#বনজোছনা
১১.
ফাবিহা নির্বোধের মতো বসে আছে। কী ঘটছে, কেন ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
মহিলা দুজনের একজন তাদের প্রতিবেশী, নার্গিস। অপরজনকে ফাবিহা চেনে না। নার্গিস এসে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাবি, কেমন আছেন?”
নূরজাহান মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে লাগলেন। উত্তর দিতে পারলেন না।
ফাবিহা বলল, “কিছু দরকার, আন্টি?”
“দরকার তো আছে, মা। ওকেই বলব ভাবি?”
নূরজাহান প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। ফাবিহাকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে তার ঘরে ঢুকিয়ে মহিলা দুজনকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। সিটকিনি না তুললেও দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বোঝালেন—আপাতত তিনি কারো আগমন আশা করছেন না।
সিমি ছিল পুরো ঘটনার দর্শক। তার চোখে-মুখে প্রচ্ছন্ন একটা ভয় খেলা করছে। আব্দুর রহমান নামের সেই লোকটা মারা যাওয়ার পর যে হাঙ্গামা হলো, তখন খালাম্মা তার থেকে কঠিন একট কথা নিয়েছেন। সে কথাটা এতদিনে ভুলেই বসেছিল সিমি। নার্গিসকে দেখে সেটা হেঁচকির মতো গলায় এসে ঝুলতে লাগল। কিন্তু সেটা বলতেও পারছে না সিমি। কথা দিয়ে না রাখলে নাকি সে মুনাফিক হয়ে যায়। তার অনেক পাপ, সে আর পাপ বাড়াতে চায় না। কিন্তু ভয়টা কমছে না। এই ছোট জীবনে কম ঘটনা ঘটতে দেখেনি সে। বাতাসের গন্ধ শুনেই বুঝতে পারে কালবোশেখী আর কতদূর। তার বারো বছরের অভিজ্ঞতা দৃঢ় কণ্ঠে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানাচ্ছে—এ বাড়ির ঈশান কোণে ইতোমধ্যেই কালবোশেখী উঁকি দিতে শুরু করেছে।
ফাবিহা তীক্ষ্ণ চোখে সিমিকে দেখছিল। ওর মুখ যে ভয়ে সাদা হয়ে গেছে এটা অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছে সে। আস্তে করে ফাবিহা ডাকল—সিমি!
সিমি প্রায় লাফিয়ে উঠল। বসার ঘর থেকেই ফাবিহার ঘরে দিকে তাকালো। দরজা হাট করে খোলা। ছোট আপা তার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন চোর ধরা পড়েছে। শুকনো গলায় সে উত্তর নিলো, “জী?”
“এদিকে আয়।”
“একটু পরে যাই, ছোট আপা? মাথা কেমন ঘুরছে। একটু শুয়ে থাকব।”
“পরে শুবি। আগে এদিকে আয়!”
সিমি কোনোমতে ফাবিহার কাছে গেলো। তার মনে হচ্ছিল সে-ই অপরাধী।
“কী হয়েছে বল তো?”
“আমি জানি না।” মাথা নিচু করে বলল সিমি। আদতেই সে আসল ঘটনা জানে না। শুধু জানে, সেদিন নূরজাহান ছুটতে ছুটতে নার্গিসের বাড়িতেই গিয়েছিলেন। তারপর কী হয়েছে সেটা তার অজানা।
“আমাকে বলবি না?”
সিমি কাঁদো কাঁদো চেহারায় বলল, “আমি সত্যিই জানি না, ছোট আপা।”
“আচ্ছা যা।”
সিমি প্রায় দৌঁড়ে পালালো।
ফাবিহা বাইরের কাপড় পাল্টে ফেলল। একবার ভেজানো দরজায় উঁকি দিয়ে ওপাশের আবহাওয়া আন্দাজ করার চেষ্টা করল। কোনো লাভ হলো না। অন্য সময় মেহমানের সাথে গল্প ডুবে গেলে নূরজাহান তাদের নাশতার ফরমায়েশ দেন। আজ সে ফরমায়েশও এলো না। বাড়ির আবহাওয়া হুট করেই বেজায় থমথমে হয়ে গেলো।
মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে সন্ধ্যা নামলো। নূরজাহানের ঘরে চলতে থাকা উচ্চবাচ্য স্তিমিত হতে হতে হাওয়ায় মিশে গেল। ফাবিহা বুঝতেই পারছিল না কী হয়েছে।
মহিলা দুজন বেরিয়ে যেতেই সে সোজা মেয়ের ঘরে হানা দিল। নূরজাহান ততক্ষণে গুছিয়ে বসেছেন। ফাবিহা বলল, “ব্যাপারটা কী আম্মু?”
“কী ব্যাপার?”
“নার্গিস আন্টি চেঁচামেচি করছিল কেন?”
“চেঁচামেচি করবে কেন!” অবাক হয়ে বললেন নূরজাহান।
“আমি স্পষ্ট শুনলাম।”
“ভুল শুনেছিস। যা এখন।”
ফাবিহা উক্ত ঘুরেও আবার ফিরে এলো। আলমারির পাল্লা হাট করে খোলা। সেদিকে এগিয়ে যেতেই নূরজাহান বাজখাঁই কোন ধমক দিলেন, “যেতে বললাম না! কী তল্লাশি করতে এসেছিস এখানে?”
বিমূঢ় ফাবিহা উত্তর দিতেও ভুলে গেলো। মায়ের ধমক তার কষ্ট হলো না। বরং তার উদভ্রান্ত ভাব লুকানোর প্রাণপণ চেষ্টাটুকু তার ভেতরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল।
অপ্রকৃতস্থের মতো নূরজাহান আলমারিতে তালা দিয়ে চাবিটা আঁচলে বাঁধলেন।
ঘরে ফিরে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসল ফাবিহা। কোনোভাবেই কোনো সূত্র মিলছে না। ঘটনার আগপাশতলা না জানলে আন্দাজ করবে কীভাবে? ডায়েরিটা টেনে বের করল সে।
“ফাবিহা,
আম্মুর এই পাগল পাগল আচরণের অর্থ কী? একটা কিছু যে গোপন করার চেষ্টা করছে এটা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু জিনিসটা কী? সম্ভবত বাবাও জানে না। জানলে…”
হোয়াটস অ্যাপের রিংটোন বেজে উঠল। চোখ বন্ধ করে বিরক্তিটা দমানোর চেষ্টা করল ফাবিহা। একটামাত্র মানুষই ওখানে কল দেয়। যে সে কল না, ভিডিও কল। রিসিভ করা ছাড়া তার আর কোনো উপায়ও ছিল না।
সজীব হাসিমুখে বলল, “কী খবর, ফাবিহা?”
“ভালো। আপনার কী খবর?”
“ভালো। তোমার দুটো ছবি চেয়েছিলাম। দিলে না কেন?”
“আমার কোনো ছবি নেই। ওহ সরি! ভার্সিটির আইডি কার্ডে আছে। ওটা দেব?”
সজীব অবাক হয়ে বলল, “তুমি ছবি তোলো না!”
“দরকার না হলে তুলব কেন?”
“তুমি চূড়ান্ত বিরক্তিকর একটা মেয়ে। চেয়েছি যখন তখন দুটো তুলে দিতে কী সমস্যা?”
“আবার ভালো জামাকাপড় পরা লাগবে। খুব হ্যাসেল সজীব ভাই।”
“যেভাবে আছো সেভাবেই দেবে।” সজীবের চোখের ভাষা আজকাল বদলে গেছে। ফাবিহার মনে হয় চট করে মানুষের চোখের ভাষা বদলানো সম্ভব নয়। আগে থেকেই ওটা ছিল, কেবল একটি পর্দার আড়ালে। বন্ধুর বিয়েতে সে পর্দাটা খসে পড়েছে। এখন সজীবের চোখে কিছু একটা জ্বলজ্বল করে। সে জিনিসটা কী—সেটা জানে ফাবিহা । মনটা সতর্কভাবে সে জানাটুকু চেপে রাখতে চায়।
“বুঝতে পেরেছ?”
“জী।”
“তোমার অ্যাটিটিউড কিন্তু একটুও বদলায়নি ফাবিহা। আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলবে।”
“কীভাবে কথা বললে আপনি সম্মানিত হবেন, সজীব ভাই? এক লাইনে দুইবার করে স্যার বলতে হবে?”
সজীব কটমট করে বলল, “আবার! আবার তেজ দেখাচ্ছ! আমি কিন্তু…”
“এটা গত এক মাসে কম করে হলেও একশ বার বলেছেন। কল ধরো—নাহলে তোমার বদনাম রটিয়ে দেব, দেখা করো—নাহলে তোমার বদনাম রটিয়ে দেব, ঠিক করে কথা বলো—নাহলে তোমার বদনাম রটিয়ে দেব! নাম তো আপনি রটাতে পারবেন না সজীব ভাই। কাজেই বদনামই রটান।”
“তোমার জানে কি ভয় নেই? আমি ফাঁকা আওয়াজ ছাড়ছি ভেবেছো?” সজীবের চোখমুখ শক্ত হয়ে আসছে।
“ভয় অবশ্যই আছে। কিন্তু কী জানেন? আপনি নিজেকে আমার সৃষ্টিকর্তার আসনে বসিয়ে ফেলেছেন। আপনি ভাবছেন—চাইলেই আমার নামে বদনাম রটিয়ে দিতে পারবেন, আমার জীবন ধ্বংস করে দিতে পারবেন, চাইলেই আপনি আমাকে বিয়ে করতে পারবেন, না চাইলে আমাকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে পারবেন। এসব হচ্ছে না কারণ আপনি চাইছেন না। সজীব ভাই, নিজেকে অলমাইটি ভাবা বন্ধ করুন। আমার মাথার উপরে যিনি আছেন, তিনি আপনার মাথার উপরেও আছেন।”
অগ্নিচোখে ফাবিহাকে ভস্ম করে দেয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে ফোন কেটে দিলো সজীব। ফাবিহা ক্লান্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলো। গত এক দেড় মাসের নিরবচ্ছিন্ন হুমকি তার ভয়টাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। আজ নূরজাহানের রহস্য এবং সজীবের সে একঘেয়ে কথা ভেতরের বিরক্তটাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। দরজার শব্দে মাথা ওঠালো ফাবিহা। বাবা এসেছে। তাকে আজকের ঘটনাটা জানাতেই হবে।
কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই নূরজাহান প্রায় উড়ে এলেন। ঝট করে মেয়ের হাত টেনে নিজের মাথায় রেখে বললেন, “তোর বাবাকে কিচ্ছু বলবি না!”
ফাবিহা স্তব্ধ কণ্ঠে বলল, “কী করছ আম্মু!”
নূরজাহান হাতটা আরও শক্ত করে ধরলেন, “বল! কিচ্ছু বলবি না তোর বাবাকে!”
“অবশ্যই বলব! কী হয়েছে তুমি আমাদের বলছ না কেন?”
“সময় হলে আমি নিজেই বলব। তোকে মাতব্বরি করতে হবে না।” নূরজাহান রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন।
ফাবিহা নরম কণ্ঠে বলল, “আম্মু, তুমি কি কোনো সমস্যায় পড়েছ? আমাদের না বললে বুঝব কীভাবে? বলো প্লিজ!”
মেয়ের নরম কণ্ঠ শুনে নূরজাহানের চোখে জল চলে এলো। ভেতরের ঝড়কে যথাসম্ভব দমিয়ে রেখে তিনি আকুতি করে বললেন, “কথাটা রাখ মা! আমিই তোর বাবাকে বলব।”
ফাবিহা দমে গেলো। একেই সমস্যাটা সে ধরতে পারছে না। তাছাড়া সে মেয়ে হলেও, এত আকুতির পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বাড়তি ব্যক্তি হওয়ার মানে হয় না। হতাশ কণ্ঠে সে বলল, “ঠিক আছে।”
নূরজাহান সাথে সাথেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। ভেজা কণ্ঠে বললেন, “আমার জন্য দোয়া করিস মা!”
তিনি খুব জোর দিয়ে বলেছিলেন—ফরিদ আহমেদকে কথাটা তিনিই জানাবেন। কিন্তু নূরজাহান জানতেন না—সেটা কখনোই তার দ্বারা সম্ভব হবে না।
পরবর্তী তিন মাসে ফনা তোলা ঝড়টা স্তিমিত হয়ে গেলো। ফাবিহাও ভুলে গেলো একটা কিছু হয়েছিল। কিন্তু ঝড়টা তখনও মরে যায়নি। প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে শক্তি সঞ্চয় করে।
*****
সাকিন বেশ বিব্রত বোধ করছে। পাপিয়া বেগম তাদের অবহেলা করেছেন—বিষয়টা তেমন নয়। নিজের সংসারে বাড়তি ঝামেলা যে কেউই অপছন্দ করে। তাই দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে সংসারে খুঁটি গাড়লে তার মুখে যে মেঘ ঘনিয়েছিল—সেটা খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিল সাকিন। তার মুখ দেখেই মনের অবস্থা স্পষ্ট বোঝা যেত। পাপিয়ার আচরণ ছিল বরাবরই শীতল। বাড়তি আদর বা অবহেলা কোনোটাই তাতে রঙ চড়ায়নি।
কিন্তু ইদানীং তিনি সাকিনকে অভ্যাসের অধিক যত্ন করছেন। আর এজন্যই বিব্রত হচ্ছে সাকিন। ফার্মেসিতে যাবার সময় তিনি খাবার বেড়ে দেন। সে ফিরে এসেও দেখে মামী অপেক্ষা করছেন। তাকে খাইয়ে তারপরই ঘুমুতে যান। সাকিন অবুঝ নয়। পদের সাথেই যে সম্মান জুড়ে থাকে—এটা যে কারো জানা। তবে এটা সামনের গল্প। গল্পের পেছনের গল্পটা তাকে ক্রমেই অস্থির করে তুলছে।
পাপড়ির হাবভাব আগে যেমন ছিল এখনও তেমনই। নরম কণ্ঠের বুলি ওকে পথ দেখাতে পারেনি। উপরি হিসেবে যুক্ত হয়েছে পাপিয়া বেগম। তিনি যেন ইচ্ছে করেই পাপড়িকে তার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। বিষয়টা যতটা না দৃষ্টিকটু তার চেয়ে বেশি অস্বস্তির। মামীর শীতল আচরণ তবু সহ্য করা গেছে। কিন্তু এই নীচ মানসিকতা অসহনীয় হয়ে উঠেছে সাকিনের কাছে।
আজও সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো।
সে বেরিয়ে যাবার সময় পাপড়ি তৈরি হয়ে এলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমাকে নামিয়ে দিয়ে যান, সাকিন ভাই।”
সোজা সাইকেলে ওঠার আবদার। সাকিন মুখ খোলার আগেই পাপিয়া পেছন থেকে বললেন, “যা তো, একটু তাড়াতাড়ি দিয়ে আয়। নবাবজাদির ঘুম কাটতে কাটতেই স্কুলের ঘণ্টা বেজে যায়।”
সাকিন এক মুহূর্ত ব্যয় করল। তারপর ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “ওর আর আমার রাস্তা আলাদা মামী। আদিলকে বলুন ওকে এগিয়ে দিতে।” তাড়াহুড়া করল না সাকিন। ধীরে-সুস্থে বেরিয়ে গেলো। পাপিয়ার বৈষয়িক জ্ঞান তীক্ষ্ণ। কথাটা না বোঝার মতো বোকা তিনি নন। এরপরও না বুঝলে খুব শীঘ্রই এখানকার পাট চুকিয়ে ফেলতে হবে—ভাবল সাকিন।
—
চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় দিন গুনছে সাকিন। এখানেই কোনো একটা কলেজে তার পোস্টিং হবে। সবচেয়ে কাছাকাছি যে কলেজ—সেখানেই পড়ত সাবিহা। ওর কলেজেও হতে পারে। সে ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে লেকচার দিচ্ছে—ভাবনাটা মনে আসতেই পুরো শরীর জুড়ে একটা চঞ্চল বায়ু খেলে যায়। সে সুখ-কল্পনা থেকে তাকে টেনে বের করলেন নাজিম।
“তুমি যে তলে তলে এই ফন্দি আটছো এইটা তো চিন্তাও করতে পারি নাই।”
সাকিন হাসল।
নাজিম টুল থেকে একটু ঝুঁকে বললেন, “এমন চোর-পুলিশ খেললা ক্যান মিয়া? আমরা জানলে একটু দোয়া দিতাম।”
“এখন দিন চাচা। দোয়া করার সময় তো ফুরিয়ে যায়নি।”
নাজিম সোজা হয়ে বসে বললেন, “নিজের আখের তো গুছায় ফেলছো। আকরাম নিষেধ করতো দেখেই লুকায় কাজ সাড়লা না? ভালোই চালু আছো।”
সাকিন উত্তর দিলো না।
ঠিক সে সময় হাসপতাল থেকে আহাজারির সুর ভেসে এলো। এ আর এমন নতুন কিছু নয়। হাসপাতালটা জীবনের খেলাঘর। সূচনার স্থানেই বিদায়ের আর্তনাদ বেজে ওঠে।
কিন্তু নাজিম এসব নিয়ে বরাবরই কৌতূহলী। তিনি এগিয়ে গেলেন কারণ সন্ধানে—কীভাবে রোগীর মৃত্যু হলো।
মিনিট দশেকের মাঝে যে নাজিম ফিরে এলেন—তার সাথে একটি আগের নাজিমের কোনো মিল নেই। তার ফ্যাকাশে চেহারা দেখে সাকিন চিন্তিত কণ্ঠে বলল, “চাচার কি শরীর খারাপ?” ভেবেছিল, বয়স্ক মানুষ—মৃত্যু দেখে সহ্য করতে পারেননি।
নাজিম দুপাশে মাথা নাড়লেন। অস্থির ভঙ্গিতে পানি খেয়ে চঞ্চল পায়ে পাশের ফার্মেসিতে ছুটলেন। কিছুক্ষণ পর এসে বললেন, “গত এক সপ্তাহে তিনজন মরছে। জানো এই খবর?”
সাকিন ভেবে বলল, “প্রতিদিনই তো কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে চাচা। তিনজনের বেশিই হবে।”
“না! তিনজন। আজকে নিয়ে চার হইলো।” বলতে বলতে শেলফ থেকে কিছু ওষুধের প্যাকেট বের করতে লাগলেন তিনি। সাকিন দেখল সব একই কোম্পানির ওষুধ। সে জিজ্ঞেস করল, “কী করবেন?”
নাজিম উত্তর দিলেন না। নির্দিষ্ট সে কোম্পানির সমস্ত ওষুধ একটা ব্যাগে ভরে সাকিনের হাতে দিয়ে বললেন, “শরীরটা ভাল্লাগতেছে না। দোকান বন্ধ করে দেই।”
“ চাচা, আপনি বাসায় যান। আমি তো আছি।”
“না, তুমিও যাও। দোকান বন্ধ করব।”
সাকিনকে বের করে দিয়ে তিনি দোকানের ঝাঁপি নামিয়ে দিলেন। সে অবাক হয়ে কেবল তাকে দেখছিল। তিনি তাড়া দিয়ে বললেন, “যাও! যাও! ওষুধগুলি বাসায় নিয়ে পোড়ায় ফেলবা। শিগগির যাও!” সাকিনের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নাজিম প্রায় পালিয়ে গেলেন।
সাকিন বাড়িতে গেলো বটে তবে ওষুধগুলো পুড়িয়ে ফেলল না। কিউআর কোড স্ক্যান করল, গুগলে সার্চ দিলো। ফলাফল শূন্য। বিকেল হতে হতে ঘটনাটা পরিষ্কার হয়ে গেলো।
লাইসেন্সবিহীন কোম্পানির ওষুধ সেবনে সরকারি হাসপাতালেই চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে দায়িত্বরত ডাক্তার। ওষুধগুলো বাজারে ছাড়া হয়েছিল পরীক্ষণের উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য সফল করতে চারটা তাজা প্রাণ দিতে হয়েছে।
আরও জানা গেলো—সে ওষুধের অন্যতম প্রধান ডিলার ছিল খান ফার্মেসি। মোটা টাকার বিনিময়ে তাদের সাথে চুক্তি করেছে সাকিন, সাকিন মুহতাসিম।
চলমান~