#বনজোছনা
১০.
সাকিন ঝড়ের বেগে বাড়িতে ছুটল। এমনি দিন সাইকেলটা মাখনের মতো ছোটে। অথচ আজ তিনবার চেইন পড়ে গেলো। বিরক্ত সাকিন বুঝল না তার তাড়াহুড়োর সাথে সাইকেল বেচারা কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
আকরাম খান কোনোদিনই খুব নামকরা উকিল ছিলেন না । কিন্তু গত দু-এক বছরে কাঁচা টাকার সন্ধান পেয়েছেন। কোত্থেকে পেয়েছেন—সাকিন জানতে চায় না। কিছু জিনিস না জানাটাই স্বস্তির।
কিন্তু এই স্বস্তি সম্ভবত আর খুব বেশিদিন অবশিষ্ট থাকবে না। ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। আগপাশতলা কিছু না জানলেও সাকিনের বড় ভয় হয়। নেশা জিনিসটাই ভয়ঙ্কর। আর যদি তা হয় টাকার নেশা—তবে আর ঠেকায় কে! ভয়ঙ্করতম দুটো জিনিসের সহযোগে যে দাবানল তৈরি হবে—তার ধ্বংস ঠিক কাকে কাকে ছুঁয়ে যাবে? সাকিন বাঁচতে পারবে তো!
সতের মিনিটের রাস্তাটুকু এগার মিনিটে ফুরিয়ে সাকিন বাড়ির সামনে থামলো। এরই মাঝে বাড়িয়ে সামনে বেশ কিছু আগ্রহী মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। বিপদের শুরুতে তারা বেশ চাঙ্গা থাকে, শেষ মাথায় এলেই তাদের কৌতূহলের পারদ স্তিমিত হয়ে যায়।
ভিড় পেরিয়ে যেতে যেতে পাড়ার এক ছেলে নিচু কণ্ঠে বলল, “ভাই, পুলিশ আপনাকে খুঁজে ওলট-পালট করে ফেলতেছে!”
সাকিন একটা বিট মিস করল। পিছু ঘুরে বক্তাকে না খুঁজে পায়ের গতি বাড়ালো। দরজার ওপাশেই আদিলের ঘর। এ বাড়িতে বসার ঘর বলে আলাদা কোনো ব্যাপার নেই। আকরাম খানের বক্তব্য হলো—চাইলে যে কোনো ঘরেই বসা যায়। এমন তুচ্ছ কাজের জন্য পুরো একটা ঘর ওয়াকফ করে দেয়ার কোনো মানে হয় না।
কাজেই দরজা ছাড়া বিশাল ঘরটা আদিলের বাসস্থান হয়ে গেছে। দু’টুকরো সস্তা পর্দার সাথে প্রাইভেসিটাও মলিন ভঙ্গিতে ঝুলছে।
সে ঘরে সোফায় মুখ গুম করে বসে আছে পাপিয়া। তার পেছনে পাপড়ির ছটফটানি চোখে পড়ার মতো। অথচ পুলিশ লোকটার হাবভাব দেখে মোটেই মনে হচ্ছে না—তিনি অপরাধী ধরতে এসেছেন। আরেকটু এগিয়ে সাকিন দেখল টি টেবিলে হরেক রকম নাশতা সাজানো। ঘটনাটা কী!
ঘটনা আসলে বেশি কিছুই না। পুলিশ ভদ্রলোক বললেন, “আপনিই সাকিন মুহতাসিম?”
“জি।” বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল সাকিন।
“ভয়ে তো দেখি সাদা হয়ে গেছেন!” দু’পাটি দাঁত বের করে বললেন তিনি। চোখেমুখে আত্মতৃপ্তি। তাকে দেখে যে ঘরের এবং ঘরের মালিকের আবহাওয়া পাল্টে গেছে—এটা খুব উপভোগ করছে তিনি।
“নরম্যাল ভেরিফিকেশনের জন্য আসছি ভাই। আপনার কাগজপত্রগুলো একটু নিয়ে আসেন।”
“ভেরিফিকেশন? ভেরিফিকেশন..!” বিড়বিড় করল সাকিন। তার বুকটা তখনও কাঁপছে। এই নাকি কলার চেপে বলে—হিরোইন কোত্থেকে এনেছিস বল!
কাজেই কথাটা সে বুঝতে পারল না।
পাপিয়া বেগম উঠে এসে চাপা কণ্ঠে বললেন, “এতবড় একটা কাজ করে এইভাবে চেপে রাখলি! আমরা কি তোর এতোই পর?”
সাকিন দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে মামীর দিকে তাকালো। সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
ওর অবুঝ ভঙ্গিটা পাপিয়া মোটেই সহ্য করতে পারলেন না। চোখ রাঙিয়ে বললেন, “হা করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন! বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছিস, ভাইভা দিয়েছিস, সব শেষ হয়েছে—আর একটা টু শব্দও করলি না। কেন রে! আমরা কি তোর চাকরিতে ভাগ বসাতাম!” আফসোসের ভঙ্গিতে বললেও তার চেহারায় সে ভাব নেই। মনে ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য চিন্তা।
টং করে সাকিনের মাথায় কথাটা বারি খেলো। বিসিএস..! পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য এসেছে! ঝোড়ো হাওয়ায় নৌকার পালের মতো তার কাঁপতে থাকা হৃদয়ে এক মুঠো স্নিগ্ধ বাতাস ছোঁয়া দিয়ে গেলো। মুহূর্তেই নার্ভ স্থির হয়ে গেলো। চুপচাপ যত্ন করে গুহিয়ে রাখা ফাইলটা নিয়ে এলো সে।
এ যুদ্ধের শুরু বহু আগে। তাও কতবছর হবে? ভাবে সাকিন। কাগজে-কলমে দুইয়ের কাছাকাছি। কিন্তু আদতে যুদ্ধটা শুরু হয়েছে তারও আগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার কিছুদিনের মাঝেই।
নিজের ইচ্ছে মতো কিছু যে করতে পারবে না—এটা তো সে ইন্টারে থাকতেই বুঝেছিল। চুপচাপ সবকিছু সহ্য করে নেয়া তার অভ্যেস। সেবারও টিউশনি ছেড়ে বিষয়টা হজম করার চেষ্টা করল। কিন্তু একটা বদহজমের উপসর্গ সর্বদাই বুকে চাপ দিত। উপায় না পেয়ে তার ভার্সিটির কিছু অ্যলামনাইয়ের সাথে কথা বলল সাকিন। তারা পরামর্শ দিলেন—দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই চাকরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করো।
টুকটাক কয়েকটা বই কিনল সে। মামা কোনোদিনই আউট বই পড়াটা পছন্দ করতেন না। কিন্তু তিনি যে চাকরির প্রস্তুতি নেয়াটাও বাঁকা চোখে দেখবেন—এটা বুঝতে পারেনি সে।
একদিন তার ঘরে শুয়ে অংকের কোনো এক বইয়ে উপর চোখ বোলাচ্ছিল সাকিন। আকরাম খান সে সময় এলেন। হাতের বইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখমুখ কুচকে বললেন, “পড়িস সেকেন্ড ইয়ারে, চাকরির বই পড়ে এখন কোন বিশ্ব উদ্ধারের কাজটা করবি? এই করতে করতে ওইদিকে রেজাল্ট খারাপ হলে তখন বুঝবি।” বলে একটু থামলেন তিনি। সরাসরি আক্রমণে সাকিন একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিল।
আরও একটু বিরক্ত হয়ে আকরাম খান বললেন, “দোকানেও নাকি সবসময় এই বই পড়ছিস? এমন করলে দোকানটা চলবে কীভাবে? নাজিমের এক নম্বরি, দুই নম্বরি কোনোটাই আর ধরতে পারবি না।”
এমন কথার পর পড়ার তোড়টা আর আগের মতো রইলো না। বেশ দমে গেলো সাকিন।
তার কয়েকদিন পরের কথা।
হাতের কাছে ‘দেশে-বিদেশে’ বইটা পেয়ে দিন-দুনিয়া প্রায় ভুলেই বসল সাকিন। টানা দুদিন বুঁদ হয়ে বইটা শেষ করল। এবং শেষ করার পরই তার মাথা কাজ করল। মামা তো এসব পছন্দ করেন না। আবার ধমক!
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আকরাম কিচ্ছুটি বললেন না। নাজিম তার সামনেই অবশ্য অনুযোগ করেছিলেন—সারাদিন যদি বইই পড়ে তাইলে দোকান সামলায় কে?
“পড়ুক। দোকানে বসে থাকতে আর কতক্ষণ ভালো লাগে?” আকরাম খান উত্তর দিয়েছিলেন।
এর পরই সাকিনের মাথা খেলতে শুরু করল। চাকরি প্রস্তুতি বইয়ের উপরে সে তার কাছে থাকা গল্পের বইয়ের মলাট লাগিয়ে দিলো। সর্বোচ্চ পঠিত বইয়ের পর্দা হলো—আরণ্যক।
এবং সে বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করল—লবটুলিয়া, বইহারে হারালে মামা বিরক্ত হন না। হন কেবল—পরবর্তী বিসিএসের খোঁজ নিতে দেখলে। কাজেই নিজের কার্যকরণ আরণ্যকের আড়ালেই ঠিক করে ফেলল সাকিন।
মাস্টার্স শেষ করেই বিসিএসটা ধরে ফেলল। প্রথম ধাপে কত শত মানুষই তো টেকে! কাজেই আনন্দে সে নিজেকে উদ্বেল হতে দিলো না। লিখিত, ভাইভা সবগুলোই যখন মসৃণভাবে পার করে ফেলল—একবার মনে হলো সাবিহাকে একটু জানানো যাক। ওর চেয়ে আপন আর কে আছে! কিন্তু ততদিনে সাকিনের সূক্ষ্ম অথচ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে—মামা তাকে চাকরি করতে দিতে চান না। বছর পেরিয়ে গেলেও নিজের মুখে একবারও তিনি বলেননি—বসে না থেকে চাকরি-বাকরির চেষ্টা করলেও তো পারিস!
তাই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় ছিল সাকিন। যতক্ষণ আড়ালে কাজ সাড়া যায় ততক্ষণ চিৎকার না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আজ সে নাটকের পর্দা উঠল। পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়ে গেছে। সে যে শিক্ষা ক্যাডারে টিকেছে—এটা আকরাম খানকে কতটুকু আনন্দ দেবে সাকিন জানে না। বরং উল্টোটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। হোক। আর কী-ই বা করবেন তিনি! নির্ভার মনে সাবিহার কাছে ফোন দিলো সাকিন। খবরটা শুনে ওর চেহারা কেমন হবে? ইশ! একটু দেখতে পেলে হতো।
সাবিহা ফোনের ওপাশে কিশোরীর মতো খলবল করছে।
“সত্যি বলছিস ভাইয়া! আল্লাহ! আমাকে একবারও কিচ্ছু বললি না! কেমন মানুষ তুই! তোকে তো আলাভোলা ভেবেছিলাম। এখন দেখি ছুপা রুস্তম!” বলতে বলতে কেঁদে ফেলল সে।
“আমার বাড়ি আসার নাম করে কোথায় গিয়েছিলি বল তো!”
“হাসপাতালে। মেডিকেল টেস্টের জন্য।”
“ভাইয়া রে! আমার কি যে আনন্দ হচ্ছে! আমি অবশ্যই দশটা রোজা থাকব। তুই পড়াবি কীভাবে ভাইয়া? তোর চেহারা দেখলে তো ছেলেমেয়েরা একটুও ভয় পাবে না।”
সে এলোমেলো কথার খাঁটি উচ্ছ্বাসটুকু সাকিনের বুক ছুঁয়ে সেখানেই ঘাপটি মেরে বসে রইলো। সাবিহা হাসছে, এই আবার কাঁদছে। নাক টানতে টানতে কতরকম কথাই না বলছে! সাকিনের বুকটা ঠান্ডা হয়ে আসে। সবকিছু বড় ভালো লাগে!
*****
“ফারদিনকে নিয়ে কী করি বল তো!” চিন্তিত কণ্ঠে বললেন ফরিদ। তার সামনে নূরজাহান এবং ফাবিহা চুপচাপ বসে আছে। কেউ কোনো উত্তর দিলো না।
ফরিদ ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে বললেন, “এই শেষে এসে ও এমন করছে কেন? তীরে এসে তরী ডুবিয়ে দিচ্ছে…!”
“তুমি ওকে সামনাসামনি কিছু বলো না কেন!” বিরক্ত হয়ে বললেন নূরজাহান। “আমাদের সাথে তিন বেলা বলে তো লাভ নাই। আসল মানুষের কাছে বলো যাও।”
“ও কি সারাদিন ঘরেই বসে থাকে নাকি?” ফরিদের কপালে ভাঁজ পড়ল।
“বেশিরভাগ দিনই।”
সাথে সাথেই সিমিকে দিয়ে ফারদিনকে ডেকে পাঠালেন। বিকেলের রোদ মরে আসছে। তাদের পারিবারিক আড্ডায় চুপচাপ থাকলেও ফারদিন আগে বসত। কিন্তু ইদানীং সে একেবারে হ্যালির ধূমকেতু হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরে তার জীবনের সূর্য যে অস্ত গেছে—আর ওঠার নাম নেই।
ফারদিন হেলেদুলে এলো। তার চোখজোড়া লাল।
ফরিদ আহমেদ শীতল কণ্ঠে বললেন, “বস।”
ফারদিন চুপচাপ মায়ের পাশের ফাঁকা চেয়ারে বসল।
“তুই কি পড়াশোনা ছেড়ে দেয়ার নিয়ত করেছিস?” ফরিদ জিজ্ঞেস করলেন।
ফারদিন কোনো উত্তর দিলো না। তার মাথা স্টিল হয়ে গেছে। ওটায় কোনরকম নড়চড় দেখতে পেলো না ফাবিহা।
“কথার উত্তর দিবি। কী করছিস এখন?”
“কিছু না।”
“কিছু না মানে কী? ফাইনাল পরীক্ষা কি দিবি না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?”
এক মুহূর্তও দেরি না করে ফারদিন বলল, “হ্যাঁ।”
ওর এই স্বাভাবিক উত্তরটাই শান্ত ফরিদকে ক্ষেপিয়ে তুলল।
“হ্যাঁ মানে কী? তোকে এতদিন কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছি এই দিন দেখার জন্য! জীবনটা কোনো ইয়ার্কি মারার বিষয় না। তুই অবশ্যই পরীক্ষা দিবি আর এখন থেকেই চাকরির চেষ্টা করবি।”
কিছুক্ষণের জন্য ঘরে গমগমে নীরবতা নেমে এলো। ফরিদ আহমেদের ধমক তখনও ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাবার চোখ দেখে ভয়ই পেলো ফাবিহা।
ধীর অথচ শক্ত কণ্ঠে ফারদিন বলল, “জন্ম দিয়েছ বলে আমাকে পুতুল নাচ নাচাবে—এমন মনে করো না। সারাজীবন তোমাদের যা ইচ্ছা হয়েছে তাই করেছি। তাই বলে আগামীতেও করব না। কামাই করে, তোমাদের সবার দায়িত্ব নিয়ে, গাধার মতো খাটতে খাটতে জীবনটা উৎসর্গ করে দেবো—এমন মহৎ ইচ্ছা আমার নেই। তোমাদের খাওয়ার চিন্তা আমি করতে পারব না, আমারটাও তোমাদেরকে করতে হবে না।” বলে ওঠে দাঁড়ালো ফারদিন।
ফরিদ আহমেদ হতভম্ব কণ্ঠে বললেন, “তুই কি আমারই ছেলে!”
“দুর্ভাগ্যবশত।” ফারদিন চলে গেলো।
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ফরিদ বললেন, “আমার উপরে এতো ক্ষোভ কেন ওর?”
“জানি না।” নূরজাহানের মনে হচ্ছে আকাশের সাতটা স্তর এক এক করে তার মাথায় ভেঙে পড়ছে। তিনি ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছেন।
ফাবিহা কারণ খোঁজার চেষ্টা করছিল। অনার্সের শুরুতে ফারদিন বিদেশ যেতে চেয়েছিল। শুধুমাত্র টাকার সংকটের জন্যই নয়, দৃষ্টির আড়ালে ওরকম বেপরোয়া সংস্কৃতির মাঝে থিতু হলে ছেলে কতখানি মানুষ থাকবে—এই চিন্তাতেই ফরিদ সায় দেননি। বরং তীব্রভাবে প্রতিরোধ করেছেন। শুধু ওই একটা কারণেই ফারদিন এমন করছে? চোখের সামনে থেকেও বখে যেয়ে সে কী প্রমান করতে চাইছে?
অবশিষ্ট দিনটা শ্রাবণের কালো মেঘে ঢেকে গেলো। সবাই একসাথে থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো।
অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঘরে এসে নিজের ইলেকট্রিক সেলাই মেশিনটা বের করলেন নূরজাহান। ফাবিহাকে ডেকে বললেন, “তোর বান্ধবীরা জামা-কাপড় বানায় না?”
“এটা আবার কেমন প্রশ্ন! বানাবে না কেন?”
“আমাকে তাহলে কিছু অর্ডার এনে দিস।”
ফাবিহা অবাক হয়ে বলল, “তুমি অর্ডার নিবা?” নিজেদের জামা-কাপড় সেলাই করলেও অর্ডারের কাজ করতেন না নূরজাহান। দুই একজনের কাজ করেই বুঝেছেন—এ জিনিস বড় ঝামেলার। কারো জামাই যুৎসই হয় না। একজনের গলা বড় তো আরেকজনের হাত ছোট। নানান সমস্যা! আজ সেই মানুষের কণ্ঠে ভিন্ন সুর শুনে ফাবিহা সূত্র মেলাতে পারল না।
মায়ের কাছে বসে সে বলল, “আম্মু তোমার কী হয়েছে বলো তো!”
বিরক্ত ভঙ্গিতে নূরজাহান বললেন, “কী আবার হবে? ঘরে বসে থেকে হাড়ে জং ধরে গেলো। একটু গা ঝালাই করি।”
ফাবিহার বিস্ময় আরও বাড়ল। যে মানুষ কাজ ছাড়া থাকতে পারে না, কাজ না থাকলে নিজে বানিয়ে নেয়—তার মুখে এমন কথা বেমানান বৈ কি! কোথাও একটা গণ্ডগোল হয়েছে। একটা বিশাল ফাঁক তৈরি হয়েছে। ফাবিহা সেটা ধরতে পারল না।
ঘরে যাওয়ার আগে ফরিদ আহমেদের শুকনো মুখ দেখে এগিয়ে গেলো ফাবিহা। ফেইসবুকে তার পেইজ বের করে নওরোজের সাম্প্রতিক পর্বের ইনসাইট দেখিয়ে বলল, “দেখো বাবা! তোমার কত পাঠক হয়েছে!”
ফরিদ আহমেদ তাকিয়ে সেই বত্রিশটা লাইকই দেখতে পেলেন। মেয়ের উচ্ছ্বাসের কারণ বুঝলেন না।
ফাবিহা বলল, “এই যে এখানে ভিউজ দেখা যায়। দেখো, তোমার পোস্ট গেছে চার হাজার মানুষের কাছে। তার মাঝে তিন হাজার লোক তোমার লেখা পড়েছে।”
ফরিদের চোখে স্পষ্ট বিস্ময়ের ভেলকি। হতভম্ব কণ্ঠে তিনি বললেন, “তিন হাজার!”
“হ্যাঁ!”
পরিসংখ্যানটা ভালো করে বুঝে নিলেন ফরিদ। আনন্দ হলেও সেটা দুঃখের পারদ ছাড়াতে পারল না। ছেলেটাকে নিয়ে বেজায় চিন্তা হচ্ছে।
এর ঠিক এক সপ্তাহ পর। শুক্রবার বিকেলে হাঁটতে বেড়িয়েছেন ফরিদ। অনেকদিন পর ফারদিনও বাইরে গেছে। ফাবিহা ভাবছিল সেও একটু সামনে রাস্তা থেকে হেঁটে আসবে। নূরজাহানকে বলতে যেয়ে দেখল তিনি থরথর করে কাঁপছেন। তাকে দেখে হালে পানি পাওয়ার মতো করে বললেন, “ফাবিহা! মা রে! একটু আমার কাছে আয়!”
ফাবিহা প্রায় দৌঁড়ে যেয়ে নূরজাহানকে আগলে নিলো। তাজ্জব কণ্ঠে বলল, “কী হয়েছে আম্মু!”
নূরজাহান প্রথমটায় কিছু বলতে পারলেন না। ফাবিহা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “কী হয়েছে? বলো না!”
“আমার অনেক ভয় লাগছে!”
“কীসের ভয়!”
“তুই কোথাও যাস না মা! আমার কাছে থাক। কোথাও যাস না!”
“যাচ্ছি না!” সিমি আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছিল। ফাবিহা বলল, “একটু পানি নিয়ে আয় সিমি।”
নূরজাহান পানিটা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই সম্পূর্ণ অচেনা দুজন মহিলা বাড়িতে এলো। তাদের দেখেই মেয়ের হাত খামচে ধরলেন নূরজাহান।
চলমান~