#বনজোছনা
১৫.
ইংরেজিতে একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে, Morning shows the day. কিন্তু ফাবিহার ক্ষেত্রে সে প্রবাদ ফলল না। দিনের অর্ধেক কাটলো আশ্বিনের সাদা মেঘের ভেলায়। সময় গড়াতেই তুলোর মত মেঘগুলো কৃষ্ণকায় হয়ে দানবীয় ঝড়ের আগাম বার্তা বয়ে নিয়ে এলো।
গতকাল ফরিদ ঝড়ের বেগে উড়ে যাওয়ার পর থেকেই ফাবিহা চিন্তায় হাবুডুবু খাচ্ছে। চাচাদের সাথে তাদের তেমন মাখো মাখো সম্পর্ক নেই। থাকার মাঝে এক ফুপুর সাথেই একটু আধটু যোগাযোগ হয়। মূলত মনিরার জন্যই যোগাযোগটা টিকে আছে। চাচাদের ফোন দিয়ে পাওয়াই যায় না। তারাও খুব একটা যে যোগাযোগ রাখতে চায়—তেমনও না। সেই তাদের কাছেই যেয়ে উঠেছে ফরিদ। জমিজমার ব্যাপার তো খুব প্যাঁচালো। তারা কেমন কি সাহায্য করবে কে জানে। তার উপরে সকালে বাবার সাথে কেবল একবার কথা হয়েছে। তারপর ফোন দিলেও তিনি কেটে দিয়েছেন। ব্যস্ত বুঝে ফাবিহা আর কল দেয়নি।
অথচ এই পুরো কাজটায় নূরজাহান ছিলেন দর্শক। স্বামীকে নিজে থেকে একটা ফোন করার সাহসও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। যখন যা বলা দরকার, মেয়েকে মুখপাত্র করে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। ফাবিহার প্রথমে বিরক্ত লাগল, তারপর হতাশা। সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে!
এলোমেলো হলেও জীবন তার নিজস্ব গতিতেই বহমান। ব্যাগ কাঁধে ঠিক ভার্সিটিতে যেতে হয়। পঁচাত্তর পার্সেন্ট উপস্থিতি না এলে পরীক্ষায় বসতে আবার নানান ঝামেলা পোহাতে হবে। এমনিতেই ঝামেলার শেষ নেই, উপরি আরও কিছু চায় না বলে ফাবিহা আর ক্লাস মিস না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
সে যখন বাড়িতে ফিরেছে—তখন যোহরের নামাজের আর ঘণ্টা দেড়েক সময় বাকি। কোনো রকমে গোসল সেরেই নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল ফাবিহা। গামছায় পেঁচিয়ে রাখা ভেজা চুলের পানিতে পিঠের জামা ভিজে গেছে। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। অসম্ভব বিরক্ত হলো সে। মনোযোগ বারবার ওদিকে চলে যাচ্ছে।
সুন্নত শেষ করে গামছা খুলে রাখবে, সে সময় বসার ঘর থেকে নূরজাহানের উচ্চকণ্ঠ শোনা গেলো। তার বুকটা ধ্বক করে উঠল। ছুটতে যেয়েও থেমে গেলো ফাবিহা। নিশ্চয়ই আরেকটা দুঃসংবাদ চৌকাঠে কড়া নেড়েছে। দোনামনা করে নামাজেই দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ওখানে গেলে এ বেলায় আর নামাজটা পড়া হবে না। তাছাড়া আগমনী ধাক্কার প্রস্তুতি হিসেবে জায়নামাজ থেকে আরেকটু সাহস কুড়িয়ে নেয়া দরকার। দুরুদুরু বুকে ছয় রাকাত শেষ করল সে। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করল ধাক্কাটা যেন সয়ে যাওয়ার মতো হয়। ধীরে-সুস্থে হিজাব খুলে রাখছে—সে সময় নূরজাহান হাঁক ছাড়লেন—ফাবিহা!
ঘাড় ঘুরিয়ে সিমিকে দেখল ফাবিহা। দরজায় দাঁড়ানো ওর শুকনো মুখটা দেখে কত নম্বর সতর্ক সংকেত তা আন্দাজ করতে পারল না।
নূরজাহান মেঝেতে হতোদ্যম ভঙ্গিতে বসে আছেন। বসার ধরণই বলে দিচ্ছে আরেকটা বিপদ হানা দিয়েছে। বাবার কিছু হয়নি তো? ভাবনাটা তাকে শঙ্কিত করে তুলল। মায়ের পাশে বসে সে বলল, “কী হয়েছে আম্মু?”
নূরজাহান সহসাই কিছু বলতে পারলেন না। কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন। ফাবিহা হাট ঝাঁকালো, “আম্মু!”
“তোর খালা কী বলে ফাবিহা!”
“কী বলছে?” ফাবিহার কপাল কুচকে এলো। এর মানে বাবা ভালো আছে। যাক!
সে সময় শেলীর ফোন এলো। নূরজাহান ধরার সাহস পেলেন না। মেয়ের দিকে ঠেলে দিলেন।
“আসসালামু আলাইকুম।” শান্ত কণ্ঠে সালাম দিল ফাবিহা।
শেলী জ্বলে উঠলেন, “বেহায়া মেয়ে! তোর সালাম তুই গুলে খা! এই কী করেছিস তুই?”
আচমকা আক্রমণের হেতু সন্ধান করতে পারল না ফাবিহা। তার কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো।
“কী করেছি?”
“একদম সাধু সাজবি না! সজীব এসব কী বলছে আমাকে?”
“সেটা তো তুমি জানবা!” অবাক হয়ে বলল ফাবিহা। সজীবের কথা ওঠায় মনে পড়ল গতকাল সে কম করেও তিরিশটা মেসেজ পাঠিয়েছে। ওরকম সংকটময় মুহূর্তে লোকটার সাথে মোটেই ফালতু আলাপ করতে ইচ্ছে করছিল না তার। কাজেই চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ওটাকে আর্কাইভে ফেলে রেখেছে। এজন্যই কি খালার কাছে নোটিশ পাঠিয়েছে?
“চড়িয়ে গাল লাল করে ফেলব! কয়টা ছেলে লাগে তোর? সজীবের কোন বন্ধুর সাথে তুই…” কথা শেষ করলেন না তিনি। মনে হলো বাকিটুকু ঘৃণায় বলতে পারলেন না।
“ভদ্রভাবে কথা বলো খালা। মুরুব্বি বলে মুখে যেটা আসবে সেটাই বলতে পারবে না।” থমথমে কণ্ঠে বলল ফাবিহা। তার মাথায় চিন্তার ঝড়। সজীব কী এমন বলেছে?
“তোর মতো মেয়ের সাথে কীসের ভদ্রতা? তোদের এই দুরবস্থার কথা কত রেখে-ঢেকে সজীবকে বললাম! ছেলে ভালো মানুষের মতো শুনে গেলো। এটাও বলল—ফাবিহার সমস্যা মানেই তো আমার সমস্যা! সেই ছেলে এখন কীভাবে বিয়ে ভাঙার কথা বলে?”
ফাবিহার কপালের ভাঁজ সমান হয়ে গেলো, “কী বলেছে সজীব ভাই?”
“আবার আমার মুখে শুনতে চাচ্ছিস! যেদিন ওর সাথে বিয়েতে গিয়েছিলি সেদিন যে বন্ধুর সাথে ও আলাপ করিয়ে দিয়েছিল—সেই বন্ধু সজীবের বাবার কাছে ফোন করে বলেছে তুই যে কীভাবে ওকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাস। ওর সাথে নাকি ঘুরতেও গেছিস! ছি ছি! সজীবের সাথে বের হতে বললেই তো তোর আর তোর বাপের সতীত্ব উথলে ওঠে! ওর বন্ধুর সাথে যাওয়ার সময় এসব নাটক কোথায় ছিল? নিজের গায়ে কাদা তো মাখালিই, আমার মান-সম্মানও ডোবালি। অসভ্য, বেহায়া মেয়ে! আর যদি আমাকে ফোন দিয়েছিস তোরা কেউ!” খট করে লাইন কেটে গেলো।
ফোন রেখে অনেকক্ষণ ধরে বসে রইলো ফাবিহা। ঠোঁট কামড়ে চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইলো। আচমকা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “খালা ঋণের বিষয়ে কখন জানল?”
সোফায় মাথা এলিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে রইলেন নূরজাহান। বোজা কণ্ঠে বললেন, “ও আগে থেকেই জানে।
“আগে থেকে মানে!” ফাবিহা অবাক হয়ে তাকালো।
“ওকেই বলেছিলাম, কীভাবে কী করব।”
“কী বলেছিল খালা?”
নূরজাহান নিশ্বাস ছাড়লেন। কাল বাপের কাছে বলতে হয়েছে, আজ মেয়ের কাছে স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন। বাকি জীবন বোধহয় তাকে স্বীকারোক্তি দিয়েই কাটাতে হবে।
“অল্প সুদের একটা কিস্তি নিয়ে দিয়েছিল।”
ফাবিহা সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করল, “সাক্ষী কে ছিল? খালা?”
“হ্যাঁ।”
ফাবিহা ঝটপট ঘরে চলে গেলো। ফোন নিয়ে আর্কাইভ থেকে সজীবের নাম্বার বের করে মেসেজগুলো একে একে পড়তে শুরু করল।
“ফাবিহা! কী শুনছি! তোমাদের নাকি কোটি টাকার লোন?”
“এত লোন দিয়ে করেছটা কী তোমরা?”
“এই ওয়েট! এজন্যই তোমার বাবা এক কথায় বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে তাই না?”
“তুমি প্রথমে ভং ধরে একটু দাম কিনলে যেন আমি সন্দেহ না করি!”
“এই সব লোন আমার পকেটে থেকে দেয়ার ফন্দি! ও মাই গড!”
“তোমার ভাই তো টোটাল ডিজাস্টার। শুনলাম নেশাপানিও ধরেছে। সেজন্য আমাকে এই নাচ নাচালে তাই না? চমৎকার!”
ফাবিহা স্ক্রল করেই গেলো। মিনিটে পাঁচ সাতটা করে মেসেজ দিয়েছে। যা মনে এসেছে সব লিখেছে।
“এসব হবে না ডিয়ার! আমার পকেটে থেকে এই রাবিশ রিজনে আমি এক টাকাও খসাবো না।”
“এই ওয়েট! এই কথা আসছেই কেন এখন!”
“যে ফ্যামিলি এমন জোচ্চর তাদের সাথে সম্পর্ক করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না!”
“নেহায়েত তোমাকে ভালো লেগেছিল। নাহলে এমন সি-গ্রেড ফ্যামিলির ধারে কাছেও আমি ঘেষি না।”
“কান খুলে শুনে রাখো, তোমাকে আমি রিজেক্ট করছি।” মেসেজটা পড়ার সাথে সাথেই এটার স্ক্রিনশট নিয়ে রাখল ফাবিহা। একেকটা মেসেজের সাথে চরম আনন্দের অবাধ্য ঢেউ বুকের ভেতর শব্দ করে আছড়ে পড়ছে।
“ভালো মানুষের মতো আংটি ফেরত দেবে।”
“আর আমাকে যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছো এজন্য একটা শাস্তি তো তোমার পাওনা। Just wait and see!”
মেসেজ শেষ। ফাবিহার মনে হলো সে নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পলক ফেললেই ভেসে ভেসে উঠছে কমিউনিটি সেন্টারের ঝকঝকে দোতলা ফ্লোর। তাকে কোণঠাসা করার জন্য বন্ধুর হাতে তুলে দেয়া সজীবের চেহারা, ফাবিহার আকুতি, সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য কসম খাওয়া—সবকিছু চলচ্চিত্রের মতো চোখে ভেসে উঠল। ফাবিহা বিশ্বাস করতে পারল না পাশার দান এভাবেও উল্টে যায়! তার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। বুকটা কাঁপছে। ফের মেসেজগুলো দেখল সে। না স্বপ্ন নয়, নিরেট বাস্তব।
কম্পনরত কন্ঠেই সে বলল, “watch হবে গাধা! see না!”
তড়িঘড়ি করে বিছানায় ফেলে রাখা হিজাবটা আবার গায়ে চড়াল সে। ঝাপসা চোখে জায়নামাজ যে উল্টো বিছিয়ে দাঁড়াল—তা সে খেয়াল করলে তো! কিরাত থেকে সিজদার দূরত্বটুকুও আজ বড় ভারী মনে হলো। সে ভেবে রেখেছিল সিজদায় পড়ে অসংখ্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে। কিন্তু হলো তার উল্টো। কিচ্ছুটি বলতে পারল না ফাবিহা। যেন তাকে বোবায় ধরেছে!
কৃতজ্ঞতার জলে জায়নামাজ ভিজে গেলো। এই ভেজা ভাব তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারল না। ফাবিহা তখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না—সে বেঁচে গেছে। কত সহজভাবে সে বেঁচে গেলো! ঝড়টা তার জীবনের অভিশপ্ত একটা গাছ উপড়ে ফেলেছে। বিপদটা শাপে বর হয়ে এসেছে।
ফাবিহা—তার রবের উপরে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা মেয়েটা জানে না—দুঃখ একটা ভাঙন, জীবনটাকে ভেঙে সে নতুন রূপে সাজায়।
—
দিনের অর্ধেক যে স্বপ্ন স্বপ্ন অনুভূতিতে কাটল—সেটা কাচের টুকরোর মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সন্ধ্যার পরপর।
একটা মেয়ের নামে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে অপবাদ ছড়ানো যায়—সজীব সেটাই ছড়িয়েছে। ফাবিহা তার বন্ধুর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সে সম্পর্কের গভীরতা এতখানি যে ওকে এখন আর অস্পৃশ্যা বলা যায় না। এমন মেয়েকে ঘরে তুলে কে-ই বা নিজের মান নষ্ট করবে? কাজেই তিন বছরের বিয়ে-বিয়ে নাটকের পর্দা ওখানেই নেমে গেলো।
এই কলঙ্কে ফাবিহার কিছু এলো গেলো না। সজীবের থেকে মুক্তি পাওয়ার বিনিময়ে সে নিজের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত সহ্য করে যেতে পারে। সেখানে এই মিথ্যে রটনা কিছুই নয়। তার উপরে তার বিশ্বাসের পারদ আজ দুপুরেই আকাশ ছুঁয়ে গেছে। ফাবিহা চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে এই রটনার পথ ধরেই তার জীবনে চমৎকার কিছু একটা হবে, হবেই!
অংকের হিসেব মেলাতে তার সময় লাগল না। আংটিবদল বাতিল করে সজীবের পরিবার নিরাপদ অবস্থানে সরে পড়েছে। কিন্তু শেলী একা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকবেন—তা কীভাবে সম্ভব! কাজেই সম্মানের ছুঁতো দিয়ে তিনিও কলের সাথে সাথে সম্পর্কের সুতো কেটে দিয়েছেন। সাক্ষী বলেই তার ঘাড়ে এখন আর কিছু চাপানো যাবে না। এসব মনে করে একটু পর পরই হাসছিল ফাবিহা। তাই দেখে সিমি চোখমুখ কুঁচকে বলল, “আপনার হয়েছে কী ছোট আপা? বিয়ে ভাঙার জন্য তো আপনার কষ্ট পাওয়ার কথা না। গুজব শুনে কি শোকে পাগল হয়ে গেলেন?”
ফাবিহা ঝট করে সিমিকে জড়িয়ে ধরলো। অবাক মেয়েটাকে বলল, “সিমি রে! মনে হচ্ছে আমি সাক্ষাৎ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে গেছি।”
সিমি ছোট আপার হাসি মুখটা দেখল। কিন্তু সে খুশি হতে পারল না। মিনমিন করে বলল, “কিন্তু খচ্চরগুলো যে বাজে কথা ছড়িয়ে দিল?”
ফাবিহা বন্ধন আরও শক্ত করল। ইতোমধ্যেই দু’চারজন প্রতিবেশী মারফত নিজের কীর্তির খবর পেয়ে গেছে সে। শেলীর হাত যে এতদূর এটা চিন্তা করেনি।
সে হেসে বলল, “ঝড়ের আগে বিদ্যুৎ চমকায়, মেঘ ডাকে, ঝড়ের সময় ধুলো-বালি উড়ে সব নোংরা হয়ে যায়। তারপর আল্লাহ বৃষ্টি দেন। সেই পানিতে সব ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। আগের জমানো ময়লাও পরিষ্কার হয়ে যায়। আমাদের এখন ধুলো-বালি ওড়ার পর্ব চলছে সিমি। পর্বটা লম্বা হচ্ছে। একসময় বৃষ্টি হবে, সব পরিষ্কার হয়ে আগের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে যাবে। আমি সেই বৃষ্টির অপেক্ষায় আছি।”
ফাবিহার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সিমি। মনে মনে বলল—আল্লাহ্! ধূলা-বালির এই পর্বের চেয়ে তোমার রহমতের বৃষ্টির পর্ব ছোট আপার জীবনে আরও অনেক বেশি সময় ধরে দিও।
মাগরিবের পরপর ফাবিহার স্বপ্নভঙ্গ হলো। কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরলেন ফরিদ। তাকে জাপটে ধরে প্রাণপণে চেঁচালেন নূরজাহান—ফাবিহা! ফাবিহা রে!
ফাবিহা দৌড়ে এসে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। সিমির ডাকে ছুটে যেয়ে দুজনে মিলে ফরিদকে সোফায় বসাতেই তিনি দেহ ছেড়ে দিলেন। ফাবিহা বাবার গালে, কপালে হাত বুলিয়ে বলল, “ও বাবা! কী হয়েছে?” তার কণ্ঠের শঙ্কা জ্বরতপ্ত ফরিদ টের পেলেন না।
নূরজাহান ছুটে যেয়ে গামছা ভিজিয়ে আনলেন। স্বামীর মাথায় চাপা দিয়ে সিমিকে বললেন তৎক্ষণাৎ খাবারের ব্যবস্থা করতে।
ফরিদ নিভু নিভু চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন, “ফাবিহা! মা রে!” ডুকরে উঠলেন তিনি।
ফাবিহা আরও খানিকটা এগিয়ে এলো, “বলো বাবা! কাঁদছ কেন!”
নূরজাহান ফ্যাকাশে চেহারায় স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছেন।
ফরিদ ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বললেন, “ওরা আমার সব জমি বিক্রি করে দিয়েছে মা রে! আমার তো আর কিচ্ছু থাকলো না। নূরজাহান! ওরা আমাকে সর্বশান্ত করে দিলো!”
ফরিদ প্রলাপ বকতে শুরু করলেন। নূরজাহান প্রথমটায় নড়তেই ভুলে গিয়েছিলেন। সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তার চোখ অন্ধকার হয়ে আসছিল। বাবার গলা, বুক মুছতে মুছতে ফাবিহা তাগাদা দিলো—বাবাকে খাওয়াও আম্মু! ওষুধ খাওয়ানো লাগবে!
নূরজাহান ছুটতে চাইলেন। কিন্তু শরীরে জোর পেলেন না। ঋণের পাহাড়ে নিশ্বাস নেয়া দায়, মেয়েটার বিয়ে ভেঙে গেলো, বিশ্রী একটা অপবাদ রটে গেল, জমি-জমা সব হাতছাড়া হয়ে গেলো—আর কী হারানোর আছে? অন্যমনস্ক নূরজাহান গরম হাঁড়িতে ছ্যাকা খেলেন কিন্তু কিছুই অনুভব করতে পারলেন না।
অপরদিকে ফাবিহার চোখমুখ স্বাভাবিক। প্রতি পদে পদে তার বিশ্বাসের তরল দৃঢ়ীভূত হয়ে চলেছে। ধূলিঝড় যত সাংঘাতিক হবে, বৃষ্টিটাও তত শান্তিময় হবে। ফাবিহা সে বৃষ্টির অপেক্ষায় একটা জীবন স্বচ্ছন্দে ধূলিঝড়ে কাটিয়ে দিতে পারে।
চলমান~
(প্রিয় ফুলেরা! তিনটে দিন আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এই প্রথম কোনো রানিংয়ের মাঝে এসে তিনশোর আশেপাশে রেসপন্স পাচ্ছি। এটা অবশ্যই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাচিভমেন্ট। সেই অ্যাচিভমেন্ট পাইয়ে দিয়েছেন আপনারা। আমার একবুক কৃতজ্ঞতা জানবেন।
ছুটি ফুরিয়েছে। কাল থেকে আবার ক্লাস শুরু। একদিন বিরতির সে রুটিনে ফিরে গেলাম। এর মাঝে যদি লিখে শেষ করতে পারি—তবে আগেই দিয়ে দেব ইনশাআল্লাহ্। আপনাদের অপেক্ষায় রাখতে আমি মোটেও পছন্দ করি না—এটুকু বিশ্বাস করেন তো?)