#বনজোছনা
৮.
ফরিদ আহমেদ ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দাঁড়িয়ে আছেন বললে ভুল হবে। দশ গজ সামনে যে সেগুন গাছটা এই ঝড়ের মাঝেও অবিচল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে—তিনি দৌঁড়ে দৌঁড়ে সেদিকেই যাচ্ছেন। ওখানে পৌঁছে গেলে ফিরে আবার কেচি গেটের সামনে ফিরে আসছেন। যেন ছোঁয়াছুঁয়ির এক খেলা। কিন্তু তিনি বারবার ফিরে এসেও ফাবিহাকে ছুঁতে পারছেন না। ভিজে চুপচুপে হয়ে যাওয়া ঘড়ির ডায়ালের দিকে খানিক পরপরই তাকাচ্ছেন তিনি। ইতোমধ্যেই দশটা বেজে গেছে। আর কত দেরি হবে!
সিমি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মানুষটাকে দেখে যাচ্ছে। যেভাবে ছুটোছুটি করছে—কখন না জানি উল্টে পড়ে! পেছন ফিরে সে নূরজাহানকে বলল, “খালাম্মা! খালু যেভাবে দৌড়াচ্ছে, পিছলা খেয়ে কখন জানি পড়ে যায়। খালুকে ডাক দেন। ছোট আপা আসলে তো আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে না।”
নূরজাহান ক্লান্ত ভঙ্গিতে সিমির দিকে তাকালেন। তার গলায় কোনরকম জোর অবশিষ্ট নেই। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা ভাতের বাটি বের করে বললেন, “মাথায় একটা ভূত ঢুকলে কারোর কথা শোনে? বলা না বলা সমান। তুই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।”
দশটা দশ বেজে গেলে ফোন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ফরিদ। ঘন্টাখানেক আগে ফোন দিয়েছিলেন। সজীব বলেছিল আর বিশ মিনিট লাগবে। আধা ঘণ্টা আগেও একই কথা বলেছে। ওর বিশ মিনিটের দৈর্ঘ্য আসলে কতটুকু—জানা দরকার।
ফোন বের করার আগেই সাই করে প্রাইভেট এসে থামল। ফাবিহা দেরি করল না। সাথে সাথেই বেরিয়ে পড়ল। এবং দাপুটে বৃষ্টি মুহূর্তেই তাকে ভিজিয়ে দিল। ফরিদ আহমেদ তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন। মেয়েটার মাথায় ছাতা ধরার আগেই সে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেলো। ছাতা ধরতেই বাবার বুকের ভেতর গুটিয়ে এলো ফাবিহা।
ফরিদ আহমেদ রুষ্ট চোখে সজীবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত দেরি হবে, এটা তো বলোনি বাবা!” সে বাবু সেজে গাড়ির ভেতরেই বসে আছে। অর্ধেক কাচ নামিয়ে বলল, “বিয়ের অনুষ্ঠান তো আঙ্কেল ঘড়ি ধরে শেষ হয় না।”
সেই একানব্বই সালে মাইক পাওয়েল ৮.৯৫ মিটার লাফিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল। ফরিদ আহমেদের বিরক্তি লং জাম্প দিয়ে সেই অপরাজেয় রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিলো। ক্ষোভের সাথে তিনি বললেন, “বিয়ের আগে এভাবে ঘোরাঘুরিটা অসুন্দর দেখায়। আশেপাশের মানুষ নানান কথা বলে। তুমি এমন আবদার আর কোরো না যেটা রাখতে কষ্ট হয়।” তবে দুঃখের বিষয় হলো—ক্ষোভের কথাও তিনি শক্ত কণ্ঠে বলতে পারেন না। তার সব কথাই কেমন করুন শোনায়।
সজীব নমনীয় কণ্ঠে বলল, “আর এমন হবে না আঙ্কেল! ভেরি সরি!”
ফরিদ আহমেদ বিড়বিড় করলেন, “বোধবুদ্ধি নেই! গাধার মতো গাড়িতেই বসে আছে!”
গলা উঁচু করে বললেন, “যাও বাড়িতে যাও।”
সাথে সাথেই চলে গেল সজীব।
এই এতক্ষণে মেয়ের দিকে নজর দিলেন ফরিদ। ওর গায়ের পানিতে তার নিজের পাঞ্জাবিও ভিজে গেছে। মৃদু মৃদু কাঁপছে মেয়েটা। জ্বর চলে এলো নাকি!
“ফাবিহা! মা রে!”
ফাবিহা তাকালো না। তার ইচ্ছে হলো বাবার বুকপকেটে ঢুকে দুনিয়া থেকে লুকিয়ে পড়তে।
ফরিদ আহমেদ ছাতা একটু কাত করে ধরতেই পিঠে পানি গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে আর মুখ গুঁজে থাকতে পারল না ফাবিহা। বাবা যে এত বেখেয়ালি!
রোড লাইটের ভেজা হলুদ আলোয় মেয়েকে দেখে আঁতকে উঠলেন ফরিদ। ফাবিহাকে আরেকটু আগলে নিয়ে বললেন, “চোখ দুটো লাল হয়ে গেলো কেন রে মা? জ্বর চলে আসছে মনে হচ্ছে। চল চল! ঘরে চল!”
মেয়ের কাঁপুনিকে তিনি ভাবলেন ঠান্ডার আঘাত। ফাবিহাকেও অশ্রু লুকাতে হলো না। বৃষ্টির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে ঘটনাটা বেমালুম চেপে গেলো সে।
ফরিদ ঘরে ঢুকে বেশ চোটপাট করলেন। শালীকে ফোন দিয়ে এক দফা বকাঝকা করে বললেন, “আংটি পরিয়েছে বলে যা খুশি করবে? এই রাত এগারোটায় মেয়েকে দিয়ে গেলো। এগুলো কেমন ধরনের কথা? না, তোমার কথা আমি শুনছি না আর। দুই বছর ধরে দেখা হয়নি? আর কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর আমার মেয়ে পাশ করবে? শোনো, একটা কথা ওদের পরিষ্কার করে বলে দেবে। বিয়েতে মত দিয়েছি, বেলেল্লাপনায় না। খবরদার ফাবিহাকে যদি আর কোথাও ডেকেছে!” খট করে ফোন কেটে দিলেন ফরিদ। কথাগুলো বলেও স্বস্তি পেলেন না। অতি শীঘ্রই সজীবের বাবাকে টাকাগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। হোক বেয়াই, তা বলে তার থেকে টাকা নিতে হবে কেন! সেই টাকার অদৃশ্য ক্ষমতা দেখিয়েই তো মেয়েটাকে পুতুল বানিয়ে ছেড়েছে!
প্লেট নিয়ে বসেও তার মুখটা তিক্ত হয়ে গেলো। না খেয়েই ঘরে চলে গেলেন তিনি।
•
রাত্রি তখন দুইটা পঁচিশ।
অনেকক্ষণ ধরে গোসল করার ফলে জ্বরটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সে যন্ত্রণায় ঘুমুতেও পারল না ফাবিহা। নিজেকে তার পাথর পাথর লাগছে। মনে হচ্ছে—মাথা থেকে বুক অবধি—পুরোটা পাথর হয়ে গেছে। সে ভার সহ্য করা দেহের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। পাঁচ মিনিটের বেশি একভাবে বসেও থাকতে পারল না সে।
অথচ চোখ বন্ধ করলেও একটা কণ্ঠস্বর ইথারে ভেসে আসছে।
“ওয়ানা সোয়্যাপ?”
ধপ করে উঠে বসল ফাবিহা। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বেলে টালমাটাল পায়ে টেবিলে যেয়ে বসল। নাক বন্ধ হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। অনবরত হা করে নিশ্বাস নেয়ার ফলে ঠোঁটও শুকিয়ে গেছে।
দুর্বল হাতে ডায়েরিটা বের করে সে লিখতে বসল,
“ফাবিহা,
তোমার আচরণে আমি খুবই অবাক হচ্ছি। গাড়িতে বসে তোমার সর্বপ্রথম যে সমাধানের কথা মনে হলো—সেটা আত্মহত্যা। কেন? সজীব লোকটার ক্ষমতা এতই বেশি—যে তার খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য মরতে হয়! এ জীবনটা নিঃশেষ করে দিতে হয়! জীবনের দাম এতই কম!
কক্ষণো না!
লোকটা আমাকে একটা বিশ্রী ফাঁদে ফেলেছে। শ্বাপদসঙ্কুল খাদের কিনারায় এসে হাত ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখাচ্ছে। এতই সোজা? সজীব ভাই জানে না—দুনিয়াটা এত সোজা না।
আমার অসম্ভব ভয় হচ্ছে মাবুদ! ওই জানোয়ারের হাতে তুমি আমাকে দিও না। অগ্নিগহ্বর থেকে তুমি ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বের করে এনেছ। আমি ইব্রাহিম নই মাবুদ। আমি তোমার অতি নিকৃষ্ট, পাপী এক বান্দা। ত্রুটিপূর্ণ, পেছনে পড়া একটা মানুষ। কিন্তু যেমনই হই—তোমারই তো! তোমার কোটি কোটি সৎ বান্দা আছে। আমার তো তুমি ছাড়া কেউ নেই! তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে—আমি কোথায় যাবো? আমাকে তুমি সাহায্য করো। ওই পশুর হাত থেকে রেহাই দাও।”
লেখাটা শেষ করেই কান্নায় ভেঙে পড়ল ফাবিহা। তার মাথাটা ভারহীন লাগছে। কিন্তু বুকের ভার কমছে না। কাঁদতে কাঁদতে সে টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ল।
*****
বোনের বাড়িতে থেকে ইচ্ছে মতো টাকা উড়িয়ে এসেছে সাকিন। সে যখন দুহাত ভরে বাজার করে আনতো—তখন সাবিহার চেহারায় যে হাসি ঝলমল করে উঠত—তার দাম কোনো কিছু দিয়েই মেটাতে পারবে না সে। ছোট বেলা থেকেই সাবিহার পুতুল খেলার শখ। শখ পূরণের সময় বেচারি পায়নি। মামীর আঁচলের তলায় যে পুতুল খেলা যায় না—এটা বাস্তবতাই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। তাই সংসারটা পেয়েই তা দিয়ে ফুরিয়ে যাওয়া শখটা মেটাচ্ছে সাবিহা। এর মাঝে সাকিন যখন সে খেলায় সঙ্গ দিলো—সাবিহার মনে হলো সে হাতে স্বর্গ পেয়ে গেছে।
বোনের খুশির দিকে নজর দিতে গিয়ে পকেটের চিন্তা করেনি সাকিন। ওটা সারাবছরই করতে হয়। দুদিন না করলে তেমন কিছু যাবে আসবে না। কিন্তু ফল হয়েছে এই যে—এখন মানিব্যাগের কোণায় কেবল একটা পঞ্চাশ টাকার নোট অবহেলায় পড়ে আছে।
সাকিন বাস স্ট্যান্ড থেকে ওভার ব্রিজে উঠল। এ এক অদ্ভুত জায়গা। সিঁড়িতে ভিক্ষা চলছে, উঠতেই সিমকার্ড বিক্রি, মাঝের দিকে বয়স্ক কেউ একজন ওজন মাপার মেশিন নিয়ে বসে থাকে। দু’চারজন ভবঘুরে ওখানে থাকবে না—এটা হতেই পারে না। আজকাল দেখা যায় ছেলেমেয়েদের কিছু জোড়া। ফুটপাতে যারা সুবিধা করতে পারে না তারা ব্রিজে এসে ওঠে। কিছু চিন্তক মানুষও ওখানে দেখা যায়। জবরজং ঐ ব্রিজে হেলান দিয়ে, হুশহাশ করে ছেড়ে যাওয়া একেকটা গাড়ির দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে তারা জীবনের কোন সমীকরণ মেলায়—এটা নিয়ে কোনোদিন কোনো জরিপ হয়নি। ফায়দা ছাড়া এদেশে কোনো জরিপ হয় না। আর মানুষে মন বোঝা—সবচেয়ে বড় লোকসান।
পুরোনো, একঘেয়ে সে জীবনে ফিরে যাওয়ার আগে সাকিন এক কাপ মালাই চা খেতে চাইলো। মোড়ের দোকানের মালাই চা এ শহরে বিখ্যাত। তবে এদিকে তার খুব একটা আসা হয় না।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। তিন মিনিটের মাঝেই ধোঁয়া ওঠা চা হাজির হলো।
দোকানের ঠিক পেছনে দিকে, যেখানে নোংরা ফেলা হয়—ওখানে একটা বিড়াল বসে আছে অনেকক্ষণ ধরেই। একটু ঘুরেই ওকে দেখতে পেলো সাকিন। ময়লা একটা বাটিতে মুখ দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা খাচ্ছে। সাকিন চায়ে চুমুক দিতে দিতে সেটাই দেখছিল।
এর মাঝেই, এক্কেবারে আচমকা, ভদ্র-সভ্য দেখতে একটা লোক দোকানে ঢোকার পথে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওই বাটিতে লাথি দিলো। প্যান্টের দু’পকেটে তার হাত যেমন ছিল, সেভাবেই শিস বাজাতে বাজাতে দোকানে ঢুকল। কোথাও কোনো পরিবর্তন হলো না। দোকানের ছেলেটা ক্ষিপ্র গতিতে কাঁচের গ্লাসে চা ঢেলে যাচ্ছে, পাঁচ হাত সামনেই কলা বিক্রেতা হাঁক দিচ্ছে—হালি পঁচিশ! হালি পঁচিশ! সাগর কলা মাত্র পঁচ্চিশ! ওভার ব্রিজের উপর থেকে এক জোড়া ছেলেমেয়ে বাদামের ঠোঙা ছুঁড়ে ফেলল। সেগুলো উড়তে উড়তে পড়ল আইল্যান্ডের কৃষ্ণচূড়ার মাথায়। সব স্বাভাবিক, কোথাও কোনো বিচ্যুতি নেই।
কেবল সেই নোংরা বিড়ালটা—যে আপনমনে পরিত্যক্ত একটা বাটিতে মুখ দিয়েছিল—সে নীরবে একবার লোকটার দিকে তাকালো। তারপর ছুঁড়ে ফেলা খাবারের দিকে। ওটার দিকেই তাকিয়ে রইলো। ডাকল না, নড়ল না। চুপচাপ, এক ধ্যানে শুধু ঐ ছড়িয়ে থাকা খাবারের দিকে তাকিয়ে রইলো।
দৃশ্যটা দেখে সাকিনের মনে হলো—তার বুকে কেউ ঘাই মেরে গেছে। শত মণের একটা শক্ত পাথর দৈত্যের মতো হাসতে হাসতে গলায় চেপে বসল। বিড়ালটার বৃত্তাকৃতির নিশ্চল চোখের দিকে তাকাতে পারল না সে। লজ্জায়, কুণ্ঠায়, কষ্টে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো। বহু চেষ্টা করেও চায়ে আরেকটা চুমুক দিতে পারল না সাকিন।
মিনিট খানেক থম মেরে বসে থেকে উঠে গেলো সে। অর্ধেকের বেশি চা ফেলে দিয়ে বিল পরিশোধ করে বেরিয়ে গেলো। বিড়ালটা তখনও ওভাবেই বসে আছে। বাংলাদেশে কি ও নতুন নাকি! এসবের মুখোমুখি বোধহয় আগে হয়নি।
সাকিন এগিয়ে গেছিল প্রায় দশ গজের মতো। কিন্তু সামনে তাকালেই দেখতে পাচ্ছে একটা মলিন বিড়াল মাথা নিচু করে বসে আছে। নিশ্বাস ছেড়ে সে ফিরতি পথ ধরল।
চায়ের দোকানের পাশেই বিশাল এক খাবারের হোটেল। ওখান থেকে তিরিশ টাকা দিয়ে একটা ছোট সাইজের পাবদা মাছ আর দশ টাকার ভাত নিলো। ঝোলে মাখামাখি পলিথিনটা ওই মূর্তি বিড়ালের সামনে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ওটা চোখ তুলে তাকালো। ওখানে কোনো অনুভূতি নেই। স্রেফ জিজ্ঞাসা—খেতে দেবে, তারপর লাথি দেবে। এটা তোমাদের কেমনতর খেলা?
সাকিন নড়ল না। বহু হিসাব-নিকাশ শেষে বিড়ালটা খেতে শুরু করল। সামনের পা দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে যখন ঘাড় নাড়িয়ে খাচ্ছিল তখন সাকিনের মনে হলো—এ প্রাণীগুলোকে অসহায় করে পাঠানটাও মানুষের পরীক্ষার একটা অংশ। তার উদ্ধত অহমে লাগাম ধরার পরীক্ষা।
ওভারব্রিজ পেরিয়ে সাকিন জনস্রোতে মিশে গেল। খুব সাধারণ চেহারার একটা ছেলে। আলাদা করে চোখে পড়ার মতো কোনো বৈশিষ্ট্য তার মাঝে নেই। পাঁচ সাত উচ্চতা, রোদে পোড়া গড়পড়তা বাঙালি চেহারা। চোখে বুদ্ধির ঝলক নেই, চেহারায় উদ্যম ভাব নেই। জীবন সংগ্রাম আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই। সাধারণ সে ছেলেটা জানে না—মাঝে মাঝে সৃষ্টিকর্তা খুব সাধারণ কিছু মানুষের খুব সাধারণ কিছু কাজ অসাধারণভাবে কবুল করে নেন। সেই অসাধারণত্বের মাত্রা এতখানি যে—সেটুকু অর্জন করতে বেশিরভাগ মানুষের গোটা একটা জীবন লেগে যায়।
•
পাপড়ির বয়স গত মাসেই চোদ্দ পার করে পনেরোর ঘরে এসেছে। আরও দু বছর যাওয়ার পর, এসএসসির সার্টিফিকেট গলায় ঝোলাতে পারলেই মানুষ তাকে বড় বলে একটা আলাদা মূল্যায়ন দেবে। পাপড়ি কেবল বড়ই হতে চায় না। সে পরিপূর্ণ একজন মেয়ে হতে চায়।
তার বান্ধবীদের সবার মোবাইল তো বটেই ফেইসবুক আইডিও দু’চারটা করে আছে। স্রেফ সময় কাটানোর জন্যই ওগুলো ওরা খোলেনি। ভিন্ন ভিন্ন আইডি দিতে অসংখ্য সব ছেলেদের সাথে তাদের যোগাযোগ। সবাই যে তাদের পাণিপ্রার্থী বা সবাইকেই যে তার বান্ধবীরা পছন্দ করে—তেমন কিছু নয়। তবে ইনবক্সে দু-চারটে ছেলে না থাকলে নাকি সে আদতে মেয়ে হয়ে ওঠে না। যে মেয়ের দিকে চারটা ছেলে চোখ তুলে তাকায় না তারা আবার কেমন ধারার মেয়ে?
এই তত্ত্বখানি পাপড়ি পেয়েছে তার বান্ধবীদের থেকে। ওরা যে বংশে বা অর্থে পাপড়িদের চেয়ে খুব পিছিয়ে—এমন কিছু নয়। বরং অনেকের অবস্থাই তাদের আগে। যেমন—তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বাবা ডাক্তার, মা প্রাইমারির শিক্ষিকা। সেই তারাই সুযোগ-সুবিধার জন্য মেয়েকে ফোন দিয়েছেন। কিন্তু বাবার সামনে এ কথা উচ্চারণই করতে পারবে না পাপড়ি। নিজে ব্যবহার করেন বাটন। অ্যান্ড্রয়েড ফোন তিনি দুচোখে দেখতে পারেন না, কাউকে দেখতে দিতে চানও না। গার্লস স্কুলে পড়ে, গার্লস কোচিংয়ে যেয়ে তাই পাপড়ি কোনো ইনবক্স খোলার সুযোগ করে উঠতে পারেনি। ফলে বান্ধবীরা যখন উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে—আজ দুইজন প্রপোজ করেছে জানিস! একটাকেও পাত্তা দিইনি। মেসেজ দিয়ে ফোন হ্যাং করে ফেলছে গর্ধবগুলো!
“একটু সুযোগ দিলেই পারিস!”
“ধুর! একবার বলাতেই যদি একসেপ্ট করে নিই তাহলে ভাববে ওর জন্য আমি মরে যাচ্ছিলাম। তাছাড়া, দেখতেও এমন কিছু না।”
“তা, তোর পোস্টে যখন কমেন্ট করে তুই তো এমনভাবে রিপ্লাই দিস যেন ওর অপেক্ষাতেই বসে ছিলি। কমেন্ট পেয়ে ধন্য হয়েছিস!”
চোখ মেরে অপর বান্ধবী বলে, “এটাই তো টেকনিক দোস্ত! সবাই ভাববে ওকেই প্রায়োরিটি দিচ্ছি। ইনবক্সে মেসেজ দেবে, ধর্না দিয়ে বসে থাকবে।”
ওর চোখেমুখের ঝলকানি দেখে পাপড়ির খুব ইচ্ছে হয়—কেউ ধর্না দিয়ে বসে থাকলে কেমন অনুভূতি হয়—সেটা অনুভব করতে । কিন্তু তার ওরকম কোনো সুযোগ নেই। ফলে বান্ধবীদের বৃত্তে বসে থেকেও তার নিজেকে অপর মনে হয়।
ঠিক এই খোঁচাটাই একদিন তার বান্ধবী দিয়ে বসল।
“পাপড়ির মতো এমন ম্যাদামারা মেয়ে আমি আর দুটো দেখিনি!”
পাপড়ি চরম বিব্রত হয়ে বলল, “ম্যাদামারা আবার কী?”
“পেছনে ছেলে নেই, সামনে ছেলে নেই। জীবনে একটাও প্রপোজাল পেলি না। তোর বাপ তো চুইংগামের বাবলের মতো তোর আশেপাশে বাবল বানিয়ে দিয়েছে। তারপর একদিন একটা ভুঁড়িওয়ালা সরকারি চাকরিজীবী ধরে এনে বলবে—বল মা, কবুল!” বলেই অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়েছিল ওরা।
পাপড়ির সদ্য ফোঁটা নারী সত্ত্বা তখনও কিশোরীর খোলস ছেড়ে বেরুতে পারেনি। কলির ভেতরেই সে আগামীর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু পরিবেশের চাপাচাপিতে সে আর স্থির হয়ে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে পারল না।
পাপড়ি রাগ চেপে বলল, “কে বলেছে কেউ নেই! বাড়িতেই আছে!” কেন যে তার সাকিন ভাইয়ের কথা মনে হলো—সে নিজেও জানে না। তার দৃষ্টিসীমানায় এক সাকিন ছাড়া আর কোনো যুবক ছিল না। অথচ সাকিন যে সীমানায় থেকেও নেই—এটা সে বেমালুম ভুলে গেলো।
“তাই! কে আছে? তোর উকিল বাপ?” রগড় করে বলল বান্ধবী।
“না, আমার ফুপাতো ভাই আছে। ছয় সাত বছর ধরে আমাদের বাড়িতে থাকে। আমিই পাত্তা দিই না।” এক অদ্ভুত, অজানা গর্ব তখন পাপড়ির কণ্ঠে। কথাটা বলতে পেরে প্রশান্তিতে তার বুকটা ছেয়ে গেছিল।
“তুই পাত্তা দিস না! কেলো করেছে!” একজন বললেও আরেকজন মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ইশ! বললেই বিশ্বাস করি না। খুকুমণির মতো মুখ দেখে লাইন মারার কিছু নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখিস, ফ্রক পরলে তোকে ফাইভের মেয়ে বলে মনে হয়। নাইন-টেনের কোনো ভাবই নেই। নিশ্চয়ই ছোট বোন মনে করে তুনুমুনু করে।”
পাপড়ির শরীর জ্বলে গেছিল সে কথা শুনে। ওর গ্রোথ খুব বেশি না। উচ্চতাও কম। চার ফুট দশে যেয়ে আটকে গেছে। খুব সতর্কতাভাবে ওদের সাথে নিজের একটা তুলনা করে ফেলল পাপড়ি। শারীরিক অবয়বের এমন তাচ্ছিল্য মেনে নেয়া যেকোনো মেয়ের জন্যেই কষ্টের।
“কী করলে বিশ্বাস করবি যে সাকিন ভাই হাভাতের মতো আমার পেছনে পড়ে আছে?” তার মননে-মগজে তখন নিজেকে আকাঙ্ক্ষিত নারীর কাতারে ফেলার তীব্র বাসনা।
“একদিন কোচিংয়ে নিয়ে আয়। চোখ দেখলেই আমরা বুঝতে পারি।”
এরপর থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছে পাপড়ি। সাকিন ভাই যে কোনোদিন তাকে এগিয়ে দেয়নি—এমন নয়। তবে যেদিন থেকে সে একটু তরল ব্যবহার করছে—সেদিন থেকেই উনি একেবারে দূরছাই করতে শুরু করেছেন। ক্ষোভে, কষ্টে পাপড়ির চোখে পানি চলে আসে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেও লজ্জা লাগে। এর প্রতিকার কী? বান্ধবীদের টিকটকে নারীত্বের যে সব সংজ্ঞা সে দেখেছে—সেসবের সাথে তো পাপিয়া বেগমেরই কোনো মিল নেই। তাহলে সে মিলবে কীভাবে?
এক অক্ষম আক্রোশ পাপড়ির পঞ্চদশী শরীর জুড়ে রাজ করে চলেছে। পাপড়ি না পারছে সে আক্রোশ মিটিয়ে নারী হতে, না পারছে সেটা ভুলে নিজেকে পরাজিত কিশোরী ভাবতে।
সাকিন ভাই একটু বুঝলেই তাকে আর কষ্ট করতে হতো না। একটাদিন, স্রেফ একটাদিন তার সাথে কোচিংয়ে গেলেই তাকে আর বিরক্ত করত না পাপড়ি। বান্ধবীদের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখিয়ে দিত—তার পেছনেও ছেলে আছে। সে কোনো ম্যাদামারা বালিকা নয়।
পুরো একটা দিন এজন্য তাকে খাবারও দিলো না। প্লেট গুছিয়ে সে অপেক্ষা করছিল—সাকিন ভাই তাকে একটা ডাক দেবে। তাহলেই সে উড়ে চলে যেত। কিন্তু ওই শান্তশিষ্ট মানুষটা যে এমন পাথরের মতো শক্ত—পাপড়ি কস্মিনকালেও ভাবতে পারেনি। প্রায় দুটো দিন একরকম না খেয়েই রইলো—কিন্তু তাকে একবার ডাক দিলো না বান্দা!
মনে মনে সাকিন ভাইয়ের জন্য তার একটা মায়া আছে। সাবিহা আপার জন্যেও আছে। বাবা-মা নেই ভাবলেই তো তার বুকটা কেমন লাগে। তার উপরে সাকিন ভাইয়ের চেহারাটাই ওরকম—দেখলেই মায়া লাগে। পাপড়ি ঠিক করল, বাড়িতে এলে সাকিন ভাইকে সুন্দর করে খাওয়াবে। সে দুদিন তার জন্য না খেয়ে ছিল—ভাবতেই তার মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
সাকিন এলো প্রায় আড়াইটার সময়। গোসল করে ফার্মেসিতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, সেসময় পাপড়ি দরজায় টুকটুক করে শব্দ করে বলল, “সাকিন ভাই, খেয়ে যান।”
পাপিয়া বেগম যদিও মেয়েকে বলেছিলেন সাকিনকে ডেকে ঘরে চলে যেতে, কিন্তু পাপড়ি গেলো না। মায়ের ভাতঘুমের সুযোগ নিতে ভুল করল না সে।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খেতে বসল সাকিন। খাওয়া শুরুর আগে বলল, “সবার খাওয়া শেষ?”
“হ্যাঁ।”
“আচ্ছা, তুই যা। আমি গুছিয়ে রেখে যাবো।”
পাপড়ি তবুও গেলো না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। তার ইচ্ছে হচ্ছিল, সেদিন খাবার না দেয়ার জন্য একবার সরি বলে। কিন্তু গোটা একটা দিন অভুক্ত থাকার বদলে একটা সরিই কি যথেষ্ট?
দূরে পাপড়িকে নত মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাকিনের মনে হলো, কয়েকটা দিন ওর সাথে খুব কঠিন ব্যবহার করে ফেলেছে। ছোট মানুষ, না বুঝে পাগলামি করেছে। বকলে কি আর বুঝবে? তার মনে হলো, ওর সাথে নরম করে কথা বলা উচিত ছিল। ভুলটা শোধরাতে দেরি করল না সে।
আস্তে করে ডাকল, “পাপড়ি!”
পাপড়ি চমকে উঠল। এগিয়ে এসে বলল, “জি ভাই!”
সাকিন নরম কণ্ঠে বলল, “ভাই বলে ডাকিস। ভাইয়ের মানটা রাখবি না?”
কথাটা বুঝতে পাপড়ির বেশ কিছুটা সময় লাগল। আর তারপরই তার চোখ দুটো টলমল করে উঠল। সাকিন মনযোগ দিয়ে পটলের বিচি ফেলছে। দাঁতে বাঁধলেই কট করে ওঠে। অসম্ভব বিরক্ত লাগে তার।
পাপড়ি কম্পিত কণ্ঠে বলল, “আপনি কি আমাকে একটুও পছন্দ করেন না, সাকিন ভাই?”
সাকিন হেসে মাথা ওঠাল। পাপড়ির শুকনো চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল, “পছন্দ করব না কেন পাগল? তোরা ছাড়া আমার আছেটা কে? শুধু পছন্দ করি না, তোকে, আদিলকে ভালোওবাসি।”
“এর মধ্যে আদিল কোত্থেকে এলো?”
“আসেনি, ওরা আগে থেকেই আছে। যেমন আছে মামা-মামী। আমিও তো কত বছর ধরে আছি পাপড়ি। সাত বছর হবে না? তুই মনে হয় তখন টু-তে পড়িস। আমার সাইকেলে করে স্কুলে না নিয়ে গেলে হাত-পা ছড়িয়ে কান্নাকাটি করতি, মনে আছে না?” সাকিনের চেহারায় স্মৃতির মিষ্টি ছায়া।
পাপড়ি মাথা নাড়ল, “আছে।”
সাকিন প্লেট ধুয়ে এসে দাঁড়াল। পাপড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “তখন আমি তোর যেই ভাই ছিলাম, এখনও সেই ভাইই আছি। নিজের চোখে আমি ছোট হই—এমন কিছু করিস না বোন।” বলে দাঁড়ালো না সাকিন। সোজা বেরিয়ে রাস্তায় চলে গেলো।
পাপড়ির মনে হলো তার নারীত্বের ফুল অঙ্কুরিত হবার আগেই ঝরে গেছে। তার বান্ধবীরাই বরং ছেলেদের মুখের উপর না ছুঁড়ে মারে। আর সে এদিকে বহু চেষ্টা করেও সাকিন ভাইয়ের হ্যাঁ পেলো না। মনে পড়ে, সে বলেছিল—সাকিন ভাই তার পেছনে হাভাতের মতো পড়ে আছে। কি জঘন্য মিথ্যা!
সাকিনের নরম কণ্ঠ পাপড়ির ঘায়ে মলম লাগাতে পারল না। বরং এক ছেলেমানুষী জেদের সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিলো। নিজের এমন নগ্ন অবমাননা সহ্য করতে পারল না পাপড়ি। নারী হওয়ার যে খেলায় সে নেমেছিল সেটা এক নিমিষে তার সমগ্র সত্ত্বাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলল।
চলমান~
(ছবি কৃতজ্ঞতা Toukey Tahmida Khan Showmik 🌷)