#বনজোছনা
৭.
ফাবিহা নিজের ঘরে অনেকক্ষণ ধরে বসে রইলো। অদ্ভুত এক ভয় তাকে ভেতর থেকে আক্রমণ করছে। ভয় সবসময় অজানাকে ঘিরেই হয়। সেই অজানাকেই ছুঁতে পারছে না ফাবিহা। মায়ের কাছে খানিকক্ষণ বসে থেকে এসেছে। কিন্তু তার ভঙ্গুর চেহারার দিকে তাকিয়ে ভয় নিবারণের কোনো ওষুধ খুঁজে পায়নি। এর মাঝে ছোট খালা আরও একবার ফোন দিয়ে তাড়া দিলেন। আজ সজীব একবারও ফোন দেয়নি। খালাকে মিডিয়া বানিয়েছে। কেন?
কতক্ষণ ধরে সে আলমারির পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে আছে—ফাবিহা জানে না। সিমি এসে ধ্যান না ভাঙালে ওভাবে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত সেটাও বলা যাচ্ছে না।
সিমি অবাক হয়ে বলল, “কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন! কী খুঁজেন এখানে?”
“কতক্ষণ ধরে?” ফাবিহার কন্ঠে বিভ্রান্তি।
সিমি চিন্তিত কোন বলল, “কী হয়েছে ছোট আপা? কোথাও যাবেন?” সিমি সুন্দর করে জিজ্ঞেস করল। মেয়েটার বাচনভঙ্গি সুন্দর। এ বাড়িতে সে এসেছে ছয় মাসের বেশি হবে না। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের বাড়িতে কাজ করত। তিনি তাকে খানিকটা পড়িয়েছেন বলেও শুনেছে সে। কথা বলার এ ধরনটা তারই উপহার।
“হুঁ।”
“কোথায়?”
“সজীব ভাইয়ের সাথে।”
সিমির মুখে কেমন ছায়া ঘনালো ফাবিহা দেখতে পেলো না। কেননা আকাশের শোকে ঘর আক্রান্ত হয়েছে।
“শাড়ি পরবেন?”
“না। এমনি জামা পরব।”
সিমি তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই উদ্যোগী হয়ে জামা বের করল। গতকালই সব ধুয়ে ইস্ত্রি করে রেখেছে।
ফাবিহা সবসময় বিশাল ঘেরের গোল জামা পরে থাকে। লম্বায় সেগুলো প্রায় গোড়ালি পর্যন্ত। সে জামার ফাঁক দিয়ে চুড়িদার লুকোচুরি খেলে। চুড়িদারের সাথে মিল করে একটা ওড়না সবসময়ই তার মাথায় দেখা যায়।
তার বেশিরভাগ জামাই ওরকম। বাড়িতে পরার জন্য কিছু সালোয়ার-কামিজ অবশ্যি আছে। তবে বাইরে যাওয়ার সময় তাকে কদাচিৎ অন্য পোশাকে দেখা যায়।
তেমনই নীল রঙের একটা সেট বের করে দিলো সিমি। ওটা ফাবিহার পাশে রাখতেই সে খপ করে সিমির হাত ধরে বলল, “ভয় করছে সিমি।”
সিমি ভীষণ অবাক হলো। ফাবিহার কন্ঠ সচরাচর এমন শোনা যায় না।
“কীসের ভয়?”
“বুঝতে পারছি না। যাওয়াটা ক্যানসেল হলে মনে হয় ভালো লাগতো।”
“তাহলে দুলাভাইকে ফোন দিয়ে বলেন, আপনার শরীর খারাপ।”
“বলা গেলে বাবাই বলতো। মনে হয় বলা যাবে না।” ফাবিহা দুপাশে মাথা নাড়ল।
সিমির ভীষণ মায়া হলো। তার ইচ্ছে হলো—ছোট আপার মন থেকে সব ভয় দূর করে দিতে। কিন্তু সে উপায় তার জানা নেই।
ফাবিহার ফোন বেজে উঠল। সে বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে দেখল ছোট খালার কল। ফোনটা সাইলেন্ট করে সে সিমিকে বলল, “তুই যা, আমি গুছিয়ে নিই।”
গোছানোর কথা বললেও ফাবিহা টেবিলে বসল। ওর গাঢ় খয়েরি মলাটের ডায়েরিটা বের করে ধীর ভঙ্গিতে লিখতে শুরু করল।
“ফাবিহা,
কিছু একটা ঠিক নেই। কিন্তু ভুলটা কোথায়—এটাও ধরতে পারছ না। সুতরাং অযাচিত চিন্তাকে মনে বাসা বাঁধতে দেয়ার দরকার নেই। ওরা শুধু মাকড়সার দুর্বল ঘরের মতো ধুল জমাবে। তারচে আসো, চিন্তা করি—আম্মুর কী হয়েছে।”
লেখাটা লিখেও খুব একটা শান্তি পেলো না ফাবিহা। দুমিনিট ডায়েরিতে মাথা ঠেকিয়ে বসে থেকে চট করে উঠে পড়ল। রেডি হয়ে সোজা ফারদিনের ঘরে চলে গেল। সে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। তার শূন্য দৃষ্টি জানালার দিকে।
“ভাইয়া, আমি এক জায়গায় যাচ্ছি। আমাকে কি তুই নিয়ে আসতে পারবি?”
ফারদিন কোনো উত্তর দিল না। ফাবিহার দিকে তাকালোও না। ফাবিহা ফিসফিসিয়ে বলে গেলো, “আমি মেসেজ দিলে, আমাকে একটু নিয়ে আসিস।”
ফারদিন জানতো না, এমন আবদার ফাবিহা আর কোনোদিন করবে না। জানলে হয়তো এই আবদারের মানটা রাখত। কে জানে!
আধা ঘণ্টার মাঝে সজীব বাড়ির সামনে উপস্থিত হলো। তার ফিটফাট বেশভূষায় স্ফূর্তির ভাব প্রকট। ফাবিহাকে দেখে সে একটু বিরক্ত হলো বৈ কি!
কণ্ঠে সে বিরক্তি লুকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বলল, “তোমার কি একটা ভালো শাড়ি-টাড়ি নেই? বন্ধুর বিয়েতে কেউ এভাবে যায়?”
“আমি বাইরে সাজি না।”
সজীব চরম বিরক্ত হলো, “সাজোটা কোথায়! শোনো ফাবিহা, এমন আলগা ভাব দেখাবে না আমার সাথে। তোমাকে পছন্দ করি মানে এই না যে আমার সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করবে।”
ফাবিহা থমথমে কণ্ঠে বলল, “আমি কি তাহলে চলে যাব?”
এবার ক্ষেপে গেলো সজীব, “এই তোমাকে যেতে বলেছি কখন! আমার সাথে দেখা করতে আসার সময় অ্যাটিটিউড বাড়িতে তালা দিয়ে আসবে। যত্তসব..!” নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো সে। ফাবিহার সাথে এর আগে কখনও এমন রুক্ষ ব্যবহার করেনি সজীব।
ফাবিহার মন কিছুটা আক্রান্ত হলো। সে শুকনো চোখে সামনের লোকটার দিকে তাকিয়ে ভাবার চেষ্টা করল—এই লোকটার সাথে তাকে আজীবন থাকতে হবে।
ভাবনাটা তাকে মোটেও স্বস্তি দিলো না।
সজীব তার বাবার প্রাইভেট নিয়ে এসেছিল। গাড়িতে তারা দুজন ব্যতীত কেউ নেই। ড্রাইভার যদিও ছিল। তাকে মাঝপথে হাওয়া খেতে পাঠিয়ে দিয়েছে সজীব। ফাবিহার সাথে একটু একান্ত সময় কাটানোই তার ইচ্ছে।
গাড়ি চালাতে চালাতে সজীব নরম কণ্ঠে বলল, “ফাবিহা, তুমি সবসময় আমার পছন্দের বিপরীত কাজ করো। এর কারণটা জানতে পারি?”
ফাবিহা ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, “কোনো কারণ নেই, সজীব ভাই। আপনার পছন্দ আমার পছন্দের সাথে ভুল করেও কখনও মেলে না। এজন্য আমি যেটাই করি সেটাই আপনার বিপরীতে যায়।”
“আজকে তোমাকে ড্রেস নিয়ে সামান্য একটা কথা বললাম। তুমি চাইলে তখনই যেয়ে বদলে আসতে পারতে। সেটা না করে আমার মুখের উপর জাস্ট না বলে দিলে। এটা কি তোমার উচিত হয়েছে?”
“সজীব ভাই, আমি বাইরের মানুষের সামনে সাজতে পছন্দ করি না। আমাদের কোনো ফ্যামিলি ফাংশনেও আপনি আমাকে সেভাবে দেখেননি। আপনার কি উচিত ছিল না আমার কমফোর্টের চিন্তাটা করা?”
“ওখানে যেয়ে এমন সজীব ভাই সজীব ভাই করবে না খবরদার!” চোখমুখ কুচকে বলল সজীব। “নাম ধরে ডাকতে পারলে ডাকবে, নাহলে চুপ করে থাকবে।”
সজীব প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে ফাবিহাও আর সেসব নিয়ে কথা আগানোর প্রয়োজন মনে করল না।
বিশাল এক কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজন করা হয়েছে। এক দেখায় ওটার আয়তন আন্দাজ করতে পারল না ফাবিহা। উপর-নিচ মিলিয়ে ঘর না হলেও পঞ্চাশটা তো আছেই। বিশাল জাঁকজমক অনুষ্ঠান। তাকালেই চোখে ধাঁধা ধরে যায়। তার বিস্ময় কাটালো সজীবের স্ফূর্ত কণ্ঠ। সে খুব আমোদর সাথেই জানালো, মেইন প্রোগ্রাম শুরুই হবে রাত আটটা থেকে। ফাবিহার অজ্ঞাত ভয়টা এই প্রচণ্ড আলোকসজ্জার মাঝেও নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে ভুলল না। এক ঘর লোকের মাঝে সে সজীবের সাথে সাথে থাকতে চাইলো, এই প্রথম।
এদের রীতিনীতি একেবারেই আলাদা। ফাবিহা এ যাবৎকালে যতগুলো বিয়েতে ছিল সবগুলোতেই—ঘরোয়া গায়ে হলুদ, বিয়ের আগের রাতে মেহেদী দেয়া আর আয়োজনের গণ্ডগোলের মাঝে এক ফাঁকে কবুল বলে ফেলা—এই ছিল আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু এখানে এসে এক ভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের সাথে পরিচিত হলো সে।
বিয়ের আগে আগে খুব গান-বাজনা শুরু হলো। সজীব তার কিছু বন্ধু এবং তাদের স্ত্রীদের সাথে ফাবিহাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এবং ফাবিহা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিল, সম্পূর্ণ অচেনা এই পরিবেশে সজীবের ‘উড বি’ পরিচয়টা তাকে একটু হলেও স্বস্তি দিচ্ছে।
মিউজিক শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া একদল ছেলেমেয়ে নাচ পরিবেশন করল। তারা সরে যেতেই ফ্লোর দখল করে নিল বরের বন্ধুরা। নিজেদের স্ত্রী নিয়ে তারা নাচতে শুরু করল, যারা সজীবের মতো ‘উড বি’ নিয়ে হাজির হয়েছে তারাও পিছিয়ে রইলো না। ফাবিহা ভয় করছিল সজীব আবার তাকে এমন প্রস্তাব দেয় কি না। কিন্তু সজীবকেই অনাগ্রহী দেখে সে স্বস্তি পেলো।
ফাবিহার চক্ষু চড়কগাছ হলো মেয়েদের হাত বদল হতে দেখে। খুব আমোদর সাথেই তারা সঙ্গী বদলে নাচতে শুরু করল। সজীব তাকে অবাক হতে দেখে বলল, “এত আশ্চর্য হচ্ছ কেন? পার্টনার সোয়্যাপিং তো এখন খুব নরমাল।”
ফাবিহা স্তম্ভিত কণ্ঠে বলল, “নরমাল!” ড্যান্স ফ্লোরে যা হচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকা মুশকিল। সে চোখ সরিয়ে বলল, “আপনার কাছেও?”
সজীবের দৃষ্টি সামনের দিকে। সে উত্তর দেয়ার প্রয়োজনবোধ করল না।
খাবারের পরপর সজীবের এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে তারা সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় গেলো। ওখানে মানুষজন নেই বললেই চলে। পরিবেশটা কেমন থমথমে। নিচ তলার মিউজিকের লিরিক্স এই অবধি পৌঁছাতে পারছে না। আসছে কেবল বিটগুলো। ফাবিহার গা কেমন ছমছম করে উঠল। এখানে এসেই ফারদিনকে ঠিকানা লিখে পাঠিয়েছিল সে। এ যাত্রায় আবার মেসেজ পাঠালো—ভাইয়া, আমাকে একটু নিয়ে যা প্লিজ!
পনের মিনিট পর বন্ধুকে দেখা গেলো একটি মেয়ের সাথে। সজীব ইশারা করে বলল, “ভাবি?”
“নোপ। গার্লফ্রেন্ড। এক্সপেরিমেন্ট চলছে।” তার এক চোখ টিপে বলা কথাটা শুনে ফাবিহার গা গুলিয়ে এলো। অথচ মেয়েটাকে দেখল বেশ হেসে হেসে সে কোথায় সায় জানাচ্ছে।
সে বন্ধুটি ফাবিহার প্রতি জিজ্ঞাসু নজরে তাকালে, একদম আচমকাই সজীব তার কাঁধ পেঁচিয়ে ধরল। গর্বিত কণ্ঠে বলল, “আমার এক্সপেরিমেন্ট শেষ। ওর অনার্সটা শেষ হলেই বিয়ের দাওয়াত পাবি।”
একটা দুর্বোধ্য ইশারা দিয়ে সে বন্ধুটি চলে গেলো।
ফাবিহা যেন এতক্ষণ ঘোরের ভেতর ছিল। সজীব কখনও তার হাত ধরার সাহসও করেনি। মূলত সে-ই সুযোগ দেয়নি। আজ আচমকা এমন আক্রমণে বিহ্বল হয়ে গেলো ফাবিহা। পরপর তার বলা কথাটা কানে ঝনঝন করে বেজে উঠল—আমার এক্সপেরিমেন্ট শেষ..!
ছিটকে ওর থেকে দূরে সরে গেলো ফাবিহা। চাপা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, “এটা কী বললেন আপনি!” কাঁধে হাত দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করার মতো করে সজীবের স্পর্শ ঝেড়ে ফেলতে চাইলো সে। কিন্তু অত সহজেই সেটা উঠল না।
দৃশ্যটা দেখে সজীবের মাথায় আগুন ধরে গেল। ফাবিহার হাত শক্ত করে ধরে বলল, “কী বলেছি!” সজীবের চোয়াল দেখে ভয় পেলেও নিভে গেলো না ফাবিহা।
কাঠকাঠ কণ্ঠে বলল, “এক্সপেরিমেন্ট শেষ মানে কী?”
সজীবের চেহারায় মুহূর্তেই একটা ফিচেল হাসি খেলে গেলো, “বন্ধুকে বলেছি। ও বুঝলেই হলো। তোমার এত কী?”
ঝাঁঝালো কণ্ঠে ফাবিহা বলল, “আমাকে অসম্মান করে কথা বলার সাহস হয় কীভাবে আপনার!” ফের কাঁধে হাত দিতে গেলেই ওর হাত শক্ত করে চেপে ধরল সজীব। কটমট করে তাকিয়ে বলল, “আমি হাত দিয়েছি, তাই কি কাঁধ খসে গেছে? তোমার এই অতি সতী রূপটা জাস্ট সহ্য হয় না আমার! ইরিটেটিং!”
“ইরিটেটিং হলে বাদ দিয়ে দিন। আপনার গলায় তো কেউ ছুরি ধরেনি!” বাম হাত দিয়ে সজীবের হাত খামচে ধরলেও ওর বন্ধন একটুও টলাতে পারল না সে। ডান হাতটা সজীবের হাতের চাপে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সজীবের কণ্ঠ আরও একধাপ উঁচু হলো, “বাদ দিন বাদ দিন মানে কী? সবসময় এই আলগা ভাব দেখিয়ে কী প্রমাণ করতে চাও? তোমার পেছনে ছেলের লাইন লেগে আছে? আমি ছেড়ে দিলে তোমার ঘরের অভাব হবে না—তাই বোঝাতে চাও? নিজেকে কি উর্বশী মনে করো তুমি?”
“সজীব ভাই! ভদ্র ভাষায় কথা বলুন!”
“ভদ্র ভাষায়ই বলছি। এ পর্যন্ত ভুরি ভুরি প্রপোজাল পেয়েছি। তোমার চেয়ে হাজার গুণে ভালো। শুধুমাত্র তোমাকে পছন্দ করেছি বলেই সেসবে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করিনি। আর তোমার ভাব দেখলে মনে হয় রাজি হয়ে আমাকে দয়া করেছ।”
“হাত ছাড়ুন আপনি।”
ফাবিহার জ্বলজ্বলে চোখ আর ওর দৃঢ় কণ্ঠস্বর সজীবের রাগের আগুনে ঘি ঢাললো। ওর দুহাত বন্ধ করে বলল, “আজকে বাড়িতে যেয়েই আংটি পরবে। ফার্দার আমাকে ডাউন করে কথা বলার দুঃসাহস দেখাবে না। তোমার বাবা যে তোমাকে বিক্রি করে দিয়েছে—এটা জানো?”
“কী!” ফাবিহার অবিশ্বাস্য কণ্ঠস্বর।
“হাসপাতালে যখন মড়ার মতো পড়ে ছিল, তখন আমার বাবাই টাকা খরচ করেছে।”
“সেই টাকা বাবা ফেরতও দিয়েছে।”
“ভুল! টাকা আমার বাবা নেয়নি। তার বদলে নিয়েছে তোমাকে। বুঝতে পেরেছ?”
ফাবিহার শরীর থেকে এক নিমিষেই সব শক্তি উধাও হয়ে গেলো। এতক্ষণ ধরে ধস্তাধস্তি করতে থাকা তার হাত জোড়াও শান্ত হয়ে গেলো। এই কথাটা সে কখনও জানতে পারেনি। সে তো জানত তার খালা প্রস্তাব এনেছে, বাবা-মায়ের ভালো লেগেছে, সেও নিষেধ করেনি—এজন্যই তো আংটি বদল হলো। এত সহজ একটা সমীকরণ! এভাবে পাল্টে গেলো! তাকে নিয়ে সওদা হয়েছে! করেছে তার বাবা!
“আমার কথা কানে ঢুকেছে?” সজীব তাকে ঝাঁকি দিলো।
শূন্য দৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে তাকালো ফাবিহা। সে জানে, বাবা কক্ষনো এমন কিছু করতে পারে না। সজীবের মুখের কথায় নিজের বাবাকে অবিশ্বাস করার মতো বোকা সে নয়। নিশ্চয়ই মিষ্টি বুলিতে তাকে ভুলিয়ে বিয়েতে রাজি করিয়েছে। বাবা বোকা-সোকা। তাকে হাত করা মিনিটের বিষয়। আর সে জিনিসটাই এখন দেখাচ্ছে কি বিশ্রীভাবে! মানুষের মুখের কথায় সাদা একটা ঘটনার রং উড়ে কি জঘন্যই না হতে পারে!
এসবকিছু বাবাকে বলবে সে। এরপর নিশ্চয়ই এ বিয়ে ভাঙতে আর কোনো সমস্যাই থাকবে না! এই অসহ্য মানুষটার থেকে রেহাই পেয়ে যাবে— ভাবনাটা ফাবিহাকে অন্যরকম শক্তি জোগালো।
সজীবের হাতে আটক অবস্থাতেই সে অসম্ভব দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “সব টাকা সুদে-আসলে আপনার মুখে ছুঁড়ে দিয়ে আসব। সাথে আংটিও। আজকের এই ঘটনার পর আপনাকে আমি বিয়ে করব—এটা কস্মিনকালেও ভাববেন না।”
“কী বললে!” চোখে পলকে সজীবের হাতের থাবার নিচে পড়ে গেলো ফাবিহার মুখটা। ওর মন হলো চোয়ালের হাড় ভেঙে গুড়ো গুড়ো হয়ে গেছে।
সজীবের এক হাতে ফাবিহার দুই হাত বাঁধা। আর এক হাত পিষ্ট করছে ওর মুখ।
“মুখ দিয়ে যেটা একবার বের করেছ, সেটা দ্বিতীয়বার আর বলার ভুল করবে না! আমাকে ফিরিয়ে দিতে চাও! তোমাকেও বিয়ে করে আমি দেখিয়ে দেব। ওয়েট কর শুধু!”
ফাবিহাও সমান তেজের সাথে জবাব দিল, “আমিও আপনার মুখে থুথু দিয়ে দেখিয়ে দেব!” রাগে ওর সমস্ত শরীর জ্বলে যাচ্ছে।
কিন্তু ফাবিহা জানত না—ওর এই কথাটাই ছিল কফিনের শেষ পেরেক। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পর একটা মানুষকে যে পশুর মতো দেখায়—এটা সজীবকে দেখে হাড়ে হাড়ে টের পেলো ফাবিহা।
সজীবের সে বন্ধুটি, যার সাথে দেখা করার জন্য দোতলায় আসা—সে তখনও ওখানেই ছিল। দৃষ্টিসীমার মাঝে আসতেই বিদ্যুৎ চমকের মতো সজীবের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। ফাবিহাকে সে প্রকৃতপক্ষেই পছন্দ করে। কিন্তু আজীবন অধিকাংশ মেয়েদের মুগ্ধ দৃষ্টি তাকে এতই অভ্যস্ত করে তুলেছে যে, ফাবিহার নির্বিকার চোখজোড়া তাকে প্রতিনিয়ত অপমান করে চলে। সাথে উপরি হিসেবে তার বিয়ে না করার বায়না। আজ মোক্ষম সুযোগ পেলো ওকে আজীবনের জন্য বন্দী করে ফেলার। তৎক্ষণাৎ বন্ধুকে ইশারা করল সে। ফাবিহা বুঝতে পারল না সে কী করতে চাচ্ছে।
বন্ধুটি এগিয়ে এলে সজীব হাসিমুখে একহাতে আটকে রাখা ফাবিহাকে এগিয়ে দিলো। অসম্ভব ভদ্রোচিত কণ্ঠে বলল, “ওয়ানা সোয়্যাপ?”
ফাবিহার মনে হলো তার কান ভুল শুনছে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা যখন তাকে আপাদমস্তক পরোখ করতে শুরু করল তখন তার মনে হলো—এ সবই তার জীবনের জঘন্যতম সত্যি। যে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা সে এতক্ষণ শরীরের সমগ্র শক্তি ব্যয় করছিল, সে হাতটাই ফাবিহা প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চাইলো। হতভম্ব কণ্ঠে বলল, “সজীব ভাই!”
ফাবিহার বর্ণহীন চেহারার দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক আনন্দ ভরে উঠছিল সজীবের মন।
সামনের ছেলেটা বলল, “আমারটা তো চলে গেছে।”
“কোনো সমস্যা নেই। আজকে তোর পালা।”
সজীব তাকে এগিয়ে দিলো। ফাবিহা দুহাত দিয়ে তার হাত ধরে বলল, “এমন করবেন না সজীব ভাই! দোহাই আপনার!” তার কণ্ঠে তীব্র অবিশ্বাস।
সজীব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। তার সাপের মতো শীতল চোখে তখন অনুভূতির লেশমাত্র নেই। ভীষণ ঠান্ডা কণ্ঠে সে বলল, “আমার কথা শুনবে?”
“শুনব! আপনি এখান থেকে আমাকে নিয়ে গেলে, যা বলবেন তাই শুনব!” ফাবিহার কথা আটকে আটকে আসছে।
“আমাকে বিয়ে করতে আর কোনো নাটক করবে?” সজীবের ইশারায় তার বন্ধু ফাবিহার একটা হাত ধরল।
ফাবিহার পালানোর কোনো পথ ছিল না। তার মনে হলো দুপাশ থেকে দুটো জ্বলন্ত অঙ্গার তাকে ভস্ম করে দিচ্ছে। সে ডুকরে উঠে বলল, “এমন কিছু করবেন না সজীব ভাই! প্লিজ..!” তার কথা ইতোমধ্যেই অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
“আমাকেই বিয়ে করবে? প্রমিস করছ?” সজীবের কণ্ঠের কৌতুক একটুও টের পেলো না ফাবিহা।
সে ছেলেটার হাত থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, “প্রমিস করছি। আপনি উনাকে ছাড়তে বলুন প্লিজ!”
সজীব সন্তুষ্ট হলো না। দুপাশে মাথা নেড়ে বলল, “চ্! প্রমিস দিয়ে হচ্ছে না। অন্যকিছু ট্রাই করো..”
সজীবের বন্ধুও এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ফায়দা উসুল করতে ভুলল না। তার হাত সাঁড়াশির মতো ফাবিহার হাত আটকে রেখেছে। অক্টোপাসের মতো সে হাতটা উঠে আসতে দেখে ফাবিহা খাবি খেতে খেতে বলল, “আল্লাহর কসম সজীব ভাই! আমি আপনাকেই বিয়ে করব!”
সজীবের চেহারায় এই এতক্ষণে পুরোনো আমেজ ফিরে এলো। বন্ধুর হাত সরিয়ে দিলো সে। তারপর অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেলো। ওকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে বন্ধুর সাথে কী আলাপ করল—ফাবিহা জানে না। তার চোখের পানি শুকিয়ে গালে দাগ বসিয়েছে। সে ফোন বের করে তাতে শূন্য দৃষ্টিতে তাকালো। ফারদিন তার মেসেজ দেখে রেখে দিয়েছে।
সজীব হেলেদুলে গাড়িতে এসে বলল, “বাড়ি যেয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করার কথা মাথায় এনো না। তুমি যে আমার বন্ধুর সাথে ‘কোয়ালিটি টাইম’ স্পেন্ড করেছ—এটা আমার বন্ধুও সাক্ষী দেবে, আর আমিও। সো, এখনই বাড়ি যেয়ে ভালো মেয়ের মতো আংটি পরে আমাকে ছবি পাঠাবে।”
ফাবিহার মনে হলো—বেঁচে থাকাটাও মাঝে মাঝে অনেক বড় শাস্তি। অথচ আত্মহত্যার সহজ সমাধানে জাহান্নাম বড় একটা দাড়ি বসিয়েছে।
কাচের জানালায় বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। প্রবল বৃষ্টি।
চলমান~
(Photo credit Nusrat Jahan 🧡)