#বনজোছনা
১৬.
সাকিন বুঝতে পারছে না তার সাথে ঠিক কী করা হবে। পুলিশি বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা শুন্যের কোঠায়। তবে তা হলেও চোখ বন্ধ করে সে বলতে পারে—এমন যত্ন-আত্তি করার জন্য পুলিশ কাউকে ধরে আনে না। সেখানে সে মোটামুটি কট ইন রেড হ্যান্ড। সেখানে জুবায়ের নামের লোকটা আসার পর তাকে এক কাপ চা খাইয়েছে। সকালে যেহেতু কিছু পেটে পড়েনি তাই একটু খারাপ লাগছিল বটে। অবস্থা বুঝে সে ব্যক্তি একটা পরোটাও আনিয়েছে। সাকিনের সব কিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এটা কোন ধারার বিচার? ওদিকে জুবায়ের নির্বিকার। সে সমস্ত মনোযোগ একাট্টা করে একটা ফাইল পড়ছে। সাকিন উশখুশ করল। পিঠ ব্যাথা করছে। দু'ঘন্টা তো হবেই এই চেয়ারে ঠায় বসে আছে।
ফাইল দেখতে দেখতে জুবায়ের বলল, “আপনার চাকরির খবর কতদূর?” তার চোখ কাগজের দিকে সেঁটে আছে।
সাকিন এক নজর তাকালো, “আর চাকরি!” দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে।
“কেন? ভেরিফিকেশনে সমস্যা হয়েছে?”
“হয়নি। এবার হবে।”
“শিক্ষক মানুষ এত দ্রুত হাল ছাড়লে চলবে! ছাত্র-ছাত্রীদের কে সাহস দেবে তাহলে?” জুবায়েরের ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি।
সাকিন বুঝতে পারছে না তার বিরুদ্ধে এমন নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনার পরও জুবায়ের কীভাবে এত খোশমেজাজে আছে! পরক্ষণেই সে চিন্তা ত্যাগ করল। জুবায়ের পুলিশ মানুষ। এমন দু’চারটে কেস রোজই তার কাছে আসে। বিচলিত হলে তার চলবে কেন!
সাকিন ছোট করে শ্বাস ছেড়ে বলল, “বজ্র আঁটুনি। বিচারের ঝামেলাটা শেষ হতে কতদিন লাগবে?”
জুবায়েরের হাসি বাড়ল, “বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো।” বলে ফাইল বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো সে। সাকিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে হয়তো আজ এখানে থাকতে হবে না। কিন্তু আপনি যে আপাতত খালাস পাচ্ছেন এটা পাঁচ কান করবেন না। আমি থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। দুটো দিন সেখানে থাকুন। ততদিনে আশা করি ঝামেলাটা ফুরিয়ে আসবে।”
সাকিন অবাক হয়ে বলল, “আমি আসলে কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“পুরোটা আমিও এখনও বুঝিনি। বুঝেই আপনাকে জানাবো।” মাথা নেড়ে বলল জুবায়ের। সাকিনের কাছে এসে বলল, “সাকিন ভাই, আপনি জয়েনের পরপর যত দ্রুত সম্ভব ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করবেন। শুরুতে অবশ্য ট্রান্সফার করতে দেয় না। আমি দেখব, সমস্যা নেই। আপনি শর্ট টাইমের ভেতর শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন।”
সাকিনকে দোলাচলে ডুবিয়ে জুবায়ের চলে গেলো। এই মুহূর্তে সে কী করবে—সেটাও বলে গেলো না। কাঠের বেঞ্চটায় কোনামতে শুয়ে পড়ল সে। যা হবে দেখা যাবে। আপাতত একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক। চোখ বন্ধ করতেই একটা প্রশ্নে তার খটকা লাগলো — জুবায়ের একবারও কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। কেন?
—
ডায়েরি করার জন্য আকরাম এসেছেন প্রায় তিন ঘণ্টা পর। জুবায়ের হেসে বলল, “রাস্তায় জ্যাম পড়েছিল নাকি?”
স্পষ্ট খোঁচা। কটমট করে তাকালেন আকরাম। এই হাঁটুর বয়সী ছেলের হাবভাব বুঝতে পারছেন না তিনি। এক আধবার মনে হচ্ছে বোকার হদ্দ, তারপরই মন বলছে মহা ধূর্ত।
“বাড়ির পরিবেশ ঠান্ডা করে আসতে সময় লাগল।”
“আচ্ছা আচ্ছা!” ঘাড় নাড়তে নাড়তে জুবায়ের পেছনে কনস্টেবলকে ইশারা করল। সংকেত পেয়েই কাজে নেমে পড়ল সে।
খাতা বের করল জুবায়ের, “বলুন।”
গড়গড় করে জমিয়ে রাখা কথাগুলো উগলে দিলেন আকরাম। জুবায়ের মনযোগী হয়ে সবটা শুনল, টুকে নিলো।
সবটা ঠিকমতো বলতে পারে আকরাম খান যেই না স্বস্তির নিশ্বাস নিলেন ওমনি জুবায়ের বলল, “নিজাম—আপনার ফার্মেসির এই লোকটা কোথায়?”
আকরাম একটুও থতমত খেলেন না, “বেশ কিছুদিন আগেই গ্রামের বাড়িতে গেছে।”
“কোনো বিশেষ দরকার?”
“অনেকদিন যায় না। এজন্য বোধহয়।”
“এজন্য সেদিনই যেতে হলো?”
আকরাম খান চোখা চোখে তাকালেন, “কী বলতে চাচ্ছেন আপনি!”
জুবায়ের সুন্দর করে হাসল, “বেশিরভাগ ডিলিংস আপনি সাইন করেন। ওটা ভাগ্নেকে দিয়ে করালেন কেন?”
“আমি তখন ব্যস্ত ছিলাম। পেপার পড়ে, সাইন করার মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না।”
“এখন ব্যস্ততা কমেছে তো?”
“বেশি একটা না। তাও ঝামেলা যখন হয়েছেই..!” নিশ্বাস ছাড়লেন আকরাম। তার চেহারার পরতে পরতে হতাশা। যেন এই একটা দিনের ক্ষতি তিনি পুষিয়ে উঠতে পারবেন না।
“জি, আপনার শিডিউল বের করা উচিত।” অর্থপূর্ণ ভঙ্গিতে বলল জুবায়ের।
“কেন?”
“এখন তো একটু দৌড়াদৌড়ি হবে না! আপনি আইনের লোক। এর কাহিনী তো জানেনই। আপনাকে আর কী বলব!”
আকরাম খান খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলো না।
জুবায়ের বলল, “আপনার মেয়ের একটা স্টেটমেন্ট লাগবে।”
“কিসের স্টেটমেন্ট! ও এখনও নাবালিকা।”
“নাবালিকা হলেই যে স্টেটমেন্ট দেয়া যাবে না—এমন কোনো নিয়ম কিন্তু নেই! যেহেতু তাকে কেন্দ্র করেই একটা চার্জ আনা হয়েছে সেজন্য তার একটা লিখিত বক্তব্য দরকার। সাথে নিজাম উদ্দিনকেও খবর দিন। ওষুধ কোম্পানির সাথে সাকিন সাহেব আর কী কী ঘটনা ঘটিয়েছেন—সেটার কোনো হদিস তার কাছে থাকলেও থাকতে পারে।”
আকরাম উঠে দাঁড়ালেন। জুবায়ের বলল, “আজকের ভেতরেই আসুন। কেস কোর্টে চালান করার জন্য ভালো করে গোছাতে হবে।”
“ঠিকাছে।” বলে উল্টো ঘুরলেন আকরাম। ঠিক সে সময় জুবায়ের মসৃণ ভঙ্গিতে হেসে বো-মাটা ফাটালো।
“আকরাম সাহেব! বিলুর দল আপনাকে একটা কেস দিয়েছিল—সেটার খবর ভালো তো?”
বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন আকরাম। তার মনে হলো তিনি নড়তে ভুলে গেছেন। জুবায়েরের হাসি বিস্তৃত হলো।
“আসুন আকরাম সাহেব, তাড়াতাড়িই আসুন।”
সেদিন বিকেলের ভেতরেই সাকিনকে সরিয়ে ফেলা হলো। সাকিন নিজেও বলতে পারল না সেটা কোন জায়গায়। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল পা পিছলে একটা বিশাল জালের ভেতর পেঁচিয়ে গেছে সে। চাইলেই ওখান থেকে ছুটে আসা সম্ভব না। তবে আশার কথা হলো—জুবায়ের লোকটা খুব হিসেব-নিকেশ করে কোনো পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। তার চোখ দুটো দেখলেই মনে হয় সাকিন একদিন এখান থেকে ছাড়া পাবেই!
*****
ফরিদ আহমেদের জ্বর নামাতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হলো। তিন বয়সী তিন মহিলার পক্ষে কাজটা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। পুরোটা দিন ঘুরে ঘুরে ফারদিন রাতে যখন ফিরল—তখন নূরজাহান ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ফরিদকে চোখের দেখা দেখে নিজের ঘরের দুয়ার দিলো সে। তাই দেখে হু হু করে কেঁদে উঠলেন নূরজাহান। তার গোছানো সংসারটা নিমিষেই এলোমেলো হয়ে গেছে। আর এমনভাবেই এলোমেলো হয়েছে যে তা যে আবার কোনোদিন পরিপাটি হবে—সে আশা অবধি নেই।
পরদিন সকালে ফরিদ সুস্থ হয়ে উঠলেন বটে। তবে আগমনী ঝড়ের তোপ কীভাবে সামলে উঠবেন—সে চিন্তায় তার দূর্বল শরীর আরো ভেঙে পড়লেন। দুটো দিন বন্ধ থাকার পর তিনি যখন কোচিংয়ে গেলেন—আবিষ্কার করলেন সেমিপাকা সে বিল্ডিং গড়ের মাঠের মতো হা হা করছে। নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে মাত্র সাতজন ছাত্র এলো। ফরিদ ভগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “বাকিরা কই?”
ছাত্ররা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তাদের বন্ধুরা যে আর এদিকে আসবে না, ইতোমধ্যেই অন্য কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে গেছে—সেটা স্যারকে কীভাবে জানায়! মাসের মাঝামাঝি দেখে তাদের যেতে সংকোচ তৈরি হয়েছিল। এ মাসটা শেষ হলে বেতন দিয়ে তারাও কেটে পড়বে। বন্ধুদের ছাড়া একা পড়ে মজা নেই।
ওদের মুখের ভাব দেখেই ঘটনা ঠাহর করতে পারলেন ফরিদ। কিন্তু ঘটনাটা ঘটল কেন? তিনি ঋণগ্রস্ত হয়েছেন এজন্য?
ছুটির সময় ধোঁয়াশা কাটল। একটা মেয়ে তার বান্ধবীর সাথে ফিসফিস করে বলছে— “জানিস! ফাবিহা ম্যামের বিয়ে ভেঙে গেছে! কী কাহিনী শুনলে আর এদিকে আসতে চাইবি না। আম্মু তো সাফ মানা করে দিয়েছে। এ মাস শেষ হলেই আমি চম্পট দিব।”
ফরিদ আহমেদ পাথর হয়ে শুনে গেলেন। কোনো উত্তর দিয়ে পারলেন না। ঘটনা কতখানি রং ছড়িয়েছে কে জানে! ওই মেয়েটার মুখে গল্পটা নিশ্চয়ই আরেক মোড় নেবে! নিজেকে অথর্ব পিতা মনে বলো ফরিদের। মেয়েটার জন্য তাই বলে তিনি কিছুই করতে পারলেন না!
ব্যর্থ ভঙ্গিতে বাড়ি ফিরলেন তিনি। ফাবিহা তার অপেক্ষাতেই বসে ছিল। বাবার শুকনো মুখ দেখে সে এগিয়ে এলো। মানুষটা ভেতরে ভেতরে ভেঙে গুড়িয়ে গেছে। আম্মুর মনোবলের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ফাবিহা ভাঙবে না। এই মানুষগুলোকে জোড়া লাগানোর জন্য হলেও সে নিজে আঠার ভূমিকা পালন করবে। পুরো একটা রটনা চাউর হয়ে যাওয়ার পরও তারা ফাবিহার কাছে একটাবার জিজ্ঞেস করেনি—তুই কী করেছিলি ফাবিহা?
এই বিশ্বাসের মর্যাদা ফাবিহা দেবে। যারা বিনা প্রশ্নে, পুরো পৃথিবীর বিপরীতে যেয়ে তাকে বিশ্বাস করেছে—তাদের ভাঙা জীবনে নিজের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আঠার কাজ করে যাবে সে। মোড় ঘুরে তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। জীবন দিয়ে হলেও বনি ইসরাঈলের চব্বিশ নাম্বার আয়াত পালন করে যাবে সে।
“কোচিংয়ে কেউ আসেনি?” মেয়ের প্রশ্নে মাথা ওঠালেন না ফরিদ। চোখটা বরং আরেকদিকে ফিরিয়ে নিলেন।
ফাবিহা একদৃষ্টে সে মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার জন্য..”
“না মা! আমার জন্যই। মুখ চিনে মনের খবর নিইনি। ধরা তো একটা খেতেই হতো।” মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন তিনি।
“এখন কী করবে তাহলে?”
ফরিদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “ছাত্র-ছাত্রী না এলে কোচিং দিয়ে আর কী করব? ঘরের ভাড়াও তো দিতে পারব না। আগামী মাসের শুরুতেই ঘর ছেড়ে দেব।”
ফাবিহা বাবার চেহারার দিকে তাকালো। তাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই কোচিং সেন্টার। কলেজের বেতন তিন চারমাসে একবার দেয়। তাও যা দেয় একেবারেই নাম মাত্র। তবু সে কলেজের শিক্ষক বলেই কোচিংয়ের পসার ছিল। বানের জলে সেটাও ভেসে যাওয়ার পথে।
মাস শেষ হতে হতে সে অবশিষ্ট সাতজনও হাওয়ায় মিশে গেলো। পঞ্চাশ জনের কোচিংটা বিরানভূমিতে পরিণত হতে সময় লাগল মাত্র বিশদিন।
ঘর ছাড়ার আগে ওখানে একা একা অনেকটা সময় কাটিয়ে এলেন ফরিদ। তার মাথা ইদানীং কাজ করে না। কীভাবে আগামী দিনের বাজার করবে সেটাই বুঝে উঠতে পারেন না। ছেলেমেয়েগুলো যদি তবু বেতনটা দিয়ে যেত… অবর্ণনীয় একটা ব্যথা বুক থেকে মাথার পুরোটা জুড়ে রাজ করে বেড়ায়। ফরিদ কোনো পথ পান না।
এই কদিনে আরেকটা ব্যাপার ঘটল।
যাদের কাছে নূরজাহান ধার নিয়েছিলেন তারা সকলেই তার কোণঠাসা অবস্থার কথা জেনে গেছে। ফলে প্রতিদিনই কেউ না কেউ তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে। এবং তাদের ভাষাগুলো মোটেই সুশীল নয়। সিমি, যে কি না খিস্তি-খেউড় শুনেই বড় হয়েছে—সেই মেয়েটাও ওদের ভাষা শুনে কান চাপা দিতে বাধ্য হয়।
ঘটনাগুলো ঘটত সকালের দিকে, ফাঁকা বাড়িতে। সব ঘটনার মতো এটাও নুরজাহান প্রাণপণে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু একদিন বাড়িওয়ালার সামনেই বিশ্রী ব্যাপারটা প্রকাশ পেয়ে গেলো। ঘোমটার আড়াল থেকে বহু চেষ্টা করেও মুখ ওঠাতে পারলেন না নূরজাহান। সেদিন রাতেই বাড়িওয়ালা নোটিশ পাঠালেন—এ মাসের শেষেই তাদের বাড়ি ছাড়তে হবে।
চলমান~
{বার্তা: অক্টোবরের পনের তারিখের ভেতরে গল্পটা শেষ করতে হবে। এর মাঝে চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ প্রতিদিন দেয়ার (মাঝে দু’একদিন গ্যাপ যেতে পারে)। আপনারা যারা গত তিনদিন আমার সাথে ছিলেন, অক্টোবর পর্যন্ত থাকবেন প্লিজ?}