই তো ভুলে যাই।” সাবিহা মোটেও চোখ সরালো না।
যেই দুটো দিন সাকিন থাকলো, সে দুদিনে রিফাত তার মাকে প্রায় ভুলেই গেলো। এই নিয়ে সাবিহার দুঃখের শেষ নেই। তার কোল ছাড়া যে ছেলে নিশ্বাস নিতে চায় না সে মামাকে পেয়ে তাকে চোখেই দেখছে না। ওর সম্ভবত খুব একটা ক্ষুধাও লাগছে না। কেননা তাকে খাওয়াতে গেলেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠছে।
সাবিহা চেয়েছিল সাকিনকে আটকে রাখতে। কিন্তু সে থাকল না। যাবার আগে কেবল সাবিহার মাথায় হাত রেখে বলল, “আমার জন্য দোয়া করিস।”
প্রতিবার সাকিন চলে যাওয়ার সময় এমন হয়। সাবিহা মুখ ফুটে কথা বলতে পারে না। এবারও পারল না। ঠোঁট চেপে কেবল সাকিনের পথে মিলিয়ে যাওয়া দেখল।
কুন্দকলি থেকে বেরিয়ে যাবার কালেও সাকিন জানত না উত্তর-দক্ষিণ দুদিক দিয়েই তার জন্য প্রবল প্রলয় অপেক্ষা করছে।
*****
ফরিদ আহমেদের কোচিং সেন্টারের নাম ‘ভিশন কোচিং সেন্টার’। তার কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সায়েন্সের সবজেক্টগুলো তিনি দেখান। ছাত্র আনাগোনাও বেশ। জনা পঞ্চাশেক তো হবেই। একটা ঘরে কুলিয়ে উঠতে পারেন না বলে এই গতমাসেই দুটো ঘর দেখে ভাড়া নিলেন। ওদিকে ভাড়া দিতে যেয়ে আরেকজন টিচার রাখার আর উপায় রইলো না। ভেবেছিলেন মেয়েটাকে এ বেলায় একটু রেহাই দেবেন। তা আর হলো না। নিয়ম করে ওকে দুটো ক্লাস নিতেই হচ্ছে।
ফাবিহা যখন ফার্স্ট ইয়ারের কেমিস্ট্রি ক্লাস নিচ্ছে—তখন ঘড়িতে তিনটে বেজে বিশ। আরও চল্লিশটা মিনিট ওদের সামনে বকবক করে যেতে হবে। কিন্তু আজ মনটা মোটেই সায় দিচ্ছে না। বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় নূরজাহানের শুকনো মুখ দেখে এসেছে সে। জিজ্ঞেস করেছিল—কী হয়েছে। নূরজাহান কেবল শুকনো একটা হাসি হাসলেন। চেহারাখানি দেখে মনে হলো—কতদিনের পুরনো রোগ এবার যেন ছাপ ফেলতে শুরু করেছে। কিন্তু তেমন কিছু তো নয়। এই সেদিনই ফরিদ-নূরজাহান দুজনেই রেগুলার চেকাপ করিয়ে এসেছেন। সব ফিট। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ফাবিহার মনে অদৃশ্য একট কাঁটা খচখচ করে। বহু হাতড়েও সেটা খুঁজে পেলো না সে।
এরই মাঝে আয়োজন করে মেঘ ডাকতে ডাকতে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে পড়ল। ফাবিহা এ পর্যায়ে একটা ফাঁকিবাজি করল। সামনে বসে থাকা তেইশ জনকে একটা ব্যতিক্রমী ইকুয়েশন করতে দিয়ে সে জানালার ধারে চলে গেলো। লোহার শিকগুলো তৃষ্ণার্তের মতো বৃষ্টিবিন্দু শুষে নিচ্ছে।
বাইরে ইতোমধ্যেই সঙ্গীত শুরু হয়ে গেছে। মেঘের গর্জন ব্যতীত বৃষ্টির নিজস্ব কোনো আওয়াজ নেই। প্রকৃতির অনুষঙ্গে মিশেই সে একেক সময় একেক রকম আওয়াজ তৈরি করে।
নারিকেলের চিরল পাতার বৃষ্টির ফোঁটা যে শব্দ তোলে তা কচু পাতার সুরের সাথে একেবারেই মেলে না। তাল গাছের পাতায় বৃষ্টির লয় আবার একদম ভিন্নরূপ নেয়। তার চেহারা বদলে যায় পুকুরের পানিতে ডুব দেয়ার সময়।
উত্তর শ্রাবণে বর্ষণের যে অপূর্ব মূর্ছনা তৈরি হয়েছে, কার সাধ্যি অবিকল সে সুর তৈরি করে!
তবু ফাবিহা ডুবে যেত পারল না। এই ভেজা বাতাসেও থেকে থেকে তার মানসে নূরজাহানের শুকনো চেহারাটা ডুবসাঁতার খেলতে থাকল।
ক্লাসটা শেষ হতেই ছোট খালা ফোন দিলেন। তার কন্ঠ ভারী মিষ্টি। মিষ্টি স্বরেই তিনি বললেন, “মা, সজীবের কোন বন্ধুর বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে। তোকে নিয়ে যেতে চায়।”
চট করে ফাবিহার চমৎকার মেজাজটা নষ্ট হয়ে গেলো। বড়দের সাথে খারাপ ব্যবহার করা তার স্বভাবে নেই। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে বলল, “দুইদিন পরপর এমন ঘোরাঘুরি আমার ভালো লাগে না খালামনি। বিয়ে করতে চাইলে করতে বলো, না হলে ছাড়তে বলো। এই ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা আমার একেবারেই পছন্দ না।”
“কী বলিস এসব! ওর সামনে খবরদার এসব কথা বলবি না! ভাববে আমরা হাভাতের মতো করছি, পছন্দ হয়েছে বলে ঘাড়ে উঠে যাব নাকি? একটু দাম দেখাতে হবে। নাহলে একেবারে পেয়ে বসবে।”
“তার বন্ধুর বাড়িতে যেয়ে আমাকে দাম দেখাতে হবে? অদ্ভুত সব কথা বলো খালামনি! যখন যেখানে নিয়ে যেতে চাচ্ছে, ব্যাগ হাতবদল করার মতো আমাকে ধরিয়ে দিচ্ছ। এই তোমাদের দাম নেয়া?”
“তো, আবদার করলে একটু রাখতে হয় না?”
ফাবিহা উত্তর দিল না। তার মেজাজ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে।
“শুনছিস তুই? হ্যালো, ফাবিহা?”
“শুনছি। বলো।”
“তোর মা বলল তুই কোচিংয়ে। যা বাড়ি যেয়ে তৈরি হয়ে নে।”
ফোন রাখার আগে ফাবিহা বলল, “খালামনি, সজীব ভাইয়ের সাথে আমার চিন্তা-ভাবনা একেবারেই মেলে না। তাকে..”
“খবরদার এসব কথা মুখে আনবি না! সারা পাড়ার মানুষ, আমার বাপের-বাড়ি, শ্বশুর-বাড়ি—সবদিকে জানাজানি হয়ে গেছে যে তদের বিয়ে হবে। এখন একটু এদিক সেদিক হলেই তোর কী হবে ভেবেছিস? বিয়ে ভাঙা মেয়ের সাথে কী হয় তা তো জানিস না। যা, ভালোয় ভালোয় থাকবি ওর সাথে।”
যাওয়ার আগে বাবার সাথে দেখা করে গেল ফাবিহা। ফরিদ আহমেদ সব শুনে চিন্তিত কণ্ঠে বললেন, “রাত হবে নাকি?” তার চেহারায় অসন্তোষের ছায়া।
“বাবা!” ফাবিহা নিচু কণ্ঠে ডাকল।
“বল মা!”
“সজীব ভাইকে নিষেধ করে দেয়া যায় না?”
ফরিদ আহমেদ সাথে সাথেই কিছু বলতে পারলেন না। ছয় মাস আগে তার মাইনর স্ট্রোক হয়েছিল। তখন সজীবের বাবা উদ্যোগী হয়ে তার পেছনে পানির মতো টাকা খরচ করলেন। সুস্থ হয়ে, অনেকদিন পর যখন সে টাকা ফরিদ ফিরিয়ে দিতে চাইলেন—সজীবের বাবা লজ্জালু কণ্ঠে ফাবিহার আবদার করলেন। তার শ্যালিকা প্রভাবক হিসেবে কাজ করল।
তখন কিছু মনে হয়নি। আজ, এই ঝোড়ো বিকেলে মনে হলো—তিনি সেদিন মেয়েটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন।
ফাবিহা বিষণ্ন মনে বাড়ি ফিরল। আকাশের চেহারা দেখে তার হঠাৎ করে মনে হলো—আজ রাতে প্রচণ্ড ঝড় হবে।
চলমান~
(আজকের পর্বটা কেমন খাপছাড়া হয়ে গেল, না? মন কেমন অস্থির হয়ে ছিল সারাদিন। স্থির মস্তিষ্কে কিছু চিন্তা করতে পারিনি। আপনাদের অপেক্ষা করাতেও ইচ্ছে করে না।
এলোমেলো পর্বের জন্য দুঃখিত।)