ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 9

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৯.
ফাবিহার ঘরে উঁকি দিলো সিমি। সে মগ্ন হয়ে বই পড়ছে। ফাবিহার এ চেহারাটা খুব সুন্দর। যখন মনোযোগী হয়ে দৃষ্টির সবটুকু কোথাও ঢেলে দেয়—তখন তাকে দেখায় ঠিক কোনো পুতুলের মতো। জীবন্ত পুতুল।

এ মানুষটিকে বড় ভালোবাসে সিমি। সে এ বাড়িতে এসেছে আজ পাঁচ মাস তের দিন। দিন তারিখের হিসেবে তার কখনও গড়মিল হয় না। তার আগেও এ বাড়িতে কয়েক দফায় কয়েকজন সাহায্যকারী এসেছে এবং বিদায় হয়েছে। কারো হাত খারাপ তো কারো মুখ। এ শ্রেণির মানুষদের এ দুই জায়গাটা বড় ভয়ানক। হাত আর মুখ একসাথে কারো ভালো হলে তাকে মালিকশ্রেণির লোকেরা দুর্লভ বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে।

সিমিও কিছু ব্যতিক্রম ছিল না। তাদের মুখ ফুটে চাওয়াটা মানুষ ভাবে স্পর্ধা। আর চুপচাপ কাজ সেরে ফেলাকে বলে অন্যায়। তালিকাভুক্ত যেভাবেই করুক না কেন, তাতে প্রয়োজনটা তো মরে যায় না। বরং তাদের ক্ষেত্রে একটু বেশিই জীবিত থাকে।

ছেড়ে আসা অধ্যাপকের বাড়িতে এক বছরের কাছাকাছি কাজ করেছে সিমি। লোকটা খারাপ নাকি ভালো সে জানে না। কিন্তু পড়াশোনা নিয়ে তাকে খুব অত্যাচার করেছে। একদিনেই বিদ্যার জাহাজ বানিয়ে দিতে চাইতো। তার বউটা আবার কাজের লোকের কাজ ছেড়ে পড়াটা পছন্দ করত না। মুখ চালানোটাও না। কাজেই হাত ওখানেও কিছু চলেছে। তারপর একদিন বনিবনা না হওয়ার সূত্র ধরে পত্রপাঠ বিদায়।
কাজও শ্রেণীভেদে সংজ্ঞা পাল্টায়। মালিকশ্রেণীর জন্য যেটা আবশ্যকীয় কাজ, ভৃত্যশ্রেণীর জন্য সেটা অচ্ছুৎ।

তের বছরের এ সময়টায় কাজ পেতে খুব কসরত করতে হয় না। সমস্যা হয় ষোল সতের বছর থেকে। যখন শরীর নিজেকে জানান দিতে শুরু করে। তখন তাদের মনে করা হয় ছাইচাপা আগুন। ওটা নিয়ে কেউ নিজেদের বাড়ি পোড়াতে চায় না। তাই, সিমিকে খুব একটা দেরি করতে হলো না। দুকূলে তার কেউ নেই। লতায়-পাতায় যে এক ফুপু আছেন, তার বাড়িতে ওঠার দিন কয়েকের মাঝেই এখানে চাকরি জুটে গেলো।

রান্নাঘরের পাশে ছোট্ট একটা ঘরে তাকে থাকতে দেয়া হলো। সেটাকে ঠিক স্টোররুম বলা চলে না। বেশ সাজানো গোছানো। একটা চকিও আছে। নিজের মতো একটা ফ্যানও আছে। চমৎকার আয়োজন।

প্রথম দিনই ফাবিহা তাকে বলল, “আমাকে কী বলে ডাকবি, বল তো!”

সিমি বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “কী বলব আপা?”

“এই তো, ডেকেই ফেলেছিস। শুধু আপা বলবি না, বলবি ছোট আপা। মনে থাকবে?”

“থাকবে। কিন্তু বড় আপাটা কই?”

ফাবিহা চমৎকার হেসে বলেছিল, “বড় আপাটা আসল জায়গায় চলে গেছে। দুই বছরে নিউমোনিয়ায় ভুগে দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে ফেলেছে। সেকালে ছবির চলও ছিল না। তাকে দেখা আমার ভাগ্যে হয়নি। কিন্তু সেও একটা মানুষ। আমার বোন, অথচ আমাদের কথা-বার্তা, চলা-ফেরা—কোথাও সেই মানুষটার অস্তিত্ব নেই। তোর অবাক লাগে না সিমি? মানুষ কেমন স্বার্থপর! আপা আমাদের জন্য কিছু দিয়ে যেতে পারেনি বলে আমরা তাকে মনে, মুখে কোথাও রাখছি না। তুই আমাকে ছোট আপা বলে ডাকবি, তাহলে বড় বলে যে কেউ একজন ছিল—সেটার মৌখিক স্বীকৃতি অন্তত দেয়া হবে। সময়ের চেয়ে ভয়ংকর ইরেজার আর দুটো নেই রে সিমি! সবকিছু এমনভাবে মুছে দেয়, এমনভাবে মুছে দেয়! যেন কখনও কোথাও কিছু ছিলোই না!”

সিমি অত ভারী কথা বোঝে না। তবে মরা মানুষকে প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে রাখার যে অভূতপূর্ব চেষ্টা—সেটা সে ওই প্রথম দেখেছিল।

উপরি হিসেবে ছিল ফাবিহার চমৎকার কণ্ঠ। সিমির মনে হয়, ফাবিহার কণ্ঠে মাধুর্য ঢেলে দিতে সৃষ্টিকর্তা কোনো কার্পণ্য করেননি। তার স্পষ্ট উচ্চারণ সে কণ্ঠে আরেকটু রং লাগায়। কথা শুধু ওর মুখ নয়, চোখজোড়াও বলে। মাঝারি ধরনের শান্ত মানুষটা যখন কথা বলে তখন অনুভূতিগুলো তার চোখে-মুখে ভেসে ওঠে। ফলে সে মানুষটার কথা সম্মোহিতের মতো সিমির কেবল শুনতেই ইচ্ছে করে।

তারপর আরেকদিনের ঘটনা।
ফেয়ার এন্ড লাভলির একটা টিউব গোটা একটা মাস নজরে রেখে সিমি বুঝেছে—ওটা কেউ ছোঁয়ও না। অর্ধেক তখনও বাকি ছিল। তাই জিনিসটা নষ্ট না করে নিজেই ব্যবহার করতে শুরু করল। কেউ ঠিকও পেলো না।

এর ঠিক দুদিনের মাথায় ফাবিহা একটা ছোট কৌটা এনে সিমির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই যে দেখ, এখানে ছোট্ট করে যে তারিখ লেখা আছে দেখছিস? একটা বানানোর, আরেকটা মেয়াদ শেষ হওয়ার। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে জিনিসটা নষ্ট হয়ে যায়। তারপর সেটা আর ব্যবহার করতে হয় না। করলে শরীরের ক্ষতি।” বলে ঝোড়ো হাওয়ার মতো যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই চলে গেলো। পেছনে সিমির হাতে ফেলে গেল সেই কৌটা।

হতভম্ব সিমি দুরুদুরু বুকে দেখেছিল, সেই ফেয়ার এন্ড লাভলির মেয়াদ ফুরিয়েছে আরও মাস চারেক আগেই। সিমির মনে হচ্ছিল, তার কলিজা ধরে কেউ টান দিয়েছে। এভাবে না বলেও যে সবকিছু বলে দেয়া যায়—এটা সে জেনেছে ফাবিহার থেকে। সেই তারপর থেকেই, ফাবিহা তার মনে যে জায়গাটায় গেড়ে বসল—ওই অঞ্চল এই অবধি কেউ খুঁজে দেখারও প্রয়োজন বোধ করেনি।

সেই মানুষটা কাল রাত থেকে গুম হয়ে আছে। বৃষ্টিতে ভিজে চোখমুখ ওরকম ভেঙে যায় কি না সিমি জানে না। ছোট আপা কেঁদেছে—এটাও ভাবা যায় না। তাকে এই এতদিনে কক্ষনো মন খারাপও করতে দেখেনি সিমি। হয় হাসে, নয়তো রাগ করে। এর বাইরে কিছু নয়। সে মানুষটার এমন নতুন মুখের পেছনের ভাষাটা সিমি বুঝতে পারছিল না। অকারণেই এক কাপ চা নিয়ে গেল ফাবিহার জন্য। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “ছোট আপা, আজকে ভার্সিটিতে যাবেন না?”

“না রে, রাতে জ্বর এসেছিল। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে।”

সিমি উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে গেলো। গালে কপালে হাত দিয়ে বলল, “এজন্যই ফ্যান বন্ধ করে বসে আছেন? এখনও শীত লাগে কেন? ওষুধ খাননি?”

“ফ্যানের শব্দ ভালো লাগে না। ওষুধ খেয়েছি। জ্বর আর নেই। তুই বস তো, মাথাটা একটু টিপে দে।”

সিমিকে বিছানায় বসিয়ে ঝট করে তার উরুতে শুয়ে পড়ল ফাবিহা। সিমি চিন্তিত চেহারা তখনও ফাবিহার চোখ-মুখের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। ঠিক সন্দেহী দারোগার মতো।

ফাবিহা আচমকা বলল, “নামাজ পড়তে পারিস, সিমি?”
সিমি একটু লজ্জা পেলো। সে নামাজ-কালাম খুব একটা পড়ে না। তবে পারে না যে এমন নয়। নতমুখে বলল, “পারি।”
ফাবিহা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “এটা একটা বিরাট ভুল কথা সিমি। আমরা অধিকাংশ মানুষই নামাজ পড়ার নামে ওঠা-বসা করি। আসল কাজটাই করি না।”

“আসল কাজটা কী, ছোট আপা?”

“মনটাকে ফেরানো। আমাদের মুখ চলে। গড়গড় করে মন্ত্রের মতো সূরা পড়ে যাই। ওতে কোনো প্রাণ থাকে না। ওতেই আমাদের লাভ। সালাম ফিরিয়েই আবার দুর্নীতি করা যায়, মানুষ মারা যায়। বেশি ভাবলই বরং আমাদের ক্ষতি।”

সিমি ফাবিহার কপালে হাত বুলিয়ে দিলো। ছোট আপা মাঝে মাঝেই অদ্ভুত সব কথা বলে। সে যে সব বোঝে—এমন নয়। তবে শুনতে ভালো লাগে।

“নিজেকে মাঝে মাঝেই খুব মূর্খ লাগে সিমি। নামাজে কী যে পড়ি, দুই একটা শব্দ ছাড়া কিছুই বুঝি না। মনে হয় অন্ধ মানুষ হাতিয়ে মরছে।”

“তাহলে আরবী শেখেন আপা।”

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফাবিহা বলল, “অনেকবার ভেবেছি। কিন্তু তারপর আবার নানা কাজে তলিয়ে যাই। দুনিয়াতে খুব মজে গেছি রে!”

অনেকক্ষণ নীরবতার পর সিমি নিচু কন্ঠে বলল, “কালকে কিছু হয়েছিল, ছোট আপা?”

“কী হবে?” ফাবিহার স্বাভাবিক কণ্ঠ।

“বিয়ে বাড়িতে?”

“গেলাম, খেলাম, এলাম। এই তো। কেন?”

“আপনার চোখ-মুখ কেমন যেন লাগছিল।” সিমির কণ্ঠে দ্বিধা।

“এখনও লাগছে?”

“না।”

“অনেকদিন পর বৃষ্টিতে ভিজেছি তো। অদ্ভুত বৃষ্টি।” ভাবুক কণ্ঠে বলল ফাবিহা।

“খালু তো অনেক ক্ষেপে গেছে। বলল বিয়ের আগে আর এমন ঘোরাঘুরি যেন না করে।”

ফাবিহা হাসল, “বাবা যে রাগতেও পারে না।” সে উঠে বসল। মাথা ব্যাথাটা কমে গেছে।

সিমি ইতস্তত করে বলল, “একটা কথা বলি, ছোট আপা?”

“বল।”

“আপনার যদি অমত থাকে, তাহলে জোর করে বিয়ে করবেন না। আমার আব্বাকে আম্মা একটুও পছন্দ করত না। যতদিন বেঁচে ছিল, সবসময় শুধু ঝগড়া, ঝগড়া আর ঝগড়া।” বলেই সিমির মনে হলো ছোট মুখে অনেক বড় কথা বলা হয়ে গেছে। এতটা বলা উচিত হয়নি। সে ঠোঁট টিপে দুরুদুরু বুকে বসে রইলো।

ফাবিহা স্মিত হেসে সিমির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “আমাকে এত ভালোবাসিস কেন সিমি? আমি তো মোটামুটি খারাপ ধরনের একটা মানুষ।”

অনাকাঙ্ক্ষিত প্রগলভতায় সিমির চোখে জল এলো। এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনে সে মাথায় রাখার মতো হাত বড় একটা পায়নি।

চাপা কণ্ঠে সে বলল, “আপনি অনেক চাপা মানুষ, ছোট আপা। কিছুই বলতে চান না।”
ফাবিহা কেবল হাসল। কোনো উত্তর দিলো না।

•

ফরিদ আহমেদ দুপুরের খাবার বাড়ি এসে খেয়ে যান। আজ সুযোগ পেয়ে বাবা সাথে আড্ডা বসালো ফাবিহা।

“তোমার লেখালেখি কেমন চলছে, বাবা?”

ফরিদ আহমেদ প্রাঞ্জল কণ্ঠে বললেন, “চলছে তো, আলহামদুলিল্লাহ্। ভালোই চলছে। তুই কোন গ্রুপ-ট্রুপে পোস্ট দিতি, সেখান থেকে বেশ কিছু মানুষ জুটে গেছে।”

“ফলোয়ার কত হলো?”

“একশ তিপ্পান্ন।” লাজুক কণ্ঠে বললেন ফরিদ।

“একমাসের হিসেবে খারাপ না। যে ছবিগুলো দিয়েছিলাম, সেগুলোসহ পোস্ট দিচ্ছ তো?”

“হ্যাঁ। কিন্তু বড় কম মানুষ পড়ে রে মা! ইদানীং মনে হয় লেখক খুব বেড়েছে না রে? তাদের দেখি হাজার হাজার পাঠক।”

“তুমি তো বাবা নতুন পেইজে খুলেছ। এজন্য মানুষ কম। একটা দুটো গল্প শেষ হোক, তারপর দেখবে তোমারও হাজার হাজার পাঠক হবে, ইনশাআল্লাহ্।”

ফরিদ আহমেদের ভীষণ ভালো লাগে। চলমান গল্পটা তিনি খুব মন দিয়ে লিখছেন। পত্র-পত্রিকার নিরবচ্ছিন্ন প্রত্যাখ্যানের পর মনটা একেবারে মরে গেছিল। সেই মরা নদীতে আবার জোয়ার এসেছে। ‘নওরোজ’ কম-বেশি চল্লিশ জন পড়ছে। অবশ্য মন্তব্য করে হাতে গুণে কয়েকজন। ফরিদের বড় আনন্দ হয়। খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের মন্তব্য পড়েন তিনি। ফিরতি উত্তর দেন। জায়গাটা তার চমৎকার লেগেছে। মুক্ত পাখির মতো কেমন উড়ে বেড়ানো যায়!

সেদিন বিকেলে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

ঘরে বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় ফাবিহা একটু আগেই কোচিংয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। ফিরে এলো একটু দেরিতে। রিকশার বদলে পাজোড়া সম্বল করায় সময় খানিকটা বেশি বিনিয়োগ করতে হয়েছে। সময়টা অবশ্য মন্দ কাটেনি। বা হাতের অনামিকা আঙুলটা নজরান্দাজ করলেই বাকি সব চমৎকার।

বাড়িতে যখন সে ঢুকল তখন দিনের পর্দা নামছে। গোধূলীর নরম আলো বিদায় নিচ্ছে ধরণীর বুক থেকে। দৃশ্যটা দেখতে দেখতে তার ফারদিনের কথা মনে পড়ল। বুকটা কামড়ে উঠল সাথে সাথেই। ফারদিন যদি সেদিন যেত…!

ফাবিহা ভেবেছিল একবার ভাইয়ের মুখোমুখি হবে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই নূরজাহানের আতঙ্কিত, রক্তশূন্য মুখটা তাকে বিচলিত করে তুলল। সে তড়িৎ গতিতে এগিয়ে যেয়ে বলল, “কী হয়েছে, আম্মু? শরীর খারাপ লাগছে?”

নূরজাহানের গলায় তখন মরুভূমির শুষ্কতা। তিনি বিভ্রান্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, “ফাবিহা..!”

“বলো আম্মু! কী হয়েছে?”

নূরজাহান কিছু বলতে পারলেন না। মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে, মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলেন। ফাবিহা তাড়া দিলো না। নিজেকে সামলে নেয়ার সুযোগ দিলো। কিন্তু প্রায় দশ মিনিট পেরিয়ে গেলেও টু শব্দটি করলেন না নূরজাহান।

ফাবিহা গা ঝাঁকি দিলো, “আম্মু!”

“কিছু হয়নি। বিয়ের তারিখটা কি এগিয়ে আনতে পারিস?”

ফাবিহা অবাক হয়ে তাকালো, “কী?”

“বিয়ে যখন হবেই—অত দেরি করার কী দরকার? তুই সজীবকে একটু বল।”

ফাবিহা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। নির্বোধ কণ্ঠ বলল, “আমি?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি কি পাগল হয়েছো আম্মু? সজীব ভাইকে আমি বলব, আসুন তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেই?” বিস্মিত কণ্ঠে বলল ফাবিহা।

নূরজাহান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে ফাবিহা বলল, “তোমার কী হয়েছে, সেটা আগে বলো। আমার বিয়ে নিয়ে মুখ-চোখ সাদা করোনি নিশ্চয়ই?”

আচমকা ঝাঁঝালো হয়ে গেল নূরজাহানের কণ্ঠস্বর, “তোর বিয়ে নিয়েই আমার যত দুশ্চিন্তা!” বলে তিনি চট করে ঘরে যেয়ে দরজা দিলেন। ফাবিহার কেন যেন মনে হলো তিনি পালিয়ে বাঁচলেন।

তৎক্ষণাৎ সে সিমিকে ডেকে পাঠাল।

“কী হয়েছে রে, সিমি?”

“একজন এসেছিল, ছোট আপা।”

“কে?”

“চিনি না তো। এই প্রথম মহিলাকে দেখলাম।”

“এসে কী করল?”

“খালা আম্মার সাথে ঘরে বসে কী যেন বলাবলি করল। ইয়ে..ছোট আপা, মনে হয় লুকানো কিছু। আমি চা দিতে ঘরে ঢুকলাম আর সব কথা বন্ধ।”

ফাবিহা বিস্মিত বোধ করছিল। তার খোলা বইয়ের মতো মায়ের আবার এমন কী গোপনীয়তা।

“মহিলা দেখতে কেমন?”

“উঁচু-লম্বা, ফর্সা।” ফাবিহা বিরক্ত হলো। এমন বর্ণনায় কোনো মানুষ চেনা যায় না। সে ঠোঁট কামড়ে ভাবতে বসল—গণ্ডগোলটা ঠিক কোথায় বেঁধেছে।

*****

সকাল সকাল আকরাম খান সাকিনের হাতে একটা মস্ত ফাইলের সাথে এক টুকরো কাগজ দিয়ে বললেন, “এই ঠিকানায় এটা পৌঁছে দিস তো।”

ঠিকানাটা খুব দূরে নয় বটে, তবে জায়গাটা ভালো নয়। সাকিন বোধহয় মনের কথা বিড়বিড় করে মুখেও কিছু বলে থাকবে।

আকরাম খান তা শুনে বিরক্ত হয়ে বললেন, “পুরুষ মানুষের ভালো-খারাপ সব জায়গাতেই যেতে হয়। এত বাছ-বিচার করলে চলবে? কাওয়ার্ডের মতো করিস না তো! যা।”

সাহসের উপর আঙুল এলে আর কিছু বলা যায় না। প্রশ্নবোধক চিহ্নকে ধুলিস্যাৎ করার জন্য তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়ল সাকিন। যাবার মুখে আকরাম খান বললেন, “একটা ফিরতি পার্সেল আসবে। সেটা আমাকে দিয়ে তারপর ফার্মেসিতে যাবি।”

সাকিন সরল মনেই সেখানে গেলো।
পরিত্যক্ত একটা বিল্ডিং। ঘর বাঁধানোর কাজ অর্ধেক করার পর সব আচমকাই বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু ইট ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। সিমেন্টের খালি বস্তাও দেখা যায়। এমন খোলামেলা ছেড়ে দিলে বারোভূতে তো লুটেপুটে খাবেই।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো সাকিন। যে ফোন নাম্বারটা মামা দিয়েছেন, সেটা থেকে তাকে দোতলায়ই যেতে বলা হয়েছে।
দোতলায় উঠতেই কিছু গুণ্ডা মার্কা চেহারার লোক দেখা গেলো। তাদের শরীরের অনুপাতে সাকিন কিছুই নয়। ভয় না পেলেও তাদের দৃষ্টি তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল।

আরও অস্বস্তির বিষয় হলো—কেউ একটা কথাও বলল না। হাত বাড়িয়ে ফাইল নিলো আর একটা ফাইল ধরিয়ে দিলো। সাকিনের মনে একবার প্রশ্ন এলো—এসব চিহ্নিত নেশারুদের সাথে মামার কীসের কারবার? আর কাজ যদি থেকেই থাকে তবে তিনি তাদের নিজের চেম্বারে ডেকে নেন না কেন?

প্রশ্নটা ভাবতে ভাবতেই সে দেখল একজন তাকে হাতের ইশারায় চলে যেতে বলছে। সে সিঁড়ি বেয়ে নামতেই একজন বাতাসের গতিতে এসে একট প্যাকেট সাকিনের প্যান্টের পেছনের পকেটে রেখে দিলো। হাত সাফাইয়ে অভ্যস্ত সে লোকের আক্রমণের বিন্দুবিসর্গ টের পেলো না সাকিন।

কাঁচাবাজার পেরিয়ে আসার সময় ঘটনাটা ঘটল।

মাছ বাজারের কাদা বাঁচিয়ে যখন সে আসছে তখন আচমকা এক ধাক্কার মুখোমুখি হলো ভূপাতিত হওয়ার আগেই নিজেকে সামলে নিলো সাকিন। কিন্তু ততক্ষণে ঘটনা ঘটে গেছে। হিপ পকেটে হাত দিয়েই বুঝল মানিব্যাগ গায়েব। পেছনে ঘুরতেই সতের-আঠার বছর বয়সী এক ছেলেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে দেখে তার আর কোনো সন্দেহ রইলো না। সেও প্রাণপণে পিছু নিতে শুরু করল।

অত ভিড়ের মাঝে দৌঁড়ে সুবিধা করতে পারছিল না সাকিন। কিন্তু ছেলেটার সম্ভবত অভ্যেস আছে। সে অত্যন্ত মসৃণভাবেই জনসমুদ্রে ঠেলে বেরিয়ে যাচ্ছিল। বেতনের বাকি টাকাটা ওখানেই রাখা ছিল। সাকিনকে দুনিয়া ভুলে ছুটতেই হতো।

আশার আলো দেখালো এক ট্রাফিক পুলিশ। বাজারের শেষ প্রান্তেই তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলেটা তখনও সে পর্যন্ত পৌঁছায়নি। সাকিন চেঁচিয়ে বলল, “স্যার! ছেলেটাকে ধরুন! আমার মানিব্যাগ চুরি করেছে! ধরুন স্যার!” আশেপাশের মানুষ সরে চোর-পুলিশ খেলাটা জমানোর জন্য জায়গা করে দিচ্ছিল।

সাকিবের কণ্ঠ পুলিশের কানে গেলো। বিচক্ষণ দৃষ্টিতে ছেলেটাকে দৌড়াতে দেখেই তিনি ঘটনা আঁচ করতে পারলেন। মুহূর্তেই ছুটে এলেন তিনি। ছেলেটা বিপাকে পড়ল। ডানে-বায়ে ফাঁক নেই। সামনে পেছনে ফাঁদ। সমাধান পাওয়ার আগেই তাকে দ্বিমুখী আক্রমণের শিকার হতে হলো।

কিন্তু বো-মা-টা ফাঁটল তার পর।

ওর হাত থেকে এক ঝটকায় মানিব্যাগ ছাড়িয়ে নিলেন পুলিশ। সাথে এলো স্ট্যাপল করা ছোট্ট বাঁশপাতার একটা খাম। হাতাহাতিতে সেটা ছিঁড়ে ভেতরের পলিথিনে বেরিয়ে গেছে। তার ভেতরে সাদা যে গুঁড়ো, সেটা চেনার জন্য তাকে কোনো কেমিক্যাল টেস্ট করতে হবে না। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, “হিরোইন সাপ্লাই দিচ্ছিস হারামজাদা!”

ছেলেটা চোখ গোল করে তাকালো। পুলিশের হাতে পড়া তার জন্য নতুন কিছু নয়। দু’চারদিন একটু খাতিরদারি করে ছেড়ে দেবে। সে খাতিরদারি পছন্দ না হলেও সে ক’টা দিন দিনে খাওয়া অথবা রাতে থাকা নিয়ে অন্তত চিন্তা করতে হবে না। কিন্ত এর মাঝে এই প্যাকেট এলো কোত্থেকে!

সে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, “মানিব্যাগের সাথেই ছিল, সার! ভাত খাইতে পয়সা পাই না, হিরোইনের টাকা কই পামু? বিশ্বাস করেন, আল্লাহর কিড়া!”

ছেলেটার চেহারায় উদ্ভ্রান্ত ভাব স্পষ্ট।চোখ দেখেই বোঝা যায় নেশা করে। নিশ্চিত আগে থেকেই ওটা হাতে ছিল। ধরা পড়ে যাওয়ায় দোষ তার ঘাড়ে চাপাচ্ছে।

সাকিন গর্জে উঠল, “মিথ্যা কথা, স্যার! আমার পকেটে এসব ছিল না। শুধু মানিব্যাগটাই আমার।”

খপাৎ করে ছেলেটার কলার মুচড়ে ধরলেন পুলিশ ভদ্রলোক। মানিব্যাগ খুলতেই এনআইডি বেরোলো। আলাদা করে প্রমাণ দিতে হয় না ওটা সাকিনের। তার হাতে জিনিসটা ফিরিয়ে দিয়ে তিনি কটমট করে বললেন, “গাছেরও খাচ্ছ, তলারও কুড়াচ্ছ! আজ খাওয়া-খাওয়ি সব বের করছি দাঁড়াও!”

ছেলেটা কাকুতি-মিনতি করে বলল, “আল্লার কসম লাগে সার, ওই জিনিস আমার না। আমি হুদা মানিব্যাগটাই নিসিলাম!” তার কান্না কোনো কাজেই এলো না। হিড়হিড় করে তাকে টানতে টানতে থানায় নিয়ে গেলেন তিনি। সাকিনের নাম-ঠিকানা রাখতে অবশ্য ভুললেন না। তীব্র অস্বস্তির সাথে নিজের তথ্যগুলো দিয়ে এলো সাকিন। সে বুঝতে পারছিল না তার নাম-ঠিকানার দরকারটা কী!

ফাইল উল্টেপাল্টে দেখে ভুরু কুচকে তাকালেন আকরাম খান। একটা জিনিসের জন্য তিনি সকাল থেকে অপেক্ষা করছেন। মনে মনে একটু উত্তেজিতও বটে। সে জিনিসটা এই মুহূর্তে হাতে পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাতে আসেনি।

চোখের পলকে ফোন দিয়ে তিনি সে জিনিসের অবস্থান জেনে নিলেন। ফোন রেখে ঝটপট করে সাকিনকে বললেন, “তোর হিপ পকেটে দেখ তো একটা প্যাকেট আছে কি না!”

এক ঠান্ডা স্রোত সাকিনের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেলো। হাত না দিয়েই সে শীতল কণ্ঠে বলল, “নেই।”

“নেই?” জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন আকরাম খান।

বাজারের ঘটনা বলে সাকিন জিজ্ঞেস করল, “জিনিসটা কি আপনার পাওয়ার কথা ছিল, মামা?” তার অপলক দৃষ্টিতে আকরাম বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।

কথা কাটানোর জন্য বললেন, “কী কথা! হিরোইন আমার হতে যাবে কেন? আরেকটা প্যাকেট ছিল। ওই চোরের খাবলায় সেটাও মনে হয় গেছে।”

“জিনিসটা আমাকে জানিয়ে, আমার হাতেই দেয়া যেত।”
আকরাম খান এ কথার কোনো জবাব দিলেন না।

তারপর থেকে খুব সাবধানে থাকতে শুরু করল সাকিন। তার প্রায় দু-বছরের পরীক্ষা এবং চার বছরের পরিশ্রমের ফল খুব নিকটে চলে এসেছে। যেকোনো সময় খবরটা হাতে পাবে সে। আর দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি আছে। এ সময়টুকু অসম্ভব দেখে-শুনে চলতে হবে। কিন্তু এরই মাঝে সেদিন ঘটনাটা ঘটে ভালো হলো না। তার বুকের ভেতর কেমন খচখচ করে। একটু পা হড়কে গেলেই শেষ, সব শেষ!

কিন্তু তার দৃঢ় সন্দেহ হয়—বাঁশপাতার সে খামটা মামার জন্যেই ছিল। অথচ পুলিশের কাছে রয়েছে সাকিনের নাম। সে ভীষন অস্থির বোধ করে।

এর ঠিক এক মাসের মাথায়, এক বিকেলে পাপিয়া সাকিনের কাছে ফোন দিয়ে বললেন, “পুলিশ তোকে খুঁজতে এসেছে।”

চলমান~

(ছবি কৃতজ্ঞতা: ফাহারিয়া লিজা 🧡)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 9 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন