#বনজোছনা
১৩.
আকরাম খানের দিকে এক পলক তাকালো সাকিন। বলল, “আমাকে ফাঁসিয়ে আপনার লাভটা কী মামা?”
আকরাম সে প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। তার মাথায় চিন্তার জট। দুশ্চিন্তার সে মিছিলে পদদলিত হয়ে পড়েছে ক্ষয়ে যাওয়া মনুষ্যত্বের অবশিষ্টাংশ।
খুব বেশিদিন হয়নি নতুন একটা র্যাকেটের সাথে তিনি কাজ করছেন। প্রথমে জানতেন হোমড়া-চোমড়াদের দল। এদের এক থাবায় মুঠো মুঠো টাকা উঠে আসে। তার উচ্ছিষ্ট পেলেও পুরো বছর পায়ের উপর পা তুলে খেতে পারতেন আকরাম। কিন্তু কিছুদিন আগে জেনেছেন এরা এলাকার পাতি মাস্তান। বিশাল র্যাকেটের একটা বিশেষত্বহীন শাখা মাত্র, যাদের থাকা না থাকায় কোনো কিছুই যায় আসে না। উপরন্তু এখানে লাভ নেই বললেই চলে। উল্টো মান-সম্মান হাতে নিয়ে ঘুরতে হয়। ধরা পড়লেই ইজ্জত বাঁচাতে পুলিশের পকেট ভারী, উল্টোদিকে নিজের পকেট খালি। তাতে লাভের লাভ হয় সেই র্যাকেটের ফাঁদেই পিছলে যাওয়া দু-একজনের কেস। ফিস দিতেই যাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়।
এই দলের আবার বিশেষ একটা পদ্ধতি আছে। তিন মাস অন্তর অন্তর কাস্টমার পার্টি থেকে একজনকে ধরিয়ে দিলেই পরবর্তী তিনমাস নিশ্চিন্তে সাপ্লাইয়ের পূর্ণ সুযোগ পাওয়া যায়। বলির পাঠা যে হয় তাকে খুব পুরনো কাস্টমার হওয়া চলে না। নতুন, কাঁচা মাথা এবং অতি অবশ্যই মাদকের প্রতি পরিপূর্ণ আসক্ত হতে হয়। এমন একজনকে নজরানা হিসেবে পেশ করতে পারলেই রাস্তা পরিষ্কার। জনমনে এই ভেবে একটা আত্মতৃপ্তির ধোঁয়া ওঠে যে—একজন মাদক ব্যবসায়ী অন্তত ধরা পড়ল। পুলিশও খুশি, তাদেরও লাভ। শিকার অবশ্য জানতেই পারে না কলেজ গেটে যে তোয়াজ করে পকেট ভরে দিল, ঘণ্টার ব্যবধানে সেই তাকে জেলে ভরে দিচ্ছে। তাকে চাল বানিয়েই এক পক্ষ নিরাপত্তা আর আরেক পক্ষ প্রমোশনের সার্টিফিকেট অর্জন করছে—এটা তার মাদকাসক্ত মস্তিষ্কের জানবার কথা নয়।
এ মাসেও নতুন মুখের অভাব হয়নি। স্কুল, কলেজের গেটে দাঁড়ালেই ভুরি ভুরি ছেলে পাওয়া যায়। তবে উপর তলা থেকে তার উপরে নারাজির সিগন্যাল পেয়েছেন আকরাম। তিনি যথেষ্ট বিনিয়োগ করতে পারছেন না। পাশে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে ধরা দিয়েছে এক পুলিশ অফিসার। লোকটা পুলিশের ইউনিফর্মে ঘাগু ধরনের সন্ত্রাসী । তার উপরে নজর যখন পড়েছে—হয় তার রক্ত চুষে খাবে, নয়তো ধরিয়ে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হবে।
এই পুরো প্যাঁচ থেকে বেঁচে ফেরার একমাত্র উপায় হিসেবে সামনে পেলেন—সাকিনকে।
পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় তাকে ধরিয়ে দিলে অফিসার রীতিমতো হেডলাইনে চলে আসবেন। দেশকে সম্ভাব্য মাদকসেবী শিক্ষকের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য চারিদিকে তার জয়জয়কার পড়ে যাবে। পুলিশবাহিনী যে কতখানি তৎপর তাও মানুষ জানবে। অন্য পেশার লোকের সাথে শিক্ষকদের একটা পার্থক্য আছে। এদের কুকীর্তি ধরা পড়লে মানুষ যেমন হতোদ্যম হয়ে যায় তেমনি বেশ একটা বিচার করলে ফাঁড়া কেটে যাওয়ার প্রবঞ্চনায় তৃপ্তি পায়।
তাছাড়া সাকিন তার নাকের ডগা দিয়ে চলে যাবার পাঁয়তারা করছিল। বিষয়টা মোটেই পছন্দ হয়নি তার। ওকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে পারলে তিনি শান্তি পাবেন। পাশাপাশি নিজের ভাগ্নেকেও ছাড় দেননি বলে লোকের চোখেও বিশেষ স্থান পাবেন। নীতিবান আইনজীবী হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়বে।
তবে মাঝখান থেকে মেয়েটা এমন ঘটনা ঘটাবে তিনি চিন্তাও করেননি। একটু আগে যখন পাপিয়া বলছিলেন—মেয়ে সাকিনকে পছন্দ করে—তখন কষে একটা ধমক দিয়েছেন তিনি। ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে। পাপড়ি সাকিনের ঘর অবধি পৌঁছে গেছে। সব শুনে তার কেবল একটা কথাই মনে হয়েছে—মেয়ে মানুষের বুদ্ধি!
সাকিনকে জামাই বানানোর কোনো ইচ্ছেই তার নেই। মাঝে মাঝে মন্ত্রীকে বাঁচতে দু একটা বড়ে বিসর্জন দিতে হয়। সাকিন তার সেই বড়ে। কিন্তু মাঠে যখন নেমেই পড়েছেন—অন্তত মেয়ের মন রক্ষার জন্য হলেও একটু নাটক করার প্রয়োজন মনে করলেন আকরাম। সাকিন যে কোনোদিনই রাজি হবে না—এ তারচে ভালো আর কে জানে! নয়তো ওর সামনে কোনো অপশন রাখা যেত না। ওকে বিনিয়োগ হিসেবে চালান করতে পারলেই এবার ভালো একটা জায়গা পাবেন তিনি। তাছাড়া আজ বিকেলেই কীভাবে যেন ফার্মেসির কেলেঙ্কারিটা ফাঁস হয়ে গেছে। সব দিক দিয়ে সাকিন জড়িয়ে গেছে। ওকে বাঁচানো মানে নিজে আগুনে ঝাঁপ দেয়া।
“আমার মেয়ের দিকে যে হাত বাড়ানোর সাহস দেখিয়েছে তাকে সর্ষের ভূত দেখিয়ে ছাড়ব আমি!” গমগমে কণ্ঠে বললেন আকরাম। “বেশি সময় দেয়া যাবে না। দ্রুত বল!”
সাকিনের শান্ত দৃষ্টিতে পাপড়ি এই এতক্ষণে অস্বস্তি বোধ করল। ওর দিকে তাকিয়ে সাকিন ক্ষীণ হেসে বলল, “ভাইয়ের এই মানটাই রাখলি?”
“চুপ!” ধমকে উঠলেন আকরাম। “পাপড়িকে বিয়ে করবি?”
“প্রশ্নই ওঠে না!”
“তাহলে পরের ঘটনার জন্য অপেক্ষা কর! আদিল! বের হ।” নিজেরা বের হয়ে দরজা আটকে দিলেন আকরাম। পাপড়ি কেঁদে ফেলল। কেন কে জানে!
সাকিন হয়তো পালাত না। পালিয়ে সে যাবেই বা কোথায়? সাবিহার কথা মনে পড়ল। পুলিশের খাতায় তার নাম উঠলে শ্বশুরবাড়িতে সাবিহার সম্মানটা কোথায় যাবে!
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। অপলক ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। সেই ক্ষণে একটা হাদীসের কথা মনে পড়ল। অজনপ্রিয় এক সাহাবীকে আল্লাহর রাসুল জান্নাতী বলে ঘোষণা দিলেন। বাঘা বাঘা সব সাহাবীরা তার আমলের তদন্ত করতে নেমে গেলেন। শেষমেশ জানা গেলো জনৈক সাহাবী স্রেফ রাতে ঘুমানোর আগে তাবৎ পৃথিবীর মানুষকে ক্ষমা করে তারপর ঘুমান। কি সহজ আমল!
অথচ তার মনে হলো এই মুহূর্তে ক্ষমার চেয়ে বেশি কঠিন কাজ তার কাছে আর কিছুই নেই। এই মানুষগুলোকে সে কীভাবে ক্ষমা করবে! অসম্ভব ব্যাপার।
নিজের ভেতরের আরেক সত্ত্বা যেন ইথারে কথা বলল।
— জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা এতই সোজা ভাবো!
— কঠিন। তাই বলে এত?
— তোমার দাসপ্রথা নেই, নামাজ পড়লে কেউ শরীরে নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেয় না, বুকের উপর তপ্ত পাথর উঠিয়ে দেয় না। তোমার পরীক্ষাটা সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক।
— মনস্তাত্ত্বিক!
— হ্যাঁ। অদৃশ্য ছুরি তোমার পিঠে গেঁথে আছে, কপালে কলংকের কালি মাখানোর প্রস্তুতি চলছে, ভবিষ্যৎ নসাৎ করার সব পরিকল্পনা পরিপূর্ণ। অথচ ওরা জানে না, তোমার ভবিষ্যৎ পৃথিবী সৃষ্টিরও পঞ্চাশ হাজার বছর আগে ফিক্সড হয়ে গেছে।
— আমি কী করব?
— ক্ষমা করে দাও।
— ক্ষমা!
— ভাবো, জাহান্নামকে সামনে রেখে, তোমার ভুলে ভরা জীবনটা আল্লাহ এই উসিলায় ক্ষমা করে দিলেন। সহজ মনে হচ্ছে না?
— হুঁ।
খুব কষ্ট হলো। ওই চরম অন্তর্দ্বন্দ্বের সে মুহূর্তে সাকিন বুঝতে পারল—ক্ষমা করার বিষয়টাও সময় ভেদে কত কঠিন হতে পারে। এই বাড়িতে এতদিন সে থেকেছে। যে নুন খেয়েছে তার বিনিময়ে মানুষগুলোকে সে ক্ষমা করে দিলো বটে, কিন্তু এও ভাবলো—নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা সে করে যাবে। তার এই জোলো জীবনে এতো মোড় অপেক্ষা করছিল!
ফোনটা কোন ফাঁকে যেন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সাকিন বিছানায় টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ল। কতরকম কথাই যে মনে পড়ল! মনে পড়ল মায়ের ছোট্ট মুখটা। কত অসংখ্য প্রহর পার হয়ে গেছে তাকে হারানোর। তবু চোখ বন্ধ করলেই ঘোমটার তলায় ছোট্ট সে গোলগাল মুখটা এখনও হাসি দিয়ে বলে, “সাকিন, বাবা রে! সারাজীবনই মানুষের মার খেয়ে যাবি?”
সে কথা শুনে সাকিনের বাবা গর্বিত কণ্ঠে বলেন, “দুনিয়া মাইর খাওয়ারই জায়গা। কেউ হাতে মাইর খায়, কেউ ভাতে। যার মাইর ফেরত দেয়ার শক্তি নাই তার আল্লাহ আছে, বাপ। তুই নরমই থাক। নরম দিলের মানুষের দুনিয়ায় বড় অভাব!”
সাকিন নরমই থেকে গেলো। নৈঃশব্দের সে কোলাহলের মাঝে নিজেকে মনে হলো কাহাফের গুহাবাসী, জালিম রাজার অবাধ্যচারণ করায় যে প্রাণ নিয়ে শঙ্কিত। মনে হলো, সে শতাব্দী পুরোনো ওই মানুষ—যে গুহায় আটকা পড়েছে। একটা ভালো কাজের উসিলায় দোয়া করলেই গুহার মুখে বজ্র আঁটুনির পাথরটা ফাঁক হয়ে আশার আলো দেখাবে। কিন্তু হায়! তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো ভালো কাজের নিশানা পেলো না সে। একটা জীবন উল্লেখ করার মতো কোনো কাজ না করেই কীভাবে কাটিয়ে দিলো!
নিজের চক্ষুলজ্জা থেকে বাঁচতে সাকিন চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার অনুতপ্ত সত্ত্বা ভেতর থেকে কুঁকড়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল, “মালিক, উসিলা দেয়ার মতো কোনো কাজই আমার নেই। আমার শুধু তুমি আছো। আর কিচ্ছু না!”
সাকিন ভুলে গেলো—তুচ্ছ কুকুরকে পানি পান করানোর জন্য এক পতিতা নারীকে আল্লাহ মাফ করে দিয়েছিলেন, ভুলে গেলো সর্ষে দানার সমপরিমাণ কাজও আল্লাহর কাছে ফেলনা নয়। সে ভুলে গেলো—তার মালিক কিচ্ছু ভোলেন না!
একটা সাধারণ সকাল শুরু হলো। নিয়ম করে সূর্য উঠল। সারা রাত উপোসের বিনিময়ে বাঁচিয়ে রাখা দুশো মিলির সে পানিটুকুই হলো ওযুর একমাত্র সম্বল। সালাম ফিরিয়ে নিজেকে একবার ইউসুফ আলাইহিস সালামের জায়গায় ভাবার দুঃসাহস করে ফেলল সে, যিনি নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় মিথ্যের বিপরীতে কারাগারের সম্মান বেছে নিয়েছিলেন। ঠিক তক্ষুণি সাকিনের মনে হলো—কুরআনকে এত জীবন্ত সে কোনোদিন অনুভব করেনি। কোনোদিন না!
স্তব্ধ মস্তিষ্কে একটা আয়াত থেকে থেকেই ঝিলিক দিয়ে উঠছিল—এ কুরআন তোমার কাছে ওহী যোগে পাঠিয়ে, আমি তোমার কাছে সর্বোত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি, যদিও এর পূর্বে তুমি অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।
—
জাল দেয়া গরুর মাংস দিয়ে চারটে রুটি খেয়ে আয়েশ করে থানায় ফোন দিলেন আকরাম। কী দুর্ধর্ষ কায়দায় এক আসামীকে তিনি জিম্মি করে রেখেছেন তা সংক্ষেপে বর্ণনা করে দ্রুত ফোর্স পাঠাতে বললেন। পাপড়ি তখন ঘরে বন্দী, আদিল বন্দী আদেশে। এর মাঝেই পুলিশের জিপ চলে এলো। আকরাম আশা করেছিলেন যার জন্য এত আয়োজন—সেই পুলিশ অফিসার আসবে। তার আশায় জল ঢেলে এলো এক নতুন মুখ। একে আকরাম একেবারেই চেনেন না। খানিক বিরক্ত হলেও গায়ে মাখলেন না। সাকিনের ঘরের সিটকিনি খুলে দিলেন। সাকিন তখন শেষবারের মতো অদ্ভুত জানালার ফ্রেমে মড়া গাছটাকে দেখে নিচ্ছিল।
জুবায়ের স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মায়ের জীবন রক্ষাকারীর ভূমিকায় যে অবতীর্ণ হয়েছিল, তাকে মাদক পাচারকারীর ভূমিকায় দেখে যে ধাক্কা সে খেয়েছে—সেটা তার পাঁচ বছরের পুলিশি জীবনে এই প্রথম।
*****
ফরিদ আহমেদ ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বললেন, “নয় লাখ টাকা কীভাবে হয়ে গেল, লোকমান?”
লোকমান ছোট করে নিশ্বাস ছাড়লেন, “হিসাব আছে দুলাভাই। আপনি চাইলে দেখবেন। পঞ্চাশ হাজারের লোন নিয়ে আপা এই আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল। যে মহিলার থেকে নিলো সে গলায় ছুরি ধরে তার নামে আরও তিন লাখ টাকা তুলল। এই তিন লাখের সুদ হু হু করে বাড়ছে। আট লাখ সত্তর হাজারের মধ্যে বড়জোর তিন সাড়ে তিন সেই পঞ্চাশ হাজারের জন্য হয়েছে আর বাকিটা ওই তিন লাখের।”
ফরিদ আহমেদ আস্তে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। তার পিঠের শক্তি কমে আসছিল, সোজা হয়ে বসে থাকতে পারছিলেন না তিনি। ফাবিহা এ দৃশ্য দেখে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।। ছুটে এসে বাবাকে আঁকড়ে ধরতেই তিনি ডুকরে উঠলেন, “ফাবিহা, কী বলে তোর মামা!”
ফাবিহার গলা কাঁপছে। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।
ফরিদ বললেন, “তোর মা কই?”
“ঘরে।”
“তাকে ডাক।”
ডাকতে হলো না, ফোলা চোখ-মুখ নিয়ে নূরজাহান টেনে-হিঁচড়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। লোকমান ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন, “দুলাভাই! রাগের মাথায় কিছু বইলেন না! আল্লাহর দোহাই লাগে!”
তার আশঙ্কা ছিল রাগে অন্ধ হয়ে ফরিদ ভুলভাল কিছু বলে দিতে পারেন। সবচেয়ে ভুল যেটা নিয়ে ভয় তা হলো—তালাক। একবার মুখ দিয়ে বের করলে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো পথ থাকবে না। সে কথা মনে করেই বোনকে আরেক ঘরে বসিয়ে এসেছে লোকমান।
ফরিদ ভঙ্গুর দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। নূরজাহান সে দৃষ্টি সহ্য করতে পারলেন না। ফুঁপিয়ে উঠতেই ফরিদ বললেন, “কী করলা নূরজাহান!”
এক ঘর দৃষ্টি তাকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিল। নূরজাহান বলতে পারলেন না স্বামীর প্রাণের ঝুঁকির সামনে তিনি দুনিয়ার সবকিছু অন্ধকার দেখছিলেন। সে অন্ধকারে সুদের অগ্নিগর্ত চোখে পড়েনি। চিন্তায় আসেনি পরবর্তী করণীয়। তৎক্ষণাৎ সে মানুষটাকে বাঁচানোই জীবনের একমাত্র কর্তব্য বলে মনে হয়েছে। এও বলতে পারলেন না বিশ হাজারের প্রথম কিস্তির কথাটা তিনি তাকে জানিয়েছিলেন। কোনো এক বিচিত্র কারণে ফরিদ তখন মোটেই আগ্রহ দেখাননি। তারপর সে বিষয়ে আর আলাপ করার সাহস পাননি নূরজাহান।
ফরিদ আহমেদ ঝিম মেরে বসে রইলেন। লোকমান বললেন, “দুলাভাই, দুইটা ঋণের সময় ফুরিয়ে এসেছে। এখনও কিছু না দিলে ওরা..” কাচুমাচু করলেন তিনি, “পুলিশে খবর দিবে বলেছে।”
“পুলিশ!” আর্তনাদ করে উঠলেন ফরিদ। “কত টাকা?”
“একটা তেষট্টি হাজার, আরেকটা ঊনচল্লিশ।”
“এত টাকা আমি কোথায় পাবো, লোকমান!”
“পুরা দিতে না পারলেও, অন্তত কিছু…” বোনের বোকামির কথা চিন্তা করে জোর গলায় দুটো কথাও বলতে পারছিলেন না তিনি। কতখানি বুদ্ধিভ্রষ্ট হলে মানুষ একই ফাঁদে বারবার পা দেয়!
ফরিদ নড়তে পারছিলেন না। তার সহকর্মী বললেন, “আপনি বাড়িতে থাকেন ভাই। আজকে আর কলেজে যেতে হবে না।” বলে তিনি বিদায় নিলেন। দুটো ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পুরো ইতিহাস ঘেঁটেও সে টাকা শোধ করার মতো অংক কোথাও পেলেন না ফরিদ।
আধা ঘণ্টা অতিক্রম হবার পর নূরজাহান শ্লথ ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন। ক্ষীণ কন্ঠে বললেন, “আমার একটা চেইন আর আংটি বেঁচে দেন।”
ফরিদ আহমেদ চোখ ওঠালেন । সে দৃষ্টি বড় অচেনা মনে হলো নূরজাহানের কাছে।
আর কোনো উপায়ও ছিল না। লোকমান যেয়েই বিক্রির কাজটা সম্পন্ন করলেন। দুটো মিলিয়ে পাওয়া গেলো মোটে চুয়াল্লিশ হাজার। সোনা কেনার সময় খাদ থাকে না, বিক্রির সময় সোনা থাকে না।
দু’পক্ষকে ভাগ করে কিছু দিয়ে শান্ত করা হলো। তবে ফাবিহা বুঝল—কোনোকিছুই শান্ত হয়নি। অশান্তির সেটাই শুরু। সে মা’কে দেখছিল মুখে আঁচল চেপে নিরবচ্ছিন্ন ভঙ্গিতে কেঁদে যাচ্ছেন। বাবা এই কান্নাকাটি একেবারেই পছন্দ করতেন না। সেই তিনি আজ স্ত্রীর দিকে ঘুরেও তাকালেন না। বাড়িটা অদৃশ্য কতগুলো ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো। সে বিভক্তির মাঝে সিমি আশ্রয়হীন বোধ করল। তার কেবলই মনে হতে লাগল—এরা এবার ছাঁটাই শুরু করবে। ঘরের অপ্রয়োজনীয় সব আসবাবের সাথে তাকেও যদি ছাঁটাই করে দেয়? ভেতরে ভেতরে বিচলিত বোধ করলেও মুখ ফুটে কাউকে সে কথা বলতে পারল না সিমি। কেবল, মূক ফাবিহার মাথাটা উরুর উপর নিয়ে টিপতে লাগলো। অথচ সেটাও ঠিকমতো করতে পারল না। তার হাত জোড়া পারকিনসন রোগীর মতো কাঁপছে।
চলমান~
(পাঠক, আপনারা যদি আগামীকাল সন্ধ্যার ভেতর কমবেশি আড়াইশ রিয়্যাক্টের দায়িত্ব নিতে পারেন, তবে আমিও পরবর্তী পর্ব কালকে দেয়ার একটা ঝুঁকি নিতে পারি।)