ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 14

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
১৪.

বাহিরে আশ্বিনের খা খা রোদ্দুর। অথচ পুরো বাড়িতে একটা গুমোট ভেজা বাতাস নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে যাচ্ছে। সে বাতাস যাকেই ছুঁয়ে দিচ্ছে তারই গা কাঁপিয়ে দুশ্চিন্তার জ্বর আসছে।

ফরিদ আহমেদ আজীবন পাঁচ বাই তিন ইঞ্চির নোটবুক ব্যবহার করে এসেছেন—দৈনিক হিসেব টুকে রাখার জন্য। অথচ আজ সে নোটবুকের পৃষ্ঠা ফুরিয়েও টাকার হিসেব মেলাতে পারলেন না। তার মাথা থেকে থেকেই প্রবল বেগে ঘুরে উঠছে। হিসেব লিখছেন, কাটছেন, ফের লিখছেন। এই করতে করতে রাত্তির দুটো বাজালেন। মড়ার মতো পড়ে থেকেও ঘুমুতে পারছিলেন না নূরজাহান। ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘণ্টা বাজালে তিনি অস্থির ভঙ্গিতে বিছানা ছাড়লেন। স্বামীর কাছে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, “ঘুমাবেন না?” অতি স্বাভাবিক কথাটুকুও তিনি সহজভাবে বলতে পারলেন না। নূরজাহানের মনে হলো বাকি জীবনের জন্য তিনি অপরাধীর কাঠগড়ায় স্থায়ী নিবাস গড়ে ফেলেছেন। ওখান থেকে সমূলে আর উঠে আসা যাবে না।

ফরিদ তাকালেন না। ফের নতুন হিসেব শুরু করলেন। নূরজাহান কণ্ঠের কাঁপুনি লুকিয়ে ফরিদের ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, “শুয়ে পড়ুন। এত রাত জাগলে আবার শরীর খারাপ না হয়!”

“শরীর খারাপ হওয়ার আর কিছু বাদ আছে!” কতদিন পর ফরিদ তাকে ধমকালেন নূরজাহান মনে করতে পারলেন না। আস্তে করে হাতটা সরিয়ে নিলেন তিনি।

ফরিদ বললেন, “এত্ত বড় বোকামি কী বুঝে করলে নূরজাহান?”

ফ্যাসফেসে কণ্ঠে নূরজাহান বললেন, “আপনাকে একবার বলেছিলাম…”

“বলেছিলে! বলেছিলে একজনের থেকে বিশ হাজার টাকা ধার নিচ্ছো। তোমাকে কোনোদিন টাকা পয়সা নিয়ে আমি জিজ্ঞাসাবাদ করেছি? সেদিন কেন করতে যাব? এটা যে সুদের ঋণ—সেই কথাটা আমাকে একবার জানিয়েছিলে?”

“বলেছিলাম। আপনি খেয়াল করেননি।” নিজের কণ্ঠ নিজেই শুনতে পেলেন না নূরজাহান।

ফরিদ তখনও বলে যাচ্ছেন, “একবার ঋণ নিয়ে যখন দেখলে শোধ দিতে পারছ না তখন অন্তত কাউকে বলা দরকার ছিল না?”

“শেলীকে বলেছিলাম।” শেলী—নূরজাহানের ছোট বোন।

ফরিদ এই এতক্ষণে সরাসরি তাকালেন, “সে কী বলল?”

চোখ নিচু করে নূরজাহান বললেন, “কম সুদের একটা ঋণ নিয়ে দিয়েছিল।”

“চমৎকার! এত বছরে তুমি আমাকে এইটুকু বিশ্বাস করতে পারলে না!” জোরে দম ছাড়লেন ফরিদ। “সজীবের বাড়ির লোকজন কিছু জানে?”

“জানি না। আজ না জানলেও কাল তো জানবেই।”

ফরিদ আহমেদ সহসাই চিন্তায় ডুবে গেলেন। নূরজাহান স্বামীর চিন্তিত চেহারার দিকে তাকিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন কেন এই ঘটনা তাকে জানাতে পারেননি। প্রথম যেদিন বলেছিলেন সেদিন ফরিদ কিছু জিজ্ঞেসই করলেন না। এর মাঝে তার দুই মাসের বেতন আটকে গেলো। অর্ধেক ছাত্র কোচিং ছেড়ে দিলো। সব মিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে চাল কেনার টাকা অবধি নেই। সে সময় কিস্তিতে তোলা ওই টাকাই স্বামীকে দিয়েছিলেন তিনি। ফরিদ কি জানতেন না এটা কোন জায়গার টাকা? তখন কেন টু শব্দ করেননি?

নূরজাহান শাড়ির আঁচলে মুখের ঘাম মুছলেন। সবার চোখে তিনি অপরাধী হয়েছেন। এই বিষ দৃষ্টি আর সহ্য করতে পারছেন না। নিজের উপরেই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন তিনি। যুদ্ধের কেবল শুরু, এখনই সহ্য না হলে বাকি দিন কী হবে?

হাফ খরচ হয়ে যাওয়া রাতটা তিনি কাটালেন জেগে জেগে দুঃস্বপ্ন দেখে আর ফরিদ ঠায় বসে রইলেন চেয়ারে। দূর থেকে তাকে দেখে মনে হলো একটা কাঠের পুতুল।

—

ফাবিহা নামাজ পড়ে ভাইয়ের ঘরে ঢুকল। দুবার নক করে কোনো সাড়া না পেয়ে সে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ভেতরে সবসময়ের মতো ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। জানালার খুলতেই ঘর দৃশ্যমান হলো। এই গরমেও ফারদিন কম্বল পেঁচিয়ে ঘুমুচ্ছে।

ফাবিহা কয়েকবার তাকে ডাক দিলো, “ভাইয়া! এই ভাইয়া!”

ধাক্কাধাক্কিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল ফারদিন। তার চোখ টকটকে লাল। কত রাতে ঘুমিয়েছে কে জানে।

“কী সমস্যা?”

ফাবিহা এক পলক ওর সুন্দর মুখটা দেখল। ধীর কণ্ঠে বলল, “তুই সবসময় বাড়িতে থাকিস। কিন্তু আমরা বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি একবার খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করিস না।”

“বেঁচে আছিস তা তো ঠিকই পাচ্ছি। মরতে যাবি কেন?”

“বাড়িতে কী হয়েছে তুই জানিস?”

“না।” ফারদিন আবার শোয়ার প্রস্তুতি নিলো। ফাবিহা প্রায় ধমকে বলল, “তুই এমন করছিস কেন! দেখছিস একটা কথা বলতে এসেছি। ইয়ার্কি ভাবছিস তুই!”

ফারদিন চোখ-মুখ কুঁচকে তাকালো, “কী বলবি তাড়াতাড়ি বল।”

ঘটনা সংক্ষেপে বলল ফাবিহা। চেষ্টা করল দোষ যেন পুরোটা মায়ের ঘাড়ে না যায়।

ফারদিনের তেমন হেলদোল দেখা গেলো না। সে নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “ও আচ্ছা।”

“আচ্ছা মানে! তুই কি বুঝতে পারছিস না আমরা কত বড় বিপদের মধ্যে আছি?”

“আমি এই দুনিয়াতেই নেই ফাবিহা। এসব বিপদাপদে আমার কিছু যায় আসে না।”

বিতৃষ্ণায় ফাবিহার মুখভঙ্গি বদলে গেলো।
“তিনবেলা যে আরাম করে খাচ্ছিস, সেই খাওয়াটুকুও আর জুটবে না এবার।”

ফারদিন ঠান্ডা চোখে তাকালো, “খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছিস?”

“দিলেও ভুল করছি না।” আচমকা দাঁড়িয়ে গেলো ফাবিহা। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল, “তুই কি মানুষ! নাকি আমাদের তুই পর মনে করিস বল তো? এমন খবর শুনেও ঘুমানোর চিন্তা করছিস কীভাবে?”

ফারদিন এক মুহূর্ত থেমে বলল, “তোদের নিজের মনে করার জন্য যদি আমার রক্ত পানি করতে হয়—তাহলে আমি মনে করি না নিজের। বের হ। দরজাটা আটকে দিয়ে যাবি।”

স্তব্ধ হয়ে ওর শুয়ে পড়া দেখা ছাড়া আর কিছু করার রইলো না ফাবিহার। তার মুখে আর কোনো কথাও জোগালো না। ফারদিন তো এমন ছিল না! মাখো-মাখো ভাব কোনোদিন তার মাঝে না থাকলেও এমন ছন্নছাড়াও সে ছিল না। ঘর ভরা আলোর মাঝেও দুচোখে অন্ধকার দেখল সে। কোনো রকমে শরীরটা টেনে-হিঁচড়ে নিজের ঘরে পৌঁছালো।

ফরিদ আহমেদ কলেজ থেকে ছুটি নিলেন। ফাবিহা শুনে বলল, “কোথাও যাবে, বাবা?”

“হ্যাঁ। পাওনাদারদের সাথে একটু কথা বলে আসি।”

লোকমানের থেকে আগেই নাম্বার নিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এবং সাক্ষাতের সে কাজটা করতে যেয়েই বুঝলেন ঋণের তালিকায় নাম উঠিয়ে তিনি ঊনমানুষ হয়ে গেছেন। সমিতির লোকেরা তার সাথে রাস্তার কুকুরের মতো ব্যবহার করল। এক মাসের মাথায় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা না দিতে পারলে কী কী করবে সেটারও একটা ফিরিস্তি দিয়ে দিলো। ফরিদ শুকনো মুখে বাড়ি ফিরলেন। দুপুরের খাবার খেলেন না। এক গ্লাস পানি নিয়েছিলেন। সেটাও খেতে পারলেন না। ফাবিহা একটা ক্লাস করেই চলে এসেছিল। বাবার ওরকম চেহারা দেখে সে ভয় পেয়ে গেলো। কাছে যেয়ে বলল, “কী হয়েছে বাবা?

ফরিদ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। মেয়েকে দেখে বললেন, “পাবনা যেতে চাচ্ছি মা।”

“কেন?” ফাবিহা অবাক হলো। টের পেলো নূরজাহান বসার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন।

“জমিটা বিক্রি করে দেব।”

“কী!” যেন ঘরের ভেতর বাজ পড়ল। ফাবিহা ফ্যাকাশে চোখে মায়ের দিকে তাকালো। বোঝাই যাচ্ছে তিনি এসব কিছুই জানতেন না। এটা তাকে আরও বেশি কষ্ট দিলো। ফরিদ কখনোই নূরজাহানকে না জানিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। এক দিনের ব্যবধানে সবকিছু কেমন রং পাল্টে ফেলল!

ফরিদ নিশ্বাস ছাড়লেন।
“আট লাখ টাকা পরিশোধ করার সাধ্য আমার নেই মা। এই ঋণ যতদিন থাকবে ততদিন বাড়বে। আট লাখ বিশ লাখ হতেও সময় নেবে না। টাকাগুলো আমার গলায় কাটার মতো ঝুলছে। আমি শান্তি পাচ্ছি না।” অসহায় ভঙ্গিতে বললেন ফরিদ। আজ যে কেমন ব্যবহার কপালে জুটেছে সেটা বলার সাহস করতে পারলেন না।

ফাবিহা বা নূরজাহান—কারোরই কিছু বলার রইলো না।

এক দিনের নোটিশে সোজা দেশের বাড়ি পাবনা চলে গেলেন তিনি। ওখানে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া তার সাত শতক জমি আছে। সেমিপাকা দুটো ঘরের একটা দালানও আছে। ফাবিহা হওয়ার পর কয়েক বছর ওখানে ছিলেন। এখানে চলে আসার পর এতদিন সেটা ফাঁকা পড়ে ছিল। বাড়িসহ জমি বিক্রি করলে নিশ্চয়ই টাকাটা উঠে আসবে! ভাবনাটা ফরিদের মনে শক্তি যোগালো। বাসের মলিন সিটে হেলান দিয়ে ঝিমুতে ঝিমুতে তিনি চিন্তা করলেন—এই সংকটকালীন সময়টা দ্রুতই কেটে যাবে।

ঘটনার আরও একটা মোড় তখনও অজানা ছিল।

দাশুড়িয়ায় তার ছোট দুই ভাই থাকেন। মেজ জনের বাড়িতে যেয়ে উঠলেন তিনি। রাতে খাবার খাওয়ার সময় ভাইকে বললেন, “জমিটা বিক্রি করব। একটু খরিদ্দার খুঁজে দিও তো। মোটামুটি একটা দাম পেলেই চলবে।” তিনি খেয়াল করেননি অপর পক্ষের খাওয়া যে ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে।

থমথমে কণ্ঠে তার ভাই বলল, “জমি বিক্রি করবেন মানে?”

“ইমারজেন্সি কিছু টাকার দরকার। জমি বিক্রি ছাড়া উপায় নেই।” প্লেট থেকে মাথা ওঠালেন ফরিদ। নিজের দুরাবস্থার বর্ণনা দিতে চাইলেন না। অথচ ভাইয়ের গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে তার কপাল কুঁচকে এলো। এতক্ষণ তো বেশ খোশ মেজাজে ছিল।

“জমি বিক্রি করতে পারবেন না।”

“কেন?” ফরিদের কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো।

“ওই জমি বিক্রি হয়ে গেছে।”

“মানে কী! আমার জমি কে বিক্রি করেছে?”

“আপার ফারায়েজের ভাগ ওখানে ছিল। সে-ই বিক্রি করেছে।” প্লেট চেটে খেলেন তিনি।

ফরিদ হতভম্ব কণ্ঠে বললেন, “আমার জমিতে ওর ফারায়েজ থাকবে কেন? ওর অংশ তো আলাদা!”

“এত কিছু জানি না। আপনি ছোট জনের সাথে কথা বলেন।” সে উঠতে গেলে ফরিদ থামিয়ে দিলেন।

রেগে আগুন হয়ে বললেন, “কোন ধরনের মশকরা এসব? তোমাদের কারোর জমির ভেতর মনিরার ফারায়েজ নেই, আমারটার মধ্যে ঢুকে গেলো কীভাবে? আর যদি ঢুকেও থাকে তাহলে তার মীমাংসা আমার সাথে হবে। তোমরা বিক্রি করার কে!” হুংকার দিয়ে উঠলেন ফরিদ। তার গলার শিরা ফুলে উঠেছে। অথচ কণ্ঠের জোর তার ভাইকে ছুঁতে পারেনি।

সে বিরক্ত হয়ে বলল, “বছরে একবারও তো এদিকে উঁকি দিয়ে দেখেননা। জমি, বাড়ি থাকলেই হয়? সেগুলো যত্ন করা লাগে না? এতদিন আমরা সব দেখে শুনে রাখছি। পেটে টান পড়েছে বলে দুদ্দাড় করে বিক্রি করে দিবেন—এইটা তো হবে না! আপনি আপনার বাকি ভাই-বোনের সাথে কথা বলেন। হুংকার দিয়ে কোনো লাভ নাই।”

এঁটো হাতে মূর্তির মতো বসে রইলেন ফরিদ। ভাইয়ের বউ এতক্ষণ আপ্যায়ন করছিল। জমি বিক্রির কথা শুনে সে অবসর নিয়েছে। খাবার ওভাবেই ফেলে রেখে তিনি ঘরে চলে গেলেন। সাথে সাথেই ছোট ভাইকে কল দিলেন। প্রথম দু’বার সে রিসিভই করল না। তৃতীয়বার কল ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, “কে?”

নিজের বড় ভাইয়ের নাম্বার সেভ না থাকায় আহত হওয়ার সুযোগ পেলেন না ফরিদ। বড় বড় ঘায়ে তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। ওসব ছোটখাট চোট এখন গায়ে লাগে না।

“তোমার বড় ভাই। তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ? জরুরি কথা আছে।”

একটু নীরবতার পর উত্তর এলো, “বলেন।”

“আমি দাশুড়িয়া এসেছি। জমির একটা ব্যবস্থা করে যাবো। কালকে দেখা করো।” ছোটজনকে বাজিয়ে দেখতে চাইলেন তিনি।

“জমির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। চোখ দিয়ে দেখে বিদায় হন। আপনার কিছু করা লাগবে না।”

“একদম অভদ্রের মতো কথা বলবে না! আমার জমি তোমরা কী ব্যবস্থা করেছ?”

“মুখ দিয়ে বললেই আমার জমি হয়ে যায় না। কাগজপত্র দেখাবেন। আমাদেরও কাগজপত্র আছে। আর তাফালিং করেও কোনো লাভ নাই। সে বাড়ি, জমি দুইটাই বিক্রি হয়ে গেছে। টাকাও ভাগ বাটোয়ারা শেষ। মেহমান হয়ে আসছেন, খেয়ে-দেয়ে রাস্তা মাপেন।” খট করে কল কেটে গেলো। ফরিদ প্রতিক্রিয়া দিতে ভুলে গেলেন। মনে হলো এই দুজন তার ভাই হতেই পারে না। দূর শহরে থাকায় তাদের সাথে ঘন ঘন সাক্ষাৎ হতো না। তবে মাসে ছয় মাসে ফোনে তো কথা হয়েছে। কখনও তো মনে হয়নি ওরা পাল্টে গেছে। নাকি শুরু থেকেই এমন ছিল? ফরিদই ধরতে পারেননি!

উপায়ান্তর হয়ে বোনকে ফোন দিলেন তিনি। তার পরেই মনিরা, মনিরার ছোট বাকি দুই ভাই।

এত রাতে ভাইয়ের ফোন পেয়ে যে মনির অবাক হয়েছে সেটা তার কণ্ঠেই স্পষ্ট। উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “সব ঠিক আছে ভাইজান?”

“মনিরা, আমি পাবনা এসেছি। জমির একটা ব্যবস্থা করতে চাইলাম। ওরা এসব কী বলে? জমি নাকি তুমি বিক্রি করে দিয়েছ?” শেষে খুব অসহায় শোনালো তার কণ্ঠস্বর।

মনিরা হাউমাউ করে উঠলেন, “জোচ্চরের দলের কথা বিশ্বাস করবেন না ভাইজান! ওরা আপনার জমি আমার ফারায়েজের নাম দিয়ে বিক্রি করছে কিন্তু আমাকে একটা টাকা দেয় নাই। আপনার জমি যে বিক্রি করছে এটা আমি জানতে পারছি বেঁচা-বিক্রির পর। ওর আব্বু ছয়মাস অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিল, একটা মানুষ আমা খোঁজ করে নাই। এর ভিতরে শয়তানের দল জমি চালান করে দিয়েছে।” ঠিক কার কার উপর মনিরা অভিযোগ করলেন—বোঝা গেলো না।

ভগ্ন কণ্ঠে ফরিদ বললেন, “আমি কি কিছুই পাবো না?”

“ছয় মাস ধরে ওখানে নতুন মানুষ উঠেছে ভাইজান। তাদের কাছে কাগজপত্র আছে। আপনি আমি চাইলেই কিছু করতে পারব না।”

কাজেই এ রাতটাও নির্ঘুম কাটল। সকাল সকাল না খেয়েই বেরিয়ে গেলেন ফরিদ। কাউকে কিছু বললেনও না। নিজের বাড়িতে গেলেন। সেখানকার বাসিন্দার সাথে কথা বলে, তার কাগজপত্র দেখে বুঝতে পারলেন—কোনো কিছুই আর তার নেই।

শেষ ভরসা হিসেবে পরিচিত দুজনকে নিয়ে ভূমি অফিসে গেলেন। শিরোনাম তার জানা ছিল। বিস্তারিতও দেখা হলো। ওখানে ঘরে ঢুকে বসতেও যেন গোটা কয়েক বান্ডিল দরকার। শুকনো মুখে কোনো কাজই হলো না। উল্টো ভর্ৎসনা করে তাকে বের করে দেয়া হলো—আপন ভাইদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপের অভিযোগে।

আর থাকতে পারছিলেন না ফরিদ। পত্রপাঠ বিদায় নিলেন।

বেপরোয়া গতিতে বাস চলছে। তার নিচে দিগন্ত বিস্তৃত মাটি। অথচ ফরিদের মনে হচ্ছিল তার জন্য পৃথিবী সংকুচিত হয়ে গেছে। কোথাও কোনো কূল নেই, এই বিপদের তরী থেকে উত্তরণের কোনো ঘাট নেই।

সেদিন বাড়ি ফিরেই কঠিন জ্বরে পড়লেন তিনি।

*****

জুবায়ের বুঝতে পারছিল সাকিন তাকে চিনতে পারেনি। এক পলক তাকিয়ে নিজের ইচ্ছায় হেঁটে এলো। তার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল ধৃত হওয়ার জন্য। তার চোখের ভাব শান্ত। কোনো উৎকন্ঠা নেই, উৎকীর্ণতা নেই। যেন সে জানেই—কী হতে চলেছে।

জুবায়ের পেছন ফিরে আকরামের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “ইনিই আপনার আসামী।”

“হ্.. হ্যাঁ!” মনে মনে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছিলেন আকরাম। সেই ক্ষণে জুবায়েরের দৃষ্টিতে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। ইতোমধ্যেই তিনজন সাক্ষী তৈরি করা হয়ে গেছে। ওরা কালিমা পড়ে সাক্ষী দেবে সাকিন তাদের থেকে গত সপ্তাহেই হিরোইন কিনেছে। এর মাঝে একজন আবার আছে স্কুলের ছাত্র। অনাথ সে ছেলেকে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে কেনা হয়েছে। কলেজ গেটে সাকিন যে তাকে নেশার লোভ দেখাতো এটা বলতে পারলেই তার জীবন ধন্য।

জুবায়েরের অভিজ্ঞতা অনেক না হলেও কিছু কম নয়। মুখ দেখে মানুষ চেনার শিল্প বেশ খানিকটা রপ্ত করে ফেলেছে সে। কিন্তু তাতেই রায় দেয়া চলে না। আইনের মারপ্যাঁচ সে জানে। ওই প্যাঁচে সাকিনের মতো মানুষেরাই আটকে যায়। সে প্যাঁচ ছাড়াতে না পারলেও নতুন প্যাঁচ গড়াতে পারবে জুবায়ের। মায়ের রক্তের এটুকু দাম শোধ করাই যায়।

গমগমে কণ্ঠে সে বলল, “পুরো বাড়ি সার্চ করা হবে!”

“কেন!” প্রায় চিৎকার করে উঠলেন আকরাম। “আসামী আপনার সামনে। আমরা ওর আলমারির কোন জায়গা থেকে কী পেয়েছি সেটাও দেখাচ্ছি। পুরো বাড়ি সার্চের ওয়ারেন্ট আছে আপনার কাছে?” ভয়টা সামলে নিয়ে বেশ মেজাজী কণ্ঠে বললেন তিনি।

জুবায়ের পেছনে ফোর্সকে চোখের ইশারা দিয়ে আকরামকে ধরে রাখলেন। মুহূর্তেই বাকি তিনজনকে এক ঘরে বন্ধ করে নিঃশব্দে তল্লাশি শুরু হলো।

জুবায়ের এক পা এগিয়ে এসে আকরামকে নিচু কণ্ঠে বললেন, “এর চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যায় ঘাপলা আছে। বাড়ির কোথায় আর কী করে রেখেছে আপনি জানবেন কীভাবে! আপনাকে সহজ-সরল পেয়ে ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙেছে।”

আকরাম মনে মনে বললেন, “ছাগল হওয়ার দরকার ছিল তোর! পুলিশ হয়েছিস কোন দুঃখে? ছাগলের চোখ তাও ঘাস চিনে, তুই তো সেটাও চিনিস না!”

মুখে বললেন, “তা ঠিক। কিন্তু আমার বাড়িতে যদি ওয়ারেন্ট ছাড়া সার্চ করেন সেটা আমার রেপুটেশনের জন্য ক্ষতিকর। আপনি ওয়ারেন্ট নিয়ে আসুন। আমরা বাড়ি ছেড়ে কেউ বের হচ্ছি না। চাইলে পাহারা বসিয়ে যেতে পারেন।”

মাথা নেড়ে জুবায়ের বলল, “ঠিক আছে। তাই হবে।” আড়চোখে পেছনে তাকিয়ে অবস্থা দেখল। একজন হাতের ইশারায় বোঝালো কাজ হয়ে গেছে। চিরুনি তল্লাশি এখন সম্ভব না, উপর দিয়ে একটা চোখ ঘুরিয়ে নেয়াটাই যথেষ্ট। সেটুকু শেষ হলে সাকিনের দিকে ফিরল জুবায়ের।

বলল, “চলুন!”

সাকিন হাঁটতে গেলে আকরাম চেঁচিয়ে উঠলেন, “হাতকড়া পরান ওকে! হাতকড়া পরান! শয়তান আমার মেয়ের দিকে চোখ তুলেছিল। দুই নম্বর কোম্পানির সাথে চুক্তি করে চারটা মানুষকে মেরেছে। ওর নামে রেপ, মার্ডার কেস করব আমি!”

“অবশ্যই! আপনি থানায় আসুন। পুলিশের হাতই হাতকড়া। আলাদা করে না পরালেও সমস্যা নেই। আপনি আসুন।”

বলে দরজা ছাড়ল জুবায়ের। তার পিছু পিছু সাকিন। নিশ্চুপ ভঙ্গিতে সে জিপে যেয়ে উঠল। ফিরে চাইলো সাত বছর ধরে থাকা বাড়িটায়। আঙিনা লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। অপরাধীকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসীর আনন্দের শেষ নেই।

জিপ থেকে নেমে থানায় যাওয়ার পথে জুবায়ের নিচু কণ্ঠে বলল, “ভাই আমাকে চিনতে পারেন নাই?”

সাকিন অবাক হয়ে তাকালো। বিব্রত কণ্ঠে বলল, “না তো?”

জুবায়ের সুন্দর করে হাসল, “আমার মাকে রক্ত দিলেন। মনে নাই?”

“ওহ! মনে পড়েছে!” সাকিনের কপালের ভাঁজ সমান হলো, “আপনি এই থানায়?”

“রিসেন্ট ট্রান্সফার হয়েছি। সবই কপাল! আল্লাহ আপনার খাতিরদারি করতে আমাকে পাঠিয়েছেন।” কথাটা প্রহসন ছিল কি না ধরতে পারল না সাকিন। চুপ থাকাই উচিত মনে করল।

নিজের কক্ষে আসতেই এক কনস্টেবল ছুটে এলো জুবায়েরের কাছে। তার হাতে একটা ফাইল ধরিয়ে দিয়ে বলল, “বাড়ির মেয়েটা লুকিয়ে দিল।”

জুবায়ের অবাক হয়ে বলল, “কে? আকরাম খানের মেয়ে?”

“তাই তো বলল।”

ফাইল খুলতেই হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে গেলো জুবায়েরের মুখ। পৃথিবীতে কত রকম প্রহসনই না ঘটে চলেছে!

চলমান~

(কালকে আরেক পর্ব চান নাকি? 😏
কী করতে হবে জানেন তো?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 14 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন